রবিবার, ১১ মে, ২০১৪

আহমেদ খান হীরকের গল্প : বিশ বছর পরের একদিন

তোমার হাত ঘড়িটা তোমাকে ভাবাচ্ছে।

অনেকক্ষণ ধরেই ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে আছো। অ্যানালগ ঘড়ি। এক সময় বাবা পরতেন। বাবার মৃত্যুর পর তাঁর সব কাপড়-চোপড় দান করে দেয়া হয়েছে; শুধু ঘড়িটা ঠাঁই পেয়েছে তোমার হাতে। ঘড়িটা এখন আর সুদৃশ্য নেই। বরং বলা যায়, এই সময়ের জন্য ঘড়িটা বেশ বিসদৃশ। ঘড়ির রূপালি রঙ করা বেল্ট আর রূপালি নেই। চটা উঠেছে। দেখে মনে হয় বয়ষ্ক ঘড়ি। আর অবশ্যই তা তো বয়ষ্ক। কিন্তু, যত বয়স তার চেয়েও বেশি বয়সের মনে হচ্ছে ঘড়িটাকে।


নিজের সাথেই তুলনা করছ নাকি?

তোমারও তো অবস্থা তথৈবচ। বয়স চল্লিশ নাকি, নাকি পঁয়চল্লিশ? অথচ দেখায় পঞ্চান্ন বা তারো বেশি। গাল ভেঙ্গে গেছে। বুকের চারটি পাঁচটি লোমে পাক ধরেছে। তারচেয়েও বড় কথা কপালের উপর পড়ে থাকা একগোছা চুলে সাদা রঙ, দু’জুলফি ধরে চুনকাম। বলা যায় চটা উঠেছে।

কিন্তু এসব তো তুমি মেলাচ্ছ না। ঘড়িটার দুটি কাঁটা খাড়াখাড়ি ভাবে গিয়ে থেমে আছে। ঘড়িতে বাজছে বারটা তিরিশ; এবং ঘড়িটা থেমে আছে। কাটা চলছে না, কাটা চলছে না। দেখে মনে হচ্ছে না, তোমার জীবনের কথাই বলছে ঘড়িটা! জীবন দুইদিকে দুহাত প্রসারিত করে, কোথায় যেন হারিয়ে গেছে; এবং থমকে গেছে। চলছে না চলছে না।

তাহলে কী চলছে?

অযাপন?

জীবন মানে যে চলা। বাবার প্রিয় একটা সিনেমা ছিল। হিন্দি। নাম চালতে কি নাম গাড্ডি। চলার নামই গাড়ি। অনেক পরে তুমি ঠিক করেছিলে যে আসলে চলার নামই জীবন। চালতে কি নাম জিন্দেগি!

কিন্তু চলছে না তো। থেমে আছে। এভাবে আর কতক্ষণ কতদিন!


অবশ্য এখান থেকে উঠে গেলেই অন্যরকম চলা শুরু হবে। আট বছর থেকে থমকে থাকা জীবনটা জঙ্গম হবে। এখানে লোকজন আসবে, তোমাকে খুঁজবে। ওরা তো তোমাকে কাচ ঘেরা অফিসটায় ঢুকতে দেখেছে- তোমাকে না পেয়ে ফোন দেবে। অবশ্য ফোন দিয়ে এখন আর তোমাকে পাওয়া যাবে না। ফোন নেই। কদিন আগেই তা হারিয়েছ। হারিয়েছ? এতটা বেপোরায়া বেখেয়ালি তুমি কীভাবে হতে পারো?

পারো না কি?

ছেলেবেলায় কালো ছোট্ট খেলনা পিস্তলটা তো সারাদিন চোখে চোখে রাখতে। পিস্তলটা বিদেশ থেকে এক আত্মীয় এনে দিয়েছিল এই জন্যই কি? বিদেশ থেকে অবশ্য খেলনা ট্রেনও এসেছিল, পুতুলও। ওগুলোর প্রতি তেমন মোহ ছিল না। কিন্তু মোহময় ছিল পিস্তলটা। কী দারুণ পিস্তল! হাফপ্যান্টের পকেটের ভিতর থাকতো পিস্তলটা। নলটা শুধু অসভ্যের মত উঁকি দিয়ে চোখ রাখত বাইরে। মনে হতো বাইরে কে কী করছে তা দেখতে আগ্রহের সীমা তার নেই!

রাতে ঘুমাতে যেতে পিস্তল নিয়ে। বালিশের পাশে রাখতে। সত্যিকারের ব্যবহারকারীরা বালিশের পাশে পিস্তল রাখে ভয়ে, তুমি রাখতে ভালোবাসায়। ইশকুল যাওয়ার সময় নিয়ে যেতে। চোর-পুলিশ খেলার সময় দারুণ ব্যবহার হতো পিস্তলটার। ওই পিস্তলটার বদৌলতে ইশকুলের খেলায় নেতা হয়ে উঠছিলে। তখনো জানো নি, পিস্তল মহার্ঘ; যে কোনো খেলায় তা তোমাকে নেতা করে দিতে পারে।


সেই পিস্তলটা কি ফয়সাল চুরি করে নি?

মোটা ফয়সাল। মাংস মাংস মাংস আর মাংস ফয়সাল। ইশকুলের পাশেই ডোমদের শূয়োর চরতো, ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ করতো, ময়লার মধ্যে ডুবে থাকত আপদমস্তক; ফয়সালকে তেমনই শূয়োর মনে হতো। যার বাবাও ছিল শূয়োর বিশেষ। কালোবাজারি ও ঋণখেলাপি। যদিও ফয়সালকে তুমি কখনো শূয়োরের বাচ্চা বলে গালি দাও নি। কিন্তু দিতে পারলে ভালো লাগতো। সবচেয়ে ভালো লাগতো ফয়সালের বাবাকে গালিটা দিতে পারলে। যদিও ফয়সালের দাদাও শূয়োর কিনা এ ব্যাপারে তুমি কোনোদিনই নিশ্চিত হতে পারো নি।


তো ফয়সাল তোমার বাড়ি এসেছিল। তখন তো যাতায়াত হতো, না? এর বাড়ি সে যেত, তার বাড়ি তুমি যেতে। সামাজিক যোগাযোগের জন্য তখন কোনো সাইট টাইট ছিল না। সামাজিক যোগাযোগ হেঁটে হতো, সাইকেলে হতো, ট্রেনে-বাসে হতো। বাসের পাশের সিটে বসে থাকা লোকটা জিজ্ঞেস করত, কোথায় থাকেন? কী নাম? কী করা হয়? ইত্যাদি। একসময় বেরোতো তোমার চাচাকে বা মামাকে বা বাবাকে সে চেনে। তুমিও তার কাউকে না কাউকে চেনো। পরিচয় হয়ে যেত। একসাথে চা খাওয়াও হতো। বাড়ির দাওয়াত লেন-দেন পর্যন্ত হতো। তবে শেষ পর্যন্ত আর কারো বাড়ি যাওয়া হতো না। পথের দাওয়াত পথেই ফুরাতো, ঘরোয়া হতো না।


তো এক ঘরোয়া দাওয়াতে ফয়সালকে নিয়ে তার মা এসেছিল। দাওয়াতে, নাকি এমনি? ঠিক মনে পড়ছে না তো! ওই যে বললাম বয়সের চেয়েও বয়স তোমার বেশি। তবে ফয়সাল এসেছিল তার শূয়োরের মত আগাগোরা কোলবালিশ হয়ে যাওয়া শরীরটা নিয়ে। সে হাঁটলে থপ থপ আওয়াজ হতো। সে জোর করে তোমার পয়সা আর ডাক টিকিটের সংগ্রহ দেখতে চেয়েছিল; তুমি জানতে কোনো একটা প্যাঁচ সে করছে। তুমি পয়সা আর টিকিট দেখাচ্ছিল খুব সতর্কভাবে। যেন একটিও না হারায়। কিন্তু ফয়সালের নজর ছিল আসলে অন্যদিকে। পয়সা ও টিকিট ঠিকঠাক মত রেখে আসার ফাঁকেই পিস্তলটা হাওয়া করে দিয়েছিল ফয়সাল; ঘুর্ণাক্ষরেও টের পাও নি তুমি। হাসতে হাসতে তাদের বাড়ি যাওয়ার কথা বলতে বলতে মাকে নিয়ে ফয়সাল, কিংবা ফয়সালকে নিয়ে মা চলে যায়।

আর কিছুক্ষণ পরেই, পিস্তলটা খুঁজে পাওয়া যায় না। আর কক্ষনোই পাওয়া যায় না।


বাড়ির সবাই ভেবেছিল তুমি অনেক কান্নাকাটি করবে। সবাইকে ভুল প্রমাণ করে তুমি দিব্যি ইশকুলে গেলে, সকাল-সন্ধ্যা পড়তে বসলে, পাড়ার ক্রিকেট ম্যাচে অংশ নিলে, নদী সাঁতরে সাঁতরে আঙুলের ডগা ফ্যাকাশে করে ফেললে।

পিস্তলের কথা সবাই ভুলে গেল, তবে তুমি মনে রাখলে। ক্ষেত্রবিশেষে তোমার স্মৃতিশক্তি ভালো।


হিমার কথা যেমন তুমি ভোলো নি। এক ক্লাশ আগে পড়ত। তবে সমবয়সী তো। যে বুড়ি চু খেলা তোমার কোনোদিন ভালো লাগে নি, হিমার জন্য তা-ও তো খেলতে; এবং চাইতে হিমার বিপরীত দলে থাকতে। তাহলে হিমার চাটি খাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না! হিমা, নরম কোমল, হিমা পাতলা লম্বা, হিমা মসৃণ। ববকাট চুলে একটা টায়রা দিয়ে গার্লস-ইশকুলের নীল ড্রেস পরেই সে খেলতে চলে আসতো। তখন সিক্স কি সেভেনে পড়ত। না না সেভেনে। তুমি তো তখন হাফপ্যান্ট ছেড়ে ফুলপ্যান্টে গেছ। খাকি প্যান্ট আর সাদা শার্ট পড়ে হাই-ইশকুল যাওয়া ধরেছ। মায়ের আজন্ম করে দেয়া চুলের পাট ভেঙ্গে নতুন নতুন চুল আঁচড়ানো শিখছ। আয়নার সামনে বেশ কিছুক্ষণ কাটে তখন তোমার। লুকিয়ে একটা ফেয়ার এন্ড লাভলির টিউবও শেষ হয়ে গেছে। একুশ টাকা জোগাড় হচ্ছে না বলে আরেকটা কেনা হচ্ছে না, এই যা!

ঠোঁটের উপর সরু গোঁফ উঠেছে। সেগুলো গোঁফ না বলে লোম বলাই ভালো। সেগুলো কাটা প্রয়োজন, কিন্তু সুযোগ হচ্ছে না। পায়খানায় একটা কেঁচি নিয়ে কয়েকদিন চেষ্টা করা হয়েছে; কিন্তু কাজটা বিপদজনক মনে হয়েছে তোমার কাছে। আধা-ঘন গোঁফ নিয়ে ক্রিকেট ছেড়ে বুড়ি চু’র মাঠে বেশি যাও তুমি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলা দেখ। ভাগ্য ভালো থাকলে হিমার বিপরীত দলে সুযোগ হয়। ভাগ্য আরো ভালো থাকলে হিমার ইশকুল ড্রেস সরে গিয়ে কাঁধের কাছে বেরিয়ে আসে সাদা সেমিজ। এই সাদা চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। অন্ধ করে দেয়। কয়েক ঘন্টা কয়েক বেলা কয়েক দিন আর কিছু দেখতে পাওয়া যায় না।

একদিন খেলতে খেলতে বুলার টানে হিমার ইশকুল ড্রেসের পিছনের হুক ছিঁড়ে যায়। সাদা পিঠ বেরিয়ে যায়। সাদা, নাকি অন্য কোনো রঙ? ওই রঙ আসলে কী তা কি কোনোদিন বলা যায়, বোঝানো যায়? পিঠটা বেরিয়ে যায়। পিঠের একটা অংশ বেরিয়ে যায়। হিমা তো কেঁদে ওঠে; রাগে কেঁদে ওঠে, ভয়ে কেঁদে ওঠে। তার মা মেরে ফেলবে এমন আশঙ্কায় সে খড়ের গাদার পিছনে লুকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ।

তুমি তো তাকে আবিষ্কার করেছিলে, তাই না?

আবিষ্কারটা কেমন ছিল? খড়ের গাদা ঘুরে মুরগির ডিম পাবার মত? কখনো কখনো সাপের ডিমও তো পাওয়া যেত। চেনা যেত। সাপের ডিম আর মুরগির ডিম আলাদা করা যেত। সেদিন যায় নি। হিমাকে আর কিছু থেকে আলাদা করা যায় নি। হিমার নাভির কাছের তিলটাকেই মনে হয়েছিল পরশ পাথর; তা ছুঁয়েই তুমি সোনা হয়ে যাচ্ছিলে! কিন্তু হিমা তোমাকে আরো সোনার সন্ধান দিয়েছিল; তোমার মনে হয়েছিল তুমি বোধহয় মারা যাচ্ছ, মরেই গেলে কয়েকবার; নাগরদোলার চূড়া থেকে নামতে গিয়ে হঠাৎ যেমন শূন্য হয়ে যায় শরীর, বুক খালি হয়ে যায়, দুলে ওঠে মাথা- ঠিক তেমনই দোলা দিয়েছিল হিমা, হিমার সমস্ত কাঞ্চন; সেই দোলা নিয়ে তুমি তো ছিলে হাজার হাজার দিন।

হিমার গ্রীবার সুঘ্রাণ তুমি কি এখনো পাও না ঘুমালে?

সেদিনের পর থেকে বুড়ি চু বদলে গেল, ফেয়ার এন্ড লাভলি বদলে গেল, চুলের ভাঁজ বদলে গেল। মাঠের পেছনের খড়ের গাদা বদলে গেল। খড়ের গাদা একটুকরো মেঘ হয়ে গেল। বারবার মেঘ হয়ে গেল। মাঝে মাঝে পাখি হলো। আর এক সন্ধ্যায় ঠিক ঠিক বৃষ্টি হয়ে গেল। বর্ষা হয়ে গেল। তারপর আবার বদলে গেল সব কিছু।

তখন কলেজ। রাজনীতি এলো। বান্ধবী এলো। গাঁজা এলো। হিমা কি দূরে সরে গেল? দূরে চলে গেল? নাহ্! তখনো হিমা ছিল, এখনো যেমন আছে। আছে না? এখনো স্বপ্ন কাতর হয়, এখনো বাতাস ঝিমঝিম করে ওঠে। ওঠে না কি?

কিন্তু হিমার যে বিয়ে হলো? অন্য কোথায় চলে গেল। দূরে কোথায় চলে গেল।

তাতে কি? সিগারেট খাওয়া বাড়লো, সিনেমা দেখা বাড়লো, মাস্টারবেশন বাড়লো। ফেয়ার এন্ড লাভলির টিউব কেনা বন্ধ হলো। এছাড়া সব ঠিকঠাক থাকলো। মিছিল হলো। বাংলা মদও হলো একদিন। গাঁজা হলো মাঝে মাঝে। ব্যাঙ কাটা হলো, অণুবীক্ষণ আঁকা হলো বিস্তর। জীবনের ঘড়ি চলতে থাকলো টিকটক টিকটক।

তবে এখন আর চলছে না। বন্ধ। অন্ধ ঘড়িটার মতো বন্ধ। দুহাত প্রসারিত করে বন্ধ।



রক্তের প্লাবনের উপর ফয়সাল ঘুমিয়ে আছে নিশ্চিন্তে। তার অতিকায় ভুঁড়িটা ফেটে কাদার মতো ছড়িয়ে আছে। অথচ মুখটা কী শান্ত আর সৌম! ফয়সালকে এর আগে এত ভালো করে দেখা হয় নি তোমার। এখন আর তাকে শূয়োর শাবক মনে হচ্ছে না!

তুমি ফয়সালের ঘর থেকে চুরি করা আসল পিস্তলটা ফেলেই দিলে মেঝেতে। এখন এটার আর দরকার নেই। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। তোমাকে একটা ফোন-ফ্যাক্সের দোকান খুঁজতে হবে।

নম্বরটা মনে আছে তো? ০১৯১৩...। হ্যাঁ হ্যাঁ, ক্ষেত্রবিশেষে তোমার স্মরণশক্তি ভালো।

হিমাকে জানাতে হবে ফয়সাল মারা গেছে। তার আইনসম্মত পুরুষটি মারা গেছে। মারা গেছে। মারা গেছে। যদিও অনেক আগেই উচিত ছিল মারা যাওয়া!

এতদিন পর।

তুমি নম্বরটাতে চেষ্টা করেই যাচ্ছো, করেই যাচ্ছো, ওপ্রান্ত থেকে কেউ ফোন ধরছে না। বৃষ্টি ভিজিয়ে দিচ্ছে তোমাকে। ফোনওয়ালা তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার ফোনের দিকে; ফোনটাও ভিজে যাচ্ছে। আকাশ পাতাল সব ভেসে যাচ্ছে বৃষ্টিতে। আর তুমি থেমে আছো, অনড় অন্ধ ঘড়িটার মতো।

ভুলে গেছ মৃত মানুষ ফোন ওঠায় না।


লেখক পরিচিতি

আহমেদ খান হীরক
জন্মসাল- ১৯৮১
জন্মস্থান- রহনপুর, রাজশাহী, বাংলাদেশ।
বর্তমান আবাসস্থল-ঢাকা, বাংলাদেশ।
পেশা- লেখক, টুন বাংলা এ্যানিমেশন স্টুড...
প্রকাশিত লেখা- উত্তরাধিকার, নতুন ধারা ইত্যাদিসহ বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকা।
প্রকাশিত গ্রন্থ- কাব্যগ্রন্থ- আত্মহননের পূর্বপাঠ।
ইমেইল- hirok_khan@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন