সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৪

নীহারুল ইসলামের গল্প : আলেয়া

মোফি আমাদের দোস্ত লাগে। যদিও সে আমাদের সঙ্গে স্কুলে পড়ে না। সে তার বাপের ঘর-গেরস্থিতে কামকাজ করে। তার বাপ সাবেদ সেখের পড়াশুনোতে আস্থা নেই। পড়াশুনোর কথা শুনলে সাবেদ সেখ আমার আব্বার উদাহরণ টেনে বলে, লেখে-পড়হে সাজ্জাদমাস্টারের মুতোন ছিঁড়ে বেড়াইবে নাকি? তাছাড়া সাজ্জাদমাস্টার ছেল্যা পড়হিয়ে ক’বিঘা ভুঁই কিন্যাছে দেখাও তো দেখি!

একেবারে সত্যি কথা। মাস্টারি করে আমাদের মানুষ করা যেখানে আমার আব্বার লক্ষ্য, সেখানে সাবেদ সেখের লক্ষ্য বছর বছর জমি কেনা। এই তো, গত বছর আমার বড়ভাইকে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি করতে প্রচুর টাকা লেগেছে। ওই টাকা জোগাড় করতে আব্বাকে আমাদের মরিচডাঙার আড়াই বিঘার দাগটা বিক্রি করতে হয়েছিল। মরিচডাঙার সেই আড়াই বিঘা জমির মালিক এখন সাবেদ সেখ। স্বভাবতই সাবেদ সেখের ওরকম কথা বলা সাজে। আব্বা কিংবা আমরা তার ওই সব কথা নিয়ে ভাবি না।

আমাদের গ্রাম সংলগ্ন যে ডিহিটা আছে, কালীপালের ডিহি! আমরা রোজ বিকেলে সেখানে খেলে বেড়াই। ঘর-গেরস্থির কামকাজ শেষ করে মোফিও সেখানে আমাদের সঙ্গে খেলতে আসে। আসে সবার শেষে। একটুখানি খেলার সময় পায় কি পায় না, তবু ওইটুকু সময় মোফি আমাদের সঙ্গ ছাড়া নাকি থাকতে পারে না! তার কথাঃ সারা দিনমান যা হল তা হল দোস্ত! এই সুমায়ে তোধের এইটুকুন সাথ না পেলে হামার দম বন্ধ হুই আসে। মুনে হয় হামি যেনে পাগল হুই যাবো!


দুই

মোফির বড়ভাই সফির বিয়ে হয়েছিল অনেক কাল আগে। তখন আমরা খুব ছোট। সেকথা আমাদের মনে ছিল না। কে জানে, হয়ত সেকথা আমাদের মনে করিয়ে দিতেই সাবেদ সেখ হঠাৎ মোফির বিয়ে জুড়ে বসল। আর, আমরা খুব উৎসাহিত হয়ে উঠলাম। মোফির বিয়ে হবে! আমাদের দোস্ত মোফি বউ নিয়ে শোবে! তারপর, সে তার বউয়ের সঙ্গে কী কী করবে, কালীপালের ডিহিতে এসে আমাদের সেই সব গল্প শোনাবে! আমরা তার গল্প শুনবো। আমরা মজা পাবো। আর, আমাদের মজা মানেই মোফির মজা। কারণ, মোফি আমাদের দোস্ত লাগে।

তবু আমরা মজা পাওয়ার আগে মজা পেতে মোফিকে একদিন জিজ্ঞেস করি, কী রে- বুলবি তো?

মোফি ঘুরিয়ে আমাদের জিজ্ঞেস করে, কী বুলবো?

- রাইতে বহুর সাথে শুতি কী কী করবি সেই সব গল্প!

- বুলবো। কেনি বুলবো না? তোরা হামার দোস্ত লাগিস! তোধের বুলবো না তো কাধের বুলবো?



আমাদের আর এক দোস্ত কাজেম। সে এক ধাপ এগিয়ে বলে, বুলবে কী- হামরা চাহিলে মোফি অর লয়া বহুর পাঁজরে হামাদেরকে শুতেও লিবে। তারপর মোফিকে উদ্দেশ্য করে বলে, কী বে মোফি- লিবি তো?

মোফি বলে, লিবো না কেনি? শুতলেই হলো! কেনি- এখুন কি হামরা পাশাপাশি শুতি নাই খো?

যখন আমরা এই সব কথা বলাবলি করি, ভর সন্ধ্যাকাল। সূর্য সবে অস্ত গেছে। পশ্চিম আকাশটা রক্তলাল! আকাশ থেকে লাল রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে পশ্চিম দিগন্তে। সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা কালীপালের ডিহিতে ঘাসের ওপর পাশাপাশি শুয়ে আছি। সারা বিকেল খেলাধূলার নামে দৌড়ঝাঁপের পর শরীরের ঘাম শুকিয়ে নেওয়া। সেই সুযোগে নিজ নিজ বাড়ি ফেরার আগে কিছু অন্তরঙ্গ কথাবার্তা! যার রেশ রাত্রে ঘুমিয়েও আমরা আমাদের স্বপ্নে টের পাই।

তিন

মোফির কোথায় বিয়ে? কার সঙ্গে বিয়ে? আমরা কিছু জানি না। কিংবা, সেটা যে একটা জানার মতো বিষয় সেটাও আমাদের অজানা। মোফির বিয়ে হচ্ছে এটাই আমাদের কাছে খুব বড় একটা ঘটনা। এবং সেটা কত তাড়াতাড়ি হয়, আমাদের অপেক্ষা তারই। ভেতর ভেতর আমরা অধৈর্য হয়ে পড়ছিলাম। তার মধ্যেই একদিন শুনলাম, সামনের শুক্রবার মোফির বিয়ে। সেই বিয়েতে আমাদের বরযাত্রী যেতে হবে। মোফির আব্বা আমাদের জিয়াফত করেছে।

শুক্রবার জুম্মাবার। পবিত্র দিন। ছেলেবুড়ো সবাই সেদিন দুপুরে মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে যায়। আমাদেরকেও যেতে হয়। মাঠের কাজ মাঠে পড়ে থাকে। স্কুলের টিফিন থাকে দেড় ঘন্টা।

অথচ মোফির বিয়ের শুক্রবারে আমাদের কাউকেই স্কুল কিংবা মাঠে যেতে হয় না। মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তেও যেতে হয় না। আমরা যাই লাদেনভ্যানে চড়ে দুর্লভপুর। দোস্ত মোফির বিয়ের বরযাত্রী সেজে।

দুর্লভপুর পদ্মাপাড়ের একটি গ্রাম। পাশ দিয়ে কলকল বয়ে যাচ্ছে পদ্মা নদী। কী বিশাল তার রূপ! আর কী ভয়ঙ্কর! যেন নদী নয়, একটা অজগর! ফঁস ফঁস করছে। ডান দিকে কট্‌ মারলে গ্রাম সুদ্দ আমাদেরকেও গিলে খাবে। দোস্তের বিয়ের আনন্দ ভূলে আমাদের আক্কেল গুড়ুম! আমরা রীতিমতো ভয় পাই।

যদিও কাজেমের সাহসে আমরা সেই পদ্মাতেই দুপুরবেলা গোসুল করি। কাজেমের কথাঃ বুঝলি বে মোফির বহুটো এই লদীর পানিতে গোসুল করে সিয়ানা হয়েছে। গা-গতর তৈয়ার করেছে। এই লদীর পানিতে বহুটার গা-গতরের গন্ধ মিশে আছে। শুঁকে দ্যাখ্‌ সেই গন্ধ পাইস কি না!

আমরা কাজেমের কথা শুনে নদীর পানিতে সেই গন্ধটাকে পাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কার কী হয়েছিল জানি না। তবে নাক-মুখে পানি ঢুকে আমার মরার জোগাড় হয়েছিল। যদিও আমাকে বাঁচিয়েছিল সেই কাজেমই।



চার

মোফির বউকে আমি সামনাসামনি দেখেছিলাম বিয়ের বেশ কিছুদিন পর। মোফির মা তাকে সঙ্গে করে আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। আমার মা অসুস্থ। বহুদিন বিছানাগত। নিজ ইচ্ছায় নড়াচড়া করতে পারেন না। বিছানায় তাঁর দুনিয়া। যদিও তিনি জানতেন মোফি আমার জিগরী দোস্তদের মধ্যে অন্যতম। এবং সেই মোফির বিয়ে হয়েছে। ছেলের দোস্তের বউকে একবার চোখের দেখা দেখবার ইচ্ছে হয়ে থাকবে তাঁর। সেকারণেই হয়ত তিনি মালতীবুবুকে পাঠিয়ে ডেকে থাকবেন!


যাইহোক, স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে আমি তখন কালীপালের ডিহিতে খেলতে যাওয়ার জন্য ছট্‌ফট করছি। আমাকে তাড়াতাড়ি খেতে দেবার জন্য মালতীবুবুকে বারবার তাগাদা দিচ্ছি। আমার তর সইছে না। হঠাৎ মায়ের ক্ষীণ কন্ঠস্বর ভেসে আসে, বেটা রহমত- কতি তুই? হেরায় তো এদিকে! দাখ্‌ তো কে আলছে?

মা সাধারণত আমাকে এভাবে ডাকেন না। আমি অবাক হই। কে আবার এল? যাকে দেখতে আগ্রহভরে মা আমায় ডাকছেন!

আমি তাড়াতাড়ি ছুটে যায় মায়ের ঘরে। আর, দেখি মোফির মাকে। আমার মায়ের মাথার কাছে বসে আছেন তিনি। সঙ্গে একটি মেয়েও আছে। যে বসে আছে মায়ের পায়ের দিকে। আমার বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এই মেয়েটিই তাহলে আমার দোস্ত মোফির বউ। বিয়ের দিন নতুন কাপড়চোপড়ে এমন ভাবে ঢাকা ছিল যে, আমরা তাকে ভালো করে দেখার সুযোগ পাইনি।

যদিও মোফির মুখে এই মেয়েটি সম্পর্কে ইতিমধ্যে আমরা অনেক গল্প শুনেছি। মেয়েটির নাম আলেয়া। মোফি আমাদের সামনে আলেয়ার রঙঢঙের বর্ণনা দিয়েছে। সেই বর্ণনা শুনতে শুনতে আমরা কামপ্রবণ হয়ে উঠেছি। কালীপালের ডিহি সংলগ্ন রমনায় ঢুকে পাগলা হাতির মতো সবকিছু তহছ নহছ করেছি। স্বপ্নে আলেয়াকে নিয়ে আরও কত কী করেছি তার হিসেব নেই।

পাঁচ

বিয়ের কিছুদিনের মধ্যে মোফির জীবনে একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে। সামান্য অজুহাতে বাপ সাবেদ সেখ তাকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করে বসে। তার আর আলেয়ার ভালোবাসাবাসি সাবেদ সেখের কাছে অসহ্য হয়ে দাঁড়ায়। ভোর ভোর মোফিকে মাঠে যেতে হয়। অথচ বিয়ের পর ভোরবেলা নাকি তার ঘুম ভাঙে না! বউয়ের বুকে বুক সাঁটিয়ে ঘুমিয়ে থাকে। এতে নাকি সাবেদ সেখের ঘর-গেরস্থির চরম ক্ষতি হয়! কী ক্ষতি হয়, সাবেদ সেখ জানে। আমরা জানি না। আমাদের শুধু মনে হয় এটা সাবেদ সেখের চরম অন্যায়। সাবেদ সেখ তার ছেলের ওপর অন্যায় করছে। অবিচার করছে।

মোফিরও হয়ত সেটাই মনে হয়। কিন্তু সে প্রতিবাদের ভাষা পায় না। কিংবা ইচ্ছে করেই বাপের অন্যায় - অবিচারের বিরোধিতা করে না। চুপচাপ বাপের বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসে। কালীপালের ডিহির পাশে লালগোলার লাড়ুবাবুদের খাস জমিতে একটা কুঁড়ে ঘর বানায়। বউ আলেয়াকে নিয়ে গিয়ে তোলে সেখানে। আগে যেখানে সে নিজের বাপের ঘর-গেরস্থিতে খাটত, এই ঘটনার পর পরের ঘর-গেরস্থিতে খাটতে শুরু করে। মুনিষ হিসেবে। সারাদিন পরের ঘর-গেরস্থির কামকাজ সামটে তার ওই কুঁড়ে ঘরে ফিরতে রোজ সন্ধ্যা হয়ে যায়। আমাদের খেলা তখন প্রায় শেষ। আমরা তখন কালীপালের ডিহির ঘাসে শুয়ে নীল আকাশের লাল রক্ত চুইয়ে পড়া দেখতে দেখতে শরীরের ঘাম শুকোই। অথচ একদিনও একটুক্ষণের জন্য মোফি আমাদের কাছে আসে না। আমরা অবাক হই। বিকেল হলে আমাদের সঙ্গ না পেলে যার দম বন্ধ হয়ে আসত, সে আমাদের এড়িয়ে থাকছে কী করে?

আমাদের কৌতুহল হয়। আমরা আমাদের কৌতুহল চেপে রাখি না। একদিন তাকে ওরকম ফিরতে দেখে আমরাও তার পিছু পিছু গিয়ে হাজির হই ওই কুঁড়েঘরে। পানি খাওয়ার অছিলায় । তার বউ আলেয়া এত ভালো যে, আমরা পানি খেতে চাইলে সে আমাদের শুধু পানি দেয় না, সঙ্গে দেয় আরও কত কিছু! আমাদের বসতে মাদুর পেতে দেয়। ফুলতোলা কাঁচের গেলাসে পানি দেয়। লঙ্কা-পিঁয়াজ-তেল মাখিয়ে মুড়ি দেয়। আমরা খাই। সবশেষে চা।


একই সঙ্গে সে মোফিকেও খেতে দেয়। গরম ভাত।

তারপর থেকে ওই কুঁড়ে ঘরটা আর কারও কাছে নয়, শুধু আমার কাছে নেশার মতো হয়ে দাঁড়ায়। কালীপালের ডিহিতে খেলতে খেলতে সবার অগোচরে আমি ঠিক একবার না একবার ওই কুঁড়ে ঘরে গিয়ে ঢুকে পড়ি। আলেয়ার কাছে পানি চেয়ে খাই। তার খবরাখবর জিজ্ঞেস করি। তারপর আবার ছুটে বেরিয়ে আসি।

তা দেখে একদিন আলেয়া আমাকে বলে বসল, লুকিয়ে লুকিয়ে খালি খোঁজ লিবা দোস্ত? একটুখানি বসবা না? বিরান ডাঙায় একলা পড়্যা থাকি সারাদিন! দ্যাখোই তো হামার কথা বুলার কেহু নাই। তুমার দোস্ত কুন ভোর ভোর কামে বেরহিন যায়! যখুন আসে, সাঁঝের সুমায়, অর কথা বুলার ক্ষ্যামতা থাকে না। থাকবে কী করি? সারাদিনের খাট্‌নির শরীর! ভাত খেই ঘুমিন পড়ে। হামাকে একলা বোবা কালা হুই থাকতে হয়।

একথা শোনার পর আমি ওই কুঁড়ে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে আসতে পারি না। আলেয়া কী বলল? কেন বলল? বোঝার চেষ্টা করতে করতে ধীর পায়ে বেরিয়ে আসি। বুঝতে পারি, সত্যি আলেয়া কত একা! মোফি সেই কোন্‌ সকালে মুনিষ খাটতে বেরিয়ে যায়। তারপর আলেয়া সারাদিন একেবারে একা থাকে। বেচারীর কত দুঃখ! কত কষ্ট!

- কী বে টিপ মেরে চলে এলি?

আমি চমকে উঠি। কে বলল এমন কথা? আমি এদিক ওদিক চাই। কাজেমকে চোখে পড়ে। সে আমার পেছনে দাঁড়িয়ে। তার মুখে জ্বলন্ত বিড়ি। আমার চোখে চোখ পড়তেই সে আবার বলে, কিছু হোছে না খালি খালি সুমায় বরবাদ করছিস?

কাজেমের কথার মাথামুন্ডু আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কী বলতে চাইছে ছোঁড়া?

আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, যা বুলতে চাস সোজাসুজি বোল কেনি! তোর অত ঘুর-প্যাঁচের কথা হামার মাথায় ঢুকছে না।

কাজেম তার মুখের বিড়িটা শেষ টান মেরে ফেলে দেয়। বলে, বুঝলি মোফি শালা পারে না। তাই আলেয়া তোকে দিয়ে অর চাহিদা মিটাইতে চাহিছে। আর তু শালা এমনি চুদ্ধু যেনে কিছুই বুঝিস না!

ছয়
সত্যিই আমি কিছুই বুঝতাম না। কাজেমের বলার পর বুঝতে পারছি। তারপর থেকে মোফির কুঁড়েঘরটা আমাকে যেন চুম্বকের মতো টানছে। কখন বিকেল হবে আর আমি কালীপালের ডিহিতে যাবো! পানি খাওয়ার বাহানায় আলেয়ার কুঁড়ে ঘরে ঢুকবো! আলেয়াকে দেখবো! আলেয়ার মনের কথা পড়বো!

ভাবতে ভাবতে আমার রাত কাটে। সকাল হয়। স্কুল গিয়ে ক্লাসে মন বসে না। পড়া পারি না। মাস্টারের হাতে মার খাই। নীলডাউন হয়ে থাকি ক্লাসের পর ক্লাস। ক্লাসের শাস্তি সহ্য করতে করতে জাহান্নামের শাস্তির ভয় আমার কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়। আমি আর পারি না, একদিন ভরদুপুরে স্কুল পালিয়ে গিয়ে হাজির হই আলেয়ার কুঁড়ে ঘরের সামনে।

গ্রীষ্মের দুপুর। চারপাশ খা খা করছে। অতবড় কালীপালের ডিহিতে কোথাও কোনো জনপ্রাণী নেই। নাকি আছে? আমি নিশ্চিত হতে সময় নিই। আমার সামনে সেই কুঁড়ে ঘরটা। যে ঘরে আলেয়া আছে। যার কাছে কথা বলার মতো কেউ নেই। যার খুব দুঃখ! খুব কষ্ট!



আমি বেশীক্ষণ সময় নিই না। আলেয়ার দুঃখকষ্টের কথা ভাবতে ভাবতে আচমকা কুঁড়েঘরের ঝাঁপ ঠেলে সরাসরি ঢুকে পড়ি। আর শুনতে পাই আলেয়ার কণ্ঠ, হামি জানতুম দোস্ত- তুমি আসবা।

কন্ঠ শুনি ঠিকই, কিন্ত আলেয়া কই? আলেয়াকে খুঁজে পাই না।

বাইরে প্রখর রোদ হলেও কুঁড়েঘরের ভেতরটা ঘুঁপচি আঁধার। আলেয়াকে খুঁজে পেতে আমার সময় লাগে। তারপর যা দেখি, আমার ভিমরি খাওয়ার অবস্থা হয়। কোনোরকমে নিজেকে সামলে চোখ কচলে ভালো করে দেখি আবার। আলেয়া ঘরের মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। তার শরীরে কোনো কাপড় নেই। একেবারে অনাবৃত। আমাকে দেখেও তার লজ্জ্বাশরমের বালাই নেই। ঘুরিয়ে সে আমাকে বেশরমের মতো ডাকছে। বলছে, খুব গরম দোস্ত- খুব গরম! হামি আর থাকতে পারছি না। হামাকে একটু ঠান্ডা কর!

আমার হাত থেকে বইয়ের ব্যাগ খসে পড়ে। প্রচন্ড গরম কিছুর হলকা বয়ে যায় শরীরে। আমি আমার শরীর-মনকে শান্ত রাখতে পারি না। শুধু মনে হয়, এখনই যদি আমি আলেয়ার ডাকে সাড়া না দিই, আলেয়াকে শান্ত না করি, জগৎ-সংসার পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে!

আমি ভীষণ ভয় পাই। আমি আর দেরী করি না, আলেয়ার শরীরের দিকে এগোতে থাকি। তার উন্মুক্ত বুক যেন কালীপালের ডিহির উঁচু ঢিপি দু’টি! পেট ঢিপির পাদদেশ! আর নাভি হল ওই ডিহিতে অবস্থিত সেই ডোবাটা! যার পাড়ের ঘাসের বিছানায় খেলাধুলার পর শরীরের ঘাম শুকোতে আমরা শুয়ে থাকি! দোস্ত মোফির মুখে শোনা বর্ণনার সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে সব। আমি আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছি না। কিংবা আমার চোখে আলেয়ার শরীরটা যেন আর একটা পদ্মা নদী। শ্বাসপ্রশ্বাসের তালে তালে তার নাভি, পেট, বুক যেভাবে ওঠানামা করছে, আমার মনে হচ্ছে পদ্মার উথালপাথাল ঢেউ যেন! আমি সেই ঢেউয়ে ঝাঁপিয়ে না পড়লে, সাঁতার না কাটলে সে হয়ত কট্‌ ফিরে আমাদের এই জগৎ-সংসারটাকেই অজগরের মতো গিলে খাবে!

কিন্তু আমি ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই মসজিদের মাইকে ঘড়ঘড় আওয়াজ ওঠে। চকিতেই আলেয়া পাশে পড়ে থাকা তার কাপড়টা টেনে নেয়। নিজের অনাবৃত শরীর ঢাকে। মুখে বলে, আজানটো হুই যাক দোস্ত। জোহরের নামাজের আজান! তারপর ...

আজান হয়ে যায়। কিন্তু মাইকের ঘড়ঘড় বন্ধ হয় না। আজানের পর পরেই আর একটা ঘোষণা ছড়িয়ে পড়ে, বেরাদানে ইসলাম- একটা শোকসংবাদ আছে। আমাদের মাস্টার সাজ্জাদসাহেবের স্ত্রী আম্বিয়া বেগম ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি অ-ইন্না ইলাইহি রাজিউন। (আমরা আল্লার জন্য এবং আমাদের তারই দিকে ফিরে যেতে হবে।) আপনাদের অবগতির জন্য জানাই যে বাদ-আসর তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে আমাদের বড় গোরস্থানে। আপনারা হাজির থাকবেন।

আমার তখন নীলডাউনের ভঙ্গি। একটু আগে আমার যে দু’হাত আলেয়ার শরীর ছুঁতে চাইছিল। এখন সেই দুই হাত মোনাজাতের ভঙ্গিতে উঠে এল আমার মুখ-চোখে। কেন কী জানি, আমি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম ...। 



লেখক পরিচিতি
নীহারুল ইসলাম

‘সাগরভিলা’ লালগোলা, মুর্শিদাবাদ, ৭৪২১৪৮ পঃ বঃ, ভারতবর্ষ।
 জন্ম- ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৭, মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘী থানার হরহরি গ্রামে (মাতুলালয়)। 
শিক্ষা- স্নাতক (কলা বিভাগ), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা- শিক্ষা সম্প্রসারক। 
সখ- ভ্রমণ। বিনোদন- উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শ্রবণ। 
রৌরব, দেশ সহ বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনে লেখেন নববই দশক থেকে। 
প্রকাশিত গল্পগ্রন্থঃ 

পঞ্চব্যাধের শিকার পর্ব (১৯৯৬),  জেনা (২০০০),  আগুনদৃষ্টি ও কালোবিড়াল (২০০৪), ট্যাকের মাঠে, মাধবী অপেরা (২০০৮), মজনু হবার রূপকথা (২০১২)। 
দু’টি নভেলা--,  জনম দৌড় (২০১২), উপন্যাস।
 ২০০০ থেকে ‘খোঁজ’ নামে একটি অনিয়মিত সাহিত্য সাময়িকী’র সম্পাদনা। 
পুরস্কার : 
লালগোলা ‘সংস্কৃতি সংঘ’ (১৯৯৫)এবং শিলিগুড়ি ‘উত্তরবঙ্গ নাট্য জগৎ’ কর্তৃক ছোটগল্পকার হিসাবে সংবর্ধিত
 (২০০৩)। সাহিত্য আকাদেমি’র ট্রাভেল গ্রান্ট পেয়ে জুনিয়র লেখক হিসাবে কেরালা ভ্রমণ (২০০৪)। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ কর্তৃক “ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার” প্রাপ্তি (২০১০)। ‘ট্যাকের মাঠে মাধবী অপেরা’ গল্পগ্রন্থটির জন্য পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রবর্তিত “সোমেন চন্দ স্মারক পুরস্কার” প্রাপ্তি (২০১০)। ভারত বাংলাদেশ সাহিত্য সংহতি সম্মান “উত্তর বাংলা পদক” প্রাপ্তি (২০১১)। রুদ্রকাল সম্মান (২০১৩) প্রাপ্তি। 
niharulislam@yahoo.com



নীহারুল ইসলামের আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন--

--------------------------------------------
নীহারুল ইসলামের সাক্ষাৎকার পড়ুন--লিঙ্ক




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন