রবিবার, ১১ মে, ২০১৪

অনন্ত একাকিত্বের দেশে মার্কেজ

অনন্ত মাহফুজ

পৃথিবীব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী উপন্যাস 'শতবর্ষের একাকিত্ব' এবং আরও অসংখ্য উপন্যাস, ছোটগল্প, কবিতা রচনা করেই শুধু তৃপ্ত হলেন না মার্কেজ। এবার অনন্তকালের একাকিত্বের ভেতর নিজেই রচিত হয়ে লাখো-কোটি ভক্ত-পাঠক-শুভাকাঙ্ক্ষীকে কাঁদিয়ে হয়ে চলে গেলেন লোকচক্ষুর চিরঅন্তরালে। জাদুবাস্তবতার ঘোর সৃষ্টিকারী এই মহান লেখককে হারিয়ে যেন গভীর এক টালমাটাল হাওয়ার হোঁচট খেল সমকালীন কথাসাহিত্যের অসীম যাত্রা। কেননা মার্কেজের মতো বিরল লেখকদের দেখা খুব কমই মিলেছে জগতে। মার্কেজের মতো ক্ষণজন্মা স্রষ্টাদের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয় যুগের পর যুগ, কখনো শতাব্দিকালও।

ল্যাটিন আমেরিকার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত, পরম শ্রদ্ধা আর প্রগাঢ় ভালোবাসায় একটি নাম উচ্চারিত হয়, একটি নাম ভালোবাসায় শ্রদ্ধায় আমরাও উচ্চারণ করি 'গাবো'। গাবো গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের নাম, একটি পরম শ্রদ্ধা আর সম্মানের নাম। হাতেগোনা কয়েকজন সাহিত্যিক ছাড়া বিশ্বজুড়ে এমন ভালোবাসা আর কেউ পায়নি। ল্যাটিন আমেরিকার ভূমিও ঊর্বরা। এখানেই জন্ম নেন কালের মহানায়কেরা যাঁদের অমর সৃষ্টি, দর্শন কিংবা বিপ্লব পৃথিবী জুড়ে আলোচিত হয়।

মার্কেজের জন্ম কলম্বিয়ার আরাকাটাকা গ্রামে। মার্কেজের জন্মের পর পিতা গাব্রিয়েল এলিজিও গার্সিয়া ফার্মাসিস্ট হিসাবে চাকরি পান। চাকরি পাবার পর তিনি লুইসা সান্টিয়াগা মার্কেজকে নিয়ে চলে যান বারানকুইলা শহরে। খুব শৈশব থেকে মার্কেজ বড়ো হতে থাকে আরাকাটাকা গ্রামে নানা-নানির কাছে। প্রায় নয় বছর পর অর্থাৎ ১৯৩৬ সালে শিশু মার্কেজ গ্রাম ছেড়ে চলে যায় বারানকুইলা শহরে যা এখন বিশ্বের অন্যতম আধুনিক শহর। মার্কেজের প্রিয় আরাকাটাকা গ্রামও পরিবর্তিত হতে হতে প্রায় শহরের মতো, আধুনিক জীবনের সব ছোঁয়ালাগা সেই গ্রামও এখন মার্কেজের মতোই পরিচিত। মানুষ বিখ্যাত হলে জায়গাটিও হয়। সম্ভবত খ্যাতির সাথে চলে যায় স্বাভাবিক প্রাকৃতিক স্পর্শটুকু। এই পরিবর্তন ভালো না মন্দ তা অবশ্য বিবেচ্য নয়। শতবর্ষের একাকিত্ব উপন্যাসের মাকোন্দো গ্রামকে কল্পনায় রেখে বর্তমান কলম্বিয়ার আরাকাটাকা গ্রামের তুলনা এখন আর চলবে না। আরাকাটাকা অনেক দূরে চলে গেছে। এই গ্রামে বিংশ শতকের গোড়ার দিকে প্রেমে পড়ে গাব্রিয়েল এলিজিও গার্সিয়া নামের এক যুবক আর লুইসা সান্টিয়াগা মার্কেজ নামের এক যুবতী। মার্কেজের নানা এই প্রেম মানতে পারেননি কারণ এলিসিও গার্সিয়া তার দৃষ্টিতে রক্ষণশীল এবং প্রেমিক পুরুষ। লুইসাকে দূরে পাঠিয়ে দেওয়ার পর তরুণ এলিসিও অসংখ্য চিঠি, কবিতা এমনকি টেলিগ্রামের মাধ্যমে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। অবশেষে তারা জয়ী হন। বাবা-মা'র প্রেমের এই ট্রাজি-কমিক ঘটনা উঠে এসেছে তার আরেক বিখ্যাত গ্রন্থ লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা উপন্যাসে। এরকম গ্রাম, গ্রামের মানুষ আর শৈশবের হাজারো স্মৃতি নিয়ে মার্কেজ শহরে যান বটে, তবে ফেলে যাওয়া গ্রাম পরম জাদুবাস্তবতায় বিরাজ করে তার বহুল পঠিত এবং ব্যাপক আলোচিত শতবর্ষের একাকিত্ব উপন্যাসে।

পিতা এবং মাতার কাছ থেকে প্রায় নয় বছর দূরে ছিলেন মার্কেজ। খুব কাছ থেকে দেখেছেন বাবা এবং মায়ের প্রেমের মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া নানা, তার প্রিয় 'পাপালেলো'। শৈশবের নয় বছর খুব ভালোভাবে প্রভাবিত হয় নানার দ্বারা। নানা বিখ্যাত 'এক হাজার দিনের যদ্ধ'-এ অংশ নিয়ে গ্রামের মানুষের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত। ইতিহাস আর বাস্তবতা এক অপরূপ সন্ধি নাতির সামনে উপস্থাপন করেন নানা। ফলে গ্রামের মানুষের হিরো মার্কেজেরও হিরো হয়ে যান। নানাই তাকে শব্দকোষ থেকে শব্দ শেখাতেন, নিয়ে যেতেন সার্কাসে। নানাই তাকে পৃথিবীতে প্রথম 'মিরাকল' দেখিয়েছিলেন যা আসলে ছিল এক খন্ড বরফ। নানার নানান গল্প শৈশবের মার্কেজকে ভাবিয়ে তুলত। নানা প্রায়ই শিশু মার্কেজকে বলতেন, মৃত মানুষ কতটুকু ভারি হয় তা কি আমরা কেউ কল্পনা করতে পারি। মানুষ হয়ে মানুষের জীবনহরণের বিরুদ্ধে এর চেয়ে শক্তিশালী কথা আর কী হতে পারে।

মার্কেজ তাঁর বন্ধু মেন্ডোজাকে বলেছিলেন, তাঁর নানা কর্নেল তাঁকে রূপকথার পরিবর্তে যুদ্ধের ভয়াবহ ঘটনা শোনাতেন। তিনি ছিলেন একজন লিবারেল। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন সেখান থেকেই গঠিত হতে শুরু করে। মজার বিষয় হচ্ছে মার্কেজের নানী বিশ্বাস করতেন ভূত-প্রেত আর নানা ধরনের অতিপ্রাকৃত বিষয়ে। ধারণা করা হয় মার্কেজের ম্যাজিক রিয়ালিজমের উৎপত্তি ওখানেই। শতবর্ষের একাকিত্ব উপন্যাসের বাস্তব সেটিং-এর সাথে বিভিন্ন অতিপ্রাকৃত ঘটনার সনি্নবেশন করার ভিত্তি তৈরি হয় মার্কেজের নিজের বাড়িতে, নানা আর নানির বিপরীত সহাবস্থানের মাধ্যমে। নানীর গল্প বলার অসাধারণ স্টাইলটি মার্কেজকে শৈশবে ব্যাপক আলোড়িত করেছিল।

কলম্বিয়ার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনার সময় সাংবাদিকতা দিয়ে মার্কেজের পেশাজীবন শুরু। ১৯৫০ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত বারানকুইলা থেকে প্রকাশিত এল হেরাল্ডো পত্রিকায় সেপ্টিমাস ছদ্মনামে লিখতেন হুইমসিক্যাল নামক কলাম। এ সময় তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ করেন বিভিন্ন দেশি এবং আন্তর্জাতিক সাহিত্য সংগঠনের সাথে। এটি তাকে বিশ্বসাহিত্য এবং সাহিত্যিকদের সঙ্গে পরিচিত করে। ভার্জিনিয়া উলফ এবং উইলিয়াম ফকনারের লেখা উপন্যাস এবং ন্যারিটিভ টেকনিক বা বর্ণনা কৌশল তাকে আলোড়িত করেছিল। বিশেষ করে ফকনারের ঐতিহাসিক থিম এবং গ্রামীণ জনপদ অন্যান্য ল্যাটিন আমেরিকান লেখকদের মতো তাকেও প্রভাবিত করেছিল। ফকনার সৃষ্ট ইয়োকনোপাথাউপা কাউন্টির আদলে মার্কেজ শতবর্ষের একাকিত্ব উপন্যাসে তৈরি করেন মাকোন্দো গ্রাম যাতে তার জন্মস্থান আরাকাটাকা গ্রামের ছোঁয়াও পাওয়া যায়। যাদু আর বাস্তববতার অবিস্মরণীয় এই মাকোন্দো ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে পাঠকের ভিতর। স্বপ্নবাস্তবতার এই গ্রাম পাঠকের আরাধ্য না হলেও মাকোন্দো আমাদের ভিতর জায়গা করে থাকে। ১৯৫৭ সালে মার্কেজ ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে আসেন এল মোমেন্টো পত্রিকায় চাকরি নিয়ে। তার প্রথম উপন্যাস ইন ইভিল আওয়ার প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে।

অনেকে বলে থাকেন বাইবেলের পর সবচেয়ে পঠিত এবং সবচেয়ে বেশি ভাষায় অনূদিত বই আনিওস দে সোলেদাদ (ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউট)। উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। প্রকাশের পর তুমূল আলোড়ন তৈরি হয় সারা বিশ্বের সাহিত্যজগতে। সম্ভবত আর কোনো ঔপন্যাসিকের কোনো উপন্যাস নিয়ে এতটা আলোড়ন তৈরি হয়নি। দ্য অটাম অব দি প্যাট্টিয়ার্ক উপন্যাস প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে এবং আরেক আলোড়ন তৈরি করা উপন্যাস লাভ ইন দি টাইম অব কলেরা প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। তার লেখা অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে আছে দি জেনারেল ইন হিজ ল্যাবিরিন্থ, অব লাভ এন্ড আদার ডেমনস। তার উপন্যাস ছোটোগল্পের জন্য ১৯৮২ সালে তাকে নোবেল প্রাইজ দেওয়া হয়। সাহিত্যের মহান এই কারিগর গত বৃহস্পতিবার মারা যান।
- See more at: http://www.sangbad.com.bd/index.php?ref=MjBfMDRfMjRfMTRfMV80MV8xXzE2MTQzNw==#sthash.AjzICqmr.dpuf

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন