বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

বেন ওকরি'র গল্প : ঘড়ি


অনুবাদঃ বিকাশ গণ চৌধুরী 

(বেন ওকরি, জন্ম : ১৯৫৯, নাইজেরিয়ার কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সেই “The Famished Road”- এর বিখ্যাত লেখক, আমাদের খুব চেনা নাম। যাদের কাছে ইনি নতুন, তাদের বলি, আফ্রিকার উত্তর-আধুনিক এবং উত্তর-ঔপনিবেশিকলেখালেখির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এই ভাষাশিল্পী লেখেন ইংরেজিতে। বেন-এর যখন দু’বছর বয়স তখন উচ্চশিক্ষার জন্য তার বাবা সপরিবারে লন্ডনে চলে যান ,১৯৬৮তে জীবিকার জন্য ফিরে আসেন লাগোস-এ; বেন-এর প্রথম স্কুলে যাওয়া লন্ডনে, তারপর লাগোস-এ। লাগোসেই শুরু হয় তাঁর নিজস্ব শিকড়ের পরিচয়, গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, আর এই সংস্কৃতিক মিশেলই ভবিষ্যতে বেন-এর রচনায় প্রাণ সঞ্চার করতে থাকে।২০০৯ সালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর “Tales of Freedom”, যেখানে লেখক হাইকু আর গল্পকে মিশিয়েছেন, এবং লেখালেখির এই বর্গকে নাম দিচ্ছেন “stoku”; এখানে রইল এরকমই একটি ‘স্টোকু’র নমুনা, হে পাঠক, আপনারই পাঠের অপেক্ষায়...)


ঘটনাটা ঘটেছিল বোয়াদ্‌ বুলইয়ে, এক জ্যোৎস্না-ধোওয়া বিষ্ণণ্ণ রাতে। চেষ্টনাট গাছগুলোর তলায় বনের মধ্যে একটা খোলা জায়গায়। আমাদের পরনে ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর পোষাক-আষাক।

মুহুর্তটা এল। ডুয়েল-লড়িয়েরা ঠোঁট চেপে পিস্তল বাগিয়ে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়াল। আর তখনই সেই অপ্রত্যাশিত ঘটনাটা ঘটল। আমি যার সহযোগী ছিলাম, আমার সামান্য পরিচিত সেই লোকটা হঠাৎই কেঁদে উঠল। ও ওর প্রতিদ্বন্দ্বীর বুক আর কোমরের মাঝখানের কোন একটা জিনিস আঙুল তুলে দেখাতে লাগলো। আমরা ওই দিকে তাকিয়ে দেখলাম কী সেই জিনিস যা ওকে অসুবিধায় ফেলছে। দেখলাম, ওর প্রতিদ্বন্দ্বীর কোমরে রয়েছে একটা বড়, গোল, চক্চকে ঘড়ি। ও ওটাকে বেল্টের বকলেসের মতো করে পরেছে। চক্চকে ডায়ালে সংখ্যাগুলো ছিল কালো রঙের ।


আমার সহযোগী ওই ঘড়িটায় সম্মোহিত হয়ে পড়েছিল। ঘড়িটা ওকে নিশ্চল করে দিয়েছিল। ও ওটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়েছিল। তারপর ও ভয়ে বিড়বিড় করতে লাগলো। ঘড়িটা কোনভাবে ওর মনটাকে বিষিয়ে দিয়েছিল। আমি বললাম :

‘ভগবানের দোহাই, ওরে দামড়া খোকা, ওটা শুধুই একটা ঘড়ি’।

‘ওটার দিকে তাকাও’, ও ফিসফিসিয়ে বলল, ‘ওটা কি নিষ্ঠুর’।

‘ওটাকে মাথা থেকে তাড়াও’, আমি বললাম।

‘এটা অসম্ভব ! বিরক্তিকর !’

ওর প্রতিদ্বন্দ্বী তার সহযোগীকে নিয়ে ভাবলেশহীনভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। ওরা আমাদের মাপছিল। আমার সহযোগী আমার চোখের সামনে পড়ে গেল। ও কিছুতেই ওর মাথা থেকে ওই ঘড়িটাকে তাড়াতে পারছিল না। আমিও আর ঐ হতচ্ছাড়া ডুয়েলটা চাইছিলাম না।ওই ডুয়েলটা সম্পর্কে আমি কিছু জানতামও না আর ও আমাকে কখনো কিছু বলেও নি। দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যেই কারণটা গোপন ছিল। লোক-দেখানো বন্ধুত্ব আর সেই বন্ধুত্বকে সম্মান দেখাতে গিয়ে আমি এতে ফেঁসে গিয়েছিলাম। চুলোয় যাক সব সম্মান। ওসব সম্মান একজন মানুষকে অন্যমানুষের নরকে নিয়ে ফেলে।

কারোরই কিছু করার ছিলো না। আমার সহযোগী চাপ নিতে না পেরে এক ভয়ানক পাক্ষাঘাতে আক্রান্ত হল। ওর প্রতিদ্বন্দ্বী ধৈর্য্য ধরছিল। রাত গভীর হল, আর ধীরে ধীরে ভোর হল। আমার সহযোগীর সুস্থ্য হবার অপেক্ষায় ওর প্রতিদ্বন্দী অনেক ঘন্টা অপেক্ষা করল। একটা স্মৃতিস্তম্ভের মতো, সম্মান জানানো হয় না এরকম একটা রোমান দেবমূ্র্তির মতো সে নীরবে অপেক্ষা করছিল।

যদিও আমার সহযোগী, উদ্বিগ্ন সময় কাটাতে কাটাতে কেমন যেন জন্তুর মতো হয়ে পরছিল। সকাল হবার সঙ্গে সঙ্গেই ও কাঁপতে কাঁপতে সেই অস্বস্তিকর ঘড়িটার সম্বন্ধে বিড়বিড় করতে করতে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ল। আর এসবের পর আমরা ওকে ঐ খোলা জায়গার মধ্যে থেকে ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে এনে তুললাম। মনে রাখতে হবে যে ওখানে কেবল একটা গাড়িই ছিল, কারণ ভাবা ছিল যে ডুয়েলে যে হারবে সে ওখানে মরে পড়ে থাকবে।

আমরাই গাড়িটা নিলাম। আমাদের প্রতিদ্বন্দী আমাদের দয়া দেখালো। নীরব ছিল সে। যেন রাতেরবেলার এক অদ্ভুত শহরে, একটা বেদীর ওপরে, নাড়ানো-চাড়ানো যায় না এরকম একটা শাদা পাথরের শরীর। সে আর তার সঙ্গীসাথীরা সেই ফুটে ওঠা ভোরে দল বেঁধে সেখানে শুধু শুধুই দাঁড়িয়ে রইল, আর সেই চক্চকে ঘড়িটা তার সৌরতন্ত্রের জালে জ্বলজ্বল করেই চলছিল।

আমার সহযোগী আর কখনই সেরে উঠল না। আমরা ওকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। তারপর ওর দুঃস্বপ্ন দেখা শুরু হল। তারপর ও পাগল হয়ে গেল।

আমি মাঝেমাঝে ওকে দেখতে যেতাম। যখনই ও আমাকে দেখতো ও ঐ ঘড়িটার কথা জিজ্ঞাসা করতো। উত্তরে আমি ওকে পাশ কাটিয়ে যেতাম। তারপর আমি যাওয়া বন্ধ করে দিলাম। ওর অস্থিরতা আমাতে সংক্রামণ ছড়াচ্ছিল। আর সেটা একজন মানুষের মাথার গন্ডগোল ঘটানোয় খুব একটা সময় নেয় না, তাই না। বিশেষ করে যদি, বনের মধ্যে একটা খোলা জায়গায়, চাঁদের আলো-ধোওয়া রাতে, মন কখনই একটা প্রতীক থেকে নিজেকে ছাড়াতে না পারে ।

এখন আমি আমার মনকে কোন কিছুতে, বা কারো সঙ্গে না জুড়ে জীবন বেয়ে চলি। এর মধ্যে এক ধরনের স্বাধীনতা আছে।


অনুবাদক পরিচিতি
বিকাশ গণ চৌধুরী

আদি নিবাস কুমিল্লা জেলার বুড়িচং গ্রাম হলেও, পাহাড় ঘেরা একটা ছোট্ট শহর দেরাদুনে ১৯৬১ সালে জন্ম, ছোটবেলার অনেকটা সেখানে কাটিয়ে বড় হওয়া কলকাতায়, চাকরিসূত্রে অনেকটা সময় কেটেছে এলাহাবাদ আর মধ্যপ্রদেশের রায়পুরে। বর্তমানে কলকাতার বাসিন্দা... লেখেন কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ; ফরাসি, হিস্পানি, ইংরেজি প্রভৃতি ভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন মন্‌পসন্দ নানান লেখা, সম্প্রতি শেষ করেছেন পাবলো নেরুদার শেষ কবিতার বই ‘El libro de las preguntas’ –এর পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ‘প্রশ্ন-পুঁথি’। দীর্ঘদিন যুগ্মভাবে সম্পাদনা করেছেন সবুজপত্র ‘বিষয়মুখ’।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন