সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৪

নিয়নের বাতি গল্পের গল্পটি

নিয়নের বাতি গল্প পড়ার লিঙ্ক 
নিয়নের বাতি গল্পের গল্পটি
দীপেন ভট্টাচার্য
গল্পটা প্রায় আড়াই বছর আগের লেখা। আমি এবং আমার স্ত্রী লিসা লিসার বাড়িতে থাকি, আর পাঁচ মিনিটের পথে আমার বাড়িটিতে তখন লিসার এক বোনপো থাকত। তিন বছর আগে আমরা একদিন লাটিন আমেরিকার স্যরিয়েল সাহিত্য নিয়ে কথা বলছিলাম। সেই প্রসঙ্গে লিসা বলল, আমরা অন্য বাড়িটিতে গিয়ে থাকলে একদিন সকালে উঠে দেখব আমরা অতীতে ফিরে গেছি। কথাটা আমার মনে ধরেছিল। এর কয়েক মাস বাদে আমি এই গল্পটি লিখি, বলতে গেলে গল্পের শেষে কি হবে সেটা আমার জানাই ছিল, এর আঙ্গিকটা কি হতে পারে সেটা নিয়ে কয়েক মাস ভাবতে হল। আমি গল্পের ড্রাফট করি না। সাধারণতঃ গল্পের শুরুটা জানি, শেষটা জানি না, এই ক্ষেত্রে ব্যাপারটা উল্টো হল। গল্প লিখতে শুরু করলেই বিভিন্ন চিন্তা ও শব্দ আপনা থেকেই ভীড় করে আসে।


আমার ছোটবেলায় ঢাকায় নিয়নের বিজ্ঞাপন আসে। আর মজিবুল হক সন্ধ্যাবেলা ঢাকার আকাশের যে বর্ণনা দিলেন সেটাই আমার স্মৃতি। তাই নিয়নের আলো যেন সেই হারনো দিনের হাতছানি।

আমি পুরোনো ঢাকায় উয়ারিতে বড় হয়েছি, আমাদের উয়ারি পাড়ার হিন্দু পরিচিতরা ধীরে ধীরে চলে গেলেন, কারুর বাড়ি দখল হল, কেউ ভয়ে অল্প দামে বিক্রী করে দিল। আর হৃষিকেশ দাস রোডে আমাদের দূর্সম্পর্কীয় এক আত্মীয় পরিবার থাকতেন (এখনো আছেন)। তাঁদের বাড়িটি এখানে যে ভাবে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তার সাথে কিছুটা মেলে। আর আমরা উয়ারির যে বাড়িতে বড় হয়েছি সেটা ভাড়া ছিল, এখন আর আমাদের নেই। তাই সেই বাড়িটির কথা ভেবে প্রায়ই মন খারাপ হয়। ইতিমধ্যে আমি বছরের দু বার ঢাকা যাতায়াত করি, হৃত কিছুকে আবার ফিরে পাবার ইচ্ছে মনের মধ্যে ছিল, কিন্তুআমাদের পুরোনো বাড়িটিকে পাওয়া সম্ভব ছিল না, হয়তো কমলের মাধ্যমে সেই অতৃপ্ত বাসনাকে বাস্তব করার ইচ্ছে এই গল্পে কাজ করেছে।

পাঠককে একটা ধাঁধার মধ্যে রাখা বা নিজেকে ক্রমাগত প্রশ্ন করে যাওয়া আমার জন্য যেন একটা কর্তব্য। গল্প পড়ে বা যে সিনেমা দেখে পাঠক বা দর্শক যদি এক ধরণের দ্বন্দ্ব বা প্রশ্নের সম্মুখীণ হন, তবেই সেই শিল্প কৌশলের সার্থ্কতা। জীবন কখনই সরল রেখায় চলে না, আর যে বাস্তবতা আমরা আমাদের ইন্দ্রিয় দিয়ে বোধ করি, তার নিচে লুকিয়ে আছে যে সমস্ত বোধ তার ছোঁয়াচ দেয়াই শিল্পীর কাজ।

ব্যাচেলর কমল তার ভাড়া বাড়িতে মালিকের জন্য কোন প্রমোদের (অন্য কোন নারী মাধ্যমে) ব্যবস্থা করতে পারে, এরকম একটা ধারণা পাঠককে দিয়ে রাখা হল। এই ধারণাটা ভেঙ্গে দেওয়াই হল গল্পের প্রথম মোড়। এবার আমাকে একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস নিয়ে আসতে হবে যেটা পাঠক একেবারেই আশা করছিল না - কমলের ইতিহাস, এই বাড়ির সঙ্গে তার সম্পর্ক। কিন্তু হঠাৎ করে সেটা উপস্থাপনা করা যাবে না। সেই জন্যই ওয়াইনের অবতারণা। আমি এটাকে বলি instrument। এই instrument মাধ্যমে কমল তার গল্প বলা শুরু করল। এবং অনেকটা এই instrumentয়ের জন্যই মজিবুল ও রেজওয়ানা কমলের বাড়িতে থাকতে রাজি হল। কমলের গল্পটা এই গল্পের ২য় মোড় হিসেবে ভাবা যেতে পারে।

এখন আমার দরকার একটা সমাপনীর। সেই রাতে যেন মজিবুল ও রেজওয়ানার মুক্তি হল, তারা ফিরে গেল তাদের যৌবনে। কমল দায়িত্বের বোঝা বয়ে হল প্রবীণ। এটা হচ্ছে গল্পের তৃতীয় মোড়।

বাড়িটি যে মজিবুলের ওপর প্রথম থেকেই প্রভাব রেখেছে সেটা আমরা বুঝতেই পেরেছি। এই বাড়িতে এসে সে নিজের শৈশবকে আবিষ্কার করত, কাজেই এই বাড়িতে রাত্রিবাস তাকে যে তরুণ করবে সেটাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

৬৪র দাঙ্গায় আমরা উয়ারিতে ছিলাম, ছাদে উঠে দেখেছি দক্ষিণে বনগ্রামের হিন্দু এলাকায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারপর আমরা বাবার এক প্রিয়জন মুসলমান বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নিই। ১৯৭১ সনে তিনিই আমার মা বাবাকে বাঁচিয়েছিলেন। মজিবুল-রেজওয়ানার মত মানুষের কাছে ৫২ ও ৬৪র দাঙ্গা যেন একটি অন্য জগতের কথা, অথচ কমলের ব্যক্তিত্বকে সেই ইতিহাস গড়ে তুলেছে। কিন্তু মজিবুল-রেজওয়ানা মুক্ত চেতনার মানুষ, তাই তারা কমলের ঘটনাকে নিজেদের জীবনে মানিয়ে নিতে চাইছে, আর ভাল ভাবে মানাতে পেরেছে বলেই তারা মুক্তি পেয়েছে, তরুণ হয়েছে।

আর রেজওয়ানা ও মজিবুলের তারুণ্যে পরিবর্তন কি শুধুমাত্র একটা বোধ নাকি একটি স্যরিয়েল ঘটনার মাধ্যমে তাদের মুক্তির বহিঃপ্রকাশ সেটা পাঠক নিজের ইচ্ছে মতন ভেবে নিতে পারেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন