সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৫

অজিত কাউর এর গল্প - শুভ নববর্ষ

অনুবাদ-জাকির তালুকদার


বছরের পর বছর টাইপরাইটারের সাথে ধস্তাধস্তি করার পর কাপুরের ভাগ্য তাকে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সাথে সংযোগ তৈরি করে দিল। রাতারাতি কাপুর থেকে ‘কাপুর সাহেব’ : মাননীয় মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী।


সেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার বুক অন্তত দুই ইঞ্চি ফুলে উঠেছে। অফিসের করিডোরে বেরিয়ে এসে ঝুঁটিঅলা তেজি মোরগের মতো গলা ফুলিয়ে শ্বাস টানল সে। করিডোরটা তার কাছে এখন আর যথেষ্ট প্রশস্ত বলে মনে হচ্ছে না। যে পিয়নটা সব সময় টুলে বসে পান চিবাতে চিবাতে ঝিমায়, আজ সে তাকে দেখামাত্র তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে সালাম ঠুকল।


কাপুরের এই রূপান্তরটা ঘটল বছর শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে। এতগুলো বছর ধরে কাপুর ছিল নিতান্তই একজন কেরানি। নিউ ইয়ার ইভ বা নিউ ইয়ারের মতো বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনো অবকাশই সে পায়নি কোনো দিন। একটা নতুন বছর আসে, দিনে দিনে বছরটি পুরনো হতে থাকে, এবং তারপরে কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়—এসব নিয়ে কোনো দিন ভাবেইনি সে।


তার কাছে ৩১ ডিসেম্বর অন্য কোনো মাসের ৩০ বা ৩১ তারিখের থেকে আলাদা কিছু ছিল না। ৩০ বা ৩১ তারিখ ছিল শূন্য পকেট আর দীনতার কাল। পয়লা জানুয়ারিও ছিল অন্য যেকোনো মাসের ১ তারিখের মতোই। ঐদিন সে বেতন পায়, পাওনাদারদের বাকি পরিশোধ করে, বাচ্চাদের জন্য নতুন বই-খাতা-পেন্সিল কেনে, মোজা ফুটো হয়ে গেছে বলে তাদের জন্য নতুন মোজা কেনে, স্কুলের ইউনিফর্ম বানিয়ে দেয়।


এই সব কেনাকাটার সময় তার মধ্যে অদ্ভুত মিশ্র একটা অনুভূতি কাজ করে। পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যের ভাগ্যনির্ধারক হিসেবে একধরনের আত্মপ্রসাদ অনুভব করে। আবার দিনের অর্ধেক পেরুনোর আগেই গর্বটা চুপসে যায় যখন দেখতে পায় তার বেতনের অর্ধেকটাই নিঃশব্দে গায়েব হয়ে গেছে।


তবে কাপুর থেকে কাপুর সাহেবে রূপান্তরিত হওয়ার পরে তার জীবনে হঠাত্ই পরিবর্তন এল।


পরিবর্তনটা এল একজন ব্যবসায়ীর হাত ধরে। অবশ্য ব্যবসায়ী না বলে তাকে শিল্পপতিই বলা উচিত। বিভিন্ন কাজে তাকে কাপুরের মন্ত্রীর কাছে আসতে হয় ঘন ঘন। সেদিন তিনি মন্ত্রীর বাড়িতে এসেছিলেন নিউ ইয়ারের উপহার নিয়ে।


তারিখ: ৩১ ডিসেম্বর।


সময়: সকাল ৮টা।


কাপুর বাইরের বারান্দার একটা ঘরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে বসেছিল তার জন্য নির্ধারিত টেবিল-চেয়ারে। মাননীয় মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারীর টেবিল।


মন্ত্রী শিল্পপতির হাতের প্যাকেটটার দিকে একনজর তাকিয়েই বলে উঠলেন, ‘দুঃখিত, আমি ড্রিংক করা ছেড়ে দিয়েছি। আপনি নিশ্চয়ই জানেন এই বিষয়ে আমাদের মাননীয়া প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গির কথা। তিনি নির্দেশ জারি করেছেন...’


শিল্পপতির জিভের ডগায় একটা গালি চলে এসেছিল। মন্ত্রীর সাথে তার নিজের মায়ের আলো-আঁঁধারি সম্পর্ক নিয়ে একটা কুিসত গালি। কিন্তু নিশ্বাসের সাথে সাথে গালিটিকেও গিলে ফেললেন শিল্পপতি। তার মনের মধ্যে একই সাথে জেগে উঠল একটা ভীতিও—এই জঘন্য লোকটা তার হাত ফসকে বেরিয়ে যাবে না তো!


তিনি এবার সবগুলো দাঁত বের করে হেসে বললেন, ‘কোনো সমস্যা নেই স্যার। আমি আগামীকাল বা পরশু অন্য কোনো উপহার দিয়ে যাব। কিন্তু এখন তো নিউ ইয়ার ইভ। এই সময়টিতে আমি আপনাকে কোনো উপহার না দিয়ে তো যেতে পারি না স্যার!’


শিল্পপতি ব্রিফকেস খুলে একটা ডায়েরি বের করে মন্ত্রীর টেবিলে রাখলেন। ছোট একটা ডায়েরি। সরকারি অফিসের ছাপ মারা। তবে ডায়েরির ভাঁজে অন্য একটা কাগজের বান্ডিল। সেগুলোতেও সরকারি ছাপ মারা। মন্ত্রী ডায়েরির পৃষ্ঠা উল্টে পরখ করলেন নোটের বান্ডিলের পুরুত্ব। মুখে বললেন,  ‘আপনি এতটা কষ্ট না করলেও পারতেন। এসবের আসলে কোনো দরকার ছিল না।’


চাপাহাসির সাথে শিল্পপতি বললেন, ‘কষ্টের কোনো কথাই উঠতে পারে না স্যার! এটা তো কেবল বাচ্চাদের মিষ্টি খাওয়ার জন্য।’


এ কথা এখন প্রমাণিত যে, একটা মানুষ যত ওপরে ওঠে, তার সন্তানদের মিষ্টি এবং ক্যান্ডির খিদে ততটাই বেড়ে চলে। ডায়েরির ভাঁজে যে ক্যান্ডির বাক্সটা (!) দেওয়া হলো, তা শহরের সবচাইতে বড় কনফেকশনারির সবগুলো ক্যান্ডির চাইতেও পরিমাণে বেশি।


আড়াইখানা দাঁত বের করে মন্ত্রী একটা পা্লুর হাসি দিলেন। তারপর খুব শান্তভাবে ডায়েরিটা ঢুকিয়ে রাখলেন নিজের ড্রয়ারে।


স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন শিল্পপতি। তাদের ‘টাচ অ্যান্ড গো’ সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রইল।


মন্ত্রীর অফিস থেকে বেরিয়ে শিল্পপতি কাপুরের হাতে তুলে দিলেন প্যাকেটটি। মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারীকেও তো খুশি রাখতে হবে। তার হাতে প্যাকেট ধরিয়ে দেওয়ার কাজটা শিল্পপতি এতই দ্রুত সেরে ফেললেন যে আপত্তি করার কিংবা ধন্যবাদ জানানোর সুযোগটাও পেল না কাপুর। জীবনে এই প্রথম কেউ তাকে এই রকম একটা উপহার পাওয়ার যোগ্য মনে করল।


তার অস্বস্তি হচ্ছিল। কিন্তু শিল্পপতি তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘নিউ ইয়ারের খুব সামান্য একটা উপহার।’


তবু বোতলটা ড্রয়ারে ঢোকানোর সময় হাত কাঁপছিল কাপুরের। শরীরটা গরম হয়ে উঠছিল।


টাইপিস্ট বশিষ্ট একই রুমে বসে কাপুরের সঙ্গে। মন্ত্রীর টাইপিস্ট হিসেবে অনেক বছর ধরে কাজ করছে সে। চাকরির প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত তার বসার জায়গা ঘরের নির্দিষ্ট কোণটিতেই। কাপুর নতুন দায়িত্বে যোগদানের প্রথম দিনেই বশিষ্ট তাকে নিজের পরিচয় দিয়ে বলেছিল, ‘কোনো চিন্তা করবেন না স্যার। আমি আপনাকে এই মন্ত্রণালয়ের সবগুলো সূত্র ধরিয়ে দেব। মন্ত্রী আসে, মন্ত্রী যায়। তিনাদের চাকরি পারমানেন্ট নয়। কিন্তু আপনার এই অধম কর্মচারীর পদ পারমানেন্ট। এই ঘরে কী ঘটে, আর কিভাবে ঘটে সব আমার জানা। আমি দেখব যাতে কোনো বিপদ আপনার কাছে ঘেঁষতে না পারে।’


বশিষ্ট ঠিকই বুঝতে পেরেছে কাপুরের অস্বস্তি। সে কাপুরের টেবিলের কাছে এসে এক খিলি পান মুখে পুরে বলল, ‘অভিনন্দন, কাপুর সাহেব। চাকরিজীবনের প্রথম উপহার হচ্ছে বাসররাতে নববধূর নাকফুল খোলার মতোই মধুর বিষয়। বোতলটা এস্তেমালের সময় দয়া করে এই অধমদেরও ডেকে নেবেন। আমার আপনার মঙ্গলের জন্য স্বাস্থ্যপান করতে চাই।’


এই খেলাতে কাপুর একেবারেই নবিশ। সে এতক্ষণে এটাও বুঝতে পারে যে তার একার পক্ষে এত বড় স্কচের বোতল খেয়ে শেষ করা সম্ভব নয়। বরং কেউ একজন তার সাথে পান করবে, একথা ভেবে সে একটু আশ্বস্তই হয়। বলে, ‘অবশ্যই! কেন নয়!’


‘দারুণ! সন্ধ্যায় তাহলে আমরা আপনার বাড়িতেই হ্যাপি নিউ ইয়ার উদযাপন করব। বড় সাহেবরা অবশ্য এটি উদযাপন করে পাঁচতারা হোটেলে। মাঝরাতে তারা চিত্কার করে গান গায়, আর বউদের কোমর জড়িয়ে ধরে নাচে। আপনি যদি কিছু মনে না করেন তাহলে আমি গুপ্তাকেও আপনার পক্ষ থেকে নেমন্তন্ন করতে পারি।’


গুপ্তা এই অফিসের আরেক টাইপিস্ট। তার টেবিল পাশের রুমে। টাইপ করার পাশাপাশি গুপ্তার আরেক দায়িত্ব হচ্ছে এই অফিসের চিঠিগুলো ঠিকমতো বুঝে নেওয়া, বাছাই করা, তারপর ঠিকমতো ডেসপ্যাচ করা। ‘অবশ্যই!’ কাপুর উদারভাবে সায় দিল।


ব্রিফকেসে স্কচের বোতলটা নিয়ে অন্যদিনের তুলনায় একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরল কাপুর। কিন্তু সে জানত না তার বউয়ের প্রতিক্রিয়া এতটা মারাত্মক হবে। কণ্ঠে বিষ ঝরিয়ে তার বউ বলল, ‘তুমি বাড়িতে এই রকম একটা সর্বনাশ ডেকে আনলে? এই শয়তানের প্রসাদ তুমি খাবে বাচ্চাদের সামনে? নিউ ইয়ার? নিউ ইয়ার কী জিনিস? আজ মাসের ৩১ তারিখ—ঘরে কোনো তরকারি নেই, একটা বিস্কুটের টুকরা নাই, অতিথিকে খাওয়ানোর মতো কিছুই নাই। মুদির কাছ থেকে আর বাকি নিতে হলে আমি লজ্জায় মরে যাব। এই তো মাত্র গতকাল আমি তাকে বলেছি যে এই মাসে আর কোনো জিনিস আমি বাকিতে নেব না। তাকে বলে রেখেছি আমাদের বাকির হিসেব করে রাখতে যাতে আমি মাসের ১ তারিখেই সব টাকা শোধ করে দিতে পারি। এই মাসে ৯৮৩ রুপি পাওনা হয়েছে মুদির। বাড়তি যা বাকিতে নেব, তা খেয়ে সাবাড় করবে তোমার অতিথিরা। তারা তো খেয়েদেয়ে ঢেঁকুর তুলতে তুলতে বাড়ি ফিরবে, কিন্তু আমরা কিভাবে বাঁচব? তুমি কি চাও যে আমি ছেলেমেয়েদের নিয়ে সামনের মাসে গুরুদোয়ারার লঙ্গরখানায় গিয়ে খাই? নিউ ইয়ার! এই সব হচ্ছে অলস ধনীদের পাঁচতারা হোটেলের বিনোদন। আমরা পেটেভাতে দিনকাটানো মানুষ। একটা পয়সাও বাজে খরচ করার উপায় নেই। আমি যে কিভাবে তোমার গোনা-গুনতি টাকায় মাসের ৩০টা দিন পার করি, সেটা কেবল আমিই জানি।’


কাপুর এখন কী করে! কুমিরের চোয়ালের মধ্যে হাত ঢোকানো হয়ে গেছে। অক্ষত হাত ফেরত পাওয়ার আশা করা অসম্ভব। সে বউকে বোঝানোর চেষ্টা করে সবচাইতে মনগলানো মোলায়েম ভাষায়, ‘লক্ষ্মী বউ আমার! এই নিউ ইয়ারটা হচ্ছে আমার বৈশাখী কিংবা দেওয়ালির মতোই একটা ইংরেজি উত্সব।’


কিন্তু লক্ষ্মী বউ কোনো যুক্তিই মানতে রাজি নয়। যুক্তি না শোনার পণ করে বসে আছে যেন সে।


এক্কেবারে কাঁটায় কাঁটায় সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে দুই সহকর্মী তাদের স্ত্রী এবং একপাল ছেলেমেয়ে নিয়ে হাজির। মহিলা আর বাচ্চারা ঢুকে গেল ভেতরের ঘরে। ধারণা করা হয় যে কয়েকটা বাচ্চা একত্রিত হলেই হৈ-হল্লা হবে। কিন্তু দেখা গেল কেরানির সন্তান বলেই কি না কে জানে, বাচ্চারা সবাই তাদের মায়েদের গাউনের সঙ্গে লেপ্টে রইল। শব্দ বলতে নিচুস্বরে কুকুরের বাচ্চাদের মতো কিচকিচ করা। রাতটা ছিল বেশ ঠা্লা। মায়েরা বাইরে খেলতে যাওয়ার কথা বললেও কেউ নড়ল না তাদের পাশ ছেড়ে।


পুরুষরা স্কচের বোতল ঘিরে বসল। লবণ-মাখানো কাজুবাদাম দিয়ে শুরু করল তাদের পান-উত্সব। ভেতরের ঘরে তাদের স্ত্রীরা ততক্ষণে আলু আর পেঁয়াজের দাম নিয়ে কথাবার্তা শুরু করে দিয়েছে।


‘কাপুর সাহেবের প্রমোশন উপলক্ষে এই রকম একটা পার্টি আমাদের অবশ্যই পাওনা ছিল।’ বশিষ্ট মন্তব্য করল। কাপুরের মনে হলো সে একটা বেলুনের মতো ফুলেফেঁপে উঠছে। সে একটু হাসির সাথে বলল, ‘প্রমোশনের কী ছিরি ইয়ার! প্রমোশন মানে তো বেতন বাড়া। আর আমার বেড়েছে কেবল কাজের চাপ। আগে আমাকে অফিস করতে হতো সকাল ১০.৩০ থেকে বিকাল ৪.৩০ পর্যন্ত। আর এখন আমাকে মন্ত্রীর দপ্তরে রিপোর্ট করতে হয় সকাল ৭.৪৫ মিনিটে। আর ছুটি পেতে পেতে রাত ৮টা-৯টা বেজে যায়। আমি এ কথা আগে তোমাদের বলিনি।’


‘কাজের কথা ছেড়ে দিন কাপুর সাহেব। আপনার প্রভাব কতটা বেড়েছে, সেইটা খেয়াল করুন। আপনার স্ট্যাটাস এখন কতটা উঁচুতে উঠেছে সেইটা খেয়াল করুন।’ গুপ্তা বলে।


‘আপনি যে চেয়ারটিতে বসেছেন, সেখানে বসলে কত কিছু যে করা সম্ভব! আপনি সুদ সাহেবের কথাটা ভাবুন। নরিন্দার সুদ। তিনি আপনার ঐ একই চেয়ারটিতে বসতেন। বম্বের একটা পার্টির কী যেন একটা লাইসেন্সের ফাইল মিনিস্ট্রিতে আটকে ছিল আট বছর ধরে। সেই ফার্মের লোকেরা সপ্তাহে সপ্তাহে আসত, ঘুরঘুর করত, কিন্তু মন্ত্রী বরাবরই পাশ কাটিয়ে যেতেন। নিজেরা ব্যর্থ হয়ে সেই ফার্মের লোকেরা সুদ সাহেবের বাড়িতে গিয়ে প্রায় আক্ষরিক অর্থেই পায়ে পড়ল তার। সুদ সাহেব এমনই ভেলকি দেখালেন যে এক মাসের মধ্যেই লাইসেন্স হয়ে গেল। এটা ছিল পুরাপুরি সুদ সাহেবের হাতের খেল। প্রতি সপ্তাহে বম্বে থেকে আসা-যাওয়া বাবদ ফার্মের খরচ হচ্ছিল কুড়ি থেকে তিরিশ হাজার রুপি। তারা তখন সুদ সাহেবকে ধরে বসল তাদের হয়ে কাজ করার জন্য। এই চাকরি ছেড়ে সুদ সাহেব সেই কোম্পানিতে জয়েন করলেন দিল্লির আবাসিক এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হিসেবে। কোম্পানি তার জন্য তৈরি করে দিল এয়ার কন্ডিশন্ড অফিস। থাকার জন্য দিল বিশাল একটা অ্যাপার্টমেন্ট। এখন সুদ সাহেব সুন্দরী প্রাইভেট সেক্রেটারিকে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় বিলাসবহুল গাড়িতে। গাড়ি চালায় শোফার। সুদ সাহেব এখন প্রত্যেক রাতে ডিনার করে বিভিন্ন অফিসারদের সঙ্গে ওবেরয়, তাজ কিংবা মাউরিয়ার মতো অভিজাত হোটেলগুলোতে। তার হাত দিয়ে খরচ হয় লক্ষ লক্ষ রুপি। প্রতিদিন সে পরে নতুন নতুন ইমপোর্টেড স্যুট।’ বশিষ্ট এমনভাবে সুদ সাহেবের উন্নতির গল্প করে যেন সে তার রক্ত-সম্পর্কিত ভাইয়ের কথা বলছে।


গুপ্তা যোগ করে, ‘আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে প্রত্যেকটা রুপির নোটের গায়ে একটা অদৃশ্য আঠা লাগানো থাকে। হাত থেকে হাতে ঘুরে বেড়ায় রুপি। কিন্তু কারো কারো হাতের সাথে লেগে যায় সেই আঠা। আপনি এখন এমন একটা জায়গাতে আছেন, যেখানে আপনাকে সব সময় মনে রাখতে হবে কথাটা।’


কাপুরের তৃতীয় নয়ন তখন অস্পষ্ট একটা আলোর আভাস পেতে শুরু করেছে।


‘প্রিয় বন্ধুরা, আমরা ধর্মগ্রন্থে পড়েছি যে কীট-পতঙ্গ-পশু হয়ে চুরাশি লক্ষ জন্মের পর একজন মানুষ হয়ে জন্ম নেয়। একজন কেরানিকে সবগুলো পশুপাখির অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই যেতে হয়। বিড়াল, কুকুর, বিচ্ছু, কচ্ছপ, শেয়াল, শুয়োর—সব পশুর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। সেই রকম হাজার জন কেরানির মধ্য থেকে একজন হতে পারে কোনো মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী।’ বশিষ্ট ধর্মগ্রন্থের সাথে মিলিয়ে নেয় কেরানির বিবর্তনকে।


‘তোমার কথাটা সত্যি।’ কাপুর অর্ধেক মেনে নেওয়ার মতো হেসে বলল, ‘কিন্তু এই কথাটাও মেনে নিতে হবে যে কাজের চাপ বেড়ে গেছে অনেক। তোমাদের ভাবিজি তো আমাকে গত দশ দিন ধরে কথার আগুনে ঝলসে দিচ্ছে ।’


গুপ্তা চাপাহাসির সাথে বলল, ‘ভাবিজির উচিত নয় আপনার স্ট্যাটাসের একজন মানুষের সাথে এমন ব্যবহার করা।’


‘আপনি ভাবিজিকে একটু বুঝিয়ে বলছেন না কেন? তাকে বলুন যে, যে চেয়ারটিতে আপনি বসেছেন, তার কল্যাণে অচিরেই আপনার চার দিগন্তই আলোয় আলোময় হয়ে উঠবে। ভাবিজি তখন রোজ আপনার জন্য খাঁটি শুকনো ফলের সাথে দুধ আর জাফরান মিশিয়ে আপনাকে হালুয়া বানিয়ে দিতে পারবেন।’ বশিষ্ট বলল সুখের সাথে।


‘এই স্কচের বোতলটা হচ্ছে তার পয়লা চিহ্ন। এটা সেই রকম একটা উপহার, যা দেওয়া হয় নববধূকে তার প্রথম ঘোমটা খোলার সময়।’ গুপ্তা যোগ করল।


গুপ্তা আর বশিষ্ট মিলে কাপুরকে এমনভাবে জ্ঞান দিতে শুরু করল, যেমনভাবে একজন ‘গুরুদেব’ নতুন একজন শিষ্যকে গ্রহণ করার সময় দিয়ে থাকে।


‘এই বোতলটা দেখে আমার বউ এমন ভাব করেছিল যেন সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে।’ বলল নবদীক্ষিত কাপুর।


বশিষ্ট মিনতির সুরে বলল, ‘প্লিজ প্লিজ, আমরা যেসব কথা বললাম, ভাবিজিকে সেগুলো বুঝিয়ে বলবেন। তার মগজে কিছুটা স্বর্গীয় জ্ঞান ঢুকিয়ে দেওয়া দরকার।’


বশিষ্টের সঙ্গে যোগ হলো গুপ্তার কথা, ‘ভাবিজিকে বলবেন, কাস্টমসের লোক পালাম কিংবা সাহার এয়ারপোর্টে পোস্টিং পাওয়ার জন্য কী না করে! যত প্রভাবশালী লোকের সাথে তাদের জানাশোনা আছে, সবাইকে দিয়ে তদবির করায়। প্রত্যেক ট্রাফিক কনস্টেবল, প্রত্যেক সেল-ট্যাক্স অফিসার চাঁদনি চক, সদর কিংবা চোরিবাজারে পোস্টিং পাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। ঐ রকম একটা পোস্টিং পাওয়ার জন্য তারা মাখন দিয়ে কতজনের জুতা যে পালিশ করে, তার কোনো হিসেব-নিকেশ নেই। তাছাড়া ধরুন, কোনো হাসপাতালে ভিআইপিদের জন্য বরাদ্দ কেবিন-ওয়ার্ডে যে ডাক্তার দায়িত্ব পায়, তার ওপর হিংসায় জ্বলে যায় অন্য ডাক্তাররা। তদবির না করলে এই ধরনের পদ পাওয়া যায় না। এই সব পদে যে দ্বিগুণ খাটুনি, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে যে, মাথা যত বড়, মাথাব্যথাও তত বেশি।’


‘আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কথাই ধরুন।’ বশিষ্ট বলল, ‘প্রতিদিন গড়ে তাকে কাজ করতে হয় ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা। ভোটের সময় তাকে ছুটতে হয় এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে। এই অকল্পনীয় খাটুনির বিনিময়ে ভদ্রমহিলা কী অর্জন করেন, সেটা কি পরিমাপ করা সম্ভব?’


‘ঠিক। আমাদের মন্ত্রী আর নেতারা তো আর নরকে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য ছুটাছুটি করেন না। কিছুটা সময় গেলেই দেখবেন, আপনারও আর কোনো সমস্যা নাই।’ গুপ্তা হেসে বলল।


স্কচের বোতল এখন প্রায় খালি। কাজুবাদাম শেষ হয়ে গেছে। গুপ্তা হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বন্ধুগণ, এখন প্রায় সাড়ে নয়টা বাজে। খাওয়া-দাওয়া সেরে ফেলা উচিত। সাড়ে দশটার পরে আর ফেরার বাস পাওয়া যাবে না। আর আমরা মন্ত্রী-টন্ত্রীও না যে গাড়ির জন্য হুকুম করব...’


কাপুর উঠে ভেতরের ঘরে গেল। একটু পরেই তার ছেলেমেয়েরা লাইন ধরে ঘরে ঢুকল খাবার হাতে নিয়ে। ডাল। সেই সাথে পেঁয়াজ আর আলুর কারি। পুরুষ তিনজন বাইরের ঘরে বসে খেল। আর তাদের স্ত্রী এবং সন্তানরা ভেতরের ঘরে।


কাপুরের বউ চাপাতি বানাতে ব্যস্ত। আর তার ছেলেমেয়েরা গরম গরম চাপাতি নিয়ে ছুটছে অতিথিদের পাতে তুলে দিতে।


রাত সোয়া দশটায় বিদায় নিল অতিথিরা।


এখন কাপুর নিজেকে অপরাধী ভাবছে। সে দুই ঘরের বিছানা গোছাতে শুরু করল। বাসন মাজতে মাজতে তার বউ গজগজ করছে। কানে এল কাপুরের, ‘হায়রে নিউ ইয়ার! ঠা্লার মধ্যে এই রকম উত্সবের মুখে ঝাঁটা মারি। এই সব সাদা মানুষদের সাজে। আমাদের আছে বৈশাখী আর দেওয়ালি। দুই উত্সবই সুন্দর মৌসুমে। কেবল লোহরি উত্সবটাই শীতকালে। তাও মানুষ আগুন জ্বেলে শীত তাড়িয়ে দিতে পারে। আর এখন আমি বরফের মতো ঠা্লা পানিতে হাত ডুবিয়ে আবর্জনা পরিষ্কার করছি। নিউ ইয়ার না ছাই!’


বাতি নিভিয়ে শুতে শুতে রাত অনেক হলো। ছেলেমেয়েরা ঘুমিয়ে পড়েছে আগেই। কিন্তু কাপুরের স্ত্রীর গজগজানি থামেই না। একসময় সে বলল, ‘হতচ্ছাড়া নিউ ইয়ার! এটা জানুয়ারির ২ তারিখে হতে পারে না? তাহলে তো তোমার বেতনটা অন্তত আগের দিন ওঠানো যেত।’


তার স্ত্রীর কথাগুলো ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে বাদুড়ের মতো যেন উড়তে থাকে, উড়তেই থাকে। অনেক পরে কোনো একটা দেয়ালে বসার সুযোগ পায়।


মাঝরাতে যখন পাঁচতারা হোটেলের আলোগুলো কমিয়ে দেওয়া হলো, যাতে পুরুষরা অন্যের স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরার এবং চুমু খাওয়ার সুযোগ পায়, আর একসাথে ‘আউল্ড লাঙ সাইনে’ গান গেয়ে নিউ ইয়ারকে বরণ করতে পারে, ততক্ষণে কাপুর-দম্পতি একে অপরের পিঠের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন