আনন্দ রোজারিও
প্রথম পর্ব :
প্রথম পর্ব :
স্পেস কী এবং কেন এটি সাহিত্যকে গভীর করে
আমরা সাধারণত মনে করি, গল্পের কাজ হলো গল্প বলা। একজন লেখক কোনো ঘটনা, চরিত্র, সম্পর্ক বা অভিজ্ঞতার কথা আমাদের জানাবেন, আর পাঠক সেই গল্প পড়ে আনন্দ পাবেন। কিন্তু সাহিত্য যখন পরিণত হয়, তখন তার কাজ কেবল গল্প বলা থাকে না। সে গল্পের ভেতরে এমন কিছু জায়গা তৈরি করতে শুরু করে, যেখানে পাঠক নিজেই প্রবেশ করে, নিজেই অর্থ তৈরি করে, নিজেই অনুপস্থিত অংশগুলো পূরণ করে। এই ফাঁকা জায়গাগুলোকেই সাহিত্যতত্ত্বে সাধারণভাবে “স্পেস” বলা হয়। স্পেস মানে শূন্যতা নয়, বরং একটি পরিকল্পিত নীরবতা। লেখক সচেতনভাবে কিছু বিষয় বলে দেন না। তিনি জানেন, সবকিছু বলে দিলে গল্পের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়; কিন্তু কিছু না-বলে রাখলে গল্প পাঠকের মনে আরও দীর্ঘ সময় ধরে বেঁচে থাকে। সাহিত্যিক অর্থে স্পেস হলো সেই অঞ্চল, যেখানে লেখকের ভাষা থেমে যায়, কিন্তু পাঠকের কল্পনা শুরু হয়।
ধরা যাক, একটি গল্পে লেখা আছে—“মায়ের মৃত্যুর খবর শুনে সে ধীরে ধীরে আলমারি খুলল। একটি পুরোনো শাড়ি বের করল। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।” এখানে লেখক কোথাও বলেননি যে ছেলেটি কাঁদছে, ভেঙে পড়েছে, অথবা তার বুকের ভেতরে গভীর শোক কাজ করছে। তবু পাঠক সেই শোক অনুভব করতে পারে। কারণ লেখক আবেগকে ব্যাখ্যা না করে তার লক্ষণ দেখিয়েছেন। তিনি অনুভূতির পরিবর্তে আচরণ দেখিয়েছেন। এই যে আবেগকে সরাসরি উচ্চারণ না করে তার জন্য একটি নীরব জায়গা তৈরি করা হলো, সেটিই স্পেস। সাহিত্যিক শক্তির একটি বড় অংশ এখানেই নিহিত থাকে। পাঠককে যদি সব বলে দেওয়া হয়, তাহলে তার কাজ কেবল গ্রহণ করা। কিন্তু কিছু অংশ যদি অনুচ্চারিত থাকে, তাহলে পাঠককে সক্রিয় হতে হয়। তাকে অনুমান করতে হয়, ভাবতে হয়, নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে গল্পকে মিলিয়ে দেখতে হয়।
অনেক নতুন লেখক মনে করেন, পাঠক যদি কোনো কিছু বুঝতে না পারে, তাহলে সেটি লেখকের ব্যর্থতা। ফলে তারা গল্পের প্রতিটি আবেগ, প্রতিটি প্রতিক্রিয়া, প্রতিটি উদ্দেশ্য বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন। চরিত্র কেন রাগ করল, কেন কাঁদল, কেন দ্বিধাগ্রস্ত হলো, কেন সিদ্ধান্ত বদলাল—সবকিছুর ব্যাখ্যা গল্পের ভেতরে দিয়ে দেন। কিন্তু সাহিত্য যত পরিণত হয়, ততই দেখা যায় বড় লেখকেরা ব্যাখ্যা কমিয়ে দেন। কারণ বাস্তব জীবনও তো এমন। আমরা কি কখনো অন্য একজন মানুষের অন্তর্জগত পুরোপুরি জানতে পারি? আমাদের কোনো বন্ধু হঠাৎ চুপ করে যায়। আমরা তার নীরবতা দেখি, কিন্তু নীরবতার কারণ দেখি না। কেউ হাসছে, কিন্তু তার ভেতরে আনন্দ নাকি হতাশা কাজ করছে, তা আমরা জানি না। একজন মানুষ একটি ঘর ছেড়ে চলে গেল—তার সিদ্ধান্তের পেছনে কী ইতিহাস আছে, সেটিও আমরা জানি না। বাস্তব জীবন নিজেই অসংখ্য স্পেসে ভরা। সাহিত্য যখন জীবনের জটিলতাকে ধারণ করতে চায়, তখন তাকেও এই অসম্পূর্ণতা ও নীরবতাকে গ্রহণ করতে হয়।
ঊনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপীয় বাস্তববাদী সাহিত্যে লেখকেরা সাধারণত পাঠককে অনেক তথ্য দিতেন। লিও টলস্টয় কিংবা অনারে দ্য বালজাক চরিত্রের মানসিক অবস্থা, সামাজিক অবস্থান, পরিবেশ, উদ্দেশ্য এবং অতীত ইতিহাস বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করতেন। পাঠককে খুব বেশি অনুমান করতে হতো না। উদাহরণ হিসেবে কল্পনা করা যাক—“সে রাগ করেছিল। কারণ তার মনে হয়েছিল বন্ধুটি তাকে অপমান করেছে। এই অপমানের স্মৃতি তার শৈশবের একটি ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে তার মধ্যে গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছিল।” এখানে লেখক পাঠককে সব বলে দিয়েছেন। পাঠকের আর কিছু আবিষ্কার করার প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে একই দৃশ্য আধুনিক গল্পে এভাবে লেখা হতে পারে—“বন্ধুটির কথা শুনে সে আর কিছু বলল না। কফির কাপ টেবিলে রেখে উঠে চলে গেল।” এখানে রাগ শব্দটি নেই। অপমানের উল্লেখ নেই। কোনো মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণও নেই। তবু পাঠক অনুভব করতে পারে যে কিছু একটা ঘটেছে। প্রথম উদাহরণে তথ্য বেশি, দ্বিতীয় উদাহরণে স্পেস বেশি। আর অনেক সময় সাহিত্যিক শক্তি দ্বিতীয়টির মধ্যেই বেশি থাকে।
স্পেসের সবচেয়ে বড় কাজ হলো পাঠককে গল্পের সহ-স্রষ্টায় পরিণত করা। পাঠক তখন আর কেবল গল্প গ্রহণ করে না; সে গল্প নির্মাণেও অংশ নেয়। সে নিজের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, কল্পনা ও আবেগ দিয়ে গল্পের শূন্যস্থান পূরণ করে। এই কারণেই একই গল্প বিভিন্ন পাঠকের কাছে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। একজন পাঠক কোনো দৃশ্যে বিচ্ছেদের বেদনা দেখতে পারেন, অন্যজন সেখানে মুক্তির সম্ভাবনা খুঁজে পান। একজন পাঠক একটি চরিত্রের নীরবতাকে অপরাধবোধ হিসেবে পড়েন, অন্যজন সেটিকে শোক হিসেবে অনুভব করেন। স্পেস এই বহুমাত্রিক পাঠের সুযোগ তৈরি করে। সাহিত্য তখন একমুখী বার্তা হয়ে থাকে না; তা লেখক ও পাঠকের যৌথ নির্মাণে পরিণত হয়।
এই বিষয়টিকে তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন জার্মান সাহিত্যতাত্ত্বিক ভল্ফগাং আইজার। তাঁর মতে, প্রতিটি সাহিত্যকর্মের মধ্যে কিছু “গ্যাপ” বা ফাঁক থাকে। পাঠক সেই ফাঁকগুলো পূরণ করার জন্যই পাঠের মধ্যে সক্রিয়ভাবে প্রবেশ করে। একটি সহজ উদাহরণ নেওয়া যাক। ধরুন, একটি গল্পের প্রথম লাইন হলো—“চিঠিটি পড়ার পর সে সিদ্ধান্ত নিল আর কখনো বাড়ি ফিরবে না।” এই একটি বাক্য পড়েই পাঠকের মনে একাধিক প্রশ্ন জেগে ওঠে। চিঠিতে কী লেখা ছিল? সে কে? কেন বাড়ি ফিরবে না? বাড়িতে কী ঘটেছিল? লেখক যদি সঙ্গে সঙ্গে সব প্রশ্নের উত্তর না দেন, তাহলে পাঠকের কৌতূহল তৈরি হয়। সে উত্তর খুঁজতে খুঁজতে গল্পের ভেতরে আরও গভীরভাবে প্রবেশ করে। এই কৌতূহলও স্পেসের একটি রূপ। অর্থাৎ স্পেস কেবল আবেগের ক্ষেত্রেই কাজ করে না; কাহিনির ক্ষেত্রেও কাজ করে।
ভালো গল্পের অনেক শক্তি আসে এই অসম্পূর্ণতা থেকে। কারণ সাহিত্য কোনো আদালতের রিপোর্ট নয়, যেখানে সব তথ্য নথিভুক্ত করে জমা দিতে হবে। সাহিত্যের কাজ সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া নয়; বরং এমন একটি অভিজ্ঞতা তৈরি করা, যেখানে পাঠক নিজেই অর্থের সন্ধান করবে। তাই বলা যায়, স্পেস হলো সাহিত্যের নীরব ভাষা। যা লেখা আছে, তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, অনেক সময় যা লেখা নেই, সেটিও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। ফিকশনের ইতিহাসকে যদি এক বাক্যে সংক্ষেপ করা যায়, তাহলে বলা যেতে পারে—মহান সাহিত্য ক্রমশ শিখেছে কীভাবে কম বলে বেশি বোঝাতে হয়। আর সেই শিল্পের নামই স্পেস।
দ্বিতীয় পর্ব:
চেখভ, হেমিংওয়ে ও আধুনিকতার আগমনে স্পেসের বিপ্লব
ফিকশনে স্পেস নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়—সাহিত্যে এই না-বলার কৌশলটির সূত্রপাত কোথায়? মানুষের গল্প বলার ইতিহাস যেমন প্রাচীন, তেমনি গল্পের ভেতরে কিছু অনুচ্চারিত রেখে দেওয়ার প্রবণতাও নতুন নয়। লোককথা, পুরাণ, মহাকাব্য কিংবা প্রাচীন নাটকে এমন বহু জায়গা আছে যেখানে পাঠক বা শ্রোতার কল্পনাশক্তির জন্য কিছু অবকাশ রাখা হয়েছে। কিন্তু সেসব ক্ষেত্রে স্পেস সচেতন নন্দনতাত্ত্বিক কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি। উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের শুরুতে এসে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। লেখকেরা উপলব্ধি করতে থাকেন যে সাহিত্যিক সত্য সবসময় সরাসরি উচ্চারণের মাধ্যমে ধরা যায় না। অনেক সময় ব্যাখ্যার চেয়ে ইঙ্গিত বেশি কার্যকর, বক্তব্যের চেয়ে নীরবতা বেশি অর্থবহ। এই উপলব্ধি থেকেই স্পেস ধীরে ধীরে ফিকশনের একটি কেন্দ্রীয় শিল্পকৌশলে পরিণত হয়।
এই পরিবর্তনের ইতিহাসে আন্তন চেখভের নাম সর্বাগ্রে উচ্চারণ করতে হয়। তাঁর আগে ছোটগল্পকে সাধারণত একটি সুসংহত কাঠামোর শিল্পরূপ হিসেবে দেখা হতো। সেখানে একটি নির্দিষ্ট ঘটনা থাকবে, সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘাত তৈরি হবে, এবং গল্পের শেষে তার একটি সমাধান বা নিষ্পত্তি ঘটবে। পাঠক গল্প শেষ করে বুঝে যাবে লেখক কী বলতে চেয়েছেন। কিন্তু চেখভ এই ধারণাটিকে ভেঙে দেন। তিনি গল্পকে জীবনের কাছাকাছি নিয়ে আসতে চাইলেন। আর জীবন তো কখনো সব প্রশ্নের উত্তর দেয় না। জীবনের অধিকাংশ সম্পর্ক অসমাপ্ত থেকে যায়, অধিকাংশ আকাঙ্ক্ষা পূর্ণতা পায় না, অধিকাংশ মানুষ তাদের মনের গভীরতম সত্য কাউকে বলতে পারে না। মানুষের জীবনে যতটা উচ্চারিত, তার চেয়ে অনেক বেশি অনুচ্চারিত। চেখভ এই অনুচ্চারিত অঞ্চলটিকেই সাহিত্যের উপযোগী বলে মনে করেছিলেন। তাঁর গল্পে তাই প্রায়ই দেখা যায়, কাহিনি শেষ হয়ে গেছে, অথচ জীবনের সমস্যা শেষ হয়নি; গল্পের পাতা বন্ধ হয়েছে, অথচ চরিত্রের ভাগ্য অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
চেখভের বিখ্যাত গল্প The Lady with the Dog এই বিষয়ে একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। গল্পটি পড়তে পড়তে আমরা একটি প্রেমের সম্পর্কের বিকাশ দেখি। কিন্তু গল্পের শেষ মুহূর্তে এসে লেখক কোনো নাটকীয় নিষ্পত্তি দেন না। প্রেমিক-প্রেমিকা শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে থাকবে কি না, সামাজিক বাধা অতিক্রম করতে পারবে কি না, তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে—এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর আমরা পাই না। বরং গল্পের শেষ বাক্যগুলো পড়লে মনে হয় প্রকৃত সংগ্রাম যেন এখনই শুরু হতে যাচ্ছে। অর্থাৎ সমাপ্তির জায়গাতেই চেখভ একটি বিশাল স্পেস তৈরি করেন। সেই ফাঁকা জায়গা পূরণ করার দায়িত্ব পাঠকের। এই কারণেই চেখভের গল্প একবার পড়ে শেষ হয়ে যায় না; তা পাঠকের মনে দীর্ঘদিন কাজ করতে থাকে।
চেখভের একটি বিখ্যাত মন্তব্য আছে—শিল্পীর কাজ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া নয়, বরং প্রশ্নটিকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা। এই ধারণা ফিকশনের ইতিহাসে একটি মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। এর আগে লেখককে প্রায়শই এক ধরনের ব্যাখ্যাকার হিসেবে দেখা হতো। তিনি চরিত্রের আচরণের কারণ ব্যাখ্যা করতেন, ঘটনাগুলোর অর্থ নির্ধারণ করতেন, পাঠককে বলে দিতেন কোনটি ভালো আর কোনটি মন্দ। কিন্তু চেখভ লেখককে সেই আসন থেকে নামিয়ে আনলেন। তাঁর হাতে লেখক হয়ে উঠলেন একজন পর্যবেক্ষক। তিনি দেখান, কিন্তু ব্যাখ্যা করেন না; তিনি ইঙ্গিত দেন, কিন্তু সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন না। ফলে গল্পের অর্থ নির্ধারণের কাজে পাঠকও অংশ নিতে শুরু করে। এখান থেকেই আধুনিক ফিকশনের একটি নতুন যুগের সূচনা হয়।
বিশ শতকের শুরুতে এই প্রবণতা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পৃথিবী দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। বিজ্ঞান মানুষের বহু পুরোনো বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, মনোবিজ্ঞান মানুষের মনের অচেনা অঞ্চল উন্মোচন করেছে, বিশ্বযুদ্ধ সভ্যতার আত্মবিশ্বাসকে ভেঙে দিয়েছে, আর নগরজীবন মানুষকে বিচ্ছিন্ন ও অনিশ্চিত করে তুলেছে। মানুষ আর আগের মতো নিশ্চিত নয়। সত্য আর একক নয়। বাস্তবতাও সরল নয়। এই জটিল অভিজ্ঞতা সাহিত্যে এসে পৌঁছায়। ফলে লেখকেরাও বুঝতে পারেন যে মানুষের অভিজ্ঞতাকে ধরতে হলে সরল ব্যাখ্যার চেয়ে অস্পষ্টতা, নীরবতা এবং স্পেস অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।
ফ্রানৎস কাফকার সাহিত্য এই পরিবর্তনের এক অনন্য উদাহরণ। তাঁর উপন্যাস The Trial-এ জোসেফ কে.-কে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু কেন তাকে গ্রেপ্তার করা হলো, সে কী অপরাধ করেছে, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ কী—এসবের কোনো উত্তর আমরা পাই না। উপন্যাস শেষ হলেও পাই না। অথচ এই অজানা অপরাধই পুরো উপন্যাসকে চালিত করে। পাঠক শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেই অনুপস্থিত তথ্যটির সন্ধান করতে থাকে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি উপস্থিত নয়; বরং তার অনুপস্থিতিই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় শক্তি। কাফকা যেন বলতে চান, মানুষের অস্তিত্বের গভীরতম প্রশ্নগুলোর উত্তর সবসময় পাওয়া যায় না। ন্যায়বিচার, অপরাধ, ঈশ্বর, নিয়তি—এসবের অনেকটাই অন্ধকারে ঢাকা। তাই তাঁর সাহিত্যও সেই অন্ধকারকে অক্ষত রাখে। তিনি স্পেসকে কেবল একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেন না; তিনি তাকে অস্তিত্বগত অভিজ্ঞতার অংশে পরিণত করেন।
তবে স্পেসের সবচেয়ে বিখ্যাত তাত্ত্বিক এবং কারিগর নিঃসন্দেহে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। তিনি স্পেসকে একটি সুস্পষ্ট নীতিতে রূপ দিয়েছিলেন, যার নাম আইসবার্গ থিওরি। তাঁর মতে, সমুদ্রের ওপর ভাসমান একটি আইসবার্গের মাত্র এক-অষ্টমাংশ চোখে দেখা যায়; বাকি সাত-অষ্টমাংশ থাকে জলের নিচে। একটি ভালো গল্পও তেমন। পাঠক যা পড়ে, তা গল্পের কেবল দৃশ্যমান অংশ। আসল অর্থ, আবেগ, ইতিহাস এবং সংঘাত লুকিয়ে থাকে অদৃশ্য স্তরে। কিন্তু এই লুকিয়ে রাখা কখনোই অজ্ঞতার ফল নয়। লেখককে অবশ্যই জানতে হবে তিনি কী আড়াল করছেন। কারণ স্পেস মানে তথ্য না-জানা নয়; স্পেস মানে তথ্য জেনেও তা উচ্চারণ না করা।
হেমিংওয়ের বিখ্যাত গল্প Hills Like White Elephants এই কৌশলের এক অসাধারণ উদাহরণ। গল্পে একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে রেলস্টেশনে বসে কথা বলছে। তাদের সংলাপে পাহাড়ের কথা আছে, গরমের কথা আছে, ভ্রমণের কথা আছে। কিন্তু তারা যে বিষয়টি নিয়ে সত্যিকার অর্থে কথা বলছে—গর্ভপাত—সেটি প্রায় উচ্চারণই করে না। পাঠক ধীরে ধীরে সংলাপের ফাঁক, দ্বিধা, বিরতি এবং অস্বস্তির ভেতর দিয়ে বুঝতে পারে আসলে কী ঘটছে। এখানে গল্পের শক্তি সংলাপের বাক্যগুলোতে নয়; বরং তাদের মাঝখানের নীরবতায়। একজন কম দক্ষ লেখক হয়তো সরাসরি লিখতেন যে মেয়েটি গর্ভবতী এবং ছেলেটি তাকে গর্ভপাত করাতে রাজি করানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু হেমিংওয়ে তা লেখেননি। কারণ তিনি পাঠককে বিশ্বাস করেছিলেন। তিনি জানতেন, পাঠক যথেষ্ট মনোযোগ দিলে সেই অনুচ্চারিত সত্যটি নিজেই আবিষ্কার করবে।
এই বিশ্বাসই স্পেসের ভিত্তি। যে লেখক পাঠককে বিশ্বাস করেন না, তিনি সব ব্যাখ্যা করে দেন। আর যে লেখক পাঠককে বিশ্বাস করেন, তিনি কিছু অংশ পাঠকের জন্য খোলা রাখেন। আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম বড় অর্জন এখানেই। পাঠক আর কেবল গল্পের ভোক্তা নয়; সে গল্প নির্মাণেরও অংশীদার। এই পরিবর্তনের ফলে ফিকশন আরও জটিল, আরও বহুমাত্রিক এবং আরও মানবিক হয়ে ওঠে। কারণ বাস্তব জীবনও তো এমন—আমরা যা দেখি, তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু অদৃশ্য থাকে। মানুষের মুখের চেয়ে তার নীরবতা অনেক সময় বেশি কথা বলে। স্পেস সেই নীরবতার সাহিত্যিক নাম। আর চেখভ, কাফকা ও হেমিংওয়ে আমাদের শিখিয়েছেন যে কখনো কখনো গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাক্যটি সেই বাক্য, যা লেখক লিখে দেননি।
তৃতীয় পর্ব :
অনুপস্থিত চরিত্র, অনুপস্থিত ঘটনা এবং গল্পের অদৃশ্য কেন্দ্র
ফিকশনে স্পেস নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমরা সাধারণত সংলাপের ফাঁক, অসমাপ্ত সমাপ্তি বা আড়াল করা তথ্যের কথা ভাবি। কিন্তু স্পেসের আরও একটি সূক্ষ্ম ও শক্তিশালী রূপ আছে, যা অনেক সময় পাঠকের চোখে সহজে ধরা পড়ে না। সেটি হলো অনুপস্থিত চরিত্র এবং অনুপস্থিত ঘটনা। আশ্চর্যের বিষয়, অনেক মহান গল্পে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটি গল্পে উপস্থিত থাকে না, অথবা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি কখনো আমাদের সামনে ঘটে না। আমরা কেবল তার প্রতিধ্বনি শুনি, তার প্রভাব দেখি, তার অনুপস্থিতি অনুভব করি। অথচ সেই অনুপস্থিত কেন্দ্রটিই পুরো গল্পকে নিয়ন্ত্রণ করে। যেন একটি সৌরজগতের কেন্দ্রের সূর্যকে আমরা সরাসরি দেখি না, কিন্তু তার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি গ্রহগুলোর গতিপথ নির্ধারণ করছে।
বাস্তব জীবনেও আমরা প্রায়শই অনুপস্থিতির দ্বারা পরিচালিত হই। একজন মানুষ হয়তো বহু বছর আগে মারা গেছেন, কিন্তু পরিবারের প্রতিটি সিদ্ধান্তে তাঁর ছায়া রয়ে গেছে। কোনো প্রেম শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু সেই সম্পর্কের স্মৃতি একজন মানুষের বর্তমান জীবনকে নির্ধারণ করছে। কোনো যুদ্ধ বহু আগে শেষ হয়েছে, কিন্তু তার ক্ষত প্রজন্মের পর প্রজন্ম বয়ে চলেছে। অর্থাৎ মানুষের জীবন কেবল উপস্থিত মানুষের দ্বারা গঠিত নয়; অনুপস্থিত মানুষদের দ্বারাও গঠিত। সাহিত্য যখন জীবনের গভীরে প্রবেশ করে, তখন সে এই সত্যটিকেও ধারণ করতে শুরু করে।
অনুপস্থিত চরিত্রের সবচেয়ে সহজ উদাহরণ পাওয়া যায় অনেক পারিবারিক গল্পে। ধরা যাক, একটি উপন্যাসে একটি পরিবারের চারজন সদস্যকে দেখা যাচ্ছে। তারা খাওয়া-দাওয়া করছে, ঝগড়া করছে, অতীত স্মরণ করছে। কিন্তু বারবার কথার মধ্যে উঠে আসছে আরেকজনের নাম—বড় ছেলে, যে বহু বছর আগে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। পাঠক তাকে কখনো দেখে না। তার কোনো সংলাপ নেই। সে কোনো দৃশ্যে উপস্থিত হয় না। অথচ পুরো পরিবারটির আবেগ, ক্ষোভ, অপরাধবোধ, প্রত্যাশা এবং ভাঙনের কেন্দ্রে রয়েছে সেই অনুপস্থিত মানুষটি। গল্পের দৃশ্যমান চরিত্ররা যেন তার চারপাশে ঘুরছে। এই ক্ষেত্রে অনুপস্থিত চরিত্রটি দৃশ্যমান চরিত্রদের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
এই কৌশল নাটকে, উপন্যাসে এবং ছোটগল্পে বারবার ব্যবহৃত হয়েছে। কারণ কোনো চরিত্রকে সরাসরি দেখালে তাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলতে হয়। তার মুখ, কণ্ঠস্বর, আচরণ, চিন্তা—সবকিছু নির্দিষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু অনুপস্থিত চরিত্র কল্পনার ভেতরে বাস করে। ফলে তার সম্ভাবনা অনেক বড় হয়। পাঠক নিজেই তাকে নির্মাণ করে। আর এই নির্মাণের প্রক্রিয়াই স্পেস সৃষ্টি করে।
একইভাবে অনুপস্থিত ঘটনাও গল্পের অদৃশ্য কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। অনেক সময় একটি গল্প এমন একটি ঘটনার পর শুরু হয়, যা আমরা কখনো দেখি না। আমরা কেবল তার পরিণতি দেখি। গল্পের চরিত্ররা সেই ঘটনার অভিঘাতে বদলে গেছে, কিন্তু ঘটনাটি নিজে আমাদের অদেখা থেকে যায়। ফলে পাঠক ধীরে ধীরে টুকরো টুকরো ইঙ্গিত জোড়া লাগিয়ে সেই অনুপস্থিত ঘটনাকে কল্পনা করে নেয়।
এই কৌশল রহস্যকাহিনিতে যেমন ব্যবহৃত হয়, তেমনি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সাহিত্যেও ব্যবহৃত হয়। তবে সাহিত্যিক ব্যবহারে উদ্দেশ্য সাধারণত রহস্য সমাধান নয়; বরং মানুষের অভিজ্ঞতার জটিলতা তুলে ধরা। কারণ বাস্তব জীবনেও তো আমরা প্রায়শই পরিণতি দেখি, কিন্তু কারণ জানি না। আমরা একজন বিষণ্ন মানুষকে দেখি, কিন্তু তার বিষণ্নতার ইতিহাস জানি না। আমরা একটি ভাঙা পরিবার দেখি, কিন্তু সেই ভাঙনের সূচনামুহূর্ত দেখি না। সাহিত্য এই বাস্তবতাকেই শিল্পে রূপ দেয়।
ফ্রানৎস কাফকার সাহিত্য আবার এই প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায়। তাঁর রচনাগুলোতে প্রায়ই এমন একটি অনুপস্থিত কেন্দ্র কাজ করে, যার অস্তিত্ব অনুভব করা যায় কিন্তু স্পষ্টভাবে দেখা যায় না। The Trial-এ জোসেফ কে.-র অপরাধ অনুপস্থিত। The Castle-এ ক্ষমতার কেন্দ্র অনুপস্থিত। চরিত্ররা সেই কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যেতে চায়, কিন্তু পৌঁছাতে পারে না। ফলে অনুপস্থিতিই বাস্তবতার সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়। পাঠক বুঝতে পারে, মানুষের জীবনেও অনেক সময় আমরা এমন শক্তির দ্বারা পরিচালিত হই, যাকে আমরা পুরোপুরি বুঝতে পারি না।
এই ধারণার আরও সূক্ষ্ম উদাহরণ পাওয়া যায় প্রেমের গল্পে। অনেক প্রেমের গল্প আসলে উপস্থিত প্রেমিক-প্রেমিকার গল্প নয়; বরং হারিয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প। একজন মানুষ হয়তো নতুন সম্পর্কে আছে, নতুন শহরে বাস করছে, নতুন জীবন শুরু করেছে। কিন্তু পাঠক ধীরে ধীরে বুঝতে পারে, তার সমস্ত আচরণের পেছনে রয়েছে আরেকজন—একজন অনুপস্থিত মানুষ, যিনি গল্পে নেই, কিন্তু স্মৃতিতে আছেন। তখন গল্পের প্রকৃত কেন্দ্র হয়ে ওঠে সেই অনুপস্থিত সম্পর্ক। যা নেই, সেটিই সবচেয়ে বেশি উপস্থিত।
এই কারণেই অনেক বড় লেখক সরাসরি কেন্দ্র দেখাতে চান না। তাঁরা কেন্দ্রটিকে আড়াল করেন। কারণ কেন্দ্র যত আড়ালে থাকে, তার মাধ্যাকর্ষণ তত বৃদ্ধি পায়। পাঠক তখন গল্পের প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি সংলাপ, প্রতিটি নীরবতার মধ্যে সেই অদৃশ্য উপস্থিতিকে খুঁজতে শুরু করে। আর এই অনুসন্ধানই পাঠের আনন্দকে গভীর করে।
ফিকশনে স্পেসের এই রূপটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য শেখায়। গল্প সবসময় তার দৃশ্যমান অংশের সমষ্টি নয়। অনেক সময় গল্পের আসল শক্তি থাকে সেই অংশে, যা দৃশ্যমান নয়। যে চরিত্রটি অনুপস্থিত, যে ঘটনাটি দেখানো হয়নি, যে স্মৃতিটি কেবল ইঙ্গিতে উপস্থিত, যে সত্যটি কেউ উচ্চারণ করছে না—সেগুলোই গল্পের অদৃশ্য কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তখন কাহিনি আর কেবল ঘটনার ধারাবিবরণী থাকে না; তা পরিণত হয় অনুপস্থিতির এক শিল্পে, যেখানে না-থাকাও এক ধরনের উপস্থিতি, আর নীরবতাও এক ধরনের ভাষা।
চতুর্থ পর্ব :
সংলাপ, নীরবতা ও সাবটেক্সট—কথার নিচের গল্প
ফিকশনে স্পেসের সবচেয়ে সূক্ষ্ম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী রূপগুলোর একটি হলো সাবটেক্সট। একটি গল্পে চরিত্র যা বলে, তার চেয়ে অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সে যা বলে না। সংলাপের দৃশ্যমান স্তরের নিচে আরেকটি অদৃশ্য স্তর কাজ করে, যেখানে লুকিয়ে থাকে প্রকৃত আবেগ, প্রকৃত সংঘাত, প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা এবং প্রকৃত ভয়। এই অদৃশ্য স্তরকেই আমরা সাবটেক্সট বলি। ফিকশনের ভাষায় সাবটেক্সট হলো সেই অঞ্চল, যেখানে স্পেস সবচেয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে। একজন দক্ষ লেখক জানেন, মানুষ খুব কম ক্ষেত্রেই নিজের গভীরতম সত্য সরাসরি উচ্চারণ করে। বাস্তব জীবনে যেমন মানুষ প্রায়ই এক কথা বলে আর অন্য কিছু বোঝায়, তেমনি সাহিত্যেও চরিত্রের মুখের ভাষা এবং মনের ভাষা অনেক সময় আলাদা হয়। এই ব্যবধান থেকেই জন্ম নেয় স্পেস।
বাস্তব জীবনের দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ধরুন, দীর্ঘদিন পর দুই বন্ধু দেখা করল। একজন অন্যজনকে জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছ?” উত্তরে সে বলল, “ভালো আছি।” কথাটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কিন্তু তার চোখের ক্লান্তি, কণ্ঠের ভাঙন কিংবা দীর্ঘ বিরতি হয়তো অন্য একটি গল্প বলছে। মানুষ প্রায়ই নিজের সত্যকে আড়াল করে। কখনো লজ্জায়, কখনো ভয়ে, কখনো সামাজিক শিষ্টাচারের কারণে, কখনো নিজের কাছ থেকেও সত্যটিকে লুকিয়ে রাখতে চায় বলে। সাহিত্য এই মানবিক প্রবণতাকে গভীরভাবে ব্যবহার করে। ফলে সংলাপ কেবল তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম থাকে না; তা হয়ে ওঠে আড়াল এবং উন্মোচনের এক জটিল খেলা।
এই কারণেই বড় লেখকেরা সংলাপকে কখনো সরল ব্যাখ্যার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন না। একজন দুর্বল লেখক হয়তো লিখবেন, “আমি তোমাকে ঘৃণা করি, কারণ তুমি আমাকে প্রতারণা করেছ।” কিন্তু বাস্তব জীবনে মানুষ খুব কমই এভাবে কথা বলে। বরং সে হয়তো বলবে, “তোমার নিশ্চয়ই খুব ব্যস্ত সময় যাচ্ছে।” বাহ্যত বাক্যটি নিরীহ, কিন্তু তার মধ্যে জমা থাকতে পারে বছরের পর বছর ধরে সঞ্চিত ক্ষোভ। পাঠককে সেই ক্ষোভ আবিষ্কার করতে হয়। আর এই আবিষ্কারের জন্য যে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়, সেটিই স্পেস।
আর্নেস্ট হেমিংওয়ের গল্পে এই কৌশল সবচেয়ে বিখ্যাতভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। Hills Like White Elephants গল্পটির কথা আবার স্মরণ করা যাক। গল্পটি পড়লে প্রথমে মনে হয় একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে স্টেশনে বসে সাধারণ কিছু কথা বলছে। তারা পাহাড় নিয়ে কথা বলে, পানীয় নিয়ে কথা বলে, আবহাওয়া নিয়ে কথা বলে। কিন্তু ধীরে ধীরে পাঠক অনুভব করে, কথোপকথনের নিচে আরেকটি অদৃশ্য আলোচনা চলছে। সেখানে ভয় আছে, দ্বিধা আছে, চাপ আছে, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি প্রায় কখনোই স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয় না। ফলে পাঠককে সংলাপের ফাঁক, বিরতি এবং পুনরাবৃত্তির মধ্যে অর্থ খুঁজতে হয়। এখানে গল্পের শক্তি উচ্চারিত বাক্যে নয়; বরং বাক্যগুলোর মধ্যবর্তী নীরবতায়।
নীরবতা ফিকশনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। আমরা সাধারণত ভাষাকে শব্দের সমষ্টি বলে মনে করি, কিন্তু সাহিত্য আমাদের শেখায় যে নীরবতাও ভাষা হতে পারে। কখনো কখনো একটি চরিত্রের চুপ করে থাকা তার দীর্ঘ বক্তৃতার চেয়েও বেশি অর্থ বহন করে। একটি প্রশ্নের উত্তরে নীরবতা, একটি সংলাপের মাঝখানে হঠাৎ থেমে যাওয়া, কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়া—এসবই গল্পের ভেতরে স্পেস তৈরি করে। পাঠক তখন ভাবতে শুরু করে, চরিত্রটি কেন চুপ করল? সে কী বলতে চেয়েছিল? কী কারণে সে কথাটি বলল না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার মধ্যেই পাঠের সক্রিয়তা জন্ম নেয়।
রুশ নাট্যকার আন্তন চেখভ-এর নাটকগুলো এই বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর চরিত্ররা প্রায়ই এমন সব কথা বলে, যা তাদের প্রকৃত সমস্যার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। তারা আবহাওয়া নিয়ে আলোচনা করছে, চা খাচ্ছে, বাড়ির কথা বলছে। কিন্তু পাঠক বা দর্শক জানে, তাদের জীবনের গভীরে অন্য এক সংকট কাজ করছে। কথোপকথনের ওপরের স্তর এবং নিচের স্তরের এই দূরত্বই নাটকীয় শক্তি তৈরি করে। চেখভের নাটক পড়তে বা দেখতে গেলে প্রায়ই মনে হয়, চরিত্ররা যেন নিজেদের জীবন সম্পর্কে সরাসরি কথা বলতে পারছে না। অথচ সেই অক্ষমতার মধ্যেই তাদের মানবিকতা ধরা পড়ে।
আধুনিক ও সমকালীন ফিকশনে সাবটেক্সটের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ আজকের পাঠককে অনেক বেশি সক্রিয় বলে ধরে নেওয়া হয়। লেখক আর সবকিছু ব্যাখ্যা করে দিতে চান না। তিনি পাঠককে বিশ্বাস করেন। তিনি জানেন, পাঠক সংলাপের ভেতরে লুকিয়ে থাকা উত্তেজনা, দ্বিধা, ক্ষোভ, প্রেম কিংবা অপরাধবোধ অনুভব করতে সক্ষম। ফলে সংলাপের ভাষা ক্রমশ সংক্ষিপ্ত হয়, কিন্তু তার গভীরতা বাড়তে থাকে। অনেক সময় একটি মাত্র বাক্য, এমনকি একটি মাত্র শব্দ, একটি দীর্ঘ অনুচ্ছেদের চেয়েও বেশি অর্থ বহন করে।
সাবটেক্সটের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি চরিত্রকে বাস্তব করে তোলে। বাস্তব মানুষ যেমন কখনো সম্পূর্ণ স্বচ্ছ নয়, তেমনি সাহিত্যিক চরিত্রও সম্পূর্ণ উন্মুক্ত নয়। তাদেরও গোপন অঞ্চল আছে, অপ্রকাশিত স্মৃতি আছে, অস্বীকার করা সত্য আছে। যখন লেখক সেই অঞ্চলগুলো পুরোপুরি উন্মুক্ত না করে কেবল ইঙ্গিত দেন, তখন চরিত্র জীবন্ত হয়ে ওঠে। পাঠক অনুভব করে যে সে একটি কৃত্রিম নির্মাণ নয়, বরং একজন বাস্তব মানুষের মুখোমুখি হয়েছে।
ফিকশনে স্পেসের এই রূপ আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। গল্প কেবল যা বলা হয়েছে তার সমষ্টি নয়; গল্প অনেক সময় গড়ে ওঠে যা বলা হয়নি তার ওপর। সংলাপের নিচে আরেকটি সংলাপ থাকে, কথার নিচে আরেকটি গল্প থাকে, উচ্চারণের নিচে আরেকটি নীরবতা কাজ করে। একজন দক্ষ লেখক সেই নীরবতার জন্য জায়গা তৈরি করেন। আর একজন মনোযোগী পাঠক সেই নীরবতার শব্দ শুনতে শেখে। সাহিত্যিক পরিপক্বতার একটি লক্ষণ সম্ভবত এখানেই—যখন আমরা কেবল চরিত্রের কথা শুনি না, তার নীরবতাকেও শুনতে শুরু করি।
পঞ্চম পর্ব :
উত্তর-আধুনিক ফিকশনে স্পেস—বোরহেস, বেকেট, ক্যালভিনো এবং পাঠকের ভূমিকা
চেখভ, কাফকা এবং হেমিংওয়ের হাতে স্পেস ফিকশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকৌশলে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু উত্তর-আধুনিক সাহিত্যে এসে স্পেস আর কেবল একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয় না; অনেক ক্ষেত্রে সেটিই হয়ে ওঠে সাহিত্যের প্রধান বিষয়। আগে লেখকেরা গল্পের ভেতরে কিছু জায়গা খালি রাখতেন, যাতে পাঠক সেখানে নিজের কল্পনা ও ব্যাখ্যা যুক্ত করতে পারে। উত্তর-আধুনিক লেখকেরা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন। তাঁরা প্রশ্ন তুললেন, গল্পের কেন্দ্র বলে আদৌ কিছু আছে কি? একটি নির্দিষ্ট অর্থ কি সত্যিই সম্ভব? লেখকের উদ্দেশ্য কি পাঠকের ব্যাখ্যার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ? এই প্রশ্নগুলোর ফলে ফিকশনে স্পেসের ধারণা এক নতুন মাত্রা লাভ করে। এখন আর শুধু কিছু তথ্য গোপন রাখা হয় না; কখনো কখনো পুরো গল্পই এমনভাবে নির্মিত হয় যে তার কেন্দ্রে একটি পরিকল্পিত শূন্যতা কাজ করতে থাকে।
এই পরিবর্তন বোঝার জন্য প্রথমেই হোর্হে লুইস বোরহেসের দিকে তাকাতে হয়। বোরহেসের গল্প পড়লে প্রায়ই মনে হয় আমরা একটি গোলকধাঁধার মধ্যে প্রবেশ করেছি। গল্প আছে, চরিত্র আছে, ঘটনা আছে—কিন্তু সবকিছু যেন এমন একটি কেন্দ্রকে ঘিরে ঘুরছে, যা ক্রমাগত সরে যাচ্ছে। তাঁর বিখ্যাত গল্প The Garden of Forking Paths কিংবা The Library of Babel পড়লে দেখা যায়, গল্পের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে গল্পের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ধারণা। পাঠক একটি নির্দিষ্ট উত্তর পায় না; বরং অসংখ্য সম্ভাবনার মুখোমুখি হয়। বোরহেসের সাহিত্য যেন বারবার বলে, অর্থ কোনো স্থির বস্তু নয়; অর্থ একটি চলমান অনুসন্ধান। ফলে তাঁর গল্পে স্পেস কেবল তথ্যের অভাব নয়; স্পেস হলো অর্থের বহুত্ব।
The Library of Babel গল্পটির কথাই ধরা যাক। সেখানে একটি অসীম গ্রন্থাগারের কল্পনা করা হয়েছে, যেখানে সব সম্ভাব্য বই বিদ্যমান। সেই গ্রন্থাগারে সত্যও আছে, মিথ্যাও আছে; ভবিষ্যতের ইতিহাসও আছে, অর্থহীন অক্ষরের সমাবেশও আছে। কিন্তু সমস্যা হলো, পাঠক জানে না কোন বইটি সত্য। ফলে পুরো গল্পটি একটি বিশাল অনিশ্চয়তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। এখানে অনুপস্থিত বিষয় কোনো চরিত্র বা ঘটনা নয়; অনুপস্থিত বিষয় হলো নিশ্চিত অর্থ। এই অনুপস্থিতিই গল্পের শক্তি।
স্যামুয়েল বেকেটের সাহিত্য স্পেসকে আরও চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। তাঁর নাটক Waiting for Godot বিশ শতকের সাহিত্যে অনুপস্থিতির সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণগুলোর একটি। পুরো নাটকজুড়ে দুটি চরিত্র অপেক্ষা করে একজনের জন্য—গোডো। কিন্তু গোডো কখনো আসে না। নাটক শেষ হয়ে যায়, অপেক্ষা শেষ হয় না। দর্শক জানে না গোডো কে, কেন তার জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে, সে আদৌ আসবে কি না। আশ্চর্যের বিষয়, নাটকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটি পুরো নাটকজুড়ে অনুপস্থিত। অথচ সেই অনুপস্থিত মানুষটিই সমস্ত ঘটনার কেন্দ্র। বেকেট এখানে স্পেসকে অস্তিত্বের রূপক হিসেবে ব্যবহার করেন। মানুষের জীবনও কি এক ধরনের অপেক্ষা নয়? আমরা কি এমন কিছুর জন্য অপেক্ষা করি না, যার পরিচয় আমরা নিজেরাও স্পষ্টভাবে জানি না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নাটক দেয় না। বরং প্রশ্নগুলোকেই বাঁচিয়ে রাখে।
বোরহেস ও বেকেটের হাতে স্পেস এমন একটি জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে অনুপস্থিতি উপস্থিতির চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কিন্তু ইতালো ক্যালভিনোর কাছে এসে স্পেস আরেক ধরনের খেলায় পরিণত হয়। ক্যালভিনো পাঠককে সরাসরি গল্পের ভেতরে টেনে আনেন। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস If on a Winter’s Night a Traveler শুরুই হয় পাঠককে সম্বোধন করে। তুমি একটি বই পড়তে বসেছ—এই বাক্য দিয়ে উপন্যাস শুরু হয়। পাঠক যতবার একটি গল্পে প্রবেশ করতে চায়, ততবার গল্পটি ভেঙে যায়, থেমে যায়, অন্য গল্পে চলে যায়। ফলে পাঠক কখনো পূর্ণ গল্প পায় না। তাকে বারবার অসম্পূর্ণতার মুখোমুখি হতে হয়। ক্যালভিনো যেন দেখাতে চান, পাঠ নিজেই একটি অনুসন্ধান, আর সেই অনুসন্ধানের প্রধান উপাদান হলো অপূর্ণতা।
এই পর্যায়ে এসে পাঠকের ভূমিকাও বদলে যায়। বাস্তববাদী সাহিত্যে পাঠকের কাজ ছিল লেখকের দেওয়া অর্থ গ্রহণ করা। আধুনিক সাহিত্যে পাঠকের কাজ হয়েছিল আংশিকভাবে অর্থ নির্মাণ করা। কিন্তু উত্তর-আধুনিক সাহিত্যে এসে পাঠক প্রায় সহ-লেখকে পরিণত হয়। কারণ গল্পের অর্থ আর আগে থেকে নির্ধারিত থাকে না। পাঠককে নিজের ব্যাখ্যা, অভিজ্ঞতা এবং কল্পনার সাহায্যে গল্প সম্পূর্ণ করতে হয়। ফলে দুটি পাঠ কখনো একরকম হয় না। একই গল্প বিভিন্ন পাঠকের কাছে ভিন্ন অর্থ তৈরি করতে পারে।
এই পরিবর্তনের পেছনে সাহিত্যতাত্ত্বিকদেরও ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে পাঠক-প্রতিক্রিয়া তত্ত্বের প্রবক্তারা দেখিয়েছিলেন যে একটি সাহিত্যকর্মের অর্থ কেবল লেখকের মধ্যে থাকে না; পাঠকের মধ্যেও তৈরি হয়। একটি গল্পের মধ্যে যত বেশি স্পেস থাকবে, পাঠকের অংশগ্রহণও তত বেশি হবে। ফলে স্পেস কেবল একটি নান্দনিক কৌশল নয়; এটি লেখক ও পাঠকের সম্পর্কেরও একটি নতুন সংজ্ঞা।
উত্তর-আধুনিক সাহিত্যের একটি বড় শিক্ষা হলো, সাহিত্য সবসময় উত্তর দেওয়ার জন্য তৈরি হয় না। অনেক সময় তার কাজ প্রশ্ন তৈরি করা। অনেক সময় তার কাজ অর্থকে স্থির করা নয়, বরং অস্থির করে তোলা। এই কারণেই বোরহেস, বেকেট বা ক্যালভিনোর মতো লেখকদের পড়তে গিয়ে অনেক পাঠক প্রথমে বিভ্রান্ত হন। তাঁরা মনে করেন গল্পে যেন কিছু নেই, কোনো কেন্দ্র নেই, কোনো সিদ্ধান্ত নেই। কিন্তু ধীরে ধীরে বোঝা যায়, সেই না-থাকাটাই আসল বিষয়। লেখক ইচ্ছাকৃতভাবে একটি খালি জায়গা তৈরি করেছেন, যাতে পাঠক সেখানে প্রবেশ করতে পারে।
ফিকশনে স্পেসের ইতিহাসের এই পর্যায়ে এসে আমরা বুঝতে পারি, স্পেস আর কেবল সংলাপের ফাঁক বা অসমাপ্ত সমাপ্তির নাম নয়। এটি হয়ে উঠেছে সাহিত্যের এক মৌলিক দার্শনিক ধারণা। অর্থের অনিশ্চয়তা, সত্যের বহুত্ব, অভিজ্ঞতার অসম্পূর্ণতা এবং পাঠকের সক্রিয় ভূমিকা—সবকিছু মিলেই স্পেসকে নতুন অর্থ দেয়। বোরহেস, বেকেট ও ক্যালভিনো আমাদের শিখিয়েছেন যে কখনো কখনো গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি সেই অংশ, যা লেখা হয়নি; আর কখনো কখনো গল্পের প্রকৃত কেন্দ্রটি সেই কেন্দ্র, যা আদৌ অস্তিত্বশীল কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়।
ষষ্ঠ পর্ব :
সমকালীন বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যে স্পেসের ব্যবহার এবং লেখকদের জন্য ব্যবহারিক কৌশল
এই ধারাবাহিকের আগের পাঁচটি পর্বে আমরা দেখেছি, ফিকশনে স্পেস কেবল একটি অলংকার নয়; এটি সাহিত্যের অন্যতম মৌলিক শিল্পকৌশল। চেখভের অসমাপ্ততা, কাফকার অদৃশ্য কেন্দ্র, হেমিংওয়ের আইসবার্গ তত্ত্ব, বোরহেসের গোলকধাঁধা, বেকেটের অপেক্ষা এবং ক্যালভিনোর অপূর্ণতার খেলা—সবকিছু মিলিয়ে স্পষ্ট হয় যে মহান সাহিত্য প্রায়ই তার শক্তি অর্জন করে না-বলা অংশ থেকে। এখন প্রশ্ন হলো, সমকালীন সাহিত্য এই কৌশলকে কীভাবে ব্যবহার করছে? এবং একজন লেখক নিজের লেখায় স্পেস তৈরি করতে চাইলে কীভাবে তা করতে পারেন?
সমকালীন বিশ্বসাহিত্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, স্পেস এখন আর কোনো নির্দিষ্ট সাহিত্যিক ধারার সম্পত্তি নয়। সাহিত্যিক বাস্তববাদ, মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস, মিনিমালিস্ট গল্প, এমনকি রাজনৈতিক উপন্যাসেও স্পেস একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। আয়ারল্যান্ডের লেখক ক্লেয়ার কিগান-এর গল্পগুলোর কথা ধরা যাক। তাঁর লেখার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো সংযম। তিনি চরিত্রের আবেগ নিয়ে দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেন না। বরং ছোট ছোট দৃশ্য, আচরণ এবং নীরবতার মাধ্যমে এমন একটি আবহ তৈরি করেন, যেখানে পাঠক নিজেই চরিত্রের অন্তর্জগৎ অনুভব করে। তাঁর Small Things Like These-এ আমরা দেখি, নায়ক বিল ফারলংয়ের ভেতরে যে নৈতিক অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে, তার খুব সামান্য অংশই সরাসরি উচ্চারিত হয়। অথচ পাঠক তার দ্বন্দ্ব অনুভব করতে পারে। কারণ লেখক আবেগকে ব্যাখ্যা না করে তার চারপাশে স্পেস তৈরি করেছেন।
একইভাবে জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামি-এর উপন্যাসগুলোতেও স্পেস একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাঁর গল্পে প্রায়ই এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। একটি মানুষ হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়, একটি কূপ বারবার ফিরে আসে, একটি বিড়াল রহস্যময়ভাবে হারিয়ে যায়, কিংবা স্বপ্ন ও বাস্তবতার সীমারেখা মুছে যায়। মুরাকামি এই রহস্যগুলোর সমাধান দিতে তেমন আগ্রহী নন। কারণ তাঁর কাছে উত্তর অপেক্ষা অভিজ্ঞতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পাঠক সেই রহস্যের ভেতরে বাস করতে শেখে। এই বাস করার জায়গাটিই স্পেস।
বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রেও স্পেসের ব্যবহার নতুন নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনেক গল্পেই আমরা এর উপস্থিতি দেখি। পোস্টমাস্টার গল্পের শেষাংশ মনে করা যেতে পারে। রতনের ভবিষ্যৎ কী হলো, সে কি পোস্টমাস্টারকে ভুলতে পারল, নাকি সারা জীবন অপেক্ষা করল—এসব প্রশ্নের উত্তর গল্প দেয় না। অথচ সেই অনুত্তরিত প্রশ্নই গল্পের আবেগকে দীর্ঘস্থায়ী করে। একইভাবে জীবনানন্দ দাশের গদ্য ও কবিতায়ও এমন বহু অঞ্চল আছে, যেখানে অর্থ স্পষ্টভাবে ধরা দেয় না; বরং ইঙ্গিত, আবহ এবং নীরবতার মধ্যে ছড়িয়ে থাকে।
--------------------------
অমিয়ভূষণ মজুমদারের প্রমীলার বিয়ে গল্পে স্পেস
"প্রমীলার বিয়ে" গল্পটিতে স্পেস আছে, এবং তা বেশ সূক্ষ্ম ও শিল্পিতভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এটি হেমিংওয়ের মতো মিনিমালিস্ট স্পেস নয়, আবার বোরহেস বা বেকেটের মতো দার্শনিক শূন্যতাও নয়। অমিয়ভূষণ এখানে স্পেস সৃষ্টি করেছেন মূলত অনুপস্থিত চরিত্র, অনুচ্চারিত আবেগ, পারিবারিক নীরবতা এবং পাঠকের জন্য নৈতিক বিচার খোলা রেখে দেওয়ার মাধ্যমে।
প্রথমেই বড়দার কথা ধরা যাক। গল্পের প্রায় পুরোটাজুড়ে বড়দা অনুপস্থিত। তাকে আমরা দেখি না, কিন্তু পুরো বাড়ির আবহ, উৎকণ্ঠা, অপেক্ষা, এমনকি প্রমীলার মানসিক অবস্থাও তাকে ঘিরে তৈরি হয়। সকালের স্টেশন-যাওয়া, শ্বশুরের অভিমান, শাশুড়ীর গুমোট, ছোট ভাইদের আলোচনা—সবকিছুই একজন অনুপস্থিত মানুষকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। গল্পে বড়দা আসার আগ পর্যন্ত তিনি আসলে একটি "অদৃশ্য কেন্দ্র"। স্পেস নিয়ে আমরা যে তৃতীয় পর্বে আলোচনা করেছি, এটি তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। পাঠক ক্রমাগত ভাবতে থাকে—লোকটি কে? কেন আসছে না? কেন সবাই এত ব্যথিত? লেখক তাড়াতাড়ি উত্তর দেন না। ফলে কৌতূহল ও অর্থ-নির্মাণের জন্য একটি ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়।
দ্বিতীয়ত, গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি দীর্ঘ সময় অনুচ্চারিত থাকে। প্রমীলা বুঝতে পারে বাড়িতে একটি গুমোট আছে, কিন্তু সে জানে না কেন। পাঠকও জানে না। বাড়ির লোকেরা সরাসরি কিছু বলে না। সবাই ইঙ্গিত করে, এড়িয়ে যায়, চুপ করে থাকে। এই নীরবতার মধ্যেই গল্পের প্রকৃত নাটক তৈরি হয়। পরে জানা যায়, বড়দা প্রমীলার বাবার ব্যবসায়ী পরিচয় মেনে নিতে পারেনি এবং সেই কারণেই বিয়েতে আসেনি। কিন্তু এই তথ্যটি গল্পের শুরুতেই বলে দিলে গল্পের আবেগ অনেকটাই নষ্ট হয়ে যেত। লেখক এটিকে আড়াল করে রেখেছেন। এই আড়াল করাটাই স্পেস।
তৃতীয়ত, প্রমীলার মনোজগতের মধ্যেও স্পেস আছে। অমিয়ভূষণ সবকিছু ব্যাখ্যা করেন না। প্রমীলা বারবার কিছু অনুভব করছে, কিন্তু সেই অনুভূতির সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ আমরা পাই না। বিশেষ করে বড়দার আদর্শবাদ সম্পর্কে জানতে পারার পরে তার মনে যে দ্বিধা তৈরি হয়, সেটি লক্ষণীয়। সে বড়দাকে পুরোপুরি ভুলও বলতে পারছে না, আবার মেনেও নিতে পারছে না। এক মুহূর্তের জন্য সে যেন সেই আদর্শের সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়, পরের মুহূর্তেই বাস্তবতার দিকে ফিরে আসে। লেখক এখানে কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য করেন না—বড়দা ঠিক না ভুল, সেটি পাঠকের ওপর ছেড়ে দেন। এও এক ধরনের স্পেস।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্পেসটি আছে গল্পের শেষ দৃশ্যে। বড়দা অবশেষে এসেছে। বাড়ির গুমোট কেটে গেছে। আনন্দ ফিরে এসেছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় সংকটের সমাধান হয়ে গেছে। কিন্তু ঠিক তখনই প্রমীলা শুনতে পায় মাখন তার দাদাকে বলছে—
“আমি ওকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি।”
এই বাক্যটি গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর একটি। কারণ পাঠক জানে, গল্পের শুরুতে বিয়েটি ছিল সম্পূর্ণ পারিবারিক বন্দোবস্তের ফল। প্রমীলা ও মাখনের মধ্যে কোনো প্রেম ছিল না। তাহলে মাখন কেন এই কথা বলছে? সে কি দাদাকে বোঝানোর জন্য মিথ্যা বলছে? নাকি বিয়ের পর কয়েক দিনের মধ্যেই সত্যিই এক ধরনের ভালোবাসা জন্মেছে? লেখক এর উত্তর দেন না। বরং প্রমীলার প্রতিক্রিয়া দেখান। সে কাঁদে। কিন্তু কেন কাঁদে? অপমানে? আনন্দে? অপরাধবোধে? স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়? নাকি এই সবকিছুর মিশ্রণে? লেখক নির্দিষ্ট করে বলেন না। এখানেই গল্পের সবচেয়ে বড় স্পেস।
আমার মনে হয়, এই গল্পের শেষ বাক্য—"সে রাত্রিতেও প্রমীলার ভালো ঘুম হয়নি"—অমিয়ভূষণের স্পেস ব্যবহারের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। ফুলশয্যার রাতে ঘুম হয়নি, দ্বিতীয় রাতেও হয়নি, আর শেষ রাতেও হয়নি। কিন্তু তিন রাতের অনিদ্রার কারণ এক নয়। লেখক সেই পার্থক্য ব্যাখ্যা করেন না। পাঠককে নিজেই অনুভব করতে হয়।
অর্থাৎ, "প্রমীলার বিয়ে" গল্পে স্পেস আছে—কিন্তু তা হেমিংওয়ের সংলাপের ফাঁকে নয়, বরং পারিবারিক আবহের ভেতরে, অনুপস্থিত বড়দাকে ঘিরে, প্রমীলার নীরব মানসিক পরিবর্তনের মধ্যে এবং শেষ দৃশ্যের আবেগগত অস্পষ্টতায়। অমিয়ভূষণ অনেক কিছু বলেছেন, কিন্তু কয়েকটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলেননি। আর সেই না-বলা অংশগুলিই গল্পটিকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। পাঠ শেষ হওয়ার পরও পাঠক ভাবতে থাকে—প্রমীলা আসলে কেন কেঁদেছিল? মাখন কি সত্যিই ভালোবেসেছিল? আর বড়দা কি সত্যিই বদলেছিল? এই প্রশ্নগুলোই গল্পের স্পেস।
---------------------------------
সমকালীন বাংলা ছোটগল্পে স্পেসের ব্যবহার আরও লক্ষণীয়। বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে লেখকেরা চরিত্রের অন্তর্জগতকে সরাসরি ব্যাখ্যা করার বদলে তার আচরণ, স্মৃতি এবং নীরবতার মাধ্যমে তুলে ধরতে শুরু করেছেন। কারণ সাহিত্য ক্রমশ উপলব্ধি করেছে যে মানুষের অভিজ্ঞতা সবসময় ভাষায় সম্পূর্ণ ধরা পড়ে না। কিছু অংশ অবশ্যম্ভাবীভাবে ভাষার বাইরে থেকে যায়। সেই বাইরের অঞ্চলটিকেই স্পেস ধারণ করে।
কিন্তু একজন লেখক যদি নিজের গল্পে স্পেস ব্যবহার করতে চান, তাহলে কী করবেন? প্রথমেই বুঝতে হবে, স্পেস মানে অস্পষ্টতা নয়। অনেক নতুন লেখক মনে করেন, যত কম বলা যাবে, গল্প তত গভীর হবে। ফলস্বরূপ তারা প্রয়োজনীয় তথ্যও বাদ দিয়ে দেন। এতে গল্প গভীর হয় না; বরং দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। হেমিংওয়ে যে তথ্য আড়াল করেন, তিনি তা আগে জানেন। লেখক যদি নিজেই না জানেন চরিত্রের ভেতরে কী চলছে, তাহলে তার নীরবতা অর্থহীন হয়ে যায়। তাই স্পেসের প্রথম শর্ত হলো—লেখককে নিজের গল্প সম্পর্কে পাঠকের চেয়ে বেশি জানতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ব্যাখ্যার পরিবর্তে দৃশ্য ব্যবহার করতে হবে। “সে খুব দুঃখ পেয়েছিল” লেখার বদলে দুঃখের একটি দৃশ্য দেখানো যায়। যেমন—“চিঠিটি ভাঁজ করে সে ড্রয়ারে রেখে দিল। তারপর অনেকক্ষণ আলো নিভিয়ে বসে রইল।” এখানে দুঃখ শব্দটি নেই, কিন্তু দুঃখ অনুভূত হচ্ছে। স্পেস সৃষ্টি করার এটি একটি মৌলিক কৌশল।
তৃতীয়ত, সংলাপের মধ্যে সাবটেক্সট তৈরি করতে হবে। চরিত্র যা ভাবছে, তা সবসময় বলবে না। বাস্তব মানুষ যেমন নিজের গভীরতম সত্য লুকিয়ে রাখে, চরিত্রও তেমন করবে। ফলে সংলাপের নিচে আরেকটি অদৃশ্য সংলাপ তৈরি হবে। পাঠক সেই স্তরটি আবিষ্কার করবে।
চতুর্থত, সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যাবে না। গল্পের শেষে কিছু দরজা খোলা রাখা যেতে পারে। তবে সেই খোলা দরজা যেন কৃত্রিম না হয়। পাঠকের মনে প্রশ্ন তৈরি করতে হবে, বিভ্রান্তি নয়। একটি ভালো স্পেস পাঠককে চিন্তা করতে বাধ্য করে; একটি খারাপ স্পেস তাকে বিরক্ত করে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, স্পেসের উদ্দেশ্য তথ্য গোপন করা নয়; পাঠকের জন্য অংশগ্রহণের জায়গা তৈরি করা। মহান সাহিত্য পাঠককে কেবল গল্প শোনায় না, তাকে গল্পের মধ্যে আমন্ত্রণ জানায়। সেই আমন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন কিছু খালি জায়গা, কিছু নীরবতা, কিছু অনুপস্থিতি। কারণ সাহিত্য শেষ পর্যন্ত কেবল ভাষার শিল্প নয়; এটি ভাষার সীমারও শিল্প। যা বলা হয়েছে, তার পাশাপাশি যা বলা হয়নি, যা উচ্চারিত হয়নি, যা কেবল ইঙ্গিতে রয়ে গেছে—সেখানেই অনেক সময় সাহিত্যের গভীরতম সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে।
ফিকশনে স্পেসের এই দীর্ঘ আলোচনার শেষে হয়তো বলা যায়, একজন লেখক যতটা শব্দ দিয়ে লেখেন, ততটাই লেখেন শব্দের অনুপস্থিতি দিয়ে। তাঁর বাক্যগুলো যেমন অর্থ তৈরি করে, তেমনি তাদের মধ্যবর্তী নীরবতাও অর্থ তৈরি করে। আর একজন পরিণত পাঠক ধীরে ধীরে শিখে যায়, কেবল গল্পের বাক্য পড়তে নয়, তার ফাঁকগুলোও পড়তে। কারণ সাহিত্যের অনেক বড় সত্য উচ্চারিত হয় না; তা কেবল ইঙ্গিত করা হয়। আর সেই ইঙ্গিতের শিল্পের নামই—স্পেস। ·


0 মন্তব্যসমূহ