রবিবার, ১১ মে, ২০১৪

মার্কেস : অতীতের সমান বয়সী একাকিত্বের সঙ্গী

ইমতিয়ার শামীম

নিউমোনিয়াকে পরাস্ত করে হাসপাতাল থেকে তিনি ফিরে এসেছেন আগের বাসায়, আগের সপ্তাহে আমাদের আশ্বস্ত করা এ সংবাদকে বিদায় জানিয়ে ১৭ এপ্রিল বৃহস্পতিবার গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের মৃত্যু এলো। যেন তিনি হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন ডেমোক্লিসের মতো, স্বেচ্ছাচারী ডায়োনিসিউস যাকে প্রতিস্থাপন করেছিলেন জাঁকালো ও গোছালো এক টেবিলে এবং তাঁর ঠিক মাথার ওপর ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল এক তীক্ষ্ন তরবারি, যার গোড়া বেঁধে রাখা হয়েছিল একটিমাত্র ঘোড়ার চুলে। ডেমোক্লিসের সেই অসহায়ত্বের কথা মার্কেস আমাদের শুনিয়েছিলেন ১৯৮৬ সালের ৬ আগস্ট, মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত ছয়টি রাষ্ট্রের নিরস্ত্রীকরণ সভায় দেওয়া এক ভাষণে। নিরস্ত্রীকরণের মতো নীরস বিষয় নিয়ে দেওয়া ভাষণও আমাদের মতো মানুষদের কাছে উদ্দীপনাময় হয়ে উঠেছিল মার্কেসের কথার গুণে।
কি কথায়, কি লেখায় সমান মুখ ও হাত চালানো এমন মানুষ আমাদের সময় কে-ই বা ছিল আর! সরগরম কলার বাজার হয়ে থাকা আরাকাটাকের কর্নেল মার্কেস যুদ্ধ, খরা, দুর্ভিক্ষ আর গৌরবময়তার স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে এবং মৃত ও জীবিতের মধ্যে ভেদরেখা দাঁড় করাতে অক্ষম ডোনা ট্রাঙ্কুইলিনার তার মৃত আত্মীয়দের দীর্ঘশ্বাসের কাহিনী শোনাতে পাঁচ বছর বয়স থেকে তাদের নাতিকে অতীতের সমান বয়সী এক মানুষে পরিণত করতে থাকেন। মানুষকে তার স্মৃতিময়তা দিয়ে বর্তমানের মধ্যে ঘুরপাক খাওয়াতে মার্কেসের কখনোই কোনো কষ্ট হয়নি। নিরস্ত্রীকরণ সভায়ও তিনি ওই সময়ের হিসাব-নিকাশকে কাজে লাগিয়ে আমাদের জানিয়েছিলেন, শিশুদের যদি গণনার বাইরেও রাখা হয়, তার পরও বলতে হয়, প্রতিটি মানুষ বসে আছে প্রায় চার টন ডিনামাইটের গোলার ওপর, যেগুলোর সম্মিলনে সংঘটিত বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে এই পৃথিবী থেকে প্রাণের চিহ্ন মুছে ফেলা সম্ভব কেবল একবার নয়- কমপক্ষে বারোবার। কিন্তু এই ভয়ংকর ধ্বংসশক্তির ওপর দাঁড়িয়েও আমরা আশাবাদী থাকি। কেননা মার্কেস আমাদের মনে করিয়ে দেন, পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব ঘটার পরও ৩৮ কোটি বছর লেগেছিল প্রজাপতির উড়তে শিখতে, তার পরও নাকি আরো ১৮ কোটি বছর লেগেছিল গোলাপকে শুধুই সুন্দর হয়ে ফুটে উঠতে, আর তার পরও পিথেকানথ্রপাসের পূর্বসূরিদের তুলনায় অতিরিক্ত চার-চারটি ভূতাত্তি্বক যুগ লেগেছিল মানুষের পাখির চেয়েও সুন্দর করে গান গাইতে শিখতে এবং ভালোবাসার জন্য মৃত্যুকে হাসিমুখে মেনে নিতে। যেন তিনি আমাদের না-বলেও বলে দেন, সশস্ত্রতার বিরুদ্ধে মানবতার জয়গান গাওয়া শিখতে আমাদের আরো বহু বহু দিন লাগবে, আরো বহু বহু দিন কাটাতে হবে দানবীয় নৃশংসতার মধ্যে একটি হলুদ ফুল ফুটে ওঠা দেখতে আর একটি হলুদ প্রজাপতিকে তার গায়ে উড়ে এসে বসা দেখতে। মুঠোফোনে এক সাংবাদিক বন্ধুর পাঠানো মার্কেসের মৃত্যুবার্তা দেখতে দেখতে ১৮ এপ্রিলের ভোররাতে অদ্ভুত নীরব ঠাণ্ডা বাতাসের স্পর্শ নিতে নিতে আমিও যেন অনন্ত নির্জনতায় ডুবে যেতে যেতে মনে করি, সাংবাদিকতাকে সাহিত্যচর্চার প্রতিবন্ধক হিসেবে দাঁড় করিয়ে কাউকে সমালোচনা করতে শুনলেই আমি গ্যাবোর মুখটি স্মরণে আনি- অবশ্য এ কারণে নয় যে সব সাংবাদিকের পক্ষেই তাঁর মতো সাহিত্যিক হওয়া সম্ভব; বরং এই কারণে যে যাবতীয় প্রতিভাহীনতা থাকার পরও আমরা জন্মেছিলাম মার্কেসের জীবৎকালে এবং তাঁর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না থাকার পরও কী ভীষণ আপনার হয়ে উঠেছিলেন তিনি আমাদের সবার!

তলস্তয়ের সাহিত্য থেকে কোনো কিছু না নেওয়ার পরও আজ পর্যন্ত লেখা যে উপন্যাসটিকে যিনি মনে করতেন 'যুদ্ধ ও শান্তি', অথচ বারবার পড়ার মতো সাহিত্যিক মনে করতেন কনরাড ও সেন্ট এক্সপেরিকে; কিন্তু যার কোনো লেখাতেই খুঁজে পাওয়া যায় না এদের কারো সাহিত্যের স্বাদ, সেই মার্কেসের সাহিত্য, তবে প্রভাবিত হয়েছিল কার লেখা থেকে? সমালোচকদের কথা শুনতে শুনতে তিনি নিজেও শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করতে শুরু করেন, উইলিয়াম ফখনারের প্রভাব রয়েছে তাঁর লেখাতে; পাশাপাশি সরাসরি জানিয়ে দেন, প্রভাব যদি কারো পড়েই থাকে, তাহলে তিনি হলেন ভার্জিনিয়া উলফ। তারপর তিনি তাঁর প্রভাবকদের তালিকা আরো দীর্ঘ করতে থাকেন- সফোক্লিস, র্যাঁবো, কাফকা, স্পেনের স্বর্ণযুগের কবিতা আর বাটক থেকে শুরু করে বার্টক পর্যন্ত সব অভিজাত গানকে যুক্ত করে। ফলে আমরাও অনুভব করি, প্রজাপতির প্রজাপতি হয়ে ওঠার জন্য ৩৮ কোটি বছর লাগার মতো তাঁরও মার্কেস হয়ে উঠতে যাত্রা শুরু করতে হয়েছিল সেই সফোক্লিসের কাল থেকে... অথবা কে জানে, আরো দূর অতীত থেকে! তিনিও বেড়ে উঠেছেন শত বছরের নির্জনতায়, আপাতদৃষ্টিতে যা মনে হয় কেবলই ১৮ মাসের এবং যে নির্জনতার শক্তি বুঝতে নোবেল কমিটির সময় লেগেছে এক কুড়ি বছর। ১৯৬২ সালে তিনি যে উপন্যাস লেখেন (লোস ফুনেরালেস ডি লা মাসা গ্রান্দে বা হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচ্যুড বা নির্জনতার এক শ বছর), সে জন্য নোবেল পুরস্কার পান ১৯৮২ সালে। আমরা তখন কলেজে হাঁটছি, আমরা তখন কোনো নির্জনতায় নেই, সামরিক শাসনের সযত্ন তত্ত্বাবধানে উদ্গত গুলির শব্দ আমাদের নির্জনতাকে ভেঙে ফেলছে এবং গুলির শব্দকে আবার ঢেকে দিচ্ছে আমাদের কালের একাগ্র প্রতিবাদী ক্রুদ্ধ স্লোগান।

'লোস ফুনেরালেস ডি লা মাসা গ্রান্দে' বা 'নির্জনতার এক শ বছর' আমাদের কালের আড্ডাকে অনেক স্পর্শ করে; কিন্তু সত্যি বলতে গেলে আমি মার্কেসের সংস্পর্শে আসি প্রথমে 'লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা' এবং পরে 'জেনারেল ইন হিজ লেবেরিন্থ'-এর মধ্য দিয়ে। এবং এখনো অবচেতনে সেই প্রেমিকদের দেখতে পাই, যারা বারবার বিশ্বাসহত্যার পরও বিশ্বাসহত্যার মধ্য দিয়েই চিরপ্রেমিক হয়ে ওঠেন। শতাব্দীর শেষ দশকের কোনো এক জন্মদিনের সকালে আমাদের শিল্পী বন্ধু ধ্রুব এষের কল্যাণে 'জেনারেল ইন হিজ লেবেরিন্থ'-এর দেখা পাই আমি। যদিও এসব বুঁদ হয়ে যাওয়ার মতো লেখা আরো অনেক আগেই না-পড়ার গ্লানি আমাকে এমনকি এখনো স্পর্শ করে না। আমাদের জেনারেলরা আমাদের কাছে তাদের চাপিয়ে দেওয়া সামরিক শাসনের গুণে এখনো এত অস্পৃশ্য যে তারুণ্যের সময়টুকু তেমন কিছু না-পড়ে কেবল তাদের বিরুদ্ধে খরচ করার গৌরব অনুভবের শক্তি এখনো আমরা বয়ে চলেছি। আরো পরে সন্ধান মেলে অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্চ বা মোড়লের শরতকালের এবং আমি ও আমার বন্ধুরা নিশ্চিত হই, যদিও এসব বইয়ের সত্যিকারের স্বাদ নেওয়ার ক্ষমতা নিশ্চয়ই অনেকেরই আছে; কিন্তু আমাদের তা আছে আরো তীব্র ও সত্যিকারভাবে- কেননা কেবল আমরাই ঘাম ঝরিয়ে এবং মিছিল থেকে হারিয়ে গিয়ে মিছিলের স্লোগান হয়ে ফিরে আসা বন্ধুদের নাম আজীবনের জন্য হৃদয়ের কুঠরিতে তুলে নিয়ে অর্জন করেছি এমন এক তীব্র ঘ্রাণশক্তি, যা এর অন্তর্নিহিত স্বাদকে ধরে নিয়ে আসতে পারে মরুভূমিতে তলিয়ে যাওয়া গুহার মধ্য থেকে।

জীবদ্দশাতেই এমন কিংবদন্তি হয়ে ওঠার শক্তি কি পৃথিবীর আর কোনো লেখকের ছিল? সেটা সত্যিই ভাবার বিষয়।

তিনি আমাদের মুগ্ধ করেছেন বটে; কিন্তু প্রভাবিত কতটুকু করেছেন, সেটিও ভেবে দেখার বিষয়। আমাদের কাউকেই বোধ হয় 'মাংসের রসে ডোবানো মূত্রাশয়ের গরম গন্ধ' তত বেশি স্পর্শ করেনি যে আমাদের 'নাসারন্ধ্রের সম্মান দারুণভাবে জরুরি ভিত্তিতে' বেড়ে যাবে এবং আমরা এই ভেবে পরম তৃপ্তি পেতে শুরু করব যে আমাদের 'আত্মার মধ্যে একটা বড় নামজাদা কুকুর লেজ নাড়তে শুরু' করেছে। আমাদের আত্মার মধ্যে একটা বড় নামজাদা কুকুরকে পেঁৗছে দেওয়া মার্কেসের গল্প আমাদের কাছে এখনো এক গোলকধাঁধার মতো, যেমন এক গোলকধাঁধা সন্ধ্যা ৬টার সেই মেয়েটি, জোসের রেস্তোরাঁয় প্রতিদিন বিকেলে যে অপেক্ষা করে খদ্দেরের আশায়। গল্প ও উপন্যাসের মধ্যকার বিভেদকে তিনি দাঁড় করিয়ে নিয়েছিলেন সুস্পষ্টভাবে এবং নিজের মতো করে। তাই তাঁর গল্প ও উপন্যাসের মধ্যকার রচনাশৈলীতেও হয়তো এক ধরনের পার্থক্য অনুভব করতে পারি আমরা, বিশেষ করে গল্প পড়তে গিয়ে। মার্কেসের দুটি বিষয় বোধ করি আমাদের এই পার্থক্য অনুভব করার দিকে তাড়িত করে। যার একটি হলো, লাতিন আমেরিকার উপন্যাসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার কারণ সম্পর্কে 'ওয়ার্ল্ড মার্কসিস্ট রিভিউ'র জানুয়ারি, ১৯৮৮ সংখ্যায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে তাঁর দেওয়া ব্যাখ্যা, যেখানে তিনি বলেন, 'লাতিন আমেরিকার উপন্যাসের জাতীয়তাবাদী মেজাজ এর বড় কারণ।' আরেকটি হলো, উপন্যাস লেখার প্রক্রিয়া সম্পর্কে দেওয়া তাঁর ভাষ্য, যেখানে তিনি বলেন, 'ছোটগল্প লেখার প্রক্রিয়া কংক্রিটের ঢালাইয়ের মতো আর উপন্যাসের প্রক্রিয়া থরে থরে ইট সাজানোর মতো।' লক্ষ করার বিষয়, মার্কেসের গল্পগুলো জাতীয়তাবাদী মেজাজ থেকে অনেকটাই মুক্ত, যদিও ভৌগোলিক পটভূমির দিক থেকে মাকোন্দোর মতো কোনো কোনো স্থান এসব গল্পে উঠে এসেছে। কিন্তু কংক্রিটের ঢালাই দেওয়ার মতো প্রক্রিয়াই বোধকরি ওই পটভূমিকে অন্য এক স্বাদে ঢেকে দিয়েছে এবং জাতীয়তাবাদী মেজাজ থেকে মুক্ত হওয়ার পরও এসব গল্প আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু উপন্যাসে তিনি সত্যিই যেন থরে থরে ইট সাজিয়ে চলেন এবং বর্তমানকে করে তোলেন ইতিহাসের সমান বয়সী। যেমন 'অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্চ'কে যদিও তিনি তাঁর সবচেয়ে আঞ্চলিক উপন্যাস মনে করতেন, তার পরও তাঁর মতে, এটিই সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস। ১৭ বছর লেগেছে তাঁর এ উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে, আর পুরো উপন্যাস ফেলে দিয়ে নতুন করে লিখেছেন মোট দুইবার। তবে এই লেখাকে নেহাৎ কমই বলা হবে, কেননা 'নো ওয়ান রাইটস টু কর্নেল'কে তিনি লিখেছিলেন মোট ৯ বার! লিখতে গিয়ে সঠিক স্বরটি খুঁজে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করার ঈর্ষণীয় ক্ষমতা ছিল তাঁর- যেমন, 'হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচ্যুড' লিখতে গিয়ে তিনি সেটি ফেলে লিখতে শুরু করেন 'অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়াচ'; আবার সেটি অসমাপ্ত রেখে ফিরে আসেন 'হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচ্যুডে'- কেননা একটি লিখতে গিয়ে যখনই তাঁর মনে হতো স্পষ্ট ধারণা নেই, তখনই তিনি তা ফেলে রাখতেন অনির্দিষ্টকালের ঝোলায়। তুলনায় ছোটগল্পগুলো হতভাগাই বলতে হবে- কেননা সঠিক স্বর খুঁজে না পেলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে সেটিকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলতেন। কারণ গল্প ও উপন্যাসের পৃথকীকরণ সম্পর্কে তাঁর ওই সুস্পষ্ট ধারণা- কংক্রিট ঢালাই বারবার করা সম্ভব নয়, সঠিকও নয়- তাই মনমতো না হলে সেখানে লেগে থাকার কোনো অর্থ নেই; বরং শুরু করা উচিত একেবারে নতুনভাবে। অন্যদিকে উপন্যাস মনমতো না হলেও আবার শুরু করা যায়, তাতে কোনো সমস্যা নেই- অন্তত মার্কেসের কাছে।

লেখা বাদেও, মার্কেস তাঁর জীবনকে ঐশ্বর্যময় করেছেন এবং সমসাময়িক সাহিত্যিকদের ঈর্ষান্বিত করে তুলেছেন বিস্তৃত রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মযজ্ঞ দিয়ে। নিজের ষোল আনাই আস্থা ছিল তাঁর সমাজতান্ত্রিক আদর্শে; কিন্তু মুক্তচিন্তাই ছিল তাঁর বিশ্বস্ত সহচর। কিউবার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সখ্যের কথা সবারই জানা। কিন্তু ১৯৬৮ সালে সে সময়ের সোভিয়েত রাশিয়া যখন চেকোস্লোভাকিয়াকে আক্রমণ করে এবং কাস্ত্রো সে আক্রমণকে সমর্থন করেন, তখন মার্কেস সরাসরি প্রতিবাদ করেন এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের আক্রমণের প্রতিবাদ করবেন বলে জানান। এটিই ছিল তাঁর এবং কাস্ত্রোর মধ্যকার একমাত্র মতবিরোধ। কাস্ত্রোর প্রতি তিনি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন এক ভোরে যখন তিনি আবিষ্কার করেন, কাস্ত্রোকে তিনি যেসব বই পড়ার পরামর্শ দিচ্ছেন সেসবই তাঁর (কাস্ত্রোর) পড়া হয়ে গেছে! মুগ্ধ মার্কেস পরে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, কাহিনীর যে অংশে বৈপরীত্য এবং তাত্তি্বক ভ্রান্তি সবচেয়ে কম আশঙ্কা করা হয়, কাস্ত্রো সে অংশের ভুল ধরিয়ে দিতে পারেন খুব সহজেই- এমনই মনোযোগী পাঠক তিনি। মার্কেসেরও কয়েকটি লেখার ভুল ধরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। জনশ্রুতি আছে, মার্কেস তাঁর পাণ্ডুলিপি কাস্ত্রোকেই প্রথম পড়তে দিতেন। তবে সাহিত্যের সূত্রে তাঁর ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল ফ্রান্সের মিতেরাঁর সঙ্গেও। আর বিল ক্লিনটনের রহস্যময়তাকেও মার্কেস খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন তাঁর নিজের মতো করে। প্রথমবার প্রার্থী হওয়ার পর বিল ক্লিনটন তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় বলেছিলেন, 'হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচ্যুড' তাঁর প্রিয় লেখা।

বিভিন্ন শিরোনামে বহু সংখ্যায় লিখলেও সব লেখকই জীবনে মাত্র একটি বই-ই লেখেন- মনে করতেন তিনি; মনে করতেন তাঁর সেই বইটি হলো একাকিত্বের বই- যে একাকিত্ব ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর প্রতিটি লেখায়। একাকিত্বের সঙ্গেই জীবন-মৃত্যু যাপন করে তাঁর পত্রঝড় বইয়ের প্রধান চরিত্র, যেমন একাকিত্বময় জীবন যাপন করেন 'নো ওয়ান রাইটস টু কর্নেল'-এর কর্নেল। লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরায়ও দেখা যায়, মার্কেসের নিজের কথাতেই, শহরের মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়ে নির্জন এক ব্যক্তিত্বে পরিণত হচ্ছেন মেয়র সাহেব। এই একই একাকিত্ব ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায় তার আরো সব উপন্যাস ও লেখায়। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মার্কেস নিজেই এবার সেই অনন্ত একাকিত্বকে বেছে নিলেন। যেমনটি আমরা পাই মার্কেসের নিজের লেখাতেই- কী ঘটেছে তাতে কিছুই আসে যায় না; বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, কী তুমি মনে করতে পারো এবং কিভাবে তুমি সেটি মনে করতে পারো। অন্যভাবে হয়তো আমরা এখন বলতে পারি, মার্কেসের মৃত্যুতে কিছু যায় আসে না, গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, আগামী দিনগুলোয় এই মৃত্যুকে আমরা কিভাবে মনে রাখব এবং কেন রাখব- কিভাবে এই মৃত্যু আমাদের নির্জনতা ও একাকিত্বে আমাদের সঙ্গ দেবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন