বুধবার, ১১ মার্চ, ২০১৫

আলবেয়ার কামু'র নোটবুক

ধা রা বা হি ক

আলবেয়ার কামু জন্ম নিয়েছেন ১৯১৩ সালে, আলজেরিয়ায়। দি আউটসাইডার, দ্য প্লেগ, দ্য ফল তাঁর উপন্যাস। লিখেছেন সিসিফাসের মিথ। পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের একজন। জীবন আসলেই কী, এই ব্যাপারে তিনিই সবচেয়ে বেশি কথা বলেছেন। নিরর্থকতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চেয়েছেন। তাঁর সাহিত্যকৃতির অনন্য দলিল 'নোটবুকস', এগুলো ফরাসি থেকে ইংরেজি অনুবাদ করেছেন ফিলিপ থোডি। কামু'র নোটবুকের ১ম খণ্ডে ১৯৩৫ থেকে ১৯৪২, ২য় খণ্ডে ১৯৪২ থেকে ১৯৫১ এবং ৩য় খণ্ডে ১৯৫১ থেকে ১৯৫৯ পর্যন্ত সময়কালের বিভিন্ন চিন্তা ও উপলব্ধি লিপিবদ্ধ করেছেন।
এই সময়কালের মধ্যেই তিনি লেখন 'দি আউটসাইডার', 'দ্য প্লেগ, 'দ্য ফল' এই উপন্যাসগুলি; ভাবনাবিস্তারি প্রবন্ধ 'দ্য রিবেল', 'দ্য মিথ অব সিসিফাস'; 'ক্যালিগুলা', 'ক্রস পারপাস', 'দ্য পজেজসড' এই তিনখানি নাটক। ১৯৫৭ সালে তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। ১৯৬০-এ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি।


আলবেয়ার কামু'র নোটবুক
অনুবাদ- এমদাদ রহমান

পর্ব ।। ৪


মে, ১৯৩৫

আমি যা বোঝাতে চাই, তা হল-- রোমান্টিসিজম বাদ দিয়ে হারানো দারিদ্রতার জন্য কেউ একজন অনুভব করবেন, নস্টালজিয়া। অতীতস্মৃতিবিধুরতা।


কপর্দকহীন হয়ে জীবনের নির্দিষ্ট কিছু বছর বেঁচে থাকাটাকে, আমার কাছে যথেষ্ট মনে হয় এই কারণে যে, একটি পূর্ণাঙ্গ চেতনাবিশ্ব বা প্রকৃত সংবেদনশীলতা অর্জনের জন্য এই সময়টুকু দরকার। এই ধরণের বিশেষ পরিস্থিতিতে বা অবস্থায় আমাদের অদ্ভুত অনুভূতি হল এটাই যে, জন্মদাত্রীর সমস্ত সংবেদনকে ধারণ করছে তার পুত্র। মা সন্তানের ভিতরে অবিকল তার সংবেদনকে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। তার ছেলেবেলা থেকে বহন করা সেইসব সুপ্ত বস্তুগত স্মৃতিগুলি (আত্মার সঙ্গে তা যেন আঠা দিয়ে লাগানো থাকে) তার কাছে ব্যাখ্যা তৈরি করে কেন অনুভূতির বা অনুভবের পদ্ধতি নিজেকে গড়ে তোলে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায়, ভিন্ন ভিন্ন রূপে।

যে-কেউ তার নিজের উদ্দেশ্যে এই কথা বলতে পারে, তার নিজের ভিতর এই তাড়না জাগতে পারে, যাতে সে অনুভব করে কৃতজ্ঞতা, এবং পরবর্তীতে এক অপরাধী বা দোষী নীতিচেতনা। যদি সে তার শ্রেণিগত অবস্থান থেকে অন্য শ্রেণিতে স্থান বদল করে, তাহলে দুইটি শ্রেণির মধ্যকার তুলনাও তাকে দেবে এই অনুভূতি-- ইতোমধ্যেই সে তার মহৎ সম্পদ খুইয়ে বসেছে।

আর ধনী লোকেরা সব সময় ভেবে থাকে, আকাশ আসলে তেমন বিশেষ কিছুই নয়, এ না থাকলেও চলে, এ আসলে প্রকৃতির দান। অন্যদিকে, বিত্তহীনরা আকাশ দেখে, যেভাবে তারা সত্যিকার অর্থেই কোনও কিছু দেখে থাকে, তারা মনে করে-- আকাশ ঈশ্বরের এক অসীম অনুগ্রহ।

যখন আমার মায়ের চোখগুলি আমার উপর স্থির না হয়, আমার দিকে কোনভাবেই তার দিকে তাকানো সম্ভব হয় না, যতক্ষণ না আমার চোখ থেকে কান্নার জলফোঁটাগুলি শুকিয়ে যায়।

একটি দোষী বা অপরাধী নীতিচেতনার দরকার হয় স্বীকারোক্তির। একটি শিল্পকর্মই হল একটি স্বীকারোক্তি; আর অবশ্যই আমাকে সাক্ষ্য প্রমাণ দাখিল করতে হবে।

যখন আমি পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে, এই জগতের সকল বস্তুকে দেখব, আমার তখন মাত্র একটি কথাই বলবার থাকবে। এই ব্যাপারটা নিহিত ছিল দারিদ্রময় জীবনে, সেইসব অনর্থক, অসার, অপদার্থ, নিষ্ফল কিংবা বিনয়ী মানুষেরাও, অনুভব করতে পেরেছে; আমি নিশ্চিতভাবেই স্পর্শ করব তাকে, যা হল জীবনের খাঁটি অর্থকেই অনুভব করা। শিল্পের কাজগুলি হয়ত কখনোই আমাদেরকে তা দেখিয়ে দিবে না, এবং শিল্প আমার কাছে অবশ্যই সব কিছু নয়। তবে শিল্পকে জীবনসন্ধানী হওয়ার একটি উপায় হতে দেওয়া উচিৎ।

যেখানে কাপুরুষতার ছোট্ট অভিনয়কেও গণনা করা হচ্ছে, সময় স্বয়ং যেন লজ্জিত। যে পদ্ধতিতে একজন আরেকজনের জগত নিয়ে ভাবনা করছি, সেই জগতটা হল টাকার জগত। পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা ছাড়াই আমরা ভাবছি।

আমি চিন্তা করি যে, দারিদ্র্যের জগত আসলে একটিই যা নিজেকে নিজেই সম্পূর্ণরূপে বদলে ফেলতে পারবে, সমাজের মধ্যে একটি বিশেষ দ্বীপ হিসাবে যা একটি আকার নিতে পারে। যাদের যথেষ্ট টাকা নেই, তারা খেলা করতে পারবে রবিনসন ক্রুসোয়, সেখানে হয়ত আরও কয়েকজন এমন থাকবে, যারা লাফ দিয়ে নীচে আসবার কালে, প্রতিবেশি ডাক্তারকে নিয়ে কথা বলবে।

সবকিছু যথার্থরূপে বিশ্লেষিত হবে, মা আর পুত্রের উপর চালিত এক বিশেষ পর্যবেক্ষণের ভিতর দিয়ে।

এইমাত্র আমি যা যা লিখলাম, তার সবটুকুই সাধারণ কিছু ক্ষেত্রে বা বিষয়ে প্রযোজ্য কিনা, তা ভেবে দেখলাম।

যখনই কেউ কোনও বিশেষ দৃষ্টান্ত তৈরি করতে চায়, তখনই সবকিছু হয়ে পড়ে আরও বেশি জটিল এবং দুর্বোধ্য--

০১- পারিপার্শ্বিকতা। নিকটবর্তী এলাকা এবং তার অধিবাসীরা।

০২- সেই মা, এবং তিনি যা কিছু করেছেন।

০৩- মা আর পুত্রের মধ্যকার সম্পর্ক।

এইসবের সমাধান কী? কে মিলিয়ে দিবে? সেই মা?


একটি অধ্যায়ের শেষ হচ্ছে এই বর্ণনার মধ্যে দিয়ে- কীভাবে মায়ের প্রতীকী মূল্য অস্তিত্ববান হয়ে উঠছে তার পুত্রের নস্টালজিয়ার ভিতর দিয়ে।


আত্ম গর্ব বা অন্তঃসারশূন্যতাকে আমরা যে শব্দে প্রকাশ করতে পারি, তা হল- অভিজ্ঞতা। আপনি কখনোই অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন না, কোনওরকম ঘটনা কিংবা পরীক্ষার ভিতর দিয়ে না গিয়ে। আপনার পক্ষে অভিজ্ঞতাকে সৃষ্টি করাও সম্ভব নয়। আমাদেরকে অবশ্যই এর ভিতর দিয়ে যেতে হবে। ধৈর্য, যথার্থ রূপে বললে, ধৈর্যই অভিজ্ঞতা। ধৈর্য না বলে এখানে সহনশীলতাও বলা যায়। আমরা খুব ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করব, অথবা, ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করব।

আমাদের অভিজ্ঞতা :

যখন আমরা অভিজ্ঞতা থেকে ঘটনা কিংবা চিন্তাধারার মাধ্যমে প্রকাশিত হই, আসলে আমরা তখন কোনওভাবেই বিচক্ষণ বা প্রজ্ঞাবান হয়ে উঠি না, হয়ে উঠি দক্ষ।

কিন্তু, কেন?

1 টি মন্তব্য: