রবিবার, ১১ মে, ২০১৪

'শতবর্ষের একাকিত্ব' সম্পর্কে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ


দীর্ঘদিনের বন্ধু ও কলম্বিয়ার সাংবাদিক-ঔপন্যাসিক পিনিও এ্যাপুলেইও মেন্দোজা মার্কেজের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি নানা কথার এক ফাঁকে বিস্তারিত বলেন তাঁর সাড়া জাগানো উপন্যাস 'শতবর্ষের একাকিত্ব' হয়ে ওঠার পূর্বাপর-কথা। সাক্ষাৎকারের এ অংশটি এখানে মুদ্রণ করা হলো। অনুবাদ করেছেন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ ও অনুবাদক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস।

যখন 'শতবর্ষের একাকিত্ব' লিখতে বসলেন তখন আসলে কী করতে চাচ্ছিলেন?

_ বালক হিসেবে আমাকে যেসব অভিজ্ঞতা প্রভাবিত করেছে সাহিত্যে তাদের প্রকাশের একটা উপায় খুঁজছিলাম।

অনেক সমালোচক কিন্তু বইটায় মানবজাতির ইতিহাসের একটা কাহিনী কিংবা একটা রূপক দেখতে পান।

_ না, আমি যা চেয়েছি তা হলো আমার বাল্যকালের জগতের একটা সাহিত্যিক দৃশ্য আঁকতে। আপনি জানেন, এই জীবন আমার কাটে একটা বিশাল কিন্তু খুব বিষণ্ন বাড়িতে। সেই বাড়িতে থাকত আমার বোন, সে মাটি খেত; থাকতেন আমার নানী-মা, তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করতেন এবং থাকতেন একইরকম আরো অসংখ্য জ্ঞাতিগোষ্ঠী। সুখ ও উন্মাদনায় পার্থক্য কী তারা জানতেন না।

তবু তো সমালোচকরা বইতে অনেক বেশি জটিল উদ্দেশ্য দেখে থাকেন।

_ সেরকম জটিল উদ্দেশ্য যদি থাকেই তো জানবেন যে তা একেবারে অনভিপ্রেত। আসলে সমালোচকরা সাধারণত বইয়ে যা দেখতে চান তা-ই বার করেন, যদিও ঔপন্যাসিক তা করেন না।

সমালোচকদের সম্পর্কে আপনি সবসময়ই একটু পরিহাসপ্রিয়। তাদের এতো অপছন্দ করেন কেন?

_ কারণ অধিকাংশ সমালোচক বুঝতে পারেন না যে 'শতবর্ষের একাকিত'্বর মতো উপন্যাস আসলে একটুখানি ঠাট্টামস্করা, নিকট বন্ধুদের প্রতি কিছু কিছু সংকেত দিয়ে লেখা। এজন্য তারা মোড়লিপনার পূর্বনির্ধারিত অধিকার নিয়ে বইকে বিকৃত করতে বসেন এবং সেই সঙ্গে নিজেদের একেবারে নির্ভেজাল বোকা বানানোর ঝুঁকি বহন করেন।

উদাহরণস্বরূপ আমার মনে আছে একজন সমালোচক ভেবেছিলেন যে, তিনি উপন্যাসটির একটা গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি আবিষ্কার করেছেন, কেননা একটা চরিত্র_ গ্যাব্রিয়েল_ র‌্যাবেলাইসের সমগ্র রচনা নিয়ে প্যারিসে যায়। এই আবিষ্কারের পর সমালোচকপ্রবর বইতে যত অতিরঞ্জন এবং প্যান্টাগ্রুয়েলীয় বাড়াবাড়ি আছে তা এই সাহিত্যিক-প্রভাবের ফল বলে জানান। আসলে আমি র‌্যাবেলাইস সংক্রান্ত উদ্ধৃতি কলার ছোবড়ার মতোই ছুড়ে ফেলেছিলাম। বহু সমালোচক তার ওপর আছাড় খেয়েছেন।

সমালোচকদের কথা বাদ দিলেও আমার মনে হয় যে উপন্যাসটি আপনার ছেলেবেলার কাব্যিক স্মৃতির চেয়েও অনেক বেশি কিছু। একবার কি কথা প্রসঙ্গে বলেননি যে বুয়েন্দিয়া পরিবারের কাহিনী সমগ্র ল্যাটিন আমেরিকারই ইতিহাস হতে পারে?

_ হ্যাঁ, তা ঠিক। ল্যাটিন আমেরিকার ইতিহাসও বহু অর্থহীন প্রয়াস আর মহতি নাটক দ্বারা গঠিত, যদিও এইসব নাটককে আগে থেকেই নিন্দা করে শেষ করে দেওয়া হয়। স্মৃতিহীনতার রোগ আমাদেরও ভোগায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখন আর কেউই স্মরণ করে না যে কলা কোম্পানির শ্রমিকদের আদৌ হত্যা করা হয়েছিল। যা কিছু তাদের মনে আছে তা হলো কর্নেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া।

এবং কর্নেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া যে তেত্রিশটা যুদ্ধে পরাজিত হন সেগুলো আমাদের রাজনৈতিক হতাশার এক একটা প্রকাশ হতে পারে। ধরুন, কর্নেল জিতলে কী হতো?

_ কর্নেল তখন বহুলাংশে মোড়লের মতো হতেন। উপন্যাসটা লিখতে গিয়ে এক পর্যায়ে ইচ্ছে হলো দিই কর্নেলকে ক্ষমতায় বসিয়ে। যদি দিতাম তো দেখা যেত 'শতবর্ষের একাকিত্ব' নয়, 'মোড়লের শরত' লিখে ফেলেছি।

তাহলে কি আমরা এই সিদ্ধান্ত নেব যে ইতিহাসের কোনো এক ভাগ্যচক্রে যিনিই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন, ক্ষমতা পেলে তিনি নিজেও স্বৈরাচারী হবার ঝুঁকি বহন করেন?

_ 'শতবর্ষের একাকিত্ব'য় কর্নেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার একজন বন্দি তাকে বলে, 'আমি যে ব্যাপারে সবচেয়ে উদ্বিগ্ন তা হলো সামরিক জান্তার প্রতি এতো প্রচ- ঘৃণা নিয়ে, এতো প্রাণপণ লড়ে এবং তাদের সম্পর্কে দিনরাত এতো ভাবনা-চিন্তা করেও আপনার পরিণতি তাদের মতোই খারাপ।' শেষে সে বলছে, 'এইভাবে চললে আপনি আমাদের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় স্বৈরাচারী এবং রক্তপায়ী একনায়কে পরিণত হবেন।'

একথা কি সত্য যে আপনি আঠারো বছর বয়সে এই উপন্যাস লিখতে চেষ্টা করেছিলেন?

_ হ্যাঁ, তখন এর নাম দিয়েছিলাম 'মহল'। কারণ আমার ধারণা ছিল বইয়ে সমগ্র কাহিনীই ঘটবে বুয়েন্দিয়ার বাড়ির অন্দরমহলে।

কতোটুকু খসড়া করেছিলেন? একশো বছর পুরোটা অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তা কি তখনই ছিল?

_ না, সে সময় কাহিনীর একটা ধারাবাহিক কাঠামো পর্যন্তও যেতে পারিনি। কেবল ছাড়া ছাড়া গল্প লিখে রেখেছিলাম। সেসময় যে সংবাদপত্রে কাজ করতাম, তাতে কিছু কিছু ছাপা হয়। বছরের হিসেব কোনো ব্যাপার ছিল না। এবং এখনো আমি নিশ্চিত নই শতবর্ষের একাকিত্ব আদৌ একশো বছরের পরিধি ধারণ করে কি-না।

তখনই বইটা লিখে ফেলেননি কেন?

_ ওই ধরনের একটি বই লিখতে যে অভিজ্ঞতা, ধৈর্য ও ব্যবহারিক কৌশল প্রয়োজন তখন তার কিছুই আমার ছিল না।

কিন্তু কাহিনী তো আপনার মাথায় বরাবরই ঘুরেছে।

_ হ্যাঁ, আরো পনেরো বছর ধরে। আমি ঠিক মেজাজটা ধরতে পাচ্ছিলাম না। ঠিক সুরটা ধরার প্রয়োজন ছিল। একদিন বাচ্চাদের নিয়ে মার্সেদেস এবং আমি আকা-পুলকো যাচ্ছি, তখনই হঠাৎ একটা ঝলকানির মতো মাথায় খেলে যায়। হ্যাঁ, গল্পটা আমার নানী-মা'র ভঙ্গিতে বলতে হবে_ তিনি যেমন আমার কাছে তার গল্প করতেন। আমি দুপুর দিয়ে শুরু করব। সেসময় একটা ছোট ছেলেকে তার দাদা বরফ আবিষ্কার করতে নিয়ে যায়।

এটা সাদামাটা বৃত্তান্ত।

_ সাদামাটা, কিন্তু তাতে সব অসাধারণ জিনিস এসে মিশেছে খুবই সরল গতানুগতিকতায়।

এ কথা কি সত্য যে, আপনি তখনই গাড়ি ফিরিয়ে লিখতে শুরু করেন?

হ্যাঁ, সেদিন আর আমাদের আকা-পুলকো যাওয়া হয়নি।

আর মার্সেদেস?

_ আপনি তো জানেন এ ধরনের পাগলামি মার্সেদেসকে কতো সহ্য করতে হয়। ওকে ছাড়া আমি ওই বই লিখতেই পারতাম না। পরিস্থিতির ভার সে নেয়। কয়েক মাস আগে একটা গাড়ি কিনেছিলাম, সেটা বন্ধক দিয়ে মার্সেদেসের হাতে টাকা গুঁজে দিই। হিসেব করে দেখি যে ছ'মাস ওই টাকায় চলে যাবে। কিন্তু বইটা লিখতে লেগে গেল দেড় বছর। টাকা বহু আগে ফুরিয়ে গেছে, অথচ সে একটা কথা বলেনি। জানি না কীভাবে চালিয়েছে। কসাইকে ব'লে গোস্ত, রুটিঅলাকে ব'লে রুটি_ সব জোগাড় করেছে সে। আর বাড়িঅলাকে ন'মাস অপেক্ষা করিয়েছে ভাড়ার জন্যে। এইভাবে আমাকে কিছু না জানতে দিয়েই সবকিছুর তদারকি করেছে সে। এমনকি মাঝে মাঝেই আমার জন্যে পাঁচশো-তা কাগজও জোগাড় করেছে। পাঁচশো-তা কাগজ মজুদ না থাকলে আমার চলত না। বই শেষ হলে মার্সেদেসই পা-ুলিপি ডাকে পাঠিয়েছে এডিটরিয়াল সুদামেরিকানা প্রকাশকের কাছে।

একবার তিনি আমাকে বলেছিলেন যে পা-ুলিপি ডাকে দেওয়ার সময় তার ভাবনা হলো, 'এতো কিছুর পর যদি উপন্যাসটা না কাটে?' বইটা তিনি পড়েছিলেন বলে মনে হয় না, ঠিক কি?

_ হ্যাঁ, মার্সেদেস পা-ুলিপি পড়তে ভালোবাসে না।

তিনি এবং আপনার ছেলেরা সাধারণত সবার শেষে আপনার বই পড়ে থাকেন। আচ্ছা, আপনি কি নিশ্চিত ছিলেন যে 'শতবর্ষের একাকিত্ব' বাজারে কাটবে?

_ সমালোচকরা পছন্দ করবেন সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম কিন্তু সাধারণ পাঠকও যে এতোটা পছন্দ করবেন তা ভাবতে পারিনি। আমার ধারণা ছিল যে বোধহয় হাজার পাঁচেক কপি বিক্রি হবে (এর আগের বইগুলো তখন পর্যন্ত প্রত্যেকটি মাত্র এক হাজার সংখ্যা বিক্রি হয়েছিল।) বরং আমার চেয়ে এডিটরিয়াল সুদামেরিকানাই বেশি আশাবাদী ছিল। ওরা ভেবেছিল হাজার আষ্টেক কপি বিক্রি হবে। বস্তুত কেবল বুয়েন্স আইরাসেই দু'প্তাহের মধ্যে প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে যায়।

বেশ, এবার বইটা সম্পর্কে আলাপ করা যাক। বুয়েন্দিয়া পরিবারে একাকিত্বের উৎস কোথায়?

_ আমার মনে হয় তাদের ভালোবাসহীনতায়। বইয়ে দেখবেন পুরো একশো বছরে টিকিদার অরেলিয়ানোই একমাত্র বুয়েন্দিয়া_ যার মধ্যে ভালোবাসার সঞ্চার হয়েছে। এছাড়া বুয়েন্দিয়ারা ভালোবাসতে অক্ষম এবং এইটেই তাদের একাকিত্ব ও হতাশার মূল কারণ। আমার মতে একাকিত্ব একতার ঠিক উল্টো জিনিস।

আমরা জানি ল্যাটিন আমেরিকার রীতিই হলো বাবা কিংবা দাদার নামে ছেলে-পুলে নাতিপোতার নাম রাখা। এবং আপনার বংশে তা এতো দূর পর্যন্ত গড়িয়েছে যে আপনার এক ভাই-এর নামও গ্যাব্রিয়েল। এজন্যে সবাই যেমন প্রশ্ন করে যে উপন্যাসে এতোগুলো অরেলিয়ানোদের থেকে হোসে আর্কেদিওদের আলাদা করার একটা সূত্র আছে। সেইটে কী?

_ খুবই সাধারণ একটা সূত্র। হোসে আর্কেদিও একই বংশের সৃষ্টি করে, কিন্তু অরেলিয়ানোরা তা করে না। অবশ্য এরও একটা ব্যতিক্রম আছে_ হোসে আর্কেদিও সেগান্দো এবং অরেলিয়ানো সেগান্দো। এর কারণ সম্ভবত এই যে একইরকম যমজ হওয়াতে জন্মের সময়ই তাদের এক করে ফেলা হয়।

উপন্যাসে পুরুষের সহজাত প্রবণতা হলো নির্বুদ্ধিতা (আবিষ্কার, রসায়ন, যুদ্ধবিগ্রহ, গোঁয়ার্তুমি), আর নারীর হলো সুবুদ্ধি। এই দুই জাত সম্পর্কে আপনার অভিমত কি এই?

_ আমি মনে কির নারী জগৎ-সংসার চালু রাখে, সবকিছু ভেঙেপড়া থেকে রক্ষা করে। তখন পুরুষ ইতিহাসকে সামনে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টায় রত। শেষ বিচারে বলা শক্ত দুই জাতের কোনটি বেশি উন্মাদ।

মেয়েরা শুধু বংশ রক্ষার প্রতিশ্রুতিই দেয় না, উপন্যাসটাও চালু রাখে। উরসুলা ইগুয়ারান যে এতো দীর্ঘদিন বাঁচে তার গোপন কথা কি এই?

_ হ্যাঁ, তার মরা উচিত ছিল গৃহযুদ্ধের আগেই যখন তার বয়স হতে যাচ্ছিল একশো বছর। কিন্তু আমি ভাবলাম যদি তাকে মারি তো বইটা নষ্ট হবে। সে মরতে মরতে বইয়ে এতো কিছু ঘটেছে যে তার মৃত্যুর পর কী ঘটবে না ঘটবে তাতে কিছু আসে যায় না।

বইয়ে পেত্রাকোটেজের ভূমিকা কী?

_ আপাতদৃষ্টিতে তার মধ্যে হয়তো ফার্নান্দার বা যে কোনো ক্যারিবিয়ান মহিলার ছায়া দেখবেন যার ভেতর এন্ডিয়ান মেয়েদের মতো কোনো নৈতিক সংস্কার নেই। কিন্তু আমার মনে হয় তার চরিত্র বহুলাংশে উরসুলার চরিত্রে মতো_ হ্যাঁ, সে আসলে উরসুলাই, যদিও তার বাস্তবতাবোধ অনেক বেশি রূঢ়।

আমি জানি উপন্যাসটি রচনার সময় কোনো কোনো চরিত্র আপনার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ভিন্নরূপ লাভ করে। একটা উদাহরণ দিতে পারেন?

_ হ্যাঁ, একটা চরিত্র হলো পিয়েদাদের সান্তা সোফিয়া। বইয়ে এবং বাস্তবজীবনেও আমি চেয়েছিলাম যে নিজের কুষ্ঠ ধরা পড়লে কারো কাছ থেকে বিদায় না নিয়েই সে বাসা ত্যাগ করবে। যদিও তার সমগ্র ব্যক্তিত্ব এক ধরনের আত্মত্যাগের এবং আত্মহননের প্রেরণার ওপর গড়ে উঠেছিল এবং সেজন্য তার কাউকে না বলে চলে যাওয়াটা বিশ্বাসযোগ্য হতো, তবু আমি ভাবলাম যে না, এটা পাল্টাব, এতোটা ক্রূর না হওয়াই উচিত।

কোনো চরিত্র কি একেবারেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল?

_ তিনটে চরিত্র গিয়েছিল এই অর্থে যে তাদের ব্যক্তিত্ব ও জীবন আমার ইচ্ছানুযায়ী সৃষ্টি হয়নি। নিজের ফুপু অমরান্তার প্রতি অরেলিয়ানো হোসের ভয়াবহ আকর্ষণ আবিষ্কার করে আমি অবাক হয়ে যাই। হোসে আর্কেদিও সেগান্দো আমার ছন্দমাফিক কলাশ্রমিকই ইউনিয়নের নেতা নয়। আর হোসে আর্কেদিও, আমাদের শিক্ষানবিস পোপ, শেষ পর্যন্ত এমন একজন অবক্ষয়ী আদোনিস-এ পরিণত হলো যে উপন্যাসের সামগ্রিকতায় তাকে একেবারে খাপছাড়া মনে হয়।

আমরা যারা উপন্যাসের কিছু কিছু সূত্র সম্পর্কে অবহিত, একটা জায়গায় এসে দেখতে পাই যে মাকোন্দো আর ছোট্ট শহরটি, আপনার শহরটি নেই বরং হয়ে গেছে এক বিশাল নগরী, বারাঙ্কুইলা। সেখানকার পরিচিত কোনো ব্যক্তি কিংবা অঞ্চল এসেছে কি উপন্যাসে? কিংবা শহরের এরকম পরিবর্তনে আপনাকে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে?

_ আমার জন্য মাকোন্দো ততটা স্থান নয় যতটা মানসিক অবস্থা। সুতরাং শহর থেকে মহানগরে দৃশ্য নিয়ে যাওয়াটা কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু একটা থেকে অন্যটায় পাল্টানো, বিশেষ করে পরিবেশ যখন তেমন পাল্টাচ্ছে না_ সেটা সমস্যাই বটে।

লেখাকালীন সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত গেছে কখন?

_ শুরু করাটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন। স্পষ্ট মনে আছে সেই দিনটি যেদিন দারুণ কষ্ট করে প্রথম বাক্যটা লিখে রীতিমতো আতঙ্কিত স্বরে নিজেকে প্রশ্ন করলাম, 'জাহান্নামে যাক, এরপর কী লিখব?' বস্তুত জঙ্গলের মধ্যে পুরনো দিনের যুদ্ধজাহাজ আবিষ্কারের পূর্ব পর্যন্ত আমি জানতাম না কী হতে যাচ্ছে। কিন্তু ওই জায়গা থেকেই সমস্ত ব্যাপারটা একটা উন্মাদনার মধ্যে কেটে যায়। খুব ভালোও লাগে।

যেদিন লেখা শেষ করলেন সেদিনের কথা মনে আছে? কোন সময় শেষ হলো? কেমন লেগেছিল তখন?

_ আমি লিখছিলাম আঠারো মাস ধরে প্রতিদিন সকাল ন'টা থেকে বিকেল তিনটে পর্যন্ত। যেদিন শেষ করি সেদিন ঠিকই জানতাম যে শেষ হতে যাচ্ছে কিন্তু যে সময়ে স্বাভাবিকভাবে শেষ হতে চলল সেই সময়টা ছিল অসময়, সকাল তখন প্রায় এগারোটা। মার্সেদেস বাসায় ছিল না। ফোন করেও কাউকে পেলাম না যে বলব শেষ করেছি। স্পষ্ট মনে আছে, যেন গতকালের ঘটনা, তখন কী রকম হতবিহ্বল হয়ে বসেছিলাম। হাতে বাকি যে সময়টুকু ছিল তা কী করে কাটাব জানা নেই। তাই এমন সব জিনিসপত্র আবিষ্কার করতে থাকি যেন বেলা তিনটে পর্যন্ত কাটানো যায়।

বইটার নিশ্চয়ই এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে যা সমালোচকরা (যাদের প্রতি আপনি এতোটা বীতশ্রদ্ধ) ধরতে পারেননি। কী সেসব দিক?

_ একটা হলো বইটার এক অসাধারণ গুণ_ সব চরিত্রের প্রতিই লেখকের অপরিসীম ভালোবাসা।

এ পর্যন্ত কাকে আপনার সবচেয়ে সেরা পাঠক বলে মনে হয়েছে?

_ আমার এক রুশ বন্ধু একজন মহিলার সাক্ষাৎ পান, খুব বৃদ্ধ এক মহিলা, যিনি সমস্ত বইটা, একেবারে শেষ লাইন পর্যন্ত, হাতে লিখে নকল করেছিলেন। আমার বন্ধু তাকে জিজ্ঞেস করেন কেন তিনি ওরকম লিখছেন। তো মহিলার উত্তর : 'কারণ আমি জানতে চাই কে আসলে উন্মাদ লেখক না আমি। এবং সেটা জানার একটিই পথ হলো বইটা আগাগোড়া লিখে ফেলা।' ওই মহিলার চেয়ে সেরা পাঠক আর কেউ হতে পারেন বলে আমার পক্ষে ভাবা কঠিন।

কটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এই বই?

সতেরোটি।

ইংরেজি অনুবাদ শুনেছি খুবই চমৎকার।

_ হ্যাঁ, খুবই চমৎকার। ইংরেজি আঁটসাঁট বাক্যে ভাষা আরো বেশি শক্তিশালী হয়।

অন্যান্য অনুবাদ?

_ ফরাসি এবং ইতালীয় ভাষার অনুবাদকদের সঙ্গে আমি বেশ কিছুটা কাজ করেছি। দুটো অনুবাদই ভালো হয়েছে। তবু ফরাসিতে বইয়ের মেজাজ ঠিক আসে না, অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে।

ইংল্যান্ড ইতালির চেয়ে ফ্রান্সে বইটার কাটতি কম। স্প্যানিশ-বলা দেশগুলোর কথা বাদই দিলাম কারণ ওসব দেশে অসাধারণ বাজার পেয়েছে আপনার বই, কিন্তু ফ্রান্সে বাজার না পাওয়ার কারণ কী?

_ সম্ভবত তাদের কার্তেজীয় ঐতিহ্য। আমি দেকার্তের শৃঙ্খলার চাইতে র‌্যাবেলাইসের উন্মাদনার অনেক নিকটবর্তী। ফ্রান্সে দেকার্তেরই প্রভাব বেশি। হয়তো এজন্যই অন্যান্য দেশে বইটা যেমন জনপ্রিয় ফ্রান্সে তেমন নয়। অবশ্য সেখানে সমালোচনা যা বেরিয়েছে তা খুবই অনুকূল। সেদিন রোসানারোসান্দা বললেন যে ফ্রান্সে প্র্রথম ছাপা হয় ১৯৬৮ সালে। ব্যবসায়-সাফল্যের জন্যে সময়টা মোটেও অনুকূল ছিল না।

শতবর্ষের একাকিত্বর সাফল্যে কি আপনি দিশেহারা?

_ হ্যাঁ, খুবই।

এই সাফল্যের গোপন সূত্রটি কী তা ভেবে দেখেছেন কখনো?

না, তা জানতেও চাই না। একটা বই, যা মাত্র কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কথা মনে রেখেই লিখেছি_ তার এমন কাটতি হয় কেন সে তথ্য জানাটা খুব বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আমি মনে করি।
- See more at: http://www.sangbad.com.bd/index.php?ref=MjBfMDRfMjRfMTRfMV80MV8xXzE2MTQzOA==#sthash.BUtJsMir.dpuf

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন