রবিবার, ১১ মে, ২০১৪

অলাত এহ্সানের গল্প : প্রায়শ্চিত্ত

এমনই শীত, মৌচাক থেকে মাছিগুলোও মরে মরে পড়ে। মা বলেন, ‘মাঘের শীতে বাঘে কাঁপে।’ এরই মধ্যে রাতভর ওয়াজ শুনে শেষ রাতের দিকে মা-চাচিরা বাড়ি ফেরেন। দাঁতে কপাটি লাগিয়ে কাঁপেন। আর সকাল থেকেই শুরু হয় টানা কয়েক দিন তার বর্ণনা।

কী বিশাল আয়োজন, কেমন দরদি ওয়াজ! মানুষ তো কেঁদে জার জার। আখেরি মোনাজাতের আগের একটু নসিহতে এক-একজন এত লাখ, পঞ্চাশ হাজার টাকা দান করে। মাইকে তাদের নাম আর টাকার বড় বড় করে ঘোষণা করে। তা ছাড়াও হাজী ওড়নায় পাঁচশ-হাজার টাকার নোটের তো গণাগাঁথা নাই। এক মহিলা তো গলার আড়াই ভরি সোনার হাড়টাই খুলে দিল! পরম তৃপ্তি ও উচ্ছ্বাসের সাথে কথাগুলো বলেন মা। বলতে বলতে একদম হাঁপিয়ে ওঠেন।
কোথায় যেন একটু কষ্টও থাকে তাঁর। ওয়াজের প্রধান বক্তা যে হেলিকপ্টারে চড়ে এসেছে সে কথাও বলতে বাদ রাখেন না। মায়ের মুখে এত সব দান-খয়রাতের কথা শুনে আমার স্কুল মাস্টারির সামান্য বেতনের কথা মনে পড়ে। সেখানে কী করে গেছে- জিজ্ঞেস করলেই মা হাসেন। বলেন, ‘সবার সাথে গেছি-আইছি।’ তার মানে, ওয়াজে যাওয়া-আসার যে টেম্পো ভাড়া আর সামান্য হাত খরচ দিয়েছিলাম, মা তাও সেখানে দিয়ে এসেছে।

কয়েক বছর যাবৎ দেখছি মা ওয়াজ থেকে ফিরে কারো না কারো মুসলমান হওয়ার কথা বলেন। একবার মা বললেন,‘এক ছেলে, বয়সে তোর মতো হবে, তার পুরো পরিবার খ্রিস্টান, কিন্তু সে মুসলমান হয়েছে। সবাই তাকে সাধ্যমতো অনেক সাহায্য করেছে।’তারপরের বছর শুনলাম ছেলেটা নাকি তার ছোটভাইকেও মুসলমান করেছে। তারপরের এক বছর বোন। আর প্রতিবারই দেখি বিভিন্ন মসজিদ, হাট-বাজার থেকে তাদের টাকা-পয়সা তুলে দিতে। এ বছর নাকি তার বাবা-মা ও ছোটবোনটাও মুসলমান হলো। মা বলেন- ‘দ্যাখ, লোকটার কি ভাগ্য, আগেরবার যে মেয়েটা মুসলমান হলো, তার খুব বড় ঘরে বিয়ে হয়েছে; কোনো যৌতুক ছাড়াই, ছেলেপক্ষ আগ্রহ করেই টেনে নিয়েছে।’ মা একটু থামেন, তারপর আবার বলেন, ‘তুই যদি একটু ‘ই’ হইতি ........।’ আমি হাসি। বিষয়টা আমার কাছে এত সহজ মনে হয় না। মনে মনে এই পরিবারটির সাথে পরিচিত হওয়ার আগ্রহ বোধ করি। কিন্তু মা এদের কারোরই নাম-ধাম বলতে পারেন না। শুধু এবার যে লোক মুসলমান হলো তার নতুন নামটাই বলতে পারলেন, বিল্লাল (বেলাল)।

সে দিন বিকেল, বাজারে বন্ধুর বইয়ের দোকানে বসে আছি। পঞ্চাশোর্ধ্ব একজন লোক, আমার খুব চেনা চেনা লাগল। সকালে তাঁকে বাজার করতেও দেখেছি। অনেকে সামান্য সমাদর-খোঁজ খবর করছিল তাঁর। অনেকক্ষণ যাবৎ রাস্তার ওপার দাঁড়িয়ে আছেন। তারপর খানিকটা এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে রাস্তা পার হলেন। আমার কাছে এসে খুব সন্তর্পনে বন্ধুর কথা জিজ্ঞেস করলেন। ও নেই জেনে একটু ইতস্তত হলেন। তারপর কেমন যেন অনন্যোপায় হয়ে, কাঁপা কাঁপা হাতে আমার দিকে পুরনো কাগজে মোড়া একটা প্যাকেট বাড়িয়ে দিলেন। বললেন, বন্ধু এলে দিতে। বন্ধু অনেক পুরনো বইও ক্রয় বিক্রয় করে। ভাবলাব সে রকমই কিছু হবে। আমি হাতে নিয়েই বুঝলাম র‌্যাকসিনে চমৎকার বাঁধাই করা বইটা আসলে একটা বাইবেল। প্রথম পৃষ্ঠায় বাইবেল সোসাইটির সিল মারা। আমি তার নাম জিজ্ঞেস করলাম। মোহাম্মদ বিল্লাল হসেন। পুরো নামটাই বললেন, সচরাচর এমনটা কেউ বলে না। উচ্চারণটাও যেন কেমন, মনে হয় এখনো রপ্ত করতে পারেননি। আমার মাথায় যেন হঠাৎ বিদ্যুৎ খেলে গেল। আরে, এ তো আমাদের হারাণ কাকার চেহারা!

লোকটা ইতিমধ্যেই বেশ খানিকটা দূর চলে গেছেন। আমি দৌঁড়ে গিয়ে তাঁকে ধরলাম। ‘আপনি হারাণ কাকার ভাই না? আরে হারাধন কাকা, হাই স্কুলের সামনে যে নৌকায় পার করতো!’ সে তবদা লাগা মানুষের মতো আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর কোনো উত্তর না দিয়ে গুঁই গুঁই করে আবার হাঁটতে শুরু করলেন। কোথায় যেন কী একটা কিন্তু আছে। আমিও নাছোড়বান্দার মতো তার পেছন পেছন তার বাড়ি পর্যন্ত রইলাম। খ্রিস্টানপাড়ার থেকে বাইরে, গাছেঘেরা ছিমছাম বাড়ি। দূর থেকেই আমার চেনা মনে হলো। স্কুলে থাকতে টিফিনের সময় কতদিন দল ধরে এসে এ বাড়িতে নাড়কেল-মুড়ি, কাসুন্ধি দিয়ে আম মাখা, পূজা-কীর্তনের প্রসাদ খেয়েছি। একটু ঠান্ডা লাগলে বাসকের পাতা, তুলসিপাতা নিয়ে গেছি। 

বাড়িতে উঠার মুখে সে আমার দিকে এমন ভাবে তাকালেন- যেন বারণ করছেন, আবার কোথায় যেন প্রশ্রয়ের প্রচ্ছন্ন ছায়াও আছে। বাড়িতে গেলে একটু সমাদর করে সে আমার সব কথা শুনলেন। তিনি আমার সামনে অপরাধীর মতো হাত জোড় করে বললেন, ‘হ, আমিই হারাধনের ছোটভাই, সাধন। এ্যাহন বিলাল।’ কিন্তু আপনি তো খ্রিস্টান থেকে.... । সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। ভাঙা ডোয়ার বারান্দায় বসে মাথা ঝুঁকে ফোঁত ফোঁত করে কেঁদতে লাগলেন। বললেন, ‘আমার কিছু করার ছিল না বাবা। বড়দা সব ভিটামাটি-নৌকা বেইচা চৈল্যা যাওয়ার পর উপায়-অন্ত ছিল না। তাই হইছিলাম। নাম হইছিল গ্যানার (গ্রেনার)। তহন বাজারে একটা চা-বিড়ির দুকান দিছি। তাও চোলব্যার পারছিলাম না। ঘরে মাইয়া দুইড্যা সিয়ান হইব্যার লাগছে। তাই.........’ সে আর কিছু বলতে পারলেন না। শকট লাগা মানুষের মতো ঝিম ধরে রইলেন। আমাকে সটান দাঁড়তে দেখে শুধু বললেন- ‘বাবা, কিছু খাইয়্যা গেলে আমার ভাল লাগতো।’ আমি তার দিকে তাকাতেই পারছিলাম না। পুরো বাড়িটাই কেমন অচেনা, বিধবার মতো দাঁড়িয়ে আছে। দরজার পাশে একজন মহিলা ঘোমটা দিয়ে আঁচলের প্রান্ত কামড়ে ধরে আছেন। তাঁর মুখের সামান্য আদল দেখেই তাঁকে চিনতে পারি। ইনি আমাদের কাকি মা, সাধন কাকার বৌ। একদিন তিনিই আমাদের কত আদর করে পাতে খাবার তুলে দিতেন। আমার কাছে সবকিছু প্রায়শ্চিত্ত মনে হলো।


আমি কতক্ষণ যাবৎ দাঁড়িয়ে আছি নিজেও জানি না, যেন বাজপড়া একটা মানুষ। চোখে থিক থিকে জল। শুধু ভাবছি, ফিরে গিয়ে মাকে কী বলবো ?


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন