সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৪

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প : তেওট তালে কনসার্ট

এ বছর বর্ষা বড় মনোহর রূপ নিয়ে এসেছে।ইংরেজি মতে স্মার্ট শাওয়ারের দাপটে শহর কলকাতার সামান্য কিছু গাছ ডালে পাতায় শিকড়ে জল শুষে শুষে এখন এই সিমেন্ট নগরীতে রীতিমতো ঝলমল করে জেগে উঠেছে। ভাঙা রাস্তা, বিকল বাস, রাস্তার বেওয়ারিশ কুকুর, রেশনে তেল নেই শুনলেও আমাদের এই এলাকায় বৃষ্টি-ভেজা গাছপালার ভেতর মেট্রো স্টেশন স্বপ্নপুরীর মতো আলো জ্বলে জেগে থাকে সারারাত। মনে হয় জীবনে আশার এখনো কিছু আছে। হয়তো বা সামনেই ভালো কিছু ঘটবে। আরেকটু এগোলেই।


এরকম একটা জায়গা থেকে রোজ চাকরি করতে যাই। ফিরে এসে ঘরগেরস্থালি করি। আলো নিভে গেলে পাড়ার ইলেকট্রিক মিস্ত্রি ডাকি। বৃহস্পতিবারের সকালে একজন লোক মাটির সরায় করে নারকেল নাড়ু, মাছের ছাঁচে বসানো খোয়া, ক্ষীরের সন্দেশ আর ঘরে তৈরি মিহিদানা বেচতে আসে। কিনি। খাই।


মেট্রো, মেট্রো স্টেশন, ট্রাম লাইন থেকে ফার্লং মতো হাঁটলে আমাদের বসতি। সবাই পায়ে হেঁটে গিয়ে অফিস কাছারির গাড়ি ধরে। এখানে পুব দিকে সূর্য ওঠে। পশ্চিমে সূর্যাস্ত হয়। দু-তিনটি সরু রাস্তায় দুধার দিয়ে দোতলা-তেতলা সব বাড়ি। দোতলায় রিটায়ার্ড বাড়িওয়ালা। একতলায় ভাড়াটে।

এরকম জায়গায় এবারের বর্ষা বড় মনোহর রূপ নিয়ে এসেছে। কলকাতার বাইরে মাঠেঘাটে না জানি বর্ষা আরো কতো সুন্দর। রাতে সবাই শুয়ে পড়লে বিছানায় বসেই বাইরে অবিরাম বৃষ্টি পড়ার শব্দ শোনা যায়। বৃষ্টি পড়েই চলেছে। পড়েই চলেছে। তার ভেতর কখন ঘুম এসে সব ভুলিয়ে দেয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে লোকালিটির একমাত্র দিঘিতে উৎফুল্ল পাতিহাঁসদের গা মেজে মেজে চান করতে দেখা যায়।

দিঘির ওপারেই শক্তিগড়। তিরিশ-চল্লিশ বছর আগে ওপারের মানুষ এখানে এসে জবরদখল করে। এখন তাদের পাকাবাড়ি। সিমেন্ট করা গোয়ালে কারো বিলাতি গাই। না হলে ছাদে ব্রয়লার মুরগির পোলট্রি। উঠোনে পাতিহাঁস। তারা চরে বেড়ায় এই সাবেক দিঘিতে। ষাট-সত্তর বছর আগে এই দিঘি কেটেই তার মাটিতে এ জায়গায় এই বসতির পত্তন।

দিঘির ওপারে ওসব বাড়ির ছেলেরাও আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে মশমশ করে চাকরি করতে যায়। শক্তিগড় একটা দেওয়া নাম। ওদের আমাদের ডাকঘর একই। সর্বজনীন দুর্গাপুজোও এক। থিয়েটার, পুজোর ভোগ রান্না, ভোগ বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়ায় ওসব বাড়ির ছেলেরাই সবার আগে।

আকাশে মেঘ করে এলে মেঘের নীচে ওদের বাড়িগুলো দেখতে পাই্। করপোরেশনের আইনের বাইরে বলে ওরা দিব্যি দোতলা, তেতলা, চারতলা হাঁকাচ্ছে।

এখানে তেতলা করতে ও কালঘাম ছোটে প্ল্যান পাশ করতে।

একেক সময় মনে হয় আমি যেন পাখি হয়ে এই শক্তিগড়, আমাদের বসতি, মেট্রো স্টেশন-সবই আকাশ থেকে ভাসতে ভাসতে দেখতে পাচ্ছি। সারা রাত স্বপ্নময়ী মেট্রো ষ্টেশনে আলো জ্বলে। গাছগুলো ভিজে ভিজে সজল। জমির কাঠা এক লক্ষ টাকা। ট্রামডিপোর মাঠে বাতিল লাইনের গায়ে কেয়াফুল ফুটে আছে।

জীবনে সেই কবে থেকে পরিশ্রম করা শুরু করেছি। এবার শুয়ে থাকব। বিশ্রাম করব। কতো [সম্ভবত এখানে ভোর/সকাল হবে] চোখের সামনে দুপুর হয়ে গেল। দুপুর হলো নিশুতি রাত। লাল পাগড়ি দেখলে আমরা বাড়ির ভেতরে চলে আসতাম। কুইট ইন্ডিয়া। আজাদ হিন্দ। স্বাধীনতা। উদ্ধাস্তু-স্রোত। দুর্গন্ধ ঢাকাতে শিয়ালদহ স্টেশনে ব্লিচিং পাউডার। ফাঁকা জায়গা, ডোবা, ভূতের বাড়ি, আমবাগান, বাঁশবাগান কিছুতেই থাকল না। লোক বসে গেল। জবরদখল করে। প্রফুল্ল কলোনি। প্রশান্ত কলোনি। যে যেমন পারে ঢুকে পড়ল। যুক্তফ্রন্ট।

ওই তো কারা কেডস্ পায়ে ফিরছে। অ্যাকশন করে ফিরল। এবার দিঘিতে হাত, পা, ভোজালি ধোবে। আরেকটু এগিয়েই কার্তিক মজুমদারের মড়া ফেলার নালা। এই পথটা যেন রামায়ণ মহাভারতে চলে গেছে। জবরদখল বাড়িগুলোর গায়ে গায়ে সব মোটাগুঁড়ির গাছ। তাদের পাতা ঝিলমিল ছায়ায় সে রাস্তার প্রায় সবটাই ঢাকা। একেক দিন ওদিকটায় আমি হাঁটতে যাই।

ওই তো সেই পথ দিয়েই হেঁটে আসছেন গণেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। আমি আমার জানলায় বসে দেখতে পাই। দিঘির ওপারে শক্তিগড়ের ভেতর দিয়ে গণেন্দ্রনাথবাবু হেঁটে আসছেন। মাথায় গাছপালার ছায়া। হাতে কাপড়ের থলে। থলেটা ঝুলে পড়েছে। গণেনবাবুর সঙ্গে আমার পরিচয় কিছুকালের। একদিন-

সাদা দাড়ি, সাদা চুল এক বৃদ্ধের অতি উৎসাহি মুখ আমার খোলা দরজায় উঁকি দিল। আপনি অমুক?

হুঁ। কেন বলুন তো?

অনেক রাত পর্যন্ত আপনার টেবিলে টেবিল-ল্যাম্প জ্বলিয়া তারপর নিভিয়া যায়-

বইপত্র নাড়াচাড়া করি। একটু-আধটু লিখি।

দিঘির ওপারে আমাদের ওইখানে বসিয়া দেখা যায়। কী ব্যাপারে এসেছেন?

আমার নাম গণেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়।

বেশ তো।

গণেনবাবু কাপড়ের থলেটি খুলে একটি মোটা খাতা বের করতে করতে বললেন, আমি আমাদের গৌরনদী থানার একখানা ইতিহাস লিখিয়াছি।যদি একটু দেখিয়া দেন-

গৌরনদী?

সে তো বরিশালে-

হ্যাঁ। আপনি জানলেন কী করিয়া? দ্যাশ ছিল?

আমাদের বাড়ি বানারিপাড়ায় ছিল। কিন্তু কোনওদিন যাওয়া হয়নি। মায়ের মুখে জায়গাটার নাম শোনা। সম্ভবত আমার ঠাকুর্দা ওখানে যাত্রা গান গাইতে গিয়েছিলেন।

কি নাম ছিল তাঁর?

বললাম।

ওরে বাবা! ও নাম তো সবাই এক ডাকে চিনতো। বড় গাইয়ে ছিলেন। নট্ট কোম্পানির।

আপনি শুনেছেন তাঁর গান।

হুঁ। বালক বয়সে। তরণীসেন বধ পালা। আপনি শোনেন নাই।

নাঃ। আমার জন্মের আগের বছর তিনি মারা যান। আপনার বয়স কতো? তিন কম আশি।


মনে মনে হিসেব কষি। আমার চেয়ে একুশ বছরের বড়।

এই ইতিহাস লেখার জন্য আমি পাসপোর্ট করিয়া আটবার গৌরনদী গেছি।

গৌরনদী আপনার খুব প্রিয় জায়গা?

আমার দেশ জন্মভূমি। বড়ো সুন্দর জায়গা। ভাবি- কী বিপুল বাতুল কান্ড। গৌরনদী এখন আর থানা নেই। সম্ভবত উপজিলা। জেলার নাম বাকেরগঞ্জ। যাকে আমরা বলি বরিশাল। গণেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় বলে যাচ্ছিলেন তাঁর স্কুলবাড়ি, দূর্গামণ্ডপ, নদীর ঘাটের কথা। যেসব জায়গা তিনি চল্লিশ বছর আগে ফেলে এসেছেন।

আমাদেরই মূল হলো খড়দহ। তার মানে আমার পূর্বপুরুষরা দুশো-আড়াইশো বছর আগে কোনো রাষ্ট্রবিপ্লব কিংবা কাজের খোঁজে-নয়তো জায়গা জমি পেয়ে খড়দহ থেকে ওপারে চলে যান। আবার চল্লিশ বছর আগে তাঁদের বংশধররা দেশভাগের মতো রাষ্ট্রবিপ্লবে এপারে চলে আসেন। এই আসা-যাওয়াই মানুষের ইতিহাস।

গণেন্দ্রনাথ বাবুর কথা হলো: আমরাই গৌরনদীর সাবেক বাসিন্দা। ওরা আসে পরে। কবে এসেছিল ওরা?

শাজাহান তখন দিল্লিতে মোগল বাদশা- তখন ওরা প্রথম আসে বরিশালে। আসিয়া ওরা ধীরে ধীরে হইয়া গেল সংখ্যাগুরু। মেজরিটি। সেই সুবাদে আমরা এক লাথি খাইয়া অপমানে লাঞ্ছনায় এপারে চলিয়া আসলাম। এই তো আমাদের ইতিহাস। এ এক অন্যায় ইতিহাস।

ইতিহাসের এই অন্যায় তো চিরকালের। ইতিহাস তো এই রকমই গণেন্দ্রনাথবাবু। যারা মিলেমিশে থাকে তাদের কিছু হয় না।

অরা তো ইরান তুরানের মানুষ। গৌরনদী ওদের হয় কি করিয়া?

বুঝলাম, গণেন্দ্রনাথের কাছে ইতিহাস অতি সরল বস্তু। কারো কাছে শোনা কথার ওপর নির্ভর করে ওর সব সিদ্ধান্ত তৈরি হয়েছে জানতে চাইলাম, কতদূর পড়াশুনা করেছেন।

ম্যাট্রিক ফেল করিয়া কলিকাতায় বীমার কাজ করতে আসি। শেষ বরিশাল অফিসে পোস্টিং পাই।

বললাম, ওরা ইরান তুরানের মানুষ নয়। আমাদের সমাজপতিদের অত্যাচারে অপমানে জেরবার হয়ে আমাদের অনেকেই ওই ধর্ম নেয়। তারাই শেষে গত একশো বছরে মেজরিটি হয়ে উঠেছে।

সেদিন আর গণেন্দ্রনাথের গৌরনদী থানার ইতিহাসের পান্ডুলিপির দেখা হলো না। তিনি মাঝে-মধ্যে আসেন। খবরের কাগজে পড়ি- সব রাজনৈতিক নেতা-ধর্মের আচার্যরা- যে যার যুক্তি দিয়ে নিজের কথা বলে যাচ্ছেন। যে যার মাঠ, মন্দির, আখড়া, মসজিদ, দরগা, মিশন, গির্জায় এক্তিয়ার অটুট রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। পড়ে মনে হয় কেউই ভুল নয়।

অথচ আমি-বা আমরা তার ভেতর পথ পাই না কেন? একজনও ত্যাগীকে দেখি না-যার পায়ের খড়ম সামনে রেখে অন্ধকারে ডাকা যায়। বর্ষণ না হলে পটলের কেজি দশ টাকা। আবার বেশি বর্ষণ হলেও পটলের কেজি সেই দশ টাকা।
এ পৃথিবীতে যাব কোথায়? এই তো আমাদের জীবন।

খুব ছোট বয়সে দুধে ডুবিয়ে পাউরুটি খাওয়ার ইচ্ছে হয়। যৌবনে একজন নারীকে বউ হিসেবে পেয়ে ভালোই লাগছিল। কিন্তু এখন কী অবস্থা। সব জিনিস খাওয়া শরীরের পক্ষে নিরাপদ নয়। বেশির ভাগ মানুষ বা জায়গার কোনও বিস্ময় নেই। মানুষের হাজার হাজার বছরের ইতিহাসের নীচে আমরা চাপা পড়ে যাচ্ছি। এই সাবেক দিঘি- তার পাতালের পাঁক ও শীত-চান করতে মশগুল কিছু পাতিহাঁসের ইতিহাসও সেই ইতিহাসের নীচে পড়ে চেপ্টে যাচ্ছে।

বাজারের পথে গণেন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা হয়। দেখা হয় সকালে বেড়াতে বেরিয়ে। কিংবা ডাকঘরের লাইনে। অথবা রেশনের দোকানে রেপসিডের টিন হাতে। সব জায়গাতেরই তাঁর সঙ্গে আমার কথা হয়।

একদিন বললেন, জমিদারি প্রথা অনেক ভালো ছিল।

বলেন কি? কত কষ্ট করে- বিরাট ক্ষতিপূরণ দিয়ে ব্যাপারটা শেকড় শুদ্ধ তোলা গেছে।

ক্ষতিপূরণ আর কী দেওয়া হয়েছে। জমিদারি প্রথা ছিল বলে জমিদার সব দেখতেন। নদীর বাঁধ বাঁধতেন। বড় গাইয়ে পুষতেন। রাস্তা বানাতেন। এখন পি. ডবলু ডি. কী সব করে। জমিদারের বসানো স্কুলের মতো স্কুল আজকাল হয়?

এই ভাবে কথা বলতে বলতে গণেন্দ্রনাথ আমার কাছে বাল্যবিবাহ সমর্থন করলেন। সমর্থন করলেন, বহুবিবাহ। কুলিনপ্রথা, পণপ্রথা, এমন কি বর্ণাশ্রমও।

বলে কি লোকটা? বাঙালি দেড়শো বছর ধরে চেষ্টা করে যা কিছু ফেলে আসতে চাইছে- তা সবই যে গণেন্দ্রনাথ আঁকড়ে ধরতে চায়।

ভীমরতি আর কাকে বলে। এড়িয়ে চলি লোকটাকে। বর্ষার পর একেক দিন তীব্র রোদ ওঠে। আমাদের সাবেক দিঘিতে সুধীরবাবু নৌকো ভাসিয়ে মাছ ধরে। তার ওপরেই দেখাশোনার ভার। কথায় কথায় তার কাছে গণেন্দ্রনাথের কথাটা পাড়ি।

সুধীরবাবু মাছ ধরা ছাড়াও মোষ পোষে। উপরন্তু নিজের বাড়ির উঠোনে বসে হাত পা বুক খুলে ফেলে ফ্রিজ সারায়। শুনে বলল, গণেনবাবু তো ছিটিয়াল। নিজের ছেলেদের সঙ্গে ঝগড়া করে নিজ বাড়িতেই পৃথক। আবার ইতিহাস লেখার জন্য-- উপন্যাস লেখার জন্য পকেটের পয়সা খরচা করিয়া প্রায়ই ল্যান্ডরুটে বরিশাল যায়। ডেসটিনেশন-- গৌরনদী। যাইতে পারেন পাগলার বাড়ি। সময় কাটিয়া যাইবে-

সময় এখনো আমার কাছে দরকারি। পাকে-প্রকারে তাকে নানাভাবে আমি ব্যবহার করি। পাড়ায় যারা মড়া পোড়ায়- তাদের একজন শুনে বললো, ওরে বাবা। গণেন? ভয়ঙ্কর লোক। নিজের ছেলের বিরুদ্ধে পুলিশ ডেকেছিল।

একাধারে ঐতিহাসিক, ঔপন্যাসিক-- আবার ঝগড়াটেও। আমি আকর্ষণ বোধ করতে থাকি। ভাবি-যাই না ঘুরে আসি। মানুষটার সঙ্গে এতবার দেখা হয়। বহুবার নিজের থেকে এসেছে। ইদানীং সুস্বাদু লোকই পাওয়া যায় না। এ তো কটু, কষায়- নানারকমে মেশানো।

আমাদের বসতির সাবেক দিঘির বাঁকটা পেরিয়ে রাস্তাটি যে একদম রামায়ণ মহাভারতের তা আগেই বলেছি। নির্জন। মোটা মোটা গুড়ির সব গাছ। সব সময় বাতাসে তাদের ঝাঁকড়া মাথা ঝিলমিল করে চলেছে। এ রাস্তায় লব-কুশ বা বালক অভিমন্যুকে খেলাধুলো করতে দেখলেও অবাক হতাম না। তার গা দিয়ে বেরুনো সি.এম.ডি. এর বাঁধানো গলির গায়ে অত নম্বর শক্তিগড় মানে গণেন্দ্রনাথের বাড়িটাকে পেলাম।

লম্বা টেরচা একফালি জমির ওপর বাড়িটা। আধখেঁচড়া তেতলা। ভাঙা রেলিং। শ্যাওলা। গণেন্দ্রনাথ বুকের কাছে লুঙি বেঁধে নিয়ে আমায় দোতলায় নিয়ে বসালেন। অতি অগোছালো একখানা ভাঙা ঘর। খাটের ওপর অগ্নিকন্যা-প্রথম ভান্ড- দ্বিতীয় ভান্ড লেখা একখানি উপন্যাসের দুখানি মোটা খাতা। একটি দেওয়াল ঘড়ি চিত হয়ে শুয়ে। কিন্তু ঠিক চলছে। পচে যাওয়া দুটি হ্যান্ডব্যাগ। বুঝলাম ও দুটি গণেন্দ্রনাথের বীমা জীবনের। খাতাপত্র। চিঠি। থাক থাক খাতার মলাটে লেখা - গৌরনদী থানার ইতিহাস। গণেন্দ্রনাথ নিজেই চা নিয়ে এলেন।

আপনার স্ত্রী কোথায়?

আজ দশ বৎসর বেড রিডন। এই চিঠিগুলো পড়ুন।

কাদের চিঠি?

আমি গৌরনদী গিয়া লোকাল স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আলাপ করি। তাদের চিঠি।

তারা লেখে?

প্রায়ই আমি জবাবও দিয়া থাকি। বিস্কুট খাইবেন? লইয়া আসি--


আশির কাছাকাছি একজন আগন্তুক ভারতবাসীকে লেখা কয়েকজন মুসলমান কিশোরীর চিঠি। ভাবতেই অবাক লাগে।

তাদের জন্মের পনেরো-বিশ বছর আগে যে দেশ ছেড়ে চলে এসেছে গণেন্দ্রনাথ- সে দেশে নতুন জন্মানো কয়েকটি কিশোরী যতখানি আবেগ দিয়ে গণেন্দ্রনাথকে জবাব দিয়েছে- আবদার করেছে চিঠিতে- অভিমান-ভালোবাসা। আশ্চর্য। হৃদয়ে ও কোন খনির সামনে এসে পড়লাম আমি। গণেন্দ্রনাথ যে জবাব দিয়েছে- তার মুসাবিদাও রয়েছে।

পড়তে পড়তে বুঝতে পারি এইসব মেয়ের নতুন নতুন নামও দিয়েছে গণেন্দ্রনাথ। একদা গৌরনদী তাঁর দেশ ছিল। সেখানে চল্লিশ বছর পরে প্রায় আশি বছর বয়সে গিয়ে কয়েকটি কিশোরীর মনে তার ভাব পড়েছে।

এর ভেতর একখানা চিঠি গৌরনদী স্কুলের হেডমাস্টারের। তিনি সার্টিফাই করছেন-


প্রধান শিক্ষক ও সম্পাদকের কার্যালয়
গৌরনদী ঈশ্বরচন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় (বহুমুখী)
স্থাপিত--১৯১৫
ডাকঘর--গৌরনদী জিলা-বরিশাল

This is to certify that Shree GanendranathMukhopadhyay S/o Late ParbaticharanMukhopadhyayVill+ P.O. Gournadi, P.S/Vpa-ZilaGournadi in the District of Barisal at present is residing at 79, Saktigarh Colony, Calcutta.

He is collecting date of the Muslim families to write a novel and history of Barisal. He was related with the Muslim families of the district of Barisal. I wish him success in life.




এক টুকরো কাগজে গণেন্দ্রনাথ নিজের পরিচয় পয়ারে লিখেছেন

গণেন আমার নাম
বরিশাল গৌরনদী ধাম
অতিবলশালী সুন্দর সুঠাম দেহ
দু-চার গ্রামের লোক মল্লযুদ্ধে পারিত না কেহ
পিতা পার্বতী মাতা সুরধনী
পেশা ছিল তালুকদারী



এই নেন- বিস্কুট খান।

বললাম, কী দরকার ছিল। আপনার স্ত্রী শয্যাশায়ী।

সেরিব্রালের পর পক্ষাঘাত। অ্যাতোটুকু হইয়া গেছেন। ছেলেরা দুধের যোগান করিয়া দিচ্ছে। কখনো ভাবি নাই অ্যাতোটুকু বাড়িতে থাকব। শ্রীহট্ট দেবে না বলিয়া সেখানে গণভোট করল। কিন্তু ভারত ভাগের সময় আমাগো কাউরে জিজ্ঞাসা করে নাই। দার্জিলিঙে থাকতে ওরা মেজরিটি বলিয়া জায়গাটা ওদের যদি হয় - তাহলে ইংল্যান্ডে যে জেলায় বাঙালিরা সাহেবদের চেয়ে বেশি - সে জেলার নাম হউক বাঙালিল্যান্ড। কি বলেন? একদিন দেখবেন দার্জিলিং নেপালের জেলা হইয়া যাইবে। কেউ আটকাইতে পারবে না। আমি প্রতিবাদ করিয়া মুখ্যমন্ত্রী দপ্তরে একখানা চিঠি দিয়া আসছি। রশিদ দিছে চিঠির। আনন্দবাজার, যুগান্তরেও চিঠি দিচ্ছি। আসলে বাঙালিরে মাথা তুইল্যা উঠতে দিবে না। নেহেরু চাইরবার আই.সি.এস. ফেল করিয়া শেষমেষ ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন। নেতাজি একবারে আই.সি.এস পাশ করিয়া হারাইয়া গেলেন। বাঙালি প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক কুসুমকুমারী দাসী আমাগো গৌরনদীর জমিদার অমিয় বাবুর ভগ্নী। তিনি প্রেমলতা আর উদ্যানলতা নামে দুই খানা উপন্যাস লিখিয়া রাখিয়া দেন। ছাপান নাই। আর রবীন্দ্রনাথ নিজের দিদি স্বর্ণকুমারীর নামে চাইরখানা উপন্যাস লিখিয়া ছাপাইয়া দিলেন। অমনি তিনি হইলেন প্রথম ঔপন্যাসিকা। ভাগ্য। সবই ভাগ্য!!

বললাম, এসব কাগজপত্র দিন। বাড়ি নিয়ে গিয়ে পড়ব।

বেশ তো। পড়েন। উপন্যাস দুই ভান্ড দিই? পরিষ্কার হাতের লেখা না। উপন্যাস থাক। এই চিঠিপত্র পড়ি আগে। পড়ি গৌরনদী থানার ইতিহাস। পড়েন। একটু সংশোধন করিয়া দিবেন। পড়িয়া তো বোঝতেই পারবেন- কালের বিচারে টিকিয়া থাকতে পারব কিনা। ভবিষ্যতের মানুষ আমার এইসব লেখা পড়বে কিনা-দেখি।

দয়া করিয়া এই একসারসাইজ বুকখানাও পড়বেন। অসবর্ণ বিবাহ-- কুলিনপ্রথা নিয়াও প্রবন্ধ লিখছি।

দিন।

এরপর আনানো অনেক ধরনের মেঘ এলো। নানা ধরণের বৃষ্টিও যেন হল।

সামনে পুজো। পুজোর সময় আমাদের কোন ও দেশ নেই যে সেখানে যাব। সবই সার্বজনীন। পাড়ার পেশাদার সার্বজনীনের দল যেমন পুজো দেবে তেমন পুজোই আমাদের নিতে হবে। দেশের পুজো বলে আর কিছু নেই আমাদের।

জমা নেওয়া পুকুরে নৌকা ভাসিয়ে জমা নেওয়া পুকুরে নৌকো ভাসিয়ে সুধীর মাছ ধরে সকাল থেকে। নৌকায় বসে আমিও সকাল থেকে গণেন্দ্রনাথের কাগজপত্র পড়তে থাকি।


পূজনীয় দাদুমহাশয়,

...আমাদের চিঠি না পেয়ে এতদিন কেমন লাগল? হয়তো বা ভেবেছেন বকুল নামের মেয়েটি আপনাকে ভূলেই গেছে। আপনার দেওয়া দুখানি পোষ্টকার্ডের একখানাও আমরা পাইনি। আপনি নাকি মাঘ মাসে আসিবেন। আসিতে ভুল করিবেন না। আপনার জামাই হয়তো এ মাসের শেষের দিকে জাহাজ ভ্রমণে বিভিন্ন দেশে যাবে। তাই এখনো পর্যন্ত আমার তাদের বাড়িতে যাওয়া হয়নি। তবে ভ্রমণে যাওয়া হলে সেখান থেকে ফিরা হলে পরে আমাকে তাদের বাড়িতে নিবে। তবে না যাওয়া হলে এই জানুয়ারিতেই একটা সিন্ধান্ত হবে। জাহাজ কিন্তু ভারতে যাবে। খুঁজে বের করতে পারবেন কি?

চিঠি পাওয়া মাত্র উত্তর দিয়ে সুখী করবেন। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।

স্নেহের বকুল

[বকুলের স্বামী জাহাজে করে বোম্বাই যাচ্ছে। এখনো সে বকুলকে নিজেদের বাড়িতে নেয়নি।]




Village :Ramjankathi

শ্রদ্ধেয় দাদুভাই,

আপনার পত্রখানা কয়েকদিন আগে পেয়েছি। কয়েকদিন আগে খুব জ্বর হওয়ায় উত্তর দিতে পারি নাই। আপনি আমাকে বাংলায় অনার্স পড়তে বলেছেন কিন্তু বাংলায় আমার নম্বর কম।
আপনার দেয়া নামগুলোর সবগুলেই ভালো। তাই আপনি যে নামেই ডাকেন সে- নামেই আমি খুশি হবো। আপনি জানতে চেয়েছেন আমার গায়ের কি রং। আমি কালো। তবে আমার মনের রং কালো নয়! আপনি দেশে আসার সময় আমার জন্য একটা লাল টুকটুকে শাড়ি নিয়ে আসিবেন। অনেকদিন ধরে শাড়ি পরার খুব শখ। আমি বর্তমানে পাজামা পরি। ইতি- রীনা।



পূজনীয় দাদুমহাশয়,

আমি H.Scপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি। আমি BA ক্লাশে ভর্তি হতে চাই। আপনি আমাকে ওখানে বসে পড়তে বলেছেন। কিন্তু তা কি সম্ভব? আমি যে নারী। তাছাড়া এখন পিতৃগৃহ হতে অপর গৃহে পদার্পণ করেছি। আপনি জানতে চেয়েছেন- আমার স্বামী আমাকে কোনও তহবিল করে দিয়েছেন কি? দাদু সে তার সামর্থ্য অনুযায়ী যতটুকু পারেন ততটুকু দিতে চেষ্টা করেন বা দেন। তবে আপনি তাকে বললে আরো ভালো হবে। ঈদের সময় আপনার আসার কথা ছিল। এবং তাহারও আসার কথা ছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত কেহই এলেন না। আমাকে ফাঁকি দিয়াছেন। যাক আপনার জামাইবাবু ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে এক মাসের ছুটিতে দেশের বাড়িতে আসবে। ওই সময় আপনিও আসবেন।

আপনার নিমন্ত্রণ রইল। ওই সময় আমি আপনাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাব।

স্মৃতির দুয়ারে দাঁড়িয়ে যদি মনে পড়ে মোর নাম
ক্ষণিকের তরে-দিবেন দাদুগো মোর লেখাটুকুর দাম।

আমাদের জন্য খোদার কাছে প্রার্থনা করিবেন।

তসীবা রশীদ
(বকুল)




দাদুভাই,
কলিকাতা আপনার কিরূপ লাগে? আমাকে কলিকাতা নিবেন কিনা জানাবেন। দেশে কবে আসিবেন তাহা জানাবেন। আমার জন্য দোয়া করবেন। আমার ডাক নাম রীনা। খাতায় লিখি- আসফিয়া সুলতান। আমি এ বছর H.Scপরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করিয়াছি।

আপনারই অপরিচিতা দাদী

REENA



পূজনীয় দাদু,
আপনি খুব ভালোবাসেন এবং আমারও বাসি। তাই ফুলপাতা এঁকে এই কাগজটুকুতে আপনাকে লিখছি।

যখন আবার ফিরে আসবেন এই সবুজ শ্যামল বাংলায় তখন আমার জন্য একটা সুন্দর শাড়ি এবং সেন্ট ও গলায় পরার জন্য একটা চেইন আনিবেন। মনে থাকবে তো দাদু? সুদূর ভারতে বসে আমাদের কথা স্মরণ করেছেন। এজন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আবার বলি আমার জিনিসগুলো অবশ্যই আনিবেন।
বকুল

মোসাম্মত আফ্রোজা সুলতানা-কল্পনা

রামজানকাঠি
ভরসাকাঠি
বরিশাল




শ্রদ্ধেয় দাদুভাই,
শ্রদ্ধাপূর্ণ সালাম ও কদমবুসি নিবেন।

পরম করুনাময় আল্লাহপাকের অশেষ রহমতে ভালো আছেন। নিজের দাদুকে দেখি নাই। আপনাকে দেখিয়া মনে হলো বৃষ্টি যেমন মৃত জমিনকে সতেজ ও সরস করে- আপনিও সেইমতো আমাকে করিয়াছেন।

আপনার সঙ্গে পরিচয়ের পর ভাবতাম-কেনই বা দেখা হলো! আপনার মতো মানুষের সঙ্গে কখনো পরিচয় হবে ভাবিনি।

আপনি জানতে চেয়েছেন আমার জন্য কি কি জিনিস আনিলে আমি খুব খুশি হবো। তাই নয় কী? তাহলে এবার শুনুন-

(১) আমার মায়ের জন্যে একটি সাদা শাড়ি (২) ভালো দেখে তিনটা সেন্ট (৩) আমার জন্য একটা ভ্যানিটি ব্যাগ- এবং একটি শাড়ি-যা পরলে আমায় খুব মানাবে- আমি এই প্রথম শাড়ি পরব (৪) বিউটি বক্স হবে ২টা (৫) রাইটিং প্যাড (৬) বিভিন্ন রংয়ের ঝর্ণা লাচি সূতা দুই ডজন (৭) গলার মালা, কানের বালা, হাতের চুড়ি (৮) লিপস্টিক গোলাপি ও লাল রঙের-দুইটা, কারণ, আমার ছোট বোন আছে। শীতের জন্য স্নো, ক্রীম যেটা ভালো মনে করেন-ইতি

শেফালি


এই শেফালিই তার দাদুকে লিখছে-

আপনাদের ওখানে কি মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবার আছে? যাদের সাথে আমাদের আত্মীয়তা হতে পারে। যে পরিবেশে আমাকে মানাবে। তাহলে হয়তো আমার জীবন আপনার সহাতায় প্রস্ফুটিত হতে পারে। বুঝলেন তো?

তাছাড়া আত্মীয় না হলে তো আর ওখানে যাওয়া সম্ভব নয়। আবার রাগ করবেন না। আপনিও কিন্তু আত্মীয়। সবাই চায় আমার বিবাহ হউক। কিন্তু আমি চাই আমার বিবাহ যখন অতি নিকটে হবেই না তখন বাংলাদেশের বাহিরে হউক যেখানে খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে। এবং যেখানে বসে বিবাহের পরেও পড়াশুনা করতে পারি। আমার মনটা এখন দুঃখে ব্যথায় ভেঙে চুরমার হতে চলেছে। তাই দিশেহারা। কারণ, আজ আমার সকল আশা মিছে হলো- যেহেতু আমার পড়াশুনা বন্ধ।


কদিন বাদেই শেফালির চিঠি-

দাদু, আপনাকে আগের চিঠিতে যাহা লিখেছি তাহা যেন এরা কেহ না বুঝতে পারে যে আমি আপনাকে বলেছি। আমার ঠিকানা- পিতা মৃত আবদুর রহিম হাওলাদার, প্রযন্তে, করিম আমেদ, রমজান কাঠি, ভরসাকাঠি, গৌরনদী, বরিশাল, বাংলাদেশ। করিম আমেদ আমার মেজোভাই।

বলতেও লজ্জা লাগে, তবু মায়ের আদেশ- যদি সম্ভব মনে করেন- তবে মায়ের জন্য ১টা লোহার কড়াই নিয়ে আসবেন।

আমার জন্য দোয়া করবেন। আর ওই ব্যাপারে আপনি নিজে বুঝবেন এবং আমাকে ইঙ্গিতস্বরূপ হ্যঁ বা না জানাতে ভুল করবেন না।


[তার মানে আপনাদের ওখানে কি মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবার আছে? ... যে পরিবেশে আমাকে মানাবে।]



আবার শেফালির চিঠি-

... না জানি দাদুর অসুখ হলো কী?ভালো থাকুন-সুস্থ থাকুন- এই দোয়া করি খোদার কাছে। প্রত্যহ দিন ভাবতে থাকি-আগামী দিন অবশ্যই দাদুর দেখা পাব। কিন্তু কই? দাদু কি আসবেনই না? এভাবে ভাবতে ভাবতে আমি কী একটা ভাবুক হয়ে যাব? জবাব দিন। চুপ করে আছেন কেন?



আবার শেফালি-

আপনি যে উপদেশ গুলো দিয়েছেন- ওটা আমিও বুঝি বা ওভাবে আমিও চিন্তু করি। কিন্তু কী যে করব তাই ভেবে দিশেহারা। ভেবেছিলাম ওকে এড়ায়ে চলা যায় কিনা- যে কারণে প্রথম পত্রে আপনাকে ওভাবে লিখেছিলাম। ভাবছিলাম অনেক দূরে চলে যাব। কিন্তু দেখা যায় কোনো মতেই উনি আমাকে ছাড়ছেন না। এমতাবস্থায় আমি এখন সব দিকের চাপের মধ্যে কোনোরকমে বেঁচে আছি। আমি এখন কোন পথ ধরব, কী ধরব, কী নিয়ে বাঁচব কিছুই বুঝি না। তবে সবচেয়ে দুঃখ লাগে পড়াশুনার জন্য। আবার একথাও সত্য, ওকে ছাড়লে আমি অন্যত্র গিয়ে সুখী হতে পারব কিনা সন্দেহ। এখন সবচেয়ে ভালো হতো যদি আমার মৃত্যু হতো বা হয়। তবে ওই লোক চায় B.Sc. পাশ করিবে, ভালো একটা চাকরি নিবে, তারপর বিবাহের ব্যবস্থা।

কিন্তু আমার এরা আমাকে অন্যত্র বিবাহ দেওয়ার জন্য ব্যস্ত। যে কারণে এমন ঘোলাটে অবস্থা। এখন আমি কী যে করিতে পারি কিছুই বুঝি না।

ওই লোকটির ঠাকুরদাদা ও ঠাকুরমা কত বয়সে মারা গেছেন তাহা আমার অজানা। এবং ওনারা প্রকৃত ভূখন্ডের লোক। লোকটি স্বাস্থ্যবান নয়। গায়ের রং শ্যামবর্ণ। আমার অভিভাবকগণ অমত প্রকাশ করেন। শুধু পাশাপাশি গ্রাম বা খুবই নিকটে, তাই বুঝলেন? দাদু আপনার উপর স্থির বিশ্বাস আছে এবং শেষ আত্মবিশ্বাস রেখে বা করে আপনার উপর রেখে দিলাম। অত্র জগতের ভবিষ্যত নষ্ট করবেন না অনুরোধ গোটা বিশ্বের। খোদা হাফেজ।

আপনার স্নেহের রানী


শেফালি আবার-

আপনাকে আমি অনুরোধ করে বলি- আপনাকে যে আমার গোপন কথাগুলো বলেছি তাহা যেন আমার এরা কোনওদিন না বুঝতে পারে। সেইভাবে আমাকে লিখবেন। কারণ, অনেকসময় আপনার পত্র এলে সবাই দেখতে চায়- তখন আমার বিপদ ছাড়া আর কী? অথবা গোপন কথা ভিন্ন একটা কাগজে লিখবেন যেটা আমি গোপন রাখতে পারি। বুঝলেন তো?

আর, ভালো কথা- ওই লোকের লেখা আপনাকে লেখা একটা পত্র পাঠালাম। ফের শুনলাম- আমার জন্য একটা শাড়ি (লাল) কিনেছেন। কী রঙের পাড়ে?

নাতনী শেফালি


আবারও--

আমি এখন আর পিত্রালয়ে নেই। সুতরাং সেখানে আর কোনওদিন আমাকে পত্র লিখিবেন না। দাদু, মন মানসিকতা খুব একটা ভালো না।

পত্র পাওয়া মাত্র এই ঠিকানায় লিখিবেন- সময় হলে ২।৩ টা শাড়ি আনবেন।

ঠিকানা
পোঃ বাবুল
এম হক বাবু
৭/৩ কমলাপুর, ঢাকা।


বাবুলের চিঠি--

প্রণামান্তের আমি এক অভাগা পাপী আপনার দ্বারে হাজির। জানি না কে আপনি। অনেক গল্প শুনেছি আপনার-মনে হয় আপনি একজন জ্ঞানী-অন্যদিকে, একজন কবি বা সাহিত্যিকও বটে। ..আপনি যাকে এতো আদর, স্নেহ, ভালোবাসা দিয়ে মানুষ হওয়ার বানী শুনাচ্ছেন-আপনার সেই ফুলের রানী শেফালিকে আমি ভালোবাসি। পরীক্ষা আগস্ট মাসে। দোয়া করবেন। এক সম্ভাবনাময় জীবন নিয়ে খোদা প্রদত্ত পথে ধাবমান।


আবার শেফালি—

পড়া বন্ধ থাকার কারণ হলো এই-আমি একজনকে ভালোবাসি বা তার প্রেমে পড়েছি। দাদু, কথাগুলো লিখতে বড্ড লজ্জা লাগছে। তবুও লজ্জা করে বসে থাকলে চলবে না। দাদুর সহায় চাই।

প্রথম যখন প্রেম শুরু তখনই আমার মেজ ভাইকে নদীর পাড়ে নিয়ে সব কথা খুলে বলেছি। দাদা আশ্বাস দিয়ে বলেছে-হবে-তবে সময় সাপেক্ষ। তার কথার উপর নির্ভর করে আমি ওই লোকের সাথে কঠিন শপথ করি।

সে শপথের জ্বালা ভোগ করিতে হইবে কেয়ামত পর্যন্ত।–যদি তাকে বিয়ে না করি। ওই লোকটির পিতা ব্রাহ্মণদিয়া স্কুলের বর্তমান হেডমাস্টার মৌলভী ছাদাম হাওলাদার। সে সংসারে বড় ছেলে। নাম-আব্দুল লাতিম (বাবুল) আগামীতে বিএসসি পরীক্ষা দিবে।

ওই লোককে না পেলে আমার পড়াশুনা আর হবে না।

দাদু- আমার একটা পাউডারের প্রয়োজন। কড়াইটা বলিয়া দিলাম-মায়ের তরকারি রান্নার জন্য।



চিঠিগুলো পড়ে অবাক হই। গৌরনদীর কয়েকজন কিশোরীর কাছে গণেন্দ্রনাথ নামে এই ৭৭ বছর বয়সের বৃদ্ধ সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য। কলকাতার কলোনীর বাসিন্দা যে কিনা পাসপোর্ট ভিসা করে বছরে বছরে নিজ ব্যয়ে গৌরনদীর যায়-দরিদ্র-তার কাছেই গৌরনদীর এই কিশোরীদের সব বায়না।


বাবুলকে গণেন্দ্রনাথের লেখা চিঠির নকল থেকে খানিকটা—


আমার শেফালি রানীকে আমি স্বয়ং যেমন ভালোবাসি তুমিও ভালোবাস। তাহলে শেফালিরানী ডাবল ভাগ্যবতী। রানী তো এখন দোটানায় পড়ে গেলো। একদিকে আমি-অন্যদিকে তুমি।

...তাই বলি বাবুল-দেবীকে কোনওসময় মনঃকষ্ট এবং মনঃব্যাথা দিবে না। দেখেন ভাই, আমি উপন্যাস ও কবিতা লিখি। তাই নাতি ও নাতঘরনীকে নিয়ে একটু রসিকতা করিলাম। যত্নে রাখিও-অতি যত্নে রাখিতে পারিলে ওর কাছ হতে সম্ভবত ফল লাভ করিবে।

রমজানকাঠির এইসব গ্রামের মালিক আমার পিতা পার্বতীচরণ ছিলেন। শেফালি রানীল দাদু মরহুম আপ্তাজদ্দি হাওলাদার আমাদের প্রজা ও কর্মচারি ছিলেন। আমার ৯/১০ বছর বয়স হইতে ঘটনাচত্রে আমরা দুইজনে বন্ধুতে পরিণত হইয়াছিলাম। আপ্তাজদ্দি খুব সৎ ও দয়াময় বিশিষ্ট লোক ছিলেন।



শেফালিকে কবি গণেন্দ্রনাথ লিখছেন—

এখানে থাকিলে তোমাকে সাজাতাম, কিরুপে শুন! একখানি মানানসই আড়ং ধোলাই নীলবসন শাড়ি পরায়ে ঝলমলে তোমার মোলায়েম চুলগুলি দুটি বেনুনি বেধে তাহার অগ্রভাগে দুটি লাল জবাফুল বেধে দিয়ে স্কন্ধের দুপাশ দিয়ে বক্ষোপরি ঝুলিয়ে দিতাম। ভ্রুলতা দুটি অঙ্কন করে নেত্রকোণে সুরমারেখা, ওষ্ঠোদ্বয়ে বিল্বফলের রঙ-কন্যে স্বর্ণের ঝুমকোলতা দুলিবে।

... যাই হোক উপরোক্তভাবে তোমাকে সাজিয়ে আমার সম্মুখে দাড় করিয়ে নয়ন ভরিয়া দেখি এই তো আমার বাসনা। এমন দিন কী হবে?

তোমাকে এতো ভালো লেগেছে কারণ, মনের গভীর তলদেশের ভালোবাসার সুক্ষ্ণতম অনুভূতি তুমি অনুভব করিতে সক্ষম।–যাহা বহু বহু জাতিবর্ণ নির্বিাশেষে মেয়েদের পক্ষে সম্পূর্ণ অসম্ভব। তোমার অন্তরের সৌন্দর্য, মাধুর্য, লাবন্যে আমি মুগ্ধ, মোহিত।

তাই মনে দুঃখ আমার যৌবনকালে তোমার সান্নিধ্য লাভ করিতে পারিলাম না।



(গণেন্দ্রনাথের যৌবনে তো শেফালি এই পৃথিবীতে আসেনি। তারমানে শেফালিও যদি সেই যৌবনে আসতো। গণেন্দ্রনাথের স্ত্রী আজ বহুদিন বেড রিডন)

তোমার কাছে পত্র লিখে বেশ আনন্দ উপভোগ করি-যে আনন্দ অপরের কাছে হতে পাওয়া যায় না। আরেকটি আমার কথা বা উপদেশ রক্ষা করিতে হইবে। যাহাতে ২/১ বছরের মধ্যে মা না হও। এত অল্প বয়সে বুড়ো হতে যেও না। সাবধান। সতর্ক মতো চলিবে। আমার যখন ২০ বছর বয়স-আমার স্ত্রীর ১৩ বছর বয়স। তখন বিবাহ হইয়োছে। আমার স্ত্রী ২০/২১ বছর বয়সে প্রথম সন্তান লাভ করেছে। আমরাও সাবধান সতর্কমতো চলিতাম। আমি তোমার সহিত দেখা করিতে বিশেষ চেষ্টা করিতেছি।

গণেন্দ্রনাথের বাড়ি জানলা দিয়ে তাকিয়ে দীঘির ওপারেই বৃষ্টি-ভেজা শক্তিগড়ে দেখতে পাই। আধখেচড়া কয়েকটা বাড়ি। চল্লিশ বছরে কিছুটা চেহারা পেয়েছে। ওখানে গণেন্দ্রনাথ থাকে। প্রায় আশির কিনারায়পৌছে তার প্রাণে এখনো এতো আনন্দ। মৃত্যুচিন্তার ছিটেফোটাও নেই কোথাও। শেফালিকে চিঠি লেখার সময় যেন-বা তরুন যুবক। অথচ সে শেফালিরই ঠাকুর্দা মরহুম আপ্তাজদ্দি হাওলাদারের বাল্যবন্ধু।


চিঠিগুলো গণেন্দ্রনাথের বড় যত্নের। ফেরত দিতে গেলাম। টিপ টিপ করে বৃষ্টি হচ্ছিল। আজ যেন গণেন্দ্রনাথ কিছু উদ্ভ্রান্ত। চোখের নীচেটা ফোলা। বেশ ক’দিন দাড়ি কামাননি। সুঠাম কাঠামো থেকে মাংস ভীষণভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। বললাম, ঘুম হয়নি নাকি?

ঘুম কোথার থিকা হবে। ছেলেদের বললাম-লোহা, বালি, ইট, স্টোন-চিপ সব কিনিয়া রাখছি। তোমরা শুধু সিমেন্টটা কিনে তেতলাটা কর। তা বড়জন বলে------ পারবে না।

চাকরি করে তো বড়জন।

হ।১৫/১৬ বছর চাকরি। দুই হাজার টাকার বেশি মাহিনা পায়। আবার বলে-তুমি বিদায় হও।

কে?

মানে আমাকে বিদায় হতে বলে। তেতলা করলে ভাড়া দিলে টাকা আসতো। আমার কিসে চলে বলেন?

কিসে চলে?

এক তলায় একখানা ঘর ভাড়া দিয়ে তিনশো টাকা আসে মাসে। তার দেড়শো টাকাই যায় ইলেকট্রিকবিলে। দেড়শো টাকায় আমার চলে? শেষে বয়সে অন্নকষ্টে পড়বো ভাবি নাই।

ছেলেরা তো দেখে।

মেজবউমা ভালো। তাদের সঙ্গে খাই।

মেজবউমাটি ভালো তাহলে?

হ। বরিশালিয়া গার্ল। স্বঘরে বিবাহ হইছে। বড়টি তো অসবর্ণ বিবাহ। অসবর্ণ বিবাহে কখনো সুখ-শান্তি আসেনা।

অবাক হই। যে লোক মুসলমান কিশোরীকে দাদু হিসেবে মনে মনে নায়িকা ভাবে সে কী করে কুলিন, অসবর্ণ এসব নিয়ে মাথা ঘামায়।

রামায়ণ-মহাভারতের রাস্তা দিয়েই বাড়ি ফিরি। সাবেক দিঘিটা জলে টইটম্বুর। পাড়ের পাতিঘাস বর্ষা খেয়ে খেয়ে সতেজ, নধর। একটা বাতিল জার্সিগাই তিন রাস্তার মোড়ে অনেকটা জায়গা নিয়ে বসে। চোখে তার স্বদেশকে মনে পড়ার বৃথা আয়োজন। রিকশা সাইকেল-ওয়ালাদের ঘাটিতে কী এক বারের পুজোর মাইক বসেছে। তাতে বিদেশি সুরে দিশি গান। আমি কিছুই মেলাতে পারি না। বাড়ি ফিরে এসে বিবিধ প্রসঙ্গ নিয়ে ওর খাতাখানা খুলি!

অসবর্ণ বিবাহ এবং পরবর্তী ফলাফল

নিম্নবর্ণের ছেলেগণ মনে করে যে উচ্চবর্ণের মেয়ে বিবাহ করিলে ঔ স্ত্রীর গর্ভের সন্তানদের মধ্যে উচ্চবর্ণের ছেলে-মেয়েদের ন্যায় হইবে। তাই যদি হয় তবে বাখরগঞ্জের অতি উর্বর জমিতে আই আর ধাণ্যের বীজ বপন করিলে কি বালাম উৎকৃষ্ট ধাণ্য উৎপন্ন হইবে?

নিম্নবর্ণের মেয়ে যদি উচ্চবর্ণের ছেলে বিবাহ করে তাহা হইলে অপুষ্ট বিকৃত মেধার সন্তান লাভ করিবে। যেমন অনুর্বর জমিতে যদি উৎকৃষ্ট ধাণ্যের বীজ বপন করা হয় তবে পরিশেষে দেখা যায় অপুষ্ট অসারমুক্ত জামিতে নিম্নমানের নিকৃষ্ট ধরণের চিটা ধান্য উৎপন্ন হইয়াছে। উক্ত ধান ঢেকিতে ভানিলে চাউল গুড়া গুড়া হইয়া খুদে পরিণত হয়।

বহুলোক আছেন তাহারা কৌলীন্য প্রথাকে নিন্দা করেন। আবার জমিদারি প্রথাকেও নিন্দা করিয়া থাকেন। যাহারা নিন্দা করেন তাহাদের বংশের সন্তান এবং জমিদার ও কুলীনদের বংশের সন্তানদের মেধা তুলনা করিয়া দেখিবেন।



এই পর্যন্ত পড়ে বুঝলাম, এই গণেন্দ্রনাথকে সংশোধন করা দুঃসাধ্য। আমাদের দেশে বড় বড় সংস্কারের সামনে ছিলেন বহু বন্দোপাধ্যয়, মুখোপাধ্যয়। তারাই গণেন্দ্রনাথের এই বাতিকগ্রস্থ চিন্তা-ভাবনা নস্যাৎ করে গেছেন।

গণেন্দ্রনাথের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসবার সময় তার অনুরোধ ছিলো-আমি যেন লেখাগুলি ঘষে-মেজে দিই। তিনিই বলেছিলেন- আজকাল এসব নিয়ে মাথা ঘামাবার লোকও কমিয়া গিয়াছে। তার মানে এই দুনিয়ায় গণেন্দ্রনাথ-জাতীয় মানুষ আর বিশেষ অবশিষ্ট নেই। যাও বা দু-চারজন ছিল-তারা মরে বেচে গিয়েছে।

আরেক জায়গায় গণেন্দ্রনাথ লিখেছে-বঙ্গদেশ হইতে ইংরেজকে বিতাড়ণের প্রথম বীজ বপন করেন মহারাজ নন্দকুমার নিজে ফাসিকাষ্ঠে শহীদ হইয়া।

সনাতন ধর্ম শিরোনাম দিয়ে গণেন্দ্রনাথ লিখেছে-

মেয়েদের পুষ্পবতী হওয়ার পুর্বে বিবাহ হওয়ার রীতি, কারণ প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণের সময় সন্তানের জননীর মৃত্যুর ভয় থাকে না। এবং মেয়েদেরও অসৎ পথে পা দেবার সুযোগ হয় না। স্ব-সম্প্রদায়ের ও সম-পর্যায়ের সহিত বিবাহাদি কর্ম সুসম্পন্ন হওয়ার রীতি। লাইফ ইন্সুরেন্স-এর নিয়ম বিশ বছরের মধ্যে প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণের সময় সন্তানের মাতার মৃত্যু হইলে দাবিকৃত সমুদয় টাকা পাইবেন। ইহাও বিজ্ঞান সম্মত। আজকালের জামানায় বালিকা থাকাকালীন অবস্থায় বিবাহ হয় না। মহিলা হইলে বিবাহ হয়।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ প্রবন্ধটির শুরু এইভাবে--রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পিং দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। জন্ম ১২৬৮।


আরেক জায়গায় লেখা-ধনাৎ বিদ্যা গরীয়সী।

‘হিন্দি ভাষার প্রভাব ও জৌলুস’ প্রবন্ধের শুরুতে লেখা-হিন্দি কোনো ভাষা নহে। কারণ জাতি হইতে ভাষার উৎপত্তি। বাঙ্গালি, তামিল, গুজরাটি ইত্যাদি সবাইকে লইয়াই যে হিন্দুস্থান। হিন্দি নামক বর্ণমালা নাই। মাতৃভূমির নাম নাই।

নারী জাতি প্রবন্ধের এক জায়গায় গণেন্দ্রনাথ লিখছেন—

এই সংসার কাননের বৃক্ষ পুরুষ। নারীগণ পুষ্প। সৌন্দর্যের প্রকাশক।


পড়তে পড়তে মনে হয় বুঝি-বা গম্ভীর কোনো সত্য জানলাম। কিন্তু তারপরই দেখি-দেশবিভাগ, দারিদ্র, অজ্ঞাতজনিত কারণে একজন মানুষের লেখায় যতসামান্য যা ঝিলিক থাকতে পারে-শুধু তাই আছে গণেন্দ্রনাথের লেখায়। বাকি সবটাই কু-যুক্তি। অযৌক্তিক কলোনি মার্কা বাঙ্গালিয়ানা-যার কোন ভিত্তি নাই-তাতে লেখাগুলি ভরা।

যেমন : হিন্দিতে নাকি তেমন সাহিত্য নাই। গণেন্দ্রনাথের খবর রাখার কথাও নয়। নেহরু নাকি এক ভোটের গরিষ্ঠতায় হিন্দিভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিয়ে গেছেন-ইত্যাদি। কথায় কথায় গণেন্দ্রনাথ বলেন, যার পয়সা আছে-সে একাধিক বিয়ে করুক। আমাদের সমাজে মেয়েরা এভাবে উদ্ধার হবে। যার অঢেল পয়সা তার পক্ষে বহু বিবাহ কোন দোষের নয়। বাল্যবিবাহ অতি উপাদেয়। জমিদার আর কুলীনরা ছিলো বলেই মহাপুরুষরা এদেশে জন্মেছে। আর পণপ্রথা তো খুবই ভালো। প্রথাটা আছে বলেই তো কু-রূপারাও বিয়ের পিড়িতে বসতে পারছে।

বল্লাম, যাদের পণ দেবার টাকা নাই, তাদের কি হবে?

গণেন্দ্রনাথ বলল, যাদের আছে-তারা তো বিয়ে হয়ে তরে যাচ্ছে।

তাহলে নারীর কোন সম্মান নাই!

নারীর বড় সম্মান বিয়ে এবং তারপর সন্তান ধারণে।

গণেন্দ্রনাথ ব্রাহ্মণের শরীরে বিশেষ কাঠামো দেখতে পান। তার রক্ত এবং মেধাও নাকি আলাদা। আর এই রক্ত ও মেধাকে অসবর্ণ বিয়ের আঁচ থেকে বাঁচিয়ে পবিত্র রাখতে হবে। এটাই তার সনাতন ধর্ম। রবীণ্দ্রনাথের বাবা তার কাছে পিং দেবেন্দ্রনাথ।

অথচ এই মানুষই আবার গৌরনদীর স্কুলে কযেকটি কিশোরীর কাছে বড় আপনার দাদু।

ব্রাহ্মণ, অ্যাংলো-স্যাকসন আর হিটলারের ভাবনা একটা ব্যাপারে একই খাতে চলেছে। তা হলো : আমাদের খাটি রক্ত।

এ রক্তের চেয়ে আলাদা। এ রক্তকে আলাদা কর বাচিয়ে রাখতে হলে বাইরের রক্তের সঙ্গে বিয়ে-সাদি চলবে না। আমাদের অস্থিমজ্জা চেহারা সুরত সর্বশ্রেষ্ঠ। অন্যের চেয়ে ভিন্ন।

এদের ইংরেজিতে বলা হয় শুয়োরের বাচ্চা। বাংলায় বলা হয় জাতবিরোধী। শুদ্ধাচারী। বর্ণাশ্রমী। গণেন্দ্রনাথ এদেরই একজন।

তার কাছে সারাটা উনিশ শতকের সংস্কার আন্দোলন সর্বৈব মিথ্যা। জাতিগর্বে টইটুম্বুর গণেন্দ্রনাথ সেই দেশের স্বপ্ন দেখে-যা কিনা চল্লিশ বছর হলো আর নেই। আমাদের বসতি আর শক্তিগড়ের মাঝামাঝি সাবেক দিঘি বর্ষার জলে কানায় কানায়। নানারকম পাখি এসে বসে ডুমুরের গাছে। জল ওঠায় সাপও উঠে আসে। গৃহস্ত বাড়ি থেকে ডিমভাজা আর খিচুড়ির গন্ধ।

ভিজে রাস্তার পাড়ে গণেন্দ্রনাথ দাড়িয়ে। দিঘির জলে চোখ। চওড়া কাধ। গায়ের পাঞ্জাবি-ধুতি বেশ ময়লা। গালে-মাথায় সাদা দাড়ি আর চুল ভুল ভুল করছে। পায়ে টায়ার কাটা রবারের চটি। টিকালো নাক। চোখ পুষ্টির অভাবে কোটরে।

কী অতো দ্যাখেন মুখুজ্যামশায়?

একটা শৌল মাছ।

এতোদুর থেকে দেখতে পান? জলের ভেতর?

নবান্নর সময় দেশে শৌল ধরতাম। অরা পিঠের পাখনা উজাইয়া জল কাটে। জলের ঢেউ দেখিয়া বোঝতে পারি। আসাগো বরিশাল জিলা বড় সুন্দর জায়গা। শিকারপুরে তারাপীঠ। সেখানে তলৈঙ্গস্বামী গেছিলেন। জেলার একদিকে মেঘনা-আরেকদিকে ধলেশ্বরী নদী। অন্য বর্ডার ফরিদপুর আর বঙ্গোপসাগর। কীর্তনখোলার তীরে বরিশাল।

আপনার গৌরনদী কতদূর?

আর বিশ-বাইশ মাইল আগে। এখন যশোর থিকা রাত আটটায় বাসে উঠেন—আর ভোররাতে গিয়া গৌরনদী পৌছাইবেন। মাঝে দুইটি খেয়া পড়বে-

বাস থেকে নেমে যেতে হয়?

নাঃ! বাস সমেত বড় স্টিমার নদী পারাপার করে। তা সে গৌরনদী বন্দর তো আর নাই। নদী মজিয়া গেছে। আপনি গৌরনদী স্কতুলের শেফালি, রীনা ওদের শাড়ি পাঠাবেন লিখেছিলেন-আপনি জানলেন কি করিয়া?

আপনারই দেওয়া চিঠি-খাতাপত্র পড়ে।

পাঠাইছিলাম। দেশের একটি জ্ঞাতি ছেলের হাত দিয়া। ওখানেই থাকে। সে এতো দুষ্টু –কিছুই দেয়নি মেয়েগুলোনরে। আমার এতো মনোকষ্ট হইল। সারা জিলায় অতো দুষ্টু আর নাই।

ছেলেটিতো ব্রাহ্মণ।

আমার জ্ঞাতি ভাইপো।

তাহলে দেথুন-আপনি ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণ করেছেন সারা খাতায়-অথচ আপনারই পরিচিত ব্রাহ্মণ কেমন দেখুন।

দেবতাদের মধ্যেও খারাপ হয়। আপনি সময়ের পিছনের দিকে হাটছেন গণেন্দ্রবাবু। ব্রাহ্মণের রক্ত, মেধা, বুদ্ধি নিয়ে কথা বলছেন।

বলছি তো।

আজকের প্রথিবীতে ব্রাহ্মণ বলে আলাদা কিছু থাকতে পারে না। থাকতে পারেগুনী আর অপদার্থের প্রভেদ।

তবে বলতে চান সব মানুষ সমান?

বললাম, সব মানুষ সমান হতে পারে না। মানুষে মানুষে ভিন্ন। কিন্তু আলাদা করে কিছু লোককে শ্রেষ্ঠ বলে দেগে দেওয়া যায় না। স্রেফ জন্মসূত্রে-

গণেন্দ্রনাথ বললো, ভিন্নতা স্বীকার করেন। কিন্তু শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করবেন না। কেন? ব্রাহ্মণের রক্তই আলাদা।

এটা আপনার পাগলামি। ব্লাড ব্যাঙ্ক যখন রক্ত নেয়-তখন বি ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, শুদ্র বলে বাছবিচার করে? করে না। আবার ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে রক্ত এনে যখন কোনও ব্রাহ্মণ রোগীকে দেওয়া হয়-তখন কি ব্রাহ্মণের রক্ত কিনা দেখে নেওয়া হয়?

ব্লাড ব্যাঙ্ক গ্রুপ দেখে রক্ত নেয়। আপনার অ্যানালজি ঠিক হলো না।

আপনি ভ্রান্ত গণেন্দ্রবাবু। আপনি সময়ের উল্টোদিকে হাটছেন। আপনি সাম্প্রায়িক। আপনি ব্রাহ্মণ্য হামবড়াতেই গেলেন।

প্রায় আশি গণেন্দ্রনাথ। দিঘির পাড়ে দু-পা শূণ্যে তুলে প্রায় একটা লাফ দিয়ে বললেন, আপনি ভ্রান্ত। আমি শ্রেষ্ঠত্বের স্বপক্ষে। আমি গৌরনদীর মানুষ।

আমি আমার গ্রামরে ভালোবাসি। ভালোবাসি জেলাকে। পলাশির যুদ্ধের পর ১৮৬৫-তে আমার জিলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীল অধীনে আসে। ১৮৯০ সানে বরিশালে সদর হয়।

সাহেব ম্যাজিস্ট্রেট বসে।চন্ডদ্বীপ বা মাধবপাশার রাজা কন্দর্প নারায়নের আমল থিকা আমরা হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি বাস করি।

আমাদের অল্প বয়সে দেখছি শায়েস্তাবাদের মতুল্লিসাহেব পঁচিশ হাজার টাকা দিয়া লাইব্রেরি করলেন গায়ে।

দেখাশোনার ভার পড়লো তার বাছাই পাচজন ব্রাহ্মণের উপর। তারা ব্রাহ্মণ বলিয়া নয়-পন্ডিত বলিয়া-

আপনি ব্রাহ্মণ ছাড়া পন্ডিত দেখতে পান না, তাই না?

তখন ব্রাহ্মণরাই বেশি পড়াশুনা করতো। অন্যরাও করতো। এই যে ঘোষ চক্রবতীর টেস্ট পেপার দ্যাখছেন ম্যাট্রিকুলেশনে-তার ঘোষ আমাগো বিনয়কাঠির মাখন ঘোষ। কায়স্থ বৈদ্যরাও পড়াশুনা করতে শুরু করে তখন। কোনো কোনো মুসলমান পরিবারে পড়াশুনার চল বহুদিনের। ফজলুল হকের মতো বিদ্বান বরিশালের গর্ব। সুফিয়া কামালের মতো কবি আমাদের গর্ব।

ভাবি এতো ভারি অদ্ভুত মানুষ। কলকাতায় বসে চল্লিশ বছর আগে ফেলে আসা বরিশালের গর্ব করে। যে বরিশাল তাকে ডাকেও না-সেখানকার গৌরনদীর ইতিহাস লিখে যায়। আবার ব্রাহ্মণের রক্ত নিয়ে বড়াই করে। বিশেষ করে যে পৃথিবীতে প্রধান প্রতিযোগিতা গুণের–সেখানে।

বললাম, থাকেন তো শক্তিগড় কলোনিতে-জবরদখল জায়গায়। গর্ব যে করেন জেলার জন্য-বুঝে-সুঝে করেন?

গর্ব করব না মানে! আপনাদের জওহরলালের বাবায় ১৯২৮ সনে পার্ক সার্কাস কংগ্রেসে আমাগো জিলার ক্ষীরোদ নট্টের ঢোল শুনিয়া নিজের গায়ের চাদর খুলিয়া দেন তারে। দুর্গা পূজার দিন সকালে বন্ধু মুসলমানরা পান, কাচি হলুদ, কই মাছ দেখাইত-এ কথা কি জানেন!

তা জানবেন কেন?

আধুনিক হইছেন যে! মহব্বত আলি ফোটা কাটিয়া কীর্তন গাইতেন। তখন মুসলমানদের ভালোবাসা। গোড়ামি ছিলো না। রমেশ দত্ত ম্যাজিস্ট্রেট হইয়া বরিশালে পোস্টিং পান।

গ্রাম দেখিয়া বলেন-এক-একটি গ্রাম যেন অমরাপুরী। আমরা আর মুসলমানরা মিলিয়া নবান্ন করছি। পাষানময়ী অপেরার গান ভুলতে পারি না। বৈকুণ্ঠ নট্ট কোম্পানির অধিকারী ছিলেন শশী বাইন। জারিগান গাইতো আকবর, মহব্বত আলী, খোরশেদ আলী, মোনা সোখ। ছিল কবিগান, ত্রিনাথের গান। উকিল শিক্ষকরা থিয়েটার করবেন কর্ণ, চানক্য, আলমগীর, ভাস্কর পন্ডিত, শিবাজী, প্রফুল্ল।

প্রফুল্ল চ্যাটার্জি প্রথম বৈদিক অভিনয়ে নাম করেন। কে যেন প্রফুল্লবাবুকে বলে- আপনি শিশির ভাদুড়ীর চেয়েও ভালো। জবাবে প্রফুল্লবাবু বলেছিলেন-নাট্য জগতে শিশিরবাবু ঈশ্বর। ঈশ্বরের কোন উপাধি নেই। কতো আর বলবো।

হা ডু ডুতে এক নম্বর ছিলেন গৈলার দন্তা সেন। তারপর নাম করে আপ্তাজদ্দি মোন্তাজদ্দি। জানেন-নবান্নর উদ্বৃত্ত দিয়া পিঠা হইতো। তারে আমরা কইতাম-চন্দ্রকাই। যাত্রার কথা মনে পড়লো। বলি শোনেন-স্ত্রী ভূমিকায় রাখালদাস আর রেবতী দে সবাইরে মাতাইয়া রাখছিলো। ১৯২৯ এর কার্তিক।

বিশ্বনাথ সাহার বাড়ি। ছবির মতো দেখতে পাইতেছি-ধ্রুব পালায় দ্বিতীয়া মহিষী রাখালদাস। প্রথমা মহিষী রেবতী। দ্বিতীয়া মহিষীর নিষ্ঠুরতায় চটিয়া গিয়া দর্শক আব্দুল রহিম হাওলাদার উঠিয়া দাড়াইয়া বললেন-ওই মাগীটারে পিটাও। এই হইলো আমার জিলার-গৌরনদীর অভিনয়। প্রেমের অভিনয় করতো রাখাল দাস নায়িকা সাজিয়া। ফিসফাস কথাবার্তা। অমনি শোনা যাইতো সাইলেন্ট প্লিজ। পরে কাননদেবীর যোগাযোগ দেখছি কলকাতায়। সেখানে পায়ে আলতা পরানো দৃশ্য ভোলা কঠিন।

চর গুমরিয়ার পাটের অফিসে নারী চরিত্রে রাখালের অভিনয় দেখিয়া পাট কোম্পানির ইংরেজ সাহেব সাজঘরে আসেন। পরীক্ষা করিয়া দ্যাখেন-রাখাল সত্য সত্যই নারী কিনা। এই হইলো অভিনয়ের স্ট্যান্ডার্ড। আর একটা কথা বলি। গর্ব করিবার মতো বলিয়াই গর্ব করি। নট্ট কোম্পানীর কনসার্টে তেওট তাল একবার শুনিলে সারাজীবন বুকের মধ্যে বাজে। আপনি শুনলে আপনারও বাজিত। আমি শুনছিলাম। আমার আজও বাজে।

এমনভাবে বুকে হাত দিয়ে গণেন্দ্রনাথ দাড়াল-যেন এখনই ওর বুকের ভেতর দিয়ে গণেন্দ্রনাথের সাতাত্তর বছর বয়সের ক্ষীণ বুক উকি দেয়। আমাদের সামনেই শক্তিগড় থেকে শুরু হযে বিশাল সাবেক দিঘি বর্ষার গম্ভীর-কানায় কানায়। গণেন্দ্রনাথের বুকের মতোই এই দিঘির বুক দেখেও কিছুই বোঝার উপায় নেই।

অথচ সারা জেলার ইতিহাস-গৌরনদীর ইতিহাস ওই বুকে জমাট, ঘন করে জমানো আছে। একটানা অনেকক্ষণ কথা বলে গণেন্দ্রনাথের মুখে ফেনা ওঠার যোগাড়। একটি সুখী গার্হস্থ্য সভ্যতার ভান করে পাতিহাসগুলো দিঘি থেকে পাড়ে উঠছিলো। সুধীরবাবুর মোষের খাটালে দুধ প্রার্থীদের লাইন। সুর্যাস্তের আলোয় তার গোছানো দোতলা বাড়িটা ঝকঝক করছিল।

বললাম, চলুন আপনাকে বাড়ি পৌছে দিয়ে আসি।

এত বুড়া হই নাই যে পৌছাইয়া দিতে হইবে। এখনো সইর্ষার তেল মাখিয়া রোজ দিঘিতে সাতার কাটি।

তবু এগিয়ে দিতে গেলাম। গণেন্দ্রনাথ যেতে যেতে বলল, আপনি আমার ‘অসবর্ণ’ লেখাটি পড়িয়া চটছেন। মত পার্থক্য হইতেই পারে। এইবার আপনি আমার উপন্যাস পড়েন-মিলন মন্দির-অগ্নিকন্যা-দুই ভান্ড।


দ্যাখবেন ওইখানে ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, শুদ্র চরিত্ররা মিলিয়া মিশিয়া ঘোরতেছে। সেটা যে কাথাসাহিত্য কিনা।  বোঝলেন নি--



লেখক পরিচিতি
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
১৯৩৩--২০০১
খুলনা জেলায় জন্ম।
যৌবনে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।
প্রথম উপন্যাস 'বৃহন্নলা্‌', অর্জুনের অজ্ঞাতবাস' নামে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়।
'হাওয়াগাড়ি', 'কুবেরের বিষয় আশয়্', 'শাহাজাদা দারাশুকো' প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন