সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৫

ভার্জিনিয়া উলফের দু'টি গল্প ও গল্প দুটি নিয়ে আলাপ : ১. সবুজ। ২. নীল

অনুবাদক : ইশরাত তানিয়া

সবুজ

বন্দর চিহ্নিত কাঁচের আঙুলগুলো নিচের দিকে ঝুলে থাকে। আলো পিছলিয়ে কাঁচ বেয়ে নেমে যায় আর ফোঁটা ফোঁটা সবুজ জলাশয় ঝরায়। সারাদিন ধরে উজ্জ্বল দশটি আঙুল মর্মরপ্রস্তরে সবুজের বিন্দু ঝরায়- দীর্ঘপুচ্ছের ছোট টিয়াগুলোর পালক- তাদের নিষ্ঠুর আর্তনাদ- তাল গাছের ধারাল পাতাগুলো- এরাও সবুজ; সবুজ সুচ বিদ্ধ করে সূর্যকে দ্যুতিময় করে।
কিন্তু কঠিন কাঁচ ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ে মর্মরপ্রস্তরে; মরুভূমির বালুর ওপর বাতাসে স্থির হয়ে ভেসে থাকে জলাশয়; উটগুলো এর ভিতর দিয়ে এক পাশে কাত হয়ে চলে যায়; জলাশয় স্থির হয় মর্মরপ্রস্তরে; জলাভূমির সরু পাতাহীন গাছগুলো ধীরে ধীরে কিনার ঘেঁষে চলে; আগাছা ব্যাহত করে প্রবহমানতা; এখানে সেখানে ফোটে শ্বেতপুষ্প; উদাসভাবে ব্যাঙ ঘুরে ফিরে; রাত্তিরে সেখানে নিরবচ্ছিন্নভাবে নক্ষত্রনিচয় বিন্যস্ত হয়।সন্ধ্যা নামে, ছায়া উনুনের ওপরে বেরিয়ে আসা তাক থেকে সবুজের সম্মার্জন করে; আলোড়িত হয় সমুদ্রের পৃষ্ঠভাগ। কোনো জাহাজ আসে না; উদ্দেশ্যহীন ঢেউগুলো দুলতে থাকে শূন্য আকাশের নিচে। এখন রাত; নীল কালির ফোঁটা ঝরায় সুচ। সবুজের প্রস্থান ঘটে।



নীল

চ্যাপ্টা, মোটা এবং ওপরের দিকে কিঞ্চিৎ ওলটানো নাক বিশিষ্ট অতিকায় দানব উপরিভাগে জেগে ওঠে এবং তার ভোঁতা নাসারন্ধ্র থেকে সজোরে দুইটি খাড়া স্তম্ভের মতো পানির ফোয়ারা ছোটায়, যার মধ্যভাগ অগ্নিময়-সাদা, ক্ষুদ্র জলকণা আলগা সুতোয় নীল পুঁতির অলঙ্করণ দেয়া প্রান্ত বাতাসে ভাসিয়ে দেয়। নীল রঙের অভিঘাত রেখা দিয়ে তার চামড়ার কালো ত্রিপল চিহ্নিত করে। মুখে-নাকে সশব্দে পানি ছুঁড়ে সে জলমগ্ন হয়, গান গায় এবং নীল তার কাছাকাছি এসে তার চোখের মসৃণ পাথরের টুকরো দিয়ে পানির সন্ধান করে। তীরে ছুঁড়ে দিয়ে সে শুয়ে পড়ে, ভোঁতা, স্থুল, শুকনো নীল পরিমাপক ঝরিয়ে। তাদের ধাতব নীল রং সমুদ্র তটে মরিচা ধরা লোহার রঙ পরিবর্তন করে দেয়। নীল হচ্ছে ভেঙে যাওয়া দাঁড় টানা নৌকোর পাঁজর। একটি ঢেউ নীল ঘন্টিগুলোর নিচে গড়িয়ে যায়। শুধু গির্জা স্বতন্ত্র, শীতল, ধুপ আচ্ছন্ন, মৃদু নীলের কুমারী মেরীর অবগুণ্ঠন নিয়ে।



গল্প বিষয়ে প্রাসঙ্গিক-

‘নীল এবং সবুজ’ গল্পটি ভার্জিনিয়া উলফের ‘মানডে অর টুইসডেঃ এইট স্টোরিজ’ নামক ছোটগল্পের সংকলন থেকে নির্বাচন করা হয়েছে। কাব্যিক চিত্রকল্পের ব্যাঞ্জনায় উলফ গল্পটিকে উপস্থাপন করেছেন। দুটি রঙ তিনি দেখেছেন এবং রঙের রূপান্তর অনুভব করেছেন। বাস্তবতায় তিনি রঙের বর্ণনা দিয়েছেন পাখির পালকে, গাছের পাতায়। তাঁর নিজস্ব চেতনায় সবুজ কে অনুভব করেছেন তপ্ত বালুর ওপরে ভাসমান জলাশয় মরীচিকায় এবং প্রতিফলিত আলোর ঝাড়বাতিতে। দ্বিতীয় অংশে রঙের সুষমাকে তিনি দেখেছেন বৃহৎ সামুদ্রিক প্রাণীর শক্তিতে। হতে পারে সেটি কোনো অতিকায় মৎস্য। সেই রঙ বিবর্ণ হয়ে যায় যখন জলজ প্রাণী চির নিদ্রায় ঢলে পড়ে। গল্পটির শেষে গির্জার প্রসঙ্গে রঙ শান্তিময় এবং স্বর্গীয় একটি অভিজ্ঞতার স্বরূপ ধারণ করেছে। রঙের আত্মগত অনুভব কে বহুভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। উলফ বাস্তব বোধগম্যতা এবং ধরা-ছোঁয়া যায় না এমন স্পর্শাতীত দুর্বোধ্যতার মাধ্যমে পাঠককে তাঁর উপলব্ধির প্রক্রিয়ার ভেতরে নিয়ে গেছেন।

বৃটিশ কথাসাহিত্যিক এবং ফেমিনিস্ট ভার্জিনিয়া উলফের জন্ম ১৮৮২ সালে। তাঁকে বিবেচনা করা হয় বিশ শতকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আধুনিকতাবাদী সাহিত্য-ব্যক্তিত্ব হিসেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে লন্ডনের সাহিত্য সমাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখক হিসেবে পরিগণিত হন তিনি। তৎকালীন ব্লুমস্‌বারি গোষ্ঠীরও একজন সম্মানিত সদস্য ছিলেন তিনি। উলফ-রচিত সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। লিখেছেন গল্প, উপন্যাস, স্মৃতিকথা, প্রবন্ধ। মিসেস ডলওয়ে, টু দ্য লাইটহাউস, জেকবস্‌ রুম, ওরলানডো, দ্য ওয়েভস্‌ তাঁর প্রখ্যাত উপন্যাস।

চরিত্রের অবিরাম বিবৃতি আর উন্মোচনে উপন্যাসগুলো পেয়ে যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মাত্রা। উল্‌ফকে বলা হয় অক্লান্ত পরীক্ষক, পর্যবেক্ষক এবং বহুদর্শী এক রচয়িতা। স্ট্রিম অব কনসাসনেস বা চেতনাপ্রবাহ রীতিতে তিনি রচনা করেন 'নিজের একটি ঘর' নামক প্রখ্যাত গ্রন্থটি। এই রীতির শ্রেষ্ঠ ফসল জেমস জয়েসের ইউলিসিস। এই রীতিটিকে বলা হয় কোনো ব্যক্তির চেতনাপ্রসূত অভিজ্ঞতার বিরামহীন বর্ণনা। দীর্ঘদিন বিষণ্নতায় ভোগার ফলে বেঁচে থাকবার তীব্রতা কমে যায় তাঁর। নিজের হাতে তুলে নেন নিজেকে ধ্বংসের দায়িত্ব! ৫৯ বছর বয়সে কোটের পকেটে পাথর ভরে বৃটেনের ওউশি নদীতে ডুবে যান তিনি। জীবনে আর ফেরা হয় না তাঁর। জলের সঙ্গে মিশে যায় বিষণ্ন লেখিকার আত্মা। দিনটি ছিল ১৯৪১ সালের ২৮ মার্চ।




অনুবাদক পরিচিতি

ইশরাত তানিয়ার জন্ম ৬ নভেম্বর, ১৯৮০। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেছেন। বর্তমানে পিএইচডি করছেন। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। কবি। গল্পকার। মানবিক সম্পর্ক, নৈরাশ্য, স্বপ্ন, প্রকৃতি, প্রেম, অতীন্দ্রিয়তা বিষয়ে তাঁর উপলব্ধি এবং ভাবনা কেন্দ্র করে তাঁর সাহিত্যকর্ম আবর্তিত হয়েছে।







কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন