বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

আইজ্যাক বাশেভিস সিঙ্গারের সঙ্গে আলাপ

ফিলিস ম্যালমুদ
ভাষান্তরঃ এমদাদ রহমান
........................................................................

[আইজ্যাক বাশেভিস সিঙ্গারের জন্ম পোল্যান্ডে, ওয়ারসো’র এক গ্রামে, ১৯০৪ সালে। বড় হয়েছেন শহরের ঈদিশভাষী ইহুদি পাড়ায়। সবাই মনে করত তিনিও তার বাবার মতো ইহুদি আইনের শিক্ষক হবেন, কিন্তু বিশ বছর বয়সেই সিঙ্গার ধর্মবিষয়ক জ্ঞানচর্চা বাদ দিয়ে লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। ঈদিশ লিটারারি ম্যাগাজিনে প্রুফ রিডারের কাজ নেন, পুস্তক-পর্যালোচনা করতে শুরু করেন আর প্রকাশ করেন তার গল্পগুলো। ১৯৩৫ সালে জার্মানির নাৎসি আক্রমন যখন ভয়াবহ আকার ধারণ করে, সিঙ্গার পোল্যান্ড থেকে আমেরিকায় চলে যান। নিউইয়র্কের এক ঈদিশভাষী পত্রিকায় সাংবাদিকতার কাজ নেন। বিয়ে করেন এক জার্মান-ইহুদি উদ্বাস্তু নারীকে । যদিও বাশেভিস সিঙ্গারের বেশ কিছু উপন্যাস, শিশুসাহিত্য, স্মৃতিকথা আর প্রবন্ধের বই বেরিয়েছে, তবু গল্প-লেখক হিসেবেই তিনি বেশি পরিচিত। সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন ১৯৭৮ সালে । জীবন শেষ হয় ১৯৯১-এ, ফ্লোরিডায়।

১৯৭৮ সালের অক্টোবরে, নিউজউইক ম্যাগাজিনের বোস্টন ব্যুরো প্রধান ফিলিস ম্যালামুদ, সিঙ্গারের সঙ্গে তাঁর লেখালেখির নানান দিক নিয়ে পরপর দুই দিন কথা বলেন, সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার অল্প কিছুদিন পর। তাদের দুজনের দুই দিনের সেই কথোপকথনটির বাংলা- ভাষান্তর এখানে ছাপা হল। মূল লেখার লিঙ্কঃ http://singer100.loa.org/life/commentary/interview/]




অক্টোবর ৫, ১৯৭৮

মৃত মানুষের আত্মাকে ডেকে আনার মত করেই তিনি লিখেছেন। ‘আইজ্যাক বাশেভিস সিঙ্গার’ নামটি বললে একজন সাধারণ মানুষের নামের মতই শোনায়। সিঙ্গারের উচ্চারণ ইহুদিদের মত। তার আচরণ বিনয়ী।

কোমল স্বরে বললেন, “আপনি প্রশ্ন করেন, আমি উত্তর দিচ্ছি।”

তার গল্পের প্রেত, দানব আর ক্ষুদে শয়তানদের মতই সিঙ্গার একজন অসাধারণ মানুষ। একজন নোবেল পুরস্কার-প্রাপ্ত লেখক। সুইডিশ একাডেমি তাদের ভাষায় যাকে বর্ণনা করেছে ‘প্রতিটি শব্দে তিনি জীবনে বিশ্বজনীন মানবতার বাহক’।

সিঙ্গার প্রায় সব সময়ই নিজেকে এই নির্দিষ্ট পরিচয়ে মেলে ধরেন, “নিজেকে আমি একজন ইহুদি লেখক হিসাবে বিবেচনা করি, একজন ঈদিস-ভাষী লেখক, এবং একজন আমেরিকান লেখক। কিন্তু একই সঙ্গে আমি পোল্যান্ড’কে নিয়েও বিস্তর লেখালেখি করেছি।

বেশ কয়েক বছর হল তার বসবাস স্থানান্তরিত হয়েছে আমেরিকার নিউইয়র্কে, “তখন থেকেই আমি আমার শিকড়টাকে এখানে বিস্তৃত করেছি”, আমি এখনও বিশেষ করে ঈদিশভাষী অভিবাসীদের জন্যই লিখছি। আমি তাদেরকে খুব ভাল করেই জানি, চিনি, এমনকি যারা এখানে জন্ম নিয়েছে, তাদের চেয়েও বেশি জানি। আমি সেইসব বিষয় আশয় নিয়েই লিখি যা আমি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জানি বা দেখেছি।

অতিপ্রাকৃত একটা ব্যাপার থাকে তার সব লেখায়, সিঙ্গার অনেক বেশি করেই যাকে উন্মোচন করেন বা করতে চান, পাঠকের সঙ্গে সংযোগ করিয়ে দেন, “আমি অলৌকিকে বিশ্বাস করি, অবশ্য তা নয় যে আমি ক্ষুদে শয়তান আর প্রেত-দানবদের মধ্যকার ভিন্নতা সম্পর্কে পুরোপুরি জানি।” তবে আমরা তাদের দ্বারাই পরিবৃত, আমাদের সকলের জীবনও তাদের দ্বারা পরিবৃত। এবং আমি বিশ্বাস করি, এইসব ক্ষমতার বা শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব হল তা ঈশ্বরের শক্তি। আমি একবার বলেছিলাম, যখনই আমি কোনও সমস্যায় পড়ি, আমি প্রার্থনা করি, আর এখনও, আসলে সব সময়ই আমি নানান ঝামেলার মধ্যে আছি, আর সব সময়ই প্রার্থনা করছি।”

“আমি বিশ্বাস করি যে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পেছনে একটি বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে। এই জগত কোনও দুর্ঘটনার কারণে সৃষ্টি হয় নি। তবে, কে ছিলেন সেই মহান পরিকল্পনাকারী আর কেনই বা এমন পরিকল্পনা, আমরা তা জানি না।”

তার কণ্ঠস্বর কোমল, একেবারেই ক্ষীণ আর দুর্বল, তিনি বলেন যে তিনি “একজন ইহুদি লেখক হিসাবে পরিচিত এবং বিবেচিত হওয়ার জন্য তিনি আনন্দিত। আমি আগাগোড়াই একজন ইহুদি।” যদিও কোনও ঈদিশ লেখকের কাছ থেকে তিনি কোন প্রেরণা পান নি। এই অলৌকিক ব্যাপারগুলি ঈদিশ সাহিত্য থেকে আসে নি।” একটি লেখার গঠন কাঠামোকে তিনি বর্ণনা করেন যে তার থাকবে “একটি সংবেদনশীল দিক”, একটি সামাজিক দিক, ধনী আর গরিবের সম্পরকের সচেতনতা। অলৌকিকতার জন্য আমি সর্বদা মধ্যযুগে ফিরে যাই, এই শিকড় ঈদিশ সাহিত্যের থেকেও প্রাচীন।

“সেই একজন, যাকে আমি প্রকৃতই শ্রদ্ধা করি, তিনি এডগার অ্যালান পো। আমি এখনও তাকে জিনিয়াস হিসাবে বিবেচনা করি, অন্য অনেক মহৎ লেখকদের একজন তিনি। আমি তাকে ঈদিশে পড়েছি, পোলিশে পড়েছি, হিব্রুতে পড়েছি, জার্মানে পড়েছি, ইংরেজিতে পড়েছি, এবং আমি তার সম্পর্কে এটাই বলব যে তাকে যে-ভাষাতেই পড়ি না কেন, তিনি বড় লেখক।”

তাকে যখন আইজ্যাক যশোয়া সিঙ্গার সম্পর্কে জানতে চাইলাম, যশোয়া সিঙ্গার তার বড় ভাই, লেখালেখির শুরু এগার বছর বয়সে। আইজ্যাক বাশেভিস বললেন— আমি বার বার এই কথাটাই বলতে চাই যে আমার এই প্রিয় ভাইটিই আমার পথ প্রদর্শক, আমার সাহিত্যের শিক্ষক। আমরা, অনেক অনেক আলোচনা করেছি সাহিত্য নিয়ে এবং আমি লক্ষ করেছি যে আমার ওপর তার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। নানাভাবে এই প্রভাবটা পড়েছে। সে আমার চেয়েও অনেক বেশি বাস্তবানুগ, ভাববর্জিত। আর আমার মত সে ভুত-প্রেত নিয়েও লেখে নি, বাস্তব জীবন নিয়েই বেশি ঘাটাঘাটি করেছে, লেখেছে। তার লেখার প্রতিটি লাইনের পেছনে মিসটিসিজমের একটা ব্যাপক ছাপ থেকে গেছে। তার লেখায় মিসটিক রহস্যময়তা থাকে।

বাশেভিস সিঙ্গারও তার লেখায় প্রায় অবধারিতভাবেই বিষয়টা আনেন, আর তিনি বলেন যে মিসটিসিজম আসলে শেখা যায় না। এর রহস্যময় ভাষা লুকিয়ে থাকে মানুষের বংশগতির ভিতরে, ইয়েশিভা থেকে কেউ শিখে আসে না। আসলেই, দুনিয়াতে কেউ জন্ম নেয় বাস্তববাদী হয়ে আর কারোর জন্মসময় থেকেই তার সঙ্গে আজীবন জড়িয়ে থাকে মিসটিসিজমের অনুভবগুলি। সব কিছুই আসলে গভীর এক ধ্যান। অনুধ্যান। এক আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি, যেখান থেকে ঈশ্বরকে কিংবা প্রকৃত সত্যকে বা সত্য সম্পর্কে জ্ঞান বা প্রজ্ঞা অর্জন হয়।

সিঙ্গার বড় হয়েছেন ওয়ারসো’র এক গ্রামে, ধর্ম সম্পর্কিত তালমুদিক শিক্ষা পেয়েছেন তার বাবার কাছে, “এক শান্ত, ব্যক্তিগত আর গোপনীয়তায় আমি ধর্মের তালিম নিয়েছি”, সিঙ্গার বলেন, “আমি আসলে একজন নিঃসঙ্গ মানুষ, নিঃসঙ্গতার মানুষ, অন্য মানুষ থেকে গোপন হয়ে থাকা একজন লেখক। আর অবশ্যই আমি পছন্দ করি এবং ভালবাসি মানুষের সঙ্গে দেখা করতে, কথা বলতে, মানুষের ভিড়ে মিশে যেতে। এখনও, আমি, প্রকৃত অর্থেই সামাজিক মানুষ নই। এখানকার চলমান ঈদিশ মুভমেন্টের সঙ্গে আমি সহমর্মিতা পোষণ করি, তবে আমি প্রক্রিতভাবেই একজন অসামাজিক মানুষ।”

এটা আসলেই বাশেভিস সিঙ্গারের বলার নিজস্ব ধরণ যে তিনি কখনোই ঈদিশভাষী লেখকদের প্রধান বা দিকনির্দেশক নন, “এ ব্যাপারে কোনই সংশয় নাই যে যখনই চরিত্র আর তার ব্যক্তিত্ব নিয়ে কিছু লিখতে হয়, তখন, ঠিক তখনই দেখা যায় ঈদিশ খুবই শক্তিশালী এক ভাষা-মাধ্যম। যখন প্রযুক্তি নিয়ে কোনও কিছু লেখার বা বলার দরকার হয়, তখনই দেখা যায় ঈদিশ খুব দুর্বল এক ভাষা। কিন্তু ক্রমশই কমে-যেতে-থাকা ঈদিশভাষী পাঠকরা সিঙ্গারের মত কেউ নন। তিনি নিয়তিবাদে বিশ্বাসী ব্যক্তি, ভীষণ চিন্তিত একজন লেখক। সব পাতা ঝরে গেছে, তবু, গাছের দেহকাণ্ড আর শিকড়বাকড় এখনও বেঁচে আছে। এটা খুবই বাজে একটা ব্যাপার, তবে আমাদের এই বাজে অবস্থাটা দেখা দিতে শুরু করেছিল ৩,০০০ বছর আগেই। আমি একক-চরিত্রের এক নাটক লিখেছিলাম দরিদ্র একজন নকলনবিশকে নিয়ে, যিনি, সেই প্রাচীনকালে আমাদের, মানে ইহুদিদের দলিলদস্তাবেজের লেখক ও রক্ষক ছিলেন। যিনি অস্পষ্ট হস্তাক্ষরে কীসব লিখছেন। তিনি ক্ষুধার্ত ছিলেন, তার স্ত্রীও ক্ষুধার্ত। তিনি যখন কিছু কাগজপত্র নিয়ে কাজ করছিলেন, কাগজপত্রগুলিকে তিনি মনে করছিলেন ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির প্রারম্ভিক বিন্দু হিসাবে এবং তার মনে পড়ছিল, খ্রিস্টপূর্ব ১৩০০ অব্দে মিশর থেকে ইস্রাইলিয়দের দলবদ্ধ প্রস্থানের দৃশ্য। তখন তার স্ত্রী জানতে চাইলেন, কারা আর এই বিষয়ে পড়তে আগ্রহী হবে? আসলে, পরিস্থিতিকে সব সময়ই খারাপ দেখায়, কিন্তু খারাপ দেখালেও কখনই তা পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।”

মিয়ামি’তে, সিঙ্গার ফ্যাবার, স্ত্রাউস-এর জন্য একটি ছোটগল্পের সংকলন— পুরোনো প্রেম এবং অন্যান্য গল্প— তৈরির কাজ করছেন, আর ইহুদিদের আট দিনের ধর্মীয় শানুখা উৎসব নিয়ে ছোটদের জন্য লেখা গল্পগুলির একটি সংকলনেরও কাজ করছেন। গল্পগুলির অনুবাদ করছেন তিনি নিজে এবং তার স্ত্রী অ্যালমা। আর, অবশ্যই, লেখালেখি করছেন সেই হারিয়ে যেতে বসা ঈদিশ ভাষায়, “আমি আমার শিকড়ের সঙ্গেই যুক্ত থাকতে চেয়েছি”, তিনি নিজে গল্পগুলির অনুবাদ আবার পড়ে দেখছেন আর সম্পাদনা করছেন। কখনও পুনর্বার গল্পগুলি লিখছেন, “যতক্ষণ না আমি তৃপ্তি পাচ্ছি।” পরে, ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করছি। আমি আগেও বলেছি যে এটা আমার জীবনের দ্বিতীয় প্রকৃত ভাষা, এবং সম্ভবত আমার এই বক্তব্যের ভিতরে সত্য লুকিয়ে আছে।

“এটা আসলেই অনেক বড় সম্মান”, নোবেল প্রসঙ্গে তিনি বললেন। “আমি আশা করি জীবনের বাকি দিনগুলিতেও ঈদিশেই যাবতীয় লেখালেখির কাজগুলি করব। এ ব্যাপারে কোনও ব্যত্যয় ঘটবে না।”

আমি অনুভব করি যে জীবন স্বয়ং এবং এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড বিপুল রহস্যে ঘেরা। তার রয়েছে এক মহান গোপনীয়তা আর আমরা এই গোপনীয়তায় বাস করছি। যদিও এভাবে বলাটা হয়ত যথার্থ হচ্ছে না, সিঙ্গার দ্রুতই উল্লেখ করেন, “আমি একজন দুঃখবাদী মানুষ। আমি আশাবাদী নই। আমি মানবতা থেকেও বেশি বিশ্বাস করি ঈশ্বরকে, তবে মানবতা আসলে ঈশ্বরেরই একটা অংশ, সুতরাং, আমি মানবতাতেও দৃঢ়ভাবে আস্থাশীল।


[নোটঃ বাশেভিস সিঙ্গার ক্লান্ত ছিলেন। আগামীকাল আবারো কথা বলতে রাজি হলেন। আমরা তার সংবেদন, লেখালেখির আগ্রহের জায়গাগুলি নিয়ে কথা বলব বলে ঠিক করলাম।]



অক্টোবর ৬, ১৯৭৮

আমি এ নিয়ে বলতে বা লিখতে কখনই লজ্জা বোধ করি না। বাইবেল আর তালমুদ যৌনতার গল্পে ভরপুর। যদি এইসব সন্ত’রা এই কারণে লজ্জিত না হন, তবে আমি কেন হব, যে-আমি সন্ত নই? যৌনতার লেখক হিসাবে আনন্দিত চিত্তে আজকের এই সকালে আইজ্যাক বাশেভিস সিঙ্গার ঘোষণা করেন, যৌনতা নিয়ে না লেখার কোনই কারণ নেই, কেনই বা আমি লিখব না! যদি যৌনতা না থাকত, আপনি আজ এখানে থাকতেন না আর আমিও আজ এখানে আপনার মুখোমুখি হতাম না। আমরা সবাইই এই যৌনতার ফসল। মানুষ নিয়ে আমরা কখনই কিছু লেখতে পারব না যৌনতা বা যৌনআচরণগুলি নিয়ে না লেখি। আমরা সৃষ্টির আদি বা উৎসমূলকেও আলোচনা করতে পারব না। কারণ বিষয়টা তখন হাস্যকর হয়ে পড়বে।

তার এমন মনে করবার কারণ হিসাবে সিঙ্গার আমাদেরকে বলেন যে হেনরি মিলার একটি উপন্যাসের কাছে প্রত্যাশা করেন— সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ, সাহিত্যের স্বাধীনতা। ঠিক, মিলারের মত সিঙ্গার দেখেন যৌনতা, এবং যৌনতাসম্পর্কিত অন্যান্য সব আনুষঙ্গিক বিষয়গুলি, ইন্দ্রিয়পরায়ণতা— এসব হল মানুষের বিশাল বিস্তৃত আনন্দ। যদি আমরা “এই বিষয়টাকেই এড়িয়ে যাই, তাহলে আমরা জীবনের সবচেয়ে গভীর আনন্দের উৎসটাকেই এড়িয়ে গেলাম। আমার মতে, যৌনতাহীন লেখক আসলে লেখকই নন।”

গতরাতের মতই, খুব দৃঢ় গলায় সিঙ্গার লেখকদের সম্পর্কে রূপরেখা দেন এই বলে যে, যারা যৌনক্রিয়া নিয়ে লেখেন না, “তারা অবশ্যই অর্থনীতি নিয়ে লেখবেন।” কিন্তু একজন লেখক, যিনি লেখবেন মানবজাতিকে নিয়ে, তাতে আবশ্যিকভাবেই যৌনক্রিয়ার মহান অনুভূতিগুলি থাকতে হবে, কারণ মানুষ সব সময়ই যৌনতার অনুভূতিগুলির প্রতি গভীরভাবে সংবেদনশীল। মানুষের সবচেয়ে বড় আনন্দের প্রতি লেখকদের থাকবে প্রগাঢ় সমর্থন। এই বিশ্বে অনেক ছোট ছোট আনন্দ আছে, আপনি কখনই এইসব আনন্দের উৎসগুলিকে না দেখে থাকতে পারবেন না।”

“এখানে আর কোনও প্রশ্ন নয়। যদি ঈশ্বর একজন থাকেন, আমি তাকে একজন প্রেমিক হিসাবে কল্পনা করব; কাবালা অনুসারে, স্বর্গের আত্মাগুলি একে অপরকে ভালবাসছে, গভীর প্রেমে মজে আছে আত্মারা। জ্যাকব এখনও রেসেল আর লেহের সঙ্গে প্রেমলীলা করছেন। লীলা করছে তারা চার জনায়। চার জনের দুজনই রক্ষিতা, তবুও তিনি প্রেমের ব্যাপারে বৈষম্য করছেন না; এবং অনুপম সৌন্দর্যের অধিকারী দেবদূতরা আর করুণাময় ঈশ্বর স্বয়ং পবিত্র যৌনতায় মগ্ন, আমরা যা মাঝে মাঝে বুঝতেও পারি না। কিন্তু তারা সবাই ভালবাসার খেলায় মগ্ন হয়েই আছেন। যদি ব্যাপারটা এমন হয়েই থাকে”, সিঙ্গার তালমুদিক স্বরে বলতে থাকেন, “ কেন তবে আমি যৌনতা নিয়ে লেখব না কিংবা ভাবব না কিংবা করব না?”

সিঙ্গারের কথা বলার ভঙ্গি তার লেখা কোনও এক গল্পের চরিত্রের মত। আপনি একটি প্রশ্ন করছেন এবং আপনি একটি উত্তর পাচ্ছেন। কাবালা কিংবা তালমুদ এক্ষেত্রে রেফারেন্স হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তার যুক্তির স্বপক্ষে তারা আসছে একের পর এক। সিঙ্গার তার বন্ধুদের বলছেন, যারা তাকে খবরটা দিয়েছিলেন আর জিজ্ঞাসা করেছিলেন পুরস্কার পেয়ে তিনি আনন্দিত কি না। আপনারা কীভাবে খুশি হবেন যখন পত্রিকায় আমার পুরস্কার পাওয়া নিয়ে একটা গল্প পড়বেন কয়েক’শ কিংবা কয়েকহাজার নিরাপরাধ মানুষের মৃত্যু কিংবা মারাত্মকভাবে জখম হওয়ার আরেকটি সংবাদ— আপনারা কি আনন্দিত হতে পারবেন?”

নোবেল পাবেন, এটা আশা করেছিলেন? “সত্যিকার অর্থেই, না। আমার কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু আর শুভাকাঙ্ক্ষী বলেছিলেন আমি এটা পাবই। তবে, এখন পাব আর পেয়েগেছির ব্যাবধান বহুদূর বিস্তৃত। আমি ভেবেছিলাম হয়ত তারা ঈদিশ ভাষাকে কিংবা ঈদিশভাষী লেখককে স্বীকৃতি দেবে না। এই পুরস্কারটা সমগ্র ঈদিশ সাহিত্যের জন্য।” কিংবা, সিঙ্গার যেমন খুব দ্রুত তার এই মতটি সংশোধন করে বলেন, “ঈদিশ ভাষার জন্য”।

“এমনকি যদি প্রেত-দানবরা থেকেও থাকে”, আইজ্যাক বাশেভিস সিঙ্গারের খুব পরিচিত ইহুদি চরিত্রদের একজন বলে, “তারা অবশ্যি নিউইয়র্কে নাই। একটি প্রেত কিংবা দানব নিউইয়র্কে কী করতে আসবে? সে তো গাড়িগুলির দৌড় দেখেই দৌড়ে পালাবে কিংবা সাবওয়েতে নিজেকে গুটিয়ে গোপন করে ফেলবে, আর কখনই সে তার ফিরে আসবার পথ খুঁজে বের করতে পারবে না...”

ইহুদি দানব কিংবা প্রেত’রা, আপনি জেনে থাকবেন, তারা খুবই সাধারণের মত দেখতেঃ বিভ্রান্ত, হতাশ, হতবিহবল, ঈর্ষাপরায়ণ, বজ্জাত এবং ধাপ্পাবাজ। সিঙ্গারের অধিকাংশ গল্পেই তাদের দেখা পাওয়া যায়। সব সময়ই তারা ঘটনার বর্ণনাদানকারী কিন্তু চরিত্র হিসাবে তারা সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন, তারা অনেকটাই আমাদের লোকগল্পের কুযিবাহ’র মত, যে এক অল্পবয়সি প্রেত, গাধার মত কান, বিষাণগুলি মোমের, পা’গুলি দেখতে মুরগির মত, ডানাগুলি যেন বাদুড়ের, যে সব সময়ই মানবজাতির ভয়ে আতঙ্কিত।”

১৯৭৪ সালের জানুয়ারিতে, টেলিফোনে সিঙ্গারের সঙ্গে প্রেত-দানবদের দূর করার তন্ত্রমন্ত্র নিয়ে আলাপ করেছিলাম। সিঙ্গার, যিনি প্রায়ই এই কথা বলে থাকেন যে তিনি লেখায় এইসব অতিপ্রাকৃত ব্যাপারগুলিকে ব্যবহার করে থাকেন, বিশ্বের এক আধ্যাত্মিক অনু-উপকরণ হিসাবে। “আমি নিজে এই ব্যাপারগুলির ব্যাখ্যা করা বা ভেবে দেখার শুরু করবার কয়েক বছর পর, এসব নিয়ে পড়াশোনা করতে শুরু করি, লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করি, আমি বিশ্বাস করি যে মিলিয়ন মিলিয়ন অতিপ্রাকৃত সৃষ্টি আমাদেরকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে। একদিন ঠিকই আমরা এই ব্যাপারে অনেক বেশি জানতে পারব। আমি বলতে চাই যে ইহুদিদের মধ্যে আধিকাংশই এই কথাকে গ্রহণ করবে না। ইহুদিদের ভিতর এই মায়া বা বিভ্রমটি রয়েছে যে ইহুদি ধর্ম একটি যৌক্তিক ধর্ম। কিন্তু কোনকিছু একই সঙ্গে ধর্মীয় আর যৌক্তিক হওয়া আসম্ভব।”

“জীবন আসলেই, আমার কাছে, এক বিচিত্র ব্যাপার”, সিঙ্গার স্বর কোমল করে বলেন, “আমি বিশ্বাস করি এখানে এমন কিছু অদ্ভুত ব্যাপার রয়েছে ভূতে-পাওয়া বাড়িগুলির মত, আর আছে পুনর্জন্ম, এবং আমি বিশ্বাস করি না যে আগামীর কোনও এক দিনে এইসবের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যাবে, এইজন্য এখানে, কিংবা অন্যকোথাও কিংবা তখন, অবাধ-বাছাইয়ের বা স্বাধীন-পছন্দের তেমন কিছু থাকবে না। মানুষের আবাধ-বাছাই বা স্বাধীন-পছন্দ পুরোপুরি বিলুপ্ত হবে। যদি আমরা নিশ্চিত হয়ে যাই যে সেখানেই আছে এক নরক আর আছে মৃত্যুর পর স্বর্গ-প্রবেশের আগে আত্মাকে পাপমুক্ত করবার এক শুদ্ধিস্থান, তাহলে আমরা সবাই একেকজন সন্তে পরিণত হব।”



অনুবাদক পরিচিতি
এমদাদ রহমান 

গল্পকার
অনুবাদক।
জন্ম সিলেট, বাংলাদেশ।
বর্তমানে ইংলন্ডে থাকেন। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন