সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৪

একটি শক্তিশালী চরিত্রের উপর ভর করে যেভাবে একটি ছোটগল্প তৈরি করবেন

সাজেদা হক

ছোট গল্প লেখার অনেক উপায় আছে। ছোট ছোট গল্পও হযতো অনেক আছে। তারপরও বুঝে উঠতে পারছেন না কোথা থেকে শুরু করবেন? এখানে ছোট গল্প শুরু করার কিছু কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, মিলিয়ে দেখতে পারেন!! মিলেও যেতে পারে আপনার গল্পের সাথে।


১. একটি চরিত্রকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলুন:

মনে মনে একটি চরিত্রের অনেকগুলো বর্ননা লিখুন। যেমন, বয়স, লিঙ্গ, চেহারা, কোথায় বাস করে ইত্যাদি। সেই চরিত্রের ব্যক্তিত্ব তৈরি করুন। চরিত্রটি যখন কিছু চিন্তা করবে, তখন তাকে আয়নার সামনে দাড় করিয়ে দিন। অন্যরা চরিত্রের পিছনে আপনার চরিত্র সম্পর্কে কি বলে, সে সম্পর্কে ভাবতে সেখান? চরিত্রের দুর্বল দিক কি, শক্তিশালী দিকই বা কি তারও উল্লেখ করুন। হুবহু বিবরণ তুলে না ধরলেও হবে! তবে আপনার নিজের জানা থাকতে হবে, কারণ চরিত্রটি আপনিই নির্মাণ করছেন। এই চরিত্রের শুরু থকে শেষ সবই আপনার জানা থাকবে। গল্পের স্তরে স্তরে চরিত্রটিকে, চরিত্রের চিন্তাকে, আপনার গল্পকে প্রয়োজন অনুসারে বিকশিত করুন।



২. স্থির করুন চরিত্র আসলে কি চাইছে?

হয়তো চরিত্রটি প্রচার চায়, কিংবা নাতি-নাতনি অথবা নতুন কোনো গাড়ী বা বাড়ী কিনতে চায়। নতুবা সহকর্মীদের কাছে সম্মান চায়, হতে পারে যে সে প্রতিবেশীর কাছে ক্ষমা পেতে চায়! এর অর্থ হলো চরিত্রটি যদি কিছু নাই চায়, তাহলে আপনার বলার মতো কোনো গল্পই নেই।


৩. প্রতিবন্ধকতা তৈরি বা চিহ্নিত করুন :

আপনার চরিত্র যা চাইছে, তা পেতে পারছে না কেন? কি সমস্যার কারণে চরিত্রটি তার ইচ্ছাপূরণ করতে পারছে না, তা পাঠকদের জন্য চিহ্নিত করে দিন। হতে পারে কেউ স্বশরীরে তাকে বাধা দিচ্ছে, হতে পারে সামাজিক নিয়ম-কানুন, কিংবা অন্য কোনো চরিত্রের দায় সে মাথায় নিয়ে নিজের ইচ্ছেটা পূরণ করতে পারছে না। পাঠককে বুঝতে দিনে, আপনার প্রধান চরিত্রের ইচ্ছে পুরণের বাধা কে, প্রতিবন্ধকতা কি কি?

৪. আবেগজনিত সমাধান বের করুন:

প্রধান চরিত্রের ইচ্ছে পুরণে তৈরি হওয়া সমস্যার সমাধান করতে অন্তত ৩টি উপায় পাঠকের সাথে শেয়ার করুন। তিনটিই লিখে ফেলুন। ভাবুন, প্রথম কি সমাধান আশা করছেন আপনি? প্রথমেই সে সমাধানটাকে বাদ দিন, কারণ আপনার পাঠকও স্বাভাবিকভাবে প্রথম সমাধানটাই আশা করছে। সুতরাং এবার দ্বিতীয় এবং তৃতীয় সমাধানটি নিয়ে ভাবুন। দেখেন এই দুটোর মধ্যে কোনটি অবাক করে দেয়ার মতো সমাধান, কিংবা কোনটি অসধারন একটি সমাধান? সেটিকে কেন্দ্র করে আপনার প্রধান চরিত্রটিকে তার ইচ্ছে পূরণের পথে একধাপ এগিয়ে দিন।


৫. একটা দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করুন :

গল্প লেখার বা পাঠকের কাছে উপস্থাপনের জন্য দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করুন। কোন পুরুষে গল্পটি আপনি আপনার পাঠকের সাথে শেয়ার করবেন তা স্থির করুন। হতে পারে সেটা উত্তম পুরুষ (আমি, আমরা), কিংবা মধ্যম পুরুষ (তুমি) নতুবা নামপুরুষে (সে, তাহারা) হতে পারে। সাধারণত থার্ড পার্সন বা নামপুরুষের ব্যবহারই বেশি পাঠকপ্রিয়। কারণ এতে পাঠক খুব দ্রুত নিজেকে গল্পের সাথে যুক্ত করে ফেলেন। একইসাথে নামপুরুষ আপনার ভাবনার জগতটাকে অসীম করে তোলে। গতানুগতিকতার বাইরে ভাবতে শেখায় আপনাকে। তারপরও একই পয়েন্ট অব ভিউ থেকে কয়েকটি অনুচ্ছেদ লেখার চেষ্টা করুন। এবার ওই কিয়েকটি অনুচ্ছেদকে অন্য পয়েন্ট অব ভিউয়ে লেখার চেষ্টা করুন। এভাবে লিখলে দেখবেন আপনার প্রধান চরিত্রটি তার পথ খুজে পেয়েছে, আর আপনি পেযেছেন গল্প লেখার গতি!


৬. উত্তেজনাপূর্ণ বা চমকপ্রদ কিছু দিয়ে শুরু করুন:

গল্পের সবচেয়ে চমকপ্রদ বা উত্তেজনাপূর্ণ অংশ দিয়ে লেখা শুরু করুন। পাঠককে বুঝতে দিন, ভাবতে দিন, সংযুক্ত হতে দিন। এরপর আপনি আপনার গল্পকে বিস্তৃত করুন। তখনই পাঠক বুঝতে পারবে কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো?


৭. কি বাদ পড়লো, ভাবুন, ভেবে বার করুন:

এখন পর্যন্ত যা লিখেছেন তা শুরু থেকে আবার পড়ুন। দেখুন, খেয়াল করুন কি বাদ পড়েছে। চরিত্রের কোন দিক কি যোগ করতে ভুলে গেছেন? নাকি কোন স্থানের বর্ণনা, নাকি চাওয়া না পাওয়ার দ্বন্দ্বটাই এখনো গল্পে যোগ করা হয়নি আপনার! ভাবুন, আপনার গল্পে তৈরি সমস্যার জন্য কি কি সমাধান স্থির করেছেন আপনি? তার সবই লিখে ফেলুন, দেখুন কি বাদ পড়েছে? যোগ করুন।


৮. সমাপ্তি বিবেচনায় রাখুন :

পাঠক ঠিক কখন আপনার গল্প পড়া বন্ধ করে দেবে তা আগেই লেখক হিসেবে আপনাকে অনুধাবন করতে হবে। আপনি পাঠককে কি অনুভূতি দিযে শেষ করতে চান আশাবাদী অনুভূতি, নাকি নিারাশাবাদী অনুভূতি? তা নির্ধারণ করুন। একটি সৃষ্ট সমস্যার ভালো সমাধানের প্রেরণা হয়ে উঠতে পারেন আপনি। ভাবুন।


৯. গল্পের রূপরেখার একটি তালিকা তৈরি করুন :

গল্পের যে রূপরেখা ভেবে রেখেছেন তার একটি তালিকা তৈরি করুন। বিশেষ করে বাদ পড়া অংশ এবং গল্পের সমাপ্তিকে কেন্দ্র করে। চিন্তা করার কিছু নাই। শুরুতেই সব পারফেক্ট হয়ে যাবে এমন ভাবার কিছু নাই। কিন্তু চেষ্টা করতে তো আর দোষ নেই। তাই চেষ্টা করুন। দেকবেন সব আপনারই মনমতো হয়ে গেছে।


১০. তথ্য শেয়ারিং এর সময় সাব-টাইটেল, ভিন্ন ভিন্ন কৌশল ব্যবহার করুন:

আপনার গল্পে কোন নতুন তথ্য সংযোজনের সময় ভিন্ন ভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নিন। সরাসরি কোনো তথ্য বা উপদেশ পাঠক সহজভাবে গ্রহণ নাও করতে পারে। তাই খুব সতর্কতার সাথে তথ্যের ব্যবহার করতে হবে। যাতে পাঠক আপনার দেয়া তথ্যকে অতিরিক্ত পাকামো না ভেবে বসে। লেখক হিসেবে এই পরিমিতি জ্ঞান আপনার অবশ্যই থাকতে হবে।


১১. পুরোনো স্মৃতিচারণ করুন:

এখন আপনার গল্পের শুরু আছে, মধ্য পর্যায় আছে এবং শেষও আছে। সুতরাং এখন আপনি আপনার গল্পে স্মৃতিচারণ করতে পারেন। সেই স্মৃতিচারণই আপনার প্রধান চরিত্রের সমস্যা সমাধানে সহায়ক হতে পারে। পাঠক আপনার স্মৃতিচারণে আবারো যুক্ত হতে পারে গল্পের সাথে। এবঙ মেনে নিতে পারে আপনার চরিত্রের সমস্যা সমাধানের উদ্যোগকে। হতে পারে সে উদ্যোগ একদমই ব্যতিক্রম কিংবা অসাধারণ। তাই প্রয়োজনমতো স্মৃতিচারণো করুন।


১২. সম্পাদনা ও বানান ভুল খেয়াল করুন:

অন্য কাউকে আপনি আপনার গল্প পড়তে দেয়ার আগে নিজে সেটি পড়ুন। প্রয়োজনীয় সংযোজন ও বিয়োজন করুন। বানানে ভুল থাকলে তা ঠিক করুন। এমনও হতে পারে পেশাদার কাউকে দিয়েও এ কাজটি করে নিতে পারেন আপনি। ভেবে দেখুন, কি করা ঠিক হবে!


১৩.

পাঠকদের হাতে আপনার গল্প তুলে দেয়ার আগে ছোট ছোট গ্রুপে আপনি আপনার গল্পটি ছেড়ে দিন। তাদের মতামত নিন। হতে পারে আপনার বন্ধু, পরিবারের সদস্য কিংবা অন্যকেউ, যারা আপনাকে তাদের সৃজনশীল মতামত দিয়ে আপনাকে আপনার গল্পকে আরো ঋদ্ধ করতে সহায়তা করবে।


১৪. প্রয়োজনীয় সংযোজন ও সংশোধন শেষে পুনরায় পড়ুন:

পাঠকের দেয়া মতকে গুরুত্ব দিয়ে তা আপনি আপনার গল্পে যোগ বা বিয়োগ করুন। সবার মতামতের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া গল্পটি আবারো পড়ুন। দেখুন কেমন হলো আপনার এই গল্পটি। সাধারণ কোনো গল্পই কি অনন্য হয়ে উঠলো না!! যদি উত্তর হ্যা হয়, তাহলে আমরা নিশ্চিত, আপনি আসলেই একটি জিনিয়াস। অসাধারণ আপনার লেখনী শক্তি, সৃজনশীলতা, উদ্যোম। সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক আপনি।



টিপস:

ক) ও সরল উপায়ে আপনি আপনার গল্প পড়ার কৌশল বের করুন। টাইপিং ভুল কিংবা গ্রামাটিক্যাল ভুল শুধরে নিন।

খ) ‌সময়’ ভীষন গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদক। যদি কোনো সমস্যা সমাধানের ভালো কোনো উপায় খুজে পাচ্ছেন না, তাহলে সেটিকে ওই অবস্থাতেই ফেলে রাখুন। যখন এর সঠিক এবং আপনার মনমতো সমাধান পাবেন ঠিক তখনি সেটি লিখে ফেলুন। যাকনা কিছুটা সময়।

গ) শুরু করার আগে যা ভেবেছিলেন, আর এখন যা লিখেছেন- তার মধ্যে কি পার্থক্য আছে? কেউ যদি, বা কোন পাঠক যদি আপনাকে কোনো প্রশ্ন করে, তাহলে তার উত্তর মুখে মুখে না দিয়ে লিখে জবাব দিন। এতে করে আপনারই উপকার হবে।



লেখক পরিচিতি
সাজেদা হক
সাংবাদিক। লেখক।
ঢাকা। 

1 টি মন্তব্য: