আনন্দ রোজারিও
২০০১ সালের ৮ অক্টোবর, যখন মার্কিনী যুদ্ধবিমান আফগানিস্তানের আকাশ চিরে ওসামা বিন লাদেন এবং তার তালেবান রক্ষীদের ওপর বোমা বর্ষণ শুরু করল, তখন যুদ্ধ-ইতিহাসের বিখ্যাত গবেষক জন কিগান লন্ডনের The Daily Telegraph-এর প্রতিরক্ষা বিভাগ থেকে নিজের এক ধরনের পাল্টা আক্রমণ শুরু করলেন।
কিগান ঘোষণা করলেন, মার্কিন রাজনৈতিক বিজ্ঞানী, ইতিহাসচিন্তক ও অধ্যাপক স্যামুয়েল পি হান্টিংটন ঠিকই বলেছিলেন, শীতল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পৃথিবীতে নতুন ধরনের সহিংসতা দেখা দেবে—পূর্ব আর পশ্চিমের মধ্যে সভ্যতার সংঘর্ষ।
কিন্তু হান্টিংটন যথেষ্ট দূর পর্যন্ত যাননি—কিগান লিখলেন। তার মতে, পশ্চিমা ও ইসলামি বিশ্বের সংঘর্ষের ‘মূল উপাদান’ লুকিয়ে আছে একটি সহজ পার্থক্যের মধ্যে। “পশ্চিমারা মুখোমুখি যুদ্ধ করে,” তিনি লিখলেন। “তারা সবচেয়ে রূঢ় অস্ত্র বেছে নেয় এবং ভয়ংকর সহিংসতায় তা ব্যবহার করে। কিন্তু প্রাচ্যের মানুষ সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে চলে; তারা পছন্দ করে অতর্কিত হামলা, আকস্মিক আক্রমণ, প্রতারণা ও কৌশল।”
তার মতে, ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা ছিল সেই ‘প্রাচ্য ঐতিহ্য’-এরই প্রত্যাবর্তন। “আরবরা হঠাৎ শূন্য আকাশ থেকে বেরিয়ে এলো, যেন মরুভূমির পুরোনো দস্যু পূর্বপুরুষেরা ফিরে এসেছে। তারা আকস্মিক হামলায় পশ্চিমের হৃদয়ে আঘাত করল এবং ভয়ংকর ধ্বংস ঘটাল।” এই “শিকারি ও ধ্বংসাত্মক প্রাচ্যবাসীদের” জবাব হিসেবে কিগান চেয়েছিলেন পশ্চিমাদের ধ্রুপদি শক্তিপ্রদর্শন—নিরবচ্ছিন্ন, বিশাল, চূর্ণ করে দেওয়া প্রতিশোধ।
এই লেখার প্রতিক্রিয়া কী হয়েছিল? “ক্ষোভ,” কিগান বললেন। “মানুষ শুনতে চায়নি যে এই হামলাগুলো ছিল ঐতিহ্যগত আরব কৌশলের অংশ। ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শতকের হামলাগুলোতে এ ধরনের কৌশল ব্যবহৃত হতো।। মানুষ বলল, আমি নাকি ইতিহাস জানি না। আমাকে উপহাস করা হলো। বলা হলো আমি রাজনৈতিক শুদ্ধতার সীমা অতিক্রম করেছি, এশীয়দের নিকৃষ্ট বোঝাতে চেয়েছি। যুদ্ধ সম্পর্কে আমার মত নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য—এ কথাও শুনতে হয়েছে।”
কিন্তু কিগান বিন্দুমাত্র বিচলিত নন। তিনি বললেন, “আমি যুদ্ধ নিয়ে দশ হাজারেরও বেশি বই পড়েছি। আমি পঁচিশ বছর ধরে Royal Military Academy Sandhurst-এ পড়িয়েছি। The Face of Battle (১৯৭৬) আর The Mask of Command (১৯৮৯)-এর মতো বহু বই লিখেছি বা সম্পাদনা করেছি। যদি আমার মতামতেরই কোনো মূল্য না থাকে, তাহলে কার আছে?”
শারীরিকভাবে গুরুতর খুঁড়িয়ে হাঁটার সমস্যার কারণে কিগান নিজে কখনো সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে পারেননি। কিন্তু দশ বছর বয়সেই যুদ্ধের প্রতি তার আকর্ষণ তৈরি হয়। তখন তিনি দেখেছিলেন হাজার হাজার আমেরিকান সৈন্য ইংল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলে নেমে আসছে, ডি-ডে অভিযানের প্রস্তুতির জন্য। সেই অভিজ্ঞতা এবং বই পড়ার প্রবল ঝোঁক তাকে যুদ্ধকে বইয়ের পাতায় অনুসরণ করতে শিখিয়েছিল।
University of Oxford থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর কিগান পঞ্চাশের দশকে বৃত্তি নিয়ে প্রথম আমেরিকায় আসেন। তিনি ১৯৮৪ সালে Princeton University-এ এবং ১৯৯৭ সালে Vassar College-এ পড়িয়েছেন।
এখন তিনি উইল্টশায়ারের একটি প্রাসাদসদৃশ বাড়িতে থাকেন। সেখান থেকে তিনি দেখতে পান সেই “কঠিন পথ”, যেখানে একসময় Alfred the Great ডেনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। বর্তমানে তিনি গোয়েন্দা অভিযানের ইতিহাস নিয়ে একটি বই শেষ করছেন।
তবে তার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অন্যরকম। তিনি আর শুধু পূর্ব-পশ্চিম সংঘর্ষ নিয়ে লিখতে চান না; বরং ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাইয়ের যুদ্ধ নিয়ে লিখতে চান। এই ভাবনা থেকেই ২০০২ সালে তিনি প্রকাশ করেন The American Civil War and the Wars of the Nineteenth Century।
প্রয়োজন থেকে কল্পনার দিকে ঝাঁপ
— জন কিগান
“টিউশন ফি”—এই হলো উত্তর।
মানুষ যখন আমাকে জিজ্ঞেস করে কেন আমি লেখক হলাম, আমি শুধু বলি, “টিউশন ফি।” যদিও ইংল্যান্ডে আমেরিকানরা যাকে “tuition” বলে, আমরা তাকে বলি “school fees।” এই দুইয়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। আমেরিকায় বেশিরভাগ বাবা-মায়ের জীবনে কলেজের সময় এলেই টিউশনের চাপ শুরু হয়। তার আগে স্কুল সাধারণত তাদের পকেটে খুব একটা চাপ ফেলে না।
কিন্তু ব্রিটেনে ব্যাপারটা উল্টো। কলেজ প্রায় বিনা খরচে—আগের মতো পুরোপুরি নয়, কিন্তু এখনো সহনীয়। অন্যদিকে, স্কুল খুব ব্যয়বহুল, অন্তত তাদের জন্য যারা সন্তানকে সরকারি স্কুলে না পাঠিয়ে বেসরকারি স্কুলে পাঠাতে চান।
মধ্যবিত্তরা প্রায় সবসময় সেই পথটাই বেছে নেয়, যদিও অর্থনৈতিক বিচক্ষণতা আর সাধারণ বুদ্ধি তাদের তা না করতে বলবে। কেউ কেউ পথে হেরে যায়, কেউ অবসরজীবন পর্যন্ত ঋণের বোঝা টেনে নিয়ে যায়। সবাই জানে এর মূল্য কত। তবু তারা লড়াই চালিয়ে যায়।
কারণ এই স্কুলের খরচ শুরু হয় তখনই, যখন বাবা-মায়ের পেশাজীবন কেবল শুরু হয়েছে। তখনো তারা সঞ্চয় করতে পারেনি, বীমা গড়ে তুলতে পারেনি, এমনকি খুব বেশি উপার্জনও শুরু হয়নি।
তবু আমরা কেন এটা করি?
অনেক সরকারি স্কুল, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও শহরতলির, খুব ভালো। আবার অনেক বেসরকারি স্কুলও তেমন ভালো নয়। বেসরকারি শিক্ষা কোনো নিশ্চয়তা দেয় না। বরং ব্রিটেনের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায়ই সরকারি স্কুলের ছাত্রদের অগ্রাধিকার দেয়।
তবু মধ্যবিত্ত সমাজ যেন এই ব্যয়বহুল শিক্ষাযাত্রাকে চরিত্রের পরীক্ষা বলে মনে করে। তুমি যদি সমাজে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে চাও, যদি সন্তানদের জন্য “সেরা” বলে যা ধরা হয় তা দিতে চাও, তাহলে তোমাকে এই ফি দিতেই হবে। যাই হোক, এগিয়ে যাও। পিছিয়ে পড়লে শয়তান যাক তাকে নিয়ে।
আমার লেখকজীবনের শুরু তিরিশের কোঠায়। তখন আমার চার সন্তান, আর আমার সম্বল শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন। স্কুলের খরচ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আমি ভাবতে শুরু করলাম, কীভাবে তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করব? কারণ ব্রিটিশ মধ্যবিত্তের কাছে “শিক্ষা দেওয়া” মানে শুধু “স্কুলে পাঠানো” নয়।
দ্বিতীয় চাকরি নেওয়া সম্ভব ছিল না। আমার স্ত্রী সন্তানদের দেখাশোনায় ব্যস্ত ছিলেন, তিনিও কাজ করতে পারতেন না। শেষ পর্যন্ত আমি সিদ্ধান্তে পৌঁছালাম—আমাকে লেখক হতে হবে।
আজ ত্রিশ বছরের লেখকজীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে নিজের সরলতাকে ভেবে আমি এখনো হাসি। এখন আমি জানি, বেশিরভাগ লেখক কাগজের ক্লিপ কেনার মতো টাকাও আয় করতে পারেন না।
ব্রিটেনে প্রতি বছর যে এক লাখ বই প্রকাশিত হয়, তার নব্বই হাজারই ছাপার খরচ তুলতে পারে না। কিছু বই লেখক নিজেই অর্থ দিয়ে ছাপান। আর যেগুলো কিছু আয় করে, সেগুলোর মধ্যেও খুব কম বই লেখককে স্বাধীনভাবে বাঁচার মতো আয় এনে দেয়। আজ যদি আবার শুরু করতে হতো, তাহলে চার সন্তানকে একসঙ্গে বেসরকারি স্কুলে পড়ানোর জন্য বছরে এক লাখ ডলার জোগাড় করার অন্য কোনো পথ খুঁজতাম।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমি সামান্য বেতন পাই। তা দিয়ে সংসার চালাতেই হিমশিম খাই। তাহলে এই অবস্থায় বেসরকারি স্কুলের এত খরচ কীভাবে চালানো সম্ভব—আমি নিজেই বুঝতাম না।
সবচেয়ে বেশি, সম্ভবত, অন্ধ আত্মবিশ্বাস।
আত্মসম্মান নয়। আমি প্রায়ই ভাবি, এই দুইয়ের পার্থক্য মানুষ এত কম বোঝে কেন। নিজের সম্পর্কে আমার খুব বড় কোনো ধারণা ছিল না। বরং আমি প্রায়ই নিজের সীমাবদ্ধতাগুলোই বেশি দেখতাম। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম, কিছু কিছু কাজ আমি অন্যদের চেয়ে একটু ভালো করতে পারি। তার একটি ছিল ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা।
আমি সেটা ভাবতাম কারণ স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখেছিলাম, আমার প্রবন্ধগুলো লেখার দিক থেকে অন্যদের চেয়ে ভালো। আরও লক্ষ্য করেছিলাম, আমি যে ছোটখাটো লেখাগুলো লিখি, সেগুলো কখনো কখনো বই বা সাহিত্যপত্রিকায় পড়া আমার প্রিয় লেখাগুলোর চেয়ে খুব খারাপ নয়।
আমি ভাবলাম, “ওরা যদি পারে, আমিও পারব।”
তারপর আমি শুরু করলাম। শুরুটা হয়েছিল খুব এলোমেলোভাবে।
ষাটের দশকে আমি Royal Military Academy Sandhurst-এ ইতিহাস পড়াতাম—ব্রিটেনের ওয়েস্ট পয়েন্ট বলা যায়। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কিছু ছোট প্রকাশক বুঝতে পারল, এমন পাঠকদের মধ্যে বাজার আছে যারা দামি হার্ডকভার বই কেনে না। তখন জনপ্রিয় হয়েছিল “পার্ট-ওয়ার্ক” নামে সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন। এগুলো আলাদা আলাদা সংখ্যা হিসেবে বের হতো, কিন্তু পরে ফাইলে গুছিয়ে রাখলে একসঙ্গে বই হয়ে যেত।
একজন ছোট প্রকাশক আগে পুরোনো জিনিস, বাগান করা আর পোষা প্রাণী নিয়ে এই ধরনের সিরিজ করে টাকা বানিয়েছিলেন। তিনি ভাবলেন এবার সামরিক ইতিহাস নিয়ে করবেন। তিনি লেখক খুঁজতে গিয়ে ভাবলেন, স্যান্ডহার্স্ট হয়তো লেখক দিতে পারবে।
এটা ছিল খারাপ ধারণা।
সেখানে পুরোনো অধ্যাপকরা লেখালেখিকে অপছন্দ করতেন। একটি কঠোরভাবে অ্যান্টি-ইন্টেলেকচুয়াল প্রতিষ্ঠানে লেখক হওয়াকে তারা প্রায় অপরাধের মতো দেখতেন। কিন্তু তরুণ শিক্ষকরা প্রলোভনে সহজেই রাজি হলেন। ঊর্ধ্বতনদের অপছন্দ সত্ত্বেও তারা লিখতে শুরু করলেন। আমিও তাদের একজন।
এই পার্ট-ওয়ার্ক লেখাগুলো প্রতি হাজার শব্দে দুইশো ডলার দিত। সেই টাকা দিয়ে স্কুলের অনেক ফি দেওয়া যেত।
তার চেয়েও ভালো ছিল প্রকাশকের পরের পরিকল্পনা—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে ছোট “অরিজিনাল পেপারব্যাক” বই। ত্রিশ হাজার শব্দের জন্য দিত পনেরোশো ডলার। কোনো রয়্যালটি নেই, বিদেশি স্বত্ব নেই, কিন্তু হাতে হাতে টাকা।
আমি একের পর এক ছয়টি লিখে ফেললাম। সেই বইগুলো কয়েক বছর ধরে স্কুলের খরচ চালিয়েছে। আরও কয়েকজন পরবর্তীকালে বিখ্যাত হওয়া লেখকও এই প্রলোভনে পা দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ইতিহাসবিদ Paul Kennedy-ও ছিলেন। আমাদের কারওই এ নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই।
বরং আমি খুব কৃতজ্ঞ সেই সিরিজের পরিকল্পনাকারী Barrie Pitt-এর কাছে। কিছু সময়ের জন্য তিনি একদল সম্ভাবনাময় তরুণ লেখকের ভবিষ্যৎ গড়ে দিয়েছিলেন। আমরা সবাই তার কাছ থেকে একটা বড় জিনিস শিখেছিলাম। সেটা হলো--কীভাবে নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যে, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে লিখতে হয়। এটা অমূল্য শিক্ষা।
কোনো ডক্টরাল থিসিসের মতো নয়, যেখানে একজন অধ্যাপকের খুঁতখুঁতে চাহিদা মেটাতে অনন্তকাল ধরে পুনর্লিখন করতে হয়। ব্যারি পিট চাইতেন ছোট, পরিষ্কার, ভালোভাবে লেখা, নির্ভুল ঐতিহাসিক বর্ণনা—যা টেলিভিশন-দেখা পাঠকের গল্পের ক্ষুধা মেটাবে এবং আত্মশিক্ষিত পাঠকের সত্যের চাহিদাও পূরণ করবে।
তিনি যা চেয়েছিলেন, তা পেয়েছিলেন। আর আমরা তরুণ লেখকেরা সেই পথে লিখতে শিখেছিলাম।
এই পার্ট-ওয়ার্ক আর পেপারব্যাকগুলো শুধু স্কুলের খরচই চালায়নি; যথেষ্ট পরিশ্রম করলে এগুলো “গুরুতর সাহিত্য”-এ প্রবেশের পথও তৈরি করেছিল।
অক্সফোর্ডের এক বন্ধু তখন সাহিত্য-এজেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। ১৯৭২ সালে আমি তাকে একটি হার্ডকভার বইয়ের ধারণা দিলাম। আমি লিখলাম, যুদ্ধ নিয়ে অনেক বই আছে, কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের কাছে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আসলে কেমন, তা নিয়ে কোনো বই নেই।
তিনি আমার প্রস্তাব নিয়ে গেলেন। পরে ফিরে এসে Jonathan Cape-এর প্রস্তাব দিলেন এবং আমাকে অল্প কিছু অগ্রিম টাকাও এনে দিলেন। আমি পেপারব্যাক লিখে টাকা রোজগার চালিয়ে গেলাম, কিন্তু পাশাপাশি হার্ডকভার বইও লিখতে শুরু করলাম। সকালে পেপারব্যাক, বিকেলে হার্ডকভার—মাঝখানে শিক্ষকতা।
১৯৭৫ সালের মধ্যে The Face of Battle শেষ হলো। ১৯৭৬ সালে বইটি ইংল্যান্ডে এবং আমেরিকায় Viking Press থেকে প্রকাশিত হয়। তার কিছুদিন পর থেকেই ভালো রিভিউ আসতে শুরু করল—পরে খুবই ভালো রিভিউ।
যুদ্ধ-ইতিহাসের মহীরুহ Michael Howard ঘোষণা করলেন, The Face of Battle হলো “১৯৪৫ সালের পর যুদ্ধ নিয়ে লেখা সেরা ছয়টি বইয়ের একটি।” আমার আত্মবিশ্বাস আরও বাড়ল। এমনকি নিজের প্রতি সামান্য সম্মানও অনুভব করতে শুরু করলাম।
তারপর এক সন্ধ্যায়, পারিবারিক রাতের খাবারের সময়, Alan Williams আমাকে ফোন করলেন। তিনি জানালেন, The Face of Battle-কে Book-of-the-Month Club-এর প্রধান নির্বাচিত বই করা হয়েছে। আমি টেবিলে ফিরে এসে পরিবারের সবার দিকে তাকিয়ে বললাম, “মনে হচ্ছে সব ঠিক আছে। অন্তত আরও কয়েক বছরের জন্য স্কুলের খরচ নিরাপদ।”
যদিও পুরোপুরি সত্যি ছিল না।
পরের কয়েক বছরে আমি লেখকজীবনের একটি কঠিন সত্য বুঝলাম—একজন লেখককে থেমে গেলে চলবে না। আশির দশকের শুরুতে আমি একটি পাণ্ডুলিপিতে পিছিয়ে পড়লাম, টাকা ফুরিয়ে গেল, এবং দুই বছর খুব খারাপ কেটেছিল। সেটি ভয়ংকর বিপর্যয় হয়নি, কারণ তখন আমার সন্তানরা কলেজে ছিল। তাদের খরচের বড় অংশ ব্রিটিশ সরকার বহন করত। কিন্তু ঘটনাটি আমাকে শিক্ষা দিয়েছিল।
তারপর থেকে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, দীর্ঘমেয়াদি লেখালেখির পথে কোনো কিছুকেই বাধা হতে দেব না। মোটামুটি সেই সিদ্ধান্ত মেনেই চলেছি।
The Face of Battle-এর পর আমি আরও ডজনখানেক বই লিখেছি। কিছু ভালো, কিছু কম ভালো। কিন্তু কোনোটি ব্যর্থ হয়নি।
আমার লেখার শক্তির পেছনে দুটি জিনিসকে আমি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। প্রথমটি হলো—কান পেতে শোনা। স্যান্ডহার্স্টে তরুণ শিক্ষক থাকাকালে আমি এমন সৈনিকদের কথোপকথন শুনতে পেরেছিলাম, যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লড়েছিলেন। তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলতেন, তাই কেউ বাড়িয়ে গল্প করতেন না। আর তারা যে সত্যগুলো বলতেন, তা সরকারি সামরিক ইতিহাসের সঙ্গে একেবারেই মিলত না। তাদের কথার সূত্র ধরে আমি যুদ্ধের নথিগুলো নতুনভাবে পড়তে শিখলাম।
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আমাকে বলেছিল—সব সৈনিকই ভয় পায়। শুধু অল্প কয়েকজন সাহসী মানুষ থাকে, যাদের ওপর যুদ্ধ টিকে থাকে। আর যুদ্ধকে সফল করে বড় বড় কৌশল নয়; বরং বাস্তব ছোট ছোট ব্যবস্থা। যুদ্ধ আসলে খুব দৈনন্দিন একটি কাজ।
আর লেখালেখির ক্ষেত্রে আমাকে কী সাহায্য করেছে?
আমার গদ্যের ছন্দের জন্য একটি কান আছে। আমি মনে করি, পাঠযোগ্যতার জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি। আরেকটি বড় সাহায্য ছিল বিদেশি ভাষা। ষোলো বছর বয়স পর্যন্ত আমি লাতিন ও গ্রিক শিখেছি। ফরাসিও খুব ভালো শিখেছিলাম। বিদেশি ভাষা জানা নিজের ভাষার গঠন ও সূক্ষ্মতা বোঝার সবচেয়ে বড় উপায়।
দুঃখজনকভাবে, ইংরেজিভাষী পৃথিবীতে এই অভ্যাস হারিয়ে যাচ্ছে। এখন সবাই ইংরেজি শিখতে চায়। ফল হলো, ইংরেজিভাষী লেখকেরা আগের প্রজন্মের মতো আর ভালো লিখতে পারছে না। আবার ইংরেজির অদ্ভুত নতুন নতুন রূপও তৈরি হচ্ছে তার ঐতিহাসিক কেন্দ্রের বাইরে।
Rudyard Kipling এবং Evelyn Waugh-এর লেখায় যে নিখুঁত স্পর্শ এত স্বাভাবিকভাবে আসত, তা হয়তো চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে। এটি হারিয়ে যাওয়ায় আমি গভীর দুঃখ অনুভব করি। ·
২৮ অক্টোবর, ২০০১


0 মন্তব্যসমূহ