বুধবার, ১১ জুন, ২০১৪

রূপঙ্কর সরকারের গল্প : অবনী বাড়ি নেই

খটোখটোখট্‌ - খটোখট্‌খট্‌ - অবনী –অবনী -

বহড়ুর শক্তি চাটুয্যে কবি ছিলেন। দারুণ দারুণ সব কবিতা লিখেছেন। সে সময়ে বঙ্গভূমে কবি কম ছিলেননা, কিছু আগে পরেও নামকরা নামকরা সব কবি । কারা ছিলেন, সে তালিকা বিশাল কিন্তু আমরা তো কবিতা নিয়ে কোনও প্রবন্ধ লিখছিনা, তাই তাঁদের নাম উল্লেখ করা হচ্ছেনা। এই বাংলায় শত সহস্র কবিতা লেখা হয়ে চলেছে, কিন্তু মাত্র কয়েকজন কবির কপালে জোটে একটা ব্যাপার, যে তাঁর কবিতার লাইন লোকের মুখে মুখে ফিরছে। এই তো সেদিন বালীগঞ্জ রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এক চা ওয়ালাকে শোনা গেল আপন মনে আওড়াতে, - বেণীমাধব বেণীমাধব, তোমার বাড়ি যাব, বেণীমাধব তুমি কি আর আমার কথা ভাব? ভেন্ডার মহাশয়কে জিজ্ঞেস করে জানা গেল, তিনি জয় গোস্বামী বলে কারো নাম জীবনে শোনেন নি।

দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া
কেবল শুনি রাতের কড়া নাড়া
‘অবনী, বাড়ি আছ?’

আমাদের অবনীর পদবী সমাদ্দার। সেটারও একটা কাকতালীয় যোগাযোগ হয়ে যাচ্ছে। শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রথম জীবনে গল্প লিখতেন একটা ছদ্মনামে। সেই নামের সঙ্গে তিবি পদবী লিখতেন সমাদ্দার। কিন্তু আমাদের অবনী যে খুব শক্তি চাটুয্যের ভক্ত বা সে হিসেবে খুব কবিতার ভক্ত, তাও না। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বা বিনয় মজুমদার অথবা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের নামগুলো বড়জোর শুনেছে, তবে তাঁদের কবিতা পড়েনি একটাও। অথচ মাঝেমাঝেই অবনী আপন মনে বলতে থাকে – দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া, কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া –

অবনী বাড়ি আছ? – এই অবধিই তার দৌড়। সে এর বেশি কোনওদিন আবৃত্তি করেনি। এর থেকে লোকের স্বভাবতই ধারণা হতে পারে,যে সে পুরো কবিতাটা জানেনা। তাই একদিন সে ঐ তিন লাইন বলে থামতেই দুলাল শুরু করল, -

বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস
এখানে মেঘ গাভীর মত চরে –

অবনী রেগে আগুন। না, কোনও গাভী ফাভি চরেনা। কবিতা এখানেই শেষ। দুলালও ছাড়বার পাত্র না। সে বলল, শেষ মানে? শক্তিদার অর্ধেকের বেশি কবিতা আমার মুখস্থ। তুই আমার সঙ্গে – আমি থামিয়ে দিলাম, আঃ থাকনা, ও যখন চাইছেনা – তুই কবিতা আবৃত্তি করার অনেক জায়গা পাবি। তোর গার্লফ্রেন্ডদের কাছে যা না, ওরা কবিতা টবিতা খুব পছন্দ করে। আয় অবনী –

অবনী আজকাল কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে। আড্ডায় আসেনা। হঠাৎ কোনওদিন এসে পড়লেও চুপচাপ বসে থাকে। রাজনীতি, ক্রিকেট, সিনেমা, বাঙালির এই তিনটে অতি প্রিয় আড্ডার টপিকে তার কোনই উৎসাহ দেখা যায়না। এক কোনে গোঁজ হয়ে বসে থাকে। মাঝে মাঝে বিড় বিড় করে কি যেন আওড়ায়। আমি হান্ড্রেড পারসেন্ট শিওর, ও শক্তি চাটুয্যের সেই তিন লাইন আওড়াচ্ছে।

পাড়ায় পাঁচজনে বলাবলি করতে লাগল, অবনী ব্যাটার মাথা বিগড়েছে। খাপছাড়া ব্যবহার। লোকে এড়িয়েও চলতে লাগল তাকে। মাঝে মাঝেই তাকে সারাদিনই বারান্দায় বসে থাকতে দেখি। তার মানে অফিস যায়নি। এত ছুটি তো থাকতে পারেনা, এমন করলে চাকরি থাকবে কী করে। একদিন ধরলাম তাকে, অ্যাই অবনী, শোন, তোর সঙ্গে কথা আছে। সে বলল, কথা বলতে চাও তো ভেতরে এস। আমি আজকাল রাস্তায়ঘাটে কারো সঙ্গে কথা বলছিনা। গেলাম ভেতরে। কী ব্যাপারটা কী বলত। কেমন হয়ে যাচ্ছিস তুই ? কারো সঙ্গে কথা বলছিস না, আড্ডায় আসছিস না, অফিসও যাসনা মনে হয়, আপনমনে বিড়বিড় করে কী বকিস তুই? সেই শক্তি চাটুয্যের কবিতাটা ?

অবনী বলল, দাদা, তুমি ব্যাপারটা বুঝতে পারছ? মনে হয় পারছনা। চিন্তা করতো, একটা রাত্তির, বেশ গভীর রাত। সময়টা একটু পিছিয়ে নিয়ে যাও। এখনকার মত ভেপার ল্যাম্প জ্বলছেনা, লাইটপোস্টের মাথায় দুটো সাধারন বাল্‌ব। একটা সরু রাস্তা কিংবা গলি। একটা বাড়ির একতলার দরজা, তাতে দুটো কড়া বসানো। এখনকার লোকজন তো কড়া-ই দেখেনি, সব বাড়িতেই কলিং বেল। সে দরজায় কিন্তু কড়া। কেউ এসে সেই কড়া নাড়ছে, খটোখটোখটো, খটোখটোখটো – আর বলছে, অবনী, বাড়ি আছ? অবনী, অবনী, অবনী – অবনী আছ? অবনী – এই যে বার বার অবনী বলছে, এক এক বার দ্বিতীয় অক্ষর, অর্থাৎ ব-এর ওপর ঝোঁক দিচ্ছে, তারপরের বার, নী-এর ওপর জোর দিচ্ছে, অবনী, অবনী, অবনী – আর কড়া নাড়ছে, খটোখটোখটো, খটোখটো – অবনী বাড়ি আছ? সারা পাড়ায় তখন কেউ জেগে নেই। শুধু কেউ একজন ডেকে যাচ্ছে, অবনী, বাড়ি আছ?

আমি বললাম, এমন ভাবে তো ভেবে দেখিনি। হ্যাঁ তুই যেভাবে বললি, তাতে একটু গা ছমছম করছে বৈকি। কিন্তু শক্তি চাটুয্যের কবিতায় তো ঠিক এই সিচুয়েশন – অবনী বলল, শক্তি চাটুয্যের কথা আমি বলছিনা, আমি অবনীর কথা বলছি, অবনী –বুঝেছ? আমি বললাম, না বুঝলেও বোঝার চেষ্টা করছি। অবনী মানে, হয়ত তুই, অথবা অন্য কোনও অবনী। কিন্তু তাকে কেউ মাঝরাতে ডাকছে। কেন ডাকছে ? তার কাছে, টাকা পায়? তাকে খুন করতে চায়? না কেবল বহু দূর থেকে তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। যে এসেছে সেকি মানুষ? এত সব প্রশ্নের উত্তর কি পাওয়া যাবে ? না মনে হয়। তাহলে তো কড়া নাড়াই থেমে যাবে। অবনি বলল, এই জন্যই আজকাল তুমি ছাড়া কারো সঙ্গে কথা বলছিনা। তুমি অন্ততঃ খানিকটা বোঝ। আমি বললাম, তুই শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের তিন লাইন নিয়ে লড়ে যাচ্ছিস, ওয়ালটার ডি লা মেয়ারের ‘দা লিসনার্স’ পড়েছিস ? সে কবিতায় কিন্তু পুরোটাই এইরকম আলো আঁধারি। সেখানেও রাত্তির বেলা দরজায় খট্‌খট্‌, চাঁদের আলো, রাতচরা পাখির উড়ে যাওয়া, বেশ একটা ইয়ে মতন পরিবেশ।

অবনী উৎসাহিত হয়ে বলল, বল দাদা বল বল, কেমন সেই কবিতা ? আমি শুরু করলাম, - ইজ দেয়ার এনিবডি দেয়ার ? সেড দা ট্রাভেলার, নকিং অন দা মুনলিট ডোর – অবনী খুব মনোযোগ দিয়ে কবিতাটা শুনল। শুনে বলল, হ্যাঁ পরিবেশটা বেশ তৈরী হয়েছে, তবে গোড়ায় গলদ। আমি বললাম, কী রকম? সে বলল, এখানে যে এসে দরজায় খটখট করছে, তাকে তো আমরা দেখতে পাচ্ছি। কেবল ভেতরে যারা রয়েছে, আর উত্তর দিচ্ছেনা, তারাই অশরীরি। অবনীর বেলা অবনী তো ভেতরে বসে আছে। কিন্তু দরজায় কে এল সেটাই প্রশ্ন। একেবারেই উল্টো দিক থেকে দেখা। আমি বললাম, তা বটে।

অবনীর বাবা নিধি সমাদ্দার আমায় একদিন ধরলেন রাস্তায়। এই যে শুনুন, কথা হচ্ছে, আমার কানে এল, অবনী কেবল আপনার কথাই নাকি শোনে। আপনি ছাড়া বলিই বা কাকে। আমি বললাম, না না, নিঃসঙ্কোচে বলুন। অবনীর আবার নতুন কিছু – নিধিবাবু বললেন, নতুন আর কি, সেই তো কোন এক হতচ্ছাড়া কবির দরজা খটখটানো কবিতা নিয়ে নিজে পাগল হয়ে আমাদেরও পাগল করছে। কত বয়স হ’ল বলুন তো ? আমি বললাম, কার, আপনার? উনি বললেন, না অবনীর। মেঘে মেঘে চল্লিশ পার হয়ে গেছে। বিয়ে থা-ই বা কবে করবে, সংসারই বা কবে পাতবে। আমি তো দেখছেন ঢাল নেই, তরোয়াল নেই, নিধিরাম সমাদ্দার। আমার সঙ্গে তো কথাই বলেনা। আপনারা একটু যদি না দেখেন – আমি বললাম, হ্যাঁ, ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে হবে। অফিসও তো ঠিকমতো যাচ্ছেনা বোধহয়।

সেদিনটা ছিল মেঘলা। বাজার যাচ্ছি। আগের দিন রাতে বৃষ্টি হয়েছিল, সেদিনও হব হব করছে। বাজার যাওয়ার একদম ইচ্ছে না থাকতেও যেতেই হচ্ছে। দেখলাম দূরে শেতলাতলার মোড়ের কাছে কে একজন রাস্তায় পড়ে গেল। প্রায় দৌড়েই গেলাম। একজন রিক্সাওয়ালা টেনে তুলছে তাকে। কাদায় মাখামাখি, গর্তে পা পড়েছিল। সামনে গিয়ে দেখি নিধিরাম বাবু। ইশ্‌ কাটেনি তো কোথাও ? রিক্সাওয়ালা বলল, বাবু চেনেন নাকি ? বাড়ি পৌঁছে দিন না। সেই রিক্সাতেই তুললাম তাঁকে। কী ব্যাপার, এই বয়সে আপনাকে বাজার যেতে হচ্ছে? নিধিবাবু ব্যাজার মুখে বললেন, কী করব বলেন, দুটো বুড়োবুড়ির মুখে কি আপনার সরকার এসে খাবার তুলে দেবে? আমি বললাম, কেন, অবনী কী করে? উনি একটা অদ্ভুত বিতৃষ্ণাভরা হাসি দিলেন, অবনী ? সে এখন এ বাড়িতে থাকেনা। আর থাকলেই বা কী? গত এক বছর যাবৎ সে তো স্বাভাবিক জীবন যাপন করেনা। সে যাবে বাজার?

আমি বেশ অবাক হয়েই বললাম, অবনী এখানে থাকেনা? কোথায় থাকে তবে? তিনি বললেন বাড়ি চলুন, ঠিকানা দিচ্ছি। থাকেনা শুধু না, কোনও যোগাযোগও রাখেনা। ফোন করলে, ভাল আছি, এই দুটো শব্দ বলে ফোন কেটে দেয়। আমি বললাম, অফিস যাচ্ছে? নিধিবাবু বললেন, এবাড়ি থাকতে তো যাচ্ছিলনা, ওখানে গিয়ে কী করছে জানিনা। ওঁদের বাড়ি এসে গেল। নেমে ওঁকে ধরে ভেতরে নিয়ে যেতে, হাত পা ধুয়ে এসে ডায়ারি খুলে ঠিকানা দিলেন। উত্তর কোলকাতায় ফড়েপুকুরের কাছে মনে হ’ল জায়গাটা। বললাম, বাড়ি ছাড়ার কারণ ? কোনও ঝগড়া ঝাঁটি হয়েছিল ? উনি বললেন, যে কথাই বলেনা, তার সঙ্গে ঝগড়া করা যায়? তার নাকি দোতলায় থাকতে কিসব অসুবিধে, তাই একতলা বাড়ির খোঁজে কোলকাতা চষে ফেলে এইটে নাকি পেয়েছে। ভাড়াও খুব কম। হ্যাঁ, আরও ব্যাপার আছে, বাড়ি হতে হবে গলির মধ্যে, আর আসেপাশে রাস্তায় জোরালো আলো থাকলে চলবেনা, সে সবও নাকি মিলে গেছে। আমি বললাম, তার চলে কী করে ? অফিস তো যায় না। অবনীর বাবা বললেন, পোস্টাপিসে টাকা ছিল, তার সুদ পায়। ওর নিজের খরচাও তো খুব বেশি না।

বেশ কিছুদিন অবনীর সংবাদ পাইনি। আসলে চেষ্টাও করিনি। সংসারে প্রত্যেকের আজকাল মেলাই সমস্যা। তার ওপর অপরের পাগলামি সামলানোর ডিউটি যদি ঘাড়ে এসে পড়ে, তবে তো আরোই সঙ্গীন অবস্থা। সে চলে যেতে কিছুটা যেন হাঁফ ছেড়েই বেঁচেছি বলা যায়। তবু সব মানুষই বোধহয়, চাকরি, বাজার, ছেলে পড়ানো, দাম্পত্য কলহ, পাড়ার আড্ডা, এই সবের পরও কিছুটা নিজের একান্ত সময় বোনাস হিসেবে পেয়ে যায়। সেটা সে কীভাবে কাজে লাগাবে, সেটা তার ব্যাপার। আমার একান্ত সময়টায় অবনীর কথা মনে হতনা এটা বললে মিথ্যে বলা হবে। বিশেষতঃ যে মানুষটা শুধু একজনকেই মনের কথা খুলে বলত, তার ওপর একটা টান জন্মাবেই প্রাকৃতিক নিয়মে। সেদিন রাতে বিকট শব্দে আমার মোবাইলটা বেজে উঠল। আমি ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম। এত রাতে কে ফোন করে, কারো বিপদ আপদ না হলে তো –

হাতড়ে হাতড়ে মোবাইলটা ধরে ঘুমচোখে বলি হ্যালো ? কে ফোন করছে, দেখার সুযোগ ছিলনা। দেখতে হলে চশমা লাগবে। সেটা খুঁজতে হলে উঠে আলো জ্বালাতে হবে। বললাম, হ্যালো – ওপাশের আওয়াজ বলল, দাদা, আমি অবনী। আমি বললাম, কী হয়েছে তোর ? কিছু বিপদ – অবনী বলল, শুনতে পাচ্ছনা ? ভাল করে শোন। বলে সে চুপ করে গেল। হ্যাঁ এবার স্পষ্ট শুনলাম, খটোখটোখটো – খটোখট্‌খট্‌ - অবনী বাড়ি আছ? অবনী – গলার আওয়াজটা বেশ গম্ভীর। আমার চেনা কারো আওয়াজ নয়। আমি উদ্বিগ্ন হয়ে বললাম, কী হচ্ছে এসব, অবনী ? কে ডাকছে তোকে ? দরজা একদম খুলবিনা। চেঁচিয়ে বাড়িওয়ালাকে কিংবা পাশের বাড়ির লোকজনকে ডাক। ফোনটাতে পুপ পুপ করে আওয়াজ হতে লাগল। তার মানে, কেটে গেছে।

ভোর হতেই দুলালের বাড়ি গেলাম। চল, আমার সঙ্গে যেতে হবে। দুলাল বলল, দাদা সিরিয়াস কিছু ? সঙ্গে আরও লোকজন নেব ? আমি বললাম, না। কথাটা পাঁচকান করে লাভ নেই। তবে সিরিয়াস তো বটেই। চল, এখনো বাস ফাস চালু হয়নি, একটা ট্যাক্সির চেষ্টা করি চল। ট্যাক্সিতে যেতে যেতে ঘটনাটা শুনে দুলাল বলল, ওঃ এই ব্যাপার, এই শুনেই আপনি সাত সকালে –ধুস। আমি বললাম, ধুস কিরে, ব্যাপারটা সিরিয়াস নয়? দুলাল বলল, ওর পাগলামি তো চাউর হতে বেশি সময় লাগেনা, তার ওপর নতুন পাড়া। আমরা না হয় ছোট থেকে ওকে দেখছি। কিচ্ছু হয়নি দাদা, কেউ জেনে ফেলেছে ব্যাপারটা, তারপর পাড়ায় নতুন খোরাক পেয়ে পাড়ার ছেলেরা পেছনে লেগেছে। এটা তো জলের মত পরিষ্কার কেস। আপনি পারেন দাদা, এক্কেবারে ভোর বেলা উঠে – কিছুটা বিরক্তই মনে হল। আমি বললাম হুম, সেটা অবশ্য আমার মাথায় আসেনি। তবে রাজাবাজার পেরিয়ে এসেছি, আর কতক্ষণই বা। গিয়েই দেখা যাক।

যতই ভোরে বেরোই, পৌঁছতে পৌঁছতে ছটা প্রায় বেজেই গেছে। লোকজনও বেরিয়ে পড়েছে। চায়ের দোকানের উনুন থেকে কুন্ডলি পাকিয়ে ধোঁয়া উড়ছে, একজন ঝাড়ুদার রাস্তা পরিষ্কার করছে, আমরা দু এক জন লোককে পেয়ে ঠিকানা জিজ্ঞেস করলাম। ঠিক জায়াগাতেই এসেছি, গলিটার মুখে এসে দেখলাম, বেশ সরুই গলি। ওই তো সবুজ রঙের দরজা, তাতে কড়াও আছে। দুলাল কড়া নাড়ার জন্য দরজায় হাত দিতেই দরজাটা খুলে গেল। সটান ঢুকব, না অবনী কে ডাকব ভাবছি, বাড়ির পেছন থেকে একজন মানুষ বেরিয়ে এলেন। বেশ রোগা, বেঁটেমত এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক, বিবর্ণ লুঙ্গির ওপরে ধপধপে সাদা গেঞ্জি পরা। কাকে চাই? আমি বললাম, আচ্ছা, অবনী সমাদ্দার – তিনি বললেন হ্যাঁ আমারই ভাড়াটে। কিন্তু তিনি তো নেই, ঘর ফর খুলে কোথায় যে গেলেন –

দুলাল বলল, গেলেন মানে ? বাড়িওয়ালা ভদ্রলোক বললেন, আজ সকালে রোজকার মত দুধ আনতে যাব বলে বেরিয়ে দেখি, অবনী বাবুর দরজাটা হাট করে খোলা অথচ তিনি নেই। আমিই দরজাটা টেনে দিলাম। কোনও দিন তো এত সকালে বেরোতে দেখিনা। তাও আবার দরজা টরজা খুলে – দুলাল বলল, আসুন না দেখি, চা ফা খেতে গেছে বোধহয়। বাড়িওয়ালা বললেন, না মশাই, উনি চা খেতে যান অনেক পরে। আজব লোক ভাই, এসেই বললেন দরজায় দুটো কড়া লাগিয়ে দিতে হবে। আমি বললাম, হুড়কো তো রয়েছে। তিনি বললেন, না, তাও লাগবে। আজকাল হার্ডওয়্যারের দোকানে কড়া ফড়া পাওয়াও যায়না, মহা মুশকিল। শেষে এক পুরোনো লোহার ছাঁট কেনাবেচার দোকান থেকে অনেক কষ্টে পেলাম। তার পর তেনার আবদার হ’ল। কলিং বেলটা খুলে দিতে হবে। ঐ দেখুন না, এখনও দাগ রয়ে গেছে। দুলাল বলল, ভেতরটা একটু দেখতে পারি ? আপনিও আসুন না।

তিনজনেই ঢুকলাম ভেতরে। সাদামাটা ঘর, একটা তক্তপোষের ওপর একটা শতরঞ্চি আর চাদর পাতা, সঙ্গে একটা পাতলা বালিশ। বাড়িওয়ালা বললেন তক্তপোষ আর হাতল ভাঙা চেয়ারটা ওঁর। দেয়ালে দুটো পেরেকের সঙ্গে একটা বাতিল ইলেক্ট্রিকের তার বেঁধে তাতে জামাকাপড় রাখা রয়েছে। হ্যাঙ্গারে একজোড়া শার্ট-প্যান্ট আর তারে টাঙানো একজোড়া পাঞ্জাবি পাজামা। দুলাল হঠাৎ আমার হাত চেপে ধরল, দাদা, ও কি খালি পায়ে বেরিয়ে গেল? ওই দেখুন, একজোড়া জুতো রয়েছে, চটিজড়াও রয়েছে আর এই দেখুন হাওয়াই চটি। আমি বললাম, শুধু খালি পায়ে ? ওর জামাকাপড় সবই তো তারে ঝুলছে। যেটা গায়ে পরেছিল, সেটাও তো বিছানার ওপর, মোবাইলটার পাশে পড়ে আছে। জামাকাপড় না পরে কেউ বাড়ি থেকে বেরোতে পারে? বাড়িওয়ালা বললেন, আরে হ্যাঁ, উনি তো এই দু জোড়া পাঞ্জাবি পাজামাই পাল্টে পাল্টে পরতেন। আর তো কিছু দেখিনি। আমরা ঘন্টা তিনেক অপেক্ষা করলাম, পাঁচবার গিয়ে চা খেয়ে এলাম, শেষে বাড়িওয়ালাকে ডেকে বললাম, যাক আপনি দরজাটায় তালা মেরে দিন। আমরা চললাম, এক মাসের মধ্যে ওকে না দেখতে পেলে আমায় ফোন করবেন। ঘরটা আটকে রাখার কোনও অর্থ নেই।

নিধিরাম সমাদ্দার গত পরশু মারা গেলেন। যতদিন বেঁচে ছিলেন, প্রতি বছর কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দিতেন, অবনী, তুমি যেখানেই থাক সত্বর ফিরে এস, তোমার মা মৃত্যুশয্যায়। কথাটা মিথ্যে, কেননা অবনীর মা তার নিরুদ্দেশের সংবাদ পাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই মারা যান।

২১/০৮/২০১৩





লেখক পরিচিতি
বয়স : ৬৫ বছর
প্রকাশিত বই : ‘ধানাই পানাই’ ( প্রকাশ, জানুয়ারি, ২০১৩)
নামান্তর। 
 প্রধাণতঃ নাট্যকার ও নির্দেশক। এখন শারীরিক কারণে 
নাটকের ধকল সহ্য হয়না বলে গল্প লিখছেন।






কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন