রবিবার, ১১ মে, ২০১৪

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের জাদুবাস্তবতা

শামসুল আরেফিন

১৯৪৯ সালে কিউবার ঔপন্যাসিক অ্যালিজে ক্যারপেনতিয়ার ম্যাজিক রিয়্যালিজম লাতিন সাহিত্য ব্যবহার করেন। প্রতিদিনকার বাস্তব ও অলৌকিক ঘটনার সমন্বয় উল্লেখ করে গল্প বা কাহিনী নির্মাণই ম্যাজিক রিয়্যালিজম। এ ধরনের সাহিত্য আন্দোলন ইউরোপের জার্মান সাহিত্যেও দেখা যায়। যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গুন্টার গ্রাসের উপন্যাস ‘দ্য ট্রিন ড্রাম’। ১৯২৫ সালেরও অনেক আগে ইউরোপের চিত্রশিল্পী, ফ্রেন্জ রোহ জাদুবাস্তবতা চিত্রকর্মে ব্যবহার করেন।
কিন্তু বর্তমান ম্যাজিক রিয়্যালিজম ধারার উৎপত্তি গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিচ্যুড’ প্রকাশের হাত ধরে। একই ধারাবাহিকতা উত্তর আমেরিকার লেখক ‘মার্ক হেলপ্রিন’-এর উপন্যাস ‘উইন্টার টেল’ (১৯৮৩)। তারপর সালমান রুশদির মিডনাইট চিলড্রেন। ম্যাজিক রিয়্যালিজমের বাস্তবতা যেমন অস্বীকার করা যায় না গালিভার ট্রাভেলস (১৭২৬)। । ঠিক তেমনি ‘দ্য নোজ’ উপন্যাস (১৮৪২)। একই ধরনের প্রচেষ্টা যে কোন পাঠক চার্লস ডিকেন্স, দস্তয়ভস্কি, কাফকাসহ অন্য লেখকদের মাঝেও আছে। আধুনিক যুগে বিশ্বসাহিত্যে জাদুবাস্তবতার নিপুণ শিল্পী গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। তাঁর গল্প ও উপন্যাসে লাতিন আমেরিকার মিথ, জাদুবাস্তবতা ও বাস্তবতার সম্মিলন অনন্য। রচনাশৈলীর নান্দনিকতার কারণে পাঠক ও সমালোচক মহলে তিনি সমাদৃৃত। পৃথিবীর অসংখ্য ভাষায় তার সাহিত্যকর্ম অনূদিত হয়েছে।
মার্কেসের গল্পের সারাংশ দেখলে ম্যাজিক রিয়্যালিজম কী- তা আরও পরিষ্কার হয়। যেমন ‘ অ্যা ভেরি ওল্ড ম্যান উইথ এনারমাস উইঙস’ গল্পে তিনদিন ঘূর্ণিঝড়ের পর ‘পিলেয়ো’ আঙিনার সামনে এক ডানাওয়ালা বৃদ্ধকে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে দেখে। সে স্ত্রীসহ ঐ টাকমাথা ওয়ালা বুড়োলোকটিকে পরখ করতে চায়। লোকটির কোন দাঁতই ছিল না। তারা চাইল বুড়ো ভদ্রলোকটির সাথে কথা বলবে। কিন্তু ঐ বুড়োর কথা তারা বুঝতে পারল না। কারণ সে অতি প্রাচীন ভাষায় কথা বলে। এক প্রতিবেশীর সাথে কথা বলে সে জানতে পারল- এই বুড়ো ভদ্রলোক স্বর্গীয় দূত হতে পারে। ‘পিলেয়ো’ ডানাওয়ালা বুড়োটিকে উঠোন থেকে এনে মুরগির খাঁচায় বন্দী রাখল। তারপর থেকে গ্রামের বিভিন্ন প্রান্তর থেকে লোক এসে তাকে দেখতে শুরু করল। কেউ বন্দী বুড়োকে ভেঙচি কাটে, আর কেউ তাকে বিরক্ত করে। তারপর অতিমানবীয় কোন কিছু করে দেখাতে বলে। স্থানীয় পাদ্রিরা অনেক চেষ্টা করল- আসলেই কি বন্দীটি একজন স্বর্গের দূত? পুরো শহরের লোক ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে তার ব্যাপারে জানার জন্য। কিন্তু তারা কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে না। পটভূমি ও অবস্থার দিক থেকে পুরোপুরি তা কাফকার মতো বললে ভুল হবে না।
এরপর থেকে ‘পিলেয়ো’ ও তার স্ত্রী ঐ দেব দূত দেখতে টিকেটের ব্যবস্থা করল। লোকজনের ভিড় বাড়তেই থাকল। প্রতি প্রদর্শনীতে ‘পিলেয়ো’ ও তার স্ত্রীর আয়ও বাড়ছিল। একদিন পিলেয়ো’র স্ত্রী ‘এলিসেনদা’ রান্নাঘর থেকে দেখল- বুড়ো ডানাওয়ালা ভদ্রলোকটি সহজেই উড়তে পারে। আর ডানা ঝাপটে সমুদ্র প্রদক্ষিণ করছে। মোট কথা এই গল্পটি প্রায় সব ধরনের প্রাগৈতিহাসিক ধরন ও ধর্মীয় মিথের উপস্থিতি লক্ষ্য করার মতো। এই কল্পিত ফেরেস্তা শুধু আশ্চর্যকরই নয়। বরং সে সবার নিকট দুর্বোধ্য। গল্পে কেউ সফলভাবে তার সাথে কথা বলতে পারে না। সে যদি স্বর্গের কোন ভাষা ব্যবহার করে, তবে গল্পের কেউ কেন বুঝতে পারে না তার কথা। সে ‘পিলেয়ো’র বাড়িতে আসে, থাকে, আবার উড়ে চলেও যায়। কিন্তু কেনইবা সে আসে কেনই বা সে চলে যায়- তা জানা যায় না। আর যখন সে একেবারে উড়ে চলেই যায়, পাঠক তার ব্যাপারে তেমন কিছুই জানে না। জানে না সে আর গল্পে ফিরে আসবে কি না? এটা আসলে এক ধরনের শূন্য ক্যানভাসের সৃষ্টি করে। এ সবকিছুই মার্কেসের ভাষায় ম্যাজিক রিয়্যালিজম। এভাবে তাঁর উপন্যাস ও গল্পে কখনো প্রচ- ঝড় বছরের পর বছর বয়ে যায়, কখনো আকাশ থেকে ফুল ঝরে, কখনো স্বৈরশাসক যুগের পর যুগ জীবিত থাকে, কখনো আধ্যাত্মিক সাধকরা আকাশে উড়ে চলে, আবার মৃতদেহরা কবর থেকে উঠে আসে। জাদুবাস্তবতায় যৌক্তিক পারম্পর্যতায় অর্ধশতাব্দীর বিচ্ছেদ সত্ত্বেও প্রেমিক-প্রেমিকার ভালোবাসা অম্লান থাকে। এ জাদুবাস্তবতা লাতিন আমেরিকার নির্মম স্বৈরাচারী শাসক, শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, বছরের পর বছর অভুক্ত, অসুস্থতা ও গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপট থেকে সংগৃহীত। তার লেখার ধরনকে বন্ধুরা মার্কেসিয়ান বলে। কেননা তার গল্পে অসংখ্য ঘটনার মোড়, ছোট্ট বিষয়কে গুরুতর করে তোলা, ভীতিকর বিষয়কে সাধারণ বিষয়ে পরিণত করার প্রবণতা থাকে। তাঁর শুভাকাক্সক্ষীরা জানেন- তিনি এভাবে লেখতে অভ্যস্ত। প্রতিদিনকার সামান্য বিষয় নিয়ে কথা বলা, হাসিঠাট্টা করা, ছোট্ট বিষয়কে বারবার বলা, আর সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত তা নিয়ে ব্যস্ত থাকাই- মার্কেজের মুদ্রা দোষ।
তার মতে- বিশ্বের পরাশক্তিরা ও ঔপনিবেশিক দেশগুলো লাতিন আমেরিকাকে দখল করতে যুদ্ধ করেছে বছরের পর বছর। কিন্তু তার সমস্যা নিয়ে কখনো মাথা ঘামায়নি। তাই তিনি লাতিন আমেরিকার ঐক্যের প্রয়োজন অনুভব করলেন। সম্ভবত এ ধারণা থেকেই তিনি রচনা করেন জাদুবাস্তবতার আরেক উজ্জ্বল উদাহরণ উপন্যাস ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিচ্যুড’। এই উপন্যাসে ম্যাকান্দো শহরে বুয়েন্দা নামের এক দেশপ্রেমিক পরিবার উপনিবেশ গড়ে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই পরিবারের বংশধররা সফলতা পাওয়ার আশা করে। কিন্তু তারা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয় দৈবিক কারণে। কখনো তারা প্রেমে পড়ে, স্বপ্ন দেখে ধনী হওয়ার, যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু সফল হতে পারে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভৌতিকভাবে তাদের প্রতিরোধ করে। বৃষ্টি, প্লেগ রোগ কখনো তাদের স্মৃতিভ্রম করে। এটি রেশমের পর্দার মতো প্রামাণিক উপন্যাস, যাতে বাস্তবতা ও জাদুবাস্তবতার ঘূর্ণিঝড়ের সম্মিলন ঘটেছে। এক হয়ে গেছে সমসাময়িক রাজনীতি ও ইতিহাস। আর ‘অ্যারাকাতকা’ গ্রামের সেই ছোট্ট কুঁড়েঘর, ধুলোময় কলম্বিয়ার এই গ্রামই নাকি তিনি ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিচ্যুড’ এর ম্যাকান্দো শহরে রূপায়ণ করেছেন। নানাবাড়ির সকল বাস্তব চরিত্র ও প্রেক্ষাপট উপন্যাসে ধারাবাহিকভাবে উঠে এসেছে।
গ্যাব্রিয়েল তার নানাবাড়িতেই নানাবাড়ির পরিবারের একমাত্র বাচ্চা ছিলেন। তাই কদরও ছিল তার বেশ। তার নানা কর্নেল গার্সিয়া মার্কেস তাকে অসংখ্য গৃহযুদ্ধের গল্প শোনাত। তাঁকে কখনো সার্কাস-সিনেমা দেখাতে নিয়ে যেত। আর এভাবেই বাস্তবতা ইতিহাসের সাথে তার অসাধারণ পরিচয় ঘটে। অন্যদিকে নানী তাকে সবসময় লোকাকাহিনী, রাজপরিবারে গল্প, উপাখ্যান ও ভূতপেতœী নিয়ে গল্প বলত। আর শিক্ষামূলক গল্প বলে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবন গড়ার পরামর্শ দিত। তাই নানিকে বলা যায় তার সকল ধরনের জাদুবাস্তবতা, কুসংস্কার, ও অতিপ্রাকৃত অবাস্তব ঘটনার উৎস। অবশ্য এ কথাও সত্য- তাঁর সাংবাদিকতা-দিনগুলোর অভিজ্ঞতাও অনেক কাজে আসে। কারণ তিনি ব্যারানকুইলা উপকূল শহরে বসবাসকালেই মূলত সাহিত্যের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনে সক্ষম হন। তখন তার বয়স মাত্র ২০ বছর। তিনি প্রচুর লিখতেন পড়তে আর প্রতিদিন অন্যান্য তরুণ রিপোর্টারদের সাথে সাহিত্য নিয়ে বিতর্ক করতেন। প্রতি সন্ধ্যায় বইয়ের দোকানে যাবার আগ্রহ, ক্যাফে যাওয়া আর বিয়ার খাওয়া আর গভীর রাত পর্যন্ত কর্মব্যস্ততা ছিল- দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য বিষয়। তিনি বলেন, ‘সাহিত্য নিয়ে আমার আমাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে চিৎকার করে তর্ক করতাম।’ এ সময় তিনি ভার্গেস এর প্রচুর বই পড়তেন। এমনকি এই সাহিত্যিককে তার প্রথম বই ‘লিফ স্ট্রোম’ উৎসর্গও করেন। এ ছাড়াও তিনি দ্যাফো, দোস প্যাসোস, ক্যামু, ভার্জিনিয়া ওলফ, উইলিয়াম ফকনারসহ লাতিনসাহিত্যে প্রভাব বিস্তারকারী সকল আমেরিকান লেখকের বই পড়েছেন। তাই অনেক সমালোচক বলেন, ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিচ্যুড’- উপন্যাসে জার্মান, অ্যালবোরো, অ্যাফোসনো আর গ্যাব্রিয়েল যেন বন্ধুতে পরিণত হয়েছে। এ পর্যন্ত বইটি ৩০ মিলিয়নেরও বেশি বিক্রি হয়। তিনি এর উত্তরে বলেন, ‘সবাই যে বলে- আমি আমার মিথ সৃষ্টিতে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, কারণ এ সবই আমার নিজস্ব সৃষ্টি। আমি সাহিত্যচর্চা করেছি- লেখা ও বই পাঠ করে। শুধু না পড়ে আমি লিখে সাহিত্যচর্চা করিনি। আমি মনে করি এটাই সঠিক পথ। আমি রাশিয়ান, ইংরেজ ও আমেরিকার প্রায় বিখ্যাত সকলকেই পড়েছি। আমি জেমস জয়সি, ইরসকাইন ক্যাল্ডওয়েল ও আর্নেস্তা হেমিংওয়ে থেকে অনেক কিছুই শিখেছি। কিন্তু কোন কিছুকে সুন্দর অবিশ্বাস্যও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা শিখেছি সাংবাদিকতা থেকে। আর এই পদ্ধতির উত্তম উপায়ই হলো- সরাসরি বলো। কোন ভণিতা করো না। আর এই পদ্ধতিতে সাংবাদিক ও গাঁয়ের লোকের গল্প বলে।’ তাই তার গল্প কখনো শুরু হয়েছে হঠাৎ কোন কল্পনা ও বাস্তব ঘটনা থেকে। যেমন ‘লিফ স্ট্রোম’ লেখার ধারণা তিনি হঠাৎ ঘরের চেয়ারে কৈশোরে বসে থাকার সময়। আর প্রাথমিক ধারণা, ‘নো ওয়ান রাইটস টু কলনেল’ তিনি পান ব্যারানকুইলা বাজারে এক বৃদ্ধের মাছ ক্রয় করতে দেখে। তবে তাঁর পছন্দের সাহিত্যকর্ম, ‘দ্য অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’। কারণ এর জন্য তার পরিশ্রমও বেশি। তিনি বলেন, ‘এর জন্য আমাকে পুরো লাতিন আমেরিকার স্বৈরশাসকদের ইতিহাস দশ বছর যাবত পাঠ করেছি। এরপর আমি এই সব বাস্তব ঘটনা ভুলে যেতে চাইলাম। আর সম্পূর্ণ নিজের কল্পনাশক্তি থেকে লেখা শুরু করলাম। যাতে বাস্তব কোন ঘটনা আমার উপন্যাসের কোন ঘটনার সাথে মিলে না যায়। কিন্তু এখানে স্বৈরশাসকের কাহিনী অনেকটা আত্মজীবনীর মতো এসে পড়েছে। শুধু মাত্র স্বৈরশাসকের ক্ষমতার অপব্যবহার ছাড়া সবই আমার নিজস্ব অনুভূতি, ক্ষোভ, ধারণা, নস্টালজিয়া, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসগুলো সেই দেশপ্রেমিকের মাঝে আরোপ করা হয়েছে। হ্যাঁ; হতে পারে গল্পের দেশপ্রেমিক ও আমার মাঝে অনেকে ক্ষেত্রে ক্ষমতা ও সুখ্যাতি একই রকম হয়ে গেছে। কিন্তু আমি মনে করি ক্ষমতা ও সুখ্যাতির একাকিত্ব সব সময় একই রকম হয়।’ আর এভাবে অবশেষে ১৯৭৫ লেখা হয় এই ‘দ্য অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’। তার মতে- এ উপন্যাস ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিচ্যুড’- এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ শৈল্পিক রচনা। এই বইটিও প্রকাশিত হওয়ার অল্পকদিনে এ বইটিও সর্বাধিক বিক্রির রেকর্ড গড়ে।
প্রত্যেক গল্প বা উপন্যাসের উৎস কী- তা তিনি সহজে বলে দিতে পারতেন। তিনি জানেন প্রত্যেক চিত্র দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে। আর কেনই বা তিনি সবগুলোকে একসাথে লিখেছেন? এসব গল্পের মাঝে অনেক ঘটনার এমন আছে, যা তিনে তার বন্ধু ও পরিবারের সাথে করেছেন। তিনি ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিচ্যুড’ এ জেনারেল লরেঞ্জ চরিত্রের অবতারণা করেন। যা ম্যাক্সিকান লেখক কার্লোস ফুয়েন্তাস-এর উপন্যাসের একটি চরিত্র। কার্লোস ফুয়েন্তাস’-এর এক সচেতন পাঠক ফুয়েন্তাসকে জানান ‘দ্য ডেথ অব অ্যারতিমিও ক্রুজ’ উপন্যাসে ব্যবহৃত ‘জেনারেল লরেঞ্জ’ এর চরিত্র ও ঘটনা উপন্যাসে আসলেও পরিপূর্ণতা পায়নি। ফুয়েন্তাস পাঠকের চিঠি পড়ে বুঝলেন- আসলে তার উপন্যাসে এই চরিত্রটি পরিপূর্ণ হয়নি। তখন গ্যাব্রিয়েল মার্কেস ফুয়েন্তাসকে বলেন, ‘আমি তোমার এই লরেঞ্জ চরিত্রটি পরিপূর্ণতা দিতে পারি’। আর তাই ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিচ্যুড’-এ ‘লরেঞ্জ’ ম্যাকান্দো গ্রামের কলাচাষী শ্রমিকদের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে নিহত হয়।
১৯৪৭-৫৭ সালে ব্যস্ত ছিলেন শুধু পা-ুলিপি তৈরি করতে, প্রকাশিত বইয়ের জন্য ভালো সমালোচনা খুঁজতে। এর মধ্যে তিনটি বছর তিনি ইউরোপে কাটান। অল্পসময় রোমে থাকলেও তিনি অনেকটা সময় প্যারিসে কাটিয়েছেন ভয়ঙ্কর দারিদ্র্র্যের। কিন্তু তারপরও কি পেয়েছেন এ প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘প্যারিস আমাকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ যে জিনিসটি দিয়েছে- তা হলো লাতিন আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি। এটা আমাকে লাতিন ও ইউরোপের মাঝে পার্থক্য করতে সাহায্য করে।’ প্যারিস থেকে তিনি নাকি লাতিন আমেরিকা ফিরেন এক বুক ঘৃণা নিয়ে। অথচ এখনও সময় পেলেই প্যারিসে যান। তিনি মনে করেন- পশ্চিমা সাহিত্যে নতুন তেমন কিছুই হচ্ছে না। যা হওয়ার ছিল, তা জার্মান লেখক হেনরিক বল ও গুন্টার গ্রাস অনেক আগেই রচনা করে গেছেন। তার মতে, ফরাসীরা নাকি প্রতিবছর একই ‘গনকর্ট পুরস্কার’ পাওয়ার জন্য একই ধরনের বই রচনা করে যাচ্ছে। ফরাসী বুদ্ধিজীবীদের প্রতি বীতশ্রদ্ধভাব তিনি কখনো লুকাননি। তিনি তাদের ংপযবসধঃরপ সবহঃধষ মধসবং ধহফ ধনংঃৎধপঃরড়হং. ছকবদ্ধ মানসিক খেলা বা বিমূর্তভাবনায় রচিত সাহিত্য লেখক বলেছেন। আর তাদের সফলতা নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন। ঠিক তেমনি তিনি অতি কমিউনিস্টদেরও বিরোধিতা করেন। তিনি ভাবেন তারা নাকি কখনো ডানহাতে বা সহজে কোন কিছু বলতে পারে না। লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের ব্যাপারে তিনি প্রচুর আশাবাদী। তিনি মনে করেন লাতিন সাহিত্যে প্রাণ আছে। পাবলো নেরুদাকে লাতিন আমেরিকার মহাকবি বলে উল্লেখ করতেন। তিনি ম্যাক্সিকান ঔপন্যাসিক জুয়ান রালফ ও তার বন্ধু কার্লোস ফুয়েন্তাসের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। তিনি আরও মনে করেন- তার ত্রিশ বছর আগেই আর্জেন্টিনার জর্জ লুইস বার্জেস অনেক নতুন ও আকর্ষণীয় কাজ সাহিত্যে করে গেছেন। তিনি লাতিন সাহিত্যপ্রকাশে তার সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করছেন। তার মতে জর্জ বর্জেস লাতিন ¯প্যানিশ সাহিত্যের জন্য বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে।
সমাজবাদী আদর্শ তাঁর বক্তব্য আলাপচারিতা ও প্রতিক্রিয়া প্রকাশের মধ্যে সহজেই প্রতিফলিত হয়। তার স্বপ্ন ছিল- কলম্বিয়ার বিপ্লবের উদ্দেশ্য পরিবর্তন করা, স্বজাতির উন্নয়ন ও এর মাধ্যমে পুরো লাতিন আমেরিকার পরিবর্তন। যখন কেউ তাঁর স্ববিরোধিতার প্রশ্ন তুলে বলতেন- একসাথে ফ্রান্সের ফ্যাক্সোস মিথারেন্ড আর কিউবার ফিদেল ক্যাস্ত্রো আপনার বন্ধু হতে পারে কিভাবে? প্রত্যুত্তরে তিনি বলেন- ‘খুব সহজে। কেননা ফ্রান্সের উন্নয়ন যেমন ফ্রাঙ্কোস-এর ওপর নির্ভর করে ঠিক তেমনি লাতিন আমেরিকার উন্নয়নও ক্যাস্ত্রোর ওপর নির্ভর করে।’ তাই তিনি কিউবার কবি অ্যারমানদো ভলাদেয়ার-এর মুক্তির জন্য ফ্রান্স ও কিউবার মাঝে মধ্যস্থতার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৬৭-২০০৭ পর্যন্ত আমেরিকার যাওয়ার অনুমোদন কখনো পাননি শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্র এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন’-এর আমলে তিনি হোয়াইট হাউসের অতিথি হয়ে কয়েকবার যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল- সাহিত্যিক হয়ে রাজনৈতিক কর্মকা-ে তিনি এত সময় ব্যয় করছেন? অথচ রাজনীতির কারণেই তিনি বিতর্কিত? তিনি বলেন, ‘যদি আমি লাতিন আমেরিকান না হতাম, তবে হয়ত আমাকে রাজনীতি করতে হতো না। কিন্তু মনে রাখতে হবে- অনুন্নত দেশ অনুন্নত হয় সকল দিক থেকে। কারণ তার পিছিয়ে পড়া জীবনের প্রত্যেক অংশকে প্রভাবিত করে। আমাদের মতো- তৃতীয় বিশ্বের প্রধান সমস্যা রাজনীতি। আর একজন লেখককে জাতির বাস্তব সমস্যা সমাধানের প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হয়। শুধু সাহিত্যের সামান্য অংশ নিয়ে ব্যস্ত থাকলে চলে না। আর যদি সে রাজনৈতিকভাবে সচেতন না হয়, সেও কুটিল রাজনীতিবিদদের মতো- যে আমাদের ভবিষ্যতকে নষ্ট করছে। আর এ কারণে লাতিন আমেরিকার লেখক, শিল্পী সম্পাদক সকলেই রাজনীতিতে সক্রিয়। আমি তো ইউরোপ ও আমেরিকার লেখকদের রাজনীতিতে সামান্য উচ্চবাচ্য দেখে অবাক হই। কারণ ঐখানে প্রকৃত রাজনীতিবিদরাই রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। কারণ আলবেয়ার ক্যামুদের যুগ শেষ হয়ে গেছে।’
দীর্ঘদিন ক্যান্সারে আক্রান্ত থাকার পর ১৭ এপ্রিল বৃহস্পতিবার নিজ বাসভবনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাহিত্যের এই মহানায়ক মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে সাহিত্যবিশ্ব জাদুবাস্তবতার প্রাণপুরুষ হারাল। আর লাতিন আমেরিকা হারাল তার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অভিভাবক। তারপর বলতে হয়- মহানায়করা হারান না। তার বেঁচে থাকেন তাদের কর্মে। যেমন মার্কেসও বেঁচে থাকবেন ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিচ্যুড’, ‘দ্য অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’ ও ‘অ্যা ভেরি ওল্ড ম্যান উইথ এনারমাস উইঙস’ এর মধ্য দিয়ে পাঠক হৃদয়ে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন