শুক্রবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৩

কাতাইবুড়ির থান

রূপঙ্কর সরকার
ছায়া ঘনাইছে বনে বনে, গগনে গগনে ডাকে দেয়া।
কবে নবঘন-বরিষনে গোপনে গোপনে এলি কেয়া ॥
পুরবে নীরব ইশারাতে একদা নিদ্রাহীন রাতে
হাওয়াতে কী পথে দিলি খেয়া--
আষাঢ়ের খেয়ালের কোন্‌ খেয়া ॥
যে মধু হৃদয়ে ছিল মাখা কাঁটাতে কী ভয়ে দিলি ঢাকা।
বুঝি এলি যার অভিসারে মনে মনে দেখা হল তারে,
আড়ালে আড়ালে দেয়া-নেয়া--
আপনায় লুকায়ে দেয়া-নেয়া ॥

এই বাবলি শোন, একটা দারুণ পাখি, দেখে যা –।
বাবলি বলল, দাঁড়া, আমার লেন্সের ওপর কী একটা পড়ল, ঝামেলা হয়ে গেল তো – ।
টিপু বলল, আয় না, লেন্স ফেন্স হবেখন। কী দারুণ পাখি। 

বাবলি ঝোপ ঝাড় মাড়িয়ে এল, কই কোথায় ? 
টিপু গলা জড়িয়ে ওপর দিকে আঙুল তোলে, ঐত্তো, ওই যে, দ্যাখ –।
 বাবলি বলল, টিপু, গলা জড়িয়েছিস ঠিক আছে, কিন্তু হাতটা সরা। আই ডোন্ট লাইক ইট। 
টিপু স্মার্ট হবার চেষ্টা করল, আচ্ছা ঠিক আছে, ইট’স অল রাইট, আই থিঙ্ক ইট’স বৌ কথা কও, তাইনা ? 
বাবলি বলল, না, ইট’স নট অল রাইট, ঠিক নেই। দিস ইস দা লাস্ট টাইম আই অ্যাম পোলাইটলি ওয়ার্নিং ইউ। 

নাগেশ আসছে লাফাতে লাফাতে, আরে তু লোগ ঝগড় কিঁউ রহা হ্যায় রে, আখির মামলা কেয়া হ্যায় ? মুঝে তো এক ভি চিড়িয়া নজর নেই আ রহা, ফালতু প্লেস ইয়ার। 
বাবলি বলল, অ্যাই ছেলে, তুই বাংলায় কথা বল, এটা বাংলাদেশ, তা জানিস? 
নাগেশ বলল, সিরিয়াস? আমি তো জানতাম বাংলাদেশ কহিঁ অওর, দুসরা কান্ট্রি হ্যায় ইয়ার। বাবলি বলল, সে বাংলাদশ নয়, আরে ভাই ইন্ডিয়াতে বাংলা বলে যে দেশটা আছে তাকে বলবেটা কী লোকে? 
নাগেশ বলল, ভাই, দেশ নহীঁ ইসকো প্রদেশ বোলা যাতা। আরে চল চল, ওয়াপিস চল। এক বজনে চলা। বড়ি ভুখ লাগি ইয়ার।


মেয়েটা দেখতে দারুন, ভাবছিল বাবলি। আমি ছেলে হলে এর প্রেমে নির্ঘাত পড়তাম, চামড়ার ওপরে কেউ যেন বার্নিশ করেছে। আর কি একখানা কোমর, ওয়াও! এমন কোমর যদি আমার হ’ত। বাবলি বলল, অ্যাই শোন, তোর নাম কী রে? তারপরই সামলে নিয়ে বলল, সরি ভাই, তোমার নাম কী ? 
মেয়েটা বলল, ঠিক আছে দিদি, আমাকে তুই বললে অসুবিধে নেই। আমার নাম ফুলমণি, ফুলমণি হেমব্রম। 
বাবলি বলল, তুমি এখানে কী কর? 
ফুলমণি বলল, আমি বাংলোটা সামলাই, কেয়ারটেকার বলতে পারেন। আসলে আমার বাবা কেয়ারটেকার বাবার অনেক বয়েস, চোখেও খুব কম দেখে।
বাবলি বলল, তোমার দাদা টাদা নেই? মেয়েদের পক্ষে ।
ফুলমণি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ছিল- আচ্ছা দিদি আর তো চা খাবেন না, এবার খাবার লাগাই ? 
বাবলি বলল, কী খাওয়াবে তুমি? 
মেয়েটা বলল, ভাত, ডাল, ডিমের কারি আর এখানে একটা পাতা হয়, বেসন দিয়ে ভেজে দিচ্ছি, ভাল লাগবে দেখবেন। আগে বলা থাকলে মুর্গি মারতাম। রাত্তিরে চিকেন করব দিদি। যান চান করে আসুন।

সুবিনয় কাগজ পড়ে মাটিতে বসে। কাগজটা বেশ ভাল করে ছড়িয়ে না পাতলে ঠিক যুত হয়না। আর তার কাগজ পড়তে কতক্ষণ লাগবে, ভাটপাড়ার কোনও জ্যোতিষিও বলতে পারবেনা। আজ ঈদের ছুটি। তার মানে কাগজ শেষ হতে হতে বিকেল গড়িয়ে যেতে পারে। মাঝখানে অনুপান হিসেবে আঠারো উনিশ কাপ চা না হলে কাগজের সব খবর ঠিক ভাল করে মুখস্তও হয়না। সে হাঁক পাড়তে যাচ্ছিল, ইয়ে শুনছ – হঠাৎ দেখল, আলুথালু বেশে ছুটে আসছে ইন্দিরা। সুবিনয়ের পায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সে, ওগো আমায় ঠাস ঠাস করে চড় মারো। খুব জোরে জোরে মারো। মহা পাপ করেছি। মারতে মারতে মেরে ফেল আমায়, মারো, মারো, বলে সুবিনয়ের হাতটা টেনে নিজের গালে ঠোকে ইন্দিরা। খানিকটা হকচকিয়ে গেছিল বটে সুবিনয়, তবে এ জিনিষ নতুন নয়, বলল, ও আজ আবার তোমার দৃষ্টির বান খেয়ে কোনও বাচ্চার হাত থেকে জিলিপি পড়ে গেছে ? 
ইন্দিরা ডুকরে কেঁদে উঠল, না না, ওগো আমি মহাপাতিকা, আজ বাচ্চাই পড়ে গেছেসুবিনয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ওঃ ভগবান-

ইমরান বলল, এটা স্কিটসোফ্রেনিয়ার দিকে যাচ্ছে বুঝলি, যত দিন যাবে আরও বাড়বে। আসলে কেসটা কী হয়েছিল ? সুবিনয় বলল, আর বলিসনা। আমাদের বাড়ির উল্টোদিকে, একটা দেড়তলা বাড়ি আছে, বহু লোক বাড়িটাতে, সারাদিন ক্যাচর ম্যাচর– তো সেই বাড়ির ছাদে এক মহিলা নিকজের বাচ্চাকে দাঁত কেলিয়ে একবার করে ছুঁড়ে দিচ্ছে, আবার লুফে নিচ্ছে। দাঁত ক্যালানে কিনা তুই বল- বাচ্চা পড়ে যাবেনা? 
ইমরান হেসে বলল, কী ক্যালানে জানিনা, তবে অনেকেই এমন করে। শফি যখন ছোট ছিল , আমিও করতাম। সুবিনয় খানিক দমে গিয়ে বলল, যাই হোক, বাচ্চাটা পড়ে গেছে। 
ইমরান বলল, সব্বোনাশ, একদম নীচে ? 
সুবিনয় বলল, আরে না না, ওই মহিলার পায়ের কাছেই।  
ইমরান বলল, তাহলেও ফেটাল হতে পারে। 
সুবিনয় বলল, না , হয়নি। মহিলা পড়ার সময়ে ধরতে গেছিল, তার হাতে, গায়ে, বার দুয়েক লেগে গড়িয়ে গেছে। এবার তোর ভাবির ধারণা, ও দেখছিল বলেই পড়েছে। এবার কী বলবি বল . 
ইমরান বলল, হুম, নিজের বাচ্চা নেই বলে- আচ্ছা, তোরা তো আইভিএফ, টাইভিএফ সব ট্রাই করেছিস, সারোগেসি তে যাচ্ছিসনা কেন, আজকাল কোলকাতায় খুব ভাল হচ্ছে। আমার খালাই অরগানাইজ করেন, ডাঃ জাহানারা খাতুন। চেষ্টা করবি? 
সুবিনয় বলল, সারোগেসিতে আট নয় লাখ টাকা লাগে। খবর নিইনি ভাবছিস, টাকাটা কে দেবে, তুই ?

লাল মাটির দেশ, সাল মহুয়ার জঙ্গল। অনেকে আজকাল ‘মহুল’ বলেন। আমরা সেকেলে নামটাই রাখছি। দূরে কয়েকটা পাহাড় দেখা যাচ্ছে। খুব উঁচু নয়, তবে অনেকটা ছড়ানো। পাহাড় ভর্তি ঘন গাছের সারি। বুনো বুনো গন্ধ আসছে, গন্ধটা বিকেলের দিকে একটু যেন বেড়ে যায়। সন্ধে হয়নি বটে তবে আকাশে লাল রঙ ধরতে শুরু করেছে। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রাঙামাটির পথএখানে এখনও গরুর গাড়ি চলে, একটা গেল এইমাত্র। তবে তার যাওয়া দেখে মনে হল, যাওয়ার ইচ্ছে একদম ছিলনামাঝে মাঝে একটা হট্টিটি ডেকে উঠছে, হাওয়া দিলে শালের পাতায় পাতায় লেগে খস খস আওয়াজ হয়। এই সময় যত নীরস লোক হোকনা কেন, মন উদাস হবেইবারান্দার কাঠের রেলিং, তাতে ঠেস দিয়ে নাগেশ গাইছে, ছায়া ঘনাইছে বনে বনে – বেতের চেয়ার, বেতের টেবিল, তার ওপরে বিয়ারের বোতল, দুটো গ্লাস, একটাতে একটু বিয়ার রয়ে গেছে। আলুভাজা তোলার চামচটা দিয়ে বাবলি গেলাসের ওপর টিং করে মারছে গানের এক এক কলির পর, আন্দাজেই মারছে, কেননা তার চোখ বন্ধ। ফুলমনি পাশে দাঁড়িয়ে আছে চুপটি করে। বারান্দাটা পশ্চিমের দিকে মুখ করা। পূব দিকটা বাংলোর পেছনে, এখান থেকে দেখা যায়না, সেখানে কালো মেঘ জমছিল। নাগেশ যখন গাইল, - গগনে গগনে ডাকে দেয়া– পূব দিকের আকাশে গুম গুম করে আওয়াজ হ’ল। 
নাগেশ বলল, ওহ্‌ খুব জমেগা আজ রাত কো। আরে টিপু নহী দিখ রহা? 
বাবলি বলল, তাতে তোর খুব দুঃখ হচ্ছে, নারে?

ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমে গেল। হাজার হাজার শালগাছের লক্ষ লক্ষ পাতার ওপর ঝরঝর করে জল পড়ছে, সে আওয়াজ না শুনলে বোঝা যাবেনা। ফুলমনি বাবলির কানের কাছে মুখ নামিয়ে এনে বলল, দিদি, গ্লাসগুলো নিয়ে যাব? 
বাবলি চমকে বলল, ওমা, তুমি এই জন্য এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলে? ছি ছি, বলবে তো। 
ফুলমনি বলল, না, আপনি বাজাচ্ছিলেন, তাছাড়া আমি গানও শুনছিলাম, দাদা খুব ভাল গান করেনউনি বোধহয় বাঙালি নন, তাও।
নাগেশ বলল, আমি কিন্তু লজ্জা পাচ্ছি। আচ্ছা ম্যাডাম, আপ হমারে টিপু সাব কো দেখে হ্যাঁয়? লাঞ্চ কে বাদ সে গায়ব? ফুলমনি উত্তর না দিয়ে চলে গেল। বাবলি ভাবল ব্যাপারটা কীরকম হ’ল? মেয়েটা তো এরকম নয়?

আজ ইমরানের দিদি এসেছেন, সানজিদা। বললেন, অ্যাই সুবি, বৌটাকে একটু বেড়িয়ে নিয়ে আয়না। বেচারা বদ্ধ জায়গায় থেকে থেকে আরও পাগল হচ্ছে। তোর তো অফিস গেলেও হয়, না গেলেও হয়। 
সুবিনয় বলল, ইল্লি আর কি, সরকার মুখ দেখে মাইনে দেবে। 
সানজিদা বললেন, থাম, তোর সরকারের গপ্পো অন্য জায়গায় করিস। অ্যাই শোননা, দারুন একটা জায়গা আছে, জানিস, ঐ মেদিনীপুরে, শিলাবতী নদীর ধারে, শিশম্‌বনি। যাবি ওখানে ? আমরা এই ক’দিন আগে ঘুরে এলাম।  ইমরানও বৌ ছেলে নিয়ে গেছিল। দারুন জায়গা, বিউটিফুল। মাঝখানে মাওয়িস্ট প্রবলেমের জন্য লোকে যাচ্ছিলনা, এখন সব ঠান্ডা। 
সুবিনয় বলল, ধুস্‌ ভারতবর্ষে বেড়াবার আর জায়গা নেই ? শেষে মেদিনীপুর ? 
সানজিদা রেগে গেলেন, তুই তো কত ভারত ভ্রমণ করিস, তা আমার জানা আছে। বৌটাকে তো পিষে মারছিস। ভাল কথা বললাম, একটু ঘুরিয়ে নিয়ে আয়। জায়গাটার নাম খুব বেশি লোক শোনেনি বলে ভীড় হয়না। লোকে বলে বার্ডার্স প্যারাডাইস, কতরকম যে পাখি। খালি বার্ড ফোটোগ্রাফাররা যায় ওখানে। 
সুবিনয় বলল, নাঃ আমি ভাবছি একবার গ্যাংটক যাব। ইন্দিরা চলে এসেছে, কেন যাবেনা তুমি? গ্যাংটক ফ্যাংটক তোমার পঞ্চবার্ষিকি পরিকল্পনা, কোনওদিনই টাকার যোগাড় করতে পারবেনা। এটা হাতের কাছে দিদি বলছেন, খরচও তেমন হবেনা চলোনা, তোমায় যেতেই হবে।

সুবিনয় বলল, ধুস কী যাব শালবনি, শিশমবনি – ও আমি জানি, আমার যাওয়া আছে। 
ইন্দিরা বলল, তোমার যাওয়া? কই কোনও দিন বলনি তো ? 
সুবিনয় বলল, জীবনের সব কথা তোমায় বলে ফেলেছি? আমি ট্রামে কাটা পড়তে পড়তে একটুর জন্য বেঁচেছি তুমি জান? 
সানজিদা বললেন, ও, তাই তুই জীবনানন্দের মত লিখতিস। 
সুবিনয় বলল, ইয়ার্কি মেরোনা দিদি, এটা এমন কোনও ব্যাপার নয় যে ঢাক পিটিয়ে বলতে হবে। তাছাড়া-- 

সানজিদা বললেন। দাঁড়া, তোদের যেতে বলার আর একটা কারনও আছে। তুই নাকি ঘুরে এসেছিস, তা ওখানে কাতাই বুড়ির থান আছে জানতিস ? দ্যাখ, আমি মুসলমান, আমাদের ওসব থান ফান একদম চলেনা। কিন্তু ওখানকার লোক খুব মানে। বলে কাতাই বুড়ির কাছে যা চাওয়া যায়, চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে পাওয়া যায়। সেই জন্যই বলা। 
ইন্দিরা চেপে ধরল, চলনা গো। তোমায় যেতেই হবে। আমি কাতাই বুড়ির থানে মানত করবই। 
সুবিনয় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আর চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে তোমার কোলে ছেলে উঠবে – পাগল আর কাকে বলে। আমি বলছি আমার যাওয়া জায়গা, কিস্যু নেই ওখানে, যত্ত সব।
 ইন্দিরা বলল, দিদি, আমায় ডিরেকশনটা দিন তো, আমি একাই যাব।

ভোর হচ্ছে, শালগাছগুলো কাল রাতে চান টান করে একেবারে ফ্রেশ, ঝলমল করছে। বাবলি কাল রাতেই গরম জল আনিয়ে চান সেরে রেখেছে। আজ একটু পরেই বেরোতে হবে। নাগেশ ব্যাটা  কুঁকড়ে মুকড়ে এমন ঘুমোচ্ছে, দেখলেই হাসি পায়। টিপু রাতে ফেরেনি। কোথায় আছে বা ছিল জানার কোনও ইন্টারেস্ট নেই বাবলির। নাগেশ কাল অনেক রাতে একটা ফোন করে জেনেছে যে সে বেঁচে আছে, আর কেউ তাকে কিডন্যাপ করেনিবাবলি বেতের টেবিলটার ওপর লেন্সগুলো গোচ্ছাচ্ছিল। ফুলমনি এল, দিদি চা দিই?  
বাবলি হেসে বলল, দাও। তোমায় না, যত দেখছি, আমি তোমার প্রেমে পড়ছি। ঈস্‌ যদি ছেলে হয়ে জন্মাতাম- 
ফুলমনি ম্লান হাসল, কেন দিদি, আমার মধ্যে কী পেলেন ? 
বাবলি বলল, তোমার চামড়া, তোমার কোমর, তোমার চুল – আহা এমন একখানা বেণী থাকলে – 
ফুলমনি বলল, আপনারও হবে। আপনার চুলও খুব শক্ত। বাঁধেন না তাই – দাঁড়ান আমি চা নিয়ে এসে বেঁধে দিচ্ছি। আমার কাছে হাড়ের চিরুণী আছে, ভাল করে ধুয়ে আনি। 
বাবলি বলল, অ্যাই শোন, তুমি আমায় আপনি আপনি করবেনা মোটে। মেয়েদের বয়স জানতে নেই, তবে মনে হয় তুমি আমারই বয়সী। 
ফুলমনি আবার ম্লান হাসল, বন্ধুত্ব পাতিয়ে আর কী হবে, সেই তো কাল চলে যাবেন- 
বাবলি তার গলা জড়িয়ে ধরল, যাবেন না, যাবে। গেলে কী হবে, তোমায় মনে রাখব সারাজীবন।
 ম্লান হাসিটা তৃতীয়বার হাসল ফুলমনি, সবাই অমন বলে। যাক, চা নিয়ে আসি।

বাবলি্র জিন্‌স জোড়া খুব টাইট নয়, পা মুড়ে বসেছে মাটিতে। পেছনে ফুলমনি বজ্রাসনে বসে বাবলির চুল নিয়ে যুদ্ধ করছে। সে বলল, আচ্ছা ওই দাদাটা কে? তোমার ইয়ে? 
বাবলি বলল, ধুস্‌ ওটা একটা ছাগল। ওকে আনার কোনও প্ল্যানও ছিলনা। শুধু নাগেশকে নিয়ে একা আসব, আফটার অল আমাদের সমাজ এখনও- আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করি, তুমি তো দেখছি বেশ আমার মত বাংলা বলছ, তোমার এই রকম বলার কথা না
 – এ দিদি, ইটা তুর মরদ আছে লাকি রে -? ফুলমনি খিলখিল করে হেসে উঠল, অনেকটা তুলেছ। এমন ভাষা  মা, দিদিমারা বলত। এখনকার ছেলে মেয়েরা ইস্কুলে যাচ্ছে, রেগুলার বাঙালিদের সঙ্গে মিশছে – 
বাবলি বলল, তুমিও পড়েছ? 
ফুলমনি বলল, ঐ সেকেন্ডারি অবধি। ইস্কুলটা অনেক দূর সাত আট মাইল সাইকেল চালিয়ে – তা ছাড়া পয়সা কড়িরও সমস্যা ছিল। আচ্ছা, লোকটা ভাল নয় না? আমি ভাবলাম তোমার ছেলে বন্ধু। আর ফিরছে না দেখে খুব ভয়ে ভয়ে ছিলাম। 
বাবলি বলল, কিসের ভয় ? 
ফুলমনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, কাল কিচেনে এসে আমার জামার মধ্যে হাত ঢুকিয়েছিল। ঠাস করে এক চড় মেরেছি। তারপর – 
বাবলি হাত বাড়িয়ে বলল, হাত মেলাও বন্ধু – আমারও মারার ইচ্ছে ছিল। তুমিই আমার কাজটা করে দিলে।

ফুলমনি বলল, তোমার ছেলে বন্ধু নেই ? 
বাবলি বলল, থাকবেনা কেন, অনেক আছে। এই তো নাগেশই আছে, তবে ও আমার ছোট ভাই। তুমি যা বলতে চাইছ, তেমন কেউ নেই। 
ফুলমনি বলল, তোমরা শহরে থাক, কত পড়াশোনা করেছ, একটা ভাল ছেলে পেলেনা? 
বাবলি এবার ফুলমনির মত হাসল। ছেলে পাবনা কেন, কয়েক হাজার পেয়েছি কিন্তু কাউকে মনে ধরেনা গো - জীবনটা এমনি কেটে যাবে। বলে একটা বিরাট দীর্ঘশ্বাস ফেলল। 
ফুলমনি বাবলির কাঁধে হাত রাখল, আমার একটা কথা শুনবে দিদি? এখানে কাতাই বুড়ির থান আছে, বুড়ির কাছে যা চাইবে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে পাবে। যাবে দিদি ? টাকা পয়সা কিচ্ছু লাগেনা। শুধু একটা জবা ফুল, একটা লাল আলু আর একটা পুঁটি মাছ। যাবে দিদি ? 
বাবলি হা হা করে হেসে বলল, আমি  ঠাকুর দেবতা, ধম্মো কম্মো, কিছুই মানিনা গো, আমাদের রেজিস্টার্ড দেবতাদের কাছেই গেলামনা কোনও দিন, তো – 
ফুলমনি বলল, এরা ঠাকুর নয় গো, কোনও পুরুত এসে মন্তর পড়েনা। এরা আমাদের জঙ্গলের মানুষের ভরসা। একবার চলনা দিদি, আমি তোমায় ভালবেসে ফেলেছি বলে এত জোর করছি।

বাবলি বলল, এত জোর তোমার কাতাই বুড়ির ? তো তুমি কিছু চাওনা কেন ? তোমার তো অনেক কিছুই চাওয়ার আছে। 
ফুলমনি বলল, তা আছে, কিন্তু লোভ করে কিছু চাইলে উল্টে ক্ষতি হয়ে যায়। বুড়ির কাছে যা তা চাইতে নেই। তবে আমি কাল একটা জিনিষ চেয়েছি।
 বাবলি চোখ ছোট করল, কী চেয়েছ তুমি ? 
ফুলমনি উঠে রেলিং-এর দিয়ে চলে গেল। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বলতে লাগল, সে অনেক দিনের কথা। তখন আমার বছর ষোল বয়স। একদিন সে এল, তিন বন্ধুর সঙ্গে। পাগল মানুষ, জান দিদি, সকালে উঠেই আমাদের বাড়ি চলে গেছে খুঁজে খুঁজে। বলে কিনা, খবরের কাগজ কই? আমি তো হেসে বাঁচিনা। বললাম, ও বাবু, জঙ্গলে তোমার কাগজ ছাপার যন্তর নেই।  কিন্তু তার চোখের দিকে তাকিয়ে কী সর্বনাশ হয়ে গেল কে জানে। সেদিন খুব ঝড়বৃষ্টি হচ্ছিল, ন’মাস পরে তন্ময় চোখ খুলে দুনিয়া দেখল। আমাদের মত নাম রাখিনি গো, তোমাদের শহরের নাম। তন্ময় ভাল নাম না? 
বাবলি চোখ বড় করে বলল, তারপর? 
–তারপর আর কী, তোমার মত সেও বলেছিল, তোমায় ভুলবনা, এটা, সেটা, আর কোনওদিন আসেনি। তন্ময়ের কথা জানেওনা সে। 
বাবলি বলল, স্যাড, তারপর তোমার কী হ’ল। 
ফুলমনি বলল, কী আর হবে, একটা বিয়ে হ’ল, বিয়ের সাত আট মাসের মধ্যে বরটাকে সাপে কাটল, ভাইটাকে মাওবাদী বলে মেরে দিল, এই আছি, আমি, বাবা আর তন্ময়। খালি ভাবি ওর তো সাত বছর বয়স হয়ে গেল, ইস্কুল তো সাত আট মাইল দূরে। ও অতদূর যেতে চায়না অথচ পড়ার খুব ইচ্ছে। কী করে মানুষ করি বলত? 
বাবলি খানিক চুপ থেকে বলল, কী চাইলে তুমি কাতাই বুড়ির কাছে? 
ফুলমনি বলল, কাল জবা আলু আর পুঁটি মাছ দিয়ে এসেছি। বলেছি একবারটি তাকে দেখাও। বড় মন কেমন করছে। বাংলোর পেছন দিকে গাড়ির আওয়াজ হ’ল। ফুলমনি বলল, যাই, কেউ আবার এল বোধহয়।

ইন্দিরা বলল, ও মেয়ে, তুমি বাংলা বোঝ ? 
ফুলমনি মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে ছিল, মাথা নেড়ে জানাল, হ্যাঁ।
 - আচ্ছা এখানে কাতাইবুড়ির থানটা কত দূরে গো ? আমায় একটু নিয়ে যাবে? তোমায় আমি পঞ্চাশ টাকা দেব। ফুলমনি বলল, চান করে নিন, থানে দিতে একটা জবা, একটা লাল আলু আর একটা পুঁটি মাছ লাগে। সেগুলোর জন্য দু তিন টাকা লাগবে। আমায় কিছু দিতে হবেনা। এই বাবলি দিদিও যাবেন। আমরা এক সঙ্গেই যাব।
বাবলি চান করে একটা লাল পেড়ে শাড়ি পরেছে। ওটা ফুলমনির। 
ইন্দিরা বলল, ওমা, তোমায় কী সুন্দর লাগছে গো, শাড়ি পরনা কেন? খুব সুন্দর মানায় তোমায়। 
নাগেশ বলল, এ, তু লোগ কহাঁ যা রহী হ্যায় রে? মেরা তো ছুট্টি গয়া দো দিন, বকোয়াস জগা হ্যায় ইয়ার, কোই চিড়িয়া মিড়িয়া নহী হ্যায় ইধর। 
বাবলি বলল, চুপ করবি, না কান মলা খাবি? যেতে হয় আমাদের সঙ্গে চল। না হলে পেছন উলটে ঘুমো।

জঙ্গলের মধ্যে পায়ে চলা পথ, মাঝে মাঝেই কাঁটায় শাড়ি আটকে যাচ্ছে। একটা ফটিকজল ডাকছিল, নাগেশ বলল, ইয়ে কেয়া হ্যায় রে? 
বাবলি বলল, ইন্ডিয়ান আইয়োরা। কভি সুনা ইসকি বোল ? শাড়িটা বোধহয় গেল। অন্য কোনও মেয়ে হলে বলতাম, আর একটা কেনার টাকা দিয়ে যাচ্ছি। তোমায় বলার সাহস নেই। 
ফুলমনি বলল, এমন সাহস যেন কোনও দিন না হয়। 

সে বলল, জান, বুড়িকে যে জবা, আলু আর মাছ দেয়া হয়, একঘন্টা পর এসে আর দেখতে পাবেনা। আলু আর মাছ, জানোয়ার আর পাখি বোধয় খেয়ে যায়, কিন্তু জবা টা – 
নাগেশ বলল, অগর ছুপকে দেখা যায়ে তো ? 
ফুলমনি বলল, ও দাদা, খবরদার এমন কোরনাযারা দেখতে গেছিল, হয় সাপে কেটেছে, নয় ভীষণ জ্বর এসে – আমার বরটাও তো – বলে চুপ করে গেল। 
একটা বাঁধানো চাতালের ওপর একটা মেটে লাল রঙের পাথর। তাতে অপটু হাতে চোখ মুখ আঁকা। চাতালটা খুব একটা ভাল অবস্থায় নেই, এক্ষুনি রিপেয়ার দরকার। তিন দিকে ঘন ফণীমনসার ঝোপ,  খোলা দিকটা দিয়ে ওরা ঢুকল। 
ফুলমনি বলল, জিনিষ গুলো রেখে, মনের কথা বলে, চলে আসুন। প্রণাম করার দরকার নেই। ইন্দিরা তবু ভক্তিভরে মাথা ঠুকলেন অনেক্ষণ, কী আশ্চর্য, বাবলিও একটা প্রণাম করে এল, নাগেশও। 
বাবলি বলল, তুই তো মাছ ফুল টুল দিসনি, কী চাইলি ?
 নাগেশ বলল, মেরে লিয়ে থোড়ি কুছ মাঙ্গা, ম্যায়নে বোলা, ইস পাগলি বাবলি কো এক আচ্ছা খাসা বয়ফ্রেন্ড লা দো। বুঢ়িয়া সুনেগি মেরি বাত, মুঝে ইয়েকীন হ্যায়। 
বাবলি এক চাঁটি লাগাল তার মাথায়।

দুটো গাড়ি এসেছে। আগেই বলা ছিল। জিনিষপত্র বাঁধা ছাঁদা হচ্ছে। ফুলমনি বারান্দার এক কোনে কাঠের থাম ধরে দাঁড়িয়ে। 
নাগেশ গিয়ে বলল, কী, মন খারাপ লাগছে ? 
ফুলমনি ঝাপসা চোখ অন্যদিকে রেখে বলল, মন খারাপ হবে কেন, আপনারা যাবেন, আবার পরের ছুটির দিনই অন্য লোক আসবে। তবে সবাই এক রকম নয়, এই আর কি। 
ইন্দিরা গিয়ে বলল, ভাই এটা রাখ, আমি দিদি হই। 
ফুলমনি নিতান্ত অনিচ্ছা সত্বেও একশ টাকার নোটটা নিল।
 বাবলি কাছের জঙ্গলে শেষবারের মত ঢুকলএকটা ব্লু নেকড বারবেট ডাকছে, এই ছবিটা পাব ? আমার দারুন পছন্দের পাখি। ওপরে চোখ, ফুলমনির শাড়িতে খোঁচা, তারপর গাছে ধাক্কা। 
--ওমা, গাছ তো নয়, মানুষ। হাসছে, – এমন ভাবে জঙ্গলে ঘুরলে, সিরিয়াস ইনজুরি হতে পারে। দাঁড়ান দেখি, কাটল কিনা। 
বাবলি বলল, আপনি কী করছেন জঙ্গলে? স্থানীয় বলে তো মনে হচ্ছেনা। 
তিনি বললেন, আপনি ছবি তোলেন, আমি আঁকি। তবে ইজেল নিয়ে ঘুরিনা। ভাল করে দেখে নিই, তারপর বাড়ি গিয়ে আঁকি। কাছাকাছিই থাকি, ঝাড়গ্রামে। আঃ, আবার অমন করে হাঁটে। চোখমুখ খোয়ানোর ইচ্ছে আছে নাকি? আগে কল টা ফলো করুন। এলাকাটা আন্দাজ করুন, তারপর পথ দেখে হাঁটুন। আপনাদের মত অ্যামেচারদের নিয়ে হয়েছে মুশকিল। 
বাবলি বলল, আপনি বুঝি প্রোফেশনাল ? মানুষটা দারুন একটা হাসি দিল। তা নয়, তবে এক্সপিরিয়েন্সড। 
বাবলি বলল, ফোন নাম্বার দিতে অসুবিধে আছে?  
মানুষ বলল, তা নেই, তবে আমি খুব সাধারণ লোক, স্কুল টীচার, আমাদের ফোন নাম্বারের খুব একটা চাহিদা নেই। বাবলি বলল, বাজে না বকে, দিন তো মশাই। আমার এক্ষুণি ডিপারচার, তা না হলে –

বাবলিদের একটা মোটে ব্যাকপ্যাক আর একটা করে ক্যামেরার ব্যাগ। ইন্দিরা সুবিনয়ের স্বভাবতই বেশি। ওরা গাড়ির ডিকিতে মাল ভরছে। একটা বাচ্চা এসে ইন্দিরার আঁচল ধরে টানে। বলে এই ব্যাগটা পড়ে ছিল। ইন্দিরা চমকে বলে ওমা, কী সুন্দর বাচ্চাটা, একেবারে তোমার মত মুখ। ইস এমন বাচ্চা যদি আমার হ’ত –
ফুলমনি এগিয়ে আসে। নিয়ে যান দিদি, আপনাদেরই বাচ্চা মনে করে। 
ইন্দিরা বলে যাঃ তাই কি হয়, কার না কার বাচ্চা – 
ফুলমনি বলে, আপনাদেরই ছেলে। ওর নাম তন্ময়। কী বাবা মাসির সঙ্গে যাবে? ইস্কুলে ভর্তি করে দেবে। আমি বলছি নিয়ে যান। ওর বড় পড়ার শখ। পড়াবেন নিশ্চয়ই, সুবিনয় আমতা আমতা করে, কিন্তু অ্যাডপশন ফরমালিটিস – নাগেশ এগিয়ে আসে। আইনতঃ সমস্যা আছে দাদা, কিন্তু হয়ে যাবে, আমার কার্ডটা রাখুন –

ওদের গাড়ি এগিয়ে যায়। বাবলিদের গাড়িও এঞ্জিন চালু করেছে। ফাঁকা বাংলোর বারান্দায় একটা একলা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে থাম ধরে। বাবলি ছুটে ফেরৎ আসে, ফুলি, কাতাইবুড়ি সবার কথা রাখল, তোমার কথা তো রাখলনা, চব্বিশ ঘন্টা তো পেরিয়ে গেছে। 
ফুলমনি বলে, কাতাইবুড়ির কথা ফলেনা, এমন কখনও হয়নি দিদি। আর হবেও না।

১৫/০৮/২০১৩




লেখক পরিচিতি

বয়স : ৬৫ বছর
প্রকাশিত বই :  ‘ধানাই পানাই’ ( প্রকাশ, জানুয়ারি, ২০১৩)
লেখক পরিচিতি :  প্রধাণতঃ নাট্যকার ও নির্দেশক। এখন শারীরিক কারণে 
                           নাটকের ধকল সহ্য হয়না বলে গল্প লিখছেন।





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন