রবিবার, ১১ মে, ২০১৪

দেশভাগের কথাপর্ব : শওগাত আলী সাগর--ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার ধারনাটা সুবিধাবাদী রাজনীতিকদের মাথায় থাকলেও জনগনের মননে সেটি শেকড় গজায়নি

শওগাত আলী সাগর সাংবাদিকতা করেছেন দীর্ঘকাল বাংলাদেশের প্রধান দৈনিক পত্রিকায়। কানাডা প্রবাসী হওয়ার পরে তিনি সংবাদভাষ্য লেখেন। তাঁর বেশিরভাগই চলমান রাজনীতি বিষয়ক। নিজেও নতুন দেশ নামে একটি অনলাইন পত্রিকা প্রকাশ করেন।
শওগাত আলী সাগর নিজে দেশভাগ দেখেননি। কিন্তু তারঁর বাবা-মা দেখেছেন। পাশাপাশি তাঁর নিজের রয়েছে পাঠ ও পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা। তাঁর লেখার বড় শক্তিটিই হল তার নিজের নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গী। ফলে শওগাত আলী সাগরের সঙ্গে দেশভাগ নিয়ে আলোচনাটি একটি আলাদা মাত্রা সৃষ্টি করে।
শওগাত আলী সাগর ব্যস্ত মানুষ। তার সঙ্গে ফেসবুকে আদডা-ঘরে আলোচনা শুরু হয় ১৭ মার্চ, ২০১৪ তারিখে।  শেষ হয় ২ মে, ২০১৪। 



কুলদা রায় : দেশভাগ শব্দটি আপনি কখন, কিভাবে, কোন প্রসঙ্গে প্রথম শুনতে পেয়েছিলেন?
শওগাত আলী সাগর : দেশভাগ শব্দটা আমি প্রথম কখন শুনি? হুমমম। ভাববার চেষ্টা করেছি। সত্যি বলতে কি অনেক ভেবেও কুল কিনারা পাইনি। দেশভাগ মানে দেশকে ভাগ করা! একটা ভাগ হওয়ার টুকরো টুকরো স্মৃতি আছে আমার। আমি অবশ্য সেটাকে ভাগ বলি না। বলি একটা দেশের জন্ম হওয়াবাংলাদেশের জন্ম হওয়া। সেই জন্ম হওয়াটাকেও অনেককে দেশভাগ বলতে শুনেছি। গন্ডগোলের বছর সংগ্রামের বছর, পার্টিশনের সময়...... এই কথাগুলো অনেক শুনেছি। এরা নিশ্চয়ই দেশভাগ মানে ভারত পাকিস্তানের পার্টিশন নিয়ে বলেন নি। যদ্দুর মনে পড়ে, দেশভাগ শব্দটার সঙ্গে পরিচয় ঘটে নভেল পড়তে গিয়েই। প্রাইমারী স্কুলের গন্ডি পেরোবার আগেই লুকিয়ে লুকিয়ে শরৎ চন্দ্র পড়া শুরু করে দিয়েছিলাম। সেইখানেই শব্দটার সঙ্গে পরিচয় ঘটে। কিন্তু কি অবস্থায়, কোন নভেলে সেগুলো মনে করা এখন দুরুহ কাজ।

কুলদা রায় : এর পরে আর কি কি সূত্রে দেশভাগের প্রসঙ্গ জেনেছেন?
শওগাত আলী সাগর : রাজনীতির মাঠে হাটাহাটি করতে গিয়ে 'দেশভাগ' ধারনাটার প্রবল উপস্থিতি টের পাই। বন্ধুদের আড্ডায়, নেতাদের বক্তৃতায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনায় অপরিহার্যভাবে উচ্চারিত হতো জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্ব শব্দটি। হিন্দু মুসলমানের পরিচয়ে দুটি পৃথক দেশের জন্ম হওয়া যে কতোটা ভুল ছিলো সে নিয়ে তুমুল আলোচনা চলতো আমাদের আড্ডায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার সুবাদে দেশবিভাগ বিষয়টি নিয়ে আরো নাড়াচাড়া হয়। ছাত্রলীগের রাজনীতি যারা করতেন তাদের বক্তৃতার একট নির্দিষ্ট ধরন ছিলো। তারা বক্তৃতা শুরু করতেন ১৯৪৭ থেকে। সম্ভবত আমিও প্রভাবিত হয়েছিলাম দলীয় নেতাদের বক্তৃতার কাঠামো দেখে। ফলে দ্বিজাতিতত্বদেশ বিভাগ এইসব নিয়ে কথা বলা হয়েছে সভা সমাবেশে।

কুলদা রায় : এই দ্বিজাতি তত্ত্বটি সার কথা কী ছিল।
শওগাত আলী সাগর : দ্বিজাতি তত্ব- ইংরেজীতে যাকে বলে টু ন্যাশন থিওরি। দেশটা ভাগ হলো দুটো জাতির জন্য স্বতন্ত্র দেশ গড়ার কথা বলে। সেই জাতিটা নির্ধারিত হলো আবার ধর্মের ভিত্তিতে। মুসলমান জাতি, হিন্দু জাতি। মুসলমানদের দেশ পাকিস্তান, হিন্দুদের দেশ হিন্দুস্থান বা ভারত। জাস্ট এইরকম একটা থিওরি দিয়ে দেশ ভাগ হয়ে গেলো। কিন্তু সমস্যা হলো- ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার ধারনাটা সুবিধাবাদী রাজনীতিকদের মাথায় থাকলেও জনগনের মননে তখনো সেটি শেকড় গজায়নি। তাছাড়া হিন্দু- মুসলমানের ভিত্তিতে দেশভাগ করা হলে পরিপূর্ণ হিন্দু বা মুসলমান রাষ্ট্র কিন্তু গড়ে তোলা যায়নি। দেশভাগের পর দেখা গেলো ভারতে প্রচুর সংখ্যক মুসলমান আর পাকিস্তানেও যথেষ্ট সংখ্যক হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা রয়ে গেছেন। তা হলে ধর্ম ভিত্তিক জাতীয়তা এবং সেই জাতীয়তার ভিত্তিতে দেশভাগ হলো কিভাবে? সেটা হয়েছে, রাজনীতিকদের কারনে, রাজনীতিকরা সেটা করেছেন। ধর্মকে তারা রাজনীতিরক্ষমতালাভের একটা উপকরন হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

কুলদা রায় :   ধর্মের পার্থক্যটাই তো দেশভাগের প্রধান কারণ ছিল। এই পার্থক্যটা ছিল বলেই রাজনীতিকরা এটাকে ব্যবহার করতে পেরেছিল।
শওগাত আলী সাগর : ধর্মের পার্থক্য সমাজে বসবাসরত মানুষদের মধ্যে থাকতেই পারে। এমনকি একই ধর্মের অনুসারীদের মধ্যেও কিন্তু মতবাদগত পার্থক্য আছে। মুসলমানদের কথাই যদি বলি তারাও কিন্তু নানাভাগে বিভক্ত। আর এই বিভক্তিটা এতো প্রকট যে পরষ্পর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হতেও পিছপা হয় না। তাহলে ধর্মকে পরিমাপক ধরে একটা দেশ তৈরি হলে সেই দেশের স্থিতি নিয়ে, মানুষের শান্তি নিয়ে সংশয় তৈরি হতে বাধ্য।
রাজনীতি যদি হয় মানুষের, সমাজের কল্যানের জন্য তাহলে পার্থক্য বা বিভেদ নয বরং ঐকমত্যের দিকে নজর দেওয়া দরকার। ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তা কিন্তু ধর্মীয় বিভেদের উর্দ্ধে ওঠে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলো।

কুলদা রায় :  ধর্মান্তরিত মুসলমানরা শতাব্দীর পর শতাব্দী পাশাপাশি বাস করছেন হিন্দুদের সঙ্গে, বিশেষ করে নিন্মশ্রেণীর হিন্দুদের সঙ্গে। এই সান্নিধ্যবশত দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সামাজিক বন্ধন এখন যেটুকু আছে, তার চেয়ে বেশি মাত্রায় হতে পারতো। তাঁদের মধ্যে চলাফেরা, উৎসবে, পার্বণে তাঁদের মধ্যে সামাজিক মেলামেশা; পারস্পরিক আদানপ্রদান ইত্যাদিও আরো বেশি মাত্রায় হতে পারতো। হলে সেটাই স্বাভাবিক হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তা হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে এক সম্প্রদায় আর-এক সম্প্রদায়ের ছায়াও মাড়ায়নি। এক সঙ্গে খাওয়া-দাওয়ার প্রশ্নও ওঠেনি, কারণ মুসলমানদের খেতে দেখলেও হিন্দুদের জাত যেতোরবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষদের গিয়েছিল। জাত যেতো। কারণ খাওয়ার গন্ধও নাকি অর্ধভোজনের সমান। ভোজন দূরে থাক, কোনো মুসলমান ঘরে উপস্থিত থাকলে হিন্দুর পক্ষে সে ঘরে বসে জল খাওয়াও নিষিদ্ধ ছিলো। খানাপিনা ছাড়া, সামাজিক বন্ধনের আর-একটা উপায় হলো বিবাহ। কিন্তু যেখানে ছায়া মাড়ালেও জাত যেতো, সেখানে আন্তঃসাম্প্রদায়িক বিবাহের প্রশ্নই অবান্তর। এভাবেই হিন্দু আর মুসঅলমান বহু শতাব্দী ধরে প্রতিবেশীর মত বাস করলেও দুজনই দুজনকে দেখেছেন সন্দেহের চোখে, কেউ বা দেখেছেন ঘৃণার দৃষ্টিতে। 

হিন্দুদের চোখে মুসলমানরা পাত নেড়ে/ যবন; মুসলমানদের চোখে হিন্দুরা মালাউন/ কাফের। এসব শব্দের অর্থ কী, সেটা অতো গুরুতর নয়, কারণ আক্ষরিকভাবে সেই অর্থে এসব গাল দেওয়া হয় না, এসব কথা দিয়ে প্রকাশ করা হয় মনের মনের অবিমিশ্র ঘৃণা এবং তা প্রকাশ করা হয় আক্রোশের সঙ্গে, তুচ্ছ করার মনোভাব নিয়ে। এই যখন অবস্থা তখন ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তার ঐক্যটা কিন্তু টেকেনি। দাঙ্গা হয়েছে। ফ্যাসাদ হয়েছে। দেশভাগ হয়েছে।
শওগাত আলী সাগর : আপনি বলেছেন,"ধর্মান্তরিত মুসলমানরা শতাব্দীর পর শতাব্দী পাশাপাশি বাস করছেন হিন্দুদের সঙ্গে, বিশেষ করে নিন্মশ্রেণীর হিন্দুদের সঙ্গে" আমি আপনার 'নিম্নশ্রেণীর হিন্দুদের' সঙ্গে শব্দবন্ধটির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করবো।
ধর্মান্তরিত মুসলমানদের 'শ্রেণীগত' অবস্থান কি ছিলো সেটা আপনি উল্লেখ করেননি। ধরে নিচ্ছি তারাও 'নিম্নশ্রেণীর'ই ছিলো। শ্রেণীগত উচ্চতা নিয়ে ধর্মান্তরিত হওয়ার নজির খুবই বিরল। হিন্দু ধর্মে থেকে যাওয়া আর ধর্মান্তরিত হওয়াদের মধ্যে ধর্র্ম বিশ্বাসের পার্থক্য তৈরি হলেও সামাজিক শ্রেণীগত অবস্থানের বিবেচনায় তারা স্বগোত্রীয়। আর সেই কারনে তাদের মধ্যে আসা যাওয়ার সম্পর্কটা থেকেছে।

কুলদা রায় :  কিন্তু তারা বৈবাহিক সম্পর্কটা কখনো জায়েজ করেনি।
শওগাত আলী সাগর : যেই হিন্দুরা 'মুসলমানের ছায়া'য়ও জাত ধর্ম হারানোর আতংকে ভুগতেন তারা কিন্তু সামজিকভাবে 'উচ্চ শ্রেণীর। সেই শ্রেণীটা তৈরি হয়েছে অর্থনৈতিক কারনে। ধনী হিন্দু বা ধনী মুসলমান উভয়গোষ্ঠীই কিন্তু নিম্ন শ্রেণীর স্পর্শে জাত হারানোর আতংকে ভুগতেন। আমার ধারনা, এরা কেউই ধর্মের ভেতরে প্রবেশ করেন নি বা করতে চাননি, ধর্মটাকে সামনে মেলে ধরে নিজেদের জাতপাতের দেয়াল তুলে আলাদা রাখার চেষ্টা করেছেন।
বিত্তশালী হিন্দু/মুসলমান আর বিত্তহীন হিন্দু/মুসলমানের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্কটা কি এখনো জায়েজ? মোটেও না। দুটো ধর্মের বিশ্বাসী লোকদের মধ্যে সেটা না হওয়া তো আরো স্বাভাবিক ঘটনা। কারন ধর্মের বিধিবিধানে তাদের যদ্দুর প্রবেশাধিকার আছে সেখানে অন্য ধর্মাবলম্বীর সঙ্গে সম্পর্ক করাকে উ৭সাহ দেয় না।

কুলদা রায় :   আমি এইটেই বলছি। এই যে বৈবাহিক সম্পর্ক্টার মধ্যে দিয়ে একটা সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারতো--একটা সহনশীল সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারতো সেটা ধনী হিন্দু-মুসলমানে যেমন হয়নি, গরীর হিন্দু-মুসলমানেও সেটা হয়নি। এখনো একটা দুরত্ব বজায় রেখে চলে।
বন্ধনটা হবে কিভাবে?
সেটা হয়নি। একটা ফাঁক থেকে গেছে। এটার মধ্যে দিয়েই হিংসা ঢুকেছে। ঢোকানো হয়েছে।
শওগাত আলী সাগর : আপনি ঠিকই বলেছেন, দরিদ্র হিন্দু মুসলমানের মধ্যে হয়নি। কারন ধর্মে তাদের যতটুকু প্রবেশাধিকার সেখানে হিন্দু মুসলমানের বৈবাহিক সম্পর্ককে অনুমোদন করে না। শ্রেণীগত অবস্থানের কারনে তাদের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক কিন্তু হয়, বা আছে, সেটা নিজ নিজ ধর্মকে আগলে রেখেই।
হিন্দু মুসলমানের মধ্যে বন্ধনের জন্য আন্ত:ধর্ম বিবাহ প্রথাকেই একমাত্র সমাধান বলে আমি মনে করি না। কেননা সেখানেও কিন্তু 'জোর যার মুল্লুক তার' একটা ব্যাপার কাজ করে।
যেহেতু ধর্মও একটা আইডেনটিটি সেই কারনেই এই আইডেনটিটির মধ্যে থেকেই বন্ধনের চেষ্টা করাটা ভালো। তবে আজকাল সংস্কৃতমনা,উচ্চশিক্ষিত অনেক ছেলেমেয়েরা পারষ্পরিক বিয়ে করছে। আমার বন্ধুদের মধ্যেও আছেন যারা বিয়ে করেছেন, সংসার করছেন কিন্তু কেউ কারো ধর্ম বিসর্জন দেননি।
সেটা সম্ভব হয়েছে দুজনই উচ্চশিক্ষিত এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল বলে। নিজ নিজ ধর্মে থাকা সত্বেও দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক আছে,আত্মীয়তা আছে।
এই খানে সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির একটা ভূমিকা আছে বলে আমার মনে হয়।

বিশেষ করে অর্থনীতি একটা ফ্যাক্টর। নইলে আমি বেশ কিছু ছেলে মেয়েকেই জানি,যারা বিয়ে করার পর মুসলমানীত্ব নিয়েছে বা নিতে বাধ্য হয়েছে।

কুলদা রায় :   অর্থাৎ ধর্মটা এদের দুপক্ষের মধ্যেই প্রধান হয়ে উঠেছে। শ্রেণীগত অবস্থানটা নয়। যদি তাই হত তাহলে দাঙ্গা ফ্যাসাদ না করে--শ্রেণী সংগ্রাম করতে এগিয়ে আসত। সেটা হয়নি।

শওগাত আলী সাগর :  কারন তারা ব্যবহুত হচ্ছে। ধর্মের নামে যদি তাদের ব্যবহার করা না হতো তাহলে হয়তোবা তাদের মধ্যে শ্রেণীগত ঐক্যটা দৃঢ় হতো। ধর্মের নামে নিম্নবর্ণ বা শ্রেণীর মধ্যে বিভাজন করে রাখার বড় লাভ হচ্ছে তারা তাদের আসল প্রতিপক্ষকে কোনো কালেই চিনে ওঠতে পারে না।

কুলদা রায় : কিন্তু এই রাজনীতির সঙ্গে নিম্নবর্ণের হিন্দু-মুসলমানের সুযোগটা নেই বললেই চলে। সেকালেও ছিল না। একালেও নেই। কিন্তু দাঙ্গায় তারাই প্রধান শিকার হচ্ছে।
শওগাত আলী সাগর : দাঙ্গার কথা যদি বলেন। তাহলে একটা ব্যাপারে আপনার দৃষ্টি আকর্ষন করি। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে হিন্দু বা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ওপর যে হামলা হয়েছে, তার একটা বিশ্লেষন যদি করি তাহলে দেখবেন,যারা আক্রান্ত হয়েছে তারা কিন্তু অস্বচ্ছল দরিদ্র হিন্দু বা দরিদ্র বৌদ্ধ। অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতাবান হিন্দু এলাকায় কিন্তু দাঙ্গা হয় না।
দাঙ্গাটা আসলে রাজনৈতিক উপকরন, সেটা মোটেও ধর্মীয় উপকরন নয়। দাঙ্গায় ব্যবহুত হয় নিম্নবর্ণের (ধর্মীয় এবং অর্থনৈতিকভাবে) লোকগুলো,ক্ষতিগ্রস্থও হয় নিম্নবর্ণের লোকগুলো।
রাজনীতির কারনেই ধর্মের নামে দাঙ্গা লাগানো হয়।


কুলদা রায় : একটা অভিযোগ জোরে সোরে শুনতে পাওয়া যায় যে সে সময়ে হিন্দু জমিদাররা মুসলমান প্রজাদের উপর নীপিড়ন করেছে অপেক্ষাকৃত বেশি। এটার কারণে মুসলমান নিম্ন বর্গের মানুষ হিন্দুদের উপরে ক্কিপ্ত হয়েছিল।  এ বিষয়ে আপনার অভিমত কি?
শওগাত আলী সাগর : এই বিষয়ে মতামত দেওয়া আমার জন্য খানিকটা কঠিন। কারন বিষয়টার ওপর আমার তেমন পড়াশোনা নেই বললেই চলে। সাধারনভাবে জমিদারদের যে চিত্রটা আমাদের কাছে আছে, সেটাতো একেজন অত্যাচারীরই চিত্র। কি হিন্দু, কি মুসলমান। ব্যতিক্রম যে ছিলো না, তা নয়। কিন্তু জমিদারদের মোটা দাগের চেহারাটা অত্যাচারীর চেহারা হিসেবেই আমাদের কাছে পরিচিত।
আমার হাই স্কুলের পড়াশুনা নরসিংদীর জেলা শহর থেকে দূরে হাতিরদিয়া নামক একটি স্থানে। এটা উপজেলা সদরও নয়, নিছকই মফস্বল এলাকা। সেখানে মিয়াবাড়ী বলে একটা বাড়ী আছে পুরনো জমিদার বাড়ী। সেই জমিদারদের বানানো স্কুলে আমার পড়াশুনা।
তো সেই স্কুলটি নাকি প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলো পার্শ্ববর্তী শিমুলিয়ার হিন্দু জমিদারদের সাথে রেষারেষি করে।
মিয়া বাড়ীর কোনো জমিদারের ছেলে পড়তে গিয়েছিলো শিমুলিয়া স্কুলে, মুসলমান জমিদার বাড়ীর ছেলে, গায়ের রং কালো বলে তাকে নাকি স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিলো।
মুসলমান জমিদাররা তখন নিজেরাই স্কুল বানিয়ে বসে। শুনেছি হিন্দু জমিদারদের লোকজন এসে দফায় দফায় মুসলমান জমিদারদের বানানো স্কুলটি পুড়িয়ে দিয়েছে।

কুলদা রায় : সেকালে তো ইংরেজি শিক্ষাকে ধর্ম বিরোধী হিসেবে মনে করতেন মুসলমান সমাজ। ফলে তারা নিজেরাই স্কুলে পড়তে আগ্রহ বোধ করেনি। নারাযণগঞ্জের সম্মানদি আপনার নিজের বাড়ির কাছে। সেখানে স্কুল গড়া হয়েছে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সযোগিতায়। পানাম স্কুলও তাই। ওই সময়ে মুসলমান শিক্ষকও ছিলেন সে সব স্কুলে। তবে মুসলমান ছাত্র সংখ্যা খুবই কম ছিল। বলেছেন প্রখ্যাত লেখক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি এই স্কুলেরই ছাত্র ছিলেন। 
শওগাত আলী সাগর : লেখাপড়ায় মুসলমানদের আগ্রহ ছিলো না বটে, মুসলমানরা আর মুসলমান জমিদারদের এক কাতারে ফেলা বোধ হয় ঠিক হবে না। ইংরেজী শিখলে ধর্ম যাবে, এমনকি ইংরেজীতে গায়ে বিস্কুট লেখা বিস্কুট খেলে বউ তালাক হয়ে যাবে, এই ধরনের প্রচার এবং অপপ্রচার মুসলমানদের লেখাপড়া থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। সাধারন মুসলমানদের লেখাপড়া থেকে দুরে রাখার পেছনে উচ্চবিত্ত/জমিদার বা তাদের সমগোত্রীয়দের ভূমিকা যে ছিলো না, তাকি নিশ্চিত করে বলা যাবে?

কুলদা রায় :  সেটা তো নিম্ন বর্গের বেলায়ও ঘটেছে। নমশুদ্রদের স্কুলে পড়ার সুযোগ দেওয়া হত না।
শওগাত আলী সাগর : ঘুরে ফিরে কিন্তু শ্রেণীর বিষয়টাই চলে আসে। চাড়াল নমশুদ্র বা নিম্নবর্ণের শেখ (মুসলমানদের শেখও বলা হয় অনেক অঞ্চলে) এদের দমিয়ে রাখার জন্য এদের মধ্যে হানাহানি লাগিয়ে রাখা হয়েছে। সেই হানাহানিটা হয়েছে মূলত ধর্মের নামে। আর কিছু দিয়ে হানহানি করাতে হলে সেখানে ব্যক্তিবিশেষের স্বার্থের প্রশ্ন আসে। ধর্মের নাম নেওয়া হলে সেখানে স্বার্থের প্রয়োজন হয় না। ধর্মটাই যথেষ্ট। অর্থনৈতিক পরিনির্ভরতার কারনে নিম্নবর্ণের মানুষগুলো নিজেরা পড়াশেুনার ব্যাপারে এগিয়ে যেতে পারেনি, সমাজও এগুতে দেয়নি।

কুলদা রায় : আপনার সঙ্গে আলাপ করে একটা বিষয় মনে হচ্ছে--সেকালে নিম্ন বর্গের হিন্দু-মুসলমানদের শ্রেণী সংগ্রামের বদলে সাম্প্রদায়িকতার সংঘাতে চালান করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে কৃষক প্রজাপার্টি হারিয়ে গিয়েছিল। ১৯২০ সালে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠলেও সেটা কোনোকালেই সেটা গণমানুষের হয়ে উঠতে পারেনি। তারা হিন্দু বা মুসলমান হয়েই পরিচিত হয়ে উঠতে চেয়েছে।
শওগাত আলী সাগর :  আমার তাই মনে হয়েছে। ঝগড়া ফ্যাসাদ বলেন আর দাঙ্গা বলেন এগুলো কিন্তু নিম্নবর্ণের মধ্যে হয়েছে। দূর থেকে উচ্চ বর্ণ বা উচ্চবিত্তরা সেটি নিয়ন্ত্রণ করেছেন। ধর্মীয় আলখেল্লার ভেতর থেকে হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের নিম্ন বর্ণের মানুষগুলো যাতে বের হতে না পারে সে ব্যাপারে দুই ধর্মের ক্ষমতাশালীরাই সচেষ্ট থেকেছে।

কুলদা রায় :  কিন্তু দেখতে পাওয়া গেল এর মধ্যে দিয়েই দেশভাগ হয়ে গেল। অসংখ্য মানুষ তাদের শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে দেশত্যাগ করা শুরু করল। কিন্তু দেশত্যাগের এই স্রোতটা পুর্ব বঙ্গ থেকে পশ্চিম বঙ্গের দিকেই ধাবিত হল বেশি করে। পশ্চিম বঙ্গ থেকে পূর্ব বঙ্গে চলে আসা মানুষের সংখ্যা কম হল। হাসান আজিজুল হকের আগুন পাখি উপন্যাসে এই রকম কাহিনী আছে। এর কারণটা কি মনে করেন।
শওগাত আলী সাগর : এই ব্যাপারে মন্তব্য করার আগে মনে হয় খুটিনাটি পড়াশুনা করে নেওয়া ভালো। তবু আমার ধারনার কথাটুকু বলি। পশ্চিমবঙ্গ থেকে দলে দলে পূবে চলে যাওয়ার পেছনে সম্ভবত অবিশ্বাস এবং নিরাপত্তাহীনতা প্রবলভাবে কাজ করেছে। এই নিরাপত্তাহীনতার বড় অংশই সম্ভবত অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা।
ভৌগলিকভাবে ভারত সীমান্তবর্তী অংশটার নেতৃত্বের পেছনের ইতিহাসের মধ্যে, ভৌগলিক অংশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যে স্বস্তি এবং আস্থাই হয়তো বা মূসলমানদের পশ্চিম বঙ্গে  রেখে দিয়েছে।  পূর্ব বঙ্গের হিন্দুরা পাকিস্তানের ভৌগলিক সীমানায়, মানুষগুলোর অবয়ব, বৈশিষ্ঠে কোথাও সেই ভরসা করার মতো আস্থা পায়নি বলেই দেশ ছেড়েছে।

কুলদা রায় :  আপনি কি মনে করেন--দেশভাগ অনিবার্য ছিল। সে সময়ের সমস্যার অন্য কোনো সমাধান ছিল না।
শওগাত আলী সাগর :   কোনো সমস্যার কারনে কি দেশভাগ হয়েছে? বিষয়টা কি এমন যে, পাকিস্তান নামে আলাদা একটা রাষ্ট্রের জন্য কিংবা ভারত নামে পৃথক একটা রাষ্ট্রের জন্য পুরো ভারত বর্ষ অচল হয়ে গেছে? কাজেই ভাতিবর্ষকে দুইভাগ করে দিয়ে সেই 'অচলাবস্থার' সমাধান করি।

কুলদা রায় :  বলা হয় যে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যেকার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সেই সময়ে একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

শওগাত আলী সাগর :   হিন্দু মুসমান দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে যদি দাঙ্গা পরিস্থিতি হয়, বা দাঙ্গা লেগে যায় সেটি আইন শৃংখলা পরিস্থিতির ব্যাপার। সেটিকে ধরে রাষ্ট্র ভাগাভাগি করাটার মধ্যে সংকটের সুরাহার অভিপ্রায় ছিলো বলে আমি মনে করি না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন