সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৪

ধারাবাহিক নভেলেট : সাত জমিন--কিস্তি.২

শামিম আহমেদ


কতরে মেঁ দজলঃ দিখাঈ ন দে, ঔর জুজব মেঁ কুল
খেল লড়কোঁ কা হুআ, দীদঃ-এ-বীনা ন হুআ


নিজের বাড়িতে পুনরায় থিতু হয়ে বসতে না বসতেই আবার নতুন করে দাঙ্গা-হাঙ্গামার খবর ভেসে এল। খোকা সব সময়ে বলেই যাচ্ছে, রায়ট একটা হবেই, কেউ আটকাতে পারবে না। কিন্তু এ বার রায়ট নয়, ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে দুই শরিকের ঝগড়া মারামারিতে পৌঁছল। জর্মান মিঞা ফিরে আসাতে রুনার মেজ নানা খুশি হননি মোটেই, কিন্তু নানাদের মা যে ভাবে সেই বিবাদকে নিজের হাতে আটকে দিয়েছিলেন, ভারত-পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সেটা করার মতো কেউ ছিল না। যদিও ভারতে বসেছিলেন মাউন্টব্যাটেন, আর ও দিকে দ্বিতীয় এলিজাবেথ ছিলেন কুইন অব পাকিস্তান। কেউ সে রকম গা করেনি। ফলে রে রে করে ঢুকে পড়ল একদল হানাদার।


ভারতবর্ষ যখন ভাগ হল তখন ৫৬২ জন দেশীয় রাজা, মহারাজা, নবাব, নিজাম এ দেশে ছিলেন। তাঁদের রাজ্য পাকিস্তানে যাবে না ভারতে থাকবে তা নিয়ে ঝামেলা শুরু হয়। ওই সব রাজা-বাদশাদের ইংরেজরা নিয়ন্ত্রণ করলেও তাঁরা স্বাধীন ছিলেন। তাঁদের বলা হয়েছিল, ইচ্ছে করলে ভারত বা পাকিস্তান যে কোনও রাষ্ট্রে তাঁরা যোগ দিতে পারেন, আবার স্বাধীন থাকার পরিকল্পনা থাকলে তাও বাস্তবায়িত করতে পারেন তাঁরা। কিন্তু ইচ্ছে করলেই তা সম্ভব হয় না।

জর্মান মিঞাকে তাঁর মা বললেন, “দেখো বাবা, হায়দরাবাদের নিজাম যদি ভাবেন, তিনি পাকিস্তানে যোগ দেবেন, সেটা কী করে সম্ভব হবে!’’ জর্মান মিঞা ভাবলেন, সত্যিই তো! হায়দরাবাদের চারদিকে ভারতের সীমানা, পাকিস্তানে তিনি ঢুকবেন কী প্রকারে! নিজামের মনের বাসনা ছিল, তিনি পাকিস্তানে যোগ দেন, কিন্তু এমন বাস্তব সমস্যার কথা ভেবে তিনি পিছিয়ে যান এবং স্বাধীন থাকার সিদ্ধান্ত নেন। জর্মান মিঞা তাঁর মাকে বলেন, “তা হলে কী হবে মা, এই রাজা-বাদশারা কী করবেন?’’

মা বললেন, তিনি জানেন না, কীভাবে এমন সমস্যার মোকাবিলা করা সম্ভব। কামরুন্নেসা জানালেন, “যাদের সীমানার সমস্যা নেই তারা অনায়াসে ভারত কিংবা পাকিস্তানে যোগ দেবে। এমন অবস্থায় যারা সেটা করবে না, স্বাধীন থাকতে চাইবে, তারা যে কত দিন তাদের অস্তিত্ত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে, তা বলা মুশকিল। কারণ, যদি কেউ আমাদের বাড়ির চার পাশ সবটা ঘিরে নেয়, আমরা কি পারব নিজেদের অধিকার এবং সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে!’’

কয়েক দিন আগে মৌলানা সাহেব বলে গিয়েছেন, তিনি নাকি জানেন যে জুনাগড়ের নবাব পাকিস্তানে যোগ দিতে চান। কিন্তু তাঁর অবস্থাও হায়দরাবাদের নিজামের মতো।

কাশ্মীরের ব্যাপারটা অবশ্য আলাদা। সেখানকার বেশির ভাগ লোক মুসলমান হলে কী হবে, তাদের রাজা হলেন হরি সিং। রাজপুত এই হিন্দু রাজা অবশ্য চারটে বিয়ে করেছেন। কাশ্মীর রাজ্যের মানুষ চেয়েছেন, তাঁরা পাকিস্তানে যোগ দেবেন। হরি সিং পাকিস্তানের সঙ্গে একটা চুক্তি করেন। সেই চুক্তি অবশ্য স্থিতাবস্থা মেনে চলার, যাতে তিনি স্বাধীন থাকতে পারেন। এ দিকে রাজা ভারতের সঙ্গে একই চুক্তিকরতে চাইলে ভারত তাতে রাজি হয় না।

মৌলানা এক দিন খুব সকালে এসে জর্মান মিঞাকে বলে গেলেন, হরি সিং নাকি ভারতে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। জর্মান মিঞা তাঁর স্ত্রী কামরুন্নেসাকে সে কথা বলতেই বিবিসাহেবা বলে উঠলেন, “এটা কী করে করতে পারেন হরি সিং? যে রাজ্যের চার ভাগের তিন ভাগ লোক চাইছে না ভারতে যোগ দিতে, সেখানে রাজার এমন সিদ্ধান্ত ওই রাজ্যে আগুন জ্বালিয়ে দেবে। তা ছাড়া পাকিস্তান কি ছাড়বে ভেবেছেন মিঞা! ওরাও সেই আগুনে ঘি ঢালবে। মাঝখান থেকে বেচারা কাশ্মীরিরা পড়বেন মহা ফাঁপরে।’’

দেশভাগ হওয়ার পরে ঠিক তাই হল। জর্মান মিঞার সঙ্গে তাঁর মেজ ভাইয়ের সম্পত্তি নিয়ে ঝামেলাটা তাঁদের মা মেটাতে সক্ষম হলেও কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধটা এড়ানো গেল না। জর্মান মিঞা তাঁর ভাগের সব জমি পেলেন বটে, বাড়িতেও তিনি তাঁর বাস করার জায়গায় এক ইঞ্চি জায়গাও ছাড়লেন না। কিন্তু কাশ্মীরের উত্তরপশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পাখতুন উপজাতিরা, পশ্চিম দিকের বিদ্রোহীরা জেগে উঠলেন। যেন এত দিন তাঁরা ঘুমিয়ে ছিলেন। তার উপর তাদের সঙ্গে যোগ দিলেন দীরের অধিবাসীরা। এমনকি রাজা হরি সিং-এর সেনাবাহিনীর একটা অংশ পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার জন্য ফুঁসে উঠল। পাকিস্তান তাদের প্রকাশ্যে মদত দেওয়া শুরু করল। বিদ্রোহীরা বুঝে গেলেন যে রাজা হরি সিং ভারতে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তীব্র আন্দোলন শুরু হয়ে গেল পাহাড়ে। রাজা এই বিদ্রোহীদের শায়েস্তা করার জন্য সেনাবাহিনী নামালেন। সৈন্যবাহিনী আন্দোলনকারীদের উপর গুলি চালাতে লাগল।

পাকিস্তানের সমর্থকরা বলতে লাগল, হেসে হেসে পাকিস্তান পেয়েছি, এবার লড়াই করে হিন্দুস্থান দখল করব। তাদের কাছে কাশ্মীর দখল ছিল ভারত দখল করার সমান। এমন অবস্থা দেখে সবাই রীতিমতো উদ্বিগ্ন। যুদ্ধে তখনও ভারত মাঠে নামেনি।

মেজ ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ আস্তে আস্তে গলতে শুরু করেছে। বড় ভাই যে আর পাকিস্তানের ঢাকা থেকে ফিরবেন না, তা দু ভাই জেনে গিয়েছেন। মেজ প্রথমে ভেবেছিলেন, ছোটও ওই এক রাস্তায় হাঁটবে। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস। মায়ের মধ্যস্ততায় জমি-সম্পত্তি নিয়ে মিটমাট হলেও জর্মান মিঞা ভেবেছিলেন, মেজ ভাইয়ের সঙ্গে বোধ হয় আর সেই উষ্ণ সম্পর্ক ফেরত পাবেন না। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, তাঁদের দু ভাইয়ের সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।বড় ভাইয়ের সম্পত্তিও তাঁরা দু জনে ভাগ করে নিয়েছেন।

এ দিকে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে তিক্ততা এ বার যুদ্ধের আকার নিল।পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সচিব ইস্কান্দার মির্জা গভর্নর জেনারেল মহম্মদ আলি জিন্নাহকে পরামর্শ দিলেন, কাশ্মীরে সেনা নামিয়ে দিতে। যে লোকটা কয়েক দিন আগে এ দেশের মুর্শিদাবাদের নাগরিক ছিলেন, তিনিই কাশ্মীরে সেনা নামানোর পরিকল্পনা নিলেন? এই জন্য মীর জাফর আলির বংশধরদের বিশ্বাস করতে নেই। জর্মান মিঞার মেজ ভাই আনোয়ার মিঞা এমন কথা বলাতে তাঁর মা তাঁকে বলেন, “শোন বাবা, মীর জাফর খারাপ লোক ছিলেন না, তাঁর নামে এমন খারাপ কথা উচ্চারণ করিস না। আর এই যে ইস্কান্দার মির্জা, এ মানুষ মীর জাফরের বংশধর শুধু নন, ইনি ভারতের সেনা বাহিনীতে বড় পদে চাকরিও করেছেন, আর সেই কাজে কখনো ফাঁকি মারেননি। আর তুই যে ধরেই নিচ্ছিস, কাশ্মীর ভারতের রাজ্য। তা তো নয় রে বাপ। তারা এখনও স্বাধীন। সে দেশের জনগণ চাইছে পাকিস্তানে যোগ দিতে, আর রাজার ইচ্ছে ভারতে যোগ দেওয়া।’’

কামরুন্নেসা তাঁর শ্বাশুড়িকে বলেন, “আম্মা, আমার মনে হয়, রাজা হরি সিং স্বাধীন থাকতে চান। কিন্তু দুই দিকে দুই যমদূত ষাঁড়ের মতো তার দিকে যে ভাবে এগিয়ে আসছে তাতে তিনি ভয়ে কাপড়ে-চোপড়ে না করে ফেলেন!’’

জর্মান মিঞা বলেন, “দুটো ষাঁড় নয় বিবিজান, তিনটে। আর এক দিক থেকে মিটিমিটি এগিয়ে আসছে চীন।’’

মহম্মদ আলি জিন্নাহ পাকিস্তানের সেনা বাহিনীর প্রধানজেনারেল গ্রেসিকে কাশ্মীরে সেনা পাঠাতে আদেশ দিলেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর প্রধান জিন্নাহ-র কথায় কর্ণপাত করলেন না। একটা দেশের শুরুতেই যদি সেনাপ্রধান রাষ্ট্রপ্রধানের কথা অমান্য করে, তা হলে সেই দেশের ভবিষ্যত যে কী হবে, তা খোদায় মালুম। কাশ্মীরেরবিদ্রোহীরা মোজাফফরপুর, ডোমেল দখল করে নিল। এমনকি তারা পুঞ্চে পৌঁছে গিয়ে রাজা হরি সিং-এর সৈন্যবাহিনীকে ঘিরে ফেলল।

রাজা পড়লেন মহা ফাঁপরে। তিনি এখন কী করবেন! রাজ্যের মান বাঁচাতে তিনি ভারতের সাহায্য চাইলেন। কিন্তু ভারত তাঁকে কীভাবে সাহায্য করবে! ভারতের গভর্নর জেনারেল মাউন্টব্যাটেন এ বার খেলার অন্য চাল দিলেন।

“তা আবার দেবেন না! মাউন্টব্যাটেন তো কংগ্রেসের হাতের পুতুল। তিনি যে ভাবে শুরু থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে সৎ মায়ের মতো ব্যবহার করে যাচ্ছেন, তা কহতব্য নয়! আরে বাবা, এ তো পাকিস্তানের বিষয়ই নয়। কাশ্মীরের চার ভাগের তিন ভাগ লোক তো চাইছে তারা পাকিস্তানে যোগ দেবে। হরি সিং আর মাউন্টব্যাটেন তাদের স্বাধীনতায় এ ভাবে নাক গলাচ্ছে কেন?’’ জর্মান মিঞার এমন প্রশ্নে হেসে ওঠেন কামরুন্নেসা। বললেন, “রাগেন কেন মিঞা! কী হয়েছে? মাউন্টব্যাটেন সাহেব কী বলেছে হরি সিং-কে?’’

“বড় লাট বলেছে, যদি হরি সিং কাশ্মীরকে ভারতের অন্তর্ভূক্ত করতে রাজি হয়, তবেই এই বিপদের দিনে ভারত তাঁর পাশে দাঁড়াবে, তাঁকে মসিবত থেকে উদ্ধার করবে।’’

জর্মান মিঞার বিবি বলেন, “এ ছাড়া মান বাঁচানোর মতো আর কোনও রাস্তা হরি সিং-জির ছিল না মিঞা।’’

“পাকিস্তান কাশ্মীরের ভারতভূক্তির এই চুক্তি মানেনি। একা রাজার কথাকে তারা মেনে নিতে নারাজ। রাজ্যের লোকদের কথা মানতে হবে কারণ ওই রাজা নামেই স্বাধীন, আসলে তিনি ইংরেজের তাঁবেদার। এ দিকে বিমানে করে শ্রীনগরে সেনাবাহিনী পাঠাচ্ছে ভারত। কাশ্মীর জুড়ে ভারতীয় সেনা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। এক দিকে কাশ্মীরের বিদ্রোহীরা, তাদের মদত দিচ্ছে পাকিস্তান; অন্যদিকে ভারতীয় সেনার সঙ্গে রাজা হরি সিং-এর ছোট্ট সেনাদল। যুদ্ধ চলছে।’’জর্মান মিঞার এই কথা শুনে তাঁর মা বলেন, “একটা দেশ পরাধীন ছিল। স্বাধীনতা নিয়ে মারামারি, দাঙ্গাহাঙ্গামা করে যা হোক একটা কিছু পেল, তার উপর দেশটা ভাগ হল। এখনও শান্তি নেই, তারা যুদ্ধে মেতে উঠল। কী দরকার ছিল বাপু স্বাধীনতা নিয়ে, সেই যখন ইংরেজের গোলামিই করবি!’’

আনোয়ার মিঞা বলেন, “আর ও দিকে বাদশা খান কী বলেছেন জানো?’’

জর্মান মিঞা বললেন, “না, অত সব খবর আজকাল আর মাথায় থাকে না ভাইজান। বলেন, গফফর খান কী বলেছেন?’’

“এই একটা লোককে কিছুতেই ওরা মুসলিম লিগে ঢোকাতে পারেনি। তাঁর খুদায়ি খিদমতকারের সংখ্যা এখন লাখ ছাড়িয়েছে। এই পাঠান সর্দার পাকিস্তানে গিয়ে পাখতুনদের অধিকার রক্ষার জন্য এখনও লড়াই করে চলেছেন। কিন্তু তিনি খুব হতাশ। বাপুজি নাকি তাঁকে বলেছিলেন, পাখতুনদের এই লড়াইয়ে ভারত তাঁদের পাশে থাকবে। কিন্তু ভারত কোনও ভাবেই তাঁদের সাহায্য করছে না। পাকিস্তান সরকার যে কোনও ছলছুতোয় তাঁকে জেলে পুরতে উদ্যোগী হয়েছে। এ সব ব্যাপার অবশ্য তাঁকে তাঁর পথ থেকে একটুও বিচ্যূত করতে পারেনি।’’

আনোয়ার মিঞার জবাব শুনে জর্মান হোসেন বলেন, “এ আর নতুন কথা কী ভাইজান! দেওবন্দের লোকজনেরা বলেছিল, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটা যে তৈরি হচ্ছে, তা কি একটা সুস্থ রাষ্ট্র হতে পারবে? না, বিলাত আর রাশিয়ার পলিটিক্সের কারখানা হবে! এই দেশের লোকেরা নাকি খেতে পাবে না কারণ তাদের ইকনমিটা তৈরি হবে কী প্রকারে!! সারা দেশ জুড়ে আন্দোলন হবে। মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে দাঙ্গাহাঙ্গামা করবে আর ধর্মস্থানকেও তারা রেহাই দেবে না।’’


আনোয়ার মিঞা বলেন, “সেই জন্যই তো বাদশা খান বলেছেন, গান্ধীজি আমাদের নেকড়ের মুখে ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে গেছেন।’’
(ক্রমশ)



লেখক পরিচিতি
শামিম আহমেদ

জন্ম ১৯৭৩। মুর্শিদাবাদের সালারে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের ছাত্র।
পেশা বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশন মহাবিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক।
গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ মিলিয়ে এযাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ১০ টি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন