রবিবার, ১১ মে, ২০১৪

কল্লোল লাহিড়ীর দেশভাগ : দেশভাগটা আমার কাছে খুব অসুখী মানুষের এক ধারাভাষ্য।

কল্লোল লাহিড়ী গল্প লেখেন। টিভিতে সিরিয়ালের কাহিনীর নির্মাতা। গান নিয়ে নিজে গবেষণাধর্মী সিরিয়াল পরিচালনা করেন। চলচ্চিত্র বিষয়ে পড়ান কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি টিভি কোম্পানীর পরামর্শক হিসেবেও কাজ করছেন।
ব্যস্ত মানুষ কল্লোল। তবুও তিনি দেশভাগ-সাক্ষাৎকার সিরিজে কুলদা রায়ের সঙ্গে আলাপে সাড়া দেন। কল্লোল লাহিড়ীর সঙ্গে ফেসবুকের চ্যাটবক্সে লিখিত আলাপ শুরু হয় ২০১৪ সালের ১৫ মার্চ। শেষ হয় ২২ এপ্রিল। প্রায়ই কোলকাতার রাতে আলাপ হয়েছে। মাঝখানে লম্বা বিরতি নিয়েছেন। 

দেশভাগ যখন হয় সেই ১৯৪৭ সালে কল্লোল লাহিড়ীর ঠাকুরদা জীবিত। খুলনার এক গ্রামে থাকতেন। তার বাবা আগে থেকেই কোলকাতায় পড়াশুনা করতেন। দেশভাগের পরে তার পরিবার পূর্ব বঙ্গ ছেড়ে পশ্চিম বঙ্গে চলে আসেন।
তবে কল্লোল যেমন সহজ করে লেখেন--তার আলাপও করেছেন সহজ করে। তাঁর দেশভাগের বেদনার মধ্যে বিষণ্নাতা আছেদ্বশ নেই।  ফলে এই আলাপের মধ্যে দিয়ে গল্পকার কল্লোল লাহিড়ীকেই খুঁজে পাওয়া যায়। 


কুলদা রায় : দেশভাগ শব্দটি আপনি কখন, কিভাবে, কোন প্রসঙ্গে প্রথম শুনতে পেয়েছিলেন?

কল্লোল লাহিড়ী : দেশভাগ শব্দটা অনেক ছোট্ট থেকে আমার চারপাশে ঘুরে বেড়াতো। ঠিক কখন থেকে আজ আর মনে পড়ে না। মনে না পড়ার কারণ হতে পারে আমি যাদের মধ্যে বড় হয়েছি... যে মানুষগুলোর গায়ের স্পর্শ... গন্ধ...গল্প...আমার ছোটবেলাকে সাজিয়ে দিয়েছিল তারা প্রায় সবাই ওপার বাংলার স্মৃতি নিয়ে জড়িয়ে ছিলেন। তাঁরা সবাই ছিলেন ওপারের মানুষ...। ছিন্নমূল মানুষগুলোর কাছে ‘দেশ’ নামক শব্দটা একটা ভিন্নতা পেত। কাজেই দেশের মধ্যে থেকেও তাঁরা আর একটা দেশ মনে মনে গড়ে তুলতেন।

আমার বাবা খুব ছোট্ট থেকে এপার বাংলায় কাকুর কাছে মানুষ হয়েছিলেন। বাবার তাই ‘দেশ’ নিয়ে অন্যান্যদের থেকে স্মৃতি কাতরতা কম ছিল। আমার ঠাকুমা ছিলেন নবদ্বীপের মেয়ে। কাজেই খুব ছোট্ট বয়সে যখন তিনি খুলনার এক অখ্যাত গ্রামে বউ হিসেবে গিয়েছিলেন তখন তাঁর চোখ ফেটে জল এসেছিল। কারণ নবদ্বীপ তখন ছিল বেশ জমকালো মফস্বল শহর। শুধু ছেলে ডাক্তার। এইটুকু দেখেই আমার দাদুর সাথে ঠাকুমার বিয়ে হয়ে যায়।

দাদু তার পিতৃসত্ত্ব পালন করার জন্য থেকে যান খুলনায়। যদিও নজরুলের অগ্নিবিনার অফিসের নীচেই তাঁর নাকি একটা ছোট্ট ডিসপেনসারি ছিল। সেই প্রথম যুগে। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার আগে তাঁকে চলে যেতে হয় দেশে। না হলে ভিটেতে সন্ধ্যা দেবে কে? দাদুর তিন ভাই বরাবরের জন্য থেকে যান এই বঙ্গে। তাদের সাথে দেশের টানের বা পিতৃ সত্ত্ব পালনের কোনো যোগ ছিল না বলেই মনে হয়। কারণ তাঁদের কাউকে আমি দেখিনি। খুব কম গল্প শুনেছি। আমার বাবা ভাইবোনদের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন। বাবাকে দাদু পাঠিয়ে দিয়েছিলেন এখানে। অনেক ছোট থেকে বাবা তাই এই দিকেই মানুষ। কিন্তু দেখা যায় ষাটের দশকের শেষের দিকে দাদু মারা যাবার পর আমার বড়মা, ঠাকুমা, মণি(পিসি) এদের আর তাদের দেশে থাকার মতো অবস্থা ছিল না।

গ্রামের খুব বিশ্বস্ত এক মুসলিম পরিবারের সহায়তায় বিশেষ করে তাদের উদ্যোগে এক গভীর রাতের আঁধারে তিন মহিলা একা একা পেরিয়ে আসেন সীমানা। আমার ঠাকুমার দুঃখ ছিল একটাই। তিনি তাঁর স্বামীর কথা রাখতে পারেননি। কারণ তাঁর ভিটে তিনি আগলে রাখতে পারেননি। সেই দুঃখ আমৃত্যু বহন করেছিলেন। আমার বাবা ছিলেন শিক্ষক। বাড়ির ছোট ছেলের ওপর সব দায়িত্ত্ব এসে পরেছিল। আমার বাবা তা খুব যত্নের সাথে পালন করেছিলেন। দুই ছেলেকে বড় করতে করতে। আমার আর আমার দাদার ছোটবেলাটা কেটেছে এইসব মানুষগুলোর সাথে। যারা একটা দেশে জন্মালো আর একটা দেশে মারা গেল। যাদের কাছে দেশভাগ শব্দটা বড় কষ্টের। বড় আর্তির। কারণ আমার ঠাকুমা মনে করতো একদিন তিনি ঠিক ফিরে যেতে পারবেন। ঠাকুমাকে কেউ বোঝাতে পারেনি...আসলে যেখানে সব কিছু ছেড়ে দিয়ে চলে এসেছো সেখানে আর ফিরে যাওয়া যায় না।

কাজেই বাড়িতে বাজার থেকে আমটা এলে, জামরুল টা এলে ঠাকুমার কোনো কিছুতেই পছন্দ হতো না। খুলনার কোলাপোতার কোন এক অখ্যাত গ্রামের কথা চলে আসতোই। যে গ্রাম আমি দেখিনি। দাদা দেখেনি। কিন্তু কোথাও আমাদের মানসপটে এটা আঁকা থাকতো। শুধু এইটুকু বুঝতাম যে সেই অভাবের সংসারে...কষ্টের সংসারে...এই মানুষগুলো গা ঘেঁষা ঘেঁষি করে আছে বটে কিন্তু এরা সুখী নয়। দেশভাগটা আমার কাছে তাই খুব অসুখী মানুষের এক ধারাভাষ্য। যে ধারাভাষ্যের মধ্যে আমি বড় হয়ে উঠেছি। আমার সমকাল কেটেছে অনেকটা।

কুলদা রায় : ষাটের দশকের শেষের দিকে দাদু মারা যাবার পর আমার বড়মা, ঠাকুমা, মণি এদের আর এই দেশে থাকার মতো অবস্থা ছিল না।--কী এমন অবস্থা ছিল তাদের পূর্ব বঙ্গ ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসতে হয়েছিল?

কল্লোল লাহিড়ী : পূর্ববঙ্গ থেকে তাঁদের পশ্চিমবঙ্গে চলে আসার মূল কারণ ছিল বাড়ির ছেলেরা সবাই ছিল পশ্চিমবঙ্গে। আমার জেঠু দূর্গাপুরে পুলিশের চাকরী করতেন। আমার বাবার কথা আগেই বলেছি। ছোট থেকে তিনি কাকার বাড়ি থেকে মানুষ। আমার বড়মা তখন নতুন বউ। আমার সবচেয়ে ছোটকাকা, যিনি দেশের বাড়ির চাষবাস দেখাশুনো করতেন তিনি খুব একটা সুস্থ ছিলেন না। তাঁর গ্যাসটিকের অসুখ ছিল। আমাদের তো আর দালান কোঠা ছিল না। গল্প শুনে যা মনে হয় একটা মাটির ঘরের ওপর টালির চাল। একটা পুকুর। কিছুটা ধানি জমি। খুব সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে যেমন থাকে ঠিক তেমনি। কারণ সেই সময়ে বাবারা সবে কেউ চাকরী করছেন। কিম্বা চাকরীতে প্রবেশের মুখে আছেন। কিছুদিন আগে, বাবাকে লেখা দাদুর প্রায় পঞ্চাশ-ষাটটি চিঠি উদ্ধার করেছি। আমার বাবা খুব যত্নে রাখতেন সব কিছু। সেখানে দেখতে পাচ্ছি বাবা যখন কলেজে পড়ছেন তখন দাদুকে টাকা পাঠাচ্ছেন। গ্রামের মানুষের চিকিৎসা করে দাদু তেমন কোনো টাকা পেতেন না। এদিকে তিনি মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করতে পেরেছিলেন, নাকি পড়ার মাঝে ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল সেই গল্পটাও খুব ভাষা ভাষা। তবে চিঠিতে আছে গরুর গাড়ি করে রোগী দেখতে যাওয়ার কথা। ঠাকুমা আমার খুব ছোট বেলায় মারা গেছেন। তাঁর মুখ থেকে চলে আসার কারণ কোনোদিন শুনতে পাইনি। আমার কাকু যাকে হাঁদা বলতাম তিনিও কোনো ছেড়ে আসার অভিমান নিয়ে কোনোদিন কিছু বলেননি। বড়মা বলেছিল, গ্রামের চারিদিকে হিন্দু পরিবার গুলোর কাছে থ্রেট আসতে থাকে। বাইরের কিছু মানুষ যারা চাইছিল না এই গ্রামে ‘অন্য কেউ’ থাকে। আমাদের বাড়িতে দাদুর দীর্ঘদিনের সহযোগী ছিলেন। আশে পাশের গ্রামের অনেক শুভানুধ্যায়ীরা ছিলেন। তাঁরা দাদু মারা যাবার পরেও ঠাম্মাদের আগলে রেখেছিলেন। কিন্তু একটা সময়ের পরে তাঁদের মধ্যে একজন বাবাকে চিঠি লিখে। পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। পোড়ানো হচ্ছে বাড়ি-ঘর। বাবাও তখন কাকার বাড়িতে। বাড়ি ঠিক করে নিয়ে আসার মতো অবস্থার আগেই ঠাম্মারা তখনকার চব্বিশপরগণা জেলার শিবহাটিতে আমার এক পিসির বাড়িতে এসে ওঠেন। কাদের জন্য তাঁদের উঠে আসতে হয়েছিল। কারা তাঁদের বাধ্য করলো সেই গল্প আমার কাছে, দাদার কাছে, কোনো দিন কেউ করেনি। একটা হতে পারে তখন আমরা খুব ছোট। আর একটা কারণ হতে পারে আমার ঠাম্মা, মণি, হাঁদা ফেলে আসা সময় নিয়েই থাকতে হয়তো ভালোবাসতেন। কারোর ওপর তাঁদের রাগ ছিল না। শুধু যে মানুষটি ঠাম্মাদের সীমান্ত পার করেদিয়েছিলেন তার কথা তিনি মারা যাবার আগে পর্যন্ত মনে রেখেছিলেন কৃতজ্ঞ চিত্তে। তার কথা আমার লেখায় মাঝে মাঝেই চলে আসে।

কুলদা রায় : দেশ ছেড়ে আসার পরে তাদের অবস্থা বলুন।

কল্লোল লাহিড়ী : দেশ ছেড়ে আসার পর তাদের অবস্থা ছিল স্বপ্ন আর বাস্তবের মিশেল।

আমার বাবা যেহেতু এই দিকেই ছোট থেকে মানুষ হয়েছিলেন অনেক কষ্ট করে তিনি তাঁর মা, ভাই, বিধবা বোন, আর নিজের সংসারের জন্য দুই কামরার এক বাসা বাড়ি ঠিক করেছিলেন। সেখানে প্রায় দশ জনের এক নিরবিচ্ছিন্ন গা ঘেঁষা ঘেঁষি সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরোয় ছিল। আমার বাবার স্কুল শিক্ষকের জীবনের স্বল্প মাইনে আর টিউশানিতে চলতো সংসার।

আমার আর দাদার ছোটবেলা কেটেছে সেই মানুষ গুলোর সাথে যারা মনে করতো তাদের একটা তুলসী তলা ছিল। তাদের অষ্টম প্রহরের মঞ্চ ছিল। বৎসরান্তে বাড়িতে কালী পুজো হতো। তাদের পুকুর পাড়ে কাঁচা মিঠের আম গাছ ছিল। তাদের ফলসা গাছে ফল ধরে মেঘ ঘনিয়ে আসতো। আমার দাদা...তাদের স্বপ্ন গুলো খুব সুন্দর করে প্যাস্টেল কালার দিয়ে আঁকতো। আমার মণি বলতো...বিশ্বাস করতো...দাদা ওই জায়গাটায় না গিয়েই কী করে আঁকে? এইসব কম বেশি স্বপ্ন বাস্তবকে আস্তে আস্তে তুলে ধরার চেষ্টা করছি ‘গোরা নকশাল’ উপন্যাসে। কারণ সেই সময়ে আস্তে আস্তে মানুষের মনের পরিবর্তন হচ্ছে। বাড়ির চারপাশে যে সমস্ত মানুষরা ভিড় করছেন বুঝতে পারছি তারা আর পাঁচটা মানুষের থেকে আলাদা। কিন্তু কিভাবে আলাদা সেটা আরো অনেক পরে বুঝেছিলাম। সেই ছায়া...আলো...আর অনেক রোদে ভরা শৈশবের দিকে যখন তাকাই তখন যাদের কথা বেশি করে মনে আসে তাদের নিয়ে লিখতে বসি। কোথা থেকে যেন তৈরী হয়ে যায় আমার গোরা নকশাল উপন্যাসটি।

বলতে পারা যায়...একদল মানুষ...তাদের একটা জায়গা ছেড়ে নতুন জায়গাতে এসে ভালো ছিল না। তারা কষ্টে ছিল। কিন্তু সেই কষ্ট আমাদের সেই বড় সংসারকে কোনোদিন গিলে ফেলতে চায়নি। সবাই সহ্য করে নিয়েছিল। একটা শান্ত...সব সয়ে নেওয়ার চুড়ান্ত প্রতি মূর্তি ছিলেন আমার বাবা। তিনি না থাকলে আমরা সবাই কোথায় যে ভেসে যেতাম...কে জানে।

কুলদা রায় : আপনাদের পরিচিতি কেউ কি ভেসে গিয়েছিল?

কল্লোল লাহিড়ী : নাহ...সেটা জানি না। কারণ অনেকের দেশের বাড়িতে অনেক পরিচিত লোক ছিল। অনেক বন্ধুরা তাদের দেশের বাড়িতে ফিরে গিয়েছিল বড় হয়ে। কিন্তু আমাদের ঠাকুমাদের গ্রামের কারো কথা তেমন বলতে শুনিনি। সেটা অভিমান ছিল কিনা জানি না। কাজেই কারো কথা আমার বা আমার দাদার জানা ছিল না।

ভেসে যাওয়ার কথা উঠলো এই কারণে...যে দারিদ্র্যর মধ্যে দিয়ে আমরা গিয়েছিলাম...যে কষ্টটা বাবা...কাকা...ঠাম্মা...মণি মারা যাবার সময় পেয়েছেন...সেটা যেন আর কাউকে কোনোদিন না পেতে হয়। আমার আর আমার দাদার চিরকাল এই দুঃখটা থেকে যাবে যে আমাদের সবচেয়ে প্রিয় মণিকে মাদারের নির্মল হৃদয়ে শেষ নিঃশ্বাস নিতে হয়েছিল। মাদারের নির্মল হৃদয় ছিল তাদের জন্য যাদের দেখাশুনো করার মতো কেউ নেই। বাধ্য হয়ে বাবাকে সেই সময় এই ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল। কারণ সেই বছরে বাবা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। মণি দীর্ঘদিন অসুস্থ হয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী ছিলেন। মণির দেখাশুনো করতে গিয়ে মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আমি আর দাদা তখন খুব ছোট। বাড়ির খুব কাছের ডাক্তার বাবাকে পরামর্শ দিলেন মণিকে মাদারের নির্মল হৃদয়ে পাঠিয়ে দেওয়ার। কেউ প্রথমে রাজী হয়নি। এমনকি আমার মাও না। কিন্তু পরিস্থিতি বাধ্য করেছিল। ডাক্তার কাকিমাই ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন সব। মণিকে মাদারের নির্মল হৃদয়ে দেওয়ার সাত দিনের মাথায় মণি মারা যায়। বাবা এক মাস আমাদের কারো সাথে কোনো কথা বলেননি। খুব শান্ত প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। অনেক পরে, অনেক পরে যখন একটু একটু করে লিখতে শুরু করলাম। আমার লেখা খুব অনামী অথচ কেউ কেউ পড়ে এমন জায়গায় ছাপা হতে শুরু করলো তখন বাবার কয়েকজন বন্ধু বলেছিলেন আমাকে ডেকে...এই এতো কষ্টের মধ্যে তোরা থাকতিস...রবি থাকতো...কই কোনোদিন কেউ তো বলেনি। বাবা বলার সুযোগ দেননি। বাবা ছিলেন আমার দাদার আর মায়ের কাছে একটা বড় গাছের মতো। যার ছায়ায় আমরা নিরাপদে থাকতাম। একদিন সেই গাছটাও সরে গেল। আমরা ছায়াটাকেও হারালাম।

কুলদা রায় : এই দারিদ্র কি দেশত্যাগের কারণে হয়েছিল

কল্লোল লাহিড়ী : অনেকটা তো বটেই। কারণ...একটা দেশে যারা স্থির ছিলেন...। মূল যাদের প্রোথিত ছিল। তাদের রাতারাতি যদি ঘর...জমি সাজানো সংসার ছাড়তে হয়...তাদের যদি একদিনে উদ্বাস্তু করে দেওয়া হয়...তাহলে কী হবে তার পরিণতি? জানেন এখন যখন ঘন ঘন কাজের সূত্রে বাংলাদেশে যেতে হয়...তখন অনেকেই বলেন যাবেন নাকি খুলনা? চলুন না কল্লোল ভাই...। তখন খুব ঠাম্মার কথা মনে পড়ে...মণির কথা মনে পড়ে...আর তখনি মনে হয়...একটা ভয় মনের কোথাও কাজ করে গুগুলের ম্যাপে গ্রামটাই তো খুঁজে পাইনি...। ওখানে গেলে যদি আবারো না পাই। আর যদি গ্রামটাকে পাইও... আর যদি থেকেও থাকে তাহলে যদি যাইও... পুকুর পাড়ে গিয়ে যদি দেখি পুকুরটাই নেই...ফলসা গাছটা নেই... কাচা মিঠে আম গাছ নেই... কিম্বা কোনো কালে হয়তো ছিল না... কিম্বা ছিল... কিম্বা মানুষ গুলোর একটা ইলিউশান ছিল...স্বপ্ন ছিল...তখন কষ্ট হবে... তাই যাই না...ওটা আমার আর দাদার মানসচিত্রে গল্প হয়েই থাক। তবে ইদানিং আমার বাংলাদেশ যাওয়ায় দাদার উৎসাহ বেড়েছে। ও নিজের দেশের গ্রামটা দেখতে চায় একবার। যদি সুযোগ আর সময় আসে তাহলে যাবো। আমার বড়মা এখনো বেঁচে আছেন প্রায় বিরাশি বছর বয়স। অনেক কিছু ভুলে যান আজকাল। এয়ারপোর্ট থেকে বড়মাকে যখন বলি বড়মা বাংলাদেশ যাচ্ছি। তুমি সাবধানে থেকো। আর কিছুক্ষণ পরেই প্লেনে উঠবো। বড়মা বলে ওঠে প্রতিবারের মতো...দেখে আসিস তো ফলসা গাছটা আছে কিনা! আমি মানস চক্ষে ফলসা গাছটা দেখতে পাই। ওটা দাদার প্যাস্টেল কালারের ড্রইং বুকে বিবর্ণ হয়ে ঝুলছে। একটা না দেখা গাছ আমাকে তখন হন্ট করে। সেটা না দেখাই থাক। তাই ইচ্ছে করেই আমার মণির...আমার ঠাম্মার...আমার বড়মার গ্রামে যেতে চাই না...।

কুলদা রায় : এই দেশভাগের জন্য কাদেরকে দায়ী মনে করতেন আপনার ঠাকুমা-বাবা?

কল্লোল লাহিড়ী : বাবা কাউকে দায়ী করতেন না। স্বাধীনতার পরে বাবার জন্ম। ঠাকুমাও তেমন যে দায়ী করতেন তেমন না। তবে আমার ঠাকুমার কাছে স্বাধীনতা মানে ছল দেশভাগ...। এই টুকু জেনেছিলাম...কেমন ভাবে জেনে ছিলাম সেটা ঠিক মনে নেই...বলতে পারেন সেটা স্বপ্ন আর বাস্তবে মিশেল হয়ে গেছে...।

কুলদা রায় : এই দেশভাগের কারণে শিকড়চ্যুতি, কপর্দকশূন্য হয়ে যাওয়া, কষ্টের মধ্যে দিয়ে যাওয়া--এটার জন্য কেউ না কেউ দায়ী। আপনি কি মনে করেন?

কল্লোল লাহিড়ী : সেই সময়ের আমাদের অবিভক্ত ভারতের তথাকথিত রাজনীতিবিদরা...। তাঁরা বুঝতেও পারলেন না...কিভাবে আমাদের ধর্মের নামে...জাতির নামে...স্বাধিনতার নামে ভাগ করে দেওয়া হল। তাঁরা হয়তো বুঝলেন...আর অনেকেই স্বার্থ দেখলেন। আমরা নিজেদের কপাল নিজেরা পোড়ালাম। একটা কাগজে কলমের স্বাধীনতা সব কিছু পালটে দিল রাতারাতি।

কুলদা রায় : অর্থাৎ কোনো না কোনোভাবে ধর্ম-সাম্প্রদায়িকতা এই দেশভাগের রাজনীতির প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছিল। আপনারা ঠাকুমা-বাবা যারা দেশভাগের কারণে কষ্ট পেলেন--তারা কী অপর ধর্মের বিরুদ্ধে ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন মানসিকভাবে?

কল্লোল লাহিড়ী : কোনোদিন না। কোনো ভাবেই না। চরম দারিদ্যের মধ্যেও...কষ্টের মধ্যেও...ঠাকুমা আমৃত্য স্মরণ করে গেছেন সেই মুসলিম মানুষটার নাম যিনি ঠাম্মা...মণি...আর বড়মাকে সীমানা পার করে দিয়েছিলেন। আমার বাবা ছিলেন প্রচন্ড এক উদার মনের মানুষ। কোনো ধর্ম...কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁদের কোনো রাগ বা দ্বেষ ছিল না। থাকতে পারে না। আমরাও সেই রকম পরিবেশে মানুষ হয়ে উঠেছি...। তার জন্য আমাদের অগ্রজদের কাছে কৃতজ্ঞ।

কুলদা রায় : হিন্দু-মুসলমানদের যে ভেদ আছে কী আচার-আচরণে সেগুলো কিভাবে দেখতেন? এই ছোঁয়াছুঁয়ি?

কল্লোল লাহিড়ী : পেশায় বাবা শিক্ষক ছিলেন। অনেকে আসতেন তাঁর কাছে। তাঁর অনেক প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীরা হিন্দু ও মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের ছিলেন। আমার দাদু ডাক্তার ছিলেন। শুনেছি...আপনাকেও বলেছি...। আমাদের বাড়ি বারেন্দ্র ব্রাহ্মণের বাড়ি। যাদের গোঁড়া হিসেবে ধরা হয়। আমাকে আর দাদাকে খুব ছোট বেলা পৈতে দেওয়া হয়েছিল পারিবারিক রীতি মেনে। কিন্তু কোথাও কোনো জাত পাত...ছোঁওয়া ছুঁয়ির বাধা নিষেধ বাড়িতে দেখিনি। কোনোদিন না।

কুলদা রায় : ইন্ডিয়াতে দেশত্যাগের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কতদিন লেগেছিল আপনাদের পরিবারের?

কল্লোল লাহিড়ী : দেশভাগের পরপর আমার ঠাকুমারা আসেননি কেউ। দাদু শুনেছি বিশ্বাস করতেন না। তাঁর মনে হতো কোথাও আবার জোড়া লাগবে দেশটা। তিনি আসেননি। তাঁর মারা যাবার পরে। ঠাকুমাদের চলে আসতে হয়। সেটা ষাটের দশকের শেষের দিক। বাবা এই এতোবড় সংসারটা নিজে টেনেছেন। খুব কম বয়সেই তাঁকে মারা যেতে হয়। এখোনো বাবার অনেক বন্ধুরা বেঁচে আছেন। বাবার সারা জীবনের পরিশ্রমের ধকল শরীর ফিরিয়ে দিয়েছিল। অত্যন্ত অসুস্থ ছিলেন তিনি। মারা যাওয়াটাও বড় বেদনার ছিল তাঁর কাছে। যে বাড়িতে আমরা ভাড়া থাকতাম দীর্ঘ ত্রিশ বছর সেই বাড়ি থেকে আমাদের উঠে যাওয়ার জন্য মানসিক চাপ আসতে থাকে। বাবা কারো সাথেই কোনোদিন খারাপ ব্যবহার করেননি। শুধু বাড়ির মালিককে বলেছিলেন...তাঁর মৃত্যুকাল পর্যন্ত অপেক্ষা...। বাবা আমাদের সেই পুরোনো বাড়িটাতেই মারা যান। কাজেই আমার দাদার চাকরী না হওয়া পর্যন্ত গোছানো হয়ে ওঠে না কিছুই। বাবাও গোছানো কিছু দেখে যেতে পারেননি। দাদাকে বাবা নিজের মতো করে গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। দাদা মেধাবী ছাত্র ছিল। নিজের পড়াশুনোর খরচ স্কলারশিপের টাকায় সে নিজেই বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে। একটা আক্ষেপ দাদার থেকেই যায়। ও অধ্যাপক হতে চেয়েছিল। সেটা হতে পারেনি। কারণ একটা সংসারের বিরাট দায় তখন তার কাঁধে। যদিও এখোনো সে সব কিছুর দায়িত্ত্ব সামলায়। তার মধ্যে এখোনো নিজের নানা রকমের পড়াশুনো নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আর সত্যি কথা বলতে কি আমি বা দাদা তেমন ভাবে কেউই গুছিয়ে উঠতে পারিনি। আমি দাদার কাছেই থাকি। মাত্র কয়েক বছর আগে আমাদের মাথা গোঁজার মতো একটা আস্তানা হয়েছে। কিন্তু লড়াই চলছে। এখনও...নিরন্তর...। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের যেমন উপাখ্যান থাকে আর কি...। কিন্তু আমরা ভালো আছি।

কুলদা রায় : দাদা কোন সালে চাকরি পেলেন?

কল্লোল লাহিড়ী : দাদা চাকরী পেলো পড়তে পড়তেই। সেটা ১৯৯৬ সাল। তখন সে শিক্ষানবীশ। বাবা মারা গেলেন ১৯৯৯। তিন বছর অবসর নিয়ে ছিলেন। কিন্তু তখনও হাতে এক পয়সাও পেনশন আসেনি। মানুষটা জেনে যেতে পারেননি তিনি পেনশনের টাকাটা আদৌ পেলেন কিনা। পরবর্তীকালে মা পেয়েছেন।

কুলদা রায় : আপনার বাবা বাংলাদেশের বিষয়ে কেমন বোধ করতেন শেষদিন পর্যন্ত?

কল্লোল লাহিড়ী : বাবা...কোনো কথা কোনোদিন শেয়ার করেননি। শেষকালে টিবি হয়েছিল। শিক্ষকতাকে আদর্শ হিসেবে ধরে নিয়েই বাঁচতেন। নিজের ওশুধের খরচ নিজের অর্জিত টাকায় কিনতে পারছেন না বলে মনে মনে বড় কষ্ট পেতেন। কারণ বাবার পেনশান ফাইল তখন এক টেবিল থেকে আর এক টেবিলে যেতে সময় লেগে যাচ্ছে এক বছরেরও বেশি। অসুস্থ রুগ্ন বাবাকে নিয়ে...তাঁর জীবনের শেষ সময়ে আমি ঘুরে বেড়িয়েছি এক দপ্তর থেকে আর এক দপ্তর। সে এক করুণ অসহনীয় কাহিনী। বাবা মারা যাবার আগে পেনশন পাননি। বাবা মারা যাবার দু সপ্তাহ পরে বাবার এক প্রিয় ছাত্র হঠাৎই আমাদের বাড়ি আসেন। তিনি তখন সরকারের এক বেশ দায়িত্ত্বশীল পদে ছিলেন। আমরা কেউ তাঁকে বলিনি। লোক মুখে শুনে তিনি নিজের উদ্যোগে বাবার মরোনোত্তর পেনশান শুরু করে দিলেন মাত্র এক মাসের মধ্যে। আমার মা সেই পেনশান এখনও পাচ্ছেন। কাজেই দেশ নিয়ে কথা বলতে গেলে শুধু দেশ আর সীমাবদ্ধ থাকে না। সেখানে ঝাঁপি খুলে বেড়িয়ে পড়ে আরো অনেক অনেক ব্যক্তিগত অনুষঙ্গ। যা এড়িয়ে আমি আর আমার দাদা কোনোদিন বেড়ে উঠতে পারতাম না।

কুলদা রায় : আপনারা পূর্ব বঙ্গের বাঙাল। আপনাদের ভাষা ও আচার-প্রকার একটু ভিন্ন স্থানীয়দের চেয়ে। এটা নিয়ে কখণ কি স্থানীয়দের সঙ্গে কোনো সমস্যা হয়েছে?

কল্লোল লাহিড়ী : না। এটা একটা মজার ব্যাপার। আমাদের বাবাদের দিক...মানে ছেলেদের দিক ছিল বরাবরের পূর্ব বঙ্গের আর মায়েদের দিক ছিল এই দিকের। আমার ঠাকুমা ছিলেন নবদ্বীপের মেয়ে। কাজেই আমাদের বাড়ির পুজো আচ্ছা...সব কিছু দুই বঙ্গের মিশেল। আমাদের বাড়ির কারো কথায় কোনো টান ছিল না। এমনিতেই পরবর্তী কালে বন্ধুদের সাথে মিশতে গিয়ে যাদের বাড়ি বিক্রমপুর বা বরিশাল বা চট্টগ্রাম তাদের কেউই আমাদের মতো খুলনার লোকদের বাঙাল বলেই মানতে চাইতো না। সবাই মজা করে বলতো তোরা আবার বাঙাল কবে থেকে?

কুলদা রায় : দেশভাগ নিয়ে কী কী ধরনের বইপত্র পড়েছেন?

কল্লোল লাহিড়ী : খুব একটা পড়াশোনোর মনোযোগী ছাত্র আমি ছিলাম না। আমার দাদা সেই দিক থেকে একশো মিটার দৌড়ে অনেক এগিয়ে। বাড়িতে পড়াশুনোর একটা সুন্দর আবহাওয়া ছিল। আর তার সাথে ফিল্ম দেখার। কারণ সেই সময়ে...মানে আশির দশকের শুরুতে আমাদের বালীর রাজনৈতিক এবং সামাজিক এক পরিবর্তন হতে শুরু করে। আমাদের পাড়ার দাদারা তখন ফিল্ম সোসাইটি শুরু করেছে। নাটকের দল আসছে কলকাতা থেকে। বাবা এইসবের খবর রাখতেন। সুযোগ পেলেই আমরা যেতাম। সিনেমার মধ্যে দিয়ে দেশভাগ আমার কাছে প্রকট হয়ে এসেছে। বলতে পারেন আইডেনটিফাই করতে সুবিধে হয়েছে। তবে আমাদের স্কুলে এক অসাধারণ অসম্ভব জ্ঞানী এক ইতিহাস স্যার ছিলেন। তাঁর কাছে সম্রাট অশোক থেকে দেশভাগ গল্পের মতোন শুনতে ভালো লাগতো। আর বাড়িতে একটা আবহ ছিলোই। বাবা অনেক ছোট থেকে আমাদের কবিতার বই কিনে দিতেন। সেখানে প্রথম শুনি শামসুর রহমানের নাম। অন্নদা শঙ্করের একটা ছড়া আমাদের সময় খুব জনপ্রিয় ছিল। এখোনো আছে--

তেলের শিশি ভাঙলো বলে খুকুর পরে রাগ করো.../তোমরা যেসব ধেড়ে খোকা ভারত ভেঙ্গে ভাগ করো তার বেলা? জানেন...এই যখন বাংলাদেশ যাই...এখন তো কিছু কিছু ভালো বন্ধু হয়েছে। তাদের সাথে যখন শাহবাগের পাশে যাই। কিম্বা ছবির হাটে। ঠিক উলটো দিকে একজন শুয়ে আছেন খুব শান্তিতে। তার সমাধি ফলকটার দিকে তাকালেই আবার অন্নদাশঙ্করকে মনে পড়ে..."ভুল হয়ে গেছে বিলকুল...সব কিছু ভাগ হয়ে গেছে ভাগ হয়নিকো নজরুল...যাইহোক...সুনীল পড়ে...আরো অনেক পরে নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে পড়ে...কিম্বা ঋত্বিক ঘটক...মৃণাল সেন এদের ছবি দেখে...আরো অনেক ছোট থেকে দেশভাগ নাড়া দিয়েছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্রবিদ্যা নিয়ে পড়তে ঢুকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম ঋত্বিক ঘটককে... ঢুকে পড়লাম আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চিলিকোঠার সেপাই বা খোয়াবনামার মধ্যে। পড়লাম এই সেদিন...তাও বছর দুয়েক আগে সেলিনা হোসেন...। আমি মুগ্ধ। প্রথমবার ঢাকায় গিয়ে বন্ধু কবি পারভেজ চৌধুরীর সৌজন্যে তাঁর সাথে দেখাও করি তাঁর বাসায় গিয়ে। আমার কাছে সত্যিই স্মরনীয় হয়ে আছে।

কুলদা রায় : হাসান আজিজুল হকের আগুন পাখি। মাহমুদুল হকের কালো বরফ?

কল্লোল লাহিড়ী : না। পড়া হয়নি। তবে আগুন পাখি কিনেছি। আশা করি খুব শীঘ্রই পড়ে ফেলবো।

কুলদা রায় : আপনি কি মনে করেন দেশভাগ যে রকম একটা বড় ব্যাপার সে রকমভাবে সাহিত্যে এসেছে?

কল্লোল লাহিড়ী : দেখুন...আমি বাংলা সাহিত্যের কিছু পড়েছি। অনেক কিছুই এখোনো পড়া হয়নি। ইংরাজী সাহিত্য বলতে পারবো না। তবে আমাকে ছোটোবেলায় সাহিত্য থেকে বেশি টেনেছিল সিনেমা। আমার মনে হয় সিনেমায় দেশভাগ নানা ভাবে নানা বর্নে ধরা পড়েছে। শুধু বাংলা নয়। ভারতীয় সিনেমার প্রেক্ষিতে বলতে পারি।

কুলদা রায় : ঋত্বিকের চলচ্চিত্রে দেশভাগ প্রধান বিষয়।

কল্লোল লাহিড়ী : হ্যাঁ। পটভূমি জুড়ে থাকে...আলোতে থাকে...আবছায়াতে থাকে। মানস পটে থাকে...ছড়িয়ে থাকে আলোক দ্যুতির মতো। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া স্টাডিজে আমি ঋত্বিক ঘটকের ছবি টেক্সট হিসেবে পড়াই।

কুলদা রায় : ঋত্বিকের মধ্যে যে টেম্পোটা ছিল দেশভাগ নিয়ে সেটা কিন্তু আর কোনো চলচ্চিত্রকারের মধ্যে দেখা যায় না।

কল্লোল লাহিড়ী : ঠিক অমনটা হয়তো দেখা যায়না। ওই উতল হাওয়া...ওই প্যাশন ভারতে একটা লোকের মধ্যেই ছিল।

কিন্তু যেটা ভালোর দিক ছিল...সেটা উনি ওনার ছাত্রদের মধ্যে তরান্বিত করে দিতে পেরেছিলেন। জিইয়ে রাখা যাকে বলে। সেটা ওঁর প্রিয় ছাত্ররা এগিয়ে নিয়ে গেছেন। অনেক দিন পরে দেশভাগ উঠে এসছিল মৈনাক বিশ্বাসের স্থানীয় সংবাদ নামের ছবিটায়। সমস্যাটা এখোনো আছে। কোথাও না কোথাও জোরালো ভাবে আছে। না হলে বলুন না...এখোনো ক্লাসে মেঘে ঢাকা তারা দেখালে কেনো এই প্রজন্মের তরুণরা একাত্ম বোধ করে? কবেকার সেই শাদাকালো ছবি! কেনো এখোনো নিতার কান্নায় কান্না পায়?

একটা মজার বিষয় আমি পরীক্ষা করি। তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’ আমি প্রতি বছর ক্লাসে দেখাই। নিয়ম করে। অনেকেই জানে না একুশে ফেব্রুয়ারীর গুরুত্ত্ব...কেউ কেউ জানে। কিন্তু মুক্তির গান দেখে...ওরা খোঁজ খবর নিতে শুরু করে। ওরা আরও জানতে চায়। ওরা আগ্রহী পড়ে তথ্য সন্ধানে। ইতিহাসটাই তো ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এইবার ক্লাসে মুক্তির গান দেখানোর পর এক ছাত্র এসে বললো স্যার...এতোদিন মায়ের কাছে শুধু গল্প শুনেছি। আমি জানতে চাইলাম কিসের গল্প? সেই তরুণ বললো তার মা দেখেছেন লাশ পরে থাকে...সামনে মারার ঘটনা। সে অভিভূত...সে কয়েকদিনের মধ্যে জোগাড় করেছে বাড়িতে রাখার জন্য মুক্তির গান। আসলে আমার মনে হয় কাউকে...কোনোভাবে...ভোলানো যাবে না দেশভাগ্‌,সেটা প্রত্যক্ষ ভাবেই হোক...বা অপ্রত্যক্ষভাবেই হোক।ওই ঋত্বিকের কথায়...কে উদ্বাস্তু নয় মশাই?

কুলদা রায় : ধন্যবাদ।

কল্লোল লাহিড়ী : ধন্যবাদ আপনাকেও।



৫টি মন্তব্য:

  1. কিছু মানুষ- কিছু রাজনীতিবিদ সে সময় বুঝতেই পারেন নি- অন্যের বুদ্ধিতে কাগজে কলমে দেশটাকে তারা যেভাবে ভাগ করছেন সেটা কখনোই মানচিত্রে সীমাবদ্ধ থাকবেনা। হয়তো বুঝলেও মানতে চান নি নিজেদের মতাদর্শ জীইয়ে রাখতে। কল্লোল দা, আমরা যারা দেশভাগের কোন স্মৃতিই বহন করিনা; যাদের মনে নিজের দেশ ছেড়ে ভিন্ন একটা সীমানা পাড় হওয়ার কোন স্মৃতি নেই- কোন আলাদা সীমারেখা নেই তারা কোন দিনই হয়তো বুঝবোনা 'ভারতবর্ষের স্বাধীনতা নিতে কি পরিমান দাম দিতে হয়েছে লাখ লাখ সাধারন মানুষকে। যে রাতে আপনার ঠাম্মারা ধোঁয়াশা ভবিষৎ সাথে করে সীমানা পাড় হয়েছিলো সেদিন হয়তো আমার বাড়িতে নিজেদের পুকুরের মাগুর মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেয়ে শান্তিতে ঘুমিয়েছিলো আমারই দাদা-দাদি। নিজেদের ভূল ছিলোনা কি কিছুই? রাজনীতিবিদরা তখন যদি নিজের স্বার্থ দেখতে পারেন তাহলে আমরা কেন পারিনি নিজেদের রক্ষা করতে? জানি, এ প্রশ্ন আপনাকে করাটা রীতিমতো অন্যায়। কিন্তু কার কাছে জানতে চাইবো সেটাই তো জানিনা। জিন্নাহ কিনবা নেহরু বেঁচে থাকলে হয়তো আজ তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতাম। সব কিছু জানার পরও কনিষ্ঠদের আবদারে সম্মতির জন্যে হলেও গান্ধিকে। নিতান্ত মানবতার কাঠগড়ায় তো বটেই। আচ্ছা দাদা, যে তুলশি তলা- ফলসা গাছ- যে ভিটের স্মৃতিতে আপনার ঠাম্মা এখনো বিচরন করে সুখ পান(হয়তো দুঃখও), সে স্মৃতির দীর্ঘশ্বাস কি ঐ রাজনীতিবিদদের কলঙ্কিত করেনা? ভাবতেই অবাক লাগে.. রক্তের সম্পর্ক ছাড়া যে মানুষগুলো এই বাংলাদেশ(পূর্ববঙ্গ) ছেড়ে ভারতে(পশ্চিমবঙ্গে) গেলো সেই সব মানুষের কোন কস্টের ধারনাই আমরা পাই না !

    (জুনায়েদ হোসেন)

    উত্তরমুছুন
  2. বানান... একটু নজর দেওয়া জরুরি মনে হচ্ছে! কারণ ভুল হলে অর্থ দাঁড়ায় না... ই/ঈ-কার বা উ/ঊ - তবু বোঝা যায়, কিন্তু 'পিতৃসত্ব'-টা মনে হচ্ছে 'পিতৃশর্ত' হবে... আরও দু'একটা। একটু দেখে নিলে ভাল।

    উত্তরমুছুন
  3. কস্ট না, কষ্ট...

    উত্তরমুছুন
  4. ঘা যে এখনো রয়েছে বুঝলাম। যদিও কষ্ট আমি বুঝবোনা।

    উত্তরমুছুন