শনিবার, ১০ মে, ২০১৪

মোমিনুল আজমের গল্প : স্বপ্নের বেসাতি

পূব আকাশে জন্ডিস চোখের আভা দেখার আগেই বাসা থেকে বের হয়ে বরফ পরিস্কারের ঝামলা সেরে গাড়ীতে ষ্টাটর্ দিয়ে দুতিন মিনিট অপেক্ষার পালা, আনকোরা গাড়ী নয় যে ষ্টাটর্ দিয়েই ছুটে চলা যায়! ওয়ামর্ আপ না করলে অল্প পয়সায় কেনা গাড়ীর প্রাণ বায়ু যে কোন সময় বের হয়ে যেতে পারে। এরপর গাড়ী নিয়ে মিনিমাম আশি কিলোমিটার বেগে ছুটতে হয়। তা না হলে গাড়ী পার্ক করে দুশো গজ হেটে গিয়ে গ্লোভস, সেফটি স্যু, সেফটি গ্লাস পড়ে লাইন সাইড মিটিংয়ে দাড়াতে পাঁচ সাত মিনিট দেরি হয়ে যায়, যা বিশ্বব্যাপী মন্দাক্রান্ত অর্থনীতির আঁচে পুড়ে যাওয়া কাজের বাজারে রুটি রুজির পথকে ব্যহত করতে পারে পারে একই দিনের নোটীশে। 


মধ্যম গোছের কর্মকর্তা হিসেবে একটি দেশীয় বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরুর চার বছরের মাথায় স্কিল প্রোফেশনাল কোটায় শফিক চলে আসে উত্তর আমেরিকার তুষার শুভ্র দেশটিতে। স্বপ্নের ফেরি করা দেশটিতে পা দেয়ার তিন মাসের মাথায় কাজ পেয়ে ধন্য হয় সে। বানিজ্যের তত্ব আউড়ে দেশীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তার তকমা আটা চাকুরির চার বছরের অভিঙ্গতা কোন কাজেই লাগেনা তার। দেশ থেকে নিয়ে আসা ডলারের ফিগার যখন তিন অঙ্কে নেমে আসলো তখন স্কিল ওয়ার্কারের গর্ব ত্যাগ করে ঢুকে পড়লো কাজে। কাজের ছয় মাসের পূর্তিতে তাকে স্থায়ীকরণের প্রক্রিয়া চলছে। এ ছয়মাসে সুপারভাইজারের সার্বক্ষনিক নজরদাড়িতে কাজের গতিবিচারে সে সম্ভবত পাশ করতে পেরেছে।

বাঙ্গালী জাতির সাহসী ভূমিকা নিয়ে গর্ব আছে। এ গবর্ে তারা নিজেরা যেমন গর্বিত তেমনি অন্যান্য জাতিগোষ্ঠিও এ গর্বের প্রশংসা করতে দ্বিধা করে না। পরিক্ষিত সাহসী জাতি এ সাহসের স্বাক্ষর রেখেছে ১৯৫২ সালের ভাষার দাবীতে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা আন্দোলনে এবং অবশ্যই স্বৈরাচার বিরোধী গণ আন্দোলনে। আর বিদেশী কেউ আসলে আমরা হামলে পড়ি আপ্যায়নে। কী রাষ্টীয় কী ব্যক্তি জীবনে সর্বোত্রই এ আতিথেয়তার বাড়াবাড়ি। আর তারা যাওয়ার সময় পুলকিত কিংবা বিরক্ত হয়ে আমাদের কপালে সজোরে অতিথি বাৎসল জাতির সিল মেরে যায়। কিন্তু কেউ আমাদের কর্মঠ জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এমনটি কখনও শুনি নি। কিন্তু সুপারভাইজার যখন তার কর্মের প্রশংসা করে সার্টিফিকেট দিলো তখন সকালের সোনা রোদে খড়ের গোদায় ওম নিতে থাকা নেড়ী কুকুরের মতো অলস জাতির প্রতিনিধি হিসেবে নিজের কর্মস্পৃহায় সে নিজেই চমৎকৃত।

ফুরসৎবিহীন আট ঘন্টা কাজের মাঝে যখন সে ত্রিশ মিনিটের আন পেইড লাঞ্চ ব্রেক পায় তখন শার্লীর হাতের তৈরি স্যান্ডউইচ খেতে খেতে ভাবে, আহা! কি কাজ ফাঁকির মহড়াটাই না চলে দেশের সরকারি অফিসগুলোতে। তার অফিসের সময়সূচি ছিল সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা, যা ঢাকা শহরের সরকারি বেসরকারি সবগুলো অফিসের সময়সূচি। ব্যক্তিগত আলসেমি, অফিসমূখি যানজটের অজুহাতে তার অফিসের কোনরুমের তালাই সাড়ে নটার আগে খুলেছে এমনটি তার চোখে পড়ে নি। তার পরেও আছে কর্মফাকির নানা অনুসঙ্গ। তালাচাবি খুলে সিটে বসতে বসতে সকাল দশটা। দুঘন্টা ঢিমেতালে কাজ করে ১২ টা থেকে শুরু হয় নামাজ ও মধ্যাহ্ন ভোজের প্রস্তুতি। এপর্ব সারতে সারতে দুটো বেজে যায়। এ সময় কাজ নিয়ে কোন কিছু বললে আপনাকে নির্ঘাৎ নাস্তিকতার গালাগাল শুনতে হবে। আধাঘন্টা আনপেইড ওয়ার্কিং লাঞের যে সংস্কৃতি সারা কানাডা জুড়ে, তার বাস্তবায়ন করতে গেলে কতো পূর্ণ দিবস কর্মবিরতির ফাঁদে পড়বে বাংলাদেশ তা কল্পনাও করতে পারে না সে। চারটা বাজতে বাজতে আবার ফেরার প্রস্তুতি শুরু হয়। ভাবখানা এমন যে দুবার তো আর দেরি করা যায় না, সকালে দেরিতে এসেছে তাই বিকেলে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরা তাদের কর্তব্য। এরুপ একটি কাজের পরিবেশ থেকে এসে নিজের দক্ষতা প্রমান করতে পেরে শফিকের গর্বের সীমা পরিসীমা নেই।

চাকুরি স্থায়ীকরনের কথা শুনে শার্লীর চোখে রঙ্গিন স্বপ্ন। ছেলে এবং মেয়ের পড়াশুনা , স্বাস্থ্যগত সমস্যা নিশ্চিত করা গেছে। হেলথ কাডর্ নামে প্লাষ্টিক একটি কার্ডের বিনিময়ে কত হাজার ডলারের যে চিকিৎসা ফ্রি পাওয়া যায় এটি যাদের নেই তারা হাড়ে হাড়ে টের পায়। এতো সুবিধার পরও হাসপাতালে গেলে মেজাজ খিচড়ে থাকে তার। ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে কার ভালো লাগে। ওয়েটিং রুমের শব্দহীন এলইডি মনিটরে যখন ভেসে ওঠে র্উই আর গিভিং ইউ এ ওয়াল্ডর্ ক্লাস মেডিকেল সাভর্িসেস র্ তখন বউয়ের ছোটভাই সম্পর্কিত গালি মুখ থেকে অবলীলায় বের হয়ে আসে। এখানে ওয়াল্ড ক্লাস সাভর্িস পাওয়া যাবে তখনই যখন কেউ মৃত্যুর দরজায নক করবে আর পাশে থেকে কেউ ৯১১ এ কল করবে।

আমার মুখে এসব নেতিবাচক কথা শুনে শার্লী রাগ করে। সে আছে তার স্বপ্নের ভবিষ্যত নিয়ে। ছেলে মেয়ে দুটো পড়াশুনা করছে স্কুলে, শুধু ফ্রি না স্কুলে যাওয়া আসার বাসের টিকিট পর্যন্ত লাগে না, তার উপর মাসে মাসে ব্যাংকে জমা হয় সাত শ ডলার যার নাম চাইল্ড বেনিফিট। আঙ্গুল বা দাতের চাপে ব্যাথা অনুভব করলে পরের দিন চলে যায় ডাক্তারের কাছে। এ যাবৎ তিনবার ম্যামোগ্রাম করিয়েছে সে। ছোট খাটো চাইনিজ ফ্যামিলি ফিজিসিয়ানের সাথে তার সখি সখি ভাব।

এর মাঝে শার্লী নিজের ই-মেইল ব্যবহার করে রিম্যাক্সের সাথে রঙ্গিন স্বপ্নের বাস্তবায়নে পথ চলা শুরু করেছে। প্রতিদিন তার একাউন্টে এসে ভিড় করছে শতশত বাড়িঘরের নাম ঠিকানা। এক শ বছরের পুরনো বাড়ির ছবি দেখে মনে হবে এইমাত্র ডেভলোপার তার সদ্য সমাপ্ত বাড়ির কাগজ হস্তান্তর করে দায় মুক্তির সার্টিফিকেট নিলো।

উইক এন্ডের দুপুরে গরুর ভুনা মাংস দিয়ে ভাপ ওঠা গরম ভাত খেয়ে যখন সে দিবা নিদ্রার প্রস্তুতি নিচ্ছে ঠিক তখনি শার্লী কম্বলের নিচে পা দিয়ে মৃদু চাপ দিতে দিতে বললো-

চলোনা আজ বিকেলে ক্লেয়ার রোডের বাসাটা একটু দেখে আসি। বাসা দেখলেই তো আর কিনতে হবে না।

কম্বলের নিচের উষ্ণতার কারনেই হোক বা উইক এন্ডের রাতের পরিবেশ গাঢ় করার ইচ্ছার কারনেই হোক সামনে সমুহ বিপদের সম্ভাবনা মাথায় নিয়ে রাজি হয়ে যায়। হা সূচক মতামত পেয়ে লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে ক্যানন এমজেড প্রিন্টারে ক্লেয়ার রোডের বাসার ডকুমেন্ট প্রিন্ট দিতে দিতে ফোনে এজেন্টের সাথে বিকেল পাঁচটায় এ্যাপয়েন্টমেন্ট করে ফেলে। দুপুরে কম্বলের নীচের উষ্ণতা হারিয়ে শফিক উসখুস করতে থাকে।

উত্তর আমেরিকায় বাড়ির মালিক বনে যাওয়া বড় কোন বিষয় না। মধ্যম গোছের আয় রোজগার থাকলে ৫ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ২.৯ শতাংশ সুদে যে কেউ অধর্ মিলিয়ন ডলারের একটি বাড়ি কিনে দিব্যি বসবাস করতে পারে। ৩০-৩৫ বছরের ব্যপ্তি নিয়ে যে ব্যাংকগুলো টাকা দেয়ার জন্য অস্থির হয়ে থাকে তাদের ব্যবসায়িক চিন্তা নিয়ে সামান্য মাথা ব্যাথা আছে শফিকের। তারা কী একবারও ভাবে না অধর্ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা পর্যন্ত ঝণ গ্রহিতা বাচবে কিনা? অবশ্য এসব বিষয় নিয়ে মর্টগেজ প্রদানকারকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যাংকগুলি মোটেও চিন্তিত নয়। মাসে মাসে মর্টগেজের কিস্তি দিতে না পারলে ক্রোক পরওয়ানা জারি করে বাড়ীঘর নিলামে তুলবে। এক্ষেত্রে দেশের মতো কোর্ট কিংবা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কোন তৎপরতা চোখে পড়ে না। হাউজলেস মানুষগুলো তখন সরকারি আবাসনের সুযোগ নিয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করে। আয় করলে ভাড়া দিতে হবে তাই অলস কিসিমের কিছু লোক কাজ ছেড়ে দিয়ে সোসাল সিকিউরিটির সাহায্য নিয়ে বেকার জীবন যাপন শুরু করে। নিজেরাই বিষয়টিকে অমর্যাদাকর মনে করে কমিউনিটি সাথে যোগাযোগ ছিন্ন করে প্রকৃতপক্ষে গৃহবন্দি হয়ে থাকে।

চৌকষ ড্রেস আর কথার ফুলঝুরির মাঝে স্যার, ম্যাম শব্দে রিমেক্সের এজেন্ট যখন আমাদেরকে এক প্রকার হিপনোটাইজ করে ফেললো তখন শার্লী কানের কাছে মুখ লাগিয়ে বললো-

মনে হয় অনেকটা কম দামেই বাড়ীটা বাজারে ছেড়েছে, তাছাড়া ব্যাক ইয়াডর্ে অনেক যায়গা, ছেলে মেয়েরা অন্তত বিকেল বেলা খেলতে পারবে আর তোমার বাগান করার পুরনো শখটাও নতুন করে শুরু করতে পারবে।

বাগানের কথা শুনে মনটা উদাস হয়ে যায় শফিকের। একটা সময় ছিল যখন বাগানই ছিল তার ধ্যান জ্ঞান। কোন গাছে কখন ফুলের কলি আসতো, কোন ফুলটা কদিন আগে ফুটেছে সবই ছিল তার নখদর্পনে। ঝড়ে বা বাতাসে কলি সমেত কোন ডাল ভেঙ্গে পড়লে তার কষ্টের সীমা থাকতো না। বাসার সামনের একচিলতে জমিতে ভর করতো তার সমস্ত আবেগ আর অনুভূতি। শীতের মাঝামাঝি সময়ে বাসার সামনটা ভরে উঠতো ফুলে আর তখন সামনের একলেনের রাস্তা দিয়ে রিক্সায় বা হেটে কেউ যাওয়ার সময় তার বাগানের দিকে তাকিয়ে প্রশংসা করে নি এমনটি কখনও হয় নি। বিয়ের পর বাগান নিয়ে সেই আবেগ অনুভুতির কথা সে শুনিয়েছিল শার্লীকে। বিয়ের পর বাগান করার মতো ভালো বাসা আর ভাড়ায় পাওয়া হয় নি তাদের, এ নিয়ে তার সামান্য কষ্ট আছে। শার্লী যে সে কথাটি মনে রেখেছে এবং মোক্ষম সময়ে সে ব্যবহার করেছে তা ভেবে চমৎকৃত হয়।

শফিকও অনেকক্ষন ঘোরের মধ্যে ছিলো। দেশ থেকে আসার ছয় মাসের বেশি হলো অথচ এ ছয় মাসে একবারও সে স্যার ডাক শুনতে পায় নি, সপিং মলে দু একবার শুনলেও শুনতে পারে কিন্তু সেটা ছিল কোম্পানীর লাভের সাথে স্যার শব্দ ফ্রি। আজ একসংগে অনেকবার স্যার ডাক শুনে তার দেশের কথা মনে পড়ে গেল। সে যতক্ষন অফিসে থাকতো স্যার ডাক শুনতে শুনতে কান ঝালা পালা হয়ে যেত। মাঝে মাঝে মনে হতো কর্মচারীরা অফিসে আসতো স্যার ডেকে তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য। দেশে থাকতে তার কখনও মনে হয় নি এ ডাকটির মাঝে সন্মান লুকিয়ে আছে কিন্তু এজেন্টের স্যার ডাক শুনে আজ নিজেকে সন্মানিত বোধ করছে। এ মুগ্ধতা থেকে শার্লীর কথার সাথে সে দ্বিমত করতে পারলো না। শুধু বললো বাসায় গিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে।

শার্লীর বাড়ি কেনার স্বপ্নের বাস্তবতা হয়তো নেই তবে এটাও তো ঠিক - স্বপ্ন আছে বলেই মানুষ বেচে আছে। স্বপ্ন না থাকলে দুঃস্বপ্নকে ছেড়ে দিতে হয় স্থান। শার্লীর স্বপ্নের কারনেই শুণ্য থেকে শুরু করা জীবন আজ দেশের মাটিতে ভরপুর। জীবনযাত্রার মান বিচারে প্রথম স্থানে থাকা এ দেশটিতে সে যে বাড়ী কেনার চিন্তা করছে এটাই বা কম কোথায়। শার্লীর এ স্বপ্নকে সে কোন সময় অশ্রদ্ধা করে না, তার এ স্বপ্নযাত্রায় সহযোগী থাকার প্রত্যয় নিয়ে যে জীবনের শুরু, সে জীবনের ফলাফল অনেকের কাছে ইষর্ার। তাই শফিকও অবাস্তব জেনে বাড়ি কেনার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছে না।

যে বাড়িতে তারা এখন থাকে সেটা সেমি বেজমেন্ট। বেসমেন্টে ঢোকার আলাদা কোন রাস্তা নেই। এনট্রান্স শেয়ার করতে হয় বাড়িওয়ালার সাথে। রাত বিরেতে এটি নিয়ে তাকে প্রায়ই বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। সেমি বেসমেন্টের কথা শুনেই তার মনে হয় যার অর্ধেকটা কবর আর অর্ধেকটা বাসস্থান। কুর্নিশ করে বাসায় ঢোকার সিস্টেমটাই তার কাছে অসহ্য মনে হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় ঢুকতে গেলে দুচারদিন পরপর মাথায় বা কপালে যে গোল সুপারির আবিভর্াব হয় তা সে ভলোমতোই জেনে গেছে। অবশ্য ভিতরের পরিবেশ যে বসবাসের অনুপযোগী তা কিন্তু বলা যাবে না। ছিমছাম গোছানো পুরো কার্পেট মোড়ানো বেসমেন্ট দেখলে দেশের যেকোন অভিজাত বাড়ির সমতুল্য মনে হয়। বাড়তি হিসেবে পাওয়া যায় ফ্রিজ, মাইক্রোওয়েভ, ওয়াশিং মেশিনসহ গরম ও ঠান্ডা পানির সারা বৎসরের সরবরাহ। তাছাড়া শীতকালে হিটিং আর গরমকালে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কেন্দ্রীয়ভাবে কাজ করে, যার খরচ মাসিক সাতশত ডলারের ভাড়ার সাথে একীভূত করা। এর বেশি কিছু চাওয়ার দুঃসাহস কিংবা পাওয়ার সামর্থ হয়তো শফিকের নেই তারপরও কেন জানি তার মনে হয় নেটের মিটসেফে রাখা তরকারি ফ্রিজের হিমশীতল তরকারির চেয়ে সুস্বাদু, এসির গুমোট বাতাস লিচুতলার ঝিরি বাতাসের তুলনায় অনেকটা একঘেয়ে আর ওয়াশিং মেশিন কাপড়ের গন্ধ ছাড়া ময়লা যে পরিস্কার করতে পারে না এটা সে ভালভাবেই জানে।

এতোসব আরাম আয়েসের মাঝে থেকেও বাড়ী কেনার দরকার কী- এমন প্রশ্নে শার্লী আমার পাশে সোফায় নিবিড় হয়ে বসে যুক্তির ডালি তুলে ধরে যা খন্ডনের সামথর্ আমার নেই তবে সপ্তাহান্তে টিভি সিরিয়াল বিগ বস দেখায় যে বিঘ্ন ঘটছে তা বলে তাকে নিবৃত করি। শার্লী আমার নিস্পৃহ ভাব দেখে পাশ থেকে নিরবে উঠে গিয়ে অন্য কাজে ব্যস্ততা দেখায় যদিও সে ব্যস্ততার মাঝে প্রানস্পন্দন নেই আছে আহত হৃদয়ের মলিনতার ছাপ।

বেশ কয়েকদিন থেকে বাসার পরিবেশটা গুমোট; শার্লী খাচ্ছে দাচ্ছে ঘুমোচ্ছে, বাচ্চাদের টিফিন, আমার ওয়ার্কিং লাঞ্চ সবকিছুই তৈরি হচ্ছে সময়মতো, নির্বিকার ভঙ্গিতে, কিন্তু গরম তেলে পিয়াজ আর পাচফোড়নের মাঝে ডাল বাগার দেয়ার যে তেজ আর গন্ধ সেটির দেখা পাওয়া যাচ্ছে না সংসারে অথচ এরকম একটি তেজি গন্ধময় সংসার আমার। বাচ্চারা আকার ইঙ্গিতে বলে-হেড অফিস হট।

লং উইকএন্ড আসছে। পরিবেশ এরকম থাকলে সবকিছু বিফলে যাওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ তাছাড়া খাও দাও ফূতর্ি করো নেই ঝামেলা - ছোটবেলায় শোনা এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া গানের মতোই এখানে আসে উইক এন্ড গুলো যা বিনা পার্টিতে নষ্ট হবে এমটি মেনে নেয়া যায় না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার প্রত্যয় নিয়ে যেন কিছুই হয় নি এমন একটি ভাব ধরে বলি-

-চলোনা এ উইক এন্ডে কোথাও থেকে ঘুরে আসি। অনেক গরম পড়েছে, ওয়াসাগা বিচে যাওয়া যেতে পারে।

শার্লী কোন কিছু বলার আগেই বাচ্চারা হৈহৈ করে ওঠে। অর্থাৎ প্রস্তাব পাশ, শার্লীর আপত্তি আর পাত্তা পাবে না।

এর আগেও দুবার এসেছে তারা ওয়াসাগা বিচে। জর্জিয়ান সাগরের কোল ঘেষে উষ্ণ পানির এ বিচে সামারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নগ্ন নারী পুরুষের জলকেলিতে সরগরম থাকে, যা দেখে লজ্জায় সারাটা সময় গুটিয়ে থাকে শার্লী, অবশ্য শার্লীর পরনে যে পোষাক তা যদি দেশের সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারে বা কুয়াকাটায় পড়তো তাহলে জনরোষ ঠেকানো অসম্ভব হয়ে যেত। দু ঘন্টার ড্রাইভ করে ফিরতে হবে বাসায়, দু ঘন্টার ড্রাইভ মানে প্রায় আড়াই শো কিলোমিটার অতএব জলকেলি সাঙ্গ করতে হয় সূযর্ের তেজ কমার সাথে সাথেই। বীচের উৎফুল্লতার নীচে চাপা পড়লো শার্লীর কয়েকদিনের নিঃস্পৃহতা। বাড়ি কেনা সংক্রান্ত জটিলতা সাময়িকভাবে জর্জিয়ান সাগরের জলে জলাজ্ঞলি দেয়া গেছে এমনটি ভেবে শফিক শিষ বাজিয়ে কান্ট্রিসাইড বোড ধরে ড্রাইভ করতে থাকে আর গাড়ীর ষ্টেরিও থেকে লাউড স্পিকারে ভেসে আসে মটলি ক্রুর সেই বিখ্যাত গান র্ হোম সুইট হোম র্।




লেখক পরিচিতি
মোমিনুল আজম

জন্ম : গাইবান্ধা, রংপুর।
কৃষিবিদ। গল্পকার। প্রবন্ধকার। 


৬টি মন্তব্য:

  1. এ গল্পে কানাডার অতিবাহীত অভিজ্ঞতা দারুনভাবে ফুটে উটেছে, আরও নতুন কিছু লিখ সবুজ।

    উত্তরমুছুন
  2. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  3. সবুজ ভাই, এখানে কি আপনি নিয়মিত লেখেন? ভালো লাগলো আপনার গল্প। কিছু জায়গায় আপনাকে গল্পের চরিত্রের সাথে মিলিয়ে ফেলছিলাম। তবে, গল্পের নায়ক শফিক মাঝে মাঝে আমি হয়ে গ্যাছে। 'শফিক' বা 'আমি' যেটাই হোক না কেন, একটাইতো হওয়া উচিত, নাকি? আর, বাগান করার কথাগুলো পড়ে মনে হলো যে, জায়গাটুকু আপনি হৃদয় দিয়ে লিখেছেন।
    অনেক শুভকামনা সবুজ ভাই। আপনার জন্য অনেক শ্রদ্ধা। ভালো থাকবেন।
    ------------------------------
    কামরুজ্জামান পলাশ

    উত্তরমুছুন
  4. খুব ভাল লাগল গল্পটা । প্রবাসী জীবনের চিত্র পাওয়া গেল ভালোভাবেই... তবে শফিকের আড়ালে আমরা যেমন সবুজকে খুঁজছিলাম আপনিও বোধহয় আপনার মাঝে শফিককে :) ... আর তাইতো সর্বনামে সামান্য ত্রুটি থেকে গেছে... আরও লিখুন । পড়তে চাই ।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. খুব ভাল লাগল গল্পটা । প্রবাসী জীবনের চিত্র পাওয়া গেল ভালোভাবেই... তবে শফিকের আড়ালে আমরা যেমন সবুজকে খুঁজছিলাম আপনিও বোধহয় আপনার মাঝে শফিককে :) ... আর তাইতো সর্বনামে সামান্য ত্রুটি থেকে গেছে... আরও লিখুন । পড়তে চাই ।
      আফসানা জাহান

      মুছুন
  5. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন