রবিবার, ১১ মে, ২০১৪

নীহারুল ইসলামের গল্প : ঘূর্ণি

এক জন জিজ্ঞেস করল, সব ছেড়ে হঠাৎ এখানে কেন এলাম?

আর এক জন উত্তর করল, নদী দেখতে।

তৃতীয় এক জন বলল, আচ্ছা! নদী দেখতে ইচ্ছে হয় কেন?

চতুর্থ জন বলল, নদীর স্রোতে জীবন বয়ে যায়। সেই জীবন দেখার জন্য।


নদীটা বয়ে যাচ্ছে। সারা বছর বয়ে যায়। কেউ টের পায় না। কিন্তু শেষ শ্রাবণের দিন কয়েকের ধারাবর্ষণে নদীটা হঠাৎ-ই ফুলে ফেঁপে উঠেছে। প্রচন্ড স্রোত বইছে। কোথাও কোথাও নদীর পাড় ধ্বসে পড়ছে। খবরটা পাশের গঞ্জেও পৌঁছেছিল। শুনে সেখান থেকে চার বন্ধু সাইকেল চড়ে এসেছে নদীর পাড়ে। নদীটাকে দেখছে। নিজেদের মধ্যে কথা বলছে।

- জানিস? আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, এখানে একটা স্কুল ছিল!

- প্রাইমারী স্কুল?

- ধ্যাৎ! হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল। আমাদের মতো দোতলা বিল্ডিং ছিল স্কুলটার।

- কে বললে তোকে?

- বাবা। আমার বাবা সেই স্কুলে পড়েছে।

- তা স্কুলটা কোথায় গেল?

- নদীর ভাঙ্গনে তলিয়ে গেছে।

- তোর বাবা জানে যে তুই আমাদের সঙ্গে নদী দেখতে এসেছিস্‌?

- হ্যাঁ। ‘নদী দেখতে যাবো’ বলতেই বাবা রাজী। মা অবশ্য প্রথমে রাজী ছিল না। কিন্তু বাবা যখন মাকে বুঝিয়ে বলল যে, এক কালে এই নদীর পাড়েই নাকি আমাদের পূর্ব পুরুষের বসত ছিল! আমি এলেই নাকি নদী খুশি হবে! নদী আমাকে চিনতেও পারবে! মা তখন আসতে দিল।

- তা নদী তোকে চিনতে পারছে?

- পারছেই তো! দ্যাখ্‌ , স্রোতের দিকে তাকা। কী প্রচন্ড গতিতে ছুটে যাচ্ছে! যেন বলছে, বন্ধু- জীবনে এইভাবে ছুটতে হয়! না ছুটলে পিছিয়ে পড়তে হয়। কখনও কখনও আবার লাট্টুর মতো চরকি খেতে খেতে ছুটতে হয়। ওই দ্যাখ্‌- নদীটা লাট্টুর মতো চরকি খেতে খেতে ছুটে যাচ্ছে।

চার বন্ধু পাশের গঞ্জ থেকে নদী দেখতে এসেছে। নদী পাড়ে সাইকেল দাঁড় করিয়ে তারা গল্প করছে। পড়াশোনার গল্প নয়, অন্য গল্প। অন্য ধরণের গল্প। অন্য জগতের গল্প।



ওরা চার বন্ধু যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার হাত দুই নীচ দিয়ে নদীটা বয়ে যাচ্ছে। নদীটাও শুনছে ওদের কথা। শুনে কী ভাবছে কে জানে! তবে তিন বন্ধু তাদের আর এক বন্ধু যে সব কথা বলছে তা নিয়ে ভাবছে। এই নদীর পাড়ে বিশাল বসত ছিল! স্কুল ছিল!

সেসব কথা শুনতে শুনতে এক বন্ধু মাথা ঘুরিয়ে চারপাশ দেখছে। বসত কিংবা স্কুলের কোনো চিহ্ন খুঁজে পাচ্ছে না। বদলে দেখছে। মাথার ওপর একটা অদ্ভূত নীল আকাশ। কোথাও ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা মেঘ। কোথাও শ্যামলা মেঘ। খন্ড খন্ড। ছাড়া ছাড়া। জমাট নয়। অথচ আজ সকাল পর্যন্ত ওই আকাশে কালো মেঘ জমাট বেঁধে ছিল। সেই আকাশে এখন সূর্যটাও উঁকি দিয়েছে। কিন্তু সূর্যটার দিকে সে তাকাতে পারছে না। তীব্র আক্রোশ যেন সূর্যটার! ক’দিন মেঘে ঢাকা ছিল বলেই হয়ত! ভয়ে সে সূর্যটার দিকে তাকায় না। কিন্তু চার পাশের প্রকৃতিতে আর যেসব জিনিস আছে, সব দেখে। দেখতে তার ভালো লাগে। বিশেষ করে নদীটাকে। ছুটে যাওয়া স্রোত। স্রোতে ঘূর্ণি। ঘোলাটে জল। নদীর ওপারের বিস্তীর্ণ চর! তার ওপারে, বহু দূরে সবুজে ঢাকা ভিনদেশি গ্রাম। সেই সঙ্গে মাথার ওপরের গাঢ় নীল আকাশটাও।

- নদী কোথা থেকে আসে? সে জিজ্ঞেস করে।

- পর্বত থেকে। এক জন উত্তর করে।

আর এক জন বলে, হিমালয় পর্বত থেকে আসে যেমন তেমনি আসে ছোটনাগপুরের পাহাড় থেকেও।

তৃতীয় জন বলে, এই নদীটা কিন্তু হিমালয় থেকে আসছে। এই নদী বরফ-গলা জলে পুষ্ট নদী।

- বরফ গলা জলে পুষ্ট হলে এর জল ঘোলা কেন?

- জল ঘোলা হবে না! আমাদের যতসব নোংরামি বয়ে নিয়ে যাচ্ছে যে!

- আমাদের নোংরামি বলতে?

- আমাদের জীবন যাপনের নোংরামি।

কে কী বুঝল কে জানে! সবাই আবার চুপ। বুঝি নিজেদের জীবন যাপনের নোংরামি খুঁজতে শুরু করল নদীর ঘোলা জলের স্রোতে। সেই স্রোতে তখন অনেক কিছুই ভেসে যাচ্ছে। ওরা দেখছে। শ্যাওলা। শুকনো ঝোপ-জঙ্গল। জীবজন্তুর গলাপচা লাশ! ওরা দেখছে। কিন্তু জীবন যাপনের নোংরামি ভেসে যেতে দেখছে না। বরং ওরা ভেসে যেতে দেখছে জীবন। যে জীবনে ওরা আছে। যে জীবন ওরা উপভোগ করছে!

কখন দুপুর গড়িয়ে গেছে ওদের খেয়াল নেই। নদী ওদের এমনই আকৃষ্ট করে রেখেছে! ওদের ক্ষিদে নেই। তৃষ্ণা নেই। বাড়ির কথা মনে নেই। পড়াশুনোর কথা ভুলে আছে।

কিন্তু ওদের মায়েদের মনে আছে ওদেরকে। মায়েরা আপন আপন ছেলেকে ভাবছে। কোথায় গেল? সেই সকাল ১০ টায় বেরিয়েছে! এখনো আসছে না কেন? এক মা শুধু জানে তার ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে নদী দেখতে গেছে। সে যেতে দিতে চায়নি! একমাত্র ছেলের জন্য তারও চিন্তা হচ্ছে।

রোববার ছুটির দিন। সবার ছুটি। শুধু মায়েদের ছুটি নেই। সপ্তাহে একটাই দিন, খাবার দিন। তারা স্বামী-সন্তানের জন্য এটা ওটা রান্নায় ব্যস্ত। বাবারা কেউ বাইরে থালেও বেশীর ভাগ সব বাড়িতেই। সকাল সকাল বাজার করে এসে ফেস্‌বুক নিয়ে পড়ে আছে। অলৌকিক সম্পর্কের টান! পৃথিবীর আর কোনো কিছুতেই তাদেরও খেয়াল নেই।



সেই রকম বাবা নয়, এক আড্ডাবাজ বাবা- নাম শতদলবাবু, লৌকিক সম্পর্কের টানে ব্যাগ ভর্তি বাজার রান্নাশালে পৌঁছে নিশ্চিন্তে পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে একহাতে চায়ের গেলাস, অন্য হাতে সিগারেট ধরে নানা ধরণের আলোচনায় ব্যস্ত। আগামী কালের টিম আন্না কিংবা বাবা রামদেবের ভ্রষ্টাচার বিরোধী আন্দোলনের কী হবে! সুশীলকুমার অলিম্পিকে সোনা পাবে না রূপো পাবে! আরো সব কত বিষয়! মিডিয়ার সৌজন্যে আজকাল আলোচনার বিষয়ের অভাব নেই।

ঠিক এই ধরণের কোনো একটি আলোচনা চলছিল জলট্যাঙ্ক মোড়ে অরুণের চায়ের দোকানে। হঠাৎ সেখানে বসুর আগমন। গোলাপনগরের বসু হালদার। যে রোজ ভোর রাতে নদীতে মাছ ধরতে যাওয়ার আগে এই অরুণের সামনের বউদির চায়ের দোকানে বসে পরপর দু’কাপ চা খায়। দু’টো বিড়ি টানে। তখন অরুণের দোকান বন্ধ থাকে। ওই সময় হাঁটতে বেরিয়ে প্রায় দিন তার সঙ্গে দেখা হয় শতদলবাবুর। তাছাড়াও সেই তার ছোট বয়স থেকে শতদলবাবু তাকে চেনে। সে যখন তার বাবার সঙ্গে নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে নৌকায় রাত কাটাত।

স্বভাবতই শতদলবাবু তাকে দেখে অবাক হয়। বসু এই অসময়ে! তাও আবার নদী ছেড়ে! কী ব্যাপার?

বসু হালদারকে জিজ্ঞেস করে শতদলবাবু, কী ব্যাপার রে বসু! আজ নদী যাসনি?

- গেছিলাম বাবু। চট্‌জলদি ফিরি আইছি। এই দিনে আমার ছোট মাইয়াটা জন্মেছিল। আইজ উয়ার জন্মদিন। উয়ার মা কয় উয়ার জন্মদিন পালন করতি হবে।

- জন্মদিন পালন করবি ঠিক আছে। তা তুই এখন এখানে কেন?

- বাবু- জন্মদিন পালন করতি নাকি কেক্‌ লাগে! আর সেই কেক্‌ পাওয়া যায় নাকি ওই দোকানে! কিন্তু দোকানটা বন্ধ দেখি। বলে ‘ফুড প্লাজা’টার দিকে বসু ঈশারা করে।

শতদলবাবু বন্ধ দোকানটার দিকে তাকিয়ে নিজের ছেলেকে মনে করে। তার একমাত্র ছেলে। এবছর মাধ্যমিক পাস করেছে এই গঞ্জে সবচেয়ে বেশী নম্বর পেয়ে। তার সেই ছেলের জন্মদিন সে প্রতি বছর পালন করে। পালন করে বলতে, স্ত্রীর চাপে পালন করতে বাধ্য হয়। এই তো ক’দিন আগে ১৭ জুলাই ছেলের জন্মদিন গেল। সে পালন করেছে। কিন্তু স্ত্রীর কথা মতো নয়, নিজের মতো করে। তার দুই প্রিয় বন্ধু, একজন ডাক্তার। একজন অধ্যাপক। আর একজনও ছিল। ওদের সামনে ছেলেটা ঘুরঘুর করছিল। কৌতুহল! কে কী উপহার নিয়ে এসেছে?

একজন দিয়েছিল একটা পেন। আর একজন একটা অভিধান। তৃতীয়জন দিয়েছিল আশীর্বাদ। ওই তিন অতিথির জন্য খুব খুশী হয়ে স্ত্রী বিরিয়ানি রান্না করেছিল। তার আগে একটু মদ্যপান। সেই সঙ্গে কিছু কথা বার্তা।

ডাক্তার বন্ধু বলেছিল, বন্ধু একটাতেই এন্ড যে! আর একটা নে।

সে জিজ্ঞেস করেছিল, কী?

- সন্তান।

- পাগল না পেট খারাপ?

- একটা সন্তানের কোনো ভরসা আছে নাকি? যদি কিছু হয়ে যায়!

- দু’চারটেতেই বা কী ভরসা! কিছু হলে হবে। কী করা যাবে? পৃথিবীর সব সন্তানকে নিজের সন্তান মনে করলেই হল।



অধ্যাপক বন্ধু বলল, পৃথিবীর সব সন্তানকে নিজের সন্তান মনে করতে পারবি?

- কেন পারবো না?

আড্ডায় বলেছিল কথাটা। কিন্তু এখন তার মনে হচ্ছে, এই তো সে পারছে। বসুর মেয়ে মানে তো তারই মেয়ে! সে ভাবছে। বসুর মেয়ের জন্মদিন মানে তো তার মেয়েরই জন্মদিন! আর জন্মদিনে কেক্‌ অপরিহার্য। কিন্তু ‘ফুড প্লাজা’ আজ বন্ধ কেন? রোজই তো খোলা থাকে! তাহলে কারো কিছু হল নাকি? ভাবতে ভাবতে শতদলবাবু অরুণের চায়ের দোকান ছেড়ে বেরিয়ে আসে।

‘ফুড প্লাজা’ তার পাড়ার দোকান। রণদার দুই ছেলে দোকানটা চালায়। রাতুল আর টুটুল। দোকানের পেছনেই তাদের বাড়ি। শতদলবাবু ‘ময়না ফার্মেসী’র পাশের গলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সেই বাড়ির দরজায় গিয়ে পৌঁছায়। ‘রণদা! রণদা!’ বলে হাঁক ছাড়ে।

রণদা দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন। কী হল? অত চিল্লাচ্ছো কেনো শতদল?

- দাদা ছেলেরা কই? দোকান যে বন্ধ!

- ওরা কেউ নেই ভাই। বউমাদের নিয়ে শিবগাদি গেছে। শিবের মাথায় জল ঢালতে। তা তোমার কী দরকার?

- একটা কেক্‌-এর দরকার ছিল দাদা।

- কেক্‌! কিন্তু আমি তো ভাই দোকানের কিছুই বুঝি না।

- আমি বুঝি দাদা। ক’দিন আগে আমি একটা কেক্‌ নিয়ে গেছি। দামও জানি। কেক্‌ কোথায় থাকে তাও বলতে পারবো।

- তুমি জানো কোথায় কেক্‌ থাকে?

- জানি দাদা! আপনি যদি দোকানটা খোলেন তাহলে আমি নিজেই নিয়ে নিতে পারবো।

- দাঁড়াও তাহলে।

রণদাকে দোকান খুলিয়ে কেক্‌ নিয়ে বসুকে দিতে পেরে শতদলবাবুর ভালো লাগে। পকেট থেকে টাকা বের করে বসু কেক্‌-এর দাম দিতে যায়। শতদলবাবু বাধা দেয়। বলে, তোকে দাম দিতে হবে না বসু। কেক্‌ নিয়ে তুই বাড়ি যা।

- তা কী করে হয় দাদা? আমার মাইয়ার জন্মদিন! বসু বলে ওঠে।

- তোর মেয়ে কি আমার মেয়ে নয়- রে বসু?

শতদলবাবুর এই কথার পর বসু আর কিছু বলতে পারে না। সে কেক্‌ নিয়ে নিশ্চুপে চলে যায়। সন্ধ্যাবেলা বাবুকে যে বাড়ি আসতে বলবে সেটাও তার মনে থাকে না।

শতদলবাবু তা নিয়ে ভাবে না যদিও। সে তার ছেলে সুপর্ণ’র কথা ভাবে। সুপর্ণ আজ নদী দেখতে গেছে। বন্ধুদের সঙ্গে। বলা ভালো বন্ধুদের নদী দেখাতে নিয়ে গেছে। সে যেমন তার বন্ধুদের নদী দেখাতে নিয়ে যেত! তখন অবশ্য নদীপাড়ে তাদের ভগ্ন বসতভিটেটা ছিল। পাশের আমবাগানটাও ছিল। আমবাগানে একটা কুঁড়েঘর। সেখানে



থাকত করিমচাচা। তাদের ওই ভগ্ন বসতভিটে আর আমবাগানের কেয়ারটেকার। প্রায় প্রতি সপ্তাহে স্কুল ছুটির দিন সেখানে যেত সে। বাবা নিষেধ করত না। মায়ের আপত্তি ছিল। কিন্তু মা বাবাকে ভয় করত খুব! এক-দু’ রাত কাটিয়েছেও সে ওই নদী পাড়ের তাদের ভগ্ন বসতভিটেতে। জ্যোৎস্না রাতে! নদীর ঝিলমিল জল আর চরের ঝিকমিক বালি! অদ্ভূত মাদকতা। মদ্যপানের সখ সেই তখন থেকে। বসু তখন খুব ছোট। বাবার সঙ্গে নৌকায় করে নদীতে মাছ ধরত। নৌকাতেই রাত কাটাত। নৌকায় রান্না মাছ এনে দিত তাদের। সেই রান্না মাছ ছিল তাদের মদের চাট্‌। আহঃ কী স্বাদ! এখনো যেন মুখে লেগে আছে!

কত কথা মনে পড়ছে শতদলবাবুর। সে যে জীবন উপভোগ করেছে ছেলে যদি তার একাংশ করে, সে নিজেকে ধন্য মনে করবে। কারণ, সে মনে করে জীবন উপভোগ মানে বেঁচে থাকার উপলব্ধি!

শতদলবাবু নিশ্চিন্ত মনে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে।

ওদিকে সুপর্ণ জীবন উপভোগ করছে। সুপর্ণ বেঁচে থাকার উপলব্ধি অনুভব করছে। নদী পাড়ে দঁড়িয়ে আছে বন্ধুদের নিয়ে। বোল্ডার বাধাঁনো পাড়। দু’হাত নীচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ঘোলা জলের স্রোত। পশ্চিম আকাশে প্রখর সূর্যটা কাত মেরেছে। তবু সূর্যটার দিকে সে তাকাতে পারছে না। তার ওপর তীব্র আক্রোশ যেন সূর্যটার! ক’দিন মেঘে ঢাকা ছিল বলেই হয়ত! ভয়ে সে সূর্যটার দিকে তাকায় না। কিন্তু চারপাশের প্রকৃতিতে আর যেসব জিনিস আছে, সব দেখে। দেখতে ভালো লাগে তার। নদীর ওপারের বিস্তীর্ণ চর! তার ওপারে সবুজে ঢাকা ভিনদেশি গ্রাম। সেই সঙ্গে মাথার ওপরের নীল আকাশটা! বিশেষ করে নদীটাকে। ছুটে যাওয়া ঘোলা জলের স্রোত, ঘূর্ণি!

কিন্তু এ কী! চোখের সামনে কী দেখছে সে? শুভ্র ওই ঘোলা জলের স্রোতে নামছে কেন? নেমে কোথায় যেতে চাইছে? ওই ঘোলাটে জলেই তো ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিটা! বাবার করিমচাচা নাকি বলত, ঘূর্ণি বাদ দিলে নদীর সব ভালো। কেহু যদি ওই ঘূর্ণি এড়িয়ে থাকতে পারে, নদীতে তার কুনু ভয় নাই। বাবার মুখেই শুনেছিল সে। নদী পাড়ে আসতে আসতে কথাটা বন্ধুদের বলেছেও। তবু শুভ্র কেন ভয়ঙ্কর ওই ঘূর্ণিটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?

সুপর্ণ বসে থাকতে পারছে না। উঠে যাচ্ছে। চিল্লাচ্ছে, শুভ্র! এই শুভ্র! কোথায় যাচ্ছিস তুই? ঘোলাটে জলে নামছিস কেন? তোর সামনে যে ঘূর্ণি! তলায় চোরা স্রোত! বলতে বলতে সুপর্ণ শুভ্রকে আটকাতে পাড় ছেড়ে নিজেই নেমে যাচ্ছে ঘোলা জলের স্রোতে। আর সেই ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিটা এসে পড়ছে একেবারে তার সামনেই!

কী জানি কেন, বাড়ি ফিরতে ফিরতে হঠাৎ শতদলবাবুর মনে পড়ছে তার করিমচাচাকে। করিমচাচা নদীর ঘূর্ণি, চোরা স্রোত থেকে একবার তাকে প্রাণে বাঁচিয়েছিল। ছেলে সুপর্ণকে সে বলেছিল কথাটা।


সুপর্ণ আজ নদী দেখতে গেছে। কথাটা সুপর্ণ’র মনে আছে তো?




লেখক পরিচিতি
নীহারুল ইসলাম

‘সাগরভিলা’ লালগোলা, মুর্শিদাবাদ, ৭৪২১৪৮ পঃ বঃ, ভারতবর্ষ।
 জন্ম- ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৭, মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘী থানার হরহরি গ্রামে (মাতুলালয়)। 
শিক্ষা- স্নাতক (কলা বিভাগ), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা- শিক্ষা সম্প্রসারক। 
সখ- ভ্রমণ। বিনোদন- উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শ্রবণ। 
রৌরব, দেশ সহ বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনে লেখেন নববই দশক থেকে। 
প্রকাশিত গল্পগ্রন্থঃ 

পঞ্চব্যাধের শিকার পর্ব (১৯৯৬),  জেনা (২০০০),  আগুনদৃষ্টি ও কালোবিড়াল (২০০৪), ট্যাকের মাঠে, মাধবী অপেরা (২০০৮), মজনু হবার রূপকথা (২০১২)। 
দু’টি নভেলা--,  জনম দৌড় (২০১২), উপন্যাস।
 ২০০০ থেকে ‘খোঁজ’ নামে একটি অনিয়মিত সাহিত্য সাময়িকী’র সম্পাদনা। 
পুরস্কার : 
লালগোলা ‘সংস্কৃতি সংঘ’ (১৯৯৫)এবং শিলিগুড়ি ‘উত্তরবঙ্গ নাট্য জগৎ’ কর্তৃক ছোটগল্পকার হিসাবে সংবর্ধিত
 (২০০৩)। সাহিত্য আকাদেমি’র ট্রাভেল গ্রান্ট পেয়ে জুনিয়র লেখক হিসাবে কেরালা ভ্রমণ (২০০৪)। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ কর্তৃক “ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার” প্রাপ্তি (২০১০)। ‘ট্যাকের মাঠে মাধবী অপেরা’ গল্পগ্রন্থটির জন্য পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রবর্তিত “সোমেন চন্দ স্মারক পুরস্কার” প্রাপ্তি (২০১০)। ভারত বাংলাদেশ সাহিত্য সংহতি সম্মান “উত্তর বাংলা পদক” প্রাপ্তি (২০১১)। রুদ্রকাল সম্মান (২০১৩) প্রাপ্তি। 
niharulislam@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন