রবিবার, ১১ মে, ২০১৪

দেশভাগেরে কথাপর্ব : কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর-- সাংস্কৃতিক আবহের ভিতর পূর্ববঙ্গের মানুষের আত্মার একটা আকুতি কিছুটা হলেও ধারণ করে ছিল মুসলিম লীগ।

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর চট্টগ্রামে থাকেন। পেশায় ডাক্তার। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ লেখেন। কথা নামে একটি লিটিল ম্যাগাজিনও সম্পাদনা করেন। পত্রিকাটিতে অনেক সাহিত্যিকের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। সাক্ষাৎকার গ্রহণে তাঁর বিশেষ দক্ষতা আছে। তিনি একটি বিবেচনা বোধ মাথায় রেখেই লেখালেখি করেন। সেদিক থেকে তিনি কমিটেড লেখক।

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর ইন্টারনেটেও সরব।  আড্ডাঘরে২০১৪ সালের ১৬ মার্চ সাক্ষাৎকার তিনি যোগ দেন। 
তিনি লেখালেখি ও পেশাগত কাজে ব্যস্ত থাকায় এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ ধীর হয়ে আসে। কোনো কোনো প্রশ্নে তিনি বিব্রতবোধ করেন। এক পর্যায়ে সাক্ষাৎকার থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। সেটা ২৭ মার্চ, ২০১৪ সালের ঘটনা।
কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের ভাবনার মধ্যে ভীন্ন-ভাবনার ক্ষেত্র আছে। সেদিক থেকে সাক্ষাৎকারটি একটি ভীন্ন মাত্রা পেতে পারত। 

কুলদা রায় তাকে নানাভাবে সাক্ষাৎকারে ফিরে আসার অনুরোধ করেন। তবে শেষ পর্যায়ে বলেন তিনি মাজার নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস লিখতে ব্যস্ত আছে। আশা করা করা উপন্যাসটি লেখা শেষ হলে এই আড্ডাঘরে ফিরে আসবেন। আবার সাক্ষাৎকারটি পূর্ণ করবেন। 

--কুলদা রায়




কুলদা রায় :  দেশভাগ শব্দটি আপনি কখন, কিভাবে, কোন প্রসঙ্গে প্রথম শুনতে পেয়েছিলেন?

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর : আমার মনে হয় দেশভাগ বিষয়টি এমন এক সময়ের ব্যাপার, মানে আমাদের জন্য শোনার সময়, তখন আমরা দেশভাগ নিয়ে থাকিনি; বা, থাকার অবস্থায়ই আমরা ছিলাম না আমরা যখন বুঝতে শুরু করি তখন ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান পেরিয়ে জাতীয়তবাদকে দেখতে ভালো লাগছে এমনকি তাতে আমরা জড়িয়ে পড়ি আমরা বুঝি যে পাকিস্তানি আর এই দেশের দোসররা আমাদেরকে শোষণ করছে কাজেই এ থেকে আমাদের মুক্তি পাওয়া দরকার

তবে দেশ স্বাধীনের পরও আমরা দেখছি আমাদের গ্রামের হিন্দু পরিবার, থানা শহরের হিন্দু পরিবারও দেশান্তর হচ্ছে বিষয়টি মানে দেশভাগ আমি আমার গ্রামের হিন্দু পরিবারের কমে যাওয়া দেখতে দেখতেই প্রথম বুঝি কাজেই দেশভাগটা এর সাথে জড়িয়ে আছে আমি বুঝতে শুরু করলাম, দেশভাগ নামের একটি বিষয়ই হিন্দু আর মুসলমানকে তাদের ধর্মীয় সত্তার বিষয়টা স্মরণ করাচ্ছে আমি আমার আত্মীয় দুই-একজন সিনিয়র সিটিজেনকেই বিষয়টা জিজ্ঞেস করি তারা বলে, হিন্দুরা এই দেশে থাকতে না চাইলে আমরা কি জোর করে রাখব? তার মানে আমার কাছে মনে হচ্ছে, দেশভাগ আর হিন্দু সম্প্রদায় দেশত্যাগ প্রায় সমার্থক বিষয় আমার কাছে অন্তত তাই মনে হতো আর-কি
মানুষের ভিতর যে প্রীতিময় মাখামাখি করার সত্তাটা ছিল তা দেশভাগ নামের জান্তবতাই নষ্ট করে দিয়েছে এ জন্য কারা দায়ী, কেন হলো, কী করা দরকার ছিল, ইত্যাকার বুঝদার কথাবার্তা জানলাম আরও পরে কাজেই আমার কাছে দেশভাগ আর হিন্দু সম্প্রদায়ের দেশত্যাগ সমার্থক মনে হয় আমিও বিষয়টা সেইভাবে শুনেছি


কুলদা রায় . আপনার আত্মীয়রা বলেছেন হিন্দুরা দেশে থাকতে চায় না। কেন তারা দেশে থাকতে চায় নাএ ব্যাপারে তাদের ব্যাখ্যা কি ছিল?

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর :  আমার গ্রাম্য-আত্মীয় যা বলেছে তা হলো, তা্রা এদেশকে নিজের আর মনে করতে পারে না সোজা কথা,-- সত্যি বলছি

কুলদা রায়  : আমি এই বিষয়টিই জানতে চাইছি। হিন্দুরা এই দেশটিতে পুরুষানুক্রমে বসবাস করেছে। তারা তো বাইরে থেকে আসেনি। এদেশেরই সন্তান তারা। কী এমন ঘটল হঠাৎ করে তারা তাদের এই নিজের দেশটাকে পর মনে করতে শুরু করল?

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর : আসলে মুসলমানদের আধিপত্য তো হিন্দুদের কালচারকে মিইয়ে দিচ্ছে একসময় হিন্দু জমিদার সব দেখত পরে মুসলমানরা তাদের নিয়ে ঠাট্টা শুরু করল মুসলমানরাও প্রতিশোধ নিতে চায় কারণ হিন্দু-জমিদাররা অনেক অত্যাচার তো করেছে


কুলদা রায় : একটু বিস্তারিতভাবে বলুন হিন্দুদের নিজের দেশকে পর মনে করার কারণগুলি। 

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর :  আমি এখানে ধর্মীয় আধিপত্যেরই কথাই বলব। মুসলমানদের আধিপত্য তো এই দেশে আছে। হিন্দুদের কালচারকে তারা সুযোগ পেলেই মিইয়ে দিতে চায়। এটাই ধর্মেরও কাজ। আমি ধর্মনিরপেক্ষতার ফাঁকা বুলিতে আস্থা রাখতে চাই না। ধর্ম অত নীরিহ বিষয়ও নয়। একটা পর্যায় পর্যন্ত একে থামানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। এখানে লাঞ্ছনার ইতিহাস আছে। একসময় হিন্দু জমিদার সব নিয়ন্ত্রণ করত। তাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল। মুসলমানদের তারা সহ্য করত না। বিশেষ করে রাজা লক্ষণ সেনের পলায়নের একটা প্রতিশোধ নেয়ার প্রবণতা আছে। আর মুসলমানরা তো কার্যত মূর্তি ভাঙাকে দায়িত্ব মনে করে। কাবা শরীফ থেকে মূর্তি সরিয়েই তাদের ধর্মের জয়যাত্রা শুরু। মুসলমানরাও প্রতিশোধ নিতে চায়। ফলে, হিন্দু-মুসলমানের ধর্মীয় আস্থার জায়গাটা খুবই জটিল। মুসলমানরা হিন্দুদের কাজ, চলাফেরা, পরিচ্ছন্নতা, ভারতপ্রীতি নিয়ে ঠাট্টা তো করেই। হিন্দু-জমিদাররা অনেক অত্যাচার তো একসময় করেছেই।

আরেকটা অতি সরল বিষয় হচ্ছে, হিন্দুরা তাদের সংখ্যালঘুত্বের ক্রাইসিস থেকেই সব ব্যাপারে তারা একত্র হয়ে যায়। তাদের সম্প্রদায়ের অনেক অন্যায় কাজকেও নিজেরা সাপোর্ট করে। এইটা মুসলমানরা সহ্য করতে পারে না্। এখন নানাভাবে হিন্দুদের উপর নিপীড়ন হচ্ছে। দেশভাগের পর থেকেই তা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো। আমার মনে হয় এটাই হিন্দুদের দেশছাড়ার বড়ো একটা কারণ। তারা কমে যাচ্ছে, সংস্কৃতি তো ধর্মের বাইরের কিছু নয়একধরনের অসহায়তা তাদের আছে। এইসব মিলিয়েই তারা দেশ থেকে চলে যাচ্ছে।


কুলদা রায় : তাহলে একটা বিষয় দেখা যাচ্ছে-- ১. হিন্দু জমিদারদের অত্যাচার ছিল। ২. হিন্দুদের একটা সংখ্যালঘুত্বের হীনমন্যতা উদ্ভুত ঐক্যবোধের কারণেও তারা নিজেদের অনেক অপকর্মকেও সাপোর্ট করেছে। ফলে মুসলমানদের মধ্যে এক ধরনের ক্রোধ সৃষ্টি হয়েছে। সাপ্রদায়িকতার কারণ হিসেবে এই দুটোকেই মোটা দাগে আপনি চিহ্নিত করেছেন। আরও কিছু কারণ আপনি উল্লেখ করবেন?

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর :  আপনি নিজে কিন্তু অনেক কিছু আন্দাজ করে লিখে ফেলেন। হিন্দুদের হীনমন্যতা শব্দটি কোথায় পেলেন? এটি ঠিক নয়। মানে আমি বলছি যে, আপনি যথাযথ শব্দ ব্যবহারের বিষয়ে আন্তরিক থাকেন না। এখানে আবার ঐক্যবোধ কেন আসে? আমি এইভাবে চিহ্নিত করিনি। এটা কিন্তু মুশকিল।


কুলদা রায় : আমি এখান থেকে পেয়েছি-- আপনি লিখেছেন-- হিন্দুরা তাদের সংখ্যালঘুত্বের ক্রাইসিস থেকেই সব ব্যাপারে তারা একত্র হয়ে যায়। তাদের সম্প্রদায়ের অনেক অন্যায় কাজকেও নিজেরা সাপোর্ট করে
আপনি আপনার মত করে বলুন

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর : ক্রাইসিস তো হীনমন্যতা হয় না।


কুলদা রায় : হিন্দুদের ক্রাইসিসটা কি ছিল?

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর : সংখ্যালঘুর ক্রাইসিস। এটা সব দেশে থাকে। কলকাতায় মুসলমানরা ফেইস করছে। চাকমারা অন্য আদিবাসীদের উপর করছে। একটা কম ব্যাপার।


কুলদা রায় :  সংখ্যালঘুর ক্রাইসিস বলতে আপনি কি বোঝাতে চাইছেন? তারা সমন্বিতভাবে অন্যায় কাজকে সমর্থন করে বলছেন!

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর : দেখুন, এটি একটা সাধারণ সমীকরণ থেকে বলা। যেমন, বাংলাদেশের মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে, তারা অন্যদের উপর একধরনের প্রভাব দেখায়। কেউ তা দেখাতে না-চাইলেও এর ফ্যাসিলিটি তারা পায়। আমি ধর্মকে কিভাবে দেখি তা আমার ব্যক্তিগ্ত ব্যাপার, আমি কিন্তু ধর্মীয় দিক থেকে কোনো মানসিক পীড়নে থাকি না বা থাকতে হয় না; কিন্তু হিন্দু বা অন্য ধর্মীয় গোষ্ঠী কিন্তু একধরনের মানসিক যাতনায় থাকে। ফলে তারা সুখ-দুঃখের বিষয়ে একধরনের ঐক্য বজায় রাখে। নিজেদেরকে সহযোগিতা করে। তা হয়ত কখনও কখনও সুবিচার হয় না। আমি সেটাই বলতে চাইছি। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান সম্প্রদায় বা আদিবাসীদের ভিতর চাকমারা হয়ত অন্য ক্ষুদ্র নুগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। এমনকি সংক্রালঘুর পীড়নে একই সমাজে এমনকি একই পরিবারেও দেখা যেতে পারে।


কুলদা রায় : পূর্ব বঙ্গে সে সময়ে হিন্দুদের মধ্যে নিম্ন বর্ণের হিন্দুরাই মেজরিটি ছিল। তাদের নেতা যোগেন মণ্ডল কিন্তু বর্ণ হিন্দুদের সঙ্গে থাকেননি। তিনি মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট করেছিলেন। পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ছিলেন। তাহলে হিন্দুদের ঐক্য বা ইউনিটিটা কথাটা কী ঠিক হল?

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর :  মানবসমাজের রিলেশনের নানান মাত্রা থাকতেই পারে, আছেও। এখানে মনে রাখতে হবে, পূর্ববঙ্গের নিজস্ব একটা জীবনবোধ আছে, তাতে নদ-নদী, মাটির গন্ধ যেমন আছে, চাষাদের জীবন আছে, তথা নিন্মবর্গীয় একটা আবহ আছে। এটাও একধরনের সাংস্কৃতিক নৈকট্য। তাতে যোগেন মণ্ডল যেমন আছেন, অনেক নিম্নবর্গীয় হিন্দু বা অন্য সম্প্রদায়ের একটা মিলন আছে। আর আমাদের মনে রাখতে হবে, মুসলীম লীগ কোনো প্রথাগত ধর্মীয় সংগঠন ছিল না। জামাতে ইসলামের সাথে একে এক করার কোনো সুযোগ নাই। এটা ঠিক, এর কর্তৃত্ব শেষ পর্যন্ত মুসলিম এলিটদের হাতেই চলে গেলে; তবে সাংস্কৃতিক আবহের ভিতর পূর্ববঙ্গের মানুষের আত্মার একটা আকুতি তাতে কিছুটা হলেও ধারণ করে ছিল।


কুলদা রায় : পূর্ব বঙ্গের আত্মার প্রকৃতিটা একটু ব্যাখ্যা করুন।

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর : নদ-নদী-জল-আকাশ-নৃগোষ্ঠী ইত্যাদি মিলে আলাদা একটা চরিত্র আছে। ইতিহাসও আলাদা। সবকিছু মিলে বিচিত্র এক ভাব আছে মনে হয়। হয়ত এটা সাংস্কৃতিক আবহের কল্পবাস্তবতা। সবকিছুর কাট-কাট বর্ণনা আমার কাছে নাই।

কুলদা রায় : সে সময়ে কৃষক প্রজাপার্টি ছিল। এবং কমিউনিস্ট পার্টিও গড়ে উঠেছিল। ছিল কংগ্রেস। এরা কেন সেই আত্মাটা ধরতে পারল না?

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর : এটা খুবই চমৎকার প্রশ্ন। আমি বলিনি যে মুসলিম লীগই সবটুকু ধরতে পেরেছিল। বলিছি কি? মনে হয় না। তা বললেও তা ঠিক হয় না। মুসলিম তো কংগ্রেস থেকেই বেরিয়ে আসা দল। জিন্না তো কংগ্রেসই করত। কায়েদ আজম উপাধিটা গান্ধির দেয়া। কৃষক প্রজা পার্টি মুসলিম লীগের একটা শাখা সংগঠন বলা যায়। এটি আলাদা নয়। তবে তারা যেহেতু পূর্ববঙ্গের রাজনীতি করত, তাদের আলাদা একটা চরিত্র ছিল। মুসলিম লীগ তখনকার পশ্চিম পাকিস্তানের কথাও ভাবত। ফলে তাদের রাজনীতি আলাদা ছিল। আবার মুসলিম লীগের ভিতর নাজিমউদ্দীনরা এলিটিস্ট ছিল, সোহরাওয়াদী-আবুল হাশেমরা পূর্ববঙ্গের জীবনকে ভিতর থেকে দেখতে চাইত। তারাই পরে আওয়ামী মুসলিম হয়ে আওয়ামী লীগ হয়। কমিউনিস্ট পার্টি ভাত-কাপড়ের সংগ্রামের সাথে বৃটিশ কমিউনিস্ট পার্টির সাথে খাতির রাখল। তাই তারা হেনতেন বলে বৃটিশদের একধরনের দালালিই করেছে। আমি কিন্তু রাজনীতির ভাষা একেবারে গভীর থেকে বলতে পারব না। আমি মোটামুটি এইভাবেই জানি।


কুলদা রায় : ১৯০৫ সালে মুসলিম লীগের জন্ম হল। সে সময়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তিও অনুপ্রবেশ করতে শুরু করল। সেটা একটা রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহণ করল। তখন থেকে ১৯৪৬ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নানা সময়ে ঘটেছে। সর্বশেষ ১৯৪৬ সালে নোয়াখালিতে সহিংসতার প্রকোপটা বেশিই ছিল। এজন্য গান্ধী পর্যন্ত ছুটে এসে চার মাস সেখানে থাকলেন। পূর্ব বঙ্গে এই দাঙ্গাগুলো এক তরফাই হয়েছে। হিন্দুরাই মার খেয়েছে সেখানে। এই দাঙ্গার কারণেই হিন্দুরা দেশত্যাগের সূত্রপাত হয়েছে। একটা প্রধান অভিযোগ রয়েছে যে পূর্ব বঙ্গের এই দাঙ্গার পিছনে মুসলিম লিগের হাত ছিল।

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর : হাহাহা, অত সরল হিসাব আপনি করছেন! বিষয়টা মোটেই অত সহজ নয়। আসলে প্রত্যেক ধর্মের অন্তর্জগতেই সাম্প্রদায়িকতার বীজ আছে। মূলত কোনো ধর্মই অন্য ধর্মের প্রসার চায় না। ফলে দ্বন্দ্ব অনিবার্য। আর ভারতীয় উপমহাদেশে এই বিষয়টা মুসলিম লীগের আগেও ছিল। এর সাংস্কৃতিক আবহটা বঙ্কিম আরও স্পষ্ট করে দেন। তার বন্দে মাতরম হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতার অন্যতম বিষবাষ্প। মুসলীম লীগ বলেন আর কংগ্রেস বলেন, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা তারাও লালন করেছে। নানান ব্যবসায়িক গ্রুপ এসবকে নিয়ন্ত্রণ করত। হিন্দুরা মুসলিম প্রধান এলাকায় মার খেয়েছে, মুসলমানরা হিন্দু এলাকায় মার খেয়েছে। আপনি ইতিহাস খুলে দেখেন। কাজেই মূল ইতিহাস হচ্ছে, ধর্মের হিংস্র বিষয়টা সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য আমরা চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু ধর্ম থাকবে কিন্তু ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না, তা আমি অন্তত অত সরলভাবে মানি না।


কুলদা রায় : হ্যা, প্রতিটা ধর্মই শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাটা প্রচার করে। অন্য ধর্মকে খাটো করে দেখে। অন্যকে খাটো করা ছাড়া তো শ্রেষ্ঠবোধ গড়ে ওঠে না। সেই দিক থেকে কিন্তু সব ধর্মই এক ধরনের ঘৃণা প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান। এটা আমার অভিমত। কিন্তু একটা বিষয় দেখা যায় ভারত ভূখণ্ডে হাতে গোণা কিছু উচ্চবিত্ত ছাড়া ধর্মকে কেউই কিন্তু কঠোরভাবে অনুসরণ করেনি। হিন্দুরাও নয়। অধিকাংশ নিম্নবিত্তের হিন্দুরা পূজো জিনিসটাই ভক্তির মধ্যে দিয়ে দেখেছে। অধিকাংশ নিম্ন বর্গের হিন্দু বেদ-উপনিষদ- প্রভৃতি গ্রন্থ চোখেই দেখেনি। চোখে দেখাটা তাদের জন্য পাপ। অথচ তারাই ছিল হিন্দুদের মধ্যে সংখ্যা গরিষ্ঠ।  ফলে তারা নিজেদের মত করে কিছু ভগবান ভগবান করা ছাড়া আর কিছু চর্চা করেছে বলে মনে হয় না। তারা সাধুর কাছেও গেছে। আবার দরবেশের কাছেও গেছে। বাবুদের পুজো মন্দিরে দূর থেকে কপালে হাত ছুঁয়ে ভক্তি প্রকাশ করেছে। আবার মাজারেও মানত করেছে।

আবার নিম্নবর্গের মুসলমানদের মধ্যেও একই ঘটনা। তারাও তাদের ধর্মের নিয়ম কানুনকে সেভাবে জানত না। অনুসরণ করত না। তারাও এক ধরণের লৌকিক ধর্ম অনুসরণ করত। তারাও মুসলমান পীরদের কাছে যেত। হিন্দু সাধুদেরও কাছে যেত। তাছাড়া তাদের অরিজন নিম্নবিত্তের হিন্দু হওয়ায় তাদের সঙ্গে হিন্দুদের সম্প্রীতিটা ছিল। যদিও বৈবাহিক সম্পর্কটা কেউই করত না। এড়িয়ে চলত। কিন্তু সম্প্রীতির ঐতিহ্যটা ছিল। সেকালের সাহিত্যে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এই মিলনের নজির আছে। আরো মিল ছিল তাদের উভয়ই অর্থনৈতিক রুগ্নতা। তাদের তো এই রুটিরুজির সংগ্রাম --ভাত কাপড়ের সংগ্রামের দিকে চলে যাওয়াই কথা ছিল। শ্রেণী সংগ্রাম করার কথা ছিল। সেটা না করে তারা চলে গেল সাম্প্রদায়িকতার দিকে চালিত হল। তাহলে কি শ্রেণী সংগ্রামের বদলে ধর্ম পরিচয়টাই প্রধান হয়ে ওঠে?
বা শক্তিশালী?

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর : সমাজ তখন অত বিকশিত হয়নি যে সরাসরি শ্রেণীবিলোপের কথা আসবে। মধ্যবিত্তই তখনও আপাদমস্তক দাঁড়ায়নি। হিন্দুদের লৌকিক পূজা আর মুসলমানদের লৌকিক পূজায় অনেক পার্থক্য। ইসলাম অনেক বেশি একতরফা, একেশ্বরবাদ বলে কথা। শ্রেণীসংগ্রাম অনেক বেশি মৌলিক বিষয়। ধর্ম বা সামাজিক অনেক আচার শোষণের জায়গা ঠিক রাখতে চায়। ধর্ম তো আসলে জাদু। মানুষকে হিপনোটাইজ করার কারিগর। দেশভাগকে আমি সাম্প্রদায়িক কাজ বলতে চাই না। পাকিস্তানের জন্য সাধারণ মানুষের চাওয়া হচ্ছে, জমিদারবাবু আর শাদা চামড়া তারা চায় না। কংগ্রেস হচ্ছে, শাদা চামড়ার বদলে দেশি চামড়াকে সেট করতে হবে। হিসাবটা অনেকটাই এইরকম।


কুলদা রায় : জমিদারদের সংখ্যা কর % ছিল? ০.০০০০১% এর চেয়েও কম। তার জন্য একটা গোটা সম্প্রদায়কে দায়ী করা কতটা যুক্তি সঙ্গত? আবার রবি ঠাকুরের মত প্রজাজিতৈষী জমিদারও ছিলেন?

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর : হিন্দু-জমিদার তো আছেই; এটা তো ছোট ফ্যাক্টরও নয়; তাদের কাছ থেকে সুবিধাভোগীরাও হিন্দুই ছিল। মুসলমানরা মূলত সাধারণ কৃষক আর অপরাপর নিম্নবর্গীয় মানুষ ছিল। সবকিছু মিলেই সাধারণ মুসলমানরা এক হয়েছিল। পাকিস্তানের অন্য প্রদেশে মিক্সড গভর্নমেন্ট ছিল, কিন্তু পূর্ববাঙলার মুসলমানরা এতই ক্ষিপ্ত ছিল যে এখানে কংগ্রেসের দিকে ঝুকেইনি। এটা তো ইতিহাস। একে আপনি আবেগ দিয়ে আর কত সাম্প্রদায়িক বানাবেন?
আর হিন্দু-মুসলমানের বিষয়টা তো শুধু মুসলিম লীগ গঠনের মধ্যেই ছিল না। সিরাজউদ্দোল্লার পতনের পর থেকেও তো মুসলমানরা নানাভাবে বঞ্চিত হয়েছেচাকুরি, আইন-আদালত, নেকনজর,--সবই হিন্দু সম্প্রদায় পেয়েছে। এটাও ঘটনা।


কুলদা রায় : তাহলে দ্বিজাতি তত্ত্বটি ঠিক ছিল বলে মনে করেন? এজন্য দেশ থেকে হিন্দুদের তাড়িয়ে মেরে ধরে ভয় দিয়ে বের করে দেওয়াকে জায়েজ করতে হবে? অন্য কোনো উপায় কি সে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব ছিল না?

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর : নাহ, আপনি বিশেষ বিষয় নিয়ে কথা চাপাতে চাইছেন। বাই।


কুলদা রায় : আমার এ প্রশ্নে কি আপনি আপত্তি করছেন? আপত্তি হলে তার কারণ কী? প্রয়োজনে অন্য প্রশ্ন করতে পারি।

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর : আমি এই ধরনের আলাপে ইন্টারেস্ট পাচ্ছি না। শুধু শুধু কথা বলতে চাই না। বাই।


কুলদা রায় :  আমি শুরুতেই কিতু বলে রেখেছিলাম আমি দেশভাগ নিয়ে প্রশ্ন করবো। আপনার আলাপ থেকেই প্রশ্ন বের করবো। তাই করেছি। আপনি উত্তর দিতে নাও পারেন।

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর :
আমি এ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করলাম।


কুলদা রায় :   নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে এবং হাসান আজিজুল হকের আগুন পাখি উপন্যাসে দেশভাগ এসেছে। এই দুটি উপন্যাস বিষয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কি?


কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর :  অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নীলকণ্ঠ পড়া হয়নি। আগুনপাখি ভালো লেগেছে, দেশভাগের যন্ত্রণা, ভাষার প্রাকৃতিক আবহ ভালো লেগেছে। এটা তো হাসানের দেশভাগ-যন্ত্রণা, একে সর্বজনীন কিছু ভাবা ঠিক নয়। যাই হোক, মাজার সম্পর্কীয় একটা উপন্যাস নিয়ে ব্যস্ততায় থাকার দরুন, আর কিছু বেশি বলতে পারব না। মানে এ নিয়ে হোম ওয়ার্ক সম্ভব নয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন