মঙ্গলবার, ১০ জুন, ২০১৪

কল্লোল লাহিড়ীর ধারাবাহিক উপন্যাস : গোরা নকশাল-- পর্ব তিন

গোরা নকশাল পর্বের লিঙ্ক
---------------------------------------------------------------------------------------------
“বিজয়ের পথে এগিয়ে চলো! স্বদেশ অথবা মৃত্যু !... সবটুকু বিপ্লবী উষ্ণতা দিয়ে আলিঙ্গন করছি তোমাকে!”

তিন

জ্বর, পেট ব্যাথা, শর্দি, সারা গায়ে গুটি গুটি এলার্জি এই সব হলে সাধারণত আমার আনন্দ হয়। আর একবার হলে দিন কয়েকের জন্যে আমার পড়াশুনো সব শিকেয় ওঠে। মা সরস্বতীর রাজ হাঁস সব বই পত্তর নিয়ে চৌপাট দেয় আমার এ্যালুমিনিয়ামের স্কুল বাক্সে। ধুলো জমে। মাকড়সা এসে বাসা বাঁধে। হাঁদার সাদা পায়রা নকশাল এসে মাঝে মাঝে তার ওপর একটু পাখনা মেলে ঘুরে বেড়িয়ে আমার দিকে ঘাড় কাত করে তাকায়। ভাবটা যেন... “টুকনু তুই হাড়ে বজ্জাত।”
একটু সবুজ রঙের হাগুও করে দিয়ে যায়। তখনি বাড়ির সবার টনক নড়ে। তখনি খোঁজ পড়ে আমি অনেক দিন পড়ি না। দাদা কত পড়ে। সদ্য ওঠা গোঁফ নিয়ে, জ্যাবড়া করে মাথায় নারকোল তেল আর গায়ে পিঠে সরষের তেল মেখে রোদ না আসা উঠোনের এক কোনায় শীতের দুপুরে অঙ্ক করে। আমাকে বাবা বকে না। বলে “ওকে ছেড়ে দাও...বাপী তো আছে...ওই সামলে নেবে ভাইকে। ...দেখ টুকনু নকশালও তোর এই না পড়া সহ্য করতে পারছে না। দিয়েছে অপ কম্মটি করে। ” আমিও তক্কে তক্কে থাকি। আসুক পাশের বাড়ির হুলোটা একদিন। এমন মাংস ভোজ হবে না...তোর সব রেলা বেড়িয়ে যাবে। ঘাড় কেতলে পড়ে থাকবি...কিম্বা গোরা নকশালের মতো পা মুচকে যাবে। দাদা আবার অঙ্ক খাতা থেকে মাথা তোলে। গম্ভীর হয়ে তাকায়। আজ আমার জ্বরের তিন দিন। মাথার ঘাটা শুকিয়েছে। দাদা কেনো কারোরই দেখি পছন্দ নয় গোরা নকশালকে নিয়ে আল টপকা এমন সব কথা বলা...। তিন দিন গোরা নকশাল আমাদের বাড়ির দিকে আসেনি। তিনদিন আমিও যে বিছানা থেকে খুব একটা উঠতে পেরেছি তেমনটাও নয়। দাদা আবার অঙ্কে মন দিলে আমি আমার গলার কাছে গিঁট বাঁধা চাদরটা ঠিক করে নিই...। “গোরো কিনা কালো কি...” গুনগুন করে আসে গানটা গলার কাছেই। কালই পিকনিক পার্টি চালাচ্ছিলো মাইকে।

জিটি রোডের পাশে হনুমান জুটমিলের কোয়ার্টারের দেওয়ালে পোষ্টার এঁটে দিয়েছে হরেন কাকা নতুন সিনেমার। হরেন কাকা পোষ্টার সাঁটে। দুপুরে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, হরেন কাকা ছোট্ট মই, একটা বালতি ভর্তি আঠা আর পোষ্টার নিয়ে বের হয়। আমি পিছু নিলেই ঘাবড়ে যায় ছোটো খাটো মানুষটা। কাইমাই করে ওঠে। ওর ধারণা মাষ্টার বাবু ওকে বকবে। আমাকে বাধ্য হয়ে চলে আসতে হয়। তবে আসার আগে শর্ত হিসেবে হরেন কাকা বলে দেয় পোষ্টারে নাকি লেখা আছে ডিস্কো ডান্সার। মিঠুনের বই। হেবি হিট। শ্রীকৃষ্ণতে এসেছে। হরেন কাকার কান ঢাকা চুল। হরেন কাকার সাদা রঙের চটি। হরেন কাকা বিড়ি খায়। আর হাঁদার দোকানে চা। দাদা ডাকে। পেছন ফিরে তাকাই। “বাবা হিন্দি গান করতে বারণ করেছে না?” আমি মুখ ভ্যাঙাই। ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে হরেন কাকার মতো কানের ওপর চুল গুলোকে

আনতে চাই। দাদা চিতকার করে ওঠে... “ওই দেখো মা ভাই হিন্দি গান গাইছে...কানের ওপর চুল টানছে”। রান্না ঘর থেকে ভেসে আসে মায়ের গলা... “ওকে এবার ঠিক নেড়া করে দেবো দেখ...।” আমি পালাই। বাড়িতে একমাত্র মাকে ভয় পাই। আর কাউকে না। আমার পালানোর চোটে নকশালের দানার থালা উলটে যায়। নকশাল গলা ফুলিয়ে পাঁচিলের ওপরে ঘাড় কাত করে আমাকে দেখে। আমি ঠিক জানি যারা উড়তে পারে তাদের নাম হয় নকশাল। দাদা ভুল, কোনো মানুষ কি কিছু পালটে দিতে পারে? থমকে দাঁড়াই। স্কুলে একটা লোক ম্যাজিক দেখাতে এসেছিলো। সে সবুজ রঙের সব ফুল গুলোকে লাল করে দিলো। তাহলে কি গোরা নকশাল ম্যাজিশিয়ান? কিছুতেই ওই লোকটার কথা ভুলতে পারছি না কেনো? এতো মণির মামদোর চেয়েও খুব খারাপ।

গোরা নকশালকে ভুলে এগোতে গেলে বাবার সাথে দেখা হয়ে যায়। বাবার ব্যাগ থেকে পেঁয়াজ কলি উঁকি মারতে দেখে আমার খুব আনন্দ হয়। বুঝতে পারি আজ খুব সুন্দর করে ভাত খাবো। বাবা রান্না ঘরের সামনে ব্যাগ নামালে মা চিতকার করে ওঠে। “আচ্ছা আবার এই এতো পেঁয়াজ কলি আনলে?” বাবা কথা ঘোরাতে যায়। “ওই জোর করে দিয়ে দিলো...বললো শেষবেলার বাজারে এসেছেন মাষ্টার মশাই...এই কটা নিয়ে যান।” মা আরো রেগে যায়। “তার সঙ্গে তেলটাও দিয়ে দিলে পারতো।” আমার সুন্দর মাটা দিন দিন কেমন যেন খিট খিটে হয়ে যাচ্ছে। বাবা ইশারায় আমাকে ওখান থেকে চলে যেতে বলে। আমি রান্না ঘরের সামনে থেকে পালাই। জল খাবার কি হচ্ছে সেটা জানার আর সাহস থাকে না আমার।

এখন তো শরীর খারাপ তাই নানা টাল বাহানা, ফন্দি ফিকির এঁটে আমাকে পড়তে বসতে হয় না। পরীক্ষা শেষ, বড় দিনের ছুটি তাই বাবার সাথে সক্কাল বেলা উঠে স্কুলে যেতে হয় না। শুধু চিন্তা থাকে একবার স্কুলটা খুললে রেজাল্টটা যখন বেরোবে তখনকার কথা চিন্তা করে। শীতের সকালটা কেমন যেন ভয় নিয়ে আসে আমার ওই হাফপ্যান্টের জীবনে। চুপটি করে ঠাম্মার পুজোর পাশে গিয়ে বসি। হে ঠাকুর...আমাকে পাশ করিয়ে দিও বাবা...। চোখ বন্ধ করি। আর ঠিক তখনি মণির কাছে জল পোড়া নিতে আসে পাশের পাড়ার দত্ত বাড়ির বৌ। লাল পাড় শাদা শাড়ি। গলায় মোটা একটা সোনার চেন। পাড়ার মধ্যে ওদের বাড়িতেই একমাত্র ফোন আছে। আমি কোনোদিন ফোন ধরিনি। দাদা বলেছে ফোনের মধ্যে থেকে নাকি পি পি আওয়াজ বেরোয়। দাদা কে দত্ত গিন্নি মাঝে মাঝে নেমনতন্ন করে খাওয়ায়। ওর পৈতে হয়ে গেছে কিনা...। আমায় করে না। আজ ষষ্ঠী...কাল একাদশী...পরশু অমুক লেগেই থাকে। দাদা এসে জোরে জোরে গড় গড় করে বলে কি কি খাইয়েছে। হাঁদা, মণি, ঠাম্মা রেগে যায়। আমার তখন লুচি খেতে ইচ্ছে করে। শিমাইয়ের পায়েশ খেতে ইচ্ছে করে। লাড্ডু খেতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে দু পা ছড়িয়ে খুব করে কাঁদতে। হাঁদা আমাকে দোকানে নিয়ে যায়। বেঞ্চিতে বসিয়ে লম্বু দেয়। আমি চায়ে ডুবিয়ে ডুবিয়ে খাই। আর জুটমিলের হর কিষাণ দারোয়ান তখন বসে একটু জিরোয়। দেশের ছট পুজোর গল্প করে। তার গ্রামের পাশ দিয়েও নাকি গঙ্গার মতো এতো বড় না হলেও একটা ছোট্ট নদী বয়ে গেছে। কমলা। সে দেশে যেতে পারেনি এই বছর, তার মন ভালো নেই।

মণি ফুঁ দিয়ে জলের ওপর কিসব মন্ত্র পড়ে। হাত দিয়ে আঁকি বুঁকি কাটে জলের ওপর। অনেক দূর দূর থেকে লোকজন আসে মণির কাছে। ভিড়টা একটু বেশি হয় শনি আর মঙ্গলবারে। কারো ঘাড় মচকে গেছে, কারোর পিঠে ব্যাথা, কারো অনেক দিনের বাচ্চা হচ্ছে না। মণি সবার কথা শোনে, তারপর কাগজের পুড়িয়াতে মুড়িয়ে মুড়িয়ে কিসব দেয়। দাদা বলে মণি অনেক তন্ত্র মন্ত্র জানে। রাতের বেলায় ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কথা বলে। বিড়বিড় করে। আমিও শুনেছি। কিন্তু ভয় পাইনি কোনোদিন। কেনো ভয় পাবো? মণি, ঠাম্মা, বড়মা সেই যে কবে আঁধার রাত পেরিয়ে, কাঁটা তার পেরিয়ে একা একা ইচ্ছামতী পার করে চলে এসেছিলো...। ঠাম্মা লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে তুলে নিয়েছিলো এক খাবলা দেশের মাটি। ঠাকুরের বাক্সতে এখোনো তাকে যত্ন করে পুজো করে ঠাম্মা। রোজ সকালে প্রনাম করে। বাতাসা দেয়। তুলসী গাছ নেই...তুলসী তলা নেই...পুজো করতে করতে আমার দিকে তাকিয়ে ছানি পাকা চোখ গোল গোল করে বলে “একটা বড় তুলসী মঞ্চ ছিলো বুঝলি টুকনু...। বড় বড় পাতা। তোর দাদু সেখানে অষ্টম প্রহরের শামিয়ানা টাঙাতো।” অষ্টম প্রহর কী আমি জানি না। আমার তিক্ষ্ণ নজর বাতাসার থালার দিকে। ডেঁও পিঁপড়েদের আগে সেগুলো আমার পেটে। মণি ডাকে। কপালে হাত দিয়ে জ্বর দেখে। মাথায় ফুঁ দিতে গেলে আমি সরিয়ে নিই। পাছে জ্বর সত্যি সত্যি সেরে যায়! মণি দাদাকে পাঁচ টাকা দেয়। দত্ত গিন্নি প্রনামী দিয়েছে। আজ দুধ আসবে বাড়িতে। পায়েস হবে। হাঁদার জন্মদিন। আমি গিয়ে জানলার ধারে বসি। মাথার ঘাটা শুকিয়ে এসেছে। কত লোক কত কাজে যায় আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে। কত বড় বড় ট্রাক, বাস ছুটে যায় জিটি রোডের ওপর দিয়ে। বাড়ির কোনের দিকের ছোট্ট ঘরটার জানলা দিয়ে সবটা দেখা যায়। আমি অনেকটা সময় কাটাই এই ঘরে। মণি, ঠাম্মা, হাঁদা থাকে এই ঘরটায়। লম্বা একটা চাটাই পাতা হয়। শীতের সময় কড়িকাঠ থেকে ঝোলা বাঁশের ওপরে রাখা লেপ, কম্বল পাড়া হয়। বড় পাঁচিলের ওপর থেকে যেটুকু রোদ আসে সেটুকুতেই ওদের সেঁকা হয়। তারপর ঘরে ঘরে নাম করে সবার যা যা জিনিস চলে যায়। ঘর বলতে তো ওই মোটে সাড়ে তিনটে। সামনে একটা উঠোন। আর উঠোনের পাশে রান্না ঘর। উঠোনের আর একদিকে পায়খানা। সকালে ওদিকটা আবার মেথর এলে যাওয়া যায় না। খাটা পায়খানা থেকে গন্ধ আসে খুব। হরি মেথর বড় বড় দুটো টিনের ডাব্বা একটা ছোট্ট গাড়িতে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে আসে। সঙ্গে থাকে বড় একটা হাতা। বড় বড় হাতা দিয়ে রাস্তার ওপরে দাঁড়িয়ে হরি মেথর গু ঢালে বড় টিনের ডাব্বাতে। হাঁদা ঠিক উলটো দিকের দোকানে উনুনে আঁচ ধরায়। সাতটার সাইরেন পড়ে। জুটমিল ছুটি হয়। বিহার থেকে আসা সব মানুষ গুলো জড়ো হয় হাঁদার দোকানের সামনে। শীতের সকালে ওদের মুখে চোখে লেগে থাকে সারা রাত জেগে কাজ করার একটা স্নিগ্ধ অনুভূতি। ওদের মাঝখানে ওই শীতের সকালে চায়ের ভাঁড়ে যাকে চুমুক দিতে দেখি, তাকে তিন দিন দেখিনি। একটু একটু করে চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দেয় গোরা নকশাল। আর বুড়ো বিহারীটা যে আমাদের বাড়ির পাশে ডাক্তার কিসিকুর ডিস্পেন্সারিটা রোজ খুলে দেয়, ঝাঁট দেয়, সে হাতপা নেড়ে কিসব বলতে থাকে। ওর পাশে জড়ো হয় আরো গুচ্ছের লোক। সকাল বেলায় হাঁদার দোকানটা বেশ জম জমাট ভিড় হয়ে যায়। দাদা আমাকে ঠেলে জানলার পাশে এসে দাঁড়ায়। আমি বলি “দেখ কত বিক্রি হবে চা, মুড়ি, বিস্কুট। কাল সারা রাত জেগে যে ঠোঙা গুলো আমরা করলাম সব শেষ হয়ে যাবে আজকের সকালের মধ্যেই।” দাদা চুপ করে থাকে। সে জানে এইভাবে চললে আর বেশিদিন ব্যবসা করতে পারবে না হাঁদা। জুটমিলের মালিক বদল হচ্ছে। জুটমিলের অনেক লোককে বসিয়ে দেবে।হপ্তার টাকাও ঠিক মতো দিচ্ছে না। ওরা সবাই গোরা নকশালকে ঘিরে ধরে। গোরা নকশালকে বলে চলে। গোরা নকশাল সব শোনে, চুপ করে। কোনো কথা বলে না। আড় চোখে আমার জানলার দিকে তাকাতেই গোরা নকশাল আমাকে দেখতে পায়। তার সেই কোঁচকানো দাড়িতে তরঙ্গ ওঠে। গোরা নকশাল হেসে ওঠে। আমি দাদার মতো গম্ভীর হতে চেষ্টা করি। পারি না।

সেই প্রথমবার হাঁদার জন্মদিনে পায়েস হয়। গোরা নকশাল নেমনতন্ন খেতে আসে। বারান্দায় চাটাই পেতে সবাই আমরা বরাবরের মতো খেতে বসি। ঠাকুমা তালপাতার পাখা নিয়ে মাছি তাড়ায়। আমি দেখি গোরা নকশাল খাচ্ছে আস্তে আস্তে। পাঞ্জাবির হাতার ফাঁক দিয়ে যে অংশটা বেরিয়ে পড়ছে সেখানকার মাংসটা খোবলানো। আমার দিকে তাকাতেই হাতা ঠিক করে নেয় সে। “ওরা নাকি ধর্মঘট করছে গোরা? জুটমিল নাকি বন্ধ রাখবে। কোনো শ্রমিক কাজ করবে না?” বাবা জানতে চায়। গোরা নকশাল কিছু বলে না। আঙুল গুলো চাটে। একটা ঢেকুর তুলে বলে কতদিন পর পায়েস খেলাম রাঙা মা। গোরা নকশাল ঠাম্মার এতো সুন্দর একটা নাম দিয়েছে জানতাম না তো। মা আরো একটু পায়েস ঢেলে দেয় বাটিতে। গোরা নকশাল চেটে চেটে খায়। বাইরে তখন শেষবারের মতন হনুমান জুটমিলের সাইরেন বেজে ওঠে। কাল থেকে হরতাল। কাল থেকে কাজ বন্ধ। কাল থেকে “দুনিয়ার মজদুর এক হও”। গোরা নকশাল ওঠার আগে বাবার দিকে তাকিয়ে বলে “জানো রবিদা…আমার ঘরে দুটো চড়াই বাসা বেঁধেছে। কাল আসিস টুকনু…। চড়াইয়ের ডিম দেখাবো।”

সকালে ঘুম ভাঙে দাদার ঝাঁকুনিতে। এই ভাই ওঠ ওঠ…পুলিশ এসেছে। আমি ধড়মড় করে উঠে বসি। বাবার সাথে কিসব কথা বলছে পুলিশ। আর তখন হাঁদার দোকানের সামনে পড়ে আছে বুড়ো বিহারীর রক্ত জমাট দেহ। ভোর বেলায় গঙ্গার স্নান করতে যাওয়ার সময় কেউ তার মাথাটা থেঁতলে দিয়েছে পাথর দিয়ে। সেই ভিঁড়ের মধ্যে কোথাও গোরা নকশালকে দেখতে পেলাম না। শুধু দেখলাম বুড়ো বিহারীর বউ আছাড়ি পিছাড়ি দিয়ে কাঁদছে। আর হনুমান জুটমিলের সামনে বসে গেছে সার বেঁধে লোকজন। ওরা তাদের লিডারের লাশ তুলতেও দেবে না। কাজও হবে না। ওরা চিতকার করতে থাকে “মালিকের কালো হাত ভেঙে দাও গুড়িয়ে দাও…। হরতাল চলছে চলবে…। ইনক্লাব জিন্দাবাদ…।” আমাদের শান্ত জনপদটা আর শান্ত রইলো না। কেমন যেন সব পালটে যেতে থাকলো। বিকেলের দিকে পুলিশ এলো। তারা লাশ তুলে নিয়ে গেলো। কিন্তু শ্রমিকরা কেউ নড়লো না কারখানার দরজা থেকে।কেউ একটা গুনগুন করে গাইতে থাকলো “হাম ভুখ সে মরনে বালো…ইয়া মত সে ডরনে বালো…আজাদিকা ঝান্ডা উঠাও…”

বিশাল জমায়েতটার পাশ কাটিয়ে আমি দাদার সাথে সেই প্রথম গেলাম গোরা নকশালের ঘরে। ওপরের ছাদের ধারে একটা ছোট্ট ঘর। ঘরটার চারিদিকে জানলা। জানলার ওপাশেই গঙ্গা। ঘরটার দেওয়ালে আমাদের বাড়ির মতোই পলেস্তারা খসা। আর আমাদের ঘরের মতো যেটা নয় সেটা হল ঘরের সব দেওয়াল জোড়া বইয়ের তাক। সেখানে সারি সারি বই। বইয়ের ফাঁকে চড়াইপাখির বাসা। গোরা নকশাল আমাকে চড়াই পাখির বাসা দেখায়। তার ডিম ফুটে বের হওয়া ছানা দেখায়। আমি গঙ্গার ধারের জানলা ধরে দোল খাই। এমন যদি আমাদের বাড়িটা হতো দাদা? দাদা ইশারায় চুপ করতে বলে। গোরা নকশাল শুনতে পায়। গোরা নকশাল হাসে। “এটা তোকেই আমি দিয়ে যাবো টুকনু…এই ঘরটা তোর”। একগাল হেসে বলি “সত্যি? কবে দেবে?” গোরা নকশালের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। আমার এলোমেলো চুল গুলোকে আরো এলোমেলো করে দিতে দিতে বলে কয়েকটা লাইন… “বিজয়ের পথে এগিয়ে চলো! স্বদেশ অথবা মৃত্যু!...সবটুকু বিপ্লবী উষ্ণতা দিয়ে আলিঙ্গন করছি তোমাকে!” আমি কিছু বুঝতে পারিনা ছাই মাথা মুন্ডু। দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে জানতে চাই... “ ওই যে দেওয়ালের গায়ে এঁকেছো কোঁকড়ানো চুল...তোমার মতোই হাসছে...দাঁড়ি রেখেছে লোকটা কে?” গোরা নকশাল হা হা হা করে হেসে ওঠে। লোকটা হাসলে সারাটা ঘর যেন কাঁপতে থাকে। হাসির দমক যেন থামতে চায় না। লোকটা কী পাগল? লোকটা কী মণির বলা সেই মামদো ভূতটার মতো? আমি আসতে আসতে সরে আসি দাদার কাছে। দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি সেও খানিকটা বিস্মিত গোরা নকশালের অট্টহাসিতে। ঘর ফাটানো হাসির দমক আস্তে আস্তে থেমে গেলো। লোকটার শরীরের কাঁপুনিটাও। দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে গোরা নকশাল বিড় বিড় করে বললো। “এই লোকটাকে চিনে রাখ টুকনু...এই লোকটা একদিন সব পালটে দেবে বলেছিল...সবাইকে পালটে দেবার স্বপ্ন দেখিয়েছিল...।” গোরা নকশাল হঠাৎ করে চুপ হয়ে যায়। ঘরটায় চড়াই পাখির কিচির মিচির ছাড়া কিছু শোনা যায় না। আমি দাদার দিকে তাকাতেই দাদা ইশারা করে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য। ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে জিজ্ঞেস করি, “ লোকটা কে রে দাদা?...ওই যে ছবির...”। দাদা ফিসফিস করে বলে “ইতিহাস বইতে ছবি আছে লোকটার... এর্নেস্তো চে গুয়েভারা...সবাই ডাকে চে বলে।”

মাঘের শীতের বিকেল সবে শেষ হচ্ছে। ধূসর দেওয়ালে এক ধূসর মানুষের মুখের ছবি দেখে যখন রাস্তায় নেমেছি আমার চোখের সামনেই ঘটনাটা ঘটে গেলো। বিহারীর মৃত্যুর প্রতিবাদে বসে থাকা জুটমিলের শ্রমিকদের লক্ষ্য করে কারা যেন বোমা ছুঁড়তে থাকলো। ধোঁওয়ায় ধোঁওয়া হয়ে গেল চারিদিক। অনেক রাতে সবার সাথে খেতে বসে বাবাকে সেই প্রথম বলতে শুনলাম, “টুকনু...কাল থেকে একা একা মাঠে খেলতে যেও না। দাদা কিম্বা মণি তোমাকে দিয়ে আসবে কেমন?” হাঁদা ফিসফিস করে বললো “গরীবের সরকার...গরীবের ওপর লাঠি চালায় কী করে?” ঠাম্মা দেওয়ালে ঠেসান দিয়ে দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়লো। কারণ ঠাকুমা বুঝতে পেরেছে এই বারের শীতেও হয়তো রিলিফ ক্যাম্প খুলবে না। এই বারের শীতেও তার চোখের ছানি অপারেশান হবে না। ঠাকুমা হয়তো একদিন অন্ধই হয়ে যাবে। লম্ফটা নিভে যায়। তলানির তেলটুকুও শেষ। সেই ঘন কৃষ্ণকায় অন্ধকারে বসে থাকে দেশ ছাড়া ঘর ছাড়া কয়েকটা মানুষ। এক ফালি চাঁদের আলো এসে পড়ে তাদের এঁটো কাটা থালা বাটির ওপর।
 (ক্রমশ...)



লেখক পরিচিতি
কল্লোল লাহিড়ী

কল্লোল লাহিড়ী গল্প লেখেন। টিভিতে সিরিয়ালের কাহিনীর নির্মাতা। গান নিয়ে নিজে গবেষণাধর্মী সিরিয়াল পরিচালনা করেন। চলচ্চিত্র বিষয়ে পড়ান কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি টিভি কোম্পানীর পরামর্শক হিসেবেও কাজ করছেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন