হাসান আজিজুল হকের সাক্ষাৎকার


রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে হাসান আজিজুল হক
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: মুহিত হাসান
মুহিত হাসান: আপনার ব্যক্তিগত জীবনের রবীন্দ্রনাথের কথা দিয়েই শুরু করা যাক। সেই ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথকে প্রথম কীভাবে পেলেন?
হাসান আজিজুল হক : সম্প্রতি একজন আমার সাথে ঠিক এই বিষয়টা নিয়েই কথা বলেছে।  যেন আমি কিছু বলি তাকে এ নিয়ে। তা আমি আমার স্মৃতি থেকে বলবার চেষ্টা করলাম তাকে কথাটা। কত বয়েস হবে তখন? দশ বছরও হয়েছে কিনা সন্দেহ। তখন পাঠশালাতে পড়ি , দ্বিতীয় শ্রেণী অথবা তৃতীয় শ্রেণীতে। তখন আমাদের খুব বড়, যাকে বলা যায় যৌথ পরিবার ছিলো। আর জ্ঞাতিগোষ্ঠীও প্রচুর ছিলো, প্রায় গ্রামের, আমাদের ভুবনপাড়ার অর্ধেকটা জুড়েই আমাদের জ্ঞাতিগোষ্ঠী। তা আমাদের বাড়ির ঠিক পাশেই তিনজন জ্ঞাতির বাড়ি ছিলো। একজনার সাথে আমাদের সর্ম্পক ভালো ছিলো না । তাদের বাড়িটা মাটির দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। আলাদা। সে বাড়িতে আমরা বিশেষ যেতাম না। সে বাড়িরও কেউ  এদিকে খুব একটা আসত না। আর পাশেই ছিলো পরপর দুটো বাড়ি। একটা আমার বাবার চাচাতো বড় ভাইয়ের বাড়ি, আর একটা হচ্ছে বাবার অন্য এক চাচার মেয়ের। তিনি বিধবা। সে বাড়িতে তিনি তার বড় ছেলে ও দুটি মেয়ে নিয়ে থাকতেন। আমাদের বুবু। যাইহোক, ঠিক পাশের বাড়ি থেকে, একজন স্কুলপড়ুয়া, আমার ঐ চাচার ছেলে ছিলেন—চাচার এক ছেলে, এক মেয়ে—তো উনি বোধ ক্লাস নাইনে কী টেনে পড়তেন—আমার বড় ভাই।
ঐ যে স্কুলপড়ুয়া আমার যে বড় ভাই ছিলেন, চাচাতো ভাই—তাদের মনে হয় পাঠ্য ছিলো একটা বই—সে বইটা গল্পগুচ্ছ। কিন্তু আমার স্মৃতিতে এতটা স্পষ্ট নেই যে পুরো গল্পগুচ্ছের সব গল্পই—প্রথম খণ্ডে অন্তত—সব গল্প থাকার তো প্রশ্নই ওঠে না—তিন খণ্ডে তো পরবর্তীকালে গল্পগুচ্ছ বেরিয়েছে। প্রথম খণ্ডেরও সব কটি গল্প ছিলো কিনা তাতেও আমার সন্দেহ। আমার মনে হয়, প্রথম খণ্ড থেকে কিছু গল্প—সাত-আটটা গল্প হতে পারে আরকি— আলাদা করে নিয়ে র‍্যাপিড -রিডার ধরণের কিছু একটা করা হয়েছিলো। রবীন্দ্রনাথেরই গল্পগুচ্ছ—তার মধ্যে যে গল্পগুলো ছিলো স্পষ্ট মনে আছে আমার। এবং যতদূর মনে হয় প্রথম খণ্ডের দুটো তিনটে গল্প সেখানে ছিলো না। সে জন্যই বলছি, গল্পগুচ্ছেরও ভেতর থেকে বাছাই করা কিছু গল্প। দ্রুতপঠনের জন্যে এ বইটা তৈরি করা হয়েছিলো। এই বইটা, যত্রতত্র যেখানে সেখানে পড়ে থাকতো। আমার ঐ ভাইয়ের পড়াশোনায় তো তেমন মন ছিলো না। বইপত্র কোথায় কী থাকত সেটার খবর রাখতেন না। এই গল্পগুচ্ছের প্রথম মলাটটা নেই। মলাটটা উঠে চলে গেছে, শুধু গল্পগুচ্ছ লেখা আছে—এটুকু মনে আছে। আর যত্রতত্র পড়ে থাকতো এটাও মনে আছে। কখনো হয়তো ঢেঁকির কাছে আছে, ঢেঁকিটা আছে  উঠোনে। আঙিনার একপাশে ঢেঁকি, সেই ঢেঁকিটার ওপরে। কখনোবা ঢেঁকিটার পাশে। কখনো মাটির খুব চওড়া বিস্তৃত যে তাওয়া, সেই তাওয়ার কোনো একটা জায়গায়। কখনো ঘরের ভেতরে—এইরকম। আমি কিন্তু সেই বইটার প্রতি তেমন করে আকৃষ্ট হইনি। কিন্তু, আমার ঐ যে চাচা, তিনি আমার বাবার চেয়েও বয়সে একটু বড়—তাঁর চাচাতো ভাই আরকি— সেদিক হতে আমার চাচা। উনি খুবই শিক্ষিত মানুষ ছিলেন তাও নয়। কিন্তু বড় অদ্ভুত ছিলো তখনকার গাঁয়ের অনেক মানুষ। খুব সামান্য শিক্ষিত মানুষও খানিকটা ফার্সিও জানতো। তারপরে শুভঙ্করের যেসমস্ত কবিতায় অঙ্কগুলো ছিলো, হিসেবের, সেগুলো সব তাদের মুখস্ত থাকতো।  নানান রকমের ধাঁধাঁ জানতেন তারা। আর গল্প বলতে বলতে কত রকমেরই যে গল্প করতে পারতেন—তার কোনো অন্ত নেই। আরব্য উপন্যাসের গল্প হোক বা অন্য কিছুর গল্প হোক, জীবনের অভিজ্ঞতায় একবারে পাকা সার— তাদের তৈরি হয়ে গেছে। গাছের যেমন সার থাকে— সবটাই সেরকম, খুব সারি। এরকমটা কিছু মানুষকে দেখলে মনে হতো। অথচ সেই মানুষেরা বা আমার চাচা একেবারেই দেহাতী মানুষ, নিজের হাতে লাঙ্গল চালাতেন, নিজের হাতে গরুর জাবনা কাটতেন, খেতে দিতেন। খালি গায়েই থাকতেন। খালি পা তো বটেই। একটা ধুতি পড়তেন। একটু উঁচু করে, হাটুর ওপর কোমরে বেড় দিয়ে ধুতিটা পড়তেন। এটুকুই পোশাক। তিনি,মাঝেমাঝে এই বইটা নিয়ে জোরে জোরে গল্পগুলো পড়তেন। আর শ্রোতা ছিলাম আমি। উনি যে কখন পড়বেন তার কোনো ঠিক নেই। আমি হয়তো দেখছি তিনি বইটা নিয়ে দাওয়ায় বসেছেন। যখন বইটা খুলেছেন, তখনি আমি চলে এলাম। তখন উনি , এটা পরিস্কার মনে আছে, কাবুলিওয়ালার গল্পটাই বেশীরভাগ সময়ই তিনি পড়তেন। খুব পছন্দ করতেন। আর ঐ গল্প পড়ে নিজের মনে মনে হাসতেন, মজাটা উপভোগ করতেন। আর আমিও কিন্তু গল্পটা তখন অন্ততপক্ষে বুঝতে পারতাম যে ও আচ্ছা, এই গল্প। খুব ভালো করে না বুঝলেও বেশ বুঝতে পারতাম । এখন যদি আমায় কেউ বলে যে, আপনি সেই গল্পটা কতবার শুনেছিলেন? আমি তাহলে বলবো কতবার শুনেছিলাম তার হিসেব নেই। আর নিজে পড়তে পারার  পরে যে কতবার পড়েছিলাম — ঐ বইটা থেকে—তারও হিসেব নেই।
…যে কারণে প্রায় পুরো গল্পটা আমি গোড়া থেকে শেষ এখনো একরকম মুখস্তই বলতে পারি আরকি। এমন মনের মধ্যে দাগ কেটে গেছে। যখন আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করে যে রবীন্দ্র-রচনার সাথে প্রথম পরিচয়টা কখন-কীভাবে, তখন এই গল্পটাই বলি। এবং তখনই আরো কিছু কিছু গল্প, যা ওখানে ছিলো, তিনি পড়তেন— ‘রামকানাইয়ের র্নিবুদ্ধিতা’ পড়ে খুব হাসতেন, তারপরে ‘স্বর্ণমৃগ’, ‘সম্পত্তি-সর্মপন’, ‘দেনা-পাওনা’ এই গল্পগুলো ওখানে ছিলো। ‘মুক্তির উপায়’, ‘ছুটি’, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ এগুলোও ওখানে ছিলো। তো সেগুলো গল্পও আমি—তখনই আমার একেবারে খুব ঘনিষ্ঠভাবে সবগুলো  গল্পের সঙ্গে একটা পরিচয় হয়ে গিয়েছিলো ।  গল্পগুলো তো জানতামই। এবং রবীন্দ্রনাথের গল্প তো—খুবই মানবিক রসে ভরা—কাজেই খুব উপভোগ করেছি—বেশ মনে আছে। ‘ছুটি’ গল্পটা কিংবা  ‘রামকানাইয়ের র্নিবুদ্ধিতা’ অথবা ‘স্বর্ণমৃগ’, ‘সম্পত্তি-সর্মপন’— এই গল্পগুলো ঐ চাচাই আস্তে আস্তে পড়তেন, থেকে-থেকে, একটু-একটু করে পড়তেন।  এ হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের সাথে বোধহয় আমার প্রথম পরিচয়। আট-ন-দশ বছর বয়সে। সেই সময়ে  আর অন্য একটু পরিচয় হতে পারে, হয়তো আমার বইতেই হতে পারে—রবীন্দ্রনাথের ছবি। এখানে তুমি মনে করতে পারো যে সবত্রই তো রবীন্দ্রনাথের ছবি থাকে, কেউ না কেউ তো দেখেই ফেলবে—আমাদের সময়ে, ওখানে সর্বত্র তা দেখা যেত না—তা সত্ত্বেও একটা ছবি খুব দেখতাম। আমার বড় ভাইদের পাঠ্যবইতে, এমনকি নিজেরও,আমাদের পাঠ্যবইয়ে রবীন্দ্রনাথের একটা অস্পষ্ট ছবি ছিলো, নজরুলেরও ছবি ছিলো। এসব মনে পড়ে আরকি। কিন্তু সেটা তো আরেকটু বড় হয়ে। সেগুলো তো আলাদা কথা। তবে প্রথম পরিচয়ের কথা বলতে গেলে তোমাকে যে গল্পটা বললাম সেটাই বলতে হবে।
মুহিত হাসান: একটু সামনের দিকে আগাই। আরেকটু বড় হয়ে, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, তখন আবার রবীন্দ্রনাথকে কীরকম করে অনুভব করলেন?
হাসান আজিজুল হক: এগুলো কী তোমাকে হিসেব করে বলা যায়? ভবিষ্যাতে যখন তোমারও অনেকটা বয়স হয়ে যাবে— তারপরে কেউ যদি তোমাকে এ-কথাই জিজ্ঞেস করে তখন তুমিও দেখবে যে কিছু বলতে পারছো না, কোনো খেই পাবে না। এটা অনেকটা, বাণ্ডিলের সুতো আজকাল পাওয়া যায় না—আগে বাণ্ডিলের সুতো পাওয়া যেতো— বাণ্ডিলের সুতোর একটা বিশেষ পদ্ধতি হলো উল্টোপাকে খোলা—উল্টোপাকে ঘুরিয়ে তারপরে খোলা যেতো আরকি। কেউ যদি সে কাজ করার সময় গোলমাল করে ফেলতো, বাণ্ডিল যদি ছেটে ফেলতো—তাহলে আর ঠিক করতে পারা যেতো না। ঠিক কোনদিক থেকে কতটা সুতো মিলবে বোঝা যেতো না।  রবীন্দ্রনাথ সর্ম্পকেও ঠিক তা-ই হয়েছে। বুঝতে পেরেছো তো? বাণ্ডিলের সুতো, এত বড় একটা বাণ্ডিল হয়তো রয়েছে ঠিকই—কিন্তু কতদিক থেকে যে ছিঁড়ে-টিড়ে এটা-ওটা কতজন যে কী করেছে, তা বলা খুব মুশকিল। যদি কেউ এক-কথায় দু-কথায় বলতে যায় তাহলে তাকে একটা বানিয়ে কথা বলতে হবে— এ-ই হলো আমার কাছে রবীন্দ্রনাথ! এসব বানানো কথা আজকাল খুব চলছে। আমি ওরকম করে বানিয়ে কোনো কথা বলতে চাই না তো। কাজেই তিল তিল করে সঞ্চয় করা রবীন্দ্রনাথ, তিল তিল করে খরচ করাও রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের খরচও তো করেছি, শুধু চেয়ে নিয়েছি তা তো নয়, আর নিজেও তো খরচ করেছি!  তিলতিল করে তাকে সঞ্চয় করেছি, তিলতিল করে খরচও করেছি।
যতদূর মনে পরে, ‘রবিরশ্মি’ বলে একটি বই—এই পরবর্তীকালে যে রবিরশ্মি বেরিয়েছিলো ওটা নয়—ছোট্ট একটা ‘রবিরশ্মি’, রবীন্দ্রনাথের জীবনী ছিলো সেটা। সেইটা মনে খুব দাগ কেটে আছে।   এখন রবীন্দ্রনাথের যে সমস্ত অসাধারণ জীবনীগ্রন্থ বেরিয়েছে—প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় করেছেন, প্রশান্তকুমার পাল করেছেন—এগুলোর অন্য গুরুত্ব আছে। কিন্তু মনের মধ্যে খুব একটা প্রিয় জায়গা যদি দখল করে থাকে কোনো গ্রন্থ, তবে সেই বইটাই। কারণ সেখানে রবীন্দ্রনাথের ছোটবেলার কথা এমন সুন্দর করে দেওয়া আছে, রবীন্দ্রনাথের একেবারে ছোটবেলায় তাঁর কবিতা লেখার চেষ্টা, তাঁর ছড়া লেখার চেষ্টা, তাঁর নিজের একটা কাঠের সিংহ ছিলো—সেই সিংহটার সামনে তিনি বলিদান করবেন, কাঠের খাঁড়া হাতে নিয়ে বলবেন রবি বলি দেবে। সেজন্য উনি নিজে মন্ত্র তৈরি করেছিলেন। এইসব জিনিসগুলো এত সুন্দর করে মনের মধ্যে এখনো খুব স্পষ্ট ও পরিস্কার হয়ে আছে।
আর ঐ সময়েই বোধহয় তাঁর একটা দুটো কবিতা পড়ছি, খুব সহজ কবিতাগুলো হয়তো তখন পড়ছি— ‘অন্তর মম বিকশিত করো, অন্তরতর হে’ বা এই জাতীয় কোনো কবিতা। আর একটু বড় হওয়ার পরে, আমি পড়া শুরু করেছি আমার বড় ভাইদের স্কুলপাঠ্য বইগুলো। এইগুলো তোমরা এখন হয়তো কল্পনাও করতে পারবে না, এখনকার বইগুলো এত রস-কষহীন, এত যান্ত্রিক, এত বিবমিষা-জাগানো হয়েছে যে সেটা ভাবা যায় না। যত সুন্দর দেখতে বই ততই অনার্কষণীয়। আমাদের সময়ে এই বইয়ের প্রকাশনা ওত ভালো ছিলো না —আর আজকাল যেমন ছাপার উন্নতি হয়েছে তাতো ছিলোই না—কিন্তু একটা জিনিস ছিলো, পাঠ্যতা জিনিসটা অনেক বেশী ছিলো। তখনকার ঐ যে অক্ষর বসাতো—সিসের অক্ষর একটা একটা করে । যেটাকে বলে লেটারপ্রেস। একেকটা অক্ষর ধরে ধরে বসাতো। এগুলো কিন্তু  চোখের জন্যে আরামের, পড়তে খুব ভালো লাগত। তা এইসমস্ত বই তো তখন চারপাশে খুব বেশী থাকতো না। যা থাকতো, বহুবার সেসব বই আমি পড়তাম। আমার রবীন্দ্রনাথ পড়া সেইজন্য যতদূর মনে পড়ে,‘গুপ্তধন’ গল্পটা কতবার যে পড়েছি! আমার বড় ভাই ক্লাস টেনে পড়তেন, আমার ফুফাতো বড় ভাই—তখন বইগুলো কত যত্ন করে ছাপা হতো—এ-ই-র-ক-ম মোটা ছিলো বাংলা পাঠ্য বইটা। এবং কাপড়ের মলাট দেওয়া। এরকমই মোটা বই ছিলো রমেশচন্দ্র মজুমদারের ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’। বৃহাদায়তন এবং কোনো রকমের অশ্রদ্ধা নেই যে ছোটরা পড়বে বুঝবে কিনা—তা নয়।  আমরা তো বুঝেছি, তারা যদি কঠিন করেই লিখে থাকবে তাহলে আমরা বুঝলাম কী করে? আমি তো বেশ বুঝতে পেরেছিলাম। এখান থেকে আমি ‘মহাপ্রস্থানের পথে’র একটা অংশ পড়েছি—ক্লাস  সেভেনের পাঠ্যবইতে—প্রবোধ স্যানালের লেখা। রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতা এ বই থেকেই পড়েছি। আর, যখন পুরোপুরি ওদের টেক্সটা দেওয়া হলো—ক্লাস নাইন-টেনের জন্যে—তখন আমার হাত থেকে বই কেড়ে নিতো সেই বড় ভাই—দেখলেই— বলতো ‘রেখে দে’! কিন্তু আমি লুকিয়ে, আধো-অন্ধকারের মধ্যে বসে ঐ বই খুলে ‘গুপ্তধন গল্পটা পড়তাম—বিশেষ করে ‘গুপ্তধন’ গল্পটাই! কেন যেন মনে পড়ে—‘পায়ে ধরে সাধা/ রা নাহি দেয় রাধা/ শেষে দিলো রা/ পাগল ছাড়ো পা/তেঁতুল বটের কোলে/দক্ষিণে যাও চলে’ ইত্যাদি ইত্যাদি— এইসব গল্পগুলো কীভাবে কীভাবে মনে আছে এবং বলতে বললে আমি প্রায় মুখস্ত বলতে পারবো। এইতো বলছিও—কতবার যে পড়েছি! এইরকম করে আমার বড়দের অনেক পড়ার বিষয় বেশ অল্প বয়সেই কব্জায় এসে গিয়েছিলো—আমি তখন হয়তো ফাইভে পড়ছি কিংবা সিক্সে পড়ছি—তার বেশী হবে না—আমি তখনই ঐ বইগুলো পড়ে নিয়েছি আরকি।
মুহিত হাসান :  কত আগে ‘গোরা’ নিয়ে লিখেছিলেন।  সেই প্রবন্ধের ভাবনায় এখন কি কোনো পরিবর্তন আনতে চান? ঐ সিদ্ধান্তেই কী এখনো স্থির আছেন?
হাসান আজিজুল হক : মানুষ তো বদলায়।  ‘গোরা’ নিয়ে যা লিখেছি—একটা বড় প্রবন্ধ—‘রবীন্দ্রনাথের স্বদেশভাবনা : গোরা’। কথাসাহিত্যের কথকতা গ্রন্থে আছে। কোনো একটা উপলক্ষে লিখেছিলাম নিশ্চয়ই। লেখাটাকে হয়তো আমি এখন আরো বড় করবো। যাইহোক — না, আমি তেমনকিছু বদলাবো না —  বোধহয় আমার কথা আমি এখনও ঐভাবেই বলতে চাই। কারণ সেখানে আমার জায়গাটা তো পরিস্কার করা আছে। বারবার আমি যে কথাটা বলি—রবীন্দ্রনাথকে খরচ করারও আছে,রবীন্দ্রনাথকে পুঁজি হিসেবে গ্রহণ করে সেটাকে আবার নিয়োগ করে কিছু উদ্বৃত্ত বের করার যে কাজ সেটাও আছে—সবই করি। কাজেই আমি ওখান থেকে আপাতত, ঐ অবস্থান থেকে, রবীন্দ্রনাথ সর্ম্পকে যে কথাগুলো বলেছি—ঐ অবস্থানটি থেকে এখন সরে দাঁড়ানোর কোনো উপলক্ষ বা কারণ ঘটেনি।
মুহিত হাসান: ইদানীং বাংলাদেশের কিছু তথাকথিত তরুণ কথাসাহিত্যিকদের দেখা যায় যে তারা অকারণেই রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসকে খাটো করে দেখছেন। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পকে তারা অস্বীকার করতে পারেন না মোটেও, কিন্তু তারা তাঁর উপন্যাসের প্রতি একটুখানি অমনোযোগীই। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস পাঠ না করেই কখনো কখনো তারা এরকম কথা বলছেন। এ নিয়ে আপনি কী বলবেন?
হাসান আজিজুল হক: (হাসি) তাতে আমি কী করবো বলো? আমি তো বলি যে বাংলা সাহিত্যে ‘গোরা’কে অতিক্রম করে যেতে পারে বা গিয়েছে এমন কোনো উপন্যাস এখনও পর্যন্ত লেখা হয়নি। বঙ্কিমচন্দ্রের কোনো উপন্যাসও নয়।‘গোরা’র এই প্রসার, ‘গোরা’র এই বিস্তৃতি আর  ‘গোরা’র এই সার্চ— যে অনুসন্ধান—এটা আমাদের ধারণারও বাইরে। আমরা এখন খুব ছোট্ট জিনিস নিয়ে পড়ে আছি, খুব ক্ষুদ্র জায়গায় পড়ে আছি।
মুহিত হাসান : এই ক্ষুদ্রতাটা কেন? কেন আমাদের এই দৈন্যতা?
হাসান আজিজুল হক: হবে না  কেন? হবেই তো। ক্রমাগত যে ক্ষুদ্র হয়েছি। পলিটিকালি ক্ষুদ্র হয়েছি, কালচারালি ক্ষুদ্র হয়েছি, দুই বাংলা ভাগ করে ক্ষুদ্র হয়েছি—ক্রমেই তো ক্ষুদ্র হচ্ছি!  ফলেই রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যে এই কথাগুলো—তারা কেন বলেন , কীজন্য বলেন, কী সমাচার আমি কিচ্ছু জানি না— কারো থাকতেই পারে  যেকোন বক্তব্য বা ভাবনা। কিন্তু আমার কথা এই, ঐ গদ্য পদাতিক গদ্য নয়, অশরীরি গদ্যও নয়— সেটা গজবাহিনী গদ্য। বুঝতে পেরেছো তো? দীর্ঘ পা ফেলে চলা, যেমন গোরা পা ফেলেছে—লম্বা লম্বা পা। রবীন্দ্রনাথের গদ্যও ওখানে সেরকম। ব্যাপক, বিস্তৃত, অতিশয় সুন্দর গদ্য।  কাজেই আমার নিজের ধারণা তো আমি বারবার বলেইছি  যে রবীন্দ্রনাথ বলো আর যাই-ই বলো , উপন্যাস বা কোনো কিছুরই নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। কোনোদিনই ছিলো না, এখনও নেই, ভবিষ্যতে থাকবেও না। এবং কোনো লেখক সেরকম সংজ্ঞা মেনে চলবেনও না। আমি যেমন কোনো সংজ্ঞা মানি না। কাজেই উপন্যাস হিসেবে রবীন্দ্রনাথের কোনো লেখা ভালো নয় , একথা বললে উপন্যাস বিষয়ে আগে একটা ধারণা তৈরি করতে হয়—এরকম হলে উপন্যাস হয়, এরকম হলে উপন্যাস হয় না—এই জিনিসটার অস্তিত্তই আমি স্বীকার করি না। উপন্যাস সর্ম্পকিত কোনো সুর্নিদিষ্ট আকার বা ধারণা যে বাস্তবিকই নেই তা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর সাথে পরস্পরের তুলনা করলেই বুঝতে পারা যায়। আর এই চিন্তাটাও অজ্ঞতাপ্রসূত যে উপন্যাসের একটা নির্দিষ্ট আকার আছে, সে আকারের মধ্যে পড়লেই শুধু তাকে উপন্যাস বলা যায়।  কাজেই আমি তো মনে করি, ‘গোরা’ রবীন্দ্রনাথের একটা শ্রেষ্ঠ কাজ, অসাধারণ কাজ। আমি কারো ওপর আমার চিন্তা চাপিয়ে দিতে চাই না, তারা যদি এরকম কথা বলে তবে আমি খালি বলবো : না, মানলাম না—তুমি আমার সাথে কথা বলো, আমি বুঝিয়ে দেবো আমি কেন মানলাম না। আধুনিকতা থাকবে, নতুন কথা থাকবে, আমার বিরুদ্ধ মত থাকবে— এটাতো খুব স্বাভাবিক। তবে ওজনটা আমি করবো, ওজন করে কোনটা হাতে নেবো আর কোনটা নেবো না সেটা ঠিক করবো — এই পর্যন্তই।  এটা ওই, ওটা এই বলে ঘোষণা করা— এ হলো রায় দেওয়ার মনোভাব, রায়  দেওয়ার মনোভাব সুপ্রীম কোর্টে খাটে, সাহিত্যে তা চলবে না। আমি দেখেছি, দেবেশ রায়কে এক অনুষ্ঠানে কেউ বলছিলো ‘আমার কিন্তু গোরাটা ততটা ভালো লাগে না’—  দেবেশ রায় তখন খাচ্ছিলেন, খাওয়াটা মুখের কাছে নিয়ে, প্রশ্নকর্তার দিকে তাকিয়ে বললেন,অত্যন্ত বিকৃত কণ্ঠে ‘পড়ো না! খারাপ লাগে? তো পড়ো না! তোমাকে পড়তে বলেছে কে? তুমি পড়ো না!’  এই হলো দেবেশ রায়ের রিএ্যাকশন। আমিও তাই বলবো। ঘোষণা দেবার দরকার কী? যার ভালো লাগে না সে না পড়লেই পারে(উচ্চৈস্বরে হাসি)!
মুহিত হাসান : ইদানীং আমার রবীন্দ্রনাথ বলে একটা কথা খুব শোনা যাচ্ছে। এখন আপনার সেই ব্যক্তিগত রবীন্দ্রনাথের কথাতেই আসি। আপনি রবীন্দ্রনাথকে কেন চান এবং কীভাবে?
হাসান আজিজুল হক : ভালো বলেছো। ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামে তো আমিই একটা বই করবো। শুরুতে তোমাকে যে কথাটা বললাম, ওটাকে কী বলতে পারি ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’?
মুহিত হাসান : তাতো অবশ্যই বলতে পারেন ।
হাসান আজিজুল হক: যদি বলি আমার রবীন্দ্রনাথের কথা, যিনি আমার ব্যবহারের রবীন্দ্রনাথ নাকি ব্যক্তিগতভাবে একজন মানুষকে উপভোগ করা বা গ্রহণ বিষয়টা নিয়েই আমার রবীন্দ্রনাথ?
মুহিত হাসান : ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ-বর্জনের বিষয়টাই ধরি।
হাসান আজিজুল হক: কীভাবে তাকে নিয়েছি , এক দু কথায় কেমন করে এই প্রশ্নের জবাব দেবো? বলো? একটু আগেই তোমায় বললাম আমার ছোটবেলাকার ‘গল্পগুচ্ছ’টাকে ঐভাবে দেখার কথা, তারপরে ওর সাথে তখনি তো আমি জড়িয়ে গেলাম। এই জড়িয়ে যাওয়াটা কী কারো জ্ঞানের জন্যে?  এই জড়িয়ে যাওয়াটা কেন? কেন ঘটছে? তাহলে বোঝো, যদি মানুষের প্রতি আমার আগ্রহ থাকে সেক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের রচনার প্রতিও আমার আগ্রহ থাকবে। কেননা রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন যা কিছু করেছেন—এই মানুষের ওপরে যতই বলো শেষ অবধি আর কাউকেই ঐভাবে স্বীকার করেননি—সবচেয়ে বেশী মূল্য দিয়েছেন মানুষকেই।   তার কাছে দেবতা, ঈশ্বর— যেগুলোকে আমরা প্রায় বিমূর্ত ধারণা বলি—তার কাছে এইগুলো ছিলো না। রবীন্দ্রনাথের কবিতায়, নাটকে, ছোটগল্পে, উপন্যাসে মানুষের মিছিল হাজার লক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। তাতে মানুষের অকল্পনীয় বিস্তারিত কর্মপ্রবাহেরও সামনা-সামনি দেখা মেলে। বড়, আরো বড়, ছোট, অতি ছোট, সূক্ষ্ণ আবার ঋজু সবল —সবাই একসঙ্গেই চোখে পড়ে। মানবজীবনের উষ্ণতা, নিবিড়তা, নিবিষ্ট এক সান্নিধ্য-ঘনিষ্ঠতা পূর্ণতায় চরাচর পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। মানুষকে যদি কেউ চূড়ান্ত বলে গ্রহণ করেন, তারপরে আর কিছু নেই। তাতে কী বিশ্ব বাদ যায়? তাই সেই চিন্তাটাই তো বৈশ্বিক চিন্তা। কারণ পৃথিবীতে তো মানুষেরই বসবাস। মানুষকে পৃথিবী থেকে তুমি বাদ দিয়ে দাও,তাহলে পৃথিবী বলে আর কোনো বস্তর থাকবার দরকারও নেই—তুমি তাকে ছেড়ে দিয়ে অন্য গ্রহে চলে যাও।
আর তাঁর গান তো আমি প্রতিনিয়তই শুনি—সবসময় শুনবোই আরকি—এর প্রতি কোনোদিন বীতশ্রদ্ধ হবো বলে মনেও হয় না। তো গান যেরকম করে তৈরি হয়—চট করে শোনা যায়।  গল্পের বেলায় সেখানে অবসর লাগে, নিজেকে পরিশ্রম করে পড়তে হয়—কিন্তু তাঁর গল্পও তো আমি পড়বো—তাঁর উপন্যাসও আবার পড়বো—‘গোরা’ নিয়ে এত কথা হচ্ছে, কাজেই সেটাও আরেকবার পড়বো । তাঁর আঁকা ছবি দেখবো— মূল ছবি আমি এখনো দেখিনি, কিন্তু খুব অসাধারণ সব রিপ্রিন্ট হয়েছে তো—সেগুলো দেখছি, দেখবও। রবীন্দ্রনাথের লেখা নাটক মঞ্চস্থ হলে তা আমি দেখবো, উপভোগ করবো। রবীন্দ্রনাথের ভাবনার অংশ নেবো তাঁর প্রচুর পরিমাণে সমাজচিন্তামূলক,দেশচিন্তামূলক যেসব লেখাপত্র আছে সেখান থেকে। রাষ্ট্রচিন্তামূলক ও সমগ্র পৃথিবীর মানুষের জগৎ সর্ম্পকিত রচনাগুলোর সবই দেখবো আমি। কাজেই এদিক থেকে বলা যায় যে রবীন্দ্রনাথ আমার কাছে কীভাবে গ্রহণযোগ্য সেকথার জবাব তো ঐভাবেই দিতে হবে। কত লোকই তো গ্রহণযোগ্য—রবীন্দ্রনাথও গ্রহণযোগ্য। এবং রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আমি বলতে পারি, এতটা অপরিহার্য বিশেষ আর কাউকে মনে হয় না। মানে শিল্প-সাহিত্যের জগতে বা আমার জীবন-যাপনের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের মতো ওতটা অপরিহার্য আর তেমন কেউ নেই। অন্তত শিল্পী-সাহিত্যিকদের মধ্যে, লেখকদের মধ্যে, কবিদের মধ্যে নেই। হ্যাঁ হতে পারে, আমার ভাষার কবি বলে— আরেকজন হয়তো বললো , না গ্যাটেকে আমি আরো অনেক বেশি কাছে পেতে চাই, হোমারকে পেতে চাই। আমি বলবো : না, ঠিকই আছে—কিন্তু যে কারণে রবীন্দ্রনাথকে সব চাইতে বেশি অন্তরঙ্গভাবে পাওয়া যায় বলে আমি মনে করি, সেটা হলো এই — তিনি আমার ভাষার লেখক। এই সুবিধাটা আমি রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে পাচ্ছি।
মুহিত হাসান : একটা কথা খুব শোনা যায়, পূর্ববঙ্গে না এলে নাকি রবীন্দ্রনাথ এই রবীন্দ্রনাথই হতেন না। এই মতকে আপনি কতটা যথার্থ মনে করেন?
হাসান আজিজুল হক : এই কথাগুলো সব সাদা-কালোতে ভাগ করা। সাহিত্যের ক্ষেত্রে এ সমস্ত কথা অবান্তর। যারা এসব কথাগুলো বলে, তারা অবান্তর কথা বলে। আর যারা এসব নিয়ে ভাবে, তারাও অবান্তর কথা বলে। যা পাওয়া যায় সেটা বাদ দিয়ে, তর্ক-বিতর্ক করে সময়টা নষ্ট করে। হতেন কী হতেন-না —গনৎকারের মতো এইসমস্ত কথাবার্তা বলার কোনো অর্থ হয় নাকি! কলকাতা শহরও খুব বড় জিনিস তার কাছে। শান্তিনিকেতনও, সেখানকার সেই উদার মাঠ এবং খরার রাঢ়বঙ্গ তার মনের ভেতরে আছে। আবার এইদিকে হলো উতলানো ছলছল নদীবহুল যে বাংলাদেশ—মধ্যবঙ্গের কথাও এসেছে। শুধু পূর্ববঙ্গ নয় কিন্তু! পূর্ববঙ্গের কিছু অংশ , মধ্যবঙ্গের কিছু অংশ , দক্ষিণবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের কিছু অল্পসল্প জায়গা বা ওদিকে, অন্যদিকের কিছু অঞ্চল, আরকান-টারাকান হতে পারে আরকি—এসব মিলিয়েই তাঁর ছোটগল্পের ভূগোল তৈরি হয়েছে।
এসব জিনিস হলো খুব ভালো করে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার মতো বিষয়। এখন যা ঘটছে তা হলো, যদি তেমন কোনো প্রসঙ্গ আসে বা তেমন কোনো মীমাংসার দরকার হয়—তখন আমরা দেখতে বসি যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমগ্র-প্রতিভার কতভাগ কোন জায়গা থেকে নিয়েছেন। আমি বলবো এইসব ভাগের কোনো দরকার নেই। ‘ছিন্নপত্র’ আমরা এ সমস্ত ভাগাভাগি ছাড়াই পড়তে পারি।
মুহিত হাসান : এটাতো রবীন্দ্রচর্চার ক্ষেত্রে আমাদের একটা সংকীর্ণতারই পরিচয় দেয়।
হাসান আজিজুল হক : অবশ্যই। এই যে খালি সাদা-কালো করা। অমুক হলে তমুক হতো না, তমুক হলে অমুক হতো না—এইসব কথাগুলো কে সবজান্তার মতো বলে আমি জানি না। যারা এই কথাগুলো বলে, সবজান্তার মতো বলে। বুঝতে পেরেছো তো? কথাবার্তা সবজান্তার মতো করে বললে কোনো লাভ হয় না।
মুহিত হাসান : ইদানীংকার রবীন্দ্র-চর্চার ক্ষেত্রে কোনো নতুনত্ব কী আপনি দেখতে পান? বাংলাদেশে এখন যা হচ্ছে।
হাসান আজিজুল হক : একটা কথা কী জানো, রবীন্দ্রনাথ একদিক থেকে আমাদের কাছে সম্পূর্ণভাবে একটা ক্লোজড চ্যাপ্টার ছিলো। কফিনে ভরা একটা জিনিস, পেরেক মারা একটা জিনিস—তেইশ বছর ধরে ছিলো আরকি। কাজেই, যে ফুল, তার সৌরভ কোনোদিন বিকশিত হয়ে আমাদের সামনে দেখা দিতে পারেনি— সে যখন প্রথম দেখা দিতে শুরু করে—তখন তার উত্তেজনা তো হবেই। আমাদের রবীন্দ্র-চর্চার এককথায় মোট ভলিউম বা আয়তন যেটা— সেটা এখন খুব স্ফীত হয়ে গেছে। এটা যদি আমি পাঁচের দশকে কিংবা ছয়ের দশকের সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে বলাই যেতে পারে এটা কল্পনাও  করা যাবে না যে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমাদের আগ্রহ কতটা বেড়েছে। আর উপলক্ষও অনেক সময় আমাদের নতুন কর্ম-ধারার জন্ম দেয়—এবারের সার্ধশততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আমি তো মনে করি একদিক থেকে বাংলাদেশ আর ভারতবর্ষ কেন, গোটা পৃথিবীই তো মেতে উঠেছে। তা খানিকটা বলা যায় বৈকি। কিন্তু তুমি যদি বলো যে এবারের লেখাগুলোর দিকে তাকান, কোনটাকে কী নতুন কথা বলা হয়েছে সেটা বিশ্লেষণ করুন—তা তো ভিন্ন কথা। তাহলে আমার তো মনে হয়, যে সমস্ত কথাগুলো আমরা বলতে এবং শুনতে অভ্যস্থ, যে সমস্ত কথাগুলো মূলত শব্দবহুল, এককথায় যেগুলোকে বাগাড়রম্বরপ্রধান বলা যায়—অথবা যে সমস্ত কথা বলতে বলতে যার ধারই নষ্ট হয়ে গেছে। এরকম কথাই বেশি থাকছে—এটা ঠিকই। যাকে বলা যায় নতুন নতুন জায়গা থেকে রবীন্দ্রনাথকে দেখার চেষ্টাটা, প্রশ্ন করাটা কম—এখানে প্রশ্ন করা নিয়ে একটু বিশেষ করে বলি—রবীন্দ্রনাথের অতি-প্রশংসা করা যেমন একটা চল, তেমনি রবীন্দ্রনাথের দুটো এমনি জিনিস নিয়ে প্রশ্ন করা বা তাঁকে নিয়ে কিছু নিন্দাসূচক কথা বলা, এটাও কিন্তু কমন হয়ে গেছে—এটাও নতুন কিছু নয়। একসময়ে এটা নতুন ছিলো। তখন ভাবতাম—বাপরে, রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এইসমস্ত কথা কী বলা যায়!  এখন এইসমস্ত কথাগুলো বলতে বলতে রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে বলা কথা আমার মনের মধ্যে কোনো দাগ কাটে না। মনেও হয় না যে খুব নতুন কথা শুনছি। আসলে এইসব বিতর্ক করার কোনো মানে হয় না। রবীন্দ্রনাথ কী জবাব দিতে আসবেন? এসে জবাবদিহি করবেন? বললাম তো, এইসমস্ত জিনিসগুলো হচ্ছে অবান্তর। এগুলো আলোচনায় আনারই কোনো অর্থ নেই। কারণ পৃথিবীতে সব লোকই যে দরকারী কাজ করছে তা তো নয়—যারা অদরকারী কাজ করে বেড়াচ্ছে তুমি কী তাকে কিছু বলতে পারছো? পারছো না। তবে আর কী। যারা বলছে বলুক, বলতেই পারে। আমার গুরুত্ব দেওয়ার দরকার নেই। তাদের ফেলে দেওয়ার দরকারও নেই, গুরুত্ব দেওয়ারও দরকার নেই।
মুহিত হাসান : রবীন্দ্রনাথকে আমাদের কীভাবে পাঠ করা উচিত, আপনার দৃষ্টিতে?
হাসান আজিজুল হক : আমার মনে হয় যে রবীন্দ্রনাথকে পাঠ করা উচিত নেবার জন্যে। এখন যদি বলো কী নিতে পারি—তাহলে বলবো তাঁর কাছ থেকে উপলদ্ধির গভীরতা নিতে পারি। আবার  বোধের অতলস্পর্শী অনুভবটা কেমন সেটা বুঝবার চেষ্টা করতে পারি। গানগুলো খুব ভালো করে শুনতে পারি। আমি স¤প্রতি তাঁর গান নিয়েই লিখছি, কিন্তু গানের আমি কিছুই জানি না। আমি তাই গানের বাণী নিয়েই লিখি—রবীন্দ্রনাথের গানের বাণী আমি কীভাবে শুনি—আমি তো তাঁর গানের ঐ যে স্বর, অর্ধস্বর, স্পর্শস্বর এসব বিষয়ে (অর্থাৎ সংগীতের দিক থেকে) আমার সুনির্দিষ্ট কোনো পাণ্ডিত্য নেই। তবু আমি রবীন্দ্রনাথের গান শুনে তা সম্বন্ধে কথা বলতে পারি।  রবীন্দ্রসংগীত থেকে কী পাওয়া যায়, আমারই হিসেবে সেটা ভাবতে পারি। আর তুমি যদি প্রশ্ন করো যে ওতে ‘সব-ই পান?’ আমি বলবো : না, সবটা আর কী করে পাবো।  আমি কী আর নিগ্রোদের গানের সেই সংগ্রামী সুরটা কী রবীন্দ্রনাথের গানে পাবো? পাবো না। সেজন্য তো যাচ্ছি না তাঁর কাছে—যার কাছে যা পাওয়া যাবে না, তাঁর কাছে সেইজন্যে যাবো না। তাছাড়া ব্যাপার হচ্ছে, আমি নিচ্ছি কেন— যদি ভাবি সব রবীন্দ্রনাথ করে গিয়েছেন, তাহলে আমি লিখতে যাচ্ছি কীজন্য— এইটা হিসেব করলেই তো হয়। যদি মনে করি যা হবার তার সবই করে ফেলেছেন রবীন্দ্রনাথ—তাহলে আমার জায়গা কই? তাহলে আমার নিজের জায়গাটা বজায় রাখতে হবে— বজায় রেখেই তো রবীন্দ্রনাথকে নিতে হবে নাকি! তা যে জায়গাটা আমার বজায় আছে সে জায়গাটায় তো রবীন্দ্রনাথ নেই, সেখানে আমি আছি(হাসি)।
এখন এইভাবে যদি তুমি দেখো , তাহলে বুঝবে— প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হই। রবীন্দ্রনাথকেও আমি সেভাবেই গ্রহণ করেছি।
মুহিত হাসান : তাঁকে কী আমরা বিশ্ব-মানবতার একটা অসামান্য প্রতীক হিসেবে দেখতে পারি না?
হাসান আজিজুল হক : হ্যাঁ, তা তো বটেই । আমাদের গড়পড়তা যে হিসেবগুলো করার আছে— সে হিসেবগুলোর দিক থেকে তো বলাই যায়। মানব-সংস্কৃতির একটা সর্বোত্তম প্রকাশ ঘটেছে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে। আমি এক জায়গায় বলেছি— তিনি নিজে গঠনকারী ও নিজে গঠিত—দুটোই। আর এখন তুমি যদি বলো রবীন্দ্রনাথ সব দিয়েছেন, সে-কথাও ঠিক নয়—আবার তুমি যদি বলো রবীন্দ্রনাথ কিছুই দেননি,সে-কথাও ঠিক নয়। অথবা এ কথা যদি তুমি বলো যে রবীন্দ্রনাথ যা দিয়েছেন তা অন্যেও দিয়েছেন, তাও ঠিক নয়—বা রবীন্দ্রনাথ যা দিয়েছেন তা শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথই দিতে পারেন, আর কেউ পারেন না— তাও ঠিক নয়।  আমি এভাবেই তো রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে অগ্রসর হচ্ছি, তাঁকে দেখছি। প্রতিনিয়তই দেখছি। কথাবার্তা বলছি।  রবীন্দ্রনাথের যেসমস্ত জিনিস নিয়ে আমার মনে হচ্ছে কোনো প্রশ্ন তুলবো,  সেসব বিষয় নিয়ে প্রশ্নও তো তুলেছি — প্রশ্ন যে আমি তুলি না তা তো আর নয়।
মুহিত হাসান : রবীন্দ্রনাথের দর্শন নিয়ে আপনার ভাবনাটা কী?
হাসান আজিজুল হক : একসময় আমি রবীন্দ্রনাথের দর্শন নিয়ে একটু ভাবতাম। পশ্চিমের দর্শন যেভাবে তৈরি হয়েছে, রবীন্দ্রনাথের দর্শনকে সেভাবে বিচার করা যায় না। বরং, ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দর্শনটাকে পাশাপাশি রাখলে বিবেচনা করা যায়। ইউরোপে যারা সাধারণভাবে দর্শনের মানুষ, তারা হয়তো ভারতীয় দর্শনটাকে দর্শনের পর্যায়ভুক্তই করেন না। তারা একে একধরণের নিচু চোখে দেখেন ।  যদি আমরা পশ্চিমা দর্শনের ইতিহাসের নির্মাণের রাস্তাটা দেখি—তাহলে বোঝা যাবে যে ওটা অত্যন্ত কঠিন বৌদ্ধিক পথে অগ্রসর হয়েছিলো।  অত্যন্ত কঠিন বিশ্লেষণের পথে তা অগ্রসর হয়েছিলো। তন্নতন্ন করে খোঁজা, প্রশ্ন করা, জবাব পাওয়া এবং সব জিনিসকে বিশেষ করে ফেলে তারপরে দেখা। ভারতের ঐতিহ্যটা তা নয়, ওটা একধরণের সমগ্র আরকি। সেজন্যে সাধারণভাবে দেখা যায় পূর্বদেশীয়—প্রাচ্যের যে দর্শন— সেটা   পশ্চিমের চোখে, ওদের কাছে কোনো দর্শন নয়। এটাকে তারা মনে করে এক ধরণের কবিতাধর্মী জিনিস , এটা এক ধরণের Mysticism-এর  মতো জিনিস— ধরা-ছোঁয়ার মধ্যে নেই। এই-যে জিনিসটা—এটা রবীন্দ্রনাথকে খানিকটা প্রভাবিত করেছিলো। আমি নিজে কিন্তু এই পথে নই, আমি অন্য পথের—আমি সর্বদা মনে করি, যেটাকে বলে চিৎশক্তি, মানুষের এই চিৎশক্তিটাকে সর্বদা বাদ দিয়ে কোনটাকেই শেষ পর্যন্ত দেখা ঠিক নয়। চিৎশক্তি বা চিন্তাশক্তি— চিন্তাশক্তি আমাদেরকে বিশেষ দেখায়, অভ্যন্তর দেখায়, অখণ্ড দেখায়—আর  আমাদের যে মহৎ আবেগগুলো আছে, আমাদের অনুভূতি-উপলদ্ধিগুলো আছে, তাকে সমগ্র দেখায় —পার্ট দেখায় না, অংশ দেখায় না।
সেইভাবেই রবীন্দ্রনাথের দর্শনকে আমি একসময়ে দেখার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু পরে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত জীবনের দিকে তাকিয়ে দেখেছি যে সেখানে কোনো অস্পষ্টতা নেই তাঁর—কোত্থাও নেই।  অর্থাৎ ভারতীয় দর্শনের যে অস্পষ্টতার কথাটা পশ্চিমে অভিযোগ হিসেবে শোনা যায়, সে অস্পষ্টতার ব্যাপারটা রবীন্দ্রনাথের ভেতর কখনো আর আমি খুঁজে পাই না। রবীন্দ্রনাথের চিন্তার মধ্যেও আর অস্পষ্টতা দেখি না , জীবন-যাপনের  ভেতরেও আর অস্পষ্টতা দেখি না। সবকিছুতে খুব স্পষ্টভাবেই  চিন্তা করার ব্যাপারটা দেখি।
মুহিত হাসান  : রবীন্দ্রনাথের যে ব্যবহার ও উপযোগিতা, আমাদের ভেতরে— সে সর্ম্পকে?
হাসান আজিজুল হক :  সে কথা তো আমি গত দশ বছর ধরে সর্বত্রই বলে বেড়াচ্ছি। প্রত্যেকে নিজেই নিজের রাস্তা খুঁজে নিক—রবীন্দ্রনাথের কাছে যাবার জন্য। এবং রবীন্দ্রনাথের উপযোগিতা আছে কী নেই,  সেটা সবাই নিজেই বিচার করুক।
আমি তো মনে তাঁর উপযোগিতা আছে, শুধু আছে নয়—খু-উ-ব আছে।
মুহিত হাসান : সামগ্রিকভাবে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পকে কীভাবে দেখেন? আপনার ছোটগল্প লিখবার পেছনে কী রবীন্দ্রনাথ কোনোভাবে প্রভাব ফেলেছেন?
হাসান আজিজুল হক : শোনো, এগুলো এত ব্রড কোয়েশ্চেন! ব্রড কোয়েশ্চেনে মুশকিল আছে। তাহলে অনেক অসুবিধা হয়ে যাবে।  বলতে পারে যে রবীন্দ্রনাথের গল্প যদি এতই ভালোবাসেন তবে রবীন্দ্রনাথের বিপরীতে যেসব গল্প লেখা সেসব কী ভালোবাসেন না? আপনি কী মঁপাসার গল্প ভালোবাসেন না? ও হেনরীর গল্প ভালোবাসেন না? তখন তো মুশকিলে পড়ে যাবো আমি! কাজেই, বহু-মত বহু-পথ। রবীন্দ্রনাথেরও একটা পথ। অসাধারণ। রবীন্দ্রনাথের লেখা, এই পথের জায়গা থেকে—আমি সেখানে তাঁর কোনো তুলনা পাই না। মানুষের অন্তরে যেসমস্ত সুবুদ্ধি আছে, মানবতার বোধ যেগুলো আছে, মানুষের মধ্যে ঐক্যের যে ধারণাটা আছে—এগুলো এত চমৎকারভাবে প্রকাশ করার ব্যাপারটা রবীন্দ্রনাথে যেভাবে ঘটেছে, তাঁর ছোটগল্পের মধ্যে —সেটার তুলনা মেলা ভার। আবার, যারা এসব করতে যাননি—তাদের মধ্যেও অনেকে অসাধারণ গল্প লিখেছেন। সে-গল্প আমার সমান প্রিয়। আর আমার ব্যক্তিগত বিষয়, আমার তো মনে হয় না যে কোনো কিছুতে রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারটা আমি সচেতনভাবে গ্রহণ করেছি। তবে দেখতে পারে—আমার লেখা যারা পড়ে— সেই পাঠকেরা।  এটা তাদের জন্য থাকবে—তারা বিচার করবে। আমার বলার তেমন কিছু নেই।
মুহিত হাসান : রবীন্দ্রনাথের কবিতার ক্ষেত্রে যাই। আপনার ব্যক্তিগত মত এ বিষয়ে ?
হাসান আজিজুল হক : আমার মত হচ্ছে, রবীন্দ্র-কবিতা চিরকালের—তাঁর বহু কবিতা চিরকালের কবিতা। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোর সাথে তুলনীয়! এই-তো!
মুহিত হাসান : শেষ প্রশ্ন, দিনের শেষের যে রবীন্দ্রনাথ—তিনি আপনার কাছে কেমন?
হাসান আজিজুল হক : দিনের শেষের রবীন্দ্রনাথকে আমার কাছে সব-চাইতে পরিণত, সব চেয়ে পরিণত মানুষ, অভিজ্ঞতার দ্বারা জর্জরিত, অভিজ্ঞতার দ্বারা ঋদ্ধ, বাস্তবকে সব চাইতে পরিস্কারভাবে দেখতে পাওয়া মানুষ—এ-ই মনে হয়।  রবীন্দ্রনাথ সব চাইতে ঋদ্ধ হয়েছেন—আমার মতে—যত তাঁর বয়োবৃদ্ধি ঘটেছে। তাঁর সৃষ্টিক্ষমতারও বৃদ্ধি ঘটেছে বয়স বাড়বার সাথে সাথে। এবং এত অটুট সৃষ্টিক্ষমতা নিয়ে তিনি আশি বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। এটা আমার কাছে একেবারেই একটা প্রাকৃতিক ঘটনার মতো।  কোনো মানুষের পৃথিবীতে এটা সম্ভব বলে আমার মনে হয়নি। শেষ মূহুর্ত পর্যন্তও সৃষ্টির এই অসাধারণ ক্ষমতা! সেজন্য শেষ রবীন্দ্রনাথকেই আমার কাছে সবচেয়ে পরিণত, সব চাইতে গ্রহণযোগ্য, সব চাইতে ভাবনা-উদ্রেককারী । কখনো কখনো বলা যেতে পারে এক ধরণের ডিস্ট্রার্বিং অভিজ্ঞতা হয় রবীন্দ্রনাথ পড়লে। ব্যক্তিগতভাবে আমার ‘শেষ কথা’র অনেক কবিতার কথা প্রতিনিয়তই মনে পড়ে। একটা দুপুরের কথা মনে পড়ে। ভিক্তোরিয়া ওকাম্পো তাকে যে বিশাল চৌকিটা, ইজিচেয়ারটা রবীন্দ্রনাথকে দিয়েছিলেন— সেটা তাঁর উদয়নের যে ঘরটায় তিনি থাকতেন, ওখানে পাতা ছিলো। তার পেছনের দেয়ালে সাঁটা ছিলো রবীন্দ্রনাথের হাতের লেখা।     ‘শেষ লেখা’য় যা আছে, ‘রৌদ্রতাপ ঝাঁ-ঝাঁ করে/ জনহীন বেলা দুপহরে।/শূন্য চৌকির পানে চাহি,/সেথায় সান্ত্বনালেশ নাহি।’ এই যে  ‘রৌদ্রতাপ ঝাঁ-ঝাঁ করে’ এটা—আমি মনে করি—রাঢ়ের দুপুরবেলায় না গেলে তুমি বুঝতে পারবে না কথাটা। আর তাঁর তখনকার গদ্যে আছে সমসাময়িক বিশ্বটাকে দেখা, মানুষের ভবিষ্যত নিয়ে অসম্ভব উৎকণ্ঠা-উদ্বেগ এবং হতাশা—সব আছে। তারপরেও পদ্যে তিনি আমাদের মধ্যে উদ্দীপনারই সৃষ্টি করতে চেয়েছেন। অনেক কবিতা তখন লিখেছিলেন, কাঁপা-কাঁপা হাতে। ‘ঐ মহামানব আসে’! হাতের লেখাটা দেখো, তখন তাঁর হাতের লেখা কাঁপে—ভালো করে লিখতে পারেন না। মহামানব মানে কী? এখানে মানুষই বোঝাচ্ছেন, কোনো ঈশ্বর, অলৌকিক সত্ত্বা বা পয়গম্বর— মোটেই সেসবের কথা মনে করেননি। মানুষের মধ্যে যদি গড় করো , যদি তোমাকে আমি জিজ্ঞেস করি What is the idea of a man?  তখন তুমি কী জবাব দেবে? তুমি বলতে পারবে? বলতে পারবে না। তাহলে বলবার এইভাবে চেষ্টা করা যায়, সব মানুষ তো স্বতন্ত্র—কিন্তু এই সব স্বতন্ত্র মানুষ একটা জায়গায় তো মানুষ—কী সেটা? সেইটাকেই আমি মানুষ বলি, মানুষের ধারণা বলি। গায়ের রঙ আলাদা, ভাষা আলাদা, আচরণ আলাদা—প্রত্যেকটা মানুষ স্বতন্ত্র।  এত স্বাতন্ত্র্য সত্ত্বেও বলার সময় বলি মানুষ, কেন বলি? এত পার্থক্য রয়েছে তো মানুষ বলে চিহ্নিত করি কেন? তাহলে নিশ্চয়ই মানুষ বলে একটা জিনিস আছে—যা এই এত আলাদার ভেতরেও এক—সেইটাকেই যদি মানব বলি আমি—রবীন্দ্রনাথের চোখে তিনিই মহামানব। এইটা দেখলে, মানবিক জগতের বাইরে রবীন্দ্রনাথের আর কিচ্ছু নেই— এই কথাটা কিন্তু মাথায় ঢুকিয়ে নিতে হবে। দেবতা, ঈশ্বর যতই বলুন উনি—শেষমেশ সেই মানুষই তাঁর কাছে সব হয়ে দেখা দেয়।
  রবীন্দ্রনাথ সারা জীবনে এত শূন্যতা বা পূর্ণতার কথা বলেছেন—তিনি পরিশেষেও সেই— শূন্য ও পূর্ণ। অনিঃশেষ।




হাসান আজিজুল হকের সাথে কথোপকথন

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর
[সাক্ষাৎকারটি ২০০৩ সালে চট্টগ্রামের পূর্বকোণে ছাপা হয়। প্রাসঙ্গিকতা  ও সাহিত্যমূল্য চিন্তা করে সাহিত্য ক্যাফেতে আবার প্রকাশ করা হল। – সম্পাদক]
জাহাঙ্গীর : আবুল ফজলের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে সুদূর রাজশাহী থেকে আপনি চট্টগ্রামে এলেন; তো, এই উপলক্ষ্যে আপনার বিশেষ কোনো অনুভূতি হচ্ছে কি?
হাসান: আমি যখনই বাড়ি থেকে কোনো বিশেষ উপলক্ষ্যে বেরোই, তখনই আমার খুবই ভালো লাগে। এই যে আমি চট্টগ্রাম এসেছি, এই চট্টগ্রামে আসাটা আমি খুব উপভোগ করি। সেটা অনেক কারণে, যেমন চট্টগ্রামের মানুষজনের কথা বলতে হয়, তাদের কারো কারো সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা, বন্ধুত্ব, আত্মীয়তার সম্পর্কই আছে বলতে পারো। তারপর যেভাবে এই চট্টগ্রাম নগরী বেশ পরিকল্পিতভাবে বিস্তৃত হচ্ছে এবং যেভাবে শহরটা চলছে— এও খুব ভালো লাগে। চোখের জন্য আলাদা রিলিফও তো দরকার। কেননা সমতল ভূমি দেখতে দেখতে মাথাটা কী-রকম ভোঁতা-একঘেয়ে হয়ে যায়। সেখানে যে একটুখানি উঁচু-নিচু ঢেউ খেলানো জমি, একটু ঢিলা-পাহাড় দেখি; তাও কিন্তু খুব ভালো লাগে। সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম আমার কাছে খুব পুরনো স্মৃতি জাগানিয়া শহর বলেই মনে হয়। আর এবার যে আবুল ফজলের জন্মশতবার্ষিকীতে এলাম, এ বিষয়টাও ভালো লাগছে।
জাহাঙ্গীর: আমরা এখন আবুল ফজল বিষয়ে কিছু মত বিনিময় করি; তো, দুইদিনের এই প্রোগ্রামে বিভিন্ন বক্তার আলোচনায় স্বাভাবিকভাবেই তার সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা এসেছে। যেমন, তিনি মুক্তবুদ্ধির একজন প্রবক্তা, বুদ্ধিমত্তার চর্চা তিনি অনেকটাই শুরু করেছিলেন; কথা হচ্ছে তাঁর জীবনের কোন্ দিকটা আপনার কাছে খুব বেশি পজেটিভ বলে মনে হয়।
হাসান: শোন, বুদ্ধির চর্চা বা মুক্তবুদ্ধির চর্চা, এইসমস্ত জিনিসগুলো অতিশয় পুরনোকাল থেকেই চলছে। এগুলি মানুষের সুস্থ-স্বাভাবিক বৃত্তির মধ্যেই পড়ে যে বুদ্ধি নামক সুকুমার বৃত্তিটাকে কাজে লাগানো দরকার। আবার এটাও অনেকটা স্বাভাবিক যে, মানুষই আবার বুদ্ধি হারিয়েও ফেলে। কাজেই এই সমস্ত বিষয় চর্চা হচ্ছে। সমগ্র ইউরোপীয় দর্শনে-সাহিত্যে এই বুদ্ধির চর্চা, মননশীলতার চর্চা হচ্ছে। আমাদের দেশেও দর্শনে-সাহিত্যে বুদ্ধির চর্চা হচ্ছে তো? নাকি? (প্রশ্নকারীর হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ার পর আবার বলতে থাকেন তিনি) সেইদিক থেকে আমরা দেখার চেষ্টা করি যে, আমাদের এখানে একজন অসাধারণ লেখক এসেছিলেন, যিনি বুদ্ধির দিকটাতে অনেক বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। বিশেষ করে, যে সমাজে তিনি কাজ করেছেন সেই সমাজের বাস্তবতাটা বুঝতে হবে; ধরো, আমাদের সমাজে অনেকগুলো ব্যাধি আছে, অনেকগুলো রোগের উপসর্গ আছে, সাম্প্রদায়িকতা এ-রকম একটা ব্যাধি এবং এটি একটি রোগ। একজনকে একটা বদ্ধ কোটরে আটকে ফেলে রাখা কিছুই নয়। এর বড়ো দোষ এটি মানুষের মুক্ত চেতনাকে একটা কোটরে আটকে ফেলা, সবটা না-দেখতে দেয়া। সমাজটাকে পরিপূর্ণভাবে ঝাপসা করতে থাকে। মানুষের কাছ থেকে যা পাওয়া যায় তা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা— এদিক থেকে সামপ্রদায়িকতা খুব বড়ো ব্যাপার। তো কথা হচেছ, সাম্প্রদায়িকতা থেকেই তো এমন জিনিস জন্ম নেয়, যেখানে মানুষ মানুষকে হত্যা করছে, মানুষ মানুষের যথাযথ স্বার্থ নষ্ট করছে। এতে খুব সাধারণ বুদ্ধি প্রয়োগ করলেই বোঝা যায়, মানুষ সমাজবদ্ধভাবে বাস করে এবং সেখানে এই সাম্প্রদায়িকতা অত্যন্ত ধ্বংসকারী একটা জিনিস হতে থাকে।
আমি আবুল ফজল সাহেবকে দেখি ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে। সেই বিশেষ ইতিহাস কিন্তু আমাদের এই উপমহাদেশেরই ইতিহাস। তিনি এমন একটা সময়ে একজন লেখক হিসেবে দেখা দিয়েছিলেন, যখন তার কাজ খুব বাস্তবভাবেই আমাদের পূর্ববঙ্গের মানুষের পক্ষে এসেছিল। তার কর্ম, চিন্তা ও ভাবনা— আমরা যেসব ক্ষুদ্রতা এবং সংকীর্ণতা অবলম্বন করে রাষ্ট্র-ফাষ্ট্র তৈরি করেছিলাম, সে-গুলোর প্রকৃত চেহারাটা উদঘাটন করে দেয় এবং প্রকৃতপক্ষে অতি সাধারণ মানুষের পক্ষে সমাজ গঠনের যে দাবি, তা খুব চমৎকারভাবে তিনি ধরলেন।
জাহাঙ্গীর: এখন আমরা তাঁর কথাসাহিত্য নিয়ে একটু কথা বলি— সেই সময়ে শুধু তিনি নন, আরও কেউ কেউ লিখছেন, যেমন সরদার জয়েনউদ্দীন, আবু রুশদ; তো কথা হচ্ছে তাদের উপন্যাসের ভাষাশৈলী, শিল্পসম্মত বিস্তার, দ্বন্দমুখর জীবনবিন্যাস তুলনামূলকভাবে কথাসাহিত্যের মেইনস্ট্রিম বলে পরিচিত বঙ্কিম-রবি ঠাকুর-শরৎচন্দ্রের সাথে যদি তুলনা করা হয়, তাহলে ওদের সাহিত্যকর্ম অনেকটা মলিন বলে মন্তব্য করতে চান কেউ কেউ। কারও মনে হতে পারে একধরনের সরল কাহিনী বর্ণনা করেছেন তাঁরা। এ-ব্যাপারে আপনার মন্তব্য জানতে চাচ্ছি?
হাসান: আমি তো চুপ করে থাকি না কখনও, সব সময় তো কথা বলি, তোমাকে আমি বলছি, তুমি একটু আমার লেখা ‘কথাসাহিত্যের কথকতা’র প্রথম প্রবন্ধ ‘দুই যুগের দেশ মানুষের কথা’টা পড়ে নিয়ো। এখন তুমি যে প্রসঙ্গটা তুললে, আমিও অবিকল সেই প্রসঙ্গটাই তুলেছি সেখানে। একটা অদ্ভুত ঘটনা বলি, সম্ভবত সেটা ১৯৭৪ হবে, বাংলা একাডেমীর জন্য ঐ প্রবন্ধটাই লিখেছিলাম। স্টেজে উঠে আমি এটা পড়ব; তখনই স্টেজে দাঁড়িয়ে দেখছি যে, সফেদ পাঞ্জাবি এবং পাজামা পরে সামনে বসে আছেন, ধবধবে শাদা দাঁড়ির মানুষটি বসে আছেন— তিনিই কিন্তু আবুল ফজল। আমি পড়তে গিয়ে দেখলাম, আমি তো খুব খারাপ খারাপ কথা লিখেছি, আমার তো সমালোচনার শিং গজিয়েছে, সেই শিং দিয়ে আমি প্রায় গুঁতোতে চাই, আমি তখন কিন্তু ভাবছি আমি তাহলে কী করব? কিন্তু আমি তোমাদের কাছে স্বীকার করছি, আমি যা লিখেছিলাম একদম তাই পড়েছিলাম। আবুল ফজলের ‘রাঙা প্রভাত’ সম্পর্কেও বলেছিলাম। এবং আজকে যদি খুব ভালোভাবে বলা হয়, তাহলে আমরা যে বিভাজনটা করে থাকি এবং কথাসাহিত্যের কাছে যে প্রত্যাশা করে থাকি, অর্থাৎ কথাসাহিত্য যেভাবে সমাজকে, মানুষকে সামনে এগিয়ে নিয়ে আসে; প্রবন্ধ বা কথিত মননশীল সাহিত্য তো সেভাবে আনে না জিনিসটা। ঐদিক থেকে এই জিনিসটার একটা তফাত আছে আর-কী। তিনি তাঁর কথাসাহিত্যে যে বক্তব্য দিতে চেয়েছিলেন তা কিন্তু এসে পড়েছিল। এও মনে হয় যে তার মানুষগুলো তার ভিতরের কথাগুলো বলবার জন্যেই তৈরি হয়েছে। প্রকৃত যে সমস্যা, তা ভালো কথার দ্বারা সমাধা হয় না। শুধু শুভেচ্ছা হিসেবে মূল্যবান কতটুকু তাও ভাবতে হবে। সেখানে হিন্দু ছেলে মুসলমান মেয়ে বা মুসলমান ছেলে হিন্দু মেয়ের বিয়ের ব্যাপার ছিল, প্রেমের ব্যাপার ছিল, উনি কিন্তু সেই সামাজিক অবস্থায়ও খুব সাহস নিয়ে ঘটিয়ে দিলেন, সেটা খুব ভালো লাগল। এবং এটা ঘটে যাওয়ার পরে যে সমস্ত বক্তৃতাগুলো চরিত্রসমূহ বলছে, ওইগুলো প্রায় স্বস্তিবচনের মতোন। স্বস্তিবচন করে না?— এইরকম হবে, ওইরকম হবে, খুব বড়ো বড়ো কথা বলি আর-কী। কিন্তু আমরা যে সমস্ত কথা আওড়াই, তা বাস্তব থেকে কতদূরে, পথ যে কত কন্টকীর্ণ, এইগুলোকে চুলছেঁড়া বিচারও তো করা দরকার। এইগুলো তো কথাসাহিত্যের মাধ্যমেও বলা যায়। সেইগুলো কিন্তু একেবারে পারফেক্টলি ওইখানে নেই। শোন জাহাঙ্গীর, আমি কিন্তু ওই কথাগুলো গ্রন্থটিতে বলেছি। তাহলে আমাকে আলাদা করে ওই সমস্ত কথাসাহিত্যের মান সম্পর্কে আর-কী জিজ্ঞেস করবে বলো? অন্য সাহিত্যিকদের সাথে যে পার্থক্য তা তো একটু আগেই কে যেন বক্তব্যে বলল।
জাহাঙ্গীর: বাংলা একাডেমীর প্রোগ্রামে বা পরবর্তীতে এই ব্যাপারে আবুল ফজলের কোনো মন্তব্য কি পেয়েছিলেন?
হাসান: না, এ ব্যাপারে আর কোনো কথা তিনি বলেননি।
জাহাঙ্গীর: আবুল ফজলের প্রথম উপন্যাসের কাল ধরলে তখন তো পথের দাবি বা যোগাযোগ লেখা হয়ে গেছে মনে হয়?
হাসান: হ্যাঁ, তারও পরে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ লিখলেন লালসালু্। এসব তো অনেক লম্বা আলোচনা, সেসবে ঠিক এই মুহূর্তে যেতে চাই না, আবুল ফজলের কথাসাহিত্যের আলোচনায়ও যেতে চাই না। ঠিক আছে? আমি তো আবুল ফজলের অবস্থান ঠিক কোথায়, তা কিন্তু স্পষ্ট করেই বলেছি। তবে তাঁর উপন্যাসে যে বক্তব্যগুলো আছে তা যদি শুধু গ্রহণ করি তা হলে তো উপন্যাসগুলো ভালোই। সেই বক্তব্যগুলো কিভাবে শিল্পসম্মতভাবে কার্যকর করা হবে, তাতে উপন্যাসের সব ডাইমেনশন তলিয়ে দেখা হলো কিনা, সেটা খুব সৃজনশীলভাবে হাজির করা হলো কিনা, ওইসব ভাবতে গেলে ঘাটতি তো আছেই।
জাহাঙ্গীর: এই প্রসঙ্গে আরেকটা বিষয় জানতে চাই, কথাশিল্পী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কথা আপনি বিশেষ মর্যাদা দিয়েই স্মরণ করেন এবং তা যথার্থই। তবে আমরা আপনার লেখা থেকে এও জানি যে, আপনি বলে থাকেন কথাসাহিত্যের ইতিহাস ফর্মের ইতিহাস নয়। আমরা যদি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর  শিল্পসম্মত উপন্যাসের কথা বলি, যেমন কাঁদো নদী কাঁদো বা চাঁদের অমাবস্যার কথা যদি বলি, তাহলে এগুলির ফর্মের বিশেষত্বও কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ-ক্ষেত্রে ফর্মের এই বিশেষত্বটা কি অস্বীকার করবেন?
হাসান: না না, ফর্মের বিষয়টা তো আমি অস্বীকার করবই না। কিন্তু এ জায়গায় আমি বারবার বলছি, ওয়ালীউল্লাহ আগে ফর্ম ঠিক করে লিখেছিলেন? নাকি লেখার ব্যাপারটাকে খুব এফেকটিভলি কী করে প্রকাশ করা যায়, সেইটা ভেবে ফর্ম তৈরি করেছিলেন? কোনটা আগে?! ঐ যুগে যে কথা তাকে বলতে হবে, তা সব-চাইতে তীব্রভাবে, সব-চাইতে গভীরভাবে, সব-চাইতে একেবারে তল পর্যন্ত বিবেচনা করে, তা যদি বলতে হয় তাহলে লালসালুর নিজস্ব ফর্ম দরকার। যে-কথাগুলো মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলতে চেয়েছিলেন, সেই কথাগুলোকে তত জোর দিয়ে প্রকাশ করার জন্য মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আলাদা ফর্মের প্রয়োজন ছিল। একেবারেই ফর্মলেস লেখা, প্রায় কোনোরকমের কারিগরি নাই, কৌশল নাই, খুবই সাধারণভাবে তৈরি করা এলোমেলো লেখা কার? বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। পথের পাঁচালিতে তিনি কোনো ফর্মেরই তোয়াক্কা করেননি। কাজেই কোনো লেখাকে শুধুমাত্র ফর্মের দিক চিন্তা করে নিন্দা-মন্দ করতে হয় না। কারণ তখন মনে হয়, ঠিক যে কয়টা প্যাঁচ থাকলে কৌটোর মুখটা ঠিকমতো লাগবে, সেই কয়টা প্যাঁচই বিভূতিভূষণের ঢাকনাতে আছে, বুঝতে পেরেছো? সেই কয়টা দরকারি প্যাঁচই আবার মানিকের ঢাকনাতে আছে। একেই বলে ফর্ম আর বক্তব্য বিষয়ের এক অদ্ভুত বিবাহ। এই বিবাহটা ঘটাতে হয়। একজন লেখককে এইভাবে কাজ করতে হয়। নাটক তো অনেককাল আগে থেকেই লেখা হচ্ছে, সফোক্লিসও নাটক লিখেছেন, আবার শেক্সপিয়রও নাটক লিখেছেন; শেক্সপিয়র আজ থাকলে তোমাদের জিজ্ঞেস করতেন, তোমরা ফর্ম ভাঙ্গার জন্য নাটক লিখছ, নাকি অন্যকিছু? কথা হচ্ছে, এই যে মাতামাতিটা করা হয়, তাতে আঁধার এবং আধেয়’র মধ্যে একাত্ম সম্পর্ক, তা আমরা মিস্ করি। এইজন্যই এ দুটোকে বিচ্ছিন্ন করে আলাদা করতে চাওয়ার করার কোনো দরকার নেই। সফোক্লিসের ফর্মটা আমাদের কাছে ত্রুটিপূর্ণ মনে হয় না, পুরনোও মনে হয় না। মনে হয় যে, হ্যাঁ, কিভাবে সফোক্লিস, ইউরিপিডাস বা ঈসকাইলাসরা অদ্ভুতভাবে গল্পটা বললেন তাই কিন্তু বড়ো। তুমি ওইভাবে গল্পটা বলতেও পারবে না। তাঁরা তাদের কথাগুলো সবচেয়ে ভালোভাবে বলার জন্যই ওই ফর্মটা বেছে নিয়েছেন। ওঁর চাইতে সংক্ষেপে, ওই কয়টি পাতার মধ্যে এই মহাট্র্যাজেডি নাটকে আনা যেত না। সেই জন্যই আমার মনে হয় যে, যে যত বড়ো লেখক তার তত ভালো ফর্ম। ফর্মের নিজস্ব ইতিহাস যদি ধরি তাহলে নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। কারণ সমাজের বিবর্তনের, সমাজের ক্রম-অগ্রসরমানতার পারস্পরিক নিজস্ব ধাপ অনুপাতে একটা চেহারা আছে। সেই জন্য ফর্মের ইতিহাস দেয়া যায়। একটু ভাবলেই বুঝতে পারবে, পৃথিবীর সমস্ত লেখকই প্রাতিস্বিক-অনন্য এবং নিজের ফর্ম হন্যে হয়ে খুঁজতে যাওয়া ভুল। এমনকী ম্যাজিক রিয়েলিস্টদের ভিতর তুমি যতগুলো লেখককে অন্তর্ভূক্ত করতে চাও, সেই লেখকদের একজনের ফর্মের সাথে অন্যজনের ফর্মের কোনো মিল নেই। ইউসার লেখার সাথে মার্কেজের লেখা, ফুয়েন্তেজ, কার্পেন্তিয়র বা হুয়ান রুলফোর লেখা—কারও সাথে কারও লেখা মিলবে? হুয়ান রুলফোর মাত্র পাদ্রে পেরোমার নামের চমৎকার একটা উপন্যাস আর কয়েকটা মাত্র ছোটগল্প। কী অপূর্ব শিল্প। কিন্তু তার সাথে কারও মিল পাবে? শুধু ফর্ম নিয়ে এসব তোমরা বলো কেন? লেখকরা এভাবে বলার জন্য বলেছে তোমাদের? আমরা আগে ফর্ম নিয়ে কাজ করছি, তারপরে উপন্যাস বা গল্প লিখেছি— এ-রকম বলেছে কোনো লেখক? তোমরা সমালোচকরা এসব কেন বলো? হ্যাঁ, বুঝবার জন্য ইচ্ছা হলে বলতে পারো? সেই জন্য, আমি ফর্মের ব্যাপারটা এভাবেই দেখি।
জাহাঙ্গীর: ঠিক আছে, এখন আমরা আপনার উপন্যাস সদ্যলেখা ‘শিউলি কথা’ নিয়ে একটু কথা বলি। আমাদের গল্পসাহিত্যে সর্বোচ্চ সম্মানীয় পর্যায়েই আপনি আছেন। আমরা আপনার কাছে ভালো— মহৎ উপন্যাসের বৈশিষ্ঠ্যের কথা শুনি— তো আপনার এই উপন্যাসটিতে কি সেই ধরনের উপন্যাসের বহুস্তর বিশিষ্ঠ কণ্ঠ, ভাঙচুর, চরিত্রের উত্থান-পতন, নৃ-তত্ত্ব, সমাজতত্ত্বের ব্যাপক বিষয়-আশয় ধারণ করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা, এসব যেন আমরা পুরোপুরি পাই না, একটা না-পাওয়ার অতৃপ্তি যেন থেকেই গেল। এ সম্পর্কে যদি আপনি কিছু বলেন।
হাসান: শিউলি কথা নিয়ে আপাতত কোনো কথা বলব না। আর এটি কিন্তু আমার সদ্যলেখা নয়। বেশ আগের লেখা। এইটুকু শুধু বলতে পারি, এই উপন্যাসটি আমি পুনরায় লিখব। যদি আমি লিখতে পারি তবে এটি যা আছে তার অন্তত তিনগুণ বড়ো করব। এবং এর ভেতরে বহুত কিছু এসে জমবে। তুমি যেইগুলো আশা করো বলছ, সেইগুলোও বোধ হয় আস্তে আস্তে জড়ো হবে। এখানে শুধু সূত্রপাত করা হয়েছে। পুরো কী আসবে তাও স্থির করা হয়ে গেছে।
জাহাঙ্গীর: তাহলে আমি আমার পাঠ থেকে ওইসব আশার কথাই বলি, যেমন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা এ উপন্যাসে যেন প্রবন্ধের মতো বলা হয়েছে—  ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা, মিত্রশক্তি, হিটলার, সোভিয়েট রাশিয়া, কলকাতা, একটা ফ্যামিলি ভেঙে যাচ্ছে, ছিন্নভিন্ন হচ্ছে মূল্যবোধ, জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে— কিন্তু উপন্যাসটিতে এই জায়গাটাই মনে হলো কেমন জানি তাড়াহুড়োর ব্যাপার ঘটে যাচ্ছে। এটাকে যদি বিস্তৃত করা হতো, একটা মহৎ উপন্যাসের বৈশিষ্ঠ্য নিয়ে যদি বহুস্বর, দ্বন্দ্ব নিয়ে আসা হতো তাহলে বোধ হয় আমরা নিজেদের ভাবনাকে আরও শাণিত করতে পারতাম।
হাসান: হ্যাঁ তোমার অভিযোগগুলোকে যথার্থই ধরে নিচ্ছি।
জাহাঙ্গীর: আচ্ছা, এই উপন্যাসের শুরুতেই আমরা একটা বাড়ি দেখি, আপনার গল্প উত্তর বসন্তে বা আত্মজা ও একটি করবী গাছেও প্রায় এমনই আবহের একটি তীব্র যন্ত্রণাময়, হাহাকারে ভরপুর, বিষন্ন, বারবার কান্নাময় রঙের অদল-বদল দেখি। একটা গভীর-তীব্র যন্ত্রণা যেন বাড়িটাতে লেগে আছে। আামি যখন এটি পড়ি, আমি কিন্তু খুব ইমোশনাল হয়ে যাই, আপনি কী এই যন্ত্রণাময় অসাধারণ সিম্বলটা আপনি আনেন কী করে? এই বাড়িটা নিয়ে আপনি যদি কিছু বলেন?
হাসান: খুব চমৎকার একটা বিষয় তুমি উত্থাপন করলে। দেখ, তলস্তোয় একবার বলেছিলেন, কেউ তো আর উপন্যাস লেখে না, আসলে উপন্যাসের নামে আত্মজীবনীই লেখে। এ-রকম কথা হয়ত এখানেও বলা যায়। তুমি যে লিখতে লিখতে কোথায় কোথায় হাজির হয়ে যাও, তা বলা খুব কঠিন। আমিও যে কোথায় কোথায় হাজির হয়ে যাই ! আমি যে জীবনটা কাটিয়ে এসেছি, তুমি ধরে নিতে পার এই বাড়িটা কোনো একসময় আমারই বাড়ি ছিল। যে বাড়িটা দেখছ, সেই বাড়িটাতে আমাকেই জীবন কাটাতে হয়েছিল। যে অভিজ্ঞতা শিউলি কথা বা অন্যত্র দেখছ, তা ধরে নাও আমার পারিবারিক অভিজ্ঞতাই। এখানে যে পিতাকে দেখছ, ধরে নাও আমারই ছিন্নমূল-উদ্বাস্তু বাবা। তিনি তার সম্পূর্ণ কন্টেন্ট বাদ দিয়ে হয়তো, নিজের হুবহু গল্পটা বাদ দিয়ে বলছি, তিনি কোনো-না-কোনো ভাবে আত্মজা ও একটি করবী গাছে হাজির হন, তিনিই উত্তর বসন্তে আব্দুল বারী রূপে আরও সরাসরি হাজির হন। এইভাবেই আমি বলি যে আমি কিছুই বানাই না। যা আমার রক্তের ভিতরে ঘুরছে সেই যন্ত্রণা, সেই কষ্ট, সেই কথাই আমি মানুষকে বলতে চাই। কখনো পারি, কখনো পারি না। এসব কথাবার্তা হয়তো অন্য কোথাও লিখব। আমি তো সাহিত্য করতে চাই না, সাহিত্য বলে যে লোকে খুব লাফায়, আমি তো একদমই করতে চাই না। আমি শুধু ওই কথাগুলোই বলতে চেয়েছি। বাড়িটাকে ওইভাবেই তুলে এনেছি। ব্যাপারটা বুঝেছ ?
জাহাঙ্গীর: আমরা কী তাহলে আশা করব যে বাড়িটাকে সিম্বল ধরেই আরও বড়ো কাজ করবেন?
হাসান: হ্যাঁ, বাড়ি আমাকে খুব প্রলুদ্ধ করে, নিজের বাড়ি, অপরের বাড়ি, পরিত্যক্ত বাড়ি, জনবসতিহীন বাড়ি, এখনও নির্মিত হয়নি সে-রকম পচাবাঁশের গন্ধঅলা বাড়ি— সবই আমাকে টানে, সবই আমাকে জীবনের নানান কথা বলে। কী বলব, দেখ, ছোটবেলায় ময়ের কাপড় থেকে যে গন্ধ পেতাম, নানীর কোলের কাছে বসলে হয়ত আতার গন্ধ পাওয়া যেত, এইগুলি কখনও কখনও মনে হয় ভালো নয়, কিন্তু ওগুলো কেমন গন্ধ? এখনও পুরনো সিন্দুক খুললে বৃদ্ধ মা, একবছরের বয়সের জামা দেখছেন, এসব ভাবলে কেমন লাগে? স্মৃতিময় বাড়ির বিষয়ও এ-রকমই একটা ব্যাপার। কত কথা বলে বাড়ি, সেই জন্য বাড়ি নিয়ে আবার লিখব। ঠিক আছে?
জাহাঙ্গীর: এবার আপনার গল্প নিয়ে কিছু কথা বলি। আচ্ছা, আপনার ‘জীবন ঘষে আগুন’ তো ষাট দশকের শেষদিকের লেখা— তো সেই সময় কি সশস্ত্র বাম-আন্দোলন অত মারমুখো ছিল?
হাসান: নিশ্চয়ই ছিল, তুমি হয়ত নিজের বয়সের জন্য সেই দেখাটা কল্পনাও করতে পারছ না। তখন আইয়ুব খানের মতো প্রচণ্ড প্রতাপশালী সামরিক শাসক কোনদিক দিয়ে পালাবে পথ পাচ্ছিল না হাঃহাঃহাঃ।
জাহাঙ্গীর: এই মারমুখো চরিত্রসমূহ থেকে কে মুক্তিযোদ্ধা বা অন্য হিসেবে ‘নামহীন গোত্রহীন’ নামের গল্পগ্রন্থে রিপ্রেজেন্ট করছে?
হাসান: হ্যাঁ একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। জীবন ঘষে আগুন’এর এমন কোনো চরিত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার বিষযটা বলতে পারছি না।
জাহাঙ্গীর: নামহীন গোত্রহীন তো মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক গল্পের সমাহার বলা যায়— এখানে দেখা যাচ্ছে ‘ভূষণের একদিন’ যুদ্ধ শুরুর দিকের গল্প, ‘ফেরা’ যুদ্ধের শেষের দিকের স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়ার অশান্ত-ক্ষুব্ধ গল্প, নামহীন গোত্রহীনই সেই অর্থে সরাসরি যুদ্ধের গল্প। কিন্তু সেখানেও চরিত্রসমূহ যুদ্ধের ব্যাপারে বেশ দ্বিধান্বিত। তাহলে মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে আপনার অবজার্ভেশনটা ঠিক কী ধরনের?
হাসান: খুবই পজেটিভ, এত বড়ো একটা মহৎ ঘটনা, এত কষ্টের দিন খুব কম জাতির জীবনেই আসে। তবে যেহেতু আমি সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারিনি, ইন্ডিয়াও যেতে পারিনি, তার ফলে আমার অভিজ্ঞতার তো ঘাটতি আছেই। আমি ভাই, লেখার ব্যাপারে নিজস্ব উপলব্ধির বিষয়টাকে খুব গুরুত্ব দিই। তবে মুক্তিযুদ্ধের নয়টা মাস যে অমানুষিক কষ্টটা করেছি আর-কী, তার কিছু কিছু বিষয় কিন্তু আমার একাত্তর: করতলে ছিন্নমাথাতে আছে।
জাহাঙ্গীর: মুক্তিযুদ্ধের পরপরই আপনি এ জাতির স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গ, সামাজিক অস্থিরতা, অপরাজনীতি নিয়ে বেশ কাজ করলেন। মজ্ঞু সরকার, আহমেদ বশীর, মঈনুল আহমেদ সাবের, সুশান্ত মজুমদাররাও কিছু লিখলেন, কিন্তু আপনার পর্যবেক্ষনটা একদম ভিন্নঘরানার মনে হয়েছে আমার। এ ব্যাপারে কিছু বলুন।
হাসান: তখন অনেকেই সার্বিক মুক্তির মোহ কাটাতে পারেনি, আমিই কেবল বলছি কার মুক্তি, কিসের মুক্তি, তাই তো?
জাহাঙ্গীর: এত বিশাল বিষয নিয়ে উচ্চমার্গীয় সাহিত্য আমরা পেলাম কি?
হাসান: অত লম্বা-চওড়া কথা বলে কী হবে, আমিই তো ‘পাতালে হাসপাতালে’এর মতো হতাশায় মলিন ধরনের গল্প লেখা শুরু করলাম।
জাহাঙ্গীর: আমরা জানি যে, ‘তরলাবালা: এক বঙ্গ রমণীগাঁথা’ নামের একটা উপন্যাস নিরন্তর নামের সাহিত্যপত্রিকায় বের হচ্ছে, এটা কি আমরা সহসাই কমপ্লিট অবস্থায় পাবো বলে আশা করতে পারি?
হাসান: তরলা কিছুতেই তরল থাকতে চাইছে না, ও কেবলই সলিড হয়ে যাচ্ছে হাঃহাঃহা। হ্যাঁ, আমি নিজেও ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব শঙ্কিত আছি। তবে মনে হয় শেষ করার একটা সম্ভাবনা আছে। আবার ধরলে শেষ হবে। তো এখন আমি ভাবছি, এতকাল তো আমি লেখক কাম শিক্ষক কাম পরিবারের  কর্তব্য, হেন-তেন কামে ছিলাম; এখন সব হাত থেকে নিস্কৃতি নিয়ে আমি পুরোপুরি লেখক হতে পারি কিনা, এবার আমি দেখব। তখন তরলাবালাকে ধরার ইচ্ছা আছে, একবছরের মধ্যেই হয়ত আমার ক্ষমতায় যদি কুলোয়, যদি শক্তি কিছু থাকে, তাহলে তরলাবালা সমাপ্ত হবে।
জাহাঙ্গীর: সমপ্রতি আপনার একটা নতুন গল্প পড়লাম ‘দুন্দুভি বেজে ওঠে দ্রিম দ্রিম রবে ‘, ওইটাতে সাঁওতালদের সংগ্রামের বিষয়টা অনেক সাংকেতিকভাবে, অনেক বস্তুনিষ্ঠভাবে এসেছে; আমরা অনেকদিন পর পরম-বিস্ময়ে আপনার ক্ষমতার দিকে তাকালাম—  আপনি ৬৯’এর গণঅভ্যুত্থান নিয়ে জীবন ঘষে আগুনের মতো আলাদা একটা স্পিরিট নিয়ে গল্পটা লিখলেন, এটা কিন্তু আমাকে খুব মুগ্ধ করেছ। এ নিয়ে আপনি কিছু বলুন।
হাসান: ‘দুন্দুভি বেজে ওঠে দ্রিমি দ্রিমি রবে, সাঁওতাল পল্লীতে উৎসব হবে’— এ হলো রবীন্দ্রনাথের ছোট্ট একটা কবিতা। এটা সচরাচর পাবে না, এই লাইনগুলো পরিশিষ্ট-টরিশিষ্ট কোথাও পাবে, ওইটাকে অবলম্বন করে আমি যেটা লিখলাম, তা নিয়ে আমার নিজের কিন্তু অসম্ভব দ্বিধা ছিল, এবং দ্বিধাকে কেউ কেউ আবার সমর্থনও করেছে। তোমার কাছ থেকে এখন সম্পূর্ণ ভিন্নধরনের প্রতিক্রিয়া পেয়ে প্রশান্তি পাচ্ছি এবং খুব ভালো লাগছে। একজন আবার বলল যে, ‘আপনি তো মশাই গল্প লিখেননি, কী দরকার ছিল এ-রকম একটা নক্সা লেখার?’ কিন্তু ভিন্ন কথাও হয়েছে। তোমার মতো এমন প্রতিক্রিয়াও কেউ কেউ জানিয়েছে। এইটুকুকে অবলম্বন করে আমি এখন ভাবছি, সাঁওতালদের নিয়ে একটা ছোট্ট উপন্যাস লিখব কিনা?
জাহাঙ্গীর: হ্যাঁ, এটা তো আমাদের জন্য খুবই খুশির খবর। সাঁওতালদের নিয়ে তেমন ভালো কাজ হয়েছে বলে তো আমার জানা নেই। আপনার এই নক্সাধর্মী লেখার কথা আসাতেই আমার মনে পড়ছে, আপনার সেই নক্সাধর্মী লেখার বই ‘চালচিত্রের খুঁটিনাটি’র কথা, খুবই অসাধারণ একটা বই, যদিও এ নিয়ে তেমন আলোচনা কোথাও হয়নি। এধরনের লেখা আমাদের খুবই অনুপ্রাণিত করত একসময়। তো কথা হচ্ছে, এখন আমাদের আশপাশে যে সামাজিক অবস্থা, অবক্ষয়, অস্থিরতা, সর্বদিকেই একটা দূর্বৃত্তায়ন চলছে, সংখ্যালঘুর সমস্যা আছে— এই পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিকভাবে এধরনের ইফেকটিভ লেখা আমরা আশা করতে পারি না?
হাসান: হ্যাঁ তাও হয়, কিছু কিছু অনেক সময় লিখতেও তো হয়। তবে এখন মনে হয় বড়ো বড়ো লেখার দিকেই যাই। এধরনের খুচরো লেখা লিখব কিনা ভাবতে হবে; এসব তো টাইম সার্ভার। সময়ের প্রয়োজন মেটায়— তবে মনে হয় অত সময় দেয়া কি উচিত হবে?
জাহাঙ্গীর: তবে এটা তো ভিন্নধরনের স্বাদ শুধু নয়, আপনার ঐ শ্যামল বাংলার কোমল ডাঙ্গায় নাকি যেন শিরোনাম ছিল, নিরন্ন অসহায় বিপথগামী একটা মেয়েকে নিয়ে লেখা; আমাকে অসম্ভব রকম টাচ করেছিল। এধরনের কাজও তো করা যায়?
হাসান: হ্যাঁ সমাজকে বোঝা, মানুষকে বোঝা, এসব লিখতেও পছন্দ করব-না তাও নয়। দেখি। এই যে তোমাদের সাথে কথা বলছি, অনুষ্ঠানে অংশ নিলাম— এসব নিয়েও তো বলবার মতো মূল্যবান কথা থাকতে পারে। তবে আমি কিন্তু লিখবই— কোনোকিছুই ছেড়ে দিব না হাঃহাঃহাঃ।
জাহাঙ্গীর: বাংলাভাষার উল্লেখযোগ্য কথাসাহিত্যকদের সম্পর্কে কিছু বলুন।
হাসান: কে কী-রকম লেখেন, তা বিচারের ভার আমাকে দেয়াটা কি ঠিক হচ্ছে? সব লেখক তো নিজের লেখাটাকেই শ্রেষ্ঠ ভাবতে চান, নাকি?
জাহাঙ্গীর: হ্যাঁ তা হতে পারে। তবু কমলকুমার, অমিয়ভূষণ, মহাশ্বেতা, সুবিমল মিশ্র এঁদের সাহিত্যমান সম্পর্কে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করছি।
হাসান: এই তো আরেক মুশকিলের ব্যাপার। কমলকুমারের ভাষার একটা শক্তি নিশ্চয় আছে। কিন্তু তার চেয়েও বড়ো কথা তাঁর দেখা জীবনকে তিনি সর্বোত্তমভাবে প্রকাশ করার জন্যই এমন একটা ভাষাকৌশল প্রয়োগ করেছেন। অমিয়ভূষণের লেখা কখনও আমাকে টানেনি। তাঁর লেখা আমার কাছে প্রায়ই নিরক্ত-ফ্যাকাসে মনে হয়, মহাশ্বেতা অত্যন্ত পাওয়ারফুল কথাসাহিত্যিক, মানুষ হিসেবেও তিনি অসাধারণ, তাঁর আগ্রহের মানুষদের দেখার জন্য তাঁর যে দরদী মনটা আছে, তা আমাকে রীতিমতো মুগ্ধ করে, সুবিমলের প্রথম দিকের কিছু গল্প আমার ভালো লেগেছে।
জাহাঙ্গীর: আপনি তো হুমায়ূন আহমেদের কথাসাহিত্যকেও পাওয়ারফুল বলেছিলেন একবার— সেটা ঠিক কোন অর্থে?
হাসান: মধ্যবিত্তকে দেখার একটা কায়দা তার আছে। লেখার ধরনটাও একসময় ভালোই মনে হতো।
জাহাঙ্গীর: এবার একটু অন্য বিষয় জানতে চাই, আপনি কি সিনেমা দেখেন?
হাসান:হ্যাঁ, উত্তম-সুচিত্রার ছবি এখনো দেখলে ভালো লাগে হাঃ হাঃ হাঃ। সাগরিকা যে কতবার দেখেছি । কেমন জানি ন্যাকা ন্যাকা লাগে । ঐ যে শাপমোচন, অগ্নিপরীক্ষা— হাস্যকর একেবারে, তাই না? অত্যন্ত রক্ষণশীল । এক্কেবারে রিঅ্যাকশানারিস্ট; তাই তো? তাও দেখেছি। তবে ঋত্বিকের ছবি একটু লাউড লাগলেও তাঁর তিতাস একটি নদীর নাম খুব ভালো লেগেছিল। তাঁকে কিন্তু খুব পাওয়ারফুল মনে হয়। তারপর পাড় খুব ভালো লেগেছিল।
জাহাঙ্গীর: আচ্ছা, আপনি আপনার জীবনের গল্প বলুন; ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ নিয়েই বলি— আপনি বিয়ে করেছেন কত সালে?
হাসান: আমি বিয়ে করেছি সিক্সটি ওয়ানে ।
জাহাঙ্গীর: স্যাটেল ম্যারেজ?
হাসান: একরকম স্যাটেল ম্যারেজই; ওই মেশানো আর-কী । প্রেম কতক্ষণ থাকে গো? কে যেন সেদিন বলল— তা নাকি থাকে মাত্র সাতদিন । আর বাকিটা অভ্যেস হাঃ হাঃ হাঃ।
জাহাঙ্গীর: আপনার জীবনের অন্যসব বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা আমরা জানতে চাই।
হাসান: কী আর বলব, হাজার দিকে গিয়ে কোনোদিকেই আসলে যাওয়া হলো না, মঞ্চে গেলেও বোধ হয় আমাকে নিত।
জাহাঙ্গীর: আপনার কথা বলার ধরন খুবই চমৎকার, তা যেভাবে বডি মুভমেন্ট থেকে ওঠে; একেবারে জীবন্ত।
হাসান: হাঃ হাঃ হাঃ, আরে এ জন্যই তো কোথাও যাওয়া হলো না । মঞ্চে যাওয়া হলো না, সিনেমায় যাওয়া হলো না । স্ক্রিপ্ট লিখতে চেয়েছিলাম— তাও হলো না । কিছুই তো হলো না।
জাহাঙ্গীর: আচ্ছা, আরেকটা ভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলি, লেখালেখির ক্ষেত্রে বানান-রীতি সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
হাসান : হ্যাঁ লেখার ব্যাপারে বিভিন্ন জন বিভিন্ন বানান-রীতি অনুসরণ করেন। উচ্চারণের ধরনে বানান-রীতিকেও কেউ সাজান। আমার মনে হয়, আমাদের বাংলা একাডেমীর নিয়মটাও অনুসরণ করা যেতে পারে। এ নিয়েও যে ভিন্ন কথা চলে না তা কিন্তু নয়।
জাহাঙ্গীর: এখন আমি একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে যাচ্ছি। আহমদ ছফা যে বাঙালি মুসলমানের আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে ভাবতেন, আমরা যদ্দূর জানি এসব নিয়ে তার সাথে আপনার দীর্ঘ কথাবার্তা হয়েছে, বাঙালিত্ব সম্পর্কে তার ভাবনা, এর সাথে আবার মুসলমানিত্বের ব্যাপার-স্যাপার মিলিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গিটা আসলে কেমন ছিল? আপনার সাথে তার দৃষ্টিভঙ্গির কোনো পার্থক্য ছিল কি?
হাসান: দেখ ভাই, তুমি আবার ঝামেলা করছো কেন বল তো? এই পরিসরে এত বিরাট প্রসঙ্গ আনাটা কি ঠিক হচ্ছে? বাঙালিত্ব, মুসলমানিত্ব এসব বলতে কি বোঝাচ্ছো বলো দেখি। মুসলমানিত্ব বলতে কী সারকামসিশন বোঝায় নাকি? মুসলমানিত্ব কী বস্তু, এখন এই নিয়ে কী বলা যায়? আমি এতসব বিষয় এখন আনতে চাই না, আমি শুধু এইটুকু বলতে চাই, ব্যক্তিগতভাবে ছফাকে আমি ভীষণ ভালোবাসতাম। তাঁর অদ্ভুত কথাবার্তা, ব্যবহার ইত্যাদি নিয়ে সে খুবই ইমপ্রেস করত আমায়। তাঁকে কখনই নিরামিষ তরকারি বলে মনে হতো না। তাঁর মধ্যে ঝাল-নুন এসব জিনিসগুলো ছিল। ছফা আমাকে তাঁর লেখা দিয়ে মুখ বদলাতে সাহায্য করত; অনেকে আছে তো একই জিনিস খেতে খেতে অন্যকিছু খেতে চায়, ব্যাপারটা এমন আর-কী। তাঁর সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। যখন সে একেবারেই তরুণ, আমিও তখন তরুণই ছিলাম; তবু সে তো আমার চেয়ে অনেক অল্পবয়েসি, সেই সময় প্রবন্ধ বলে একটা পত্রিকা বার করবে বলে আমার সাথে বেশ যোগাযোগ করছিল। তাঁর কত পোস্টকার্ড যে আমি সেদিন খুঁজে পেলাম, আমি লিখি না বলেই খারাপ লেখক বলে দিচ্ছে। আমি লিখি না এই অভিযোগ সংবলিত কত পোস্টকার্ড যে সেদিন পেলাম। সেই ছফা আমার সাথে কতবার যে ঝগড়া করেছে। সে কিন্তু আমাকে খুব ভালোবাসত। তাকেও আমি ভালোবাসতাম। তার পর তো লেখক হিসেবে সে দাঁড়িয়েছে। চিন্তাবিদ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সমাজতত্ত্ববিদ হিসেবে কথা বলেছে। আমাদের যে রাষ্ট্র হয়েছে তার ধরন-ধারণ নিয়ে তার সাথে বিস্তর কথা হয়েছে। কখনও মনে হতো বেশ গুরুত্বপূর্ণ কথা বলল সে, আবার কখনও মনে হতো আমি তো ওর কথাটাকে ঠিক মেনে নিতে পারছি না। কখনও বেশ সাধারণভাবে কথাগুলো বলছে। একসময় মনে হওয়া শুরু করল সাহিত্য সম্পর্কে, সংস্কৃতি সম্বন্ধে বলা কথাগুলো যেন কোথায় যেন আটকে যাচ্ছে। আবার কখনও কখনও মনে হয়েছে, আমাদের অন্ধভাবে দেখাটাকে সে একটু চোখ ফুটিয়ে দিচ্ছে। তাহলে কথা হচ্ছে, তুমি যেটা বললে ধর্ম, সংস্কৃতি, ধর্মনীতির উপর দাঁড়ানো সংস্কৃতি ইত্যাদি নিয়ে এই সাক্ষাৎকারে আমি আর আলোচনা করতে চাই না।
জাহাঙ্গীর : ঠিক আছে, আমরা এখন স্বশিক্ষিত দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর সম্পর্কে কিছু বিষয় জানতে চাইব। এই মহান ব্যক্তিটি সম্পর্কে কেউ কেউ বলতে চান, তিনি কী করে দার্শনিক হন, তাকে বড়োজোর দর্শনপিপাসু বলা যায়। দর্শনের উপর তার তো বেসিক কোনো কাজ নেই। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য জানতে চাচ্ছি।
হাসান : এইসব হচ্ছে তথাকথিত শিক্ষিত মধ্যবিত্তের কথকতা। যিনি জীবনভাবনা সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন তিনিই তো দার্শনিক, নাকি? তাঁর পা দুটি গেঁথে আছে মাটিতে, এ ভাবনায় তিনি স্বয়ম্ভু বৃক্ষ। কোনো আধুনিক দার্শনিক দ্বারা তিনি প্রভাবিত নন। সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টোটল, কান্ট প্রমুখ দার্শনিক নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা করতে থাকলে তাঁর স্বকীয় রূপটি পেতাম আমরা কিনা সন্দেহ।
জাহাঙ্গীর : এসব বিষয়ে তাঁর সাথে কি আপনার সরাসরি মত বিনিময় হয়েছে কখনও?
হাসান : আনফর্চুনেটলি তাঁর সাথে আমার পরিচয় হয়নি।
জাহাঙ্গীর : এবার এমনই ভিন্ন নৃগোষ্ঠী নিয়ে কিছু কথা বলি। পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠী নিয়ে কি লেখার কোনো প্রেরণা বোধ করেন আপনি? আপনি তো সাঁওতাল জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করেছেন, আরও কাজ করবেন বলে জানালেন। তো, পাহাড়িদের উপর জাতিগত বা রাষ্ট্রীয় আচার-আচরণ নিয়ে কিছু বলবেন? এ-ব্যাপারে আপনার উপলদ্ধিটাই-বা কেমন?
হাসান: আমি তো এইসমস্ত পাহাড়িদের, শুধু পাহাড়িদের কেন, সাঁওতাল-গারো- বা অন্যসব আদি মানবগোষ্ঠীকে শাসনতান্ত্রিক স্বীকৃতি দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের ভিতর এক্কেবারে ছোট্ট নৃ-গোষ্ঠীকেও তার মৌলিক অধিকার দেয়া উচিত। যে মানবেতর অবস্থার মধ্যে এদেরকে রাখা হয়েছে, সেখান থেকে নিজেদেরকে সর্বপ্রকারে মুক্ত করার যে আন্দোলন তারা করছে আমি তার সমর্থন করি। আমরা মানে কথিত বাঙালিরা যে তাদের সহায়-সম্পত্তি লুটে-পুটে নিয়ে নিচ্ছি, আমি তার বিরোধিতা করি। কাজেই আমার কথাটাকে এভাবে ধরতে পারো, আমি এই ক্ষুদ্র যে জাতিগোষ্ঠী আছে, আমি তাদের জন্য আছি। কিন্তু তথাকথিত সহানুভূতি-মার্কা কিছু কাজ-টাজ আমি করতে চাই না। সহানুভূতিটা কিসের? প্রত্যেকে তাদের রাইটটাকে উপভোগ করবে। আমাকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করে সমুদ্রের জীবন, অরণ্যের জীবন, পাহাড়ের জীবন— কাজেই আমার মুক্ত আকাঙ্ক্ষার কোনো শেষ নেই। কিন্তু এখন আমার সেই সামর্থ কতটুকু? আর বয়সের ব্যাপারটা যদি বলি, আমি বুড়ো হবো না বললে তো শুনবে না, বয়স বাড়বেই। আমার খুব ইচ্ছে হয় তোমাদের মতো যুবকদের সাথে যদি পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরতে পারতাম, যদি পাহাড়ি বা আদিবাসীদের বাড়িতে গিয়ে থাকতে পারতাম, তাদের খাদ্য খেতে পারতাম, তা হলে খুবই ভালো লাগত। আর এইভাবে না-করলে ভালো কিছু লেখাও সম্ভব নয়। কিন্তু মনে হয় না যে আমার আর সামর্থে কুলোবে। জানি না। তবে আমার ইচ্ছা কিন্তু আছে।
জাহাঙ্গীর: আমরা সাহিত্য পত্রিকা নিরন্তর থেকে জেনেছি যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস মুক্তিযুদ্ধের উপর একটা উপন্যাস লেখার কাজ অনেকটাই গুছিয়ে এনেছিলেন, কিন্তু তার অকাল মৃত্যুতে তা আর হলো না। এতে বাংলাসাহিত্যের বড়ো ক্ষতি হলো বলতে হয়। আপনার কি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এধরনের কাজ করার কোনো পরিকল্পনা আছে?
হাসান: তুমি যা বললে তা অত্যন্ত সত্যি কথা, ইলিয়াস যে মাঝে মাঝে বলতেন না যে একশ/দেড়শ বছর বাঁচা দরকার, আমিও নিজে সেটা অনুভব করি। হ্যাঁ, তিনি মুক্তিযুদ্ধের উপর উপন্যাস লেখার ব্যাপারে কাজ শুরু করেছিলেন। নোট তৈরি করছিলেন, তাঁর পরিকল্পনার কথা তো জানতামই। কিন্তু তিনি তা শেষ করতে পারলেন না। আমাদের কপাল ভালো যে দুটো উপন্যাস তিনি লিখে যেতে পেরেছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে মুক্তিযুদ্ধের মহৎ একটা লেখা থেকে নিশ্চয়ই আমরা বঞ্চিত হয়েছি। তার কাজটা তো আর আমার নেয়ার বিষয় নয়। কেউ কারও কাজ হাতেও নিতে পারে না। মানুষের আয়ু যদি নিরবধি হতো তাহলে অনেক আশার বাণীই শোনাতে পারতাম তোমাদের— কিন্তু তাতো নয়। কতকিছুই তো করতে চাই— তরলাবালা উপন্যাসটি শেষ করতে চাই। মুক্তিযুদ্ধকে বিশাল ক্যানভাস করে কিছু করতে গেলে ইলিয়াসের চাওয়ার মতোই দুশ বছরের আয়ু দরকার। শুধু এটা কেন, ৪৭’এর দেশবিভাগ নিয়েই তো কিছু লেখা হয়নি। তোমরা তো আসলে সেসব কিছু জানো না, কত বড়ো মানবিক ট্র্যাজিডি ঘটে গেছে তা তোমরা জানো না। এই জেনারেশনকে এখন ইনসেন্সিটিভ মনে হয় আমার। এসব নিয়েও লিখতে চাই। কিন্তু অত সময় বোধ হয় পাবো না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গল্প ‘একাত্তর : করতলে ছিন্নমাথা’ এসব কিছু কিছু লিখেছি। তুমি যেটা বলছ উপন্যাস আকারে সেই ‘এন কোয়াইজ ফ্লোজ দ্য ডন’এর মতো লেখা? না সেটা বোধ হয় হবে না। এসব করে উঠতে পারব বলে মনে হয় না।
জাহাঙ্গীর: আচ্ছা ৪৭’এর দেশভাগের প্রসঙ্গই যেহেতু এল, আমরা আবার আপনার ‘শিউলি কথা’ নামের উপন্যাসের দিকে একটু ফিরে তাকাতে পারি। আমরা এও শুনেছি কোনো শিল্পকর্ম করতে গেলে পার্সোনাল ইনভলভমেন্ট যদি না থাকে তাহলে সেই জিনিস নিয়ে কাজ করতে আপনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। কথা হচ্ছে সেই উপন্যাসটি যেখানে শেষ হলো, আমরা জানি ফোরটি সেভেন বা তারও আগে ফোরটি সিক্সের দিকে আপনার বর্ধমানের যে গ্রামের বাড়ি সেই যবগ্রামে ভয়াবহ সামপ্রদায়িক দাঙ্গার স্বরূপটা দেখেছেন আপনি। তা-ই আপনার ‘কথা লেখা কথা’য় বা বিভিন্ন সময়ে আমাদের সাথে কথাবার্তায় জানিয়েছেন। এখানে একটু কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না, দাঙ্গার এই বিষয়টা আপনার ‘শিউলি কথা’তে কি বিস্তৃতভাবে আসতে পারে না?
হাসান: ‘শিউলি কথা’তে কিন্তু আছে কিছুটা। হ্যাঁ আমি তো ভাবছি যে ফোরটিজের রাজনীতিতে আরও ডিটেইলসে যাব। যন্ত্রণা, দ্বন্দ্ব, সমস্যাগুলো নিয়ে আসার চেষ্টা করব। তার সাথে ব্যক্তি জড়িত হবে। শেষ পর্যন্ত ওইটা কিন্তু ছিন্নমূল উদ্বাস্তু সেই সময়কার যুদ্ধমান এক তরুণীর গল্প হবে।
জাহাঙ্গীর: এতে তো তাহলে চরিত্রও বাড়বে?
হাসান: হ্যাঁ, বাড়বে কিন্তু এখনকার চরিত্রসমূহ থাকবে। কেন্দ্রীয় মেয়েচরিত্র সেই শিউলিই আরও বিস্তৃত হবে। এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলি, আমাকে কেউ কেউ নারীবাদী বলেন, তবে আমি তথাকথিত নারীবাদী নয়। নারী পুরুষের মতো আচরণ করবে, হেন করবে তেন করবে; এইগুলো নয়, প্রকৃতপক্ষেই আমি নারীর পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী একজন নারীবাদী। সেই জন্যই একটা মেয়েকে সামনে রেখে আমি এই স্ট্র্যাগলটা আনব ।
জাহাঙ্গীর: আমরা জানি যে, আপনি নারীদের মুক্তির ব্যাপারে ‘কথা লেখা কথা’য় ‘মার্কস ও এঙ্গেলস: তাঁদের নারীবাদী তত্ত্ব বিষয়ে দুএকটি মন্তব্য’ নামের প্রবন্ধে এসব আলোচনা করেছেন। পরিবার প্রথা চালুর ফলেই নারীর প্রাকৃতিক স্বাধীন জীবন পুরুষ-শোষেণের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেল। গার্হস্থ জীবনের নানান সমস্যা তাদের ঘাড়ে চাপল। সেখানে এমনই আছে যে নারীদের যে সংগ্রাম-আন্দোলন তা শ্রেণীর সাথেই যুক্ত। কিন্তু নারীরা তো শ্রেণীর বাইরেও বিভিন্নভাবে নিগৃহীত-লাঞ্ছিত। যারা কথিত নারী-আন্দোলন করে তারা নিজেরাও তো অত্যাচারিত। নিজ-শ্রেণী থেকেই তারা অধিকার বঞ্চিত। এ ব্যাপারে আপনার মতামত জানতে চাচ্ছি।
হাসান: তাও আমি সেখানে লিখেছি। সাহিত্য কদ্দূর কী বরতে পারব তা এখনও জানি না। রক্ত ঝরানো, ঘাম ঝরানো যে আন্দোলন দরকার; সেটির সাথে আমি নিজে যুক্ত হতে পারব কিনা বা করতে পারব কিনা জানি না।
জাহাঙ্গীর: আমি যদ্দূর ধারণা করতে পারছি তাতে শুধু শ্রেণী অবস্থান থেকেই সবকিছু দেখানো হচ্ছে, কিন্তু প্রত্যেক শ্রেণীর ভিতরও তো নির্যাতন চলছে, এটা কি আলাদা বিষয় মনে হয় না? শ্রেণী দিয়েই সব হবে? কথিত নারীবাদীদের আন্দোলনেরও কি সীমাবদ্ধতা নেই?
হাসান: নারীদের নিয়ে লেখা সেই লেখাটিতেও আমি তা খুব স্পষ্ট করেছি। মার্কসবাদেও নারীদের মুক্তির বিষয় পুরোটা কভার করে না। আর ইউরোপ-আমেরিকাতে যে আন্দোলন হচ্ছে নারীদের তা আমাদের তেমন কিছুই কাজে আসে না। কাজেই আামাদের মাটিতে দাঁড়িয়ে, আমাদের মেয়েদের দিকে তাকিয়ে, তাদের সাথে থেকে সব করতে হবে। এদেরকে আলাদা করে নারীশ্রেণী বলা যায় কিনা ভাবতে হবে। বড়োলোকের বউরা নারীবাদের সৌখিন আন্দোলন করছে, এসবের সাথে আমি নেই।
জাহাঙ্গীর: এইসব বিলাসী আন্দোলনকারীরা নিজেরাও তো নির্যাতিত হচ্ছে।
হাসান: হ্যাঁ, নির্যাতিত হচ্ছে। তারচেয়ে আরও বেশি করে বলতে হবে নির্যাতিতাদের কথা, ইটের ভাটায় ইট ভাঙছে যে মহিলা তার কথা। কাজেই এর সাথে নিজস্ব শ্রেণী-নিপীড়নের বিষয়ও যোগ করেই দেখতে হবে। এটা কিন্তু খুব বেশি ডিফিকাল্ট ব্যাপার।
জাহাঙ্গীর: একটু সমাজ-রাজনীতি-দর্শন বিষয়ে কথা বলতে চাই, মার্কসবাদীরা যেভাবে বলে টোটাল দেশের রণনীতি-রণকৌশর একই হবে, কিন্তু আমরা যদি এই শহর থেকে একটু দূরে যাই, বিভিন্ন জাতি যেমন ম্রো, রাখাইন বা চাকমা-মারমাদের দেখি, তারা তো অনেক পশ্চাদপদ; তাদের জীবনবিন্যাস, সামাজিক বিষয় তো অনেক আলাদা। তাহলে সারাদেশে আন্দোলন-সংগ্রামের ধরন এক হবে কেন?
হাসান: শোনো, আমি তো রাজনীতি করি না; যারা করে তাদেরকে এ প্রশ্নটা করো। তোমরা ওদের সঙ্গেই তর্কটা করো।
জাহাঙ্গীর: কিন্তু এটা তো জীবন দর্শনই?
হাসান: পুঁথির দর্শন আর প্রয়োগের দর্শন এক হবে না, শুধু এটুকুই বলতে পারি। এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আমি উপযুক্ত ব্যক্তি নই।
জাহাঙ্গীর: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
হাসান: তোমাকেও ধন্যবাদ।

২৬/০৭/ ২০০৩
চট্টগ্রাম।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন