বুধবার, ১৭ জুন, ২০১৫

স্বপ্নময় চক্রবর্তীর গদ্য

এ মাসের বিশেষ লেখা
যজ্ঞজাত সন্তানের মতোই ইচ্ছাজাত আখ্যান


কেন লিখি?

না লিখে উপায় নেই তাই।

কিংবা না-লিখে কী-ই বা করব? তাস খেলব? শেয়ার বাজারে হিসেব? টিভি? নাকি হরিসভা? নাকি কোন পার্টি অফিসে বসে...

ওসব তো পারলাম না।

তাহলে কি সময় কাটাবার জন্যই লিখি?


তা কেন? সময় ব্যবহার করবার জন্যই তো লিখি। সময় নিংড়ে আনন্দ-জল বার করি, সেই আনন্দ গায়ে মাখি।

ছোটবেলায় যখন লেখালেখি করতাম, তখন অন্তরের আহ্বান ছাড়া কোনও আহ্বান ছিল না। লেখক হব-- এমন কথা ভাবিওনি। লিখে পয়সা রোজগার তো কল্পনার অতীত। এখন অন্তরের তাড়না ছাড়াও বাইরের তাড়নাও থাকে। পত্রপত্রিকার আহ্বান এবং চাপ থাকে। এখন কিছু পয়সা রোজগারও মাঝেমধ্যে হয়। মাঝে মাঝে হাবিজাবি লেখালেখিও করতে গিয়ে নিজের প্রতি বিরক্তি আসে। কিন্তু লেখা ছেড়ে দেবার কথা ভাবতেও পারি না।

শৈশবের কথা মনে পড়ে। আমার মা দুপুরের নির্জন ছাদে উঠে একটা বটগাছের কাছে দুঃখ-কথা জানাতেন। মা ছিলেন বাড়ির বড় বউ। সংসারের অনেক কাজ। রান্নাবাড়ি থেকে গুল দেওয়া, কয়লা ভাঙা, কাঁথা সেলাই কী না করতেন। আমার পিসিমারা কুঁচি দেওয়া শাড়ি পরে সেলাই স্কুলে যেতেন, কিংবা ম্যাটিনি শো। মা যেতেন না। যেতে পারতেন না। সূর্য ঢলে গেলে, এঁটো বাসন মেজে স্নান করে কিছু মুখে দিয়েই আবার উনুন ধরানো। মায়ের গায়ের ঘামে দুঃখ-কথা ঝরত। আমি বুঝতাম। বাবা স্কুলে মাস্টারি করতেন। বাবার স্কুল থেকে আনা চকখড়ি দিয়ে সেই বাসাবাড়ির কালো বারান্দায় সদ্যসাক্ষর আমি কিছু লিখতাম। তাতে হয়তো আমার মায়ের দুঃখ-কথা থাকতো। প্রতিবাদও হয়তো। আমার মা শশব্যস্ত হয়ে ভেজা ন্যাকড়ায় ওই লিপিমালা মুছে দিতেন। বলতেন, ওসব লিখিস না, ওরা রাগ করবে।

এরপর আমার রাগ, ক্ষোভ কিংবা ইচ্ছাপূরণ হার্ড পেন্সিল দিয়ে খাতায় লিখেছি। আর আমার মা আমার কাঁথায় রঙিন সুতোয় ফুল-প্রজাপতিতে লিখেছেন ভালোবাসি, ভালোবাসি। এতে কোনও বর্ণমালা ছিল না। আমার মা নেই। আমার মা মাত্র ৪৮ বছর বয়সে চলে যান। আমি আজ বর্ণমালা গেঁথে আমার মাকে উপহার দিচ্ছি-- এরকমও মনে হয় মাঝে মাঝে।

আমার ভিতরে অন্য এক আমি আছে। সবার ভিতরেই থাকে। যে-কোনও মানুষের মধ্যেই এমন একটা সত্তা থাকে, যাকে বিবেক বলি। যাকে চৈতন্য বলি। সে আমাদের বকাঝকা করে, শাসন করে। দেখিয়ে দেয় এটা তোমার আপস, এটা তোমার অন্যায়। নিজেকে তো শুদ্ধ করতে পারি না, অনেক সময় পাল্টাতে পারি না নিজেকে। কিন্তু লেখার মধ্যে ইচ্ছা-সম্ভব চরিত্র সৃষ্টি করি। যজ্ঞজাত সন্তানের মতোই ইচ্ছাজাত আখ্যান।

মনের ভিতরে গুটিপোকা হয়ে থাকা স্বপ্ন আর ইচ্ছেগুলিকে প্রজাপতি করতে চাই আমরা। গুটিপোকাটির চেয়ে প্রজাপতিই লেখকের কাছে বৃহত্তর সত্য। কিন্তু গুটিপোকাই বাস্তব। প্রকৃত বাস্তব। সমাজ, পরিবেশ, চারপাশ-- এইসব মনে রেখে প্রকৃত বাস্তবের আপাত অসম্পূর্ণতা থেকে সম্পূর্ণতার দিকে যেতে গেলে যে বাধাগুলি পেরোতে হয়, সেটাই মনে হয় শৈলী। যা-যা দেখি, ঠিক তাই লিখি না। দেখা জিনিসগুলি হুবহু ডায়েরিতে লেখা যায়, খবরের রিপোর্টিংয়ে লেখা যায়। কিন্তু সাহিত্যে নয়। সাহিত্যকর্ম তো সৃষ্টিসুখ। সৃষ্টির মধ্যে থাকে বাস্তবতার বাইরেও অন্যকিছু। পিকাসোর বাঘ প্রকৃত বাঘের চেয়েও বড় সত্যি। লোকশিল্পীদের বা যামিনী রায়ের পটের চোখ প্রকৃত চোখের বাইরে অন্য মাত্রা, অন্য ব্যঞ্জনা দেয়। এবং সেটা শেষ পর্যন্ত আনন্দ দেয়। দুঃখও তো আনন্দেরই অন্য দিক। নইলে কেন পথের পাঁচালী কিংবা অগ্রদানী পড়ে কাঁদি, কিন্তু আবার পড়তে চাই। যে-কোনও সামাজিক ক্ষত কিংবা ব্যক্তিমানুষের দুঃখের অংশভাগী হয়ে উঠতে পারলে, সেই কষ্ট এবং দুঃখের অনুভবটিকে ভাষারূপ দিতে পারার মধ্যে আনন্দ আছে, শুধু দুঃখ বলি কেন, অন্য মানুষের যে-কোনও অনুভবের সঙ্গে নিজের অনুভব মিলিয়ে দেওয়া মানে নিজেকে বিস্তৃত করা। নিজের বৃত্তের বাইরে চলে যেতে পারলেই জীবনটা কত বড় হয়ে যায়। ব্যাপ্ত, বিস্তৃত জীবনের মধ্যে অবাক বিস্ময়ে ঢুকে যাই, কখনও ভুলভুলাইয়ার মতো রাস্তায় ঘুরি, হয়তো-বা একই পথে ফিরে আসি ফের। আর ওই ভ্রমণকাহিনী লিখি। এগুলোকেই গল্প বলা হয়, উপন্যাস বলা হয়। মানুষ কত কী করে, মানুষ নিজেই কি জানে? মানুষের মধ্যে কত ভাঁজ, কত আলো-অন্ধকার। ওগুলো দেখতে পাওয়া যেন আবিষ্কার। এইসব অ্যাডভেঞ্চার কাহিনীও লিখতে ইচ্ছে করে।

লিখে সমাজ পাল্টে দেয়া যায় না। বোধহয় নিজেকেও পাল্টে দেওয়া যায় না, কিন্তু লেখার সময়টা নিজেকে কেমন যেন উন্নত প্রজাতির জীব বলে মনে হয়। কিন্তু কোনও কোনও লেখা তো সমাজে আলোড়ন ফেলতে পেরেছিল। কিছুটা হলেও বদলাতে পেরেছিল মানুষকে। ইতিহাসের গতিমুখ পালটে দিতে পেরেছিল। বিদেশ বাদ দিলাম, দেশের 'আনন্দমঠ' উপন্যাস মনে পড়ে, গোরাও। কত উপন্যাস সমাজ বদলের ইতিহাস ধারন করে আছে, যেমন 'ঢোঁড়াইচরিতমানস', যেমন 'জাগরী'। 'আরোগ্য নিকেতন', 'হাঁসুলিবাঁকের উপকথা'... কত বলব? এরকম একটা উপন্যাস লিখতে পারার আনন্দ পারিজাত-সোমরস-অপ্সরী সমন্বিত স্বর্গীয় আনন্দের চেয়েও বেশি। সে-আনন্দের স্বাদ যে পাব না, সে-এলেম আমার নেই, সেটা অনেক আগেই বুঝেছি। মানিক-বিভূতি-তারাশঙ্কর-সমরেশ বসু হতে পারব না জেনেও লিখি, সেই পরম আনন্দ থেকে যদি কিছুটা অংশ নিতে পারি। বড় পরিবার সামলাতে হয়েছিল কম বয়সে। যে-বয়সে সহজে আশ্চর্য হতে পারতাম, মনের ভিতরে তীব্র অনুভব জন্ম নিত, তখন সংসার সামলেছি। ছয় ভাই-বোন। রোজগারপাতিতে মন দিয়েছি, সঙ্গে পরাশুনো। সেসময় গল্পই লিখেছি। সেই ১৯৭২ সালে প্রথম গল্প লিখেছিলাম 'অমৃত পত্রিকা'য়। ছাত্রজীবনে। সে সময় পরপর কয়েকটা গল্প লেখার পর ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৮ তেমন কিছু লেখা হয় নি। ৭৮ থেকে আবার। ৮১-তে 'ভূমিপুত্র' বের করে 'প্রমা'। চাকরি করেছি, সেটা পূর্ণ সময়ের। উপন্যাস লেখার আহ্বান পেলাম ১৯৯১ সালে। 'শারদ আনন্দবাজার'-এ। লিখলাম 'চতুষ্পাঠী'। কিন্তু রহস্যজনকভাবে ওই প্রতিষ্ঠান আর উপন্যাস লিখতে বলল না। দু'-তিন বছর পর 'প্রতিক্ষণ' বলেছিল। তারপর তো 'প্রতিক্ষণ' বন্ধ হল। মনের মতো উপন্যাস লেখার সুযোগই পেলাম না সেই বয়সটায়। কেউ ধারাবাহিক লিখতে বলল না। উপন্যাস যা লিখেছি নির্দেশমতো পনেরো হাজার-কুড়ি হাজার-পঁচিশ হাজার শব্দের। তাতে মন খুলে লিখতে পারিনি। ক্ষেত্র সমীক্ষা এবং গবেষণা ছাড়া উপন্যাস লিখতে ইচ্ছে করে না, আর ওই কাজ এক-দেড় মাস সময়ের মধ্যে, ২৫/২০ হাজার শব্দের মধ্যে সম্ভব নয়।

গল্প নিয়ে নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। নানা বিষয়ের, নানা ধরনের গল্প লিখেছি। কিন্তু উপন্যাস লেখা হয়নি।

এখন বয়স বাড়ছে। মনে হচ্ছে-- জীবন এত ছোট কেন? কত কাজ বাকি! কবে করব? কিন্তু লেখালেখির বাইরেও তো জীবন আছে। যে-জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের, সে- জীবনও দেখা হল কই! কত কিছু পড়ে আছে অদেখা! লেখকও তো সামাজিক। আত্মীয়স্বজন আছে, লেখকের তো টিভি দেখতেও ইচ্ছে করে, মাঝে মাঝে আড্ডাও। ঘুমোতেও। এর মধ্যে লেখার জন্য আরও বেশি সময় টেনেহিঁচড়ে বার করার কথা ভাবি। যতদিন পারকিনসনস ডিজিজ না হচ্ছে, কলম ধরতে পারব, যতদিন এলঝাইমার না হচ্ছে, স্মৃতি থাকবে। ততদিনই জীবনের শিরায় শিরায়, অলিতেগলিতে ভ্রমণ করে যেতে ইচ্ছে হয়। এই ভ্রমণে পা লাগে না-- কলম আর মন।

1 টি মন্তব্য: