বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

ধারাবাহিক উপন্যাস : সখী রঙ্গমালা--তৃতীয় পর্ব

প্রথম পর্ব : পড়ার লিঙ্ক
দ্বিতীয় পর্ব : পড়ার লিঙ্ক

৩.

রাত থাকতেই ধুমধুমা জ্বর নিয়ে শ্যামপ্রিয়া বৈষ্ণবী রাজবাড়ির দিঘির পাড়ে এসে দাঁড়ায়। গায়ে ছেঁড়া কাঁথা, হাতে লোটা। হালে শ্যামপ্রিয়া নিঃসম্বল, অসুখ-বিসুখের তাড়নায় শরীরটাও কাহিল। ওদিকে রাজচন্দ্র ঘাঁটি গেড়ে বসেছে নরবাড়ি। কুড়ায় বাক দিচ্ছে-- নাগরের টিকির দেখা নেই। কাজ হাসিল হলে মানুষ উপকার মনে রাখে না। হিতে বিপরীত হয়।
বছর দুই ধরে এক শ সিক্কা ইনাম পাবার আশায় তার পায়ে পায়ে ঘুরছে শ্যামপ্রিয়া। পাওনাদারের সাক্ষাৎমাত্র চন্দ্র বাবাজি পালিয়ে যায় আর মোসাহেব রাম ভাঁড়ারি তেড়ে আসে মারতে। শ্যামপ্রিয়াও ছেড়ে দেবার পাত্রী নয়। আজ রাজচন্দ্র চৌধুরী হয় দেনা শোধ করবে, নয়তো বৈষ্ণবীর ভুখা দেহটা মারিয়ে ঘরে ফিরবে। দুসরা কোনো পথ নাই।

সে পথে খানিক বাদে উজিয়ে ওঠে ফুলেশ্বরী রাই আর হীরা দাসী। শ্যামপ্রিয়া তখন গাছে হেলান দিয়ে কাঁথা মুড়ে একটুখানি জুত হয়ে বসেছিল। মাথাটা শরীরে ডোবানো। চোখ দুটি নিদ্রায় ঢুলুঢুলু। রাজবাড়ির বউ-বান্দির হাঁটার শব্দ শুনে কাছিমের মতো গলা তোলে বৈষ্ণবী। মুখে রা নেই। ছেঁড়া কাঁথার ফাঁকে এক জোড়া চোখ শুধু ইস্পাতের ছুরির মতো ঝলসে ওঠে।

যে যা-ই বলুক, শ্যামপ্রিয়া তো মানুষ, তাও আদ্যিকালের। এখন কলিযুগ বলে কথা! সে কী করে জানবে, রাতের পর রাত সোয়ামি ঘরছাড়া কার জন্য, সে বেবুশ্যে হলেও দেখতে কেমন, এর হদিস নিতে রাজবাড়ির বউ রাতের আন্ধারে নরবাড়ি চড়াও হবে! শেষ পর্যন্ত রাস্তার ধারের সুপারিগাছে হেলান দিয়ে শ্যামপ্রিয়াকে তা দেখতে হলো। তাও যাওয়ার সময় নয়, ফেরবার পথে।

এখন শ্যামপ্রিয়ার পশ্চাতে যে ঘুমন্ত রাজবাড়ি, যা পাখপাখালির ডাকাডাকিতে একটু একটু করে জেগে উঠছে, সেখানে চক্ষের পলকে সে শোরগোল বাধিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তাতে ফায়দা কার। এমনিতেই স্বামী বিহনে বউটা জিয়ন্তে মরা। খবরটা চাউর হয়ে গেলে তার নাক-কান কাটা যাবে, অপরদিকে শ্যামপ্রিয়ার যে জন্মের দুশমন, সেই মেজো গিন্নির পোয়াবারো হবে।

যৌবনকালে শ্যামপ্রিয়ার ঘরে যখন মেজো গিন্নির স্বামী রাজেন্দ্র নারায়ণের আনাগোনা, তখন থেকেই কর্ত্রীর সে চক্ষুশূল। তার অন্দরমহলে ঢোকার পথে কাঁটা পড়ে। রাজবাড়ির বউ-ঝিদের রসের গান, ভাবের গান শুনিয়ে দু-চার টঙ্কা ইনাম লাভের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। তা ছাড়া দাসীমহলে রক্তকমল, করবীর ছাল জোগান দিয়ে পেট ফালানোর তদবির করাটা ছিল শ্যামপ্রিয়ার বাঁধা কাজ। এ বাবদ যা হাতে আসত, তা ছিল উপরি পাওনা। গরিবের পেটে সবাই লাথি মারে। ওদিকে যে নর্তকীদের পায়ে মালখানার টাকা আর রাজেন্দ্র নারায়ণের রাতগুলি নিকাশ হয়ে যাচ্ছিল, তাদের গায়ে ফুলের টোকা মারারও হিম্মত হয় নাই মেজো গিন্নির।

সে সময় দিঘির পাড়ের রংমহলে রাত নামত বাঁয়া-তবলার চাটিম-চাটিম আর রিনিঝিনি নূপুর-নিক্বণে। সুরমা-আতর-চুড়ি-ওড়নার তাওয়াফরা যেন স্বর্গের অপ্সরা, উড়ে এসে কোমর ভেঙে কুর্নিশ করে দাঁড়াত ঘরজোড়া নরম গালিচায়। বাতাসে সুগন্ধি তামাকের লম্বা চিকন ধোঁয়া। বেলোয়ারি কাচের ঝাড়ে হাজার বাতির নাচন। আসরের মধ্যমণি কর্তামশাই গায়ে আতর ঢেলে, কাছা দুলিয়ে সন্ধ্যারাতে রংমহলে হাজিরা দিতেন আর ফিরতেন নিশি কাবার করে। তাও টালমাটাল অবস্থায়। সকালে পতির স্নানের সাজসরঞ্জাম গুছিয়ে দিয়ে পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসতেন মেজো গিন্নি। তাঁর বুকভাঙা আহাজারিতে পাষাণে ফাটল ধরলেও কর্তার মন ভিজত না। একে একে তূণ থেকে অনেক বাণই ছোড়া হলো। দু-দুবার তিনি বাপের বাড়ির নাওয়ে চড়লেন। এদিক থেকে চাড় নেই। অগত্যা ফিরলেনও যাওয়ার মতো একা। সেই শোধ তুলতে বাড়ির কর্ত্রী সুরা ধরলেন। চারদিকে ঢি ঢি পড়ে গেল। তাতেও কর্তার বিকার নাই। আঁধার নামলে মাথার চুলের রশি দিয়েও তাকে বেঁধে রাখা কঠিন। রোজ রোজ রাজভোগ খেয়ে মুখ পচে গেলে রাজেন্দ্র নারায়ণ যেন শুঁটকি খাবার লোভে বৈষ্ণবীর দ্বারে হানা দিতেন। পরনে হেঁটো ধুতি, পা জোড়া কর্দমাক্ত, মুখে কাউয়্যা-কুলির মতো এক রাও-- পিরিয়া পিরিয়া। শ্যামপ্রিয়ার পরনে পীতাম্বর। সাজন-পারন নিত্যদিনের রসকলি আর তিলকে। কেশবিন্যাসও সেই চূড়া করে চুল বাঁধা। তাতেই উল্টি খেতেন রাজেন্দ্র নারায়ণ। মন থেকে লোপাট হয়ে যেত সুরমা-ওড়না-ঘাগরা-জড়োয়ার মহার্ঘ তাওয়াফি সাজ। রাত ফুরাত চোখের পলকে। দিনের বেলায় ডানে-বাঁয়ে সড়ক থাকতে মহারাজ যখন তার গরিবখানার উঠান দিয়ে লাল বনাতের গদিঅলা টাঙন দাবড়িয়ে বেরিয়ে যেতেন, ঘোড়ার গলার তামা-রুপার ঘাগরের মতো শ্যামপ্রিয়ার মনটাও দুলে দুলে নেচে উঠত।

সে কোন কালের কথা! রাজেন্দ্র নারায়ণ এখন চামড়া-ঝোলা দন্তহীন বুড়া বাঘ। হোঁতকা শরীর কাঁপিয়ে হম্বিতম্বি করলেও আদতে কলের পুতুল। পেছনে কলকাঠি নাড়ে দানবকুল শিরোমণি চান্দা বীর। আর দিঘির পাড়ের রংমহল যেন হানাবাড়ি-- রাতভর ভূত নাচে আর প্রহরে প্রহরে ভেসে আসে বুমবুম প্যাঁচার ডাক।

রাজবাড়ির ঠাটবাটে ভাটা পড়লেও এখন একাই খুড়া-ঠাকুরদার মান রেখে চলেছে রাজচন্দ্র চৌধুরী। শ্যামপ্রিয়ার বৃদ্ধকালের যষ্টি। যষ্টি না ছাই। কত কসরত করে রঙ্গমালার সঙ্গে জোড়া-গাঁথা করে দিল, এখন এক শ সিক্কা ইনাম চাইতে গেলে মোসাহেব লেলিয়ে দেয় ঠেঙাতে।

এক শ সিক্কা যৌবনেও শ্যামপ্রিয়া একসঙ্গে দেখে নাই। সেগুলি যখন ঝুনুর-ঝুনুর বাজানোর খোয়াব দেখছে, রাজচন্দ্রের ধলা টাঙন খটখটিয়ে তার নাকের ডগা দিয়ে বেরিয়ে যায়। পেছনে রাম ভাঁড়ারি। কালো টাঙনের পথ আগলে ধরতে, ঘোড়া না মানুষের উড়া লাথি খেয়ে শ্যামপ্রিয়া কাঁথা-লোটাসমেত দিঘির ঢালু পাড় দিয়ে গড়িয়ে পড়ে। পানির তল থেকে মাথা জাগাতে কিছুটা সময় পার হয়। ততক্ষণে টাঙন ছেড়ে হেঁটে বাড়ির পথ ধরেছে রাজচন্দ্র চৌধুরী। রাম ভাঁড়ারি দিঘির পাড়ের আমগাছে ধলা টাঙন বাঁধছে। সেখান থেকেই বুকপানিতে দাঁড়ানো বৈষ্ণবীকে সে হাত-পা নেড়ে শাসায়। ফের ইনাম চাইতে এলে তার মাথায় যে এক-আধগাছি চুল আছে, তাও যে থাকবে না, টেনে তুলে ফেলবে, রাম ভাঁড়ারি তা দেখায় নিজের বাবরি চুলে আঙুল নাচিয়ে। শ্যামপ্রিয়ার চোখের পাতা নড়ে না। ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে রাম ভাঁড়ারি। পরনের ধুতি নেংটি বানিয়ে বোঝাতে চায়-- পুকুর থেকে এ দন্ডে না উঠলে সে জলে নেমে বৈষ্ণবীকে ইচ্ছামতো চুবাবে।

রামার এ পদের গালাগাল, মারধর শ্যামপ্রিয়া আগেও খেয়েছে বিস্তর। ওসবে কখনো গা করে নাই। একে তো তার এক শ সিক্কা বেহাত হয়ে যাচ্ছে, যৌবনে ভাটা পড়াতে দামও কমে গেছে। ভিখারি-নিকারি ফাঁক পেলে লাথি মারে। অকারণে এ জিল্লতি আর নেয়া যাচ্ছে না। বুড়া সাপের দন্তেও বিষ থাকে। দিঘির উত্তর-পশ্চিম কোণে এক শ এক ডুব দিয়ে শ্যামপ্রিয়া যখন তীরে ওঠে, তখন কালা টাঙনসমেত রাম ভাঁড়ারি লাপাত্তা, গাছে বাঁধা ধলা টাঙন একমনে ঘাস চিবাচ্ছে।

বৈষ্ণবীর শরীর ভাসিয়ে জলের ধারা নামে। পাটল বর্ণের চোখ থেকে কান্নার মতো জল পড়ে টুপটুপিয়ে। যেমনই হোক, এ দন্ডে তার একটা ধলা মুরগির ছানা দরকার, যা গুণিনের বিধানমতে বাণ মারায় আবশ্যক। গুরুর গুপ্তবিদ্যা যথা-তথা বুরা কাজে প্রয়োগের নিষেধ থাকলেও সময় সময় এ না করে পারা যায় না। কিন্তু বিনা কড়িতে ছানাটা সে পায় কোথা। হাটে সওদাপাতি আজকাল উটনায় মেলে না। চাইতে গেলে গলাধাক্কা খেতে হয়। তবে নিখরচায় এটি হাতানো সম্ভব করিম শেখের বাড়ি থেকে। ধারেকাছে এই এক ঘর মুরগি-পোষা মুসলমানই আছে।

গায়ের ভেজা কাপড় গায়ে শুকায় শ্যামপ্রিয়ার। বেজির ভয়ে মুরগির ছানা-পোনা বাড়ি ছেড়ে নড়ে না। করিম শেখের বোবা মেয়েটাও নচ্ছার-- কেমন করে যেন আগাম বিপদের গন্ধ পেয়ে যায়। ঠেঙ্গা হাতে ঘুরে ঘুরে সে উঠানে টহল দিচ্ছে। শ্যামপ্রিয়াও ওত পেতে আছে বাড়ির নামার ছনখেতে। পাহারায় ঢিলা পড়লেই চিলের মতো ছোঁ মারবে। এ ঠিকঠাক। বেলা গড়াতেই সব প- হয়ে যায়। খিদা-তৃষ্ণায় বৈষ্ণবীর জ্বরতপ্ত শরীরটা নেতিয়ে পড়ে ছনের গাদায়। গা থেকে ধীরে ধীরে রোদ সরে দাঁড়ায়। সূর্য পাটে বসে। শ্যামপ্রিয়ার ঘোর-লাগা চোখে ভাসে-- ধলা মুরগির ছাও আর রাজবাড়ির বউ ফুলেশ্বরী রাই। ছানাগুলি যেমন চতুর, বউটা তেমন বোকা। সোয়ামি পাকড়াও করতে পাইক-প্যাদা থুয়ে, একদঙ্গল মুরগির ছাও লয়ে যাচ্ছে নরবাড়ি। রঙ্গমালা উবু হয়ে বঁটিতে শাণ দিচ্ছে। আত্মারাম নরের বাড়িতে আজ উৎসব। ওখানে শ্যামপ্রিয়ারও পাত পড়েছে। মিঠাই-মন্ডা, কোপ্তা-কালিয়া-- একেবারে শাহি ভোজ! কোনটা থুয়ে কোনটা খাবে। আমিষে যখন অরুচি নাই-- মাছই সই। সে মাছের ল্যাজা ধরে যখন টানাটানি করছে, তক্ষুনি একটি মুরগির ছাও বাতাসে ডানা ঝাপটিয়ে পাতে পড়ে।

গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসে শ্যামপ্রিয়া। এ খোয়াব, না আর কিছু! সূর্য ডুবে গেছে। দিনটাই মাটি হলো। খালি হাতে ফিরবে? তা কেন। বিহানে খোঁয়াড়ের আগল খুলে দিলে যেমন হয়, স্রোতের মতো নানা বর্ণের মুরগা-মুরগি ডানা ঝাপটে ওর নাক বরাবর ছুটে আসছে। শ্যামপ্রিয়াও হাঁটু মুড়ে সামনে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে। হাতের থাবায় খানিকটা লোম। কনুইয়ের চামড়া ছড়ে গেছে। তাও যদি কাজের কাজ কিছু হতো। বাতাসে মুরগা-মুরগি সব উবে যায়। কোথা থেকে কি। প্যাঁকপ্যাঁক ডাক ছেড়ে একঝাঁক হাঁস দিগি¦দিক পালাচ্ছে। বোবা চিৎকার উঠেছে করিম শেখের বাড়ি থেকে। বৈষ্ণবী হামা দেয়ার ভঙ্গিতেই স্থির হয়ে থাকে। সে অবাক হওয়ারও ক্ষমতারহিত। উত্তরোত্তর হইচই বেড়েই চলেছে। এভাবে ঘাপটি মেরে থাকা নিরাপদ নয়। শ্যামপ্রিয়া নিচু হয়ে ছনখেত থেকে দৌড়ে বেরিয়ে কেয়াঝোপের আড়ালে আড়ালে চোরের মতো পা টিপে নিজের বাড়ি ঢোকে।

শ্যামপ্রিয়া বৈষ্ণবীর নিজের বাড়ি বলতে চৌধুরীদের পানাপুকুরের ধারে শিমুলতলায় বাতার বেড়ার ছনে ছাওয়া কুঁড়েঘর। ওখানেই খাওয়া-বসা-শোয়া-রাঁধা-- সব। পোষা বিড়াল চন্দ্রমুখী ছাড়া ধারেকাছে জনমনিষ্যি নাই। নাই তো নাই। শ্যামপ্রিয়া তার পরোয়াও করে নাই কোনো দিন। ঘর ছাড়া অব্দি সমাজ-সংসারের ওপর তার বেজায় রোখ। কাপড় পরার শুরুই যার সাদা থান দিয়ে, তার অদৃষ্ট তো লেখা হয়েই ছিল। তাতে ঝাঁটা মেরে তেরো-চৌদ্দ বছর বয়সের কালে সে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসে। সঙ্গে শ্যামবর্ণের বংশীবাদক শ্যামসুন্দর। তারই দেয়া প্রেমিকার নাম শ্যামপ্রিয়া। কপোত-কপোতী বৈষ্ণবের ভেক নিয়ে বুক ফুলিয়ে গাঁয়ে ফেরে। সেবারের গরম কালটা আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এ নিয়ে জোর তর্কবিতর্কে। কিন্তু বৈষ্ণবীয় আধারে যারা ঠাঁই নিয়েছে, তাদের তো সনাতন ধর্মের অনুশাসন মানার দায় নেই, জাতে থাকা না-থাকার বালাই নেই। বর্ষাকালটা শ্যামসুন্দর-শ্যামপ্রিয়া ডুগডুগি বাজিয়ে ভিক মেগে খেয়ে না-খেয়ে কাটায়। গলার সুর পেটের আগুন নেভাতে পারে না। শীতের শুরুতে ঘরের ইঁদুরই বেড়া কাটে। গোবর খেয়ে শ্যামসুন্দর ফের জাতে উঠে গেলে, গাঁয়ে আর শ্যামপ্রিয়ার ঠাঁই হয় না। যৌবন আর সুরেলা কণ্ঠই তখন সম্বল। তাই নিয়ে পথে নামে সে। বৈষ্ণবীর লেবাসে ভাসতে ভাসতে ঠেকে রাজবাড়ির দুয়ারে। জীবনের বাঁকে বাঁকে অজস্র চোরাস্রোত। শ্যামপ্রিয়া তাতে খাবি খেলেও তলিয়ে যায়নি কখনো। দুবেলা খেয়েপরে বেঁচেবর্তে ছিল। রাজেন্দ্র নারায়ণের আমল শেষ হয়ে শুরু হতে যাচ্ছে রাজচন্দ্র চৌধুরীর নতুন জমানা। আজ যেন কোনো কিছুই তার বশে থাকছে না। বয়সের চেয়ে রোগ-ব্যারাম কাবু করে ফেলছে বেশি।

ঘরের মাচা থেকে আরেকটা টুটা-ছেঁড়া কাঁথা নামিয়ে শ্যামপ্রিয়া হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে বিছানায় ঢোকে। জ্বরটা ফের জাঁকিয়ে ধরেছে। থেকে থেকে তন্দ্রা ছুটে যাচ্ছে। খানিক মিউমিউ করে সাড়া না পেয়ে চন্দ্রমুখীও প্রিয়ার কাঁথার নিচে সেঁধোয়।

শেষরাতের দিকে বিনা ওষুধপথ্যে শ্যামপ্রিয়ার ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে। ছাড়ে না ধলা মুরগির বাসনা। তবে ভাবনার গতি-প্রকৃতি আমূল বদলে যায়। নয়া হাঁড়িতে ভরে রাজচন্দ্র-রাম ভাঁড়ারির যাওয়া-আসার পথে যে ছানাটা পুঁতে ফেলার কথা, তা তো একরকম কড়ির অভাবেই জোগাড় হলো না। তার ওপর আছে নয়া মাটির পাতিল আর গুণিনের খরচ। সব ব্যবস্থাই স্বচ্ছন্দে হবে রাজবাড়ির বউটাকে আরেকবার বাগে পেলে। দুষ্ট স্বামী শায়েস্তা করতে গায়ের গয়না তো গয়না, মেয়েরা নিজের চামড়াও অবলীলায় খসিয়ে দিতে পারে-- এমনই পাগল! কাজটা সহজ হতো, যদি সে রাজবাড়ির অন্দরমহলে ঢুকতে পারত। সেটি হওয়ার জো নেই, যত দিন মেজো গিন্নি খাকের ওপর আছেন। গায়ে-গতরে যেমন, তাকে অবেলায় শ্মশানে পাঠাতে হলে দরকার হীরাবাণ। তার মানে আরও একটা ধলা মুরগির ছাও, নয়া একখানা মাটির পাতিল, গুণিনের খরচ। রাজবাড়ির কর্ত্রী মরলে খাসদাসী কর্ত্রী হয়ে চারদিকে নজরদারি করে। শ্যামপ্রিয়ার অন্দরমহলে ঢোকার পথ পরিষ্কার হবে না ক্ষান্তমণিকে না সরালে।



এভাবে রাত থাকতেই রাজবাড়ির অর্ধেক লোক হীরাবাণের শিকারে পরিণত হয়। তা থেকে টঙ্কার লোভে শুধু বউটাকে রেয়াত করে বৈষ্ণবী। তাকে নিয়ে স্বপ্নও দেখে বিস্তর। রাজবাড়িতে সে নিজে ঢুকতে পারল কি পারল না, রঙ্গির টানে টানে আপনিই ঘরের বার হবে ফুলেশ্বরী। শ্যামের কোলে রাধা দোলে-- তা দুনয়নে দেখেও সুখ। এতে ভিন্ন তার আছে। শরীর-পোড়া বউয়ের দুধের স্বাদ ঘোলে না মিটিয়ে উপায় কী? নরবাড়ি থেকে ফেরার পথও তার একটাই, রাজবাড়ির দিঘির পাড়, যেখানে শ্যামপ্রিয়া কাঁথা গায়ে লোটা হাতে দাঁড়িয়ে ছিল।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন