রবিবার, ১১ মে, ২০১৪

সুবর্ণরেখা : দেশভাগের বেদনাবিধুর আখ্যান

পান্থ রহমান রেজা

সাতচলি্লশে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হলো। মুসলমানরা পেল পাকিস্তান। আর হিন্দুরা পেল ভারত। মাঝখানে রাজনীতির যূপকাষ্ঠে বলি হলো বাঙালি। আর এর রেশ রেখে গেল আরো গভীরে। তা যেমন তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারে, তেমনি তার ব্যক্তি জীবনেও। কেন না, দেশভাগ এবং দেশভাগজনিত সমস্যা বাংলার জনজীবনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলেছিল। ঋতি্বক ঘটকের সুবর্ণরেখা সিনেমায় দেশভাগের এ বেদনাবিধুর আখ্যান, ছিন্নমূল মানুষের জীবন-যন্ত্রণা, হতাশা-অসহায়তা সোজাসাপ্টাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পরিচালক মধ্যবিত্তসুলভ আবেগে বুঝতে পেরেছিলেন, চারপাশে যেসব অন্যায় হয়েছে, তার প্রতিবাদ করা প্রয়োজন। তাই সোজাসুজিভাবেই তিনি তাঁর বক্তব্য পেশ করেছেন চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে। যদিও আমরা শেষ পর্যন্ত দেখি সিনেমার চরিত্রগুলো একে একে আত্মসমর্পণ করছে। কিন্তু ঈশ্বর, হরপ্রসাদ, সীতা, অভিরামরা ভেতরে ভেতরে ঠিকই প্রতিবাদ করে গেছে।

দেশভাগের সময় উদ্বাস্তু হয়েছিল ১০ লাখ মানুষ। এ মানুষগুলো দেশভাগের পরপরই পাড়ি দিয়েছিল নিজস্ব ভিটেমাটি ছেড়ে এক অনিশ্চয়তার পথে। তাই, তাদের প্রথম চিন্তাই ছিল একটা নিজস্ব আশ্রয় খুঁজে পাওয়া। সিনেমার শুরুতে দেখি, কলোনি দখল করে নিচ্ছে উদ্বাস্তু মানুষরা। সেটা দখলে রাখার জন্য রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে তারা। আবার কলোনি থেকেই আরো একটা ভালো আশ্রয়ের খোঁজে ঈশ্বর ছুটে অন্য প্রান্তে। মানে চাকরি নিয়ে একটি নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। বন্ধুজন হরপ্রসাদের ভর্ৎসনাও তাঁকে পিছু ফেরাতে পারেনি। কেন না, ঘরহীন জীবনের যন্ত্রণা তিনি ভালোই জানেন। তিনি চান না, তাঁর ছোট বোন এই অনিশ্চয়তার জীবন নিয়ে থাকুক। যদিও অনিশ্চয়তা তাদের পিছু ছাড়েনি কখনো। একপর্যায়ে সীতা আত্মহত্যা করে বেঁচেছে। যে প্রতিষ্ঠাকে আশ্রয় করে ঈশ্বর বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন, সেটাও হাতছাড়া হয়েছে।

ঈশ্বর এস্টাবলিশমেন্টের আশায় ছোট বোন সীতা আর কুড়িয়ে পাওয়া আরেক ছেলে অভিরামকে নিয়ে নতুন গন্তব্যে এসে আশ্রয় নেন। আর আশা করতে থাকেন, একদিন ঠিকই গুছিয়ে নিবেন সব কিছু। এদিকে এক পরিত্যক্ত মিলিটারি বেসে ছোট ছেলেমেয়ে দুটি যে স্বপ্ন বোনে, পরে এসে সময়ের যূপকাষ্ঠে বলি হয়। আর এদিকে সত্যবাদী ইশ্বর আপস করে। হরপ্রসাদ এসে দেখিয়ে দেন সেই আপসের কথা। ঈশ্বরও চূড়ান্ত উপলব্ধিতে পেঁৗছায় 'আমরা মিইয়ে গেছি' বলে। প্রতিবাদ কিংবা লেজ গুটিয়ে পলায়ন, তাতে কিছুই যায় আসে না! ঋতি্বক এখানে দেশভাগের পরাজিত মানুষদের পায়ের তলায় মাটি সরে যাওয়ার বেদনা তুলে এনেছেন।

সুবর্ণরেখা ছিন্নমূল মানুষের জীবনযন্ত্রণার আখ্যান হলেও এর ভেতরের রাজনীতি গোপন থাকেনি। আর এ রাজনীতি হলো, অনৈক্যের রাজনীতি। হরপ্রসাদ যখন বলেন, 'দেখেন আগের যুগে ক্ষুদিরাম শহীদ হয়েছে। শান্ত পায়ে গান করতে করতে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়াইয়া নিজ হাতে নিজের গলায় দড়ি পরাইয়া দিয়েছিল। তার জানা ছিল যে সে কি। সেই ছিল তার মেরুদণ্ড। আজ আমরাই ক্ষুদিরামে দল, আমরা জানি না যে আমরা কি? তাই লড়াই করাকে মনে করি মাইর খাওয়া। আর শহীদ হওয়াকে বলি পথকুকুরের মৃত্যু।' তখন রাজনীতিটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সিনেমাটি যেখান থেকে শুরু হয়েছিল, সেখানে এসেই আবার শেষ হয়েছে। ঈশ্বর আর সীতার ছেলে বিনু আবার উদ্বাস্তু হয়েছে। তাদের কোনো যাওয়ার জায়গা নেই। তবে এত বিপর্যয়ের মাঝেও যখন বিনু নতুন বাড়ির কথা বলে, তখন একটা আশা জেগে ওঠে। এবং বিনুই তার মামা ঈশ্বরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলে। আর এর মাঝে দিয়েই ঋতি্বক হয়তো বলতে চেয়েছেন, আমাদের ভবিষ্যৎ ওই নতুন প্রজন্মের হাতে। যারা দেশভাগের যন্ত্রণা মোচন করে নতুন ইতিহাস নির্মাণ করবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন