রবিবার, ১১ মে, ২০১৪

গার্সিয়া মার্কেসের উপন্যাসের নায়ক

গার্সিয়া মার্কেসের উপন্যাসের নায়ক
ফয়জুল লতিফ চৌধুরী
মার্কেসের আবির্ভাবের সহিত বিশ্বসাহিত্যের মঞ্চে একটি পর্বান্তর ঘটিয়া ছিল। ইহা জাদু বাস্তবতা নহে। জাদু বাস্তবতা মার্কেসের উদ্ভাবন নহে, কিন্তু তিনি জাদু বাস্তবতাকে বিশেষ করিয়া নিজস্ব শৈলী হিসেবে গ্রহণ করিলেন। কার্যত তিনি তাহার নামটির সহিত 'জাদু বাস্তবতা' শব্দবন্ধটি সমীকরণে আবদ্ধ করিলেন এবং জাদু বাস্তবতার চৌহদ্দি টানিয়া অনেকখানি বড় করিয়া দিলেন। কথাসাহিত্য বাস্তবতাকে ভিত্তি করিয়াই রচিত হইবে, অথচ মার্কেস-যিনি কি-না আশৈশব সাংবাদিক-উপন্যাস রচনা করিতে গিয়া দেখাইলেন বাস্তবতার প্রয়োজন আছে বটে কিন্তু এই প্রয়োজন সীমিত রাখা যাইতে পারে।
বাস্তবতা কাহিনী শুরু করিয়া দিবে কিন্তু তাহার অর্থ এই নহে যে, লেখক ঘুরাইয়া-পেঁচাইয়া তাহার অভিজ্ঞতাকে পুনরুৎপাদন করিবেন এবং যতদূর সম্ভব অনুপুঙ্খ বর্ণনার জাল বিস্তার করিবেন। ইউনুস নবী (তাহার উপর শান্তি বর্ষিত হউক) তিরিশ বৎসর নিরুদ্দেশ থাকিয়া যেইদিন ঘরে ফিরিয়া স্ত্রীকে বলিলেন একটি তিমি মাছ তাহাকে গিলিয়া ফেলিয়াছিল এবং এতদিন তিনি ওই তিমিরই জঠরাভ্যন্তরে আটক ছিলেন, সেই দিন হইতে জগতে কথাসাহিত্যের সূত্রপাত হইয়াছে-এই ছিল মার্কেসের প্রত্যয়। সুতরাং হাড়েমজ্জায় সাংবাদিক হইলেও কোনো সমস্যার উদ্রেক হয় নাই। তিনি বিশদ করিয়া বলিতেছেন, সংবাদ প্রতিবেদনে অনেক ঘটনাসূত্রের মধ্যে কেবল একটি ভ্রান্ত হইলে যেন এক মণ গোদুগ্ধে এক বিন্দু চনা পড়িল; অন্যদিকে কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে অনেক ঘটনা পরম্পরার মধ্যে মাত্র একটি সত্য হইলেই পুরা রচনাটি বৈধতা লাভ করিল। তবে শর্ত আছে; শর্তটি হইল এই যে, লেখক ততক্ষণই যাহা খুশি লিখিতে পারিবেন যতক্ষণ পাঠক তাহা বিশ্বাস করিয়া সাদরে গ্রহণ করিবে। শৈশবে ঠাকুরমা মার্কেসকে অনেক অসম্ভব গল্পগাথা শুনাইতেন। ঠাকুরমা এমন কৌশলে ওইসব কাহিনী বয়ান করিতেন যে অবিশ্বাস করিবার সুযোগ থাকিত না।

মনে রাখিলে যে কোনো লেখক উপকৃত হইবেন যে, পৃথিবীর মানুষ গল্প শুনিতে ভালোবাসে; মানুষ গল্প শুনিতে চায় যদি তাহা অবিশ্বাস্যও হয়। এই স্বভাবের কারণে মানুষ নিজেই গল্প তৈরি করে; গল্প তৈরি হয় বাস্তবের সহিত কল্পিত ঘটনার মিশাল দিয়া। কীভাবে বাস্তবতার সহিত অকাতরে কল্পনা মিশিয়া যায় মার্কেস তাহার উদাহরণ দিয়াছেন। মার্কেস লিখিতেছেন, '১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ২৬ অক্টোবর দিনটি নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা-সংবাদে ঠাসা ছিল না। তাই প্রধান সম্পাদক মায়েস্তা ক্লেমেন্সে মানুয়েল সাবালা কয়েকটি গৎবাঁধা পরামর্শ আউড়ে সকালের মতো দিনকার বৈঠকের ইতি টানলেন। একজন সংবাদদাতার অপরিহার্য গুণাবলি কী সে ব্যাপারে হাতেখড়ি হয়েছিল আমার এ পত্রিকাতেই। কাউকেই বিশেষ কোনো কাজ ধরিয়ে দিলেন না তিনি। খানিক পরেই টেলিফোনে খবর এলো সুপ্রাচীন সান্তা ক্লারা কনভেন্টের সমাধিস্থল খনন করা হচ্ছে।' নিস্পৃহ কণ্ঠে তিনি আমাকে বললেন, 'ওখানটা একবার ঘুরে এসো, দ্যাখো যদি কিছু জুটে যায়।'

ক্লারিসিয় নান্দের এই ঐতিহাসিক কনভেন্টটি প্রায় শতাব্দীকাল আগেই হাসপাতালে রূপান্তর করা হইয়াছিল; হালে পাঁচ তারা হোটেল তৈরির জন্য বিক্রি করিয়া দেওয়া হইতেছে। ক্রমে-ক্রমে ছাদ ধসিয়া পড়িয়া অনিন্দ্যসুন্দর গির্জাটির ইট-পাথর নগ্ন করিয়া দিয়াছিল। তবে চিরনিদ্রায় শায়িত তিন যুগের বিশপ, পাদ্রি এবং অন্যান্য বিখ্যাত ব্যক্তি-মনীষীদের সমাধি তখন অবধি রহিয়া গিয়াছিল। প্রথম কাজ ভূগর্ভস্থ শবাধার খালি করা, কোনো দাবিদার পাওয়া গেলে তাহার নিকট দেহাবশেষ হস্তান্তর করা; নতুবা অবশিষ্ট সবকিছু একটি অভিন্ন কবরে আবার সমাধিস্থ করিয়া ফেলা। কাজটা এমন নিষ্ঠুরভাবে সারা হইতেছিল, যাহা প্রত্যক্ষ করিয়া মার্কেস স্তম্ভিত হইলেন। শ্রমিকরা শবাধার খনন করিতেছিল শাবল আর গাইতি চালাইয়া, টানিয়া-হিঁচড়াইয়া বাহির করিয়া আনিতেছিল জীর্ণ কফিনগুলো, যেগুলো কি-না সামান্য নড়াচড়াতেই চুর-চুর করিয়া ভাঙ্গিয়া পড়িতেছিল; আর ধুলার গাদা হইতে বাছিয়া হাড়-গোড়, কাপড়ের টুকরো-টাকরা, আর বিশুষ্ক কেশরাজি আলাদা করিয়া রাখা হইতেছিল। শবাধারস্থ ব্যক্তিটি কেউকেটা গোছের হইলে শ্রমিকদের কাজ হইত ক্লেশকর কেননা সেই ক্ষেত্রে দেহাবশেষ ভালোভাবে ঘাঁটিতে এবং সাবধানে ধুুুুলি-বালি নাড়িয়া-চাড়িয়া দেখিতে হইত যদি-বা মূল্যবান মনি-মুক্তো বা সোনাদানা কিছু পাওয়া যায়। শ্রমিক সর্দার একটি খাতায় সমাধিস্তম্ভ হইতে মৃত ব্যক্তির নাম-পরিচয় টুকিয়া রাখিতেছিল এবং এক-একটি কফিনের হাড়-গোড় সাজাইয়া রাখিতেছিল পৃথক পৃথক স্তূপে। আর যাহাতে গুলাইয়া না যায় তদুদ্দেশ্যে নাম লেখা কাগজ সাঁটিয়া স্তূপগুলো চিহ্নিত করিয়া রাখিতেছিল। অতঃপর মার্কেস লিখিতেছেন-

'মঠে ঢুকে প্রথমেই যা আমার দৃষ্টিগোচর হলো তা-হলো স্তূপাকৃতি হাড়-হাড্ডির দীর্ঘ এক সারি, যা ভাঙ্গা ছাদের ফোকর দিয়ে লাফিয়ে নামা অক্টোবরের ঝলসানো সূর্যের উত্তাপে তেতে আছে আর এক টুকরো কাগজে কাঠ-পেন্সিলে ঝটিতে লেখা নাম ছাড়া অন্য কোনো পরিচয় অবশিষ্ট নেই। সময়ের সর্বধ্বংসী প্রবহমানতার ভয়ঙ্কর ওই সাক্ষ্য আমার মধ্যে যে তোলপাড় তুলেছিল তার আলোড়ন আজও এই অর্ধশতাব্দী পরে আমি অনুভব করতে পারি।'

নজর করিয়া মার্কেস দেখিতে পাইলেন, আরও অনেকের মধ্যে সেইখানে রহিয়াছেন পেরুর একজন ভাইসরয় এবং তাহার গোপন প্রেয়সী; ওই অঞ্চলের বিশপ দন তোরিরিও দে কাসেরেস ই বির্তুদেস, মঠের কয়জন খাদেম যাহাদের মধ্যে ছিলেন মাতা হোসেফা মিরান্দা এবং ব্যাচেলর অব আর্টস ডিগ্রিধারী দন ক্রিস্তোবাল দে এরাসো যিনি জীবনের অর্ধেক সময় প্রকোষ্ঠখচিত ছাদ তৈরিতে ব্যয় করিয়াছেন। একটি শবাধারের ফলকে লেখা ছিল দ্বিতীয় মার্কিস দন ইগনাসিও দে আলফারো ই দুয়েনাস নাম। কিন্তু খননের পর দেখা গেল উহা সম্পূর্ণ ফাঁকা; শবাধারটি কখনোই ব্যবহার করা হয় নাই। তবে সংলগ্ন আরেকটি শবাধারেই ছিল অন্য মার্কিজদের সমাধি।

যেইখানে গসপেল রাখা হইত সেইখানকার উঁচু বেদিটির তৃতীয় ধাপের কুলুঙ্গিতে অপেক্ষা করিতেছিল প্রবল বিস্ময়। গাইতির একটি মাত্র আঘাতেই সমাধিফলক উড়িয়া গেল আর ঘোর তামাটে বর্ণ এক রাশি জীবন্ত চুল উপচাইয়া পড়িল। শ্রমিকদের লইয়া সর্দ্দার পুরা কেশরাজি বাহির করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। মনে হইল, যতই টানিয়া বাহির করা হইতেছিল কুলুঙ্গির অভ্যন্তরস্থ কেশরাশি ততই যেন দীর্ঘতর হইতেছিল। অবশেষ প্রত্যক্ষ হইল ওই কেশরাজির গোড়া যাহা তদাবধি এক তরুণীর করোটিতে সংলগ্ন রহিয়াছে। কয়েকটি বিচ্ছিন্ন হ্রস্বাকার হাড় ছাড়া শবাধারে আর কিছুই ছিল না। ক্ষয়ক্রমে সমাধিফলকে উৎকীর্ণ ছিল কেবল একটি ডাকনাম : 'সিয়ের্বা মারিয়া দে তোদাস লোস আনহেলেস', কোনো বংশউপাধি উলি্লখিত ছিল না। মেঝের ওপর সটান ছড়াইয়া দেওয়া হইলে মাপিয়া ওই উজ্জ্বল কুন্তলরাশির দৈর্ঘ্য পাওয়া গেল বাইশ মিটার এগারো সেন্টিমিটার। মার্কেসের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া নিরেটমুখো শ্রমিকসর্দার বিজ্ঞোচিৎ ভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করিল, 'মৃত্যুর পর মানুুষের চুলপ্রতি মাসে এক সেন্টিমিটার করে বৃদ্ধি পায়। সে হিসাবে বাইশ মিটার দৈর্ঘ্যটি দুইশত বৎসর সময়ের সঙ্গে হরে-দরে সঙ্গতিপূর্ণ।' মার্কেস বলিতেছেন, 'আমার কাছে ব্যাপারটা ও-রকম মামুলি কিছু মনে হলো না; কেননা ছেলেবেলায় ঠাকুরমা আমাকে একটি বারো বৎসর বয়সী মার্কিজের অলীক কাহিনী শুনিয়েছিলেন। ওই কিশোরী হেঁটে যাওয়ার সময় তার দীর্ঘ, দীর্ঘ কেশরাজি নবপরিণীতা বধূর পোশাকের প্রলম্বিত ঝুলের মতোই গড়িয়ে যেত। পাগলা কুকুরের কামড়ে জলাতঙ্ক হয়ে সে মারা যায়। আর ক্যারিবিয়নের তীরে ছোট শহরগুলোর কোথাও, যেখানে সে নানা অলৌকিক কা- ঘটিয়েছিল সেখানেই, নাকি তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হয়েছিল।'

অকুস্থল হইতে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ শেষে পত্রিকার দফতরে ফিরিয়া প্রতিবেদন রচনা করিবার সময় গার্সিয়া মার্কেস ঠাকুরমা বর্ণিত ওই লোককথাটি স্মরণে রাখিয়াছিলেন। পরবর্তীতে কার্তাহেনা দ্য ইনদিয়াসে বসিয়া ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দেএই ঘটনার সূত্রাবলম্বন করিয়া তিনি একটি উপন্যাস ফাঁদিয়া বসেন যাহার নাম Del amor y otros demonios -বাংলা করিলে দাঁড়ায় 'প্রেম ও অন্যান্য কুহকিনীর গল্প'। ইহা ১৯৬৫-১৯৬৭ কালপর্বে রচিত 'শত বৎসরের নিঃসঙ্গতা' উপন্যাসের তিন যুগ পরের কথা। জাদু বাস্তবতার ঘোর মার্কেস কখনোই কাটাইয়া ওঠেন নাই। ইংরেজি অনুবাদে মার্কেসের উপরিউক্ত উপন্যাসটি শেষ হইয়াছে এইভাবে, "...The warder who came in to prepare her for the sixth session of exorcism found her dead of love in her bed, her eyes radiant and her skin like that of a new-born baby. Strands of hair gushed like bubbles as they grew back on her shaved head... "ইংরেজি অনুবাদের এই অংশটি আর বাংলায় তর্জমা করিলাম না।

এবার আমরা মূল বিষয়ে প্রত্যাবর্তন করিব। শুরুতে আমরা লিখিয়াছি, 'গার্সিয়া মার্কেসের আবির্ভাবের সহিত বিশ্বসাহিত্যের মঞ্চে একটি পর্বান্তর ঘটিয়া ছিল। ইহা জাদু বাস্তবতা নহে।' এইটুকু লিখিয়া আমরা জাদু বাস্তবতার সাতকাহনে ডুব দিয়াছিলাম কারণ 'জাদু বাস্তবতা' জিনিসটা লইয়া আমরা সচরাচর পরের মুখের ঝাল খাইতে অভ্যস্ত; একবার অন্তত নিজের মুখে ঝাল খাইলে দোষের কিছু নাই। সেইসঙ্গে মার্কেসের মাথায় কী করিয়া বাস্তবতা ও ফ্যান্টাসির সমবায়ে কাহিনীর সূত্রপাত হয় তাহারও একটি ইঙ্গিত মুফতে পাওয়া গেল।

সুনির্দিষ্টভাবে বলিতে গেলে মার্কেস আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম আবিষ্কার উপন্যাসের রূপবন্ধে পর্বান্তরের সূত্রপাত করিয়াছেন। 'প্রেম ও অন্যান্য কুহকিনীর গল্প' পাঠে হঠাৎ করিয়া মনে হইতে পারে ইহা কিশোরী সিয়ের্বা মারিয়া দে তোদাস লোস আনহেলেসের বিষাদান্তিক কাহিনী। তাহা তো নহে। তবে কি ইহা যাজক কেতানোর কাহিনী, যিনি সিয়ের্বা মারিয়াকে শাস্তি প্রদানের পরিবর্তে তাহার প্রেমে পড়িয়া যান, যিনি যাজকত্ব পরিত্যাগ করিয়া মানুষ হইয়া ওঠেন, যিনি যাজক হইয়াও আজীবন রপ্ত ধর্মীয় অনুশাসন বিস্মৃত হইয়া আত্মার দাবিকে স্বীকার করিয়া বসেন? উপন্যাসের দ্বিতীয় বা তৃতীয় পাঠে স্পষ্ট হইয়া উঠে যে, মার্কেসের নায়ককে চিহ্নিত করা সহজ হইতেছে না। তাহার কারণ এই যে আদি হইতে 'উপন্যাস একজন নির্দিষ্ট মানুষের অন্তর্ভেদী আখ্যান' এবম্বিধ অনুমান মার্কেসের মননে কাজ করে নাই। মানুষ লইয়াই মার্কেসের কারবার। কিন্তু তাহা একজন বিশেষ মানুষ নহে। বস্তুত মার্কেস সচরাচর একটি সমাজ বা গোষ্ঠীকে উপজীব্য করিয়াছেন। তাহার সর্বাধিক পঠিত উপন্যাস 'শত বৎসরের নিঃসঙ্গতা' ইহার অন্যতম স্বাক্ষর। হোসে আরকেদিয়া বুয়েন্দিয়া, কর্নেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া, উরসুলা উগুয়ারান, হোসে আরকেদিয়া সেগুন্দো, অরেলিয়ানো (২য়) ও তাহার জমজ ভ্রাতা_ কাহাকে আপনার নায়ক বলিয়া মনে হইয়াছে? এই প্রশ্নটির উত্থাপন অন্যায্য হইবে না। ফ্লোরেন্টিনো আরিযা এবং ফারমিনা ডাযাকে 'লাভ ইন দি টাইম অব কলেরা'র নায়ক-নায়িকা প্রতীয়মান হইয়াছে? অনুগ্রহপূর্বক পুনর্বার পাঠ করিয়া দেখিবেন। উপন্যাস শেষ হইবার আগেই মৃত্যু হইয়াছে কেবল এই অজুহাতে ড. জুভেনাল উরবিনোর ভূমিকাকে বাতিল করিয়া দেওয়া যায় না।

মার্কেস উপন্যাসের চিরাচরিত রূপবন্ধে পরিবর্তন আনিয়াছেন কেননা তিনি নায়কের অনুসন্ধান করেন নাই। তাহার কাহিনী এককেন্দ্রিক নহে, অথবা মঞ্চোপরি বিশেষ একজনকে উপজীব্য করিয়া আখ্যানভাগ আবর্তিত হয় নাই। তাহার উপন্যাস নায়কহীন বলিলে তরলোক্তি হইবে কিন্তু অতিসরলীকরণ হইবে না। উক্তরূপ মার্কেসীয় ঘরানার একজন শক্তিমান কথাসাহিত্যিককে আমরা বাঙলা সাহিত্যেও আবিষ্কার করি_ তিনি হুমায়ূন আহমেদ। তাহার সর্বশ্রেষ্ঠ কীতি 'মধ্যাহ্ন' সাক্ষ্য দেবে যে মার্কেসের সগোত্র হুমায়ূন আহমেদ মূলত: একটি নির্দ্দিষ্ট সময়ের সমাজের প্রতিচিত্র অাঁকিয়াছেন এবং এই কার্য করিতে গিয়া কেন্দ্রীয় চরিত্র বা নায়কের প্রয়োজন পড়ে নাই। তাহার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস 'লীলাবতী' বা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস 'জোছনা ও জননীর গল্প' প্রসঙ্গেও একই কথা নির্দ্বিধায় বলা যাইতে পারে। গার্সিয়া মার্কেস এবং হুমায়ূন আহমেদ উভয়েরই উদ্দীষ্ট মানুষ_ সেই মানুষ যে বিভিন্ন পরিবেশে, বিভিন্ন কালপর্বে, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন পরিচয়ে বিভিন্ন চারিত্র-বৈশিষ্ট্য লইয়া আবির্ভূত হয়। এমনকী হিমুকেন্দ্রিক যে রচনাবলি সেইগুলোতেও কি বস্তুত হিমুকে পাশ কাটাইয়া নানা মানুষের চরিত্রাবলি প্রক্ষিপ্ত হয় নাই?

সাতাশি বৎসর বয়সে মার্কেসের মৃত্যু হইল। তিনি রবীন্দ্রনাথের চাইতে দীর্ঘতর জীবন লাভ করিয়াছেন যদিও, পরম পরিতাপের বিষয়, ক্যানসারের কারণে ২০০২ খ্রিস্টাব্দে আত্মজীবনীর প্রথম খ- ঠরারৎ ঢ়ধৎধ পড়হঃধৎষধ এবং ২০০৪ এ গবসড়ৎরধ ফব সরং ঢ়ঁঃধং ঃৎরংঃবং প্রকাশ করিবার পর তিনি আর কিছু প্রকাশ করিতে পারেন নাই। তিনি আর দশজন লেখকের মতো যে-কোনো পরিস্থিতিতে লিখিতে সক্ষম ছিলেন না। পৃথিবীর ১১টি দেশে তাহার ১২টি প্রাসাদোপম বাড়ি ছিল। কিন্তু তিনি মেঙ্েিকা শহরের বাড়িতে বসিয়াই কেবল লিখিতেন। এই কারণে তাহার জন্মভূমি কলম্বিয়ার বোগতা শহরে যে বাড়িটি নির্মাণ করিয়াছিলেন তাহার নকশা, সাজসজ্জা, আয়োজন সবকিছু হুবহু মেঙ্েিকা শহরের বাড়িটির মতো করিয়াছিলেন। তিনি একইসঙ্গে একজন মহৎ ও জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ছিলেন। এই ক্ষেত্রে তিনি চার্লস ডিকেন্সের সগোত্র। বাংলাদেশের পরম সৌভাগ্য, হুমায়ূন আহমেদ এই গোত্রেরই একজন।

সাহিত্য কখন সাধারণত্বেও চৌহদ্দি অতিক্রম করিয়া মহত্ত্বকে স্পর্শ করে তাহা মাপজোখ করিয়া বলা দুষ্কর। তবে ইহাও সত্য যে, এক এক লেখক (এবং কবি) এক একভাবে মহত্ত্বের দিগন্ত স্পর্শ করিয়াছেন যাহার লঘিষ্ঠ সাধারণ গুণীতক নির্ণয় করা দুরূহ। তবে এইটুকু অন্তত বলা যাইতে পারে যে, বড় লেখকদের রচনায় কল্পনা এবং কল্পনার সহিত চিন্তার সমবায় প্রত্যক্ষ হয়, যাহা প্রতিভারই স্মারক। মার্কেস ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে রচিত তাহার প্রথম উপন্যাস খধ ঐড়লধৎধংপধ কে কখনোই বাতিল করেন নাই, তিনি তৎকালীন রচনাসমূহকে 'বুদ্ধিভিত্তিক অনুশীলন' গণ্য করিয়াছেন। এমনকী ১৯৬২ তে প্রকাশিত খধ সধষধ যড়ৎধ উপন্যাসটি তাহাকে সন্তুষ্ট করিতে পারে নাই। অবশেষে ১৯৬৫ তে 'শত বৎসরের নিঃসঙ্গতা'-র অন্তরে পরমাকাঙ্ক্ষিত সুরটি তিনি খুঁজিয়া পাইলেন। পরবর্তী ১৮ মাস দরজা বন্ধ করিয়া একনাগাড়ে এই উপন্যাসটি লিখিবার ইতিহাস। বলা বাহুল্য, এই কারণেই গার্সিয়া মার্কেস এবং 'শত বৎসরের নিঃসঙ্গতা' সমার্থক হইয়া গিয়াছে। একজন লেখক তাহার প্রতিনিধিত্বশীল কর্মের মধ্য দিয়াই বিচারের দাবি রাখেন। অতঃএব 'শত বৎসরের নিঃসঙ্গতা' গ্রন্থে নায়কহীন মানবচরিত্রের সমাবেশ উপন্যাসের যে নতুন রূূপবন্ধ প্রবর্তন করিয়াছে তাহা বিস্মৃত হইলে চলিবে না। কাফকা, ফকনার, হেমিংওয়ে প্রমুখ সকলের প্রভাব উৎক্রমণ করিয়া এই উপন্যাসে মার্কেস 'মার্কেসীয়' হইয়া উঠিয়াছেন।
- See more at: http://www.alokitobangladesh.com/feature-friday/2014/04/25/68445#sthash.QAIRbIue.dpuf

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন