শাহাব আহমেদ শিশু চিকিৎসক ও কথাসাহিত্যিক। জন্ম বাংলাদেশের বিক্রমপুরে। ১৯৮২ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা শুরু করে সোভিয়েত ইউনিয়নের লেনিনগ্রাদ শহরে চলে যান বৃত্তি নিয়ে। অনার্সসহ ডাক্তারি ডিগ্রি অর্জন করে সেখানেই বসবাস করেন ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। সোভিয়েত দেশের পতন ও তৎপরবর্তী রাশিয়া ও প্রাক্তন রিপাবলিকসমূহের বিবর্তন স্বচক্ষে দেখেছেন এবং এ নিয়ে সক্রিয়ভাবে লেখালেখি করেছেন। তাঁর প্রকাশিত বইসমূহের মধ্যে রয়েছে : 'অদৃশ্য মূষিক এক', 'লেনিনগ্রাদের চিঠি', 'কলেজের দিনলিপি', 'দশজন দিগম্বর একজন সাধক', 'হিজল ও দ্রৌপদী মন', 'তিথোনসের তানপুরা', 'লেনিনগ্রাদ থেকে ককেশিয়া', 'ককেশিয়ার দিনরাত্রি', 'যত্র বয় কুরা নদী' ও 'ধুতুরা জোছনার দিন'।
গত বছর প্রকাশিত হয়েছে তাঁর উপন্যাস ‘পেরেস্ত্রোইকা মস্কো ও মধু’। উপন্যাসনটি গল্পপাঠে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। এবারের বইমেলায় কবি প্রকাশনী থেকে তাঁর অনুবাদে প্রকাশিত হলো হুয়ান রুলফোর সতেরোটি গল্পের একটি সংকলন—‘গল্পসমগ্র’। রুলফো এই সতেরোটি গল্পই লিখেছেন, সে কারণেই গল্পসমগ্র। অসাধারণ অনুবাদ। অনুবাদ হয়ে উঠেছে মূলের কাছাকাছি এবং সুবোধ্য। গল্পপাঠের পক্ষ থেকে শাহাব আহমেদকে প্রশ্নগুলো পাঠানো হয় হোয়াটসআপে। তিনি উত্তরগুলো লিখে পাঠান। এই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন তাঁর লেখালেখি, সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘পেরেস্ত্রোইকা মস্কো ও মধু’সহ তাঁর অন্য বইগুলো নিয়ে। আরও বলেছেন বইপড়া, প্রবাসজীবন, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ নানা বিষয়ে।
গল্পপাঠ :
‘পেরেস্ত্রোইকা মস্কো ও মধু’—নামেই বোঝা যাচ্ছে উপন্যাসটির পটভূমি বাংলাদেশ নয়, যদিও উপন্যাসটি বাংলা ভাষায় লেখা। এর পটভূমি সোভিয়েত রাশিয়া। উপন্যাস লেখার জন্য এই পটভূমিকে বেছে নেওয়ার কারণ কী, যদি জানাতেন...
শাহাব আহমেদ :
স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে চোখ ফোটে যে প্রজন্মের আমি তার অংশ, অর্থাৎ যুদ্ধ দেখেছি কিন্তু অংশগ্রহণ করার বয়েস হয়নি। এই সময়টায় সমাজতন্ত্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন নিয়ে আমাদের দেশে কৌতূহল ও উদ্দীপনা ছিল প্রচুর। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পরে আমি ওই দেশে যাই। দীর্ঘদিন সেখানে থেকে ওই দেশটির ভালো ও মন্দ দুটো দিকই দেখার সুযোগ হয়। তারপরে দেখি পেরেস্ত্রোইকা বা রিফর্মের শ্লোগানের আড়ালে ভাঙন ও বিলুপ্তির দুঃসহ দিন মাস ও বছরগুলো। যে দেশটি ১৯১৭ সালে দুনিয়া কাঁপিয়ে যাত্রা শুরু করে, বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদকে মানবিকতার দিকে, সোস্যাল ওয়েলফেয়ার রাষ্ট্রের দিকে যেতে বাধ্য করে, বিশ্বব্যাপী উপনিবেশের শেকল ভেঙে পরাধীন দেশগুলোকে স্বাধীনতার অনুপ্রেরণা ও সাহায্য সহযোগিতা দেয়, হঠাৎ করেই তার বিলুপ্তি মননশীল মানুষের মনে যে নাড়া দেয় আমি তার বাইরে নই। মনে হলো, এটা নিয়ে লেখা উচিত, বিশেষ করে আমাদের দেশে এই দেশটি নিয়ে যত মিথ, যত একচোখা অতিরঞ্জিত গল্প আছে বাস্তবতাভিত্তিক লেখা আছে তার চেয়ে কম, অথবা মোটেও নেই।
গল্পপাঠ :
উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র নাস্তিয়া ও অভ্র কি আপনার দেখা কোনো চরিত্র? আপনার জীবন বা জীবনের কোনো ঘটনা কি এসব চরিত্রে ঢুকেছে?
শাহাব আহমেদ :
চরিত্রগুলো কাল্পনিক কিন্তু তারা বাস্তব জগত থেকে উঠে আসা। ১৯৯০ সালে একবার আমি সিঙ্গাপুরে ফ্লাই করছিলাম, প্লেনে পরিচয় হয় এক বাঙালি ছাত্রের সাথে, যে ঘন ঘন সিঙ্গাপুরে যায় কম্পিউটার আনতে। দীর্ঘ পথে আমাদের অনেক গল্প হয় এবং সে তার গল্প বলে। প্রায় প্রতিবারই কোনো না কোনো সুন্দরী মেয়েকে সে সাথে নিয়ে যায়, যারা জীবনে এই প্রথম সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরে এসেছে, পুঁজিবাদী হাঙর সমাজ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ, শিশুসুলভ সরল এবং শুধু রুশ ভাষা ছাড়া আর কোনো ভাষা জানে না। সে বিভিন্নভাবে ভুলিয়ে ভালিয়ে তাদের বিছানায় নিতে সক্ষম হয়, শুধুমাত্র একবার একটি মেয়েকে সে কোনোমতেই ভাঙতে পারেনি।
সাথে সাথে এই অচেনা এই অভঙ্গুর মেয়েটির মুখ কল্পনায় ভেসে ওঠে। ২৬ বছর পর আমি তাকে নিয়ে লিখতে শুরু করি। নাস্তিয়া এই মেয়েটি কিন্তু আমার প্লেনের সহযাত্রীটি অভ্র নয়। অভ্রকে আমি অন্য ধাতু দিয়ে তৈরি করেছি এবং তারও একটা বাস্তব কঙ্কাল আছে।
যখন একটি উপন্যাস লেখা হয় লেখকের যাপিত জীবনের ছাপ কোনো না কোনোভাবে সেখানে থেকে যায়। রাশিয়া তার হাজার বছরের ইতিহাসে রাষ্ট্র হিসেবে বিলুপ্ত হয়েছে তিনবার। তার শেষ বিলুপ্তির সময়টায়, ১৯৯১ সালে আমি সেখানে ছিলাম দৈন্য, নিরাপত্তাহীনতায় নিমজ্জিত জীবনযুদ্ধে সক্রিয় এক যোদ্ধা হিসেবে, একই সাথে তার ঘটনাবলির নির্মোহ সাক্ষী হিসেবে। সুতরাং এই উপন্যাসে আমার জীবন, আমার পারিপার্শ্বিকতা আছে।
গল্পপাঠ :
উপন্যাসের চরিত্র নির্মাণের জন্য কোনো দেখা চরিত্র হতে হয়, নাকি কেবল কল্পনা করেও চরিত্র নির্মাণ করা যায়? আপনার ক্ষেত্রে কী ঘটেছে বা কী ঘটে থাকে?
শাহাব আহমেদ :
নির্ভর করে গল্পের ওপরে, কখনও কখনও উপন্যাসের কোনো চরিত্রের কঙ্কালটা আসে বাস্তব জীবন থেকে, কখনও তার জন্ম হয় শুধুই কল্পনায়। আমার বিশ্বাস, যদিও তখন উপন্যাস লেখা হতো না। রামায়ণ, মহাভারত, ইলিয়াড, ওডিসির চরিত্রগুলো কাল্পনিক। মানবজাতির প্রথম উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃত আপুলিয়াসের ‘স্বর্ণগর্দভের’ লুসিয়াসও সম্ভবত কল্পনাপ্রসূত, অন্যদিকে মুরাসাকি শিকিবুর ‘টেল অব গেন্জি’র গেন্জি কিন্তু কাল্পনিক নয়। আমার উপন্যাসে কিছু চরিত্র আছে যারা আমার দেখা কিছু মানুষের প্রতিচ্ছায়া।
গল্পপাঠ :
উপন্যাসটি লিখতে আপনার কতদিন লেগেছিল? একটানাই লিখেছেন, নাকি মাঝে বিরতি নিয়েছিলেন?
শাহাব আহমেদ :
২০১৬ সালের দিকে আমি উপন্যাসটি লিখতে শুরু করি, কখনও লেখা এগিয়েছে খুব দ্রুত গতিতে, কখনও খুবই ধীরে। অভ্র ও নাস্তিয়া চরিত্রদুটোর পরিণতি আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে এবং বেশকিছুদিন লেখাটি ফেলে রাখতে হয়েছে। কেবলমাত্র ২০২৩ সালে আমি লেখাটি শেষ করতে সক্ষম হই ।
গল্পপাঠ :
আপনি কোনো উপন্যাস বা গল্প একবারেই লেখেন, নাকি বার বার এডিট করেন? ‘পেরেস্ত্রোইকা মস্কো ও মধু’ কত বার এডিট করেছিলেন?
শাহাব আহমেদ :
‘পেরেস্ত্রোইকা মস্কো ও মধু’ শেষ করতে সময় লেগেছে সাত বছর, যদিও এই সময়ে আমি লিখিত অংশগুলো বদলেছি কয়েকবার। লেখাটি শেষ হবার পরে, আরও তিনবছর তাকে নিয়ে কাজ করেছি। লিখি, পরিমার্জন করি কিন্তু মনের ভেতরে খুঁতখুঁতি থেকেই যায়। বই বের হয়ে যাবার পরে যন্ত্রণাটা কমে না, ‘এই করা হয় নাই’, ‘এই করা উচিত ছিল’ ইত্যাদি অতৃপ্তি তাড়া করে। এই অর্থে লেখকের মনটা মাড়াইয়ের মেশিন বৈ আর কিছু নয়।
গল্পপাঠ :
উপন্যাসটি প্রকাশের পর পাঠকসাড়া কেমন পেয়েছিলেন?
শাহাব আহমেদ :
লেখার ক্ষেত্রে যতটা সচেতন ও সক্রিয় পাঠকের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে আমি ততটাই নিষ্ক্রিয়। সামাজিক মাধ্যমে একসময় উপস্থিত থাকলেও বইটি প্রকাশ হবার আগেই ছেড়ে দিয়েছি। কেমন বিক্রি হয়েছে আমার জানা নেই। বন্ধু-বান্ধবদের প্রশংসাকে শ্রদ্ধা করি, কিন্তু লেখকের তাকে ‘সাড়া’ হিসেবে গ্রহণ করতে নেই।
গল্পপাঠ : “বন্ধু-বান্ধবদের প্রশংসাকে শ্রদ্ধা করি, কিন্তু লেখকের তাকে ‘সাড়া’ হিসেবে গ্রহণ করতে নেই”―খুব ভালো একটা কথা বললেন। অনেক লেখক এ বিষয়টা বুঝতে পারে না। আচ্ছা, আপনি দীর্ঘ প্রবাস জীবন যাপন করছেন। প্রবাসে থেকে লেখালেখি করতে গেলে কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয় কিনা? লেখার জন্য স্বদেশে অবস্থান জরুরি কিনা? একটু বিস্তারিত যদি বলতেন...।
শাহাব আহমেদ :
যে জীবনকে নিয়ে লিখবে, লেখক যদি তার অংশ না হয় তবে তার লেখা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাস্তবতার স্পর্শ হারিয়ে ফেলে। তাই নিজের দেশের বাইরে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষা, সাংস্কৃতিক পরিবেশে থেকে খুব কমই লেখকই তাঁর লেখার তীক্ষ্ণতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। বাংলাদেশে বসে কোনো লেখক যেমন আমেরিকান সমাজের সঠিক চিত্র আঁকতে পারে না, তেমনি আমেরিকায় বসে কোনো বাংলাদেশি লেখক সমকালীন বাংলাদেশকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে অক্ষম বলেই আমার বিশ্বাস। কারণ তার আছে শুধু স্মৃতি, নস্টালজি, অতীত। দেশের উপস্থিতি তার মধ্যে ক্ষয়িষ্ণু চাঁদের মতো। তাই বিদেশে বসে আমরা লিখি পেছনের বাংলাদেশকে নিয়ে। শেকড় যার উন্মূল সে তার স্বদেশের মাটির স্বাদ নিতে পারে না, স্বদেশের মানুষের হৃৎস্পন্দন তার বীণার তারে সঠিক সুরটি তোলে না, আমার বিশ্বাস।
গল্পপাঠ :
আপনি ভ্রমণকাহিনি লিখেছেন। গল্প-উপন্যাসও লিখেছেন এবং লিখে চলেছেন। কোনটি লিখতে আপনি বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করেন?
শাহাব আহমেদ :
বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ নিয়ে আমি বেশ কিছু গদ্য লিখেছি, তবে সেগুলো সম্ভবত ভ্রমণ কাহিনি নয়। আমি যখন কোনো দেশে যাই তার ইতিহাস, সাহিত্য ও মিথ নিয়ে বেশি আবিষ্ট হয়ে পড়ি, তার প্রকৃতি আমাকে টানে। সুতরাং আমার লেখায় এই দিকগুলোই উঠে আসে বেশি, ফলে তা ভ্রমণ কাহিনি না হয়ে ভ্রমণ সাহিত্য হয়ে যায়। যেহেতু ভ্রমণগুলো সংক্ষিপ্ত এবং প্রায় দেশেরই ভাষা আমি জানি না, সাধারণ মানুষের সাথে মেশার এবং তাদের কাছ থেকে জীবন সম্পর্কে জানা হয়ে ওঠে কম। ট্যুর গাইডের মুখের তথ্য নিয়ে গল্প ফাঁদা রিস্কি, তাই আমি এই লেখাগুলো কমিয়ে দিয়েছি। উপন্যাসে কল্পনার পাখা মেলা সহজ। তাই গত কয়েক বছর ধরে আমি এ দিকটায় বেশি সময় দিচ্ছি।
গল্পপাঠ :
‘লেলিনগ্রাদ থেকে ককেশিয়া’ এবং ‘ককেশিয়ার দিনরাত্রি’ আপনার বিশাল কলেবরের দ্বৈত উপন্যাস। এটাও রাশিয়ার পটভূমিতে রচিত। আপনি রাশিয়ায় দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। এই উপন্যাসে আপনার যাপিত-জীবন কতটা এসেছে? নাকি একেবারেই আসেনি?
শাহাব আহমেদ :
‘লেনিগ্রাদ থেকে ককেশিয়া’ ও ‘ককেশিয়ার দিনরাত্রি’, উপন্যাসদ্বয়ের ল্যান্ডস্কেপ প্রশস্ত। রাশিয়া ও রুশবিপ্লব, বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব, রুশ জনগণের প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি ত্যাগ নিয়ে এই উপন্যাস। না-প্রাচ্য, না-পাশ্চাত্য, অভূত অসামান্য এই দেশ এবং অতুলনীয় এই দেশের মানুষগুলোকে যতটুকু বুঝতে পেরেছি, আমি চেয়েছি তাদের অন্তরাত্মাকে উন্মুক্ত করতে আমার পাঠকের কাছে।
৭৫০ পৃষ্ঠার উপন্যাস দুটো লেখা হয় এক নিঃশ্বাসে, রোগি দেখার ফাঁকে, ফাঁকে, আই ফোনে, দিনে, রাতে, প্রায় ৭ মাসে কিন্তু এডিটিং করি তিন বছর। এতবড় একটা উপন্যাসে লেখকের যাপিত জীবন অনুপস্থিত থাকতে পারে না।
গল্পপাঠ :
লেখালেখি কবে থেকে শুরু করেছিলেন? কীভাবে শুরু হয়েছিল সেই গল্পটা শুনতে চাই।
শাহাব আহমেদ :
লেখালেখির শুরু স্কুলজীবনে, মূলত কবিতা লিখতাম বা ছোট ছোট গদ্য কিন্তু দেশ ছেড়ে চলে যাবার পরে তা আর সচল থাকেনি। প্রায় চল্লিশ বছর বাংলায় কথা বলা হয়নি দু-তিনবার দেশে আসার সময়টা ছাড়া। তখন বিদেশে বাংলা বই পাওয়া যেত না, তাই সমসাময়িক বাংলা সাহিত্য পড়াও খুব একটা হয়নি।
লেখালেখিতে ফিরে আসাটা কাকতালীয়। দেশের সাথে যোগাযোগ ছিল না। ফ্রি ফোন ছিলো না, বন্ধু-বান্ধব কে কোথায় হারিয়ে গেছে হদিশ নেই। একদিন ফেসবুকে কার দেয়ালে হঠাৎ চোখে পড়ে আমার একটি পুরনো ছবি এবং স্কুলজীবনের এক বন্ধুর দীর্ঘ উষ্ণ স্মৃতিচারণ। তাতে লেখা ছিল, “আমার ছাত্রজীবনের বন্ধুর (আমার নাম) হাত ধরে বই পড়তে শিখেছি, সে এক সময়ে চমৎকার লিখতো, সেই যে রাশিয়ায় গিয়ে হারিয়ে গেল, আর ফিরে পেলাম না, নইলে আমরা একজন ভালো লেখক পেতাম।”―এই ধরনের কিছু।
কমেন্টবক্সে কয়েকশ বন্ধুর আকুতি, প্রশ্ন। একজন লিখেছে, শুনেছি ও মারা গেছে মাফিয়ার হাতে (আমার ওপরে আক্রমণ হয়েছিল)। বুকের ভেতরে ধ্বক করে ওঠে, তার মানে আমাকে এখনও কেউ কেউ মনে রেখেছে। মূলত ওটাই আমাকে আবার কলম ধরতে অনুপ্রাণিত করে। লিখতে শুরু করি ২০১৫ সালের দিকে, সোভিয়েত ইউনিয়নের স্মৃতি নিয়ে, যা পরে ‘লেনিগ্রাদ থেকে ককেশিয়া’ ও ‘ককেশিয়ার দিনরাত্রি’ উপন্যাসে বিবর্তিত হয়। ততদিনে ভাষা, ব্যাকরণ প্রায় ভুলে গিয়েছি। পরিশ্রম করতে হয়েছে বেশ। কিন্তু টের পেলাম মাতৃভাষা ছাইচাপা থাকলেও মরে না।
গল্পপাঠ :
দেশ ছেড়ে বিদেশে কেন পাড়ি দিয়েছিলেন? প্রথম প্রবাসযাত্রার অভিজ্ঞতার কথা শুনতে আগ্রহী।
শাহাব আহমেদ :
স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে যে দেশপ্রেম, মুক্তচিন্তা, মুক্তিযুদ্ধ, বামপন্থী চেতনা ও রুশসাহিত্য পাঠের আবহ ছিল, সেই সময়ে আমার স্কুলজীবন কাটে। রেজাল্ট ভালো করতাম, তাই ঢাকা কলেজ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছি। সোভিয়েত ইউনিয়নে যাবার বৃত্তি পাই। ওই বয়সে আমরা সবাই ফটিক চাঁদ, বিদেশে যেতে উন্মুখ, বিশেষ করে সেই বিদেশ থেকে যদি পুশকিন লের্মন্তভ দস্তয়েভস্কি তলস্তয় চেখভ গোর্কি ও অস্ত্রভস্কিরা হাতছানি দিয়ে ডাকে। ঘোরের মধ্যে চলে গেলাম! আর ফেরা হলো না।
গল্পপাঠ :
লেখালেখি শুরু আগে বা পরে কোন লেখক আপনাকে প্রভাবিত করেছিলেন? কীভাবে প্রভাবিত করেছিলেন?
শাহাব আহমেদ :
আমি ঘরকুনো বই-পড়া পতঙ্গ। বহু বই পড়েছি, কোনো একজনের নাম বলা অসম্ভব। তবে রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে এক পা ও এগুনো যায় না। মানবতা শিক্ষার গুরু নজরুল। জীবনের বিভিন্ন ধাপে বিভিন্ন বই প্রভাবিত করেছে। স্কুলের মধ্য পর্যায়ে লা মিজেরাবল, কাউন্ট মন্টিক্রিস্টো, শেষ দিকে নিকোলাই অস্ত্রভস্কির ইস্পাত, গোর্কির ছেলেবেলা, জুলিয়াস ফুচিকের ফাঁসির মঞ্চ থেকে, শওকত ওসমানের কৃতদাসের হাসি ও সমাগম; কচি মনে সমাগমের শেষ বাক্যটি, “এরাই পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য করে গেছেন” ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। আরও একটু পড়ে হায়াৎ মামুদের ‘মৃত্যুচিন্তা রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য জটিলতা’ ইউরোপের বিখ্যাত কয়েকজন কবির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। অবন্তী সান্যাল সম্পাদিত হাজার বছরের প্রেমের কবিতা রোমান্টিক মনটিকে ল্যাত ল্যাতে করে দেয়। কলেজের সময়টায় মূলত রুশ সাহিত্য ও রাজনৈতিক বই পড়ি। রাশিয়ায় গিয়ে রুশ অনুবাদে গ্যাটের ‘ফাউস্ট’ পড়ে অসম্ভব বিহ্বলিত হই। পুশকিনের ‘এভগেনিয়ি অনেগিন’, গোগলের ‘মৃত আত্মারা’ রুশ সাহিত্যের অনুন্মোচিত সৌন্দর্য উন্মুক্ত করে। লের্মন্তভ, পুশকিন, রসুল গামজাতভের কবিতার সাথে পরিচয় থাকলেও ইয়েসিনিনকে পড়ি রুশ ভাষায়। এত মুগ্ধ হই যে লাইব্রেরিতে বই ঘেটে ঘেটে প্রায় তিনশ পৃষ্ঠার একটি বই লিখি তাঁকে নিয়ে। (দুঃখজনকভাবে পাণ্ডুলিপিটা হারিয়ে যায়)। গিলগামেশ আমার পাশে পাশে হেঁটেছে প্রায় সারাজীবন। হাঁটে এখনও।
এই তালিকা দীর্ঘ, সব মনেও নেই। এরা আমার মননকে সমৃদ্ধ করেছে, ভাষার সৌন্দর্য ও বৈচিত্র চিনিয়েছে, লেখার গভীরে ডুব দিতে শিখেছি এবং অবশ্যই মানুষ হিসেবে পরিশীলিত হয়েছি (যদি তার কোনো মূল্য থেকে থাকে)।
গল্পপাঠ :
‘ধুতুরা জোৎস্নার দিন’ উপন্যাসটির ভাষাকে আপনি বলেছেন প্রধান চরিত্র। উপন্যাসে তো মানুষ কিংবা মানবেতর প্রাণী চরিত্র হিসেবে থাকে। ভাষা কীভাবে উপন্যাসের চরিত্র হয়, যদি একটু বুঝিয়ে বলতেন...।
শাহাব আহমেদ :
দাবিটি ঠিক আমার নয়, বইটির সম্পাদনার পর সম্পাদকের মনে হয়েছে বইটির প্রধান চরিত্র ভাষা। লেখকের কাজ লেখা, বিভিন্ন পাঠক লেখাকে দেখে বিভিন্ন চোখ দিয়ে শুধু জীবিত প্রাণিই নয়, আমার মনে হয় ভাষা, সময়, নদী, বৃক্ষ, মাছ, হাঙর, তিমি ইত্যাদি বহু কিছুই লেখকের হাতে প্রধান চরিত্র হিসেবে উপস্থিত হতে পারে। আর তুমি মানবেতর প্রাণি বলছো, (হাসছি), সময় এসেছে বাংলাভাষা থেকে ওই শব্দটা ছুড়ে ফেলে দেবার, ঈশ্বরকে বাদ দিলে মানুষের চেয়ে ইতর কোনো প্রাণি তুমি খুঁজে পাবে না কোথাও।
গল্পপাঠ :
আমি আপনার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত যে বাংলা ভাষা থেকে ‘মানবেতর প্রাণি’ শব্দদ্বয় ছুড়ে ফেলে দেওয়ার সময় এসেছে। আসলে শব্দটা বহুল প্রচলিত তো, তাই ব্যবহার করেছি। করাটা উচিত হয়নি। আসলেই মানুষের চেয়ে ইতর প্রাণি আর নেই। যাই হোক, উপন্যাসটি আপনি কোথায় বসে লিখেছেন? কতদিন লেগেছিল লিখতে?
শাহাব আহমেদ :
এ বইটি দ্রুত লেখা হয়েছে, মাস কয়েক মাত্র, খুব ঘোরের মধ্যে লিখেছি। বছর দুই সম্পাদনা করেছি।
গল্পপাঠ :
এখন কোন বইগুলো পড়ছেন, খাটের পাশের টেবিলে কোন বইগুলো এনে রেখেছেন পড়বার জন্য? সর্বশেষ কোন শ্রেষ্ঠ বইটি আপনি পড়েছেন?
শাহাব আহমেদ :
গত কয়েকমাসে রুশ সাহিত্যের যে বইগুলো একদিন বাংলা অনুবাদে পড়ে মুগ্ধ হয়ে ছিলাম তা মূলে পড়ে যাচ্ছি। শেষ করেছি ‘অপরাধ ও শাস্তি’, ‘ইডিয়ট’, ‘ডেমনস’। সর্বশেষ শ্রেষ্ঠ বইটি : ‘যুদ্ধ ও শান্তি।’ পড়েছি চেখভের বেশ কিছু গল্প। এভগেনিয়ি জামিয়াতিনের বিশ্ববিখ্যাত ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস, ‘আমরা’ বইটি ভালো লেগেছে, অনুবাদ শুরু করেছি। পড়েছি চিনু আচিবের ‘থিংস ফল এপার্ট’ ও জোসেফ কনরাডের ‘হার্ট অব ডার্কনেস।’
পেরু নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে খোঁজ পেলাম প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘সূর্য কাঁদলে সোনা’ (এই বইটির অস্তিত্বের কথা জানতাম না) পড়ে আনন্দ পেয়েছি। আরও পড়লাম ‘চাঁদের অমাবস্যা’, ‘আরণ্যক’, ‘হার্বাট’, মোজাফফর হোসেনের ‘কল মি লাইকা’, স্বকৃত নোমানের ‘উজানবাঁশি’, কাজী লাবণ্যের ‘হাজারমুখী রোদসী’, সাদ কামালির ‘লীলাবতী, লালবাতি নীলমানুষ।’ এখন পড়ছি প্রীতম বসুর ‘চৌথুপীর চর্যাপদ।’
গল্পপাঠ :
আপনার প্রতিদিনকার পাঠের অভিজ্ঞতার কথা বলুন, কখন কোথায়, কী এবং কীভাবে পড়েন?
শাহাব আহমেদ :
যখনই সময় পাই প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু পড়ি। সাহিত্য, ইতিহাস, পুরান আমাকে খুব টানে। বেশিরভাগ সময় বাসায় পড়ি, কখনও প্লেনে, যখন ভ্রমণ করি। প্রিন্টেড বই বা ই-বই দু’ভাবেই সই। অডিও বুক শুনি একঘণ্টা প্রাতভ্রমণের সময় বা যখন গাড়ি চালাই।
গল্পপাঠ :
ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, সমালোচক এবং কবিদের মধ্যে এখনও লিখছেন এমন কাকে আপনি সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করেন? কেন করেন?
শাহাব আহমেদ :
একজনের নাম বলতে পারবো না। তবে অমর মিত্র, হরিশঙ্কর জলদাস, ওয়াসি আহমেদ, আফসানা বেগম, ইমতিয়ার শামীম হুমায়ূন কবির, দীপেন ভট্টাচার্য, ইমতিয়াজ মাহমুদ, বদরুজ্জামান আলমগীরের লেখা ভালো লাগে। তাদের কাউকে কাউকে চিনি। এরা বাজারবাজি এড়িয়ে নিভৃতে লেখেন যা আমার ব্যক্তিগত দর্শনের সাথে যায়। খালিকুজ্জামান ইলিয়াস আমার খুব প্রিয়।
গল্পপাঠ :
লেখক হিসেবে তৈরি হতে কোন বইটি আপনার মনকে শৈল্পিক করে তুলেছে এবং কীভাবে?
শাহাব আহমেদ :
কোনো একক বইয়ের নাম বলতে পারবো না। লেখক কবিরা সমষ্টিগত মননের ফসল, নতুন বোতলে, নতুন মোড়কে পুরনো মদ বিক্রি করা যাদের কাজ। যে যতটা নতুনভাবে করতে পারে, সে ততটাই সফল, এই কারণেই কাফকা আমাদের এত প্রিয়।
গল্পপাঠ :
আপনি যখন একটি বইয়ের কাজ করেন, লেখেন, সম্পাদনা করেন, কাটাকাটি করেন—সেই সময়টায় কোন ধরনের লেখাপত্র পড়েন? আবার ঠিক এরকম পরিস্থিতিতে কী ধরনের লেখা আপনি এড়িয়ে চলেন?
শাহাব আহমেদ :
আসলে পাঠক হিসেবে আমি ‘সর্বভূক’। পড়ি সবকিছু। “আমি জানি শুধু প্রেমে পড়তে আর বই পড়তে, এই পড়ে পড়েই আমার যত সর্বনাশ!” আমার একটি লেখায় আছে। কথাটি সত্য। যখন কোনো ইতিহাস ভিত্তিক বা ভ্রমণভিত্তিক লেখা নিয়ে বসি, তা নিয়ে পড়াশুনো করি প্রচুর।
গল্পপাঠ :
সম্প্রতি বা আগে পঠিত বইগুলো থেকে এমন কোনও বিস্ময়কর ব্যাপার কি জেনেছেন যা আপনার লেখক-জীবনকে ঋদ্ধ করেছে?
শাহাব আহমেদ :
হুয়ান রুলফোকে আবিস্কার করি অল্পকিছুদিন আগে, তার পেদ্রো পারামো ও ছোটগল্পগুলো দৃষ্টি উন্মোচনকারী। আমি অনুবাদক নই, নিজের মৌলিক লেখা ছাড়া অনুবাদে লিপ্ত হতে চাইনি যদিও অনুবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করার লক্ষ্যে বাংলা অনুবাদ ফাউন্ডেশনের সাথে জড়িত আছি। কিন্তু রুলফো’র গল্পগুলো আমার কাছে এত ব্যতিক্রমধর্মী মনে হয়েছে যে পড়তে পড়তে কখন সেগুলো অনুবাদ করে ফেলেছি সঠিকভাবে টেরও পাইনি।
আমাদের একটি ‘লাতিন সাহিত্য আড্ডা’ আছে, প্রতি দু-তিন সপ্তাহ পরে আমরা মিলিত হই এবং পূর্বনির্ধারিত কোনো গল্প বা ছোট উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করি। ইতিমধ্যেই রুলফো, নেরুদা, মার্কেজ, লোর্কা, কার্পেন্তিয়ের, ওনেত্তি ও আস্তুয়িয়াস নিয়ে পাঠ হয়েছে। কার্পেন্তিয়ের, ওনেত্তি, আস্তুয়িয়াস, বোর্হেস এর লেখাগুলো সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী, বলার চেয়ে না বলা কথা অনেক বেশি, প্রতিটি লেখায় স্তরের পর স্তর, বুঝতে কষ্ট হয়, গবেষণা করতে হয়, যখন বোঝা হয় তখন ভীষণ ভালো লাগে। যা বুঝলাম, তাও নিশ্চিত নই লেখক তাই বুঝিয়েছেন কিনা। এটা নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন আবিস্কার, অন্তত প্রচুর বই পড়া সত্ত্বেও আমি এই ধরনের পঠনে অভ্যস্ত নই। বন্ধু অনুবাদক আনিসুজ জামান এ ক্ষেত্রে আমাদের অনুপ্রেরণা।
গল্পপাঠ :
হ্যাঁ, আপনি হুয়ান রুলফোর সব কটি গল্প (১৭টি) অনুবাদ করেছেন, এবারের বইমেলায় বাংলাদেশের কবি প্রকাশনী থেকে ‘গল্পসমগ্র’ নামে বইটি প্রকাশিত হয়েছে। রুলফোর গল্প তো মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এর আগে অনুবাদ করেছেন, আপনার কেন মনে হলো আবার অনুবাদ করা দরকার? মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুবাদ ও আপনার অনুবাদের মধ্যে পার্থক্য কী? অনুবাদক হিসেবে আপনার কী অভিমত?
শাহাব আহমেদ :
রুলফোর গল্পগুলো ইংরেজিতে প্রথমে জর্জ ডি শেইড, পরে ওয়েদারফোর্ডের অনুবাদে পড়ে ভীষণভাবে মুগ্ধ হয়ে অনেকটা তাৎক্ষণিকভাবে অনুবাদ শুরু করি, মূলত ‘লাতিন লিট’ আড্ডার জন্য, যেখানে আমরা বিভিন্ন গল্প বা কবিতা পাঠ করে আলোচনা করি। ওখানে অনেকেই মন্তব্য করেছেন অনুবাদগুলো সাবলীল ও সহজবোধ্য হয়েছে। তাদের অনুরোধেই বই হিসেবে বের হল। আমাদের জানা মতে রুলফো এই সতেরোটি গল্পই লিখেছেন, সতেরোটি মাণিক্য, তাই আমরা ‘গল্প সমগ্র’ নামটি পছন্দ করেছি, যদিও রুলফোর বইটির নাম ‘লেলিহান প্রান্তর ও অন্যান্য গল্পসমূহ।’
মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় খুব ভালো অনুবাদক, বাংলায় লাতিন সাহিত্যের পথ প্রদর্শক, শ্রদ্ধেয় অনুবাদক। আমার হাতে তাঁর করা রুলফোর অনুবাদের বইটি আসেনি। পড়া হয়নি বলে তুলনামূলক মন্তব্য করতে অপারগ হচ্ছি। তবে, সম্প্রতি তাঁর করা কার্পেন্তিয়েরের ‘সান্তিয়াগোর রাস্তা’ গল্পটি পড়ে ‘লাতিন লিট’ আড্ডায় আলোচনা করেছি। নিঃসন্দেহে জটিল গল্পটির পরিশ্রমী সুন্দর অনুবাদ করেছেন, তবে আমার মনে হয়েছে তাঁর ভাষা শৈলীটা একটু পুরনো, একটু গুরুগম্ভীর, আমরা এখন আরও একটু সহজ, আরও একটু প্রাচ্যবাংলায় লিখি। পাঠকের সামনে এখন দুটো চয়েস রইলো, এই অর্থে আমি কাজটাকে পজিটিভ দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ করব।
গল্পপাঠ :
গল্পকার হিসেবে একজন রিপোর্টারের মতোই কি আপনি চারপাশটাকে অবিরাম পর্যবেক্ষণে রাখেন? লেখার জন্য আপনি কি নোট নেন?
শাহাব আহমেদ :
চারিপাশের দিকে চোখ রাখা খুবই দরকার কারণ আমাদের চারিদিকে যা ঘটছে, লেখার রসদ আসে তার থেকে। মগজে তার প্রসেসিং হয়। ইনপুট না থাকলে, আউটপুট কমে যায়। আজকের জগতে শুধু কল্পনা দিয়ে লেখা যায় না, অন্তত আমি পারি না। মাঝে মধ্যে কিছু নোট নিই, তবে নিয়মিত নয়। আমি সারাজীবন আমার পেশা ডাক্তারিকে যতটুকু সিরিয়াসভাবে নিয়েছি লেখাকে তেমনভাবে নিতে পারিনি। অর্থাৎ চেখভ যেভাবে ডাক্তারিকে বিবাহিত স্ত্রী আর সাহিত্যকে প্রেমিকা হিসেবে গ্রহণ করতে পেরেছিলেন, আমি বিবাহিত স্ত্রীতেই মগ্ন থেকে প্রেমিকাকে অবহেলা করেছি।
গল্পপাঠ :
সাহিত্যের মাধ্যমে কি সমাজ পরিবর্তন হয়? আসলে সাহিত্যিকের কাজ কি শুধুই সাহিত্য রচনা, নাকি সমাজের দিকটাও মাথায় রাখা? আপনার কী মনে হয়?
শাহাব আহমেদ :
সারাজীবন তাই বিশ্বাস করেছি, লেখকের দায়িত্ব সমাজ সচেতন হওয়া, সমাজ পরিবর্তনে সংযুক্ত হওয়া। কিন্তু এখন পশ্চিম থেকে পুব দিকে তাকিয়ে মনে হয় অতি পুরনো কথা, “পৃথিবীকে নাড়াতে চাও, আগে নিজে নড়ো।” মনে হয় লেখকের লেখা উচিত কোনো দায়িত্ববোধ থেকে নয়, নিজের আনন্দের জন্য। তা যদি কাউকে আনন্দ দেয় দিল, যদি না দেয় লোকসান বড় কিছু নয়। কারণ মানুষের ভাগ্য মানুষের হাতে নয়।
গল্পপাঠ :
এখন কী লিখছেন? ভবিষ্যতে কী লেখার ইচ্ছে?
শাহাব আহমেদ :
২০১৮ সালে একটা ভ্রমণগদ্য লিখেছিলাম পেরু নিয়ে, শব্দঘরে বের হয়েছিল। কিন্তু পরে মনে হল ইতিহাস ও বর্তমান বিশ্বের উন্মত্ততা নিয়ে পেরু, সোভিয়েত ইউনিয়ন, আফ্রিকা, আমেরিকা, বাংলাদেশকে এক সূত্রে বেঁধে একটি উপন্যাস লেখা যায়। “আনাবেলা” নামে উপন্যাসটি শেষ করেছি বছর তিনেক আগে, ধীরে সুস্থে ওটা নিয়ে কাজ করছি। এই উপন্যাসে চারু মজুমদার টাইপের কট্টর বিপ্লবী আনাবেলা প্রায়ই হোরেসের কবিতা উচ্চারণ করতো, “দেশের জন্য প্রাণ দেয়ার চেয়ে গর্বের কিছু নেই।” আর আনাবেলার প্রেমিক, বাংলাদেশের মিনমিনে বিপ্লবী সুস্মিতো শ্লোগান দিত, “মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক নিপাত যাক।” এবং মনে করতো আনাবেলা ফ্যানাটিক এবং ভুল পথে হাঁটা বিপ্লবী। দেখা গেল আনাবেলা ঠিকই পেরুর জন্য প্রাণ দিয়েছে কিন্তু সুস্মিতো আমেরিকায় এসে ডাক্তারি করছে।
গল্পপাঠ :
বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ কী? বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ কী? বাংলাদেশের পাঠক তো ক্রমশই কমছে। নাকি বাড়ছে? আপনার পযর্বেক্ষণ কী বলে?
শাহাব আহমেদ :
আগে মনে হতো আমাদের জাতটা খারাপ তাই আমাদের এই দুর্দশা। পাঁচটি দেশে বাস করে এবং পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব জাতই বে-জাতের ভূত-প্রেত। কোনো জাতি যদি সামনে এগিয়ে এসে থাকে, তারা ভাগ্যবান, তারা কোনো দূরদর্শী নেতা বা নেতৃবৃন্দ পেয়েছিল, যারা তাদের ডিসিপ্লিন শিখিয়েছে আইনের প্রয়োগ, অপরাধের শাস্তি, বাস্তব-ভিত্তিক শিক্ষা এবং দেশ- জাতির জন্য মঙ্গলকর বিভিন্ন প্রজেক্ট বাস্তবায়নের মাধ্যমে। আমরা শ্লোগান ও প্রতিশ্রুতি পেয়েছি কিন্তু নেতা পাইনি। সুতরাং আমাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবার কোনো যুক্তিসম্মত কারণ দেখি না।
দেশ যদি মধ্যযুগে মুক্তি খোঁজে তার ভাষা, তার সাহিত্য উল্টা দিকে যাবে কীভাবে? মুসলমানরা বাংলাভাষাকে তাদের ভাষা হিসেবেই মানতে রাজি নয়। সৎ, বিবেকবান, ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্যিকদের জন্য ১৪ই ডিসেম্বরের পুনরাবৃত্তি হবার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। যারা ১৪ ডিসেম্বরের পরিকল্পনা করেছে এবং বাস্তবায়ন করেছে তারা কোনোদিন ক্ষমা চায়নি এবং তারা ক্ষমতার করিডোরে হাঁটে। তাছাড়া, পৃথিবীর ছোট দেশগুলো প্রতিবেশি বড় দেশগুলোর ইচ্ছা অনিচ্ছায় বাঁচে মরে। আমরা ব্যতিক্রম হবো এটা ভাবার কারণ নেই বিশেষ করে যেখানে দেশপ্রেমিক বিশ বা বাইশ কোটি কিন্তু নেতা নেই একজনও।
সারা পৃথিবীতেই পাঠক কমে আসছে, আমাদের দেশেও তাই। আমাদের দেশে লেখক, প্রকাশক, প্রোডাকশন সবকিছু নষ্ট চক্রের মধ্যে ঘোরে। সামান্য কিছু পাঠক যারা বই কেনে তারা প্রায়শই মানসম্মত বই পায় বলে মনে হয় না, অনুবাদ সাহিত্যের ক্ষেত্রে অবস্থাটা আরও করুণ। ·
সাক্ষাৎকার গ্রহণের কাল : মার্চ, ২০২৬


0 মন্তব্যসমূহ