বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট, ২০১৩

নুন পান্তার গড়াগড়ি--১

সেলিনা হোসেন

ইদানীং ঘুম ভাঙলে আরজ আলী খুব বিষণ্ন বোধ করেন। নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে বলেন, কেন যে বয়স বাড়ে। বয়সটা থেমে থাকলে ক্ষতি কি! ওটারতো আর পথ চলার কষ্ট থাকবে না। দম নিয়ে জিরোবে। দুহাতে নিজের মাথার চুল মুঠো করে ধরে আরজ আলী মাতুব্বর বিছানায় উঠে বসেন।


উঠোনে ভোরের আলো ছড়ায়। বিছানায় বসে তিনি তা অনুমান করেন। অনুমান নয়, তিনি জানেন এটা ঘটবেই। কারণ প্রকৃতির নিয়ম। প্রকৃতির নিয়ম উল্টোয় না। আর বয়স বাড়া প্রকৃতির সত্য। আরজ আলী মাতুব্বরের বুকে ফুঁড়ে যত বড় নিশ্বাসই আসুক তাতে প্রকৃতির নিয়মের কিছু আসবে যাবে না। আরজ আলী এই সত্য বোঝার সঙ্গে অনুভব করেন, তার ভেতরে আলো নেই। ওখানে আলো প্রবেশ করে না এবং দিন বড় হয় না। কারণ তার নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। তিনি একজন গরিব স্কুল মাষ্টার। তাঁর বিদ্যালয়ের নাম হরিপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়।

আরজ আলী মাতুব্বর বিছানা থেকে পা নামিয়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেলে পা ঢোকান। উঠে দাঁড়াতে পারেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়য়া মেয়েটি পরীক্ষার ফিসের জন্য টাকা চেয়ে ফোন করেছিল। তিনি চেষ্টা করেও টাকা যোগাড় করতে পারেননি। তাই পাঠানো হয়নি। বছরখানেক আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি অনেককিছু মনে রাখতে পারেন না। ছোট বোনটি বিধবা হয়ে দুই বাচ্চা নিয়ে তার সঙ্গে থাকে। সংসার দেখাশোনা করে। বাড়তি বোঝাও বটে! তারপরও ওদের দেখাশোনা করে আনন্দ পান। এই মুহূর্তে সবকিছু এলোমেলো লাগছে। বাবার কাছ থেকে টাকার জন্য অপেক্ষা করে মেয়েটি বলেছে, বাবা পরীক্ষার ফিস জমা দিয়েছি। তোমাকে আর টাকার জন্য ভাবতে হবে না। আমার জন্য চিন্তা করবে না। তুমি সুস্থ থাকো বাবা। মাকে হারিয়েছি আমরা। তোমাকে হারাতে চাই না। ফুফুকে বলেছি, তোমাকে রোজ গ্লাসভরা দুধ দিতে।

স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালে আরজ আলী মাতুব্বর টের পান ঘরের জানালার পাশের জামরুল গাছের ডালে টুনটুনিটা টুনটুন করছে। প্রতিদিন সকালে এই গাছের ডালে আসে। ছুটির দিন মাঝে মাঝে সারাদিন ঘরে থাকেন আরজ আলী মাতুব্বর। পাখিটির ডাক শোনা হয় না তার। ভোরের পরে আর এই গাছে থাকে না। কিংবা যদি থেকেও থাকে তাহলে ডাকে না। সারাদিনে তিনি ওর টের পান না। বুঝতে পারেন দিনের আলো ফুটলে অন্য কোথাও চলে যায়। দুপুরে কিংবা বিকেলে সূর্যের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে টুনটুনি বলে না, সূর্য তুমি ডোব। আমি আছি মাস্টারমশায়ের কাছে। তিনি শিক্ষকতা জীবনের সাঁয়ত্রিশ বছর পার করেছেন।

বয়স হয়েছে বাষট্টি বছর। তারপরও তাঁর জীবনে নুন আর পান্তার মিলমিশ হয় না। তিনি বড় অসহায় একজন মানুষ। সংসারের বোঝা টানতে টানতে সিন্দাবাদের বুড়ো হয়েছেন। আরজ আলী মাতুব্বর আর ভাবেন না। নিজের ভাবনা থেকে মুক্তি নিয়ে বাইরে আসেন। দেখতে পান তাঁর বোনের দুই মেয়ে রান্নাঘরে বসে পান্তা খাচ্ছে। ওরা দুই বোন ম্যাট্রিক পাশ করেছে। ওদের পড়ালেখা চালানো সম্ভব হয়নি। ওরাও মায়ের সঙ্গে সংসারের কাজ করে। সেলাই-ফোঁড়াই করে। মামাকে দরজা খুলে বাইরে আসতে দেখে, দুবোন ভাতের থালা রেখে উঠে আসে। জিজ্ঞেস করে, মামা আপনার শরীর ভালো তো?
ভালো আছি মায়েরা।
দাঁতের ব্যথা কমেছে?
কমেছে রে। তোরা ভাবিস না। যা ভাত খেয়ে শেষ কর। ভাতের থালা ফেলে উঠে আসতে হয় না মায়েরা।
আচ্ছা আমরা যাই। আপনি হাতমুখ ধোন। মা আপনার জন্য গরম ভাত রেঁধেছে। দুধভাত খেতে দেবে। আপু ঢাকা থেকে ফোন করে মাকে বলেছে।
তোদের নুন আর পান্তা ঠিক আছে তো মায়েরা?
আছে, আছে মামা।
আরজ আলী মাতুব্বর উঠোনে নামেন।
জোহরা কৈ?
মা পুকুরঘাটে গেছে মামা। মাকে ডাকতে যাবো?
না, না ডাকতে হবে না।
আরজ আলী মাতুব্বর উঠোনে নেমে চারদিকে তাকান। উঠোনে রৌদ ভরে আছে। আজ স্কুল ছুটি। ভাবেন, মাছ কিনতে বাজারে যাবেন। তাঁর কই মাছ খাওয়ার ইচ্ছা হয়েছে। পারবেন কি কিনতে? ঘরে কয় টাকা আছে তার হিসেব করতে হবে। হয়ে যাবে হয়তো। কই মাছ কিনতে না পারলে বাতাসী মাছ কিনবেন। সেটাও না কিনতে পারলে গুঁড়ো চিংড়ির ভর্তা করতে বলবেন জোহরাকে। জোহরার মেয়েরা তাঁর কাছে কোনো বায়না করে না। ওদের কি কোনো শখ নাই? নাকি অনেক শখ আছে, কিন্তু গরিব মাস্টারের সামর্থে কুলোবে না বলে বায়না ধরে না। আহা রে, ওদের যদি শৈশব থাকত তাহলে মামার আর্থিক অবস্থা না বুঝে কিছু না কিছু চাইত। আহা রে, ওরা যদি সেই বয়সটা ফিরে পেত তাহলে আরজ আলী মাতুব্বরের উঠোনে ফুল ফুটতো। কোনো গাছ ছাড়া ফুল। যে ফুলের গন্ধে আরজ আলী বুকভরে শ্বাস টানতেন। নিজেকে বলতেন, আরজ আলী দেখো মানুষের ভবিষ্যৎ কত সুন্দর! তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, সেই সুযোগ তিনি আর কোনো দিন পাবেন না। তার আয়ু খুব তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যাচ্ছে। আয়ু ফুরিয়ে গেলে মানুষের জীবনে অকাল সন্ধ্যা নামে। তখন শাড়ির আঁচলে পুইশাক বেঁধে ফিরে আসে জোহরা বেগম। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, কি হয়েছে ভাইজান?
কিছুতো হয়নি।
তাহলে এমন করে দাঁড়িয়ে আছেন যে? মনে হচ্ছে আপনার কিছু হারিয়ে গেছে, আপনি তা খোঁজার চিন্তা করছেন।
আমি আজ দুপুরে কৈ মাছ দিয়ে ভাত খাব জোহরা। 
খাবেন। আমি রান্না করে দেব।
তুমি এই বাড়িতে আসার পর থেকে তুমি আমাকে তরি-তরকারি কিনতে বল না। যা পার নিজে জোগাড় কর। গাছ লাগাও। বেগুনের গাছে বেগুনি রঙের ফুল হয়। ঝিঙে লতায় হলুদ ফুল। চিচিঙ্গা আর লাউয়ের লতায় ফোটে সাদা ফুল। সবচেয়ে ভালো লাগে কমলা রঙের কুমড়ো ফুল দেখতে।
আপনার বোধ হয় খিদে পেয়েছে ভাইজান। আমি এখন আপনাকে দুধ ভাত দেব।
তুমি যে বললে কৈ মাছ রান্না করবে, তো তুমি মাছ কোথায় পাবে? তুমিতো মাছ চাষ কর না?
আকিনকে দিয়ে বাজার থেকে দুটো মাছ কিনে আনব।
দুটো কেন? মাছতো লাগবে পাঁচটা।
আমরা অন্যদিন খাব ভাইজান।
না, না তা কি করে হয়। তাহলে আমিও অন্যদিন খাব।
ভাইজান আপনার শখ হয়েছে সেজন্য আপনি আজ খাবেন। একটু থেমে জোহরা আবার বলে, ভাইজান আমরা আপনার ছায়ায় আছি, এটাইতো আমাদের বড় পাওনা। আপনি আমাদের ছায়া না দিলে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াতাম। সবই আল্লাহর ইচ্ছা।
তোমার মেয়েদের আমি কলেজে পড়াতে পারলাম না।
রোকেয়া বলেছে, ওর পড়া শেষ হলে চাকরি করবে। তারপর রহিমা আর খালেদাকে কলেজে ভর্তি করে দেবে।
রোকেয়া  এই কথা বলেছে? আহারে, আমার সোনার মেয়ে। ওকে পরীক্ষার ফিসের টাকা দিতে পারব না বলে আমি মেয়েকে জিজ্ঞেস করিনি যে কত টাকা লাগবে। আমি ওর একটা অক্ষম বাপ।
জোহরাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে আরজ আলী মাতুব্বর পেসাবের বেগ নিয়ে পায়খানার দিকে যান। বেশ কতগুলো বড় গাছ দিয়ে ছায়া হয়ে থাকা বাড়িটিতে তিনি জন্মের পর থেকে বাস করছেন। মৃত্যুর আগে বাবা বলেছিলেন, তুমি আমার একমাত্র ছেলে। মেয়েরা পরের বাড়িতে চলে যাবে। ওদের জন্য এই ভিটে ভাগ করতে হবে না। এই ভিটেটার গাছপালা কেটে তুমি এটাকে দালান বানিও না। যেটুকু ভিটে আছে তাই থাকবে। তুমি শুধু ঠিকঠাক রাখবে। প্রয়োজনে নতুন টিন দিও ছাদে। তোমার সন্তানদের গাছের ছায়ায় বড় করবে। পাখির ডাক শোনাবে। বৃষ্টির শব্দ শুনতে দিবে। ওরা যেন বুঝতে পারে বড় হওয়ার সত্য কথাও। যেন বুঝতে পারে বেঁচে থাকার জায়গা-জমিন সবটুকু নিয়ে গড়ে উঠলে ভুল হওয়ার শঙ্কা কম থাকে। আরজ আলী মাতুব্বর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে ভাবলেন। কথাগুলো তাঁর বাবা একদিনে বলেননি। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে অনেকদিন ধরে বলেছেন। তাঁর বাবা স্কুল-শিক্ষক ছিলেন। বেশ অল্প বয়সেই মারা গেছেন। যক্ষ্মা হয়েছিল। আরজ আলী তখন ম্যাট্রিক পাশ করেছেন। কলেজে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা ছিল। মা কলেজে পাঠাতে রাজী হলেন না। বললেন, তুই বাড়ি থেকে চলে গেলে আমি এই সংসারে থাকতে পারব না। দম বন্ধ হয়ে মরে যাব। আমি তোর বিয়ে দেব বাবা। তুই ঘর-সংসার করবি। আর গ্রামের স্কুলে মাস্টারি করবি। তোর দিন সুখেই কাটবে বাবা।

আরজ আলী পায়খানার দরজা বন্ধ করলে তার ভীষণ কান্না পায়। তিনি নিজেকে সান্ত্বনা দেয়ার কোনো ভাষা খুঁজে পান না। শুধু অনুভব করেন যে তিনি সুখে নেই। বাবার কথা অনুযায়ী তাঁর মেয়ে পরের বাড়িতে থাকতে পারেনি। বিধবা হওয়ার পরে পরের বাড়ির শরীকদের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে ফিরে এসেছে বাবার ভিটেতে। ছায়াঘেরা পাখি ডাকা ভিটেতে তার মেয়েরা সুখে নেই। ওদের লেখাপড়া বন্ধ। বিয়ে মানেই যে সুখ না, এটা ওরা ভালো বোঝে। মায়ের কথা অনুযায়ী নিজে সুখে নাই। স্কুল-মাস্টার হলেই সুখ পাওয়া যায় না। দেশের সরকার মাস্টারদেরকে মানুষ গড়ার কারিগর হওয়ার উপদেশ দেয়, কিন্তু বেঁচে থাকার সুযোগ সুবিধা দেয় না। স্কুল মাস্টাররা ক্লাশঘরে শিশুদের কলরব শুনে আনমনা হয়ে যায়। কচিমুখের দিকে তাকালে তাদের বুক ধড়ফড় করে। ব্লাকবোর্ডের উপর সাদা চকের দাগ দিতে দিতে ভাবে বাজারের চালের দাম ওঠানামার সঙ্গে তার বেতনের হিসাব মেলে না। মানুষ গড়ার কারিগরদের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যায়। আরজ আলীর পেসাবের বেগ নেমে গেলেও তিনি স্বস্তি বোধ করেন না। ভাবেন, গাছের ছায়া আর পাখির ডাক দিয়ে কি হবে যদি বেঁচে থাকা কঠিন হয়? পরিবেশ রক্ষা করার মহান ব্রত এখন আরজ আলী মাতুব্বরকে হালের বলদ বানিয়েছে। যে মানুষ সময়ের সাথে সাথে নিজেকে বদলাতে পারে না তাঁর জীবনে পিছুটান ছাড়া আর কিছু থাকে না। ওই পিছুটানের সূত্র ধরে ভেসে আসে বাবার কণ্ঠস্বর, মায়ের দোয়া। সুখে থাকার অমৃত-বচন। হায় জীবন -- হায় সময় -- হায় পরিবর্তন। সবকিছুই ঘুরপাক খায় বাতাসে -- কুণ্ডলী পাকায় এবং বামন-বর্তমান ছোবল মারে। যার সঙ্গে তিনি নানা বোধ মেলাতে পারেন না। এই বামন-বর্তমানে তিনি রোকেয়াকে দেখেন -- যে বাবার কাছে পরীক্ষার ফিসের টাকা চায়। তিনি প্রবল বিষণœতায় আক্রান্ত হয়ে পায়খানার দরজা খোলেন।
ছায়াঘেরা বাড়ির স্নিগ্ধ বাতাস গায়ে মেখে ভাবেন, রোকেয়া কীভাবে টাকা জোগাড় করল? ওর ভাইয়েরা ওকে টাকা দিতে পারেনি, এটা জানিয়েছে। দুই ছেলে শহরে থাকে। সামান্য আয়ের মানুষ ওরা। বোনকে সাহায্য করা ওদের সামর্থ্যে কুলোয় না। আরজ আলী কুয়ো থেকে পানি তুলে হাতমুখ ধুতে থাকেন। পানির স্পর্শ তাকে স্বস্তি দেয় না। তিনি মনে করেন তাঁর মাথা কেমন জানি করছে। নাকি মাথায় গোলমাল মনে হচ্ছে? রোকেয়া টাকা কীভাবে জোগাড় করল তা কি তিনি জানতে চাইবেন? নাকি কিছু জানায়নি দেখে তিনি নিজেও চুপ করে থাকবেন? কি কারো কাছ থেকে ধার করেছে? যদি ধার করে থাকে তাহলেতো সে টাকা ফেরত দিতে হবে। এই টাকাই বা তিনি কোথায় পাবেন। তাঁর এক মাসের বেতনের সমান টাকা।
তখন জোহরা গামছা নিয়ে এসে পাশে দাঁড়ায়। পানির বালতি তাঁর কাছে থেকে সরিয়ে দিয়ে বলে, ভাইজান উঠেন। সকালবেলা এতক্ষণ পানি ঘাঁটলে ঠান্ডা লাগবে ভাইজান। অসুখ করবে।
অসুখ! আরজ আলী বোনের দিকে তাকান। আমার অনেক দিন অসুখ করে না রে জোহরা। যে কয়দিন বাঁচব, অসুখ ছাড়াই বোধ হয় বাঁচব।
সেটাতো খুব খুশির কথা। আপনি এখন উঠেন।
তিনি উঠতে উঠতে বলেন, আমার রোকেয়া যে কেমন করে এত মেধাবী হলো তা আমি বুঝি না রে জোহরা। ভালো রেজাল্ট করেছে বলইতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যেতে পেরেছে।
রোকেয়া বাপের মেয়ে হয়েছে ভাইজান। আপনিওতো ম্যাট্রিকে খুব ভালো রেজাল্ট করেছিলেন। মনে আছে, বাজান আশপাশের কত মানুষকে মিষ্টি খাইয়ে ছিলেন। বাবার সেই খুশি-মুখ এখনো আমার মনে পড়ে। মানুষকে ডেকে ডেকে একবারের জায়গায় দুবার আপনার রেজাল্টের কথা বলতেন। মনে আছে ভাইজান?
আরজ আলী গামছায় মুখ মোছেন। জোহরার কথার উত্তর দেন না। ভাবেন, ওর সঙ্গে খুশি ভাগাভাগি করার সময় এটা নয়। এই বামন-সময় ওর কাছে কোনো আনন্দ বয়ে আনে না। জোহরাকে পাশ কাটিয়ে বারান্দায় ওঠে। ঘরে ঢুকে আয়নায় মুখ দেখে। মাথা আঁচড়ায়। তারপরে গেঞ্জি গায়ে দিয়ে বেরিয়ে আসে। জোহরা বারান্দায় মাদুর বিছিয়ে খাওয়ার আয়োজন করেছে। মেয়েরা ভাতের থালা, পানির গ্লাস নিয়ে আসে। মাদুরের পাশে বসে। ছোট একটি গামলায় পানি দিয়ে বলে, মামা হাত ধুয়ে নেন।

আরজ আলী পানিতে হাত ডোবান। দুধ-ভাত মাখিয়ে খেতে শুরু করলে জোহরা এসে সামনে বসে। তিনি এক লোকমা মুখে পুরে বলেন, তুই খাবি না রে?
খাব। একটুপরে খাই ভাইজান? আপনার খাওয়া শেষ হলে?
আচ্ছা খা। কিন্তু কি দিয়ে খাবি?
রাতের তরকারি আছে। যা আছে তা দিয়ে আমার হয়ে যাবে।
মনে আছে জোহরা তুই আর আমি ছোটবেলায় পান্তা ভাত পোড়ামরিচ দিয়ে মাখিয়ে ঝাল করে ফেলতাম। ঝালে আমাদের জিভ পুড়ে যেত। তারপরও আমরা ভীষণ মজা পেতাম সেই ভাত খেতে।
জোহরা  মিনমিনে স্বরে বলে, বাবা আমাদের বলতেন, তোরা এমন হাসাহাসি করে ভাত খাস না রে। আমরা হাসতে হাসতে বলতাম, তাহলে কী হবে বাজান? বাজান বলতেন, তাহলে তোদের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যাবে। জোহরা কথা থামিয়ে আঁচলে চোখ মোছে। বলে, তারপর কত বছর চলে গেছে। আমার সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরিয়েছে ভাইজান। জোহরা গুনগুন করে কাঁদে। তার দুই মেয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। আরজ আলী মাথা নিচু করে ভাত খায়। দুধ-ভাত খেতে তার বেশ লাগে। তার মেয়ে রোকেয়া তার দুধ-ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। যে মেয়ে বাবার মুখে দামী খাবার তুলে দিতে পারে সে তো যোগ্য মেয়ে। বাহবা পাওয়ার উপযোগী। কিন্তু পরীক্ষার ফিস দেয়ার জন্য কত টাকা ধার করল? আরজ আলী থালার কিনারে মুখ লাগিয়ে অবশিষ্ট দুধটুকু একটানে পান করেন। ভাবেন, এক জীবনে বেঁচে থাকা সার্থক হলো বুঝি!
ভাতের থালা নামিয়ে রাখলে জোহরার বড় মেয়ে হাত ধোওয়ার জন্য পানিসহ গামলা এগিয়ে দেয়। আরজ আলী পানিতে হাত ডোবান। আঙুল ধুয়ে ফেলেন। আঙুলের গায়ে লেগে থাকে দুধের গন্ধ। দুই মেয়ে থালা-গ্লাস তুলে নিয়ে চলে যায়। জোহরা বলে, ভাইজান আমার দুই মেয়ে ঢাকায় গিয়ে গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করতে চায়।
আরজ আলী চমকে তাকান। জোহরার হাত ধরে বলেন, বলিস কি? ঢাকায় গিয়ে কাজ করবে মেয়েরা? রোকেয়া না বলেছে ওদের কলেজে পড়াবে?
তাতো পড়াবে বলেছে। কিন্তু তার আগে রোকেয়া নিজে পরীক্ষা দেবে। পরীক্ষার রেজাল্ট হবে। চাকরি পাবে। তারপর তো। ততদিন বসে থেকে কি করবে? আমিও চাই ওরা কিছু উপার্জন করুক। নিজেরা করে খেতে শিখুক।
আরজ আলী চুপ করে থাকেন। কিছু বলার জন্য সময় নেন। সময় চলে যায়, কিন্তু কিছু বলা হয় না। পুরো বিষয়টি খুব জটিল। তার দুই ছেলে শহরে থাকে। ওরা ভালো নেই। একজন মোটর গ্যারেজে কাজ করে। ড্রাইভার হওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যজন বইয়ের প্রকাশকের বাঁধাইখানায় কাজ করে। নিজেদেরই চলে না। ছেলেটি কম্পিউটার শিখছে। বইয়ের পান্ডুলিপি টাইপ করার কাজ করবে। বাবাকে লিখেছে, এই কাজ শিখে আমি বাড়িতে চলে আসব আব্বা। মনে করেন আমাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ আসবে। আমি বাড়িতে বসে পাণ্ডুলিপি কম্পোজ করে ঢাকায় পাঠাব। একইসঙ্গে আমার বই পড়ার কাজও হবে। আমি বই পড়তে ভালোবাসি। তারপর আস্তে আস্তে গ্রামের ছেলেমেয়েদের কম্পিউটার শেখানোর ব্যবস্থা করব। আপনি পেনশন পেলে আমাকে একটি কম্পিউটার কিনে দেবেন। আমার মনে হয় ততদিনে আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাবে। আপনার কি মনে হয় আব্বা?
আরজ আলী ছেলের চিঠির উত্তর দেননি। তিনি তো জানেন না কবে তাঁর গ্রামে বিদ্যুৎ আসবে।
জোহরা ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, আপনি তো আমার মেয়েদের কাজ করার ব্যাপারে কিছু বললেন না ভাইজান?
তোমাকে আমি একটি গল্প বলি --
আপনার কাছে আমি ওই গল্প শতবার শুনেছি ভাইজান। একজন স্কুল মাস্টারের বেতন ইন্সপেক্টরের কুকুরের এক পায়ের সমান, এই গল্পটাতো?
হ্যাঁ, এই গল্পটাই। সেজন্য তোমার মেয়েরা ঢাকা শহরে যাবে। কুকুরের এক পায়ের সমান বেতন দিয়ে মাস্টার কিছু করতে পারে না। ওদেরতো যেতেই হবে। আমি আর কি করব ওদের জন্য। আমার সাধ্যই বা কি!
তাহলে আমি নাসের আর খলিলকে বলি আমার মেয়েদের জন্য গার্মেন্স কারখানায় কাজ দেখতে?
হ্যাঁ, বল, বল। ভালোইতো।
জোহরার মনে হয় ভাইজানের কণ্ঠস্বর খানিকটুকু অন্যরকম শোনাচ্ছে। চেহারাও রুক্ষ দেখাচ্ছে। জোহরার দিকে তাকিয়ে আরজ আলী মাতুব্বর বলেন, তুমি কি বলতে পার আমাদের এই গ্রামে কবে বিদ্যুৎ আসবে জোহরা?
বিদ্যুৎ? কি বলেন ভাইজান, আমাদের গ্রামে তো কখনোই বিদ্যুৎ আসবে না।
কখনোই না? তুমি একটা বোকা-গাধা। একদিন না একদিন তো এখানে বিদ্যুৎ আসবে।
সে হাজার বছর লাগবে। আপনার এত আশা করা ঠিক না। বিদ্যুৎ নাই আমরাতো শান্তিতেই আছি।
কিন্তু আমার ছেলে খলিল আমার পেনশনের টাকা থেকে কম্পিউটার কেনার আবদার করেছে। এই বাড়িতে বসে ছেলেমেয়েদের কম্পিউটার শেখাবে। সেজন্য ওর বিদ্যুৎ দরকার।
রহিমা আর খালেদাকে ডেকে দিচ্ছি ভাইজান। আপনি ওদের সঙ্গে কথা বলেন। অন্য গল্প করেন।
না, ওদেরকে ডাকতে হবে না। আমি বাজারে যাই। কই মাছ কিনে আনি। রহিমা আর খালেদার জন্য কি কিনব --
না, না ওদের জন্য কিছু লাগবে না। আপনাকে আমি ফতুয়া এনে দিচ্ছি।
দাঁড়া জোহরা। তুই কি মনে করিস আমাদের জীবনে বিদ্যুৎ কুকুরের এক ঠ্যাংয়ের গল্প?
আহ্ ভাইজান, কেন বিদ্যুৎ আপনার মাথায় ঢুকেছে? এসব ভাবার দরকার কি?
বিদ্যুৎ না পেলেতো ছেলেটা এই ভিটেয় আসবে না। ঢাকা শহরের তেলেজলে নাকানি-চুবানি খাবে।
ঠিকই আসবে ভাইজান। ভিটেমাটিতে এসে কৃষি কাজ করবে।
ওহ তাই -- আরজ আলী মাতুব্বর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন। ভাবেন, জোহরা খুব ভালো মেয়ে। এমন ভালো মেয়ের ভাগ্যে বৈধব্য থাকবে কেন? রোকেয়ার ভাগ্য কেমন হবে? রোকেয়াও খুব ভালো মেয়ে। আল্লাহ যেন ওকে শান্তির জীবন দেয়। জোহরার কাছ থেকে ফতুয়া নিয়ে গায়ে দেয়ার সময় জোহরা আবার বলে, আপনি কিন্তু দুইটা কৈ মাছ কিনবেন ভাইজান। আমি আমাদের জন্য কুচোচিংড়ির ভর্তা বানাবো।
আমিও ভর্তা খাবো। কৈ মাছ কিনব না। যাই রে। শোন, কুচোচিংড়ির ভর্তায় বেশি করে ঝাল দিস।

---------------
দ্বিতীয় পর্বের লিঙ্ক




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন