সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৪

“ সাহিত্যতত্ত্ব পাঠ: রুশ প্রকরণবাদ : সীমাবদ্ধতার সীমিত জলে

অলাত এহসান

প্রতিটি তত্ত্বই একটি নতুন চিন্তা নিয়ে হাজির হয়, নতুন কৌশলের স্ফুরণঘটায়। প্রতিষ্ঠিত কংক্রিটের দেয়ালে আঁচড় কাটে, তার পলেস্তার খসে পড়ে। তাই একে স্বাগত না জানানোর কোনো কারণ নেই। রুশ প্রকরণবাদ তেমনি একটি সাহিত্যতত্ত্ব। বিশ শতকের প্রথমার্ধে এর উন্মেষ, রাশিয়ায়। তাই একে রুশ প্রকরণবাদ(Russ Formalism) বলা হয়। তবে এই তত্ত্বের প্রবর্তকরা নিজেদের ‘প্রকরণবাদী’ না বলে ‘বিশেষায়নবাদী’ বলতে পছন্দ করতেন। নিজেদের চিন্তার প্রকরণ বিস্তৃত করতে না পারায় রুশ প্রকরণ বেশি দিন টিকতে পারেনি। তবে রুশ প্রকরণের চিন্তার শুদ্ধিতার অভাব যেমন ছিল, তেমনি ছিল শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। প্রতিপক্ষের তীক্ষ্ম আক্রমনে রুশ প্রকরণবাদ একসময় বুদ্বুদের মতো মিলিয়ে যায়, বাধ্য হয়। প্রতিপক্ষের আক্রমণ শুধুমাত্র তত্ত্বীয় ছিল না, ছিল রাজনৈতিকও। যে কারণে যৌবনে প্রবেশের আগেই তার সমাপ্তি ঘটে। এর আয়ুষ্কাল ছিল মাত্র ১৬ বছর। ১৯১৪ সালে রুশ প্রকারণবাদের সূচনা আর ১৯৩০ সালের এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি।


সাহিত্যতত্ত্বকে একটি স্বকীয় শৃঙ্খলায় বাঁধতে যে-সব পদ্ধতিগত আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল রুশ প্রকরণবাদ তার মধ্যে অন্যতম ও প্রাচীন। সাহিত্যের পঠন-পাঠনকে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, স্বতন্ত্র ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে এর অবদান অনস্বীকার্য। ১৯১৪ সালে ভিকটর শক্লভস্কি ভবিষ্যবাদী (Futurist) কবিতা সম্পর্কে The Resurrection of the World নামে প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এই প্রবন্ধ প্রকাশের মধ্যদিয়ে ‘রুশ প্রকরণবাদ’-এর সূচনা হয়। এই সময়টা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের আগের মুহূর্ত। রুশ বিপ্লবের মধ্যদিয়ে জ্ঞান-তত্ত্বের শক্তি সমালোচক হিসেবে সামনে চলে আসেন লিও ট্রটস্কি। তিনি ১৯৩০ সালে Literature and Revolution নামক একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এই গ্রন্থের তিনি রুশ প্রকরণবাদরে ওপর একটি অধ্যায় রচনা করেন। যেখানে তিনি এই তত্ত্বের সীমাবন্ধতা, দূর্বলতা, সমাজ-ইতিহাস-ঐতিহ্য বিচ্ছিন্ন ও রাজনৈতিক-দার্শনিক গতিমুখ জোড়ালো ভাবে তুলে ধরেন। ফলে তারপর থেকে রুশ প্রকরণবাদী আন্দোলন অব্যাহত আক্রমণের মুখে পড়ে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, বিশ শতকের অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা থেকে রুশ প্রকরণবাদকে দূরে সরিয়ে রাখার প্রচেষ্টায় ঐতিহাসিক ষড়যন্ত্র হয়েছিল। চেষ্টা করা হয়েছে একে বিচ্ছিন্ন ও নেহায়েত আঞ্চলিক একটি ঘটনা হিসেবে প্রতিপন্ন করার। শেষপর্যন্ত, অনেকটা রাজনৈতিক চাপের মুখেই, ভিকটর শক্লভস্কি তার প্রবন্ধ প্রত্যাহার করে নেন এবং তত্ত্বের যবনিকাপাত ঘটে। অবশ্য এটা ভাবার কারণ নেই যে, তত্ত্বটি শেষ দিন পর্যন্ত তার শক্তি ও আলোড়ন নিয়ে টিকে ছিল, কিংবা শক্লভস্কি তত্ত্বে একক প্রবর্তক ছিলেন। ইতোপূর্বে এই তত্ত্বের বহুবিদ সীমাবন্ধতা চিহ্নিত হয়েছিল। এবং তত্ত্বে প্রথম বেলার সারথীগণ তাদের চিন্তায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছেন।

মূলত দু’টি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর আলাপ-আলোচনা, সভা-সমিতির কার্যবিবরণী এবং রচনাবলী থেকে রুশ প্রকরণবাদ সাহিত্যতত্ত্বের উদ্ভব। এই গোষ্ঠীর একটি পিচার্সবার্গভিত্তিক ‘কাব্যিক ভাষা-পাঠক সমাজ’ (The Society for the Study of Poetic Language), সংক্ষেপে ‘অপোইয়াজ চক্র’ (Opajaz)। অপরটি ‘মস্কো ভাষাতাত্ত্বিক কেন্দ্র’ (Moscow Linguistic Circle)। অর্থাৎ সংঘ দু’টি সাহিত্যের চেয়ে বা সাহিত্যের ভাষা প্রকরণ নিয়ে কাজ করতো। মূলত ভাষাতাত্ত্বিক সভ্য-সাথীদের নিয়ে গড়ে ওঠেছিল মস্কো ভাষাতাত্ত্বিক কেন্দ্র। ভাষাতাত্ত্বিক পরিধিকে কাব্যিক ভাষা পর্যন্ত বিস্তৃত করাই ছিল তাদের লক্ষ্যই। অন্যদিকে অপোইয়াজ চক্রের ছিল সাহিত্যের ছাত্র। তারা যেমন প্রচলিত সাহিত্যে সন্তুষ্ট ছিলেন, তেমন ভবিষ্যতবাদী কবিতার প্রতি তাদের ছিল প্রবল আগ্রহ। সভ্যগণের মধ্যে ব্যক্তি বিশেষের রচনায় বিশেষ বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব থাকলেও সকলের রচনায় সাম্মিলিত ভাবে সাহিত্যপাঠের তাত্ত্বিক ভিত্তি ‘রুশ প্রকরণবাদ’ প্রস্ফোটিত হয়। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে শক্লভস্কির প্রবন্ধের মধ্যদিয়ে।

লিও ট্রটস্কির সাহিত্যতত্ত্বের বিষয় ছিল সমাজতান্ত্রিক বাস্তুবাদ (Socialist Realism)। ১৯৩০ সালে এই তত্ত্ব প্রকাশের পর পরই প্রকরণবাদের জোয়ারে ভাটা পড়তে থাকে। খানিকটা বিতর্তিক তত্ত্ব আকারে প্রতিভাত হল প্রকরণবাদ। প্রকরণবাদীরাও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় কোনো বিশেষ তত্ত্বের প্রতি আকর্ষণ হারালেন। তাদের অনেকই পূর্ব অনুসৃত পথ পরিহার করে, নিজের বিশেষায়ণ ও গ্রন্থ সমালোচনার মতো অপেক্ষাকৃত কম বিতর্কিত সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করলেন। এদের মধ্যে আইকেনবম ও বরিস তোমাশেভস্কি’র মতো শক্তিশালী সভ্যও আছেন।

সোভিয়েত ইউনিয়নে তখন সমাজতান্ত্রিক বাস্তুবাদ রাষ্ট্রীয় ভাবে স্বীকৃত একটি সাহিত্য চিন্তা। ভিকটর শক্লভস্কি শেষ পর্যন্ত এই সমাজতান্ত্রিক বাস্তুবাদের প্রতি নিষ্ঠ হয়ে পড়েন। বলতে গেলে এর মধ্যদিয়েই শেষ হয় প্রকরণবাদী সাহিত্যতত্ত্বের স্বক্রীয় কাল।
অবশ্য প্রকরণবাদ তত্ত্বে আরেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রামান ইয়াকবসন প্রকরণবাদ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তত্ত্ব যখন বিকশিত না হয়ে টিকিয়ে রাখা চেষ্টা করতে হয় তখনই বুঝতে হয় তত্ত্ব তার অস্থি-মজ্জা হারিয়ে ফসিলে পরিণত হয়েছে। ইয়াকবসন ১৯২০ সালে মস্কো ত্যাগ করে চেকোশ্লোভাকিয়া যান। সেখানে তার বন্ধু, যারা মূলত ভাষা তাত্ত্বিক, নিয়ে ১৯২৬ সালে ‘প্রাগ ভাষাতাত্ত্বিক কেন্দ্র’ (Prague Linguistic Circle) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩৯ সালে রাজনৈতিক কারণে ভেঙে যাওয়ার আগর্পন্ত ইয়াকবসন এবং তার প্রাগ-সঙ্গী রেনে ওয়েলেক, তাদের শিক্ষকতা ও প্রকাশনার মাধ্যমে উত্তর-আমেরিকাতে বিশেষ প্রভাব বিন্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তবে এই সব কাজ প্রকরণবাদ সাহিত্যতত্ত্বে চেয়ে প্রকরণবাদী ব্যক্তিদের কাজ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। এছাড়া প্রকরণবাদীদের শেষদিকের চিন্তাধারা চেকদের কাজে কিছুটা প্রতিফল হয়।

প্রকরণবাদী রেনে ওয়েলেক ১৯৪৯ সালে অস্টিন ওয়ারেরনের সঙ্গে যৌথভাবে রচনা করেন Theory of Literature গ্রন্থটি। যা অ্যাংলো স্যাক্সন শিক্ষার্থীদের নিকট একমাত্র আকর গ্রন্থ হিসেবে বহুবছর টিকেছিল। ষাটের দশকে ফরাসি দুই সমালোচক তদোরভা ও জেনেটের তাদের লেখালেখির মাধ্যমে আলোচনার বিষয় হিসেবে রুশ প্রকরণবাদের একধরেন প্রকরণবাদের পুনর্জাগরণ ঘটনা। এই স্বকীয়তা উত্তর পুনর্জাগরণ ষাটের দশকে ফরাশি সাংগঠনিক তত্ত্বের বিকাশে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

যেকোনো সাহিত্যতত্ত্বের মৌলিক উপাদান হলো-প্রথমত, সাহিত্যকর্ম এবং রচিয়তার আন্তঃসম্পর্ক এবং দ্বিতীয়ত, সাহিত্যকর্ম ও বাস্তবতার আন্তঃসম্পর্ক। এই দুই মৌলিক উপাদান বিচার করলে সাহিত্যতত্ত্বের প্রায়গিকতা ও গতিমুখ পাওয়া যায়। রুশ প্রকরণবাদে জীবন ও সাহিত্য দু’টি বিপরীত এবং স্বতন্ত্র বিষয়, যা পরস্পরের পরিপূরকও বটে। তাই প্রকরণবাদে আত্মজীবনীর কোনো মূল্য নেই। জীবন থেকে বিচ্যুত হয়েই-ভাষা ও উপস্থাপানের মধ্যদিয়ে-একটি বিষয় সাহিত্য হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে লেখকে জীবন থেকেই সাহিত্য উৎসারি হতে পারে। কিন্তু সেখানে লেখকের উপস্থিতি নয়, সাহিত্যগুণেরই একটি সাহিত্য সাহিত্য হয়ে ওঠবে, তাদের মতে। এই সাহিত্যগুণই প্রকরণবাদের অন্যতম বিষয়। তাতে কে, কখন, কেন সাহিত্যটি রচিত হলো তা বিষয় নয়, রচনা মধ্যে সাহিত্যগুণ কি আছে তা-ই হলো সাহিত্য বিচারের মাপ কাঠি। অর্থাৎ বিশ্লেষণেই এই বিষয় নির্ধারণ হবে। এক্ষেত্রে তারা সাহিত্যের উত্তরাধিকার বিষয়কেও এড়িয়ে যান। সমাজ বিচ্ছিন্ন হলেও তাদের কোনো মাথা ব্যাথা নেই, সাহিত্যগুণ সমুন্নত থাকলো কিনা, তা-ই বিবেচ্য। এ ক্ষেত্রেই সমাজতান্ত্রি বাস্তুবাদ দ্বারা রুশ প্রকরণবাদ প্রথম আক্রান্ত হয়। আবার সাহিত্যের সামাজিক দিক বা সামজে সাহিত্যের ভূমিকা কি, তা নির্ধারণে নারাজ প্রকরণবাদীরা।

সামাজিক বিষয়াবলি বা বাস্তবতা যে সাহিত্যে উঠে আসে না, তা নয়। তাদের মতে, রোমান্টিক কবিদের কল্পনার জীবনের মতো বাস্তববদাও শিল্পের উপজাত মাত্র, শিল্পের উৎসমূল নয়। অর্থাৎ, সব বাস্তববাদই কোনো নির্দিষ্ট ধরনের রচনার সংশ্লিষ্ট উপজাতে পরিণত হয়, বাস্তবতার সরাসরি অনুকরণে পরিণত হয় না। নৃত্যের ভেতরে যেমন হাঁটা অনুভূত হয়, সাহিত্যের মধ্যে তেমনি জীবন উঁকি দিবে। কিন্তু হাঁটার গল্প নয় লেখক লেখবেন নৃত্য শৈলির গল্প। অর্থাৎ বাস্তবতা সম্পর্কে তাদের ধারণা সংস্কৃতির দৃষ্টিভঙ্গির ফাঁদে আটকা পড়েছে। তারা বরঞ্চ দৃষ্টিভঙ্গিকে সাহিত্যের তত্ত্ব দিয়ে প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন।

রুশ প্রকরণবাদের প্রধান বিষয় হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে সাহিত্য পঠন-পাঠনের বিষয় কি হওয়া উচিত তা নির্ধারণ করা, কিভাবে সাহিত্য পাঠ করতে হবে তা নয়। সাহিত্য সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে ভাষা তাদের কেন্দ্রিয় বিষয়। কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে ভাষার তত্ত্বকে বিকশিত করতে না পারায়, প্রকরণবাদের সীমাবন্ধতা আটোসাটো হয়ে আছে। তাদের মতে, মুখের ভাষা নয়, সাহিত্যের ভাষা হবে আলাদা। অর্থাৎ কবিতায় ক্রিয়াশীল স্বাতন্ত্র্য হলো ব্যবহারিক ভাষা ও কাব্যিক ভাষার মধ্যেকার স্বাতন্ত্র্য। তবে গদ্যের ক্ষেত্রে এটা ততটা প্রযোজ্য নয়। এক্ষেত্রের তারা অবতারণা ঘটনা, আকর-কাহিনী ও শিল্পিত-কাহিনীর। ভাষার বা দৃশ্যের এই পরিবর্তণকে বলা হচ্ছে অবিদিতকরণ। অবিদিতকরণ প্রকরণবাদের সাহিত্য বিবেচনায় বিশেষ বিবেচ্য বিষয়। এই অবিদিতকরণের স্বার্থেই প্রকরণবাদকে সাহিত্যের বাহ্যিক কাঠামোর দিতে অধিক মনোযোগী হতে হয়। এটা সেই দশর্নের সেই আধার-আধেয় তর্কের অবতরণ ঘটায়। আধেয় ছাড়া কি কোনো সাহিত্য হতে পারে? এর উত্তরে প্রকরণবাদীদের প্রথম কথা হচ্ছে, সাহিত্যগুণই হলো সাহিত্যবিজ্ঞান বিষয়, সাহিত্য নয়। কোনো সাহিত্যকর্মে যখন শুধু কলাপ্রকারণকেই(কাঠামোশৈলি ও উপাদান) প্রাধান্যে রাখা হয তখন আধার নিজেই আধেয় হয়ে যায়। শক্লভাস্কির ভাষায়, ‘আধার সম্পর্কে সচেতনতা উপন্যাসের বিষয়বস্তু গঠন করে।’

সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দিক হলো, রুশ প্রকরণবাদ বিশেষ কিছু সাহিত্যিক ছাড়া তাদের তত্ত্বের আওতায় আনেননি। কিংবা সবার জন্য সমান্তরাল বিবেচ্য বিষয়ও সামনে আনতে পারেনি। এদের চিন্তায় কোনো সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব নেই, আছে কবিতা ও সাহিত্য। কবিতা সম্পর্কে টি.এস. এলিয়টের সেই বিখ্যাত উক্তি-‘কোনো ব্যক্তিত্বের প্রকাশ নয়, বরং ব্যক্তিত্বের অনুপস্থিতি’-প্রকরণবাদ থেকে উৎসারিত তা পরিস্কার। প্রকরণবাদে রচয়িতা একজন নির্দিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ বা কারিগর ছাড়া কিছু নন; সাহিত্যের বিকাশ ঘটে মূলত সাহিত্যেরই স্ব-শাসনের পথে। অর্থাৎ কলম্বাস না থাকলেও আমেরিকা আবিষ্কৃত হতো। এ না হয়, কায়িক শ্রমের গল্প, কিন্তু সাহিত্য কি কলম্বাসের মতো স্থুথ কায়িক শ্রম? আবার শেকস পেয়র না থাকলেও নাটক লেখা হতো বা জঁ পল সাঁর্তে না থাকলেও ‘অস্তিত্ববাদ’ আবিষ্কৃত হতো, কিন্তু সাঁর্তে’র সাহিত্য কর্ম হতো? এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর প্রকরণবাদীদের কাছে নেই।

সাহিত্যতত্ত্ব আবিষ্কার ও সম্প্রসারে অত্যন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো, তত্ত্ব অনুযায়ি সাহিত্যের ইতিহাস নির্মাণ। মার্কসবাদী সাহিত্য ধারণা অনুযায়ি, মানুষের শ্রমের মধ্যদিয়ে সাহিত্যের উদ্ভব হয়েছে ও শ্রমের বিকাশের মধ্যে দিয়েই বিকশি হচ্ছে সাহিত্য। সাহিত্যের ইতিহাসেল জৈবিক ধারণায় অবেহেলা করা হয় প্রকরণকে, আবার প্রকরণ-নির্ভর সাহিত্যের ইতিহাসের ধারণায় ইতিহাসকে অবহেলা করা হয়। এই উভয় ধারণাই বিপরীতে রুশ প্রকরণবাদী ধারণা হলো, ইতিহাস স্বয়ং সাহিত্যের বিশেষত্বকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ করে দিচ্ছে। অর্থাৎ কালের বিববর্তনে একটি সাহিত্যকর্ম-কৌশল বা কলাপ্রকরণ যেমন সুপরিচিত হয়ে ওঠে এবং ক্রমশ জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলে। তেমনি নতুন কোনো সাহিত্যকর্ম পূর্বের কৌশলকে ব্যঙ্গকরে বা উপেক্ষা-উৎপ্রেক্ষা করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পৃথিবীর তাবৎ মহৎ সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রে এই ঘটনাই ঘটছে। এসব পুরোপুরি অধারাবাহিক কোনো কিছু। এমনই যে, অনেক এসময় ‘চাচার কাছ থেকে ভাতিজা’ উত্তরাধিকার প্রাপ্ত হয়। একই ভাবে ধরা যায়, রুশ প্রকরণবাদের ধারাবাহিকতার প্রসঙ্গ। যেমন প্রথমে-‘মস্কো ভাষাতাত্ত্বিক কেন্দ্র’ (Moscow Linguistic Circle) দ্বারা ১৯২০-১৯৩০ প্রকরণবাদ মস্কোয় চর্চিয় হয়েছে। ওই সময়-কালের মাঝ থেকেই শুরু হয়ে, ১৯২৬-১৯৩৯, উৎস এলাকার বাইরে ‘প্রাগ ভাষাতাত্ত্বিক কেন্দ্র’ (Prague Linguistic Circle) দ্বারা চর্চিত হয়েচে। আবার ষাটের দশকে ফরাসি দুই সমালোচক-তদোরভা ও জেনেটের-লেখালেখির মাধ্যমে রুশ প্রকরণবাদের পুনর্জাগরণ ঘটনান। অর্থাৎ এর ধারাবাহিকতা নেই। কিন্তু সাহিত্যে যেমন উত্তরাধিকার আছে, তেমনি আছে ধারাবাহিকতা। এর সঙ্গে সহগামী না হওয়ায় বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসের মঞ্চ থেকে খন্ডিত কালপর্বেই ছিটকে পড়েছে রুশ প্রকারণবাদ। তাদের হাতে সাহিত্যের অধারাবাহিক ইতিহাস ও নতুন সংজ্ঞা থাকলেও তা অন্যান্য ইতিহাসের সঙ্গে কিভাবে সম্পর্ক স্থাপন করবে তা নির্ধানে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। অর্থাৎ তাদের হাতে পরিশীলিত কোনো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তত্ত্ব থাকলে তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তত্ত্বকে এগিয়ে নিতে পারতেন।

প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, ১৬ বছর একটি সাহিত্যি তত্ত্ব পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্য যথেষ্ট কিনা। উত্তরও এক প্রশ্ন এখানে, যেহেতু এটা একটা সংঘ চর্চার মধ্যেদিয়ে উদ্ভব ও বিকাশ, তাহলে ১৬ কি পূর্ণই ১৬ বছর ধরা যাবে। প্রথম বেলা যেমন তত্ত্বে কাঠামো তৈরিতে পার হয়েছে এবং তেমনি শেষ বেলা গেছে আত্মরক্ষায়। অর্থাৎ বেড়া-বেস্টনিহীন রুশ প্রকরণবাদের চৌবাচ্চায় কিছুটা জল জমতে না-জমতেই রাষ্ট্র স্বীকৃত তত্ত্বের হাতি এসে হামলে পড়েছে। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। হাতি ধপাশ করে পড়ায় তার গায়ে-পায়ে মেখে উবে গেছে জল। আর চৌবাচ্চার তলানীর থিক থিকে মাটিতে ছাপ পড়ে গেছে মস্ত হাতির পা’র। একার্থে এ এক নির্যাতিতর ইতিহাস। যেখানে সমপক্ষীয় দ্বন্দ্বের চেয়ে রাষ্ট্র যন্ত্রের আক্রমণই সত্য।

পৃথিবীর কোনো আন্দোলনই যেমন বৃথা যায় না, রুশ প্রকরণবাদও তেমনি। তাদের নিজের তত্ত্বে ধারাবাহিকতা বা উত্তরাধিকার স্বীকার না করলেও রুশ প্রকরণবাদ টিকে আছে সাহিত্যতত্ত্বে ধারাবহিকতা ও উত্তরাধিকার হিসেবে।”

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন