বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

তমসায় সাক্ষাৎ

 মূল: ন্গুগি ওয়া থিয়োঙ্গ’ও

অনুবাদ: শামসুজ্জামান হীরা


সে কুঁড়েঘরটার দরজায় দাঁড়াল এবং তার বুড়ো, দুর্বল কিন্তু প্রাণোচ্ছল পিতাকে শক্ত মোটা কাপড়ে তৈরি নোংরা ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে গ্রামের পথ ধরে আসতে দেখল। তার পিতা সবসময় এই ব্যাগখানা বহন করেন। জন জানে ওটাতে কী আছে: একটা বাইবেল, একটা ধর্মীয় সংগীতের বই ও একটা কলম। তার বাবা একজন ধর্মপ্রচারক।
তার দিব্যি মনে আছে, যখন সে কিছুটা বড় হয়ে উঠেছিল তখন বাবা তার মাকে তাকে গল্প শোনাতে বারণ করেছিলেন। তারপর থেকে অনেকদিন হল, তার মা গল্প বলা বন্ধ করেছেন। তিনি বলতেন: `এখন আর কোনও গল্প বলতে বলো না। তোমার বাবা আসতে পারে।‘ এ-কারণে সে তার বাবাকে ভয় পেত। জন ঘরে ঢুকে তার মাকে তার বাবার আগমনের ব্যাপারে সতর্ক করে দিল। যখন তার বাবা ঘরে প্রবেশ করলেন, জন একপাশে সরে দাঁড়াল এবং দরজার দিকে হেঁটে গেল। সে সেখানে কিছুক্ষণ সন্দিগ্ধচিত্তে অপেক্ষা করে বাইরে বেরিয়ে গেল।

`জন, এই জন!’

`বাবা!’

`ফিরে এসো।’

সে সন্দেহভরা মন নিয়ে বাবার সম্মুখে দাঁড়াল। তার হৃৎস্পন্দন দ্রুততর হল, এবং তার মধ্যে কেমন এক অস্থির জিজ্ঞাসা আঁকুপাঁকু করতে লাগল: তিনি কি জানেন?

`বসো। কোথায় যাচ্ছ?’

`একটু হাঁটতে, বাবা।’ সে এড়িয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে জবাব দিল।

`গ্রামে যাচ্ছ?’

`মানে, হ্যাঁ — না। মানে কোনও বিশেষ জায়গায় যাচ্ছি না।‘ জন দেখল তার বাবা কঠোর দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছেন, তার চেহারা পড়বার চেষ্টা করছেন। জন খুব চাপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বাবার দৃষ্টিকে মোটেই পছন্দ হত না তার। তিনি তার দিকে এমনভাবে তাকাতেন যেন সে একজন পাপী, এমন একজন যার দিকে প্রতিমুহূর্তে নজর রাখা দরকার। `আমি’ তার অন্তর বলল। অপরাধীর মত জন তার বৃদ্ধ পিতার চাউনিকে পাশ কাটিয়ে শান্তভাবে আলুর খোসা ছাড়ানোরত মায়ের দিকে আবদারের দৃষ্টি নিয়ে তাকাল। কিন্তু তিনি তাঁর চারপাশের সবকিছু ভুলে গেছেন বলে মনে হল।

`তুমি কেন এড়িয়ে চল? কী করেছ তুমি?’

ভয়ে জন কুঁকড়ে গেল। কিন্তু তার চেহারা থাকল নির্বিকার। সে তার হৃৎপিণ্ডের জোর আওয়াজ শুনতে পেল। এটা ছিল জল পাম্প করার ইঞ্জিনের শব্দের মত। সে অনুভব করল, কোনও সন্দেহ নেই, তার বাবা এ-সম্পর্কে সবকিছু জানেন। সে ভাবল, কেন তিনি আমাকে পীড়ন করেন? কেন তিনি এখনই বলেন না যে তিনি জানেন? তখন অন্য এক বোধ তাকে বলল: না, তিনি জানেন না, জানলে তিনি তোমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন। এক ধরনের সান্ত্বনা। সে তার চিন্তাশীল পিতাকে সাহসীকতার সঙ্গে মোকাবেলা করল।

`কবে যাওয়া হচ্ছে?’

জন আবার ভাবল, তিনি কেন জিজ্ঞেস করছেন? আমি তো বহুবার বলেছি।

`পরের সপ্তাহে, মঙ্গলবারে।’ সে বলল।

`ঠিক আছে। কাল আমরা মার্কেটে যাব, শুনছ?’

`হ্যাঁ, বাবা।’

`তাহলে তৈরি থেকো।’

`হ্যাঁ, বাবা।’

`তুমি যেতে পারো।’

`ধন্যবাদ, বাবা।’ সে যেতে শুরু করল।

`জন।’

`জি।’ জনের হৃৎস্পন্দন প্রায় থেমে যাওয়ার দশা!

`তোমাকে খুব ব্যস্ত দেখাচ্ছে। তুমি গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছ, এটা আমি শুনতে চাই না। আমি তরুণদের চিনি, নিজেদের বাহাদুরি দেখাতে ঘুরে বেড়ায়, তুমি কি সেজন্য বেরোচ্ছ? আমি গ্রামে কোনও ঝামেলা বেধেছে, তা শুনতে চাই না।’

হাঁফ ছেড়ে সে ঘর থেকে বেরোলো। সে অনুমান করতে পারল, গ্রামে ঝামেলা চান না বলে তার বাবা কী বোঝাতে চেয়েছিলেন।

‘তুমি ছেলেটাকে এত নির্যাতন কর কেন?’ প্রথমবারের মত সুসানা বলে উঠলেন। তিনি পুরো নাটকটি খুব মনোযোগের সঙ্গে কোনও বাক্যবিনিময় ব্যতীত শুনছিলেন। এখন তাঁর কিছু বলবার পালা। তিনি তাঁর জীবনসঙ্গী, বৃদ্ধ কঠোর ধর্মপ্রচারকটির দিকে তাকালেন। বহুবছর আগে তিনি তাঁকে বিয়ে করেছিলেন। কত বছর তা তিনি বলতে পারেন না। তাঁরা সুখী ছিলেন। তারপর তিনি ধর্মান্তরিত হলেন। এবং গৃহের সবকিছু ধর্মের আবহে ছেয়ে গেল। তিনি, এমনকী শিশুদের গল্প শোনাতেও নিষেধ করলেন। `ওকে যিশু সম্পর্কে বল, যিশু তোমার জন্য আত্মাহুতি দিয়েছেন। শিশুর জন্য যিশু প্রাণ দিয়েছেন। ও অবশ্যই প্রভুকে জানবে — চিনবে।’ তিনি নিজেও ধর্মান্তরিত হলেন। কিন্তু তিনি কখনই ছেলেটির ওপর বৃদ্ধের নৈতিক পীড়নকে অন্ধভাবে মেনে নিতে পারতেন না (যা তিনি সবসময় জন-এর ক্ষেত্রে উল্লেখ করে থাকতেন), যেন ছেলেটা তার বাবা সম্পর্কে ভীতি নিয়ে বেড়ে না-ওঠে। তিনি বিস্মিত হতেন, এটা কী পুত্রের প্রতি ভালোবাসা! না কি এটা পুত্রের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ, যেহেতু তাঁরা দুজনেই বিয়ের পূর্বেই ‘পাপ’ করেছিলেন? জন সেই পাপের ফসল। কিন্তু সেটা তো জনের দোষ নয়। ছেলেটা বরং এ-নিয়ে অনুযোগ করতে পারে। তিনি প্রায়শ বিস্মিত হতেন, যদি ছেলেটা তেমন করত... কিন্তু না। তাঁরা যখন ফোর্ট-হল ত্যাগ করেন তখন ছেলেটা খুব ছোট ছিল। তিনি তাঁর স্বামীর দিকে তাকালেন। স্বামী নীরব রইলেন, যদিও তাঁর বাঁ হাত, কিছুটা-বা উত্তেজিতভাবে তার মুখ স্পর্শ করল।

`ব্যাপারটা এমন যে ও তোমার সন্তান নয়। অথবা তুমি কী...’

`হুম, সেবিকা।’ অনুনয় জড়ানো কণ্ঠ। মহিলা ঝগড়া বাধাতে চাইছিলেন কিন্তু তিনি নিজেকে তাঁর সমকক্ষ ভাবতেন না। সত্যি, নারী কখনও বুঝতে চায় না। নারী নারীই, রক্ষা করা হোক বা না হোক। তাদের ছেলেকে সকলপ্রকার মন্দ প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে হবে। তাকে প্রভুর পদচিহ্নের অনুসরণে বড় করে তুলতে হবে। তিনি ভ্রূ কুঁচকে তাঁর দিকে তাকালেন। মহিলা তাঁকে পাপ করতে প্রলুব্ধ করেছিলেন, কিন্তু তা বহুবছর আগে। এবং তাঁকে রক্ষা করা হয়েছিল। জন নিশ্চয়ই সে-পথে হাঁটবে না।

`তুমি আমাদেরকে চলে যেতে বলতে পারো। তুমি জান যে, আমি চলে যেতে পারি। ফোর্ট-হলে ফিরে যেতে পারি। এবং তখন সকলে...’

`দেখ সেবিকা,’ তিনি ত্রস্তে তাঁর কথায় বাধা দিলেন। তিনি সবসময়ই তাঁকে ‘সেবিকা’ সম্বোধন করতেন। পুরো অর্থে ‘প্রভুর সেবিকা’(Sister-in-Lord)। কিন্তু মাঝে মাঝে তিনি আশ্চর্য হতেন, সত্যিকার অর্থে কী নারীটি রক্ষা পেয়েছেন। তিনি অন্তর থেকে প্রার্থনা করতেন: প্রভু, আমাদের সেবিকা সামানার সঙ্গে থাকুন। উচ্চৈঃস্বরে তিনি বলে চলতেন, `তুমি জান আমি বালকটিকে প্রভুর পথে গড়ে তুলতে চাই।’

`কিন্তু তুমি তাকে এত নির্যাতন কর! তুমি তাকে তোমার প্রতি ভীত করে তুলছ।’

`কেন! আমাকে তার ভয় পাওয়া উচিত নয়। প্রকৃতপক্ষে আমি তার বিরুদ্ধে কিছু করি না।’

`তুমি। তুমি। তুমি তার প্রতি সবসময়ই নিষ্ঠুর...’ মহিলা উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর ফ্রক থেকে খোসা ছাড়ানো আলু মেঝেতে গড়িয়ে পড়ে স্তূপিকৃত হল। `স্ট্যানলি!’

`সেবিকা।’ স্ত্রীর প্রবল কণ্ঠস্বরে তিনি ভীত হলেন। তিনি কখনও তাকে এমনটি দেখেননি। প্রভু, শয়তানটাকে ওর ভেতর থেকে সরাও। তাকে রক্ষা কর। সে যা বলতে চায় তা বলছে না। স্ট্যানলি তার থেকে দৃষ্টি ফেরালেন। এটা একটা আশ্চর্যের ব্যাপার, কিন্তু মনে হল তিনি তাঁর স্ত্রীকে ভয় পাচ্ছিলেন। তুমি যদি গ্রামের লোকদের এ-ব্যাপারে বল, তারা তোমার কথা বিশ্বাস করবে না। তিনি তাঁর বাইবেল তুলে নিলেন এবং পাঠ করতে লাগলেন। রবিবারে তিনি সধর্মী এবং সধর্মিনীদের এক জমায়েতে ধর্ম-বিষয়ে বক্তব্য রাখবেন।

সুসানা, দীর্ঘাঙ্গিনী, ছিপছিপে, একসময় যিনি ছিলেন সুদর্শনা নারী, আবার বসে বসে তাঁর কাজ চালিয়ে যেতে লাগলেন। তিনি জানতেন না, কী তাঁর পুত্রকে সমস্যায় ফেলছিল। এটা কি তার আসন্ন বিদেশ-যাত্রা? তথাপিও তিনি তার জন্য ভীত ছিলেন।

বাইরে, তার বাড়ি থেকে আসা রাস্তাটি ধরে জন উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটছিল। তার পৈত্রিক বাড়ি থেকে কিছু দূরের ওয়াটল্ গাছটার কাছে দাঁড়িয়ে পুরো গ্রামটা সে জরিপ করল। গ্রামের দৃশ্য তার চোখে পড়ল, ঠাসাঠাসি, সারিসারি কাদা ও শণের কুঁড়েঘর, গিয়ে শেষ হয়েছে তীক্ষ্ণ দণ্ডগুলোর কাছে যারা মাথা উঁচু করে ছিল আকাশের দিকে। বিভিন্ন কুঁড়েঘর থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছিল। এটা এই ইঙ্গিত করছিল যে বহু স্ত্রীলোক `শামবা’ (ফসলের খেত – অনু.) থেকে ফিরে এসেছে। শিগগিরই রাত নামবে। পশ্চিমে সূর্য, নিঃসঙ্গ দিবা-পরিব্রাজক — তাড়াহুড়ো করছিল কুয়াশাচ্ছাদিত পাহাড়ের পেছনে তার নীড়ে ফিরতে।

জন আবার তাকাল ম্যাকেনো গ্রামের দিকে, যা ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে-ওঠা অনেকগুলোর মধ্যে একটি ‘শহর’, পত্তন হয়েছিল ‘মাউ-মাউ’ যুদ্ধের সময়(বৃটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে ১৯৫২ থেকে ‘৬০ পর্যন্ত পরিচালিত জাতীয়তাবাদী যুদ্ধ)। ওগুলোকে খুব বাজে দেখাচ্ছিল। একধরনের বেদনা-বোধ তার মধ্যে জন্ম নিল এবং মনে হল সে কাঁদছে, আমি তোমাকে ঘৃণা করি, আমি তোমাকে ঘৃণা করি! তুমি জ্যান্ত আমাকে ফাঁদে ফেলেছ। তোমার কাছ থেকে দূরে থাকলে কক্ষনোই এটা ঘটতে পারত না। সে চিৎকার করল না। সে শুধুমাত্র দেখল।

সে যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেদিকে একজন স্ত্রীলোক আসছিল। গ্রামে যাওয়ার পথটি খুব নিকটেই ছিল। সে একটি ভারী ‘কুনি’(কাঠের বোঝা )বহন করছিল, যা তাকে `আকাম্বা-ধনুকের’ (কামবা নৃগোষ্ঠীর বিশেষ ধরনের ধনুক – অনু.)মত বাঁকিয়ে দিয়েছিল। সে জনকে শুভেচ্ছা জানাল। ‘সবকিছু ভালো তো, নজুনি (জন)?’

`আমি ভালো, মা।’ তার কণ্ঠে কোনওরূপ তিক্ততা ছিল না। জন স্বভাবতই নম্র-ভদ্র। সবাই তা জানত। গোত্রের অন্যান্য উদ্ধত, গর্বিত, শিক্ষিত যুবকের মত সে ছিল না; যেসব তরুণ সমুদ্রের ওপার থেকে এসেছিল, ইংরেজিভাষী শ্বেতাঙ্গ বা নিগ্রো স্ত্রী নিয়ে। এবং যারা ইউরোপীয়দের মত আচরণ করত। জন ছিল জনপ্রিয়; বিনয় ও নৈতিকতার প্রকৃষ্ট প্রতীক। সবাই জানত, যদিও একজন ধর্মজাযকের পুত্র, কিন্তু কখনই সে তার গোত্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। তখনও তারা গোত্র সম্পর্কে এবং এর রীতি সম্পর্কে কথা বলত।

`ওখানে — ওখানে কখন যাচ্ছ?’

`ম্যাকেরেরে?’

`ম্যাকেলেলে।’ সে হাসল। যেভাবে সে নামটা উচ্চারণ করল তা বড়ই হাস্যকর। এবং যেভাবে সে হাসল, তা-ও। সে এটা উপভোগ করল। কিন্তু জন আঘাত পেল। তাহলে সবাই ব্যাপারটা জানে।

`পরের সপ্তাহে।’

`তোমার শুভকামনা করি।’

`ধন্যবাদ, মা।’

সে ধীরে ধীরে বলল, যেন নামটা ভালোভাবে উচ্চারণ করতে পারে, `ম্যাকেলেলে।’ সে নিজে নিজেই হেসে উঠল, কিন্তু বেশ ক্লান্ত ছিল সে। বোঝাটা খুব ভারী ছিল কিনা।

`ভালো থেকো, বাবা।’

`ভালো থাকুন, শান্তিতে থাকুন, মা।’

স্ত্রীলোকটি, যে সারাক্ষণ দাঁড়িয়েছিল, গাধার মত ঘন ঘন শ্বাস নিয়ে চলতে লাগল, সে জনের ভদ্র ব্যবহারে খুব খুশি হয়েছিল।

জন বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাকে দেখতে থাকল। কী এমন আছে যা কঠোর শ্রম করার পরও এই নারীকে সুখী রাখে? জীবনের প্রতি তার কি খুব বিশ্বাস আছে? অথবা তার গোত্রের প্রতি বিশ্বাস? সে এবং তার মত আরও অনেকে যারা শ্বেতাঙ্গদের সংস্পর্শে কখনও আসেনি, মনে হয় শক্তভাবে আঁকড়ে ধরবার কিছু একটা তাদের আছে। স্ত্রীলোকটি দৃষ্টির আড়াল হওয়ার পর সে গর্ব অনুভব করল এই ভেবে যে, তারা তাকে ভালো জানে। সে গর্ববোধ করল এজন্য যে, সে তাদের মনে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত। তখন হঠাৎই বেদনাদায়ক এক অনুভূতি তাকে আচ্ছন্ন করল। বাবা জানবে । ওরা জানবে । সে বুঝতে পারছিল না তার ভয় বেশি কিসে, তার বাবা জানতে পারার পর যে ব্যবস্থা নেবেন তাতে, নাকি যে বিশ্বাসটুকু গ্রামবাসী তার ওপর স্থাপন করেছে, জানতে পারার পর তা হারানোতে। সে সবকিছু হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত হল।

সে স্থানীয় ছোট্ট চা-দোকানটিতে গেল। কলেজে যারা তার মঙ্গল-কামনা করত তাদের অনেকের সঙ্গে দেখা করল। তারা সকলেই জানত যে, পাদ্রির ছেলে কেনিয়াতে শ্বেতাঙ্গ-শিক্ষার যাকিছু শেখার আছে তা শেষ করেছে। সে এখন উগান্ডা যাবে। তারা এটা সোয়াহিলি সাপ্তাহিক ‘বাবাজা’তে পড়েছে। জন বেশিক্ষণ চা-দোকানে থাকল না। সূর্য ইতিমধ্যে বিশ্রামে গেছে এবং এখন অন্ধকার নেমে আসছে। সান্ধ্যখাবার তৈরি ছিল। তার কঠোর পিতা তখনও টেবিলে বসে বাইবেল পাঠ করে চলেছেন। জন ঘরে ঢোকার সময় তিনি দেখলেন না। অদ্ভুত নৈঃশব্দ্য কুঁড়েঘরটিতে বিরাজ করছিল।

`তোমাকে বিমর্ষ দেখাচ্ছে।’ তার মা প্রথম নৈঃশব্দ্য ভঙ্গ করলেন। জন হাসল। একচিলতে নার্ভাস হাসি। `না, মা,’ সে ত্বরিত জবাব দিল, তার বাবার দিকে নার্ভাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে। সে গোপনে আশা করল যে, ওয়ামুহু হালকা কথাচ্ছলেও কিছু ফাঁস করেনি।

`তাহলে আমি খুশি।’

মা জানতেন না। সে নৈশভোজ সারল এবং তার ঘর ছেড়ে বেরোল। মানুষের ঘর। প্রতিটি যুবকের তার নিজের ঘর থাকে। জনের তার ঘরে কোনও মেয়েকে আনার অনুমতি ছিল না। স্ট্যানলি ‘ঝামেলা’ চাইতেন না। এমন কী কোনও মেয়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেও তা অপরাধ মনে করতেন। তার বাবা অনায়াসেই তাকে পেটাতে পারতেন। সে ভয় পেত তার বাবাকে, যদিও মাঝে মাঝে বিস্মিত হত, কেন সে বাবাকে এত ভয় পায়। অন্যান্য শিক্ষিত যুবকের মত সে-ও যদি বিদ্রোহী হতে পারত। সে লন্ঠন জ্বালাল। ওটা হাতে নিল। হলুদ আলো ভয়াবহভাবে দপদপ করে জ্বলছিল, এবং তারপর নিভে গেল। সে বুঝল তার হাত কাঁপছে। সে আবার লন্ঠন জ্বালাল এবং ঝটপট তার বড় কোট এবং বিরাট `কোফিয়া’ (এক ধরনের গোল টুপি, যা পূর্ব আফ্রিকায়/কেনিয়ায় পরা হয় – অনু.) যা অগোছালো বিছানাতে পড়েছিল, তুলে নিল। যেন তার বাবা মনে করে যে সে ঘরেই আছে, সেজন্য লন্ঠনটা জ্বালিয়ে রাখল। জন ঘৃণাভরে তার নিচের ঠোঁট কামড়াল। মেয়েলি স্বভাবের জন্য নিজেকে ঘৃণা করল। তার বয়সী যুবকের জন্য ব্যাপারটা অস্বাভাবিক।

ছায়ার মত খুব চুপিসারে সে উঠান পেরোল এবং গ্রামের পথে পা বাড়াল।

সে সারিবদ্ধ তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে দেখা করল। তারা হাসছিল, কথা বলছিল, ফিসফিস করছিল। তারা নিশ্চয়ই নিজেদের নিয়ে আনন্দ করছিল। জন ভাবল, আমার চেয়ে ওরা অনেক মুক্ত। ওদের বাড়াবাড়ি পর্যায়ের আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখে ওর ঈর্ষা হচ্ছিল। তারা শিক্ষিত লোকের বিচারে কড়া নৈতিকতার বাইরে অবস্থান করছিল। সে কি সানন্দে ওদের সঙ্গে নিজের জায়গা বদলে নেবে? সে বিস্মিত হল। অবশেষে সে একটা কুঁড়েঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। এটা ছিল গ্রামের কেন্দ্রস্থলে। কী ভালোভাবেই না সে এটাকে চিনল — তার দুঃখবোধ নিয়ে। ভেবে পেল না, সে এখন কী করবে। তার জন্য বাইরে অপেক্ষা করবে? যদি তার মা নিজে বেরিয়ে আসে? সে ভেতরে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত নিল।

`হোদি!’

`ভেতরে আসুন। আমরা ভেতরে আছি।’

ঘরে ঢোকার আগে জন তার টুপি খুলে হাতে নিল। সত্যি তারা সবাই ভেতরে ছিল শুধু সে ছাড়া, যাকে সে চাইছিল। চুলোর আগুন নিভুনিভু। শুধুমাত্র একটি লন্ঠনের শিখা পুরো ঘরের ভেতরটা হালকাভাবে আলোকিত করে রেখেছিল। আলোর শিখা এবং দেওয়ালের বিরাট ছায়া যেন তার সঙ্গে ঠাট্টা করছিল। সে খুব আশা করছিল, ওয়ামুহুর বাবা-মা যেন তাকে চিনতে না পারে। সে গুটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, যখন সে তাদেরকে সম্বোধন করে, গলার স্বরও লুকানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু তারা তাকে চিনে ফেলল এবং তার জন্য ত্রস্তব্যস্ত হয়ে উঠল। এমন একজন শিক্ষিত ব্যক্তি, যে কিনা শ্বেতাঙ্গদের জগত এবং জ্ঞান সম্পর্কে সব জানে, এবং যে এখন ভিন্ন এক দেশে যাবে, এমন কোনও ঘটনা নয় যা সচরাচর ঘটে — যাকে হালকাভাবে নেওয়া যায়। কে জানে, হয়ত সে তাদের কন্যার প্রতি আসক্ত। আশ্চর্য সব ঘটনা ঘটছে। যাহোক, শিক্ষাই সবকিছু নয়। যদিও ওয়ামুহু তেমন একটা শিক্ষিত নয় তবে তার আছে মোহনীয় সৌন্দর্য, এবং বিশ্বাস করা যায় যে, তার চাউনি এবং হাসি দিয়ে যেকোনও যুবকের হৃদয় জয় করবার ক্ষমতা তার আছে।

`বসুন। টুলটা টেনে নিন।’

`নাহ্।’ সে তিক্ততার সঙ্গে লক্ষ করল যে, মহিলাটিকে সে ‘মা’ বলে সম্বোধন করেনি।

`ওয়ামুহু কোথায়?’

মা বিজয়িনীর দৃষ্টি স্বামীর দিকে ছুঁড়ে দিল। তারা উভয়েই পরিচিত দৃষ্টি-বিনিময় করল। জন তার ঠোঁট আবার কামড়াল এবং বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ল। নিজেকে সে খুব কষ্টে সামাল দিল।

`ও চাপাতি আনতে বাইরে গেছে। অনুগ্রহ করে বসুন। ফিরে এসে আপনাকে চা বানিয়ে খাওয়াবে।’

`আমার ভয় হচ্ছে...’ সে অস্ফুট শব্দে বিড়বিড় করল এবং বাইরে বেরিয়ে গেল। ওয়ামুহুর সঙ্গে সে প্রায় ধাক্কা খেতে নিয়েছিল।

ঘরের মধ্যে: ‘আমি কি তোমায় বলিনি? একজন নারীর চোখকে বিশ্বাস কর!’

`তুমি এসব যুবককে চেন না।’

`কিন্তু, দেখ, জন কিন্তু ভিন্ন প্রকৃতির। সবাই তার সম্পর্কে ভালো বলে। এবং সে একজন পুরোহিতের পুত্র।’

`হুঁ-উ-উ! এক পুরোহিতের পুত্র! তুমি ভুলে গেছ, তোমার কন্যার খতনা করা’ (কেনিয়াসহ বেশ কিছু আফ্রিকান দেশের আদিবাসী মেয়েদের যৌনাঙ্গের ভগাঙ্কুর ছেদ করে খতনা করা হয় – অনু.)। বৃদ্ধ লোকটি তার নিজের দিনগুলো স্মরণ করছিল। গোত্রের সব রীতি মেনে সে নিজের জন্য একজন সতীসাধ্বী নারী পেয়েছিল। নারীটি অন্যকোনও মানুষকে চিনত না। সে তাকে বিয়ে করেছিল। তাঁরা সুখী ছিল। তাঁর `রিকা’র অন্য লোকেরাও একই রকম করেছিল। প্রতিটি মেয়ে ছিল কুমারী, ওভাবে কোনও মেয়েকে স্পর্শ করা ছিল একধরনের সামাজিক বিধিনিষেধের আওতাভুক্ত, যদি তুমি একই শয্যায় ঘুমাও-ও, অনেক ছেলেমেয়েই যা করত। তারপর এলো শ্বেতাঙ্গরা, প্রচার করতে লাগল এক অদ্ভুত ধর্ম, অদ্ভুত রীতি যা সবাই অনুসরণ করল। গোত্রের আচরণবিধি ভেঙে পড়ল। নতুন ধর্ম গোত্রকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারল না। কীভাবে পারবে? যারা এই নতুন ধর্ম গ্রহণ করল তারা মেয়েদের খতনা করাত না। এবং তারা তাদের ছেলেদের খতনা-করা মেয়েদেরকে বিয়ে করতে দিত না। ছোঃ! দেখ কী হচ্ছে। তাদের তরুণ সন্তানরা শ্বেতাঙ্গদের দেশে পাড়ি জমায়। তারা কী নিয়ে আসে? শ্বেতাঙ্গ রমণী। কৃষ্ণাঙ্গ নারী যারা ইংরেজি ভাষায় কথা বলে। আ — আহ্ — জঘন্য। এবং তরুণরা যারা দেশত্যাগ করে, কিছু মনে করে না। তারা অবিবাহিতা নারীদের তাদের স্ত্রী বানায় এবং তাদেরকে পরে ত্যাগ করে পিতৃহীন সন্তানসহ।

`তাতে কী?’ তার স্ত্রী জবাব দিল। `ওয়ামুহু কি তাদের সবচেয়ে ভালোর চেয়েও ভালো নয়? যাহোক, জন ভিন্ন প্রকৃতির।’

`ভিন্ন প্রকৃতির! ভিন্ন! ছোঃ! তারা সবাই একই রকম। ওই যারা শ্বেতাঙ্গদের রীতিনীতির সাদা কাদা দিয়ে মোড়া তারা হল সবচেয়ে ইতর। তাদের ভেতর কিছু নেই। কিছু নেই — কিচ্ছু নেই।’ সে এক খণ্ড চেলাকাঠ তুলে নিল এবং চুলোর নিভুনিভু আগুনকে অস্থিরভাবে খোঁচাতে থাকল। এক ধরনের অদ্ভুত অসাড়তা তাকে জেঁকে ধরেছিল। সে কাঁপছিল। এবং সে ভয় পেয়েছিল, ভয় পেয়েছিল গোত্রের জন্য। কেননা সে দেখছিল এটা শুধুমাত্র শিক্ষিত লোকেরা নয়, যারা অদ্ভুত রীতির মোড়কে আবৃত, বরং সমগ্র গোত্র। বৃদ্ধ লোকটি কাঁপছিল এবং শোকে ভেতর ভেতর কাঁদছিল — একটি গোত্রের জন্য, যা ভেঙে পড়ছিল। গোত্রটির যাওয়ার কোনও জায়গা নেই। এবং এটা আগে যেমন ছিল তেমন আর হতেও পারবে না। সে আগুন খোঁচানো বন্ধ করল এবং কড়া দৃষ্টিতে মাটির দিকে চেয়ে থাকল।

`আমি আশ্চর্য হই, কেন সে এসেছিল। আমি বিস্মিত।’ সে তখন তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি তোমার কন্যার ব্যবহারে অদ্ভুত কিছু দেখছ না?’

তার স্ত্রী উত্তর দিল না। সে তার বিরাট প্রত্যাশা দ্বারা আচ্ছন্ন ছিল।

জন এবং ওয়ামুহু নীরবে হেঁটে চলেছিল। জটিল পথ এবং পথের বাঁকগুলো তাদের উভয়ের পরিচিত। ওয়ামুহু হালকা চপল পায়ে হাঁটছিল; জন জানে যে, সে খোশমেজাজে আছে। তার পদক্ষেপ ছিল ভারী এবং সে লোকজনকে এড়িয়ে চলছিল, যদিও তখন অন্ধকার। কিন্তু কেন সে লজ্জা বোধ করবে? মেয়েটি সুন্দরী, সম্ভবত সমগ্র লিমুরু গ্রামের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী। তথাপিও তার সঙ্গে লোকে তাকে দেখুক তাতে সে ভীত ছিল। এটা পুরোটাই ভ্রান্তি। সে জানত যে, সে তাকে ভালোবাসতে পারত, তথাপিও সে বিস্মিত হল যদি সে তাকে ভালো না বেসে থাকে। সম্ভবত এটা বলা খুব কঠিন, কিন্তু সে যেসব তরুণের সঙ্গে দেখা করেছিল নিজে যদি তাদের একজন হত, এই প্রশ্নের জবাব দিতে ইতস্তত করত না।

গ্রামের বাইরে সে থামল। মেয়েটিও থামল। কেউ এ-পর্যন্ত একটি কথাও বলেনি। হয়ত নীরবতা শব্দের চেয়ে জোরে কথা বলে। উভয়েই নিজ সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন ছিল।

`তারা কি জানে?’ নীরবতা! ওয়ামুহু সম্ভবত এই প্রশ্নটি বিবেচনা করছিল। ‘আমাকে অপেক্ষায় রেখো না। দয়া করে জবাব দাও,’ সে অনুনয়ের সুরে বলল। সে বিচলিত বোধ করছিল, খুবই বিচলিত, একজন বৃদ্ধের মত, যে হঠাৎ করে তার ভ্রমণের শেষে এসে পৌঁছেছে।

`না, তুমি আরও এক সপ্তাহ সময় চেয়েছিলে। আজ সপ্তাহ শেষ হল।’

`হ্যাঁ, সেজন্যই আমি এসেছি,’ জন কর্কশ স্বরে ফিসফিস করে বলল।

ওয়ামুহু কথা বলল না। জন তার দিকে তাকাল। অন্ধকার তখন তাদের দুজনার মাঝখানে ঝুলে ছিল। সে আসলে মেয়েটিকে দেখতে পাচ্ছিল না, তার সম্মুখে ছিল তার পিতার ছবি — উদ্ধত, ধার্মিক এবং প্রভুত্বপরায়ণ। আবার সে ভাবল: আমি, জন, এক পুরোহিতপুত্র, সকলের শ্রদ্ধাভাজন এবং কলেজে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে, পতিত হব, ভূমিতে পতিত হব। সে এই পতন নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে চাইছিল না।

`এটা তোমার দোষ।’ সে মেয়েটিকে অভিযুক্ত করল। যদিও নিজ অন্তরে সে জানল যে, সে মিথ্যা বলছে।

`তুমি আমাকে ওই কথা কেন বলে চলেছ? তুমি কি আমাকে বিয়ে করতে চাওনি?’

জন শ্বাস ছাড়ল। সে জানে না, কী করতে হবে। সে স্মরণ করল সেই গল্পটি যা তার মা তাকে শোনাতেন। একদা একসময় এক কন্যা ছিল... তার কোনও ঘর ছিল না যেখানে সে যাবে এবং সে সম্মুখে যেতে পারছিল না যেখানে আছে সুন্দর ভূমি এবং দেখতে সুন্দর সব বস্তু, কেননা পথের মধ্যিখানে ছিল ‘ইরিমু’... (`ইরিমু’ কেনিয়ার পাহাড়ঘেরা প্রত্যন্ত গ্রামের অধিবাসীদের নিকট প্রচলিত ভীতিপ্রদ একটি পৌরাণিক চরিত্র – অনু.)।

‘তুমি তাদের কখন জানাবে?’

‘আজ রাতেই।’

সে বেপরোয়া বোধ করল। পরের সপ্তহেই সে কলেজে যাচ্ছে। যদি তাকে কোনওভাবে বুঝিয়েসুঝিয়ে অপেক্ষা করানো যায়, সে হয়ত এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে এবং ফিরে আসতে পারবে যখন এই ঝড় এবং অস্বস্তিকর বোধের অবসান হয়। কিন্তু তখন সরকার তার শিক্ষা-বৃত্তি প্রত্যাহার করে নিতে পারে। সে আতঙ্কিত হল এবং মেয়েটির দিকে ফিরে করুণ সুরে বলল, ‘দ্যাখো, ওয়ামুহু, কতদিন হল তুমি গর্ভ..., আমি বোঝাতে চাইছি এরকম অবস্থায়?’

`আমি বারবার তোমাকে বলেছি, আমি তিন মাসের অন্তঃস্বত্ত্বা এবং মা ব্যাপারটা নিয়ে সন্দেহ করছেন। গতকালই তো তিনি বললেন, আমি নাকি সন্তানসম্ভবা নারীর মত শ্বাস নেই।’

`তুমি কি মনে কর আরও তিন সপ্তাহ অপেক্ষা করতে পারবে?’

ওয়ামুহু হেসে উঠল। আহ্! খুদে শয়তান! সে তার ছলচাতুরি বুঝে নিয়েছিল। মেয়েটার উঁচুস্বরের হাসি সবসময়ই জনের ভেতর তীব্র আবেগ জাগিয়ে তোলে।

`ঠিক আছে,’ সে বলল, ‘আমাকে শুধু কাল পর্যন্ত সময় দাও। আমি কিছু চিন্তা করব। আগামীকাল তোমাকে জানাব।’

`আমি রাজি। আগামীকাল। আমি আর বেশি অপেক্ষা করতে পারব না যদি তুমি আমাকে বিয়ে না কর।’

কেন তাকে বিয়ে নয়? সে সুন্দরী। কেন বিয়ে নয়? আমি কি তাকে ভালোবাসি, নাকি বাসি না?’

সে চলে গেল। জনের মনে হল, সে সচেতনভাবে তাকে ব্লাকমেইল করছে। তার হাঁটু দুর্বল হয়ে উঠল এবং শক্তি হারাল। সে নড়তে পারছিল না, মাটিতে সেঁধিয়ে যাচ্ছিল যেন। তার চিবুক বেয়ে দরদরিয়ে ঘাম ঝরছিল, যেন প্রখর রৌদ্রের ভেতর ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াচ্ছিল সে। কিন্তু কী শীতল ঘাম। ঘাসের ওপর শুয়ে পড়েছিল সে, চিন্তা করতে চাইছিল না। ওহ্, না, সে বোধহয় তার বাবার মুখোমুখী হতে পারবে না। অথবা তার মায়ের। বা রেভারেন্ড কারস্টোন, যাঁর আছে তার প্রতি অগাধ বিশ্বাস। জন তা বুঝতে পারল, যদিও সে শিক্ষিত, সে অন্যদের চেয়ে কোনও অংশেই নিরাপদ নয়। ওয়ামুহু থেকে সে উন্নত কিছু নয়। তাহলে কেন তুমি তাকে বিয়ে কর না? সে জানত না। জন এক ক্যালভিনিস্ট পিতার অধীনে বড় হয়েছে, একজন মিশনারি ক্যালভিনিস্ট হেডমাস্টারের অধীনে লেখাপড়া শিখেছে! জন প্রার্থনা করতে চেষ্টা করল। কিন্তু কার উদ্দেশে সে প্রার্থনা করবে? কারস্টোনের ঈশ্বরের উদ্দেশে? মিথ্যা মনে হল। এটা এমনই যে, সে যেন ধর্মদ্রোহিতা করছিল। সে কি গোত্রের ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করতে পারত? অপরাধবোধ তাকে পিষে মারছিল।

সে জেগে উঠল। সে কোথায়? তখন সে বুঝতে পারল। ওয়ামুহু তাকে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল। সে তাকে একদিন সময় দিয়েছিল। সে উঠে দাঁড়াল, ভালো বোধ করল। দুর্বল পায়ে সে বাড়ি ফিরে চলল। সৌভাগ্য যে, তমসার চাদর ঢেকে দিয়েছিল বিশ্বচরাচর — এবং সেইসঙ্গে তাকেও। বিভিন্ন ঘর থেকে আসা অট্টহাসি সে শুনতে পেল, উত্তপ্ত বাক্যালাপ, অযথা ঝগড়াঝাঁটি। দেখা যাচ্ছিল অল্প আগুন কুঁড়েঘরগুলোর ফাঁক দিয়ে দপদপিয়ে জ্বলছে। গ্রামের তারা — জন ভাবল। সে তার চোখ তুলে ধরল। আকাশের তারা, শীতল এবং দূরবর্তী, তার দিকে সমবেদনাহীন দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। এখানে-সেখানে, শোনা যাচ্ছিল, ছেলেমেয়েদের দলের অট্টহাসি এবং হৈ-হুল্লোড়। জীবন তাদের জন্য সচরাচর যেমন কাটে তেমনই কাটছিল। জন নিজেকে প্রবোধ দিল, এ কথা ভেবে যে, তাদেরকেও শেষবিচারের মুখোমুখী হতে হবে।

জন দ্বিধান্বিত ছিল। কেন! কেন সে সব প্রত্যাশা, ভবিষ্যতের সকল সম্ভাবনাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারছিল না। এবং পারছিল না মেয়েটাকে বিয়ে করতে? না। না। এটা অসম্ভব। সে ছিল খতনা-করা মেয়ে এবং সে জানত যে তার বাবা এবং চার্চ কখনই এ-ধরনের বিয়েতে সম্মতি দেবেন না। তার শিক্ষা নেই — এমন কী সে চতুর্থ শ্রেণিও পেরোয়নি। তাকে বিয়ে করলে কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সুযোগ সম্ভবত চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে।

সে দ্রুততার সঙ্গে হাঁটতে চেষ্টা করল। ফিরে এসেছিল তার শক্তি। তার কল্পনাশক্তি ও চিন্তা জেগে উঠল। অভিযোগকারী পৃথিবীর সম্মুখে সে তার কার্যকলাপকে ব্যাখ্যা করতে চাইছিল — অতীতেও বহুবার সে করতে চেয়েছে, যখন থেকে সে এটা জানতে পেরেছিল। কী সে করতে পারত এনিয়ে তখনও সে ভাবছিল। মেয়েটি তাকে আকৃষ্ট করেছিল। সে ছিল কমনীয় এবং তার হাসি ছিল অত্যন্ত মোহনীয়। তার সমকক্ষ কেউ ছিল না এবং গ্রামে কোনও মেয়ে তারচেয়ে বেশি শিক্ষিত বলেও ভান করত না। নারীশিক্ষা ছিল অত্যন্ত কম। সম্ভবত সেজন্যই এতবেশি আফ্রিকান বাইরে যেত এবং বিয়ে করে ফিরত। সে-ও চাইত অন্যদের সঙ্গে যেতে, বিশেষভাবে আমেরিকাগামী ছাত্রদের দল নিয়ে যে বিশাল বিমানটি গিয়েছিল তাতে। যদি শুধুমাত্র ওয়ামুহুর শিক্ষা থাকত... এবং সে খতনা-করা না হত... তাহলে সম্ভবত সে বিদ্রোহ করত।

তখনও মায়ের ঘরে আলো জ্বলছিল। জন চিন্তা করল, সে কি নৈশপ্রার্থনায় যাবে। কিন্তু সে এর বিরুদ্ধে চিন্তা করল, সে হয়ত তার মা-বাবাকে মোকাবেলা করার মত যথেষ্ট সবল নয়। তার ঘরের বাতি নিভে গিয়েছিল। সে আশা করেছিল, তার বাবা নিশ্চয়ই ব্যাপারটি লক্ষ করেননি।

জন সকাল সকাল ঘুম থেকে জেগে উঠল। সে আতঙ্কিত হল। সাধারণ অর্থে সে কুসংস্কারাচ্ছন্ন নয়। কিন্তু তবুও রাতের স্বপ্নগুলোকে তার ভালো লাগল না। সে স্বপ্নে খতনা করা দেখল, গোত্রের রীতিতে এইমাত্র যেন তাকে করা হল। কেউ একজন — তার চেহারা মনে করতে পারল না, এলো এবং তাকে নিয়ে গেল যেহেতু তার প্রতি করুণা হয়েছিল। তারা গেল — এক অদ্ভুত দেশে গেল। কোনও কারণে সে নিজেকে একাকী দেখল। সেই কেউ একজন হাওয়া হয়ে গিয়েছিল। একটি প্রেতাত্মা এল। সে চিনতে পারল এটা সেই ঘরের প্রেতাত্মা যা সে ত্যাগ করেছিল। ওটা তাকে পেছনে টেনে ধরল, তখন আরেক প্রেতাত্মা এল। এটা সেই দেশের প্রেতাত্মা যেখানে সে এসেছিল। এটা তাকে সামনে টানল। দুটোতে প্রতিযোগিতা চলল। তারপর অন্য প্রেতাত্মারা বিভিন্ন দিক থেকে এল এবং তাকে টানতে শুরু করল বহুদিকে যাতে করে তার দেহ টুকরো টুকরো হয়ে পড়ল। এবং সব প্রেতাত্মাই ছিল অবাস্তব। সে কোনওটাতেই আঁকড়ে থাকতে পারছিল না। কেবলই তারা তাকে টানছিল এবং সে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ছিল, অস্তিত্বহীন... এখন সে দাঁড়িয়ে ছিল অনেক তফাতে। এটা সে ছিল না। কিন্তু সে দেখছিল একটি মেয়েকে, গল্পের মেয়েটিকে। কোথাও তার যাওয়ার উপায় নেই। সে চিন্তা করেছিল তাকে সাহায্য করতে; সে তাকে পথ দেখাবে। কিন্তু তার কাছে যেতেই সে তার পথ হারিয়েছিল... সে সম্পূর্ণ একা... ধ্বংসাত্মক কিছু যেন তার দিকে আসছিল, আসছিল, আসছিল... সে জেগে উঠল। সে ঘেমে একাকার হয়ে যাচ্ছিল।

খতনা-বিষয়ক স্বপ্ন ভালো নয়। এগুলো মৃত্যুর ইঙ্গিত দেয়। সে স্বপ্নকে হেসে বাতিল করে দিল। সারাদেশ কুজ্ঝটিকায় আচ্ছাদিত শুধু এটা দেখতে সে জানালা খুলল। এটা ছিল লিমুরুর যথার্থই জুলাই মাসের আবহাওয়া। পাহাড়, উঁচুভূমি, উপত্যকা যা গ্রামকে ঘিরে ছিল — উবে গিয়েছিল কুজ্ঝটিকার আড়ালে। এটাকে অদ্ভুত একটা স্থান বলে মনে হল। কিন্তু মোটামুটি একধরনের যাদুময়তা ছিল এতে। লিমুরু ভিন্নতর এক দেশ, আর যেখানে ভিন্ন আবেগ জাগ্রত হয় ভিন্ন ভিন্ন সময়ে। একসময় জন উচ্ছ্বসিত হবে এবং ব্যাকুল হবে ভূমি স্পর্শ করতে, এটাকে আলিঙ্গন করতে অথবা শুধুমাত্র ঘাসের ওপর শুয়ে থাকতে। অন্যসময় ধুলো, প্রখর সূর্য এবং এবড়োথেবড়ো পথের কারণে সে হবে বিতৃষ্ণ। যদি তার সংগ্রাম কেবলমাত্র ধুলো, কুয়াশা, সূর্য এবং বৃষ্টিতে সীমাবদ্ধ থাকত, সে হয়ত তৃপ্তি বোধ করত। এখানে বসবাসের তৃপ্তি। অন্তত সে ভাবত, সে কখনও মরবে না বা সমাধীস্থ হবে না লিমুরু ছাড়া অন্য কোনও জায়গায়। কিন্তু সেখানে মানবিক এক উপাদান, যা পাপ এবং অন্যলোকের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা, মূর্ত হয়ে ছিল নতুন কুৎসিত গ্রামগুলোতে।

গতরাতের ঘটনা তার মনে বানের জলের মত ধেয়ে এল, তাকে আবার দুর্বল করে ফেলল। সে তার কম্বলের নিচ থেকে বেরিয়ে এল এবং ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়ল। আজ সে কেনাকাটা করতে যাবে। সে অস্বস্তিতে ছিল। একটা অস্বাভাবিক অনুভূতি তার ভেতরে আসছিল — প্রকৃতপক্ষে আসতেই থেকেছিল — তা হল বাবার সঙ্গে তার সম্পর্ক সম্ভবত অস্বাভাবিক। কিন্তু সে চিন্তাটাকে বাতিল করে দিল। আজকের রাত হবে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির রাত। এটা ভাবতেই সে কেঁপে উঠছিল। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে এই ক্ষতটা তার জীবনে তখনই এসেছে যখন সে ম্যাকেরেরে যেতে চলেছে, এবং এটা তাকে তার পিতার কাছাকাছি নিয়ে আসতে যাচ্ছে।

তারা মার্কেটে গেল। সারা দিনব্যাপী জন চুপচাপ থাকল, যখন তারা দোকান থেকে দোকানে ঘুরে ঘুরে হ্যাংলামত কিন্তু চটপটে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জিনিসপত্র কিনল। এবং দিনভর জন ভাবল, কেন সে তার বাবাকে এতটা ভয় পায়। সে বেড়ে উঠেছিল তাঁকে ভয় করে, কম্পিত হয়ে যখনই তিনি কিছু বলতেন বা নির্দেশ দিতেন। এটা জনের একারই ছিল না।

স্ট্যানলি সবার ভয়ের পাত্র ছিলেন।

তিনি প্রচার করতেন অতি উৎসাহ নিয়ে, নরকের সেই দরজাকে তোয়াক্কা না করে। এমন কী জরুরি অবস্থা সত্ত্বেও তিনি প্রচার চালাতেন সমান তালে, ভর্ৎসনা করতেন, বিচার করতেন, নিন্দা করতেন। যারা উদ্ধারপ্রাপ্ত নয় তাদের গন্তব্য নরকে। সর্বোপরি, স্ট্যানলি তাঁর মহান এবং কঠোর নৈতিক অনুষ্ঠানাদির জন্য সুবিদিত ছিলেন — একটু বেশি রকমের কঠোর, কিছুটা কপট ধর্মধ্বজাধারীর মত। কেউ এটা লক্ষ করেনি, অবশ্যই সেই মেষগুলো যাদের তিনি ছিলেন পালক। যদি কোনও বর্ষীয়ান ব্যক্তি যেকোনও আইন ভঙ্গ করত, সে বহিষ্কৃত অথবা চার্চের কার্যাদি থেকে তাকে বিরত রাখা হত। তরুণ-তরুণীদের একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেলে যা চার্চ এবং ঈশ্বরের আইনের বাইরে, তাদেরকেও চার্চের কার্যাদি থেকে দূরে রাখা হত। এবং সেজন্য, অনেক তরুণ-যুবক দুইজন প্রভুকে সেবা করতে চেষ্টা করত, রাতের বেলায় তাদের বান্ধবীদের এবং দিনের বেলায় চার্চের। বিকল্প একটাই ছিল, তাহল, চার্চে যাওয়া একেবারেই ছেড়ে দেওয়া।

স্ট্যানলি গ্রামের অধিবাসীদের প্রতি পিতৃসুলভ আচরণ করতেন। যা তোমার, সে সম্পর্কে তোমাকে যথেষ্ট সজাগ থাকতে হবে। এবং এজন্য তার বাড়িটা যেন সবার কাছে এসব ব্যাপারে ভালো দৃষ্টান্ত হয়, তা চাইতেন। সেজন্য তিনি তাঁর পুত্রকে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে চাইতেন। কিন্তু মানুষের অনেক কাজের ভেতরের উদ্দেশ্য মিশ্রিত অবস্থায় থাকতে পারে। তিনি কখনই ভুলতে পারতেন না যে, তিনিও বিয়ের পূর্বে ভ্রষ্ট হয়েছিলেন। স্ট্যানলি নিজেও নতুন প্রভাবে ভেঙে-যাওয়া গোত্রের একজন ফসল ছিলেন।

কেনাকাটা বেশি সময় নিল না। তাদের ভেতর বিরাজমান নিঃশব্দতা তার বাবা তীক্ষ্ণভাবে লক্ষ করলেন, কথা বা ইঙ্গিতে নয়, তিনি কী গতরাত সম্পর্কে কিছু উল্লেখ করেছিলেন। তারা ঘরে ফিরল এবং জন ভাবছিল যে সবকিছু ঠিকঠাক যখন তার বাবা তাকে ডাকলেন।

`জন।’

`হ্যাঁ, বাবা।’

`কেন তুমি গতরাতে প্রার্থনায় আসোনি?’

`আমি ভুলে গিয়েছিলাম...।’

`তুমি ছিলে কোথায়?’

তুমি কেন জিজ্ঞেস করছ? আমি কোথায় ছিলাম তা জানার কী অধিকার তোমার আছে? একদিন আমি তোমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে যাচ্ছি। কিন্তু, এক্ষুনি, জন জানত বিদ্রোহের এই কাজটি এমন কিছু যা তার সাধ্যের বাইরে — যদি এমন কিছু না ঘটে, যা তাকে এ-কাজে ঠেলে দেয়। এমন কিছুসহ তার এমন একজনকে প্রয়োজন ছিল, যার অভাব তার মধ্যে ছিল।

‘আমি — আমি — আমি মানে, আমি ছিলাম...।’

‘প্রার্থনার আগে এত তাড়াতাড়ি তোমার ঘুমানো উচিত নয়। আজ রাতে থাকবার কথা মনে রেখো।’

‘আমি থাকব।’

ছেলেটির স্বরে এমন কিছু ছিল, যা পিতাকে চোখ তুলে তাকাতে বাধ্য করল। জন স্বস্তি নিয়ে চলে গেল। সবকিছু তখন পর্যন্ত ভালো ছিল।

সন্ধ্যা নামল। গতরাতের সাজেই জন সাজল, স্খলিত পদে সেই দুর্ভাগ্যজনক স্থানের দিকে সে যেতে লাগল। হিসেবনিকেশের রাত এসেছিল। এবং সে কিছু নিয়ে ভাবছিল না। এ-রাতের পর সবাই জানবে। এমন কী রেভারেন্ড কারস্টোনও এ-ব্যাপারে অবগত হবেন। সে রেভারেন্ড কারস্টোনকে স্মরণ করল, এবং তার উদ্দেশে বলা আশীর্বাদের শেষ শব্দগুলো। না! সে মনে করতে চায়নি। ওগুলো স্মরণ করা ভালো কিছু না। তবুও কথাগুলো মনে এল। ওগুলো পরিষ্কারভাবে বাতাসে লেখা ছিল অথবা তার মনের অন্ধকারে। ‘তুমি পৃথিবীর দিকে যাচ্ছ। পৃথিবী একটি ক্ষুধার্ত সিংহের মত অপেক্ষা করছে তোমাকে গিলে খেতে, তোমাকে গ্রাস করতে। সুতরাং পৃথিবী সম্পর্কে হুঁশিয়ার থেকো। যিশু বলেছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত দৃঢ়ভাবে ধারণ কর...’ জন কেমন এক ব্যথা অনুভব করল — একটি ব্যথা যা তার মাংসপেশীকে মুচড়ে দিল যখন সে এই শব্দগুলো স্মরণ করল। সে আসন্ন পতন আঁচ করল। হ্যাঁ, সে, জন, স্বর্গের তোরণ থেকে নরকের অপেক্ষমাণ ফটকে পতিত হবে। আহ্! সে এসব কিছু দেখতে পেল। এবং উপলব্ধি করতে পারল যাকিছু লোকজন বলাবলি করবে। সবাই তার সংসর্গ ত্যাগ করবে, সবাই তার দিকে বাঁকা দৃষ্টিতে তাকাবে যা অনেক কিছু বলার মত। জনের সমস্যা ছিল এটাই যে, তার কল্পনা তাকে, অতি উঁচু স্থান থেকে `ভালোত্ব’র পতনকে অতিমাত্রায় বড় করে দেখাত। জনতার ভয়, এবং পরিণতির চিন্তা সবকিছুর ওপর এমনভাবে চেপে থাকত, যা তার পতনের ভাবনাকে এতটাই ভয়াবহ করে তুলত।

জন নিজের জন্য সবধরনের শাস্তির পরিকল্পনা করল। এবং যখন সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার চিন্তার ব্যাপারটা দেখা দিল, শুধু অলীক, অবাস্তব, অসম্ভব কিছু মুক্তির পথ তার মাথায় এল। সে আদপেই মনস্থির করতে পারল না। এবং যেহেতু সে পারল না, এবং যেহেতু সে পুরোহিতকে ও জনতাকে ভয় পেল, সে বুঝতে পারল না মেয়েটার প্রতি তার প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি, সে নির্ধারিত স্থানে এল মেয়েটাকে জানাবার মত কোনওকিছু ছাড়াই। সে যাই করল তা তার কাছে মারাত্মক মনে হল। যাহোক, নিজেকে তার নিজের কাছেই ভয়ানক দেখাল। তখন হঠাৎ সে বলে উঠল:

‘দ্যাখো, ওয়ামুহু। তোমাকে কিছু টাকা দিচ্ছি। তুমি তখন হয়ত বলতে পারো যে, অন্য কেউ এজন্য দায়ী। অনেক মেয়েই এটা করে থাকে। তখন সেই লোকটি তোমাকে বিয়ে করতে পারে। আমার পক্ষে এটা করা অসম্ভব। তুমি তা জানো।’

`না। আমি তা করতে পারব না। তুমি কী করে, তুমি...’

`আমি তোমাকে দু’শ শিলিং দেবো।’

`না!’

`তিন শ’

`না!’ সে প্রায় কাঁদছিল। এটা তাকে কষ্ট দিচ্ছিল — তাকে এই রূপে দেখে।

`চার হাজার, পাঁচ হাজার, ছয় হাজার।’ জন শুরু করেছিল শান্তভাবে কিন্তু এখন তার স্বর চড়তে লাগল। সে কী বলছিল তা কি সে জানত? সে দ্রুত কথা বলল, শ্বাস না নিয়ে, যেন সে খুব ব্যস্ত। টাকার অঙ্ক দ্রুত বেড়ে চলল — নয় হাজার, দশ হাজার, বিশ হাজার... সে পাগল। সে ফুঁসছিল। সে অন্ধকারে দ্রুত মেয়েটির দিকে এগোচ্ছে। সে তার হাত মেয়েটার কাঁধে রেখেছে এবং পাগলের মত রুক্ষ স্বরে তাকে অনুনয় করছে। তার মনের গভীরে পিতার সক্রোধ হুমকি ভয়ঙ্কর ভীতির সঞ্চার করেছে এবং মনে হচ্ছে গ্রাম যেন তাকে ঠেলছে। সে সজোরে ওয়ামুহুকে ঝাঁকাচ্ছে, যখন তার মন তাকে বলছে যে, সে তাকে মৃদুভাবে চাপড় দিচ্ছে। হ্যাঁ, সে তার মনের বাইরে চলে গেছে। টাকার অঙ্ক এখন পঞ্চাশ হাজার শিলিংয়ে পৌঁছেছে এবং বেড়েই চলেছে। ওয়ামুহু ভীত। সে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় জন থেকে, একটি পাগল, ধর্মীয় পুরোহিতের শিক্ষিত সন্তান থেকে, এবং দৌড়াতে থাকে। জন তার পেছনে ছোটে এবং তাকে ধরে ফেলে, যতরকম প্রিয় শব্দ আছে তা দিয়ে সম্বোধন করে তাকে। কিন্তু সে তাকে ঝাঁকাচ্ছে, ঝাঁকি, ঝাঁকি, তাকে, তাকে — সে তাকে গলা জড়িয়ে ধরে আদর করতে চায়, চাপ দেয়... মেয়েটা ভয়ঙ্কর চিৎকার করে এবং মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তাতে আকস্মিকভাবে ধ্বস্তাধ্বস্তি শেষ হয়, টাকার অঙ্ক থেমে যায়, এবং জন সেখানে দাঁড়িয়ে ঝড়োদিনে গাছের কম্পিত পাতার মত কাঁপতে থাকে।


শিগগিরই সবাই জানবে যে, সে সৃষ্টি করেছে এবং পরে হত্যা করেছে।



ন্গুগি ওয়া থিয়োঙ্গ’ও : সংক্ষিপ্ত পরিচিতি।

কেনিয়ার কিয়াম্বু জেলার লিমুরু শহরের কাছে কামিরিথুতে ৫ জানুয়ারি, ১৯৩৮ সালে ন্গুগি ওয়া থিয়োঙ্গ’ও-র জন্ম। ঔপনিবেশিক আমলে ব্যাপটাইজ করে তাঁর নাম রাখা হয়েছিল জেমস্ ন্গুগি।

তিনি উগান্ডার ম্যাকেরেরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৩ সালে ইংরেজিতে বিএ পাশ করেন। সেই সময়েই, অর্থাৎ ছাত্রাবস্থায়, ১৯৬২-তে তাঁর লেখা The Black Hermit নামের নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। ১৯৬৪ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস Weep Not, Child, প্রকাশিত হয়। এটি লেখেন ইংল্যান্ডের লিডস্ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে। এটা কোনও পূর্ব আফ্রিকান লেখকের ইংরেজিতে লেখা প্রথম উপন্যাস। তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস The River Between, রচিত হয় ১৯৬৫-তে। ১৯৬৭ সালে রচিত হয় তাঁর সাড়া জাগানো উপন্যাস A Grain of Wheat। এই উপন্যাসে ফ্যানোনিস্ট মার্কসিজমের প্রতি তার আগ্রহ লক্ষ করা যায়। তিনি ইংরেজি, খ্রিস্টধর্ম এবং তাঁর নাম জেমস্ ন্গুগিকে ঔপনিবেশিক ক্ষতচিহ্ন আখ্যা দিয়ে তা ত্যাগ করেন এবং ফিরে যান ন্গুগি ওয়া থিয়োঙ্গ’ও নামে; লেখালেখির কাজও করতে থাকেন তাঁর মাতৃভাষা গিকু এবং সোয়াহিলিতে।

ন্গুগি ওয়া থিয়োঙ্গ’ও ১৯৭৬ সালে তাঁর নিজ এলাকা কামিরিথুতে Kamiriithu Community Education and Cultural Centre স্থাপনে সহায়তা করেন। যা অন্য কার্যক্রমের পাশাপাশি এলাকাতে আফ্রিকান নাট্য-আন্দোলন সংগঠিত করার কাজে ব্যাপৃত থাকত। ১৯৭৭-এ তাঁর অসেন্সরকৃত নাটক Ngaahika Ndeenda (I Will Marry When I Want) কেনিয়ার তদানীন্তন ভাইসপ্রেসিডেন্ট দানিয়েল আরাপ মোইকে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ করে এবং থিয়োঙ্গ’ওকে গ্রেপ্তার করা হয়। জেলখানায় অবস্থানকালে তিনি টয়লেট-পেপারের ওপর গিকু ভাষায় প্রথম আধুনিক নাটক Caitaani mũtharaba-Inĩ (Devil on the Cross) রচনা করেন। বৎসরাধিক কাল জেল খেটে তিনি মুক্তি পান। কিন্তু তাঁকে আর নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের পদে পুনর্বহাল করা হয় না। সেই সময়কার স্বেচ্ছাচারী সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধাচরণ করায় তাঁকে বলপ্রয়োগে দেশত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।

তাঁর পরবর্তী কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ছোটগল্প সংকলন A Meeting in the Dark (১৯৭৪), Secret Lives, and Other Stories (১৯৭৬); Detained (জেলখানার ডায়েরি – ১৯৮১), Decolonising the Mind: The Politics of Language in African Literature (১৯৮৬), Matigari (১৯৮৭), Wizard of the Crow (২০০৬), Something Torn and New: An African Renaissance (২০০৯), আত্মজীবনীমূলক দুটো গ্রন্থ, Dreams in a Time of War: a Childhood Memoir (২০১০) এবং In the House of the Interpreter: A Memoir (২০১২)।

ন্গুগি ওয়া থিয়োঙ্গ’ও তার প্রতিটি রচনায় ফুটিয়ে তুলেছেন পূর্ব ও মধ্য আফ্রিকার সমাজজীবনের বিভিন্ন দিক, চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন ঔপনিবেশিক শক্তির দানবীয় রূপ। আবার স্বজাতির হীনম্মন্যতা, লাম্পট্য, স্বাধীনতা-উত্তর লুটপাটের চিত্র তুলে ধরতেও পেছপা হননি। পূর্ব ও মধ্য আফ্রিকার লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব তাঁর লেখায় বড় স্থান দখল করে থাকে। মানব-মনের বিচিত্র ও জটিল দিক ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর যে মুন্সিয়ানা তা পাঠককে সম্মোহিত করে নিয়ে যায় অন্য এক জগতে।

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার একজন সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বারবার ন্গুগি ওয়া থিয়োঙ্গ’ও-র নাম আলোচনার শীর্ষে উঠে আসে।

ন্গুগি ওয়া থিয়োঙ্গ’ও বর্তমানে ক্যালিফোরনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়,অ্যারভিন-এ ‘ইংরেজি ও তুলনামূলক সাহিত্য’র একজন সম্মানীয় অধ্যাপক (Distinguished Professor)|

এই সুযোগে বলে রাখা ভালো, গিকু বা সোয়াহিলি ভাষার উচ্চারণ বাংলাভাষাভাষীদের জিহ্বায় আনা খুবই দুরূহ, বলা চলে অসম্ভব।তারপরও মূল উচ্চারণের যথাসম্ভব কাছাকাছি থাকবার আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছে। অনুবাদের ক্ষেত্রেও মূলানুগ থাকবার চেষ্টা করা হয়েছে।

‘তমসায় সাক্ষাৎ’ তাঁর বিখ্যাত গল্প A Meeting in the Dark-এর অনুবাদ।

—অনুবাদক।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন