সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৪

মোজাফ্ফর হোসেনের গল্প : একটি রাতের গল্প


রাত ১টা। চারিদিকের কোলাহল রাতের অন্ধকারের সাথে মিশে গেছে। মাঝে মাঝে গাড়ির হর্ন আর নিজের হার্টবিট ছাড়া আর কিছুই শুনতে পায় না সফেলা। টানা ছয় ঘণ্টা গাড়িতে থাকার দরুন গাড়ির শব্দটি খুবই সাধারণ ঠেকছে অথচ এই শব্দকে একদিন মোটেও সহ্য করতে পারত না সফেলা। স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে পাশের বাড়ির সবদার শেখের মেয়ের বিয়ের কথা। সেবার দু’দুটো বাস এসে সফেলার উদোম উঠোনে এসে থামলো, শব্দে তো প্রায় জানটার যায় যায় অবস্থা! সফেলা সেদিন সবদার শেখকে প্রাণ ভরে গালি দিয়েছিল। গালিটাই যে তার একমাত্র সম্বল! সবদার সাহেবদের কাছে যেমন সফেলা অতি তুচ্ছ, সফেলার গালির কাছে তাদের দশাও তেমনি— সফেলাকে যারা চেনে এ বিষয়ে তাদের মধ্যে কোন দ্বিমত ঘটবে না। তাই তো সফেলা সুযোগ পেলেই তার এই অস্ত্রটা কৃতিত্বের সাথে কাজে লাগায়।


বাসটি তেল পাম্পে এসে ভিড়লো। সফেলার ডান পাশের লোকটি প্রস্রাব করার জন্য তড়িঘড়ি করে নেমে পড়লো, বাম দিকের লোকটি নড়েচড়ে বসলো— এতক্ষণ সে সফেলার ঝুলে যাওয়া বাম স্তনটি মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছিল। এদের দু’জনার সহায়তায় আজ সফেলা অন্ধকারকে গ্রাস করে চলেছে দেহ-খাদক একদল পিশাচের ক্যাম্পে। ওরা ইচ্ছেমত ভোগ করবে তাকেউল্টে-পাল্টে, খাবলে-খুবলে খাবে তার কাকের ঠ্যাংয়ের মতো রসকষহীন শুকনো শরীর। প্রয়োজনে থাকতেও হতে পারে কয়েক রাত— বিনিময়ে টাকা; কিন্তু কত দেবে ওরা? দেহের ওপর অনেক ধকল যাবে ভাবতেই মুখখানা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায় সফেলার। সে ধকল না হয় সইলাম, কিন্তু কত দেবে ওরা— মনে মনে ভাবে সফেলা। তাকে যা দেয়া হবে তার দুই ভাগ আবার যাবে এই দালালদের পকেটে। প্রতিটা কারবারে মধ্যস্থকারীরা সব থেকে বেশি সুফল ভোগ করে, এই বেশ্যা বাজারেও তার ব্যতিক্রম ঘটে না। দালালদের সহায়তা ছাড়া যে সফেলার পক্ষে আর কোন পার্টি ধরা সম্ভব না! বেশ্যা বাজারে তার দাম পড়ে গেছে। একটা সময় ছিল যখন আগে থেকেই দরদাম হাঁকিয়ে পা বাড়ানো যেতো। কিন্তু এখন আর তার আগের সেই টসটসে মিনসে ভোলানো গতর নেই। ফুলে রস না থাকলে মৌমাছি বসবে কেন! তাই দামাদামি করতে গেলে হটিয়ে দেয় সকলে। সফেলা নীরবে মেনে নেয় সব। দশ বছর পূর্বেকার কথা মনে পড়তেই তার মুখে কিঞ্চিৎ হাসি ফুটে ওঠে। এক সাহেব গোছের মানুষ— সফেলার বয়স তখন বাইশ কি তেইশ— ভরাট যৌবন দেখে সাহেব তো একেবারে পাগলপ্রায়! সাহেব হলে কী হবে— লোকটি পাজি-নচ্ছাড়, বৌ-বাচ্চা রেখে চলে আসে সফেলার কাছে— সফেলাও খাসা মাল, চেয়ে বসে এক হাজার টাকা! ভদ্রলোক এক কথাতেই রাজি। সফেলা টানা নিঃশ্বাস ছাড়ে নিজের অজান্তেই। এ সমাজটাই হচ্ছে নচ্ছাড়। সমাজের প্রতিটি লোক বেশ্যা অথচ ভারটা বইতে হয় সফেলার মতো গুটিকতক অসহায় নারীকে। রাত হলে সমাজের কতো হর্তা-কর্তা লালা ফেলতে ফেলতে মাগী বাড়ির সন্ধান করে সফেলার তা ভাল করেই জানা। ওরাই বড় বেশ্যা অথচ সকাল হবার সাথে সাথে যেনো এক একজন ধোয়া তুলসী পাতা।

গাড়ির শব্দ ভোতা হয়ে আসছে ক্রমশ। ভিতরের বাতিগুলো এখন বন্ধ। সকলে বোধ হয় তন্দ্রাচ্ছন্ন। বামের সিটে বসে থাকা দালালটির হাত আর নড়ছে না। রাস্তায় হালকা আলো-ছায়া সফেলাকে ভেংচি কেটে সরে পড়ছে দ্রুত। রাতের নীরব আত্মা তাকে শাসিয়ে যাচ্ছে ঘনঘন। দিনের আলো সফেলার গায়ে কাঁটাতারের মতন বিঁধে— অপমানে, লজ্জায় কুঁকড়ে যায় তার সর্বাঙ্গ, অথচ রাতের পৃথিবীতে সে পানির মধ্যে মাছের মতোন খুবই স্বাভাবিক। দিনের আলোয় যারা ভালো মানুষের মুখোশ পরে সভ্যতার নকশা তৈরি করে, রাতে তাদের নগ্ন চেহারা দেখে সফেলার খুব করুণা হয়। সফেলা তো এই সমাজেরই একজন, সমাজের প্রতিটি মানুষের সাথে পাল্লা দিয়ে সেও বেঁচে থাকতে চাইছে। মোদ্দা কথা টিকে থাকাটাই এখানে সব। কোন জগতটা তবে সত্যি— রাতের নাকি দিনের? যদি রাতের হয় তবে সফেলা তো অন্যায় কিছু করছে না। বেঁচে থাকার জন্যেই আর পাঁচটা ব্যবসায়ের মতন দেহব্যবসা করছে, ভদ্রঘরের নারীদের মতো দৈহিক তাড়না কিংবা ভোগ বিলাসিতার জন্য কিছু করছে না, সে যা করছে স্রেফ বেঁচে থাকার জন্যেই; এক্ষেত্রে দেহ তার ব্যবসায়ের মূলধন মাত্র; কিন্তু সমাজের সভ্য মানুষগুলো তো তার কাছে আসে দেহের গন্ধে, মাংসাশী প্রাণীর মতন খাবলে-খুবলে খায়, সুখের নেশায় মাতাল হয়ে আঁচড় কেটে দেয় তার ভেতরে ও বাহিরে। বেশ্যা শব্দটা যদি এতটাই ঘৃণার হবে তবে আসল বেশ্যা তো ওরা যারা ঘণ্টায় ঘণ্টায় মুখোশ পাল্টায়, রাজত্ব করে ভণ্ড সভ্যতার!

এতসব বোঝে না সফেলা। এত বোঝবার জ্ঞান তার নেই। সমাজের শিক্ষিত ভদ্রলোকেরা তার কাছে জ্ঞান দিতে যায় না, যায় তাদের পাশবিক চেতনাকে উগরে দিতে। এদেরকে অজ্ঞ করে না রাখলে যে বড় ক্ষতিটা তাদেরই হবে! অন্ধকারে থাকে বলেই সফেলা জানে মানুষের অন্ধকারের খবরটা।

গাড়িটা মেইন রোডের এক কোণায় থামলো— দশ মিনিটের বিরতি। দুয়েকটি দোকান এখনো খোলা। বাম পাশের লোকটি বিড়ি কিনতে নেমে যায়, সফেলা বুকের কাপড়টা ঠিক করে আলোতে মুখটা আলগে ধরে, চোখ পড়ে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় চকচক করতে থাকা সিনেমার পোস্টারের দিকে। অর্ধ-উলঙ্গ নায়িকাদের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে সফেলা। সমাজের এই উঁচু শ্রেণির বেশ্যাদের দেখে হিংসে হয় তার। সমাজে এদের বেশ কদর আছে, টাকাও পায় ঢের বেশি। আচ্ছা, এরা কি সুখ পায়, নাকি আমার মতো যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যায় পুরা শরীর? —ছবির ওপরে দণ্ডায়মান ল্যাম্প-পোস্টটিকে প্রশ্ন করে সে। প্রচণ্ড সুখে যখন খদ্দেরদের মরে যেতে ইচ্ছে করে তখন আহত সফেলা খুব কষ্ট করে জানটাকে ধরে রাখে। পঁচিশ বছরের বেশ্যা জীবনে মাসিকের সময় যে শান্তিটুকু পেয়েছে সে, এছাড়া আর অবসর মেলেনি জীবনে। প্রথম যেবার মাসিক হয়, কী গালিটাই না দিয়েছিল মাসিককে! কী ভয়ানক রক্ত দলা বেঁধে শরীর থেকে নেমে আসে, ব্যথায় কুঁকড়ে যায় তলপেট, নারী জীবনে এর থেকে অভিশপ্ত আর কিইবা হতে পারে! তখন কি আর জানতো সেÑ এই বীভৎস ঘটনাটাই তার জীবনে সব থেকে কাক্সিক্ষত হয়ে দাঁড়াবে!

রাত ২টা। সফেলার মনে হচ্ছে গাড়িটা অন্ধকারকে আঁকড়ে তরতর করে বয়ে চলেছে অজানা এক শঙ্কার দিকে। বাড়িতে তার আট ও দশ বছরের মেয়ে দুটো একা। ছেলেটা ছ’ মাস ধরে জেলে। ছাড়াতে অনেক টাকা লাগবে। পুলিশের মন ভরানোর মতো বয়স ও টাকা কোনটাই তার নেই। ছেলেটা গেছে, এখনও সময় আছে মেয়ে দুটোকে রক্ষা করার। সফেলা অনেক ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আজকের রাতটিই হবে তার বেশ্যা জীবনের শেষ রাত; ওরা যে ক’টা টাকা দেবে তা নিয়েই মেয়ে দুটোকে সংগে করে এ সমাজের কোন এক গর্তে ঘাপটি মেরে পড়ে রইবে। টাকার কথা মনে হতেই হার্টবিটটা বেড়ে যায়। বুক থেকে দালালের হাতটি হটিয়ে নিজের হাতটি শক্ত করে চেপে ধরে সেখানে যেনো জানটা বেরিয়ে না যায়। আচ্ছা, কতো দেবে ওরা, নাকি খালি হাতেই ফিরতে হবে! —এই সংশয়টি তার সকল সংশয়কে পিছনে ফেলে পথ ভোঁতা করে দাঁড়ায়। একটা সময় ছিল যখন ওরা রূপের ঝলক দেখে দু’হাত ভরে দিত। তাইতো বেশ্যা বাজারে সকলে হিংসে করতো তাকে। এমনকি সতী-সাধ্বী নারীরাও আড়ালে-আবডালে সফেলার মতো হতে চাইতো। অথচ আজ ঝুলন্ত আর ঢিলে-ঢোলা গতর দেখে সকলে চোখ ফিরিয়ে নেয়। এ ব্যবসায়ে কচি দেহ বিকোয় বেশি। তাইতো সুযোগ পেলেই প্রতারণা করে সবাই, সফেলাকে সইতে হয় নীরবে— এ প্রতারণার যে কোন বিচার নেই, আইন-আদালত নেই, আর থাকলেই বা কী এমন লাভ হতো! এদের ‘করুণাতেই’ যে সফেলারা বেঁচে থাকে! আর জীবন? টানা নিঃশ্বাস ছাড়ে সফেলা।

গাড়ি এসে থামলো গন্তব্যে। দালাল দু’জনের পিছন পিছন সফেলাও নেমে পড়ল হিড়হিড় করে। আচ্ছা কত দেবে ওরা— ফিসফিস করে বলল নিজেকে। আঁচলের গিঁট্টু থেকে একটা বড়ি বের করে গুঁজে দিল মুখে, দেহ অবশ করার এই কায়দাটা ওর সাথেই থাকে। বেশ কয়েক কদম হাঁটার পর পৌঁছাল পিশাচদের ক্যাম্পে। ঘুটঘুটে অন্ধকার, বিশ্রী রকমের গরম পড়েছে আজ। মাঝেমধ্যে উঁকি দিয়েই মেঘের মধ্যে লুকিয়ে পড়ছে চাঁদ। সখী, তোর যৌবনের ধার একটু ধার দিবি আমাকে? সফেলা কতবার বলেছে এ কথা! আজ তার মেজাজটা আছে বিগড়ে। মাগী, ছিনালিপনা করিস আমার সাথে? হাতের কাছে পেলে তোর মাথার চুলগুলো ধরে স্যাটায় ধান ভাংতাম! সফেলা মন্ত্র পড়ার মতো বিড়বিড় করে বলে। দালালের একজন এগিয়ে যায় দরজার দিকে। অন্যজন সফেলার হাত দুয়েক দূরে দাঁড়িয়ে চচ্চড় করে পেশাব করতে থাকে। কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে একটা ঝাঁঝালো কণ্ঠস্বর ভেসে আসলো, ‘কে? কোন হ্যালায় বে এই অসময় দরজা হেটকায়?’ সফেলার বাম পাশের লোকটি একটু বিনয়ের সুরে বলল, ‘আমরা সাব, মাল লইয়া আইছি’। ভেতর থেকে আর কোন সাড়া শব্দ আসে না। সফেলা ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে জানতে চায়, ‘কত দেবে ওরা?’ ডান দিকের লোকটা আন্ডারওয়ার-এর ফিতে বাঁধতে বাঁধতে খিঁচুনি দিয়ে বলে উঠল, ‘চুপ কর শালী, এত্ত ঠাপ খেয়েও কামড় মেটেনি!’ ততক্ষণে ভেতর থেকে একটা তৃপ্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, ‘আজ আর লাগব না; আমরা কম বয়সী এক ছুড়ি পাইছি। অন্যদিন নিয়া আসিস’। সফেলাকে হটিয়ে দালাল দু’জন পিছন দিকে পা বাড়ায়। সফেলা মাথা ধরে বসে পড়ে— আরও একটি নষ্ট রাত, আরও একটি স্বপ্নের প্রতীক্ষায়। কিন্তু কত দেবে ওরা?



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন