সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৪

লেখকের নোটবুক : আইজাক বাশেভিস সিঙ্গার

আত্মকথা
আইজাক বাশেভিস সিঙ্গার
অনুবাদ করেছেন :  এমদাদ রহমান

স্মৃতি

আইজাক বাশেভিস সিঙ্গারের জন্ম পোল্যান্ডে, ওয়ারসো’র এক গ্রামে, ১৯০৪ সালে। তিনি বড় হন শহরের ঈদিশভাষী ইহুদি পাড়ায়। সবাই মনে করত তিনিও তার বাবার মতো ইহুদি আইনের শিক্ষক হবেন, কিন্তু বিশ বছর বয়সেই সিঙ্গার ধর্ম বিষয়ক জ্ঞানচর্চা বাদ দিয়ে লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। তিনি ঈদিস লিটারারি ম্যাগাজিনে প্রুফ রিডারের কাজ নেন, পুস্তক-পর্যালোচনা করতে শুরু করেন আর প্রকাশ করেন তার গল্পগুলো। ১৯৩৫ সালে পার্শ্ববর্তী জার্মানির নাৎসি আক্রমন যখন ভয়াবহ আকার ধারণ করে, সিঙ্গার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে এক ঈদিসভাষী পত্রিকায় সাংবাদিকতার কাজ নেন। ১৯৪০-এ সিঙ্গার এক জার্মান-ইহুদি উদ্বাস্তু নারীকে বিয়ে করেন। যদিও বাশেভিস সিঙ্গারের বেশ কিছু উপন্যাস, শিশুসাহিত্য, স্মৃতিকথা আর প্রবন্ধের বই বেরিয়েছে, তবু ছোটোগল্পের লেখক হিসেবেই তিনি বেশি পরিচিত। ১৯৭৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। জীবন শেষ হয় ১৯৯১-এ, ফ্লোরিডায়।


তাঁর জীবনের প্রথম চৌদ্দ বছরের স্মৃতি ‘অ্যা ডে অব প্লেজারঃ স্টোরিজ অব অ্যা বয় গ্রোইং আপ ইন ওয়ারসো।’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে। বইটি মূল ঈদিস থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন শানাহ ক্লাইনেরমান-গোল্ডস্টেইন, এলিনে গতলিয়েব, এলিজাবেথ পোলেট, রোজানা গারবার এবং জোসেফ সিঙ্গার। ইংরেজি অনুবাদ বইটির বাংলায় আংশিক অনুবাদ ‘স্মৃতি’। অনুবাদ করেছেন এমদাদ রহমান।



আমি কে

পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারসো’র কাছাকাছি রেজমিনের শহরতলীতে, ১৯০৪ সালের ১৪ জুলাই আমার জন্ম। আমার বাবা পিঙ্কশ মেনাশেম সিঙ্গার ছিলেন র‍্যাবাই, একজন উচ্চ ধর্মীয় নেতা। তার ছিল লাল দাড়ি, লম্বা কালো জুলফি আর একজোড়া লাল চোখ। আমার মা বাথশেবা ছিলেন বিলগড়ি’র র‍্যাবাই-কন্যা। বিলগড়ি লুবলিন থেকে খুব বেশি একটা দূরে নয়। মা তার লাল রঙের চুল কেটে ছোট করে রাখতেন এবং ঢেকে রাখতেন পরচুলা দিয়ে। বিবাহিত ধার্মিক মহিলাদের জীবনযাপনের রীতিমাফিক তাকে এই কাজটি করতেই হতো।

১৯০৮ সালের শুরুর দিকে, আমি তখন মাত্রই তিন বছরের বালক, আমাদের পরিবার রেজমিন থেকে ওয়ারসো চলে আসে। ওয়ারসোয় আমার বাবা ক্রচমালনা স্ট্রিট নামক খুবই দরিদ্র এক এলাকার র‍্যাবাই হিসাবে নিয়োগ পান। ক্রচমালনা স্ট্রিটের অনেকগুলো পরিবারের বসবাস যে ভবনটাতে,- আমি যেখানে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছিলাম, তাকে বলা যেতে পারে আমেরিকার বস্তি। কিন্তু, সেইসব দিনগুলোয় আমাদের পক্ষে জায়গাটা যে খুব খারাপ তা ভাববার অবকাশ ছিল না। রাত্তিরে আমাদের ঘরটিকে আলোকিত করত কেরোসিনের বাতি। আমরা অপরিচিত ছিলাম পাইপের ভিতরের গরম পানি আর ঘরের সঙ্গে লাগোয়া বাথরুমের সুবিধার সঙ্গে। ভবনের বাইরের ঘরগুলি ছিল প্রাচীরবেষ্টিত আর ছাদবিহীন অংশের সঙ্গে সংযুক্ত।

ক্রচমালনা স্ট্রিটে যারা বাস করত, তাদের বেশিরভাগই ছিল গরিব দোকানদার কিংবা নেহাত খেটে খাওয়া মজুর। এই লোকগুলোর ভিতর এমন অনেকেই ছিল যাদের ছিল বিশেষ প্রতিভা। যেমন ধারিবাজ টোকাইয়ের দল, দাগী অপরাধী আর সেইসব লোক, যারা এসেছিল অপরাধজগত থেকে।

আমি যখন সবে মাত্র চার বছরের বালক, তখন থেকেই চেডারে যেতে শুরু করি। আমাকে সেখানে নিয়ে যেতে প্রতিদিন সকালে একজন শিক্ষক আসতেন।

সেখানে যাওয়ার সময় প্রথমে একখানা প্রার্থনার পুস্তক সঙ্গে নিতাম, পরে নিতে হতো বাইবেল কিংবা তালমুদের কয়েকটি খণ্ড আর আমি জানতাম এগুলই হল আমার এই বয়সের একমাত্র স্কুলপাঠ্য বই। চেডারে আমরা প্রধানত ধর্মীয় বিধিবিধানগুলো পড়তাম। প্রার্থনার জন্য এবং পড়বার জন্য—বাইবেলের অন্তর্গত পুরাতন নিয়ম খণ্ডগুলোর প্রথম পাঁচখানি পুস্তক। আর এখানে শিখতে হয়েছে ঈদিশ ভাষায় কীভাবে লিখতে হয়। আমার প্রথম শিক্ষক ছিলেন একজন বৃদ্ধ, যার ছিল ধবধবে শাদা দাড়ি।

আমার ছোট ভাই মোশে নিতান্তই শিশু যখন আমরা ওয়ারসো চলে আসি। একটি বোন হিনদে এশথার, আমার চেয়ে তের বছরের বড় আর একটি ভাই, ইস্রায়েল যোশোয়া ছিল এগার বছরের বড়। আমাদের পরিবারের সবাই ধরে নিয়েছিলাম মোশে হবে লেখক। তার ‘আশকানযি ভাইয়েরা’ উপন্যাসটি বেশক’টি ভাষায় অনুদিত হয়েছে, ইংরেজিসহ। মোশে লিখত ঈদিশ ভাষায় লিখত, ঠিক যেরকমটি এই এখন আমার ক্ষেত্রে ঘটছে।

আমাদের ঘরটি ছিল এমন যেন এটাও একতা পাঠশালা। বাবা এখানে দিনমান বসে থেকে তালমুদ চর্চা করতেন। মা যখনি সময় পেতেন, পবিত্র পুস্তক খুলে পড়তে বসে যেতেন। আমার ভাইবোনেরা খেলনার হাতিঘোড়া নিয়ে ব্যস্ত পয়ে পড়ত আর আমার খেলনা ছিল বাবার সংগ্রহের বইগুলো। বর্ণমালা শিখবার আগেই আমি লিখতে শুরু করেছিলাম! কলমটিকে কালির দোয়াতে ডুবাতাম আর হিজিবিজি কী যেন লিখতাম! আসলে এখন মনে হয় কাগজে কলমের আঁচড় কাটতাম আর খুব আঁকতে ভালবাসতাম হাতিদের, ঘোড়াদের। বাড়িঘরের ছবি আঁকতাম আর আঁকতাম অনেক অনেক কুকুরের ছবি।

সাবাথের দিনগুলি ছিল আমার জন্যে সবচেয়ে কষ্টের। যেন অগ্নিপরীক্ষা। এই দিনগুলোয় লেখা আর আঁকার মত বিষয়গুলোকে একেবারে ভুলেই যেতে হতো।

আমাদের ওয়ারসো’র এপার্টমেন্টে বাবা র‍্যাবাইয়ের বিচারকক্ষ বানিয়ে ফেললেন। ক্রচমালনা স্ট্রিটের লোকজন তোরাহ আইনের বিভিন্ন জতিলতর বিষয় সমাধানের জন্য বাবার আদালতে ছুটে আসতেন। প্রকৃত অর্থে আমার বাবা ছিলেন র‍্যাবাই আর বিচারকের সমন্বয়ে গড়া এক মানুষ এবং এক আধ্যাত্মিক নেতা। লোকজন তার কাছে হৃদয়ের যন্ত্রণা উপশমের জন্য আসতো। যেন তাদের হৃদয় সত্য বলে। আমাদের ঘরে বিয়ে পড়ান হতো দিনের পর দিন বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনাও ঘটত। সেই সময়ের ইহুদিদের তিনি সম্মানিত র‍্যাবাই ছিলেন, তার কাজ ছিল অনেক, তাতে সম্মান থাকলে পয়সা ছিল না।

প্রকৃতি আমাকে সম্মোহিত করেছিল। আমি খুব আগ্রহি ছিলাম প্রানি, উদ্ভিদ আর কীতপতঙ্গদের বিষয়ে। প্রকৃতির আচরণ আমি খুব খেয়াল করতাম। মনে হত একটু খেয়াল করলেই প্রকৃতির কথা শোনা যাবে। বিস্ময়কর প্রকৃতির নানান বোধ্য আর দুর্বোধ্য ভাষার কথা হয়ত কিছু বুঝতে পারতাম। কিন্তু কখনই পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। ছোটবেলায় বিভিন্ন ধরণের বিষয় নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলামঃ কী হবে যদি একটি পাখিকে অনন্তকাল একই পথ ধরে উড়াল দিতে হতো; কী হতো যদি আকাশ আর পৃথিবীর মধ্যে একটি মই লাগান থাকতো? এই পৃথিবী সৃষ্টির আগে এখানে কী ছিল? সময়ের কি কোন সূচনাবিন্দু ছিল? সময় কীভাবে চলতে শুরু করল? এই মহাশূন্যের কি শেষ বলে কিছু আছে? কিন্তু কীভাবেই বা কোন শূন্যস্থানের শেষ থাকতে পারে?

আমাদের ১০ নম্বর ক্রচমালনা স্ট্রিটের এপার্টমেন্টে একটা ব্যালকনি ছিল। আমি এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এইসব ভাবনায় আক্রান্ত হয়ে বসে থাকতাম স্বপ্নাচ্ছন্ন হয়ে, ঘোরগ্রস্ত হয়ে। গরমের সময় কতরকমের কীটপতঙ্গ যে এখানটায় ভিড় জমাত—মাছি, মৌ-মাছি আর প্রজাপতি। এই সৃষ্টিগুলি আমার ভেতরে চূড়ান্ত কৌতূহলের জন্ম দিত। এরা কেমন করে খায়? কোথায় ঘুমায়? কে তাদের ছোট্ট বুকে জীবন ঢুকিয়ে দিয়েছে? রাত্তিরে চাঁদ আর তারারা আকাশে ঝলমল করত। আমাকে বলা হয়েছিল আকাশে কিছু তারা আছে পৃথিবীর চাইতে বড়। কিছু তারা যদি এতই বিশাল আকৃতির হয়ে থাকে, তবে কেমন করে ক্রচমালনা স্ট্রিটের আকাশের গায়ে লটকে থাকতে পারছে? বাবা-মা’কে প্রায়ই এই বিষয়ে প্রশ্ন করতাম। তারা নিরুত্তর থাকতেন। আমার বাবা এই কথা বলতে অভ্যস্থ- এইসব প্রশ্নকে কখনই মনের ভিতর স্থান দিও না। মা বলতেন- অনেক বড় হলে পর এই প্রশ্নের উত্তর জানতে পাবে। কিন্তু খুব শিঘ্রই আমি বুঝতে পারলাম বড়রাও পৃথিবীর সব প্রশ্নের জবাব জানেন না!

এখানে, ক্রচমালনা স্ট্রিটে প্রতিদিনই মানুষ মারা যায়। কারো মৃত্যুর খবর পেলে মনে মৃত্যু বিষয়ে ভয় তৈরি হয়, মৃত্যু আমাকে আশ্চর্য করে। ভাল আত্মাগুলো মরার পর স্বর্গসুখ ভোগ করে- মা এই কথা বলে আমার ভয় কাটাতে চায়। কিন্তু ভাল আত্মাগুলো স্বর্গে আসলে কী করে? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। স্বর্গে আত্মাদের কেমন চেহারা হয়? তারা কী দেখে? এই ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে মনের ভিতর দীর্ঘ এক দুশ্চিন্তাময় অবস্থার সৃষ্টি হয়, নরকের ভয়াবহতার কথা ভেবে। অপরাধী আত্মাগুলো শাস্তি ভোগ করে। যখন তরুণ ছিলাম, মানুষের জীবনের ভয়াবহ বিপর্যয় সম্পর্কে আমি খুবই সচেতন হয়ে উঠি। পোল্যান্ডকে তখন ক্ষতবিক্ষত করে ফেলেছে রাশিয়া, জার্মানি আর অস্ট্রিয়া। পোল্যান্ড তার স্বাধীনতা খুইয়ে বসে ছিল এক’শ বছর আগে, আর আমরা, ইহুদিরা দেশহীন হয়ে পড়ি মোটামুটি দু’শো বছর আগে। বাবা আমাকে এই বলে সান্ত্বনা দেন এই বলে- সম্ভবপর পন্থায় ইহুদিরা যদি পবিত্র উদ্দেশ্যে নিজেদের পরিচালনা করতে পারে, তাহলে যীশু আবার মসীহ আবার আসবেন এবং আমরা আমাদের ইস্রাইলে ফিরে যেতে পারব। কিন্তু দু’শো বছরের এই অপেক্ষা বড় বেশি দীর্ঘ। বাবা বলেন, আবার এটাও ভেবে দেখা দরকার,- তুমি কীভাবে সুনিশ্চিত হচ্ছ যে ইহুদিরা সবাই ঈশ্বরের বিধান সম্পর্কে পুরপুরি অবধান করবে? ক্রচমালনা স্ট্রিটে বিখ্যাত সব চুর জোচ্চোরের আনাগোনা। তাদের বদান্যতায় মসীহের আগমন পিছিয়ে যাবে, খালি পিছিয়েই যাবে।

আমার জন্মের বছরে ড থিয়দ্যর হার্জল নামক এক মহান ইহুদি নেতা মারা যান। ড হার্জল প্রচার করতেন- ইহুদিদের জন্য সবচেয়ে উত্তম হবে মসীহের আগমনের অপেক্ষায় বসে না থেকে তারা নিজেরাই যেন ফিলিস্তিনকে গড়ে তুলে। কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব হবে, যখন এই ভূমি তুর্কিদের স্বত্বাধীন থাকবে?

ক্রচমালনা স্ট্রিটের বিপ্লবীরা চাচ্ছিল রাশিয়ার জারের নিয়ন্ত্রণ থেকে অব্যাহতি। বিপ্লবীরা স্বপ্ন দেখত এমন একটি দেশের, যেখানে সকলকেই কাজ করতে হবে আর দেশটি হবে ধনী গরিবের সমস্যা থেকে একেবারেই মুক্ত। কিন্তু এত এত তলোয়ার আর রাইফেলওলা সৈন্যর মালিক জারকে কীভাবে কারো পক্ষে সিংহাসনচ্যুত করা যায়? আবার দেশে ধনী-গরিব থাকবে না এটাই বা কী করে সম্ভব? এখানে সবসময়ই কিছু লোকে ক্রচমালনা স্ট্রিটে থাকতে চায়, কিছু লোকে চায় মারশাল্কভস্কিতে থাকতে, যে শহরের রাস্তার দুই পাশ বৃক্ষশোভিত আর দোকানগুলো পণ্যের সম্ভারে বর্ণাঢ্য। কেউ কেউ চায় বড় শহরগুলোয় চলে যেতে। কেউ আবার দূরবর্তী গ্রামগুলোয়। মানুষের এইভাবে একজায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যাবার বিষয়টি নিয়ে বাবার কাছে আসা লোকজন নানান আলোচনা করত। তাদের কথাবার্তার প্রতিটি শব্দই আমি খুব মন দিয়ে শুনতাম। মানুষের অভপ্রয়াণের বিষয়টি আমাকে বিস্মিত করত।

আমার বাবা-মা, বড় ভাই এবং আমার বোন, সকলেই গল্প বলতে পছন্দ করতেন। বাবা আগেকার দিনের র‍্যাবাইদের নানা অলৌকিক ঘটনাবলী শোনাতেন। র‍্যাবাইদের কাহিনীগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকত মৃত মানুষের আত্মা, ভূত-প্রেত, অশুভ আত্মা আর খুদে শয়তানদের কথা। বাবার এই বিষয়ে আমাদেরকে গল্প শোনাবার পেছনের উদ্দ্যেশ্য ছিল ঈশ্বরের প্রতি আমাদের বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে প্রতিষ্ঠা করা আর আমাদের এই কথাটি মনে করিয়ে দেয়া যে শুভ আর অশুভ এই দুই শক্তিই পৃথিবীতে রাজত্ব করছে। মায়ের গল্পের বিষয় আমাদেরকে অন্য দিকে নিয়ে যেত। তিনি বলতেন বিলগোরি’র গল্প। তার বাবা ছিলেন বিলগোরি’র র‍্যাবাই এবং তিনি সেখানকার কমিউনিটিগুলোকে খুব দৃঢ় হাতে নেতৃত্ব দিতেন। আমার ভাই যোশোয়া ছিল একেবারে অন্যরকম। সে ছিল জাগতিক। তার ভাবনাচিন্তা ছিল পার্থিব। সে বিভিন্ন ধরণের বই পড়ত। বইগুলো কোনভাবেই ধর্মীয় অনুশাসনের ছিল না। সে আমাদের জার্মানির গল্প বলত। বলত ফ্রান্সের, আমেরিকার কথা আর আমার কাছে যে জগতের কোনও হদিস ছিল না, সেই জগতের সব জাতি আর বর্ণের মানুষের বিচিত্র বিশ্বাস আর প্রথানুগ আচরনের গল্প। প্রতিটি বিষয়কেই সে খুলে ভেঙে বুঝিয়ে দিত, যেন সে তার গল্পের বিষয়বস্তুকে নিজের চোখে দেখে এসেছে! আর আমার বোনের বলা গল্পগুলিতে থাকে প্রেমের আবেগ। সে গল্প বলে সমাজের অভিজাত ব্যক্তিবর্গের প্রণয়ের। কবে কোন যুবক গৃহভৃত্যের কাল মেয়ের প্রেমে পড়েছিল। আর আমি? আমি ছিলাম অলৌকিক কল্পনায় মগ্ন। সেই বয়সে চেডারের ছেলেদের বলার জন্য আমি নিজে নিজে গল্প বানাতে শুরু করলাম। একদিন তাদের বললাম- আমার বাবা সম্রাট ছিলেন। সম্রাটের এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিলাম যে ছেলেরা আমার গল্পের প্রত্যেকটি দাড়ি কমা সেমিকোলনকে বিশ্বাস করল। আজ পর্যন্ত এটা আমাকে বিস্মিত করে। কীভাবে তারা আমাকে বিশ্বাস করেছিল?! আমার পোশাক পরিচ্ছদ কখনোই রাজপুত্রের মতো ছিল না।

১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। ১৯১৫ সালে- আমার বয়স তখন সবে মাত্র এগার বছর- জার্মানরা ওয়ারসো দখল করে নেয়। ১৯১৭ সালে আমি এই অতিবিশিষ্ট সংবাদটি পাই- জার দ্বিতীয় নিকোলাসের পতন হয়েছে! তলোয়ার আর বন্দুকওলা সৈন্যরা তাকে রক্ষা করতে পারেনি; তারা শেষ পর্যন্ত বিপ্লবীদের পক্ষ নিয়েছে। আহা, তা-ই যদি ঘটে থাকে, তো, এটাও কি সম্ভব হবে যে দুনিয়ায় এখন থেকে আর ধনী কিংবা গরিব মানুষ থাকবে না?

কিন্তু না, এটা স্পষ্টতই প্রতীয়মান যে; সেই সময় এখনও বহু দূরে। ১৯১৭ সালে ওয়ারসো শহরটিতে চরম খাদ্যাভাব দেখা দেয় আর লোকে টাইফাস সংক্রমণের শিকার হয়, যার ফলে দেখা দেয় প্লেগ। আর এইসব রোগাক্রান্ত মানুষদেরকে জার্মানরা জোর করে ধরে এনে রাস্তায় জড়ো করে ভয়ানক সব কাজ করিয়ে নিতে বাধ্য করে। আমাদের পরিবারও ভয়ানক খাদ্য সংকটে পতিত হয় আর আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে মা, ছোট বাচ্চারা, মোশে এবং আমি বিলগোরি’তে আমাদের নানার বাড়ি চলে যাব। আমি তখন মাত্র তের বছরের এক বালক ছাড়া আর কী? এই আমি আমার ভেতরের প্রশ্নগুলোর একটারও কোন উত্তর পাইনি।









যাত্রা- রেজমিন থেকে ওয়ারসো

ট্রেন চলতে শুরু করেছে। আমি জানালার পাশে বসে বাইরের পৃথিবী দেখছি। ব্যস্তসমস্ত মানুষকে দেখে মনে হচ্ছে তারা সব বুঝি হাঁটতে হাঁটতে জীবনের থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। পুরনো দিনের দুঃখের কাছে ফিরে যাচ্ছে! ঘোড়ার গাড়িগুলোও চলছে পেছনের দিকে। টেলিগ্রাফের খুঁটিগুলো যেন প্রাণপণ ছুটছে। আমার পাশে মা আর বোন হিনদেলে, হিনদেলের কোলে ছোট্ট মোশে আর আমরা এখন রেজমিন ছেড়ে ওয়ারসো’র পথে। আমার ভাই যোশোয়া চলেছে এক ঘোড়ায় টানা ওয়াগনে, তার সঙ্গে জাচ্ছে কিছু পুরনো আসবাব আর কাপড়চোপড়ের বোঁচকা। বাবা আগে থেকেই ওয়ারসো’য় আছেন। ১০ নম্বর ক্রচমালনা স্ট্রিটে তিনি এক এপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়েছেন আর সেখানে বসিয়েছেন র‍্যাবাইনিক্যাল কোর্ট।

ছোট্ট রেজমিন থেকে মহানগর ওয়ারসো’য় আমাদের পরিবারকে স্থানান্তরের কাজটা ছিল খুব জটিল আর নানারকম সমস্যা তৈরি হওয়ার মতো কাজ। তবে, এই বিষয়টা আমার কাছে ছিল অনেক আনন্দের। প্রতিটি মুহূর্তে আমাকে জীবনের নতুন নতুন অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে যেতে হচ্ছিল। পুরনো লোকোমোটিভটি (যাকে মজা করে দ্য স্যামোভার বলে ডাকা হতো) হুইশ্যাল বাজাচ্ছে যেন সে একাই চাপা আনন্দে হাসছে! কিছুক্ষণ পরপর লোকোমোটিভটি বাষ্প আর ধোঁয়া ছাড়ছে, যেন সেও বিরাট বড় এক ইঞ্জিন। ধীরে ধীরে আমরা পার হচ্ছিলাম একেকটি গ্রাম, খড়ের চালের কুটিরের সারি আর চারণভূমি, যেখানে গরু আর ঘোড়াগুলি ঘাস খাচ্ছে। দূর থেকে দেখে মনে হয় একটি ঘোড়া আরেকটি ঘোড়ার খুড়ের কাছে তার মাথাটা নামিয়ে দিয়েছে। ক্ষেতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে কাকতাড়ুয়াগুলো, গায়ে ছিন্নবস্ত্র, পাখিরা তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেছে আর উড়ছে আর তারস্বরে ডাকছে আর আমি মা’কে প্রশ্ন করছি একটার পর একটা। ‘মা, এটা কী?’, ‘ওইটা এমন কেন?’ মা আর বোনটি পালাক্রমে উত্তর দিয়ে যাচ্ছেন, এমনকি; সহযাত্রী এক মহিলাও আমাকে অনেক কিছু বোঝাবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাদের প্রাজ্ঞ উত্তরে আমার তৃষ্ণা মিটছে না। সন্তুষ্ট হতে পারছি না। যতই দেখছি, আমার ভিতরে জাগছে অপার বিস্ময়। বুকের ভিতরটা এই সবকিছুর ব্যখ্যা শুনবার জন্য অধীর হয়ে উঠছে। গরুরা ঘাস খাচ্ছে কেন? কেনইবা চিমনির ভিতর থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে? পায়ে না হেঁটে পাখিগুলোর ওড়ার জন্য ডানা থাকে কেন? কেনইবা কিছু লোক পায়ে হেঁটে চলেছে আর কিছু ওয়াগনে চড়ে? মা মাথা ঝাঁকিয়ে বলেন- এই ছেলে দেখি আমাকে পাগল করেই ছাড়বে!

মাত্র দুই ঘণ্টার পথ, কিন্তু এই যাত্রা আমার মনে এমন গভীর এক ছাপ রেখে চলল যে এটা অনেক দীর্ঘ যাত্রা। যতই ওয়ারসো’র নিকটবর্তী হচ্ছিলাম, আমার ভিতর জন্ম নিচ্ছিল অদ্ভুত বিস্ময়। বেলকনিওলা উঁচু উঁচু ভবন দেখা যাচ্ছিল। আমরা পার হচ্ছিলাম বেশ বড় এক সমাধিক্ষেত্র। হাজার হাজার সমাধিশিলা। যেতে যেতে লালরঙা ট্রলিকার পার হচ্ছিলাম। উঁচু চিমনিওলা কারখানা, আবছা দেখা যায় তাদের বিরাট জানালাগুলি বন্ধ। আমার মনে হল এখন আর কাউকে প্রশ্ন করা ঠিক হবে না, বরং নিরব হয়ে যাওয়া ভাল। তারপর একসময়, ছোট্ট ট্রেনখানা ওয়ারসো থামল।

ধূসর ঘোড়ায় টানা চার চাকার গাড়ি ভাড়া করা হল। গাড়িটি চলতে শুরু করল প্রাগ ব্রিজের ওপর দিয়ে। আমাকে বলা হল এই সেই ভিস্তুলা নদী। যে-নদী বয়ে চলেছে এখান থেকে রেজমিনের ওপর দিয়ে। ঘোর আমার কিছুতেই কাটে না। নিজেকে জিজ্ঞেস করি- নদী এতো দীর্ঘ হয় কেমন করে? এখানে এসে এই প্রথম আমি নৌকো আর জাহাজ দেখলাম! একটা জাহাজ এত তীব্র বাজাল আর গোঙানির মত শব্দ করল যে ভয়ে আমাকে কান ঢেকে ফেলতে হল। পাশের ডেকে ব্যান্ডদল গান গাইছে। সূর্যের ঝকঝকে আলোয় তাদের বাদ্যযন্ত্রগুলো এমনভাবে চমকাচ্ছিল যে সেই উজ্জ্বল আলোয় আমার চোখ ধাধিয়ে ধাঁদিয়ে যাচ্ছিল।

প্রাগ ব্রিজ পেরুতে না পেরুতেই আরেক বিস্ময়- কিং জিগমুন্ড মনুমেন্ট! চারটি পাথরের মূর্তি, অর্ধেক মানুষ অর্ধেক মাছ। তারা বিশাল এক পাত্র থেকে পান করছে। আমি যেইমাত্র কিছু জানবার জন্য মুখ খুলতে যাচ্ছি, দেখি নতুন সব বিস্ময়কর দৃশ্য আমার চারপাশ ঘিরে ফেলেছে! সড়কগুলোর দুইপাশে সারি সারি ভবন। দোকানগুলোর জানালায় দাঁড়ানো পুতুল। আমাকে অবাক করে দিয়ে তারা আমার মতই হাসে! ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে থাকা নারীদের মাথায় হ্যাট,- চেরি-পীচ-প্লাম আর আঙুরলতায় বর্ণিল। কারো মুখ অবগুণ্ঠিত। মাথায় টুপি পড়া পুরুষদের হাতে রুপালি হাতলের পাত্র। তারা হাঁটছেন। অনেকগুলো লালরঙা ট্রলি কার। কিছু ঘোড়ায় টানা গাড়ি, কয়েকটিতে ঘোড়া লাগানো নেই। আমার বোনের কাছ থেকে এই মূল্যবান তথ্যটি জানতে পারলাম- এগুলি ঘোড়ায় নয়, বিদ্যুতে চলে। দেখতে পেলাম পাথরের মত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ, শিরস্ত্রাণ পড়া দমকলকর্মী, রবারের চাকার অপর আপনাআপনি চলছে মাল বোঝাই গাড়ি। ঘোড়াগুলো ওপরের দিকে মুখ উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের লেজগুলো কী ছোট। আমাদের নিয়ে চলা ধীরলয়ের গাড়িটির গাড়োয়ানের পরনে একটা নীলরঙা কোট আর উজ্জ্বল কাপড় লাগানো টুপি। মুখের ভাষা ঈডিস। বাইরে থেকে আসা আমাদের কাছে লোকটা ওয়ারসোকে তুলে ধরছিল।

আমি একই সঙ্গে বেশ পুলকিত আর বিনম্র হয়ে যাচ্ছিলাম। ছোট্ট এক বালকের পক্ষে এছাড়া আর কী-ই বা হওয়া সম্ভব ছিল, - এখন, চারপাশের এই তুমুল কোলাহলে পূর্ণ পৃথিবীতে, যখন যেদিকে চোখ যাচ্ছে, মানুষের মহান সব কীর্তি! কীভাবেই বা এখানে সম্পূর্ণ অপরিচিত এক জায়গায় বাবাকে খুঁজে পাবো? কীভাবে ঘরের আসবাবপত্র বোঝাই সেই ওয়াগন আর ভাই যোশোয়াকে হাজারো মানুষের ভীর থেকে খুঁজে বের করবো? আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম যে বড়রা সবকিছু জানে। বড়রাই আমার চারপাশের জগতটাকে তৈরি করেছে। ছোট্ট আমিটি যখন নিরুপায়ের মতো গাড়ির প্রান্তে বসে থাকি, বোনটি আমার হাত শক্ত করে ধরে রাখে, যাতে পড়ে না যাই। যখন গাড়িটি মোড় ঘুরছে, আকাশও তার সঙ্গে পাক খাচ্ছে আর মাথার মগজ খোসার ভিতরে থাকা বাদামের দানার মতো নড়ে উঠছে।

হঠাৎ গাড়োয়ানের গলা- এই যে ক্রচমালনা স্ট্রিট!

ভবনটি বিশাল। বৃষ্টির পানি নেমে যাবার নালার ওপর প্রচুর মানুষ দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই যে এত লোকের ভিড়, তাদের চিৎকার, ঠেলাঠেলি আমাকে কয়েক সপ্তা আগে রেজমিনের এক অগ্নিকাণ্ডের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। ওয়ারসো এসেও আগুন! ছেলেরা চিল্লাছে, লাফাচ্ছে, বাঁশি বাজাচ্ছে, একে অন্যকে জোরে ধাক্কা মারছে... মেয়েরা উচ্চস্বরে হাসছে; এইসব সঙ্গে নিয়ে সন্ধ্যা নামছে ধীরে ধীরে। কেউ একজন লম্বা লাঠির মাথায় আগুন নিয়ে সড়কবাতিগুলয় আলো জ্বেলে দিল। মহিলারা ফেরি করছে রকমারি পণ্য। চিমনিগুলোর মুখে ধোঁয়ার কুণ্ডলী যেন কোন মেয়ের কোঁকড়ান চুলের গুচ্ছ। গেট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকে গেলে যোশোয়াকে দেখতে পেলাম! আমাদের মালবাহী ওয়াগনটি আমাদের আগেই ওয়ারসো পৌঁছে গেছে।

মা যোশোয়াকে বাবার কথা জিজ্ঞেস করলে সে জানায়, সান্ধ্যকালিন প্রার্থনায় যোগ দিতে গেছেন। মায়ের গলা দুঃখে পীড়িত, বললেন- এই শহর এক পাগলা গারদ।

‘উল্লসিত মানুষের জায়গা’, আমার ভাই বলে।

‘এতগুলো লোক বাইরে বের হল কী করে?’



এখন ভিতরে যেতে হলে সিঁড়ি ভাঙতে হবে! আমি সিঁড়ির একটা ধাপে ধপ করে বসে পড়লাম। সিঁড়ি ভেঙে আগে আর কখনোই উপরে উঠিনি। একটা একটা ধাপ পেরিয়ে নিচ থেকে উপরে ওঠার এই বিষয়টা যেমন কৌতূহলোদ্দীপক তেমনি খুবই বিপদজনক বলে মনে হল আমার কাছে। সিঁড়িতেই এক মহিলার সঙ্গে দেখা হল। মাকে বললেন, আপনি কি র‍্যাবাই হুজুরের স্ত্রী? তারপর তার কণ্ঠে বিষাদ, হায় ঈশ্বর, আপনি দেখি পা থেকে মাথাঅব্দি ঢেকে রেখেছেন, হ্যাঁ, আপনিই তার স্ত্রী হবেন। মহিলা হায় হায় করে ওঠেন- প্লেগ এখানকার চুর বাটপাড়দের শেষ করে দিচ্ছে না কেন? কে জানে, হয়ত এক অশুভ আগুন তাদের পাকস্থলীগুলোকে খেয়ে ফেলেছে। যতো দ্রুত পারেন, আপনাদের মালপত্র নামিয়ে ফেলুন, নইলে জোচ্চোরগুলো সব লোপাট করে দিবে। হে সম্মানিত পিতা, মনে হচ্ছে মালগুলো নিয়ে তারা গোরস্তানে হাজির হবে! মা যোশয়াকে বলেন, ওদের দিকে খেয়াল করছ না কেন?

‘তুমি কোনভাবেই সবার দিকে নজর দিতে পারবে না মা। হয়ত তুমি ওদের একজনের সঙ্গে কথা কাটাকাটি করছ, তখন আরও দশজন মালগুলোকে ছিনিয়ে নেবে।’

‘তাহলে কিছুই রইল না?’

‘কিছু না কিছু তো রেখে গেছে।’

‘চুরগুলো সবাই ইহুদি?’

‘কয়েকজন অন্য জাতেরও আছে।’

দরোজা খুলে আমরা রান্নাঘরে প্রবেশ করলাম। গোলাপি রঙ করা দেয়াল। রান্নাঘর থেকে জানালা আর বেলকনি আছে এমন একটা বড় কক্ষে গেলাম। বেলকনিতে গিয়েই ফিরে এলাম। ফের সেখানে গেলাম আর ফিরলাম। নিচে বেশ শোরগোল শোনা যাচ্ছে। উপরে, একচিলতে আকাশ, সেখানে, একটা চাঁদ ঝুলে আছে, চাঁদে হলদে ছোপ। জানালা দিয়ে দেখা যায় ঘরে ঘরে বাতি জ্বলছে। কী যেন হল হঠাৎ, দেয়ালের ফাটলের ভিতর থেকে যেন আগুনের ফুলকি ছুটছে, তাই মনে হল। সঙ্গে সঙ্গে তুমুল হট্টগোল। দ্রুতগামী অশ্ব্যে চড়ে কোত্থেকে জানি ছুটে এল। তার মাথার শিরস্ত্রাণ আগুনের মতো লাল দেখাচ্ছিল। তাকে দেখে বাচ্চারা চিৎকার জুড়ে দিল- অশ্বারোহী প্রহরী, অশ্বারোহী প্রহরী। একটু পরেই আমি বুঝতে পারলাম যে দমকলের এই লোকটা প্রায়ই এখানে, ক্রচমালনা স্ট্রিটে টহল দিতে আসে। এখানকার বাসিন্দারা অগ্নিকাণ্ড না ঘটলেও অফিসে খবর পাঠায় আর অশ্বারোহী ছুটে আসে। এবং হ্যাঁ, সত্যিই আজ আগুন লেগেছে। লেলিহান আগুন জানালা দিয়ে জিব বের করে দিয়েছে। বেলকনিগুলোয় ভিড়। তাগড়া ঘোড়াগুলো ওয়াগন টেনে নিয়ে এসেছে। দমকলকর্মীরা ছোট ছোট কুড়াল, মই আর রবারের নল নিয়ে ভবনের ভিতরে ঢুকছে আর তলোয়ার হাতে পুলিসের দল উৎসুক ভিড়কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে। আমার বোন কেরোসিনের বাতি জ্বালল। মা খুঁজে দেখতে শুরু করেছেন মালপত্রের কী কী অবশিষ্ট আছে। হ্যাঁ, নিয়ে গেছে। দেখতে দেখতে বললেন। পবিত্র প্যাসোভার উৎসবের কাজে লাগে এমন কিছু থালা ছিল, ভেঙে শতখান। ছোট্ট ঘরটিতে দেয়ালের রঙ আর তারপিনের গন্ধ। পাশের এপার্টমেন্ট থেকে গানের কোরাস ভেসে আসছে। আমার ভাই বলে- আসলে এরা গ্রামোফোন রেকর্ড থেকে বাজাচ্ছে। গানে সিনাগগের প্রধান গায়কের গলা আর সঙ্গে তরুণীর বাঁধভাঙা হাসি; মহিলাদের প্যাঁচাল। কিছুই বাস্তব নয়। গ্রামোফোন। আমার ভাই ইতোমধ্যে জেনে ফেলেছে কে এই জিনিসের উদ্ভাবক,- এডিশন ফ্রম অ্যামেরিকা।

‘এরা গান গাইতে গাইতে কথা বলে কী করে?’ মা জানতে চান।

‘তুমি মেশিনটার ভিতরে কথা পুরে দেবে, তারপর সেখান থেকে তোমার কথা পুনরাবৃত্তি হবে।’ যোশোয়া ব্যাখ্যা দেয়।

‘কিন্তু, কীভাবে?’

‘চুম্বকের সাহায্যে…

‘সবকিছু বিদ্যুতের সাহায্যে করা হয়’, বলে আমার বোন।

কিছুক্ষণ পর মা বলেন- ‘বাচ্চাদের এখন ঘুমিয়ে পড়া উচিত।’ ঘুমের পোশাক পড়ে ফেলায় আমি আর বসে থাকতে পারলাম না। ভীষণ ক্লান্তও ছিলাম। বিছানায় গেলাম এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়লাম। চোখ খুললাম যখন, ঝলমলে রোদ্দুরে আমাদের ঘুমের ঘর থৈ থৈ! জানালা খোলা। দেখলাম ঘরের মেঝেটা ঝকঝক করছে। উঠে বেলকনিতে গেলাম। সেই সড়কটিকে দেখলাম, গতকাল যে ছিল রাতের অন্ধাকারে ঢাকা, আজ এখন, দিনের আলোয় উজ্জ্বল দীপ্তিমান। দোকানগুলোয় ক্রেতার ঠেলাঠেলি। পুরুষরা প্রার্থনা শেষে ঘরে ফিরছেন, তাদের বুকের কাছে হাত দিয়ে চেপে ধরা প্রার্থনা-চাদর। ফেরিওলারা হেঁটে হেঁটে পাউরুটি, বাগেল রুল, সিদ্ধ সামুদ্রিক মাছ, সিদ্ধ মটরশুঁটি, ব্রাউন বীন, আপেল, নাশপাতি, আর আলুবোখারা বিক্রি করছে। রাস্তার ঠিক মাঝখানে এক ছোকরা একঝাঁক টার্কি নিয়ে এসেছে। টার্কিগুলি এদিক সেদিক চলে যেতে চাচ্ছে, ছোকরা হাতের লাঠি দিয়ে খুব কৌশল করে তাদের এক জায়গায় জড়ো করছে আর জোর করে তাদের এক জায়গায় রাখতে চাইছে।

বাবা এর মধ্যেই পড়ার টেবিলে বসে পড়েছেন। তার সামনে খুলা রয়েছে তালমুদের বিরাট বিরাট খণ্ড। আমাকে দেখেই ডাক দিলেন। কাছে গেলে খুব মন দিয়ে পাঠ করতে বললেন- ‘তোমাকেই স্মরণ করছি হে পিতা।’ পড়া শেষে বললেন, -‘তোমাকে এখানকার চেডারে যেটে হবে।’

‘আমি তো জায়গাটা চিনি না।’

‘একজন শিক্ষক তোমাকে নিয়ে যাবেন।’

নাস্তায় মা কী যে খেতে দিলেন, আমি জীবনেও চেখে দেখিনি। সিদ্ধ মাছ আর কটেজ চীজ দিয়ে বানানো বাগেল রুল। এই সময় আমাদের এক প্রতিবেশি এলেন। এসেই রাশিয়ার জারের বিরুদ্ধে সংঘটিত বিপ্লবের সময়কার ঘটনাবলী বলতে শুরু করলেন। তরণ বিপ্লবীদের কীভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। শহরের সব দোকানপাঠ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পুলিশের লোকেরা খোলা তলোয়ার নিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কেউ একজন বোমা ছুঁড়ে পালিয়ে গিয়েছিল।

মাথা বিষাদের ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। বাবা হাত বুলাতে লাগলেন তার লাল দাড়িতে। অনেক বছর পার হয়ে গেলেও ক্রচমালনা স্ট্রিটের লোকজনের মনের ভিতর থেকে সেই সময়ের ভীতিকর পরিস্থিতির স্মৃতি এখনও মুছে যায়নি। বিদ্রোহীদের অনেকেই এখনও নগর-রক্ষাকারী দুর্গে কারাভোগ করছেন। অনেককেই সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে পাঠান হয়েছে। আবার অনেকেই পালিয়েছেন অ্যামেরিকায়।

বাবা জানতে চাইলেন, ‘তারা কী চেয়েছিল? জারের হাত থেকে মুক্তি?’

মা ফ্যাকাসে হয়ে গেছেন। আমি চাইনা আই ছেলেটি শুনুক কী কী ঘটেছিল। প্রতিবেশী বললেন, ‘সে কি আর এসব বুঝতে পারবে?’

আমি, যেভাবেই হোক, ঘটনাগুলো শুনেছিলাম। শোনবার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা আমায় পেয়ে বসেছিল।





বিলগোরি যাত্রা

১৯১৭ সালে আমাদের অবস্থা এতোই শোচনীয় হয়ে পড়লো যে আমাদের পক্ষে আর ওয়ারসো থাকা সম্ভব ছিল না। চব্বিশ ঘণ্টার পুরোটাই আমাদের অভুক্ত থাকতে হতো। তাইফাস তখন মহামারীর রূপ নিয়েছে। ইস্রায়েল যোশোয়া হাযামির শহরের এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়েছে, কিন্তু সে মাইনে যা পায়, তাতে তার নিজেরই খরচ চলে না। এদিকে যোশোয়া ‘জার্মান’ হয়ে গেছে, সে অর্থদক্স পোশাক পড়া ছেড়ে দিয়েছে, তার বদলে পড়তে শুরু করেছে কালো হ্যাট আর খাটো জ্যাকেট। প্রবল ধর্মে বিশ্বাসী আমার বাবা তাকে নিয়ে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। বাবা রেজমিনে র‍্যাবাই হিসাবে যোগ দিলেন আর তিনি নিজেই তার ধর্ম বিষয়ক লেখাপত্রের সম্পাদক হলেন। কিন্তু র‍্যাবাইরা কখনোই যথাযথ হিসাবে পয়সা পেতেন না।

আমাদের জন্য আশার জায়গা ছিল একটাই- বিলগোরি, যেখানকার র‍্যাবাই আমার নানা। কিন্তু সমস্যা হল বিলগোরি তখন অস্ট্রিয়ার দখলে, তার ওপর অস্ট্রিয়া আর জার্মানি এক জোট। এই অবস্থায় চিঠিপত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ ছিল প্রায় অসম্ভব। তাছাড়া স্বাভাবিক সময়েও চিঠি লেখার ব্যাপারটা বিলগোরি’র আত্মীয়দের কাছে প্রিয় বিষয় ছিল না। এদিকে, মা একদিন স্বপ্নও দেখে ফেললেন- তার বাবা মারা গেছেন!

আমাদের জানা ছিল, জার্মান দখলদারিত্বের চেয়ে অস্ট্রিয়ার অধীনে এখানকার গ্রামগুলোয় খাদ্যের মজুদ ছিল অনেক বেশি; আর শুধু একারণেই দশ হাজারেরও বেশি মানুষ ওয়ারসো’র অস্ট্রিয়ান কনসিউলেটের সামনে অপেক্ষমান ছিল- ভিসার জন্য। অপেক্ষমান মানুষের সারি ছিল বেশ দীর্ঘ এবং পরিবারগুলোর সদস্যরা একজন একজন করে বদলে বদলে সারিতে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখছিল। আমরাও দিনের পর দিন অপেক্ষমান। মাঝে মাঝে আমি, মাঝে মাঝে মা, ইস্রায়েল যোশোয়া... অবশেষে, ১৯১৭’র জুলাইয়ে আমরা ভিসা পেলাম। মা, ছোটভাই মোশে এবং আমি বিলগোরি যাত্রা করলাম। বাবা পরে আসবেন। ইস্রায়েল যোশোয়া সম্পর্কে আর কী বলব, তার পরিকল্পনা সব সময় অন্যরকম। সে এক মেয়ের সঙ্গে ওয়ারসো চলে গেল, থাকতে শুরু করল সেই মেয়ের পরিবারের সঙ্গে। ঈডিস প্রেস অভ ওয়ারসো’য় প্রকাশ করতে শুরু করল তার লেখা নিবন্ধ আর গল্পগুলি। বিলগোরি- বহুদূরের এই জঙ্গলঘেরা গ্রামটি যোশোয়ার জন্য উপযুক্ত জায়গা ছিল না।

মনে হল বহুদিন পর দৈন্যদশা থেকে মুক্তি পেতে চলেছি। আমি আমার বন্ধুদের বিদায় জানালাম আর যাত্রার জন্য প্রস্তুতি নিলাম। খেয়াল করলাম যে আমার জুতাজোড়ার অবস্থা খুবই করুণ। কী আর করা, ঘরের কাছের জুতামিস্ত্রীর কাছে ঠিক করাতে নিয়ে গেলাম।

বাইরে, রোদে ঝলমল করা দিন আর মিস্ত্রির ঘরে যাওয়ার সিঁড়ির ধাপগুলো কী অন্ধকার! করিডোর স্যাঁতস্যাঁতে এবং কালিঝুলিমাখা চেটচেটে, অসহ্য। অন্ধকারের ভিতর পা টিপে টিপে আমি ছোট্ট একটা কক্ষে ঢুকলাম। আবছা দেখা গেল কক্ষটিতে ময়লা, পুরনো ছেঁড়া কাপড় আর টালমারা জুতা। বেঁকে যাওয়া ছাদ। খুপরি জানালা। শার্সির ভাঙা কাচে কার্ডবোর্ড। আমি ভাবছিলাম, আহা, ঘরের কী বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা... অবশেষে বেশ চওড়া একটা ঘর পাওয়া গেল আসবাব আর বইপত্রে ঠাসা। দু’খানা বেশ পরিপাটি খাট পাতা, একটির ওপর, ঠিক মাঝখানে, শুয়ে আছে এক নবজাত শিশু। শিশুটিকে কেউ যেন খাটের ওপর ভাঁজ করে শুইয়ে রেখেছে। ন্যাড়ামাথা এবং মুখে একটিও দাঁত নেই। দেখতে একেবারে ক্ষুদে থলের মতো। পাশেই, বাচ্চাটির মা হবেন, উনুনে কী যেন রাঁধছেন; ধোঁয়া বেরোচ্ছে। আর, গর্তে ঢুকে যাওয়া গালে লাল দাড়ি, চওড়া কপাল আর পানশে-হলুদ চামড়ায় মোড়ানো এক যুবক বসে আছে কারিগরের আসনে।

অপেক্ষা করছিলাম কখন আমার জুতাজোড়া ঠিক হয়। ধূলি আর বিশ্রী গন্ধে আমার কাশি উঠছিল, মনে করছিলাম আমার ভাইয়ের বলা কথা- আলস্যপরায়ণ মানুষ তাদেরকে যখন মন দিয়ে দেখবে, জীবনে কর্মের গুরুত্বটা বুঝতে পারবে এবং সাফল্য লাভ করবে।

দিনে দিনে এইসব অন্যায় অবিচারের বিষয় মাথায় নিয়ে জীবনের পথে অগ্রসর হচ্ছিলাম। তরুণরা ধীরে ধীরে মারা যাবে কিংবা, মারাত্মক রকমের আঘাত পেয়ে পঙ্গু হবে, কিছু মানুষ, যারা দিনরাত অমানুষিক পরিশ্রম করবে কিন্তু এক টুকরো পাউরুটি কিনতে পারবে না; পারবে না জামাকাপড় কিনতে কিংবা দিতে পারবে না তার সন্তানকে ঘুম পারাবার ছোট্ট একটি খাট। এই জুতামিস্ত্রি, আমি জানি, আমি নিশ্চিত, খুব বেশিদিন কাজও করতে পারবে না। আজ কিংবা কাল, সংক্রামক ব্যাধি তাকে আক্রান্ত করবেই, না হলে মারাত্মক ক্ষয়রোগ তাকে খেয়ে নেবে। কীভাবে তবে এই শিশুটি এই ধোয়া, ধূলি, এই পুতিগন্ধময় অবস্থার ভিতর সতেজে বেড়ে উঠবে?

ইস্রায়েল যোশোয়া’র মত ছিল- আসলে কেউই ক্ষমতায় টিকতে পারবে না। না নিকোলাস, না উইলহেল্ম, ক্যারল, ইংলিশ রাজা এবং আরো যারা আছে,- সবাই বিতাড়িত হবে এবং প্রজাতন্ত্র কায়েম হবে। যুদ্ধ রাজাদের পরাস্ত করবে, জনপ্রিয় শাসন জারি হবে। কেন তবে এখনও তা হয় নি? কেন শাসকগণ এতটা স্বৈরতান্ত্রিক?

জুতা ঠিক হয়ে গেলে আবার আমি সূর্যের ঝকঝকে আলোয় চলে আসি এবং নিজেকে খুব অপরাধী লাগে। কেন আমি সুন্দর আগামীর আশায় এক আনন্দময় যাত্রায় বের হচ্ছি, যখন জুতামিস্ত্রি এই লোকটা ধূলিধূসর অন্ধকার ঘরে আটকে আছে? আজ এই মানুষটি আমাকে দেখিয়ে দিল সমাজের অসুস্থ চেহারার ছবি। যদিও আমি শুধুই এক বালক মাত্র, তবু, ক্রচমালনা স্ট্রিটের সেই বিপ্লবীদের সমর্থন করছি, তা সত্ত্বেও; ভালবাসা অনুভব করছি রাশিয়ার জার সম্রাটের জন্য, যিনি মানুষকে কাঠ কাটতে বাধ্য করেছিলেন।

আমার ভাই যোশোয়া ড্রস্কিতে চড়ে ডানজিঙ স্টেশন পর্যন্ত আমাদের সঙ্গী হল। ডানজিঙকে সেই সময় ভিস্তুলা স্টেশন বলা হতো। সে আমাদের টিকিট কিনে দিলে আমরা প্ল্যাটফর্মে গিয়ে ট্রেনের অপেক্ষা করতে থাকি। বিষয়টা আমার কাছে খুব অদ্ভুত লাগছে- এই ঘোরলাগা মায়াময় জায়গাগুলো আর বন্ধুদের ছেড়ে আমি চলে যাচ্ছি! দীর্ঘকায় লোকোমোটিভটি কাশতে কাশতে, সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আমাদের বহুদূর নিয়ে যাবার জন্য তৈরি হয়ে গেলো। ভয়ংকর দেখতে চাকাগুলোয় ঝুলকালি মাখা দেখে মনে হয় যেন চাকার ওপর চুইয়ে পড়ছে ঘন জ্বলা তেল। ইঞ্জিনের ভিতর আগুন জ্বলছে। যাত্রী হাতেগণা কয়েকজন মাত্র। আমরা নিজেদের আবিস্কার করলাম একটা খালি কামরায়। জার্মান-অস্ট্রিয়া বর্ডার এখান থেকে মাত্র চার ঘণ্টার দূরত্বে, ইভানগারোদে, পরে এই জায়গাটার নাম হবে ডাবলিন।

এক কানফাটা হ্যুইশ্যাল মেরে, ট্রেনখানা চলতে শুরু করল। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো আমার ভাইকে দেখে মনে হচ্ছিল সে ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যাচ্ছে।

এটা খুবই রোমাঞ্চকর যে পৃথিবীরে এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে উড়ছে, ক্রমাগত মসৃণ বেগে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঘরবাড়ি, গাছপালা, ওয়াগন আর রাস্তাগুলি ঘুরছিল চক্রাকারে এবং ভেসে বেড়াচ্ছিল শূন্যে যেন পৃথিবীতে এক বিপুল উল্লাসের ঘূর্ণি উঠেছে। দালানগুলো নাচছে, চিমনিগুলো যেন মাটি ফুঁড়ে আকাশের দিকে উঠে আসছে- ধোঁয়ার বনেট গায়ে জড়িয়ে। সোবোল টাওয়ার, রাশিয়ান অর্থডক্স চার্চ দেখা দিচ্ছে আবছাভাবে। ক্রুশগুলো ঝলমল করছে সোনার মতো, সূর্যের আলোয়। পায়রার ঝাঁক, কাল আর সোনালি রঙের মিশেলে, ঘুরপাক খেতে থাকা ছন্দিত শহরের আকাশের অনেক উপরে উড়ছে, আর আমি; কোন এক রাজা কিংবা জাদুকরের মতো- পৃথিবীর পথে বের হয়েছি। সেনাবাহিনীকে ভয় করছি না, ভয় পাচ্ছি না পুলিশকে, অ-ইহুদি বালকদের, কিংবা ভয় করছি না উদ্দ্যেশ্যহীন ভবঘুরেকে।

ব্রিজ পার হওয়ার সময় চকিতে দেখে নিলাম পাশের আরেকটি ব্রিজের ওপর ছোট্ট একটি ট্রলি এবং জড়ো হওয়া মানুষের ভিড়। মনে হল পঙ্গপাল। তাদের চলাচলের রাস্তাটি দেখে মনে হচ্ছে গুপ্তচরেরা মসীহের সময় থেকেই এই অতিকায় সময়-দানবের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। দীর্ঘতম ভিস্তুলার বুকে এক পালতোলা জাহাজ, গ্রীষ্মের আকাশের বুকে ভেসে চলা মেঘেদের দেখেও পালতোলা জাহাজ মনে হচ্ছে, মনে হচ্ছে রূপকথার অতিকায় পশুদের দল, মনে হচ্ছে মেঘের স্তম্ভগুলো আকাশের উঁচু থেকে এখনি নেমে আসবে। ট্রেন বারবার ভেঁপু বাজাচ্ছে। বারবার। মা ছোট্ট বাকসো থেকে কুকিজ আর দুধের বোতল বের করলেন। ‘আশীর্বাদবাণী উচ্চারণ করো’...

খাবার পেটে যেতেই আমি যুদ্ধের কথা বেমালুম ভুলে গেলাম, ভুলে গেলাম ক্ষুধা আর রোগব্যাধির কথা। আমি এখন চাকার ওপর এক স্বর্গে বসে আছি, যদি এই যাত্রা অনন্তকাল ধরে চলতে থাকে!

এমনকি আমার বন্ধু বারোখ-দোভিডও জানতে পারবে না ওয়ারসো’র নানা প্রান্ত এবং তার আশপাশের আরো আরো জায়গা সম্পর্কে, যা আমি এখন দেখছি। আমি একটি ট্রলি দেখেও বিস্ময়াবিভূত হচ্ছি। যদি এই ট্রলিটি আমাকে সঙ্গে করে পৃথিবীর পথে পথে ঘুরত! কিন্তু তা তো আর সম্ভব নয়। আমরা এক সমাধিক্ষেত্র পার হচ্ছিলাম। দেখে মনে হচ্ছিল এই হচ্ছে সমাধিফলকের মহানগরী। প্রচণ্ড ভয় আমাকে ঝাপটে ধরে, আমি ভাবতে থাকি যদি এখানে রাত্তিরে একা হাঁটতে আসি কিংবা দিনের যেকোনো সময়ে... কিন্তু মৃত্যু নিয়ে এতো ভয় জন্ম নিচ্ছে কেন, যখন তুমি চলন্ত ট্রেনের যাত্রী?

ওয়ারসোতে প্রত্যেকেই ভীষণ ক্ষুধার্ত, কিন্তু আমি আজ পৃথিবীর যেসব জায়গা ভ্রমণ করছি, তা কী সুন্দর আর সবুজ! মা জানালা দিয়ে হাত তুলে দেখাচ্ছেন গম, বার্লি, বাজরা আর আলু’র বিস্তীর্ণ ক্ষেত, আপেল আর নাশপাতির বাগান; ফলগুলো এখনও পাকেনি। মা এক ছোট্ট জনপদ দেখালেন। কৃষকরা খড় কাটছে, নারী আর মেয়েরা লাঙলের গভীর দাগের ওপর গোল হয়ে বসে শেকড়বাকড়সুদ্দ আগাছা টেনে তুলছে, মা বললেন, এরা খাদ্যশস্য নষ্ট করছে।

হঠাৎ আমার নজরে এলো এক অলীক প্রাণী, যার বাহুগুলি দুই দিকে প্রসারিত। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘এটা কী মা?’

‘পাখিদের ভয় দেখানো কাকতাড়ুয়া।’

আমার ভাই মোশে জানতে চাইল এটা জীবিত কিনা।

না রে বোকা।’

আমি দেখলাম সে আসলেই জীবিত নয়, তবুও মনে হল আনন্দে হাসছে। ক্ষেতের একেবারে মাঝখানে সে এমনভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে যেন শুধুই এক মূর্তি। পাখিরা তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে আর কিচিরমিচির করছে।

সন্ধ্যা নামার আগে একজন কন্ডাক্টর এলেন, টিকিটগুলোয় ছিদ্র করলেন আর মায়ের সঙ্গে মাত্র কয়েকটি শব্দের কথা বললেন আর খুব ঝানু চোখে আমাদের জিনিসপত্রের ভিতর বিশেষ কিছু আছে কিনা দেখলেন। লোকটা দেখতে ইহুদিদের মত, তবে তার চেহারা দেখে মনে হল কী যেন এক বিভ্রান্তি কাজ করছে তার ভিতরে। মনে হচ্ছে লোকটি যে প্রজন্মের, তার আগের প্রজন্ম থেকেই তারা ঠিক ইহুদি না হলেও ইহুদিদের সঙ্গেই বাস করছে।

আলো ক্রমেই কমে আসছিল, আর সবকিছু সুন্দর থেকে আরো সুন্দরে ভরে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, চারপাশের ফুটে থাকা ফুলগুলো স্পষ্ট থেকে আরো বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সবকিছু সবুজ, সবকিছু পৃথিবীর বুকের ভিতরের রসে পূর্ণ; অস্তগামী সূর্যের রশ্মিতে দীপ্তিমান, সুগন্ধময়। আমি বাইবেলের পঙক্তি মনে করলাম- আমার পুত্রের গায়ের গন্ধ যেন সেই শস্যক্ষেতের মতো, যীশু যাকে পবিত্র করেছিলেন।

আমার মনে হল এই বিস্তৃত শস্যক্ষেত্র, এই চারণভূমি আর এই জলাভূমিই হল ইসরাইলের ভূমিখণ্ড। ইয়াকুবের পুত্ররা এখানেই কাছে কোথাও মেষপাল চড়াচ্ছে। জোসেফ শস্যগুলোকে নাড়ছেন আর অন্যরা আলাদা আলাদা করে বাঁধছেন। ইসমায়েল উটে সওয়ার হয়ে এখনি এসে পড়বেন। তাদের গাধা আর খচ্চরগুলোর পিঠে বোঝাই করা হচ্ছে কাঠবাদাম, লবঙ্গ, ডুমুর আর খেজুর। বৃক্ষরাজির পেছনে বেথলেহেম আর জেরুজালেমের সেই মামড়ি সমতলভূমি দেখা যাচ্ছে। ঈশ্বর আব্রাহামকে জিজ্ঞেশ করছেন- সারাহ কী কারণে হাসছে? যীশুর জন্যে কোন কিছু কি অসম্ভব? আমি অবশ্যই আবার তোমাদের কাছে প্রত্যাবর্তন করব এবং সারাহ এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিবে।

হঠাৎ কী যেন একটা বিশাল জিনিসের দিকে চোখ গেলো। মাকে জিজ্ঞেস করলে বললেন- ‘উইন্ডমিল।’

তার দিকে ভাল করে তাকাবার আগেই তার পাখাগুলো কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেলো, যেন এক জাদুকর তাকে নিয়ে খেলছে, পরক্ষণে তাকে আমাদের পেছনের দিকে দ্যাখা যায়। পাকাগুলো ঘুরতে ঘুরতে ময়দা তৈরি হচ্ছে।

আমরা একটা নদী দেখতে পেলাম। মা বললেন, এটা ভিস্তুলা নয়। তারপর দেখলাম একপাল গরু- লাল, কাল, চিত্রল- ঘাস খাচ্ছে। দেখলাম মেষের পাল। পৃথিবীকে মনে হচ্ছে বাইবেলের পৃষ্ঠা। আকাশে ঝলছে চাঁদ আর এগারটি তারা। মিশরের ভবিষ্যৎ শাসক, জোসেফকে, তারা মাথা নুইয়ে অভিবাদ জানাচ্ছে।

আমরা যখন পৌঁছলাম, তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে, তখন ইভানগারোদ স্টেশন আলোয় ঝলমল করছে। আসলে আমরা এখানে বর্ডারের কাছে এসে গেছি। এক হাইওয়ের পাশেই বর্ডার। মা জানালেন- ‘আমরা এখন অস্ট্রিয়ায়।’ পুরো স্টেশন সেনাবাহিনীর লোকজনে ভরা। সৈন্যরা দৈহিকভাবে লম্বাচওড়া নয়, পাথরের মতো নিশ্চল নয়, আবার দেখতে জার্মানদের মতো ভয়ংকরও নয়। অনেকেই দাড়ি রেখেছে আর দেখতেও ইহুদিদের মতো। পায়ে বুট আছে আর হাঁটু থেকে গোড়ালি পর্যন্ত কাপড়ের পট্টি বাঁধা। স্টেশনের তুমুল হট্টগোলের ভিতর আমাদের রেজমিনের পড়ার ঘরে ছুটির সময়ের দ্বিতীয় রাতের কথা মনে পড়ে গেলো। হলিডে ডিনার রান্নার জন্য বউদের ছেড়ে দিয়ে লোকগুলো গল্প করছিল, সিগারেট টানছিল আর নানারকম অঙ্গভঙ্গি করছিল। আমার ভাইকে বললাম,- ‘চলো, দাবা খেলি।’ আমরা কেউই জানতাম না এখানে ঠিক কত সময়, কত দিন আর কত কাল পড়ে থাকতে হবে।

খুব দ্রুতই আমরা দাবার ঘুঁটি আর বোর্ড বের করে টেবিলে খেলতে বসে গেলাম, সৈনিক আর ননকমিশনড অফিসারদের জটলার মাঝখানে। ইহুদি সৈন্যরা আমাদের জিজ্ঞেস করল- ‘তোমরা কোথা থেকে এসেছ?’

‘ওয়ারসো।’

‘কোথায় যাবে?’

‘বিলগোরি। আমাদের নানা সেখানকার র‍্যাবাই।’

এক দাড়িওলা সৈন্য বলল সে বিলগোরিতে ছিল আর সেখানকার র‍্যাবাইকেও চিনে। আরেকজন আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে দেখিয়ে দিল কোন পথে আমরা রওয়ানা দিব। সৈন্যরা মোশেকে কোলে তুলে নিল আর তারাই, শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর লোকেরাই আমাদের খেলা খেলতে শুরু করে দিল। আমরা রওয়ানা দিলাম। মা আমাদের দিকে দেখছিলেন চিন্তিত কিন্তু গর্বিত মুখাবয়বে। সৈন্যদের দেখে ফরাসি ইহুদি মনে হচ্ছে যারা সাবাথের সময় হ্যাট আর আঙ্খারা ছাগলের লোম দিয়ে তৈরি কোট পড়ে থাকে। তাদের মুখের ঈদিস ওয়ারসো’র ঈদিশ থেকে কিছুটা কোমল। একজন সৈন্য আমার ভাইকে তার তলোয়ার ধরতে দিল আর মাথায় টুপি পড়িয়ে দিল।

আজ আমার আর মনে নাই কেমন করে আমরা সেই রাতটা কাটিয়েছিলাম। পরের পুরোটা দিন আমরা রেজোয়েক উদ্দ্যেশে প্রায় খালি এক রেলকারে চড়ে যাত্রা করেছিলাম।

এই সেই রেজোয়েক, এখানে আছে এক বন্দিশিবির। এই শিবিরে রাশিয়ানদের আটকে রাখা হয়েছে । দেখলাম উস্কুখুস্কু চুল আর ছেঁড়া উর্দি পড়া রাশিয়ান সৈন্যরা অস্ট্রিয়ান

সৈন্যদের প্রহরায় খনন কা জ করছে। সেনাবাহিনীর খাদ্যের গুদামের কাছে ব্যাপক ভিড়। খাদ্যগুদাম পাহারা দিচ্ছে এক ইহুদি সৈন্য। তার মুখের দাড়ি বেশ পরিপাটি। অস্ট্রিয়ানদের জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে জার্মান বলতে গিয়ে। রাশিয়ানদের কথাবার্তা এমন শোনাচ্ছে যেন তারা ভাঙা ঈদিসে কথা বলছে। এদের মধ্যে শুধু কিছু ইহুদি সৈন্যই খাঁটি ঈদিসে কথা বলতে পারছে।



এই রাশিয়ান যুদ্ধবন্দিরা রেজোয়েক থেকে যায়েরযানিয়েক পর্যন্ত দীর্ঘ এক সড়ক তৈরির কাজ করছিল, পরের দিনও ঠিক একই কাজ করতে হয়েছিল তাদের, আমরা যেদিন যাত্রা করেছিলাম। নিকোলাসরা যখন কাঠ কাটছে, কসাকরা তখন ঈদিস শিখছে। তারা সকলে প্রত্যেকে জানে, ঈশ্বরের প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী মসীহে আসছেন। এখনও আসার পথেই আছেন!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন