বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৫

হেনরিখ ব্যোলের গল্প : ব্লেকদের দাঁড়িপাল্লা

অনুবাদঃ সুদর্শনা রহমান

(হাইনরিখ বোল (১৯১৭-১৯৮৫)দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালীন জার্মান লেখকের মাঝে অন্যতম একজন। তাঁর অনবদ্য লিখনশৈলীর জন্য তিনি ১৯৬৭ সালে জার্মানের সম্মানীত “Georg Büchner Prize” এবং ১৯৭২ সালে “Nobel Prize” সম্মানে ভূষিত হন। তাঁর গল্প নিয়ে তৈরি উলেক্ষযোগ্য মুভি গুলো হচ্ছে; The Lost Honour of Katharina Blum,The Clown. )


আমার ঠাকুরদা যে গাঁয়ে বাস করতেন সেখানকার বেশীর ভাগ মানুষই ব্লেকদের তূলা কারখানায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত। পাঁচ পুরুষ ধরে ও অঞ্চলের মানুষগুলো তূলার আঁশ থেকে নির্গত বিষাক্ত ধুলো নিঃশ্বাসের সাথে ফুসফুসে টেনে নিত। গাঁ গেরামের নিরীহ মানুষগুলো ছিল অল্পেই বড় তুষ্ট আর তেমনি ছিল তাঁদের সাদাসিধে ঘরগেহস্থালী। ছাগলের দুধের তৈরি ছানা মাখন, সেদ্ধ আলু, ঝলসানো খরগোশের মাংস আর পুদিনা পাতার সুগন্ধিওয়ালা চা --এই সামান্য খাবার খেয়েই মানুষ গুলোর দিন গুজরান হত। গল্প গুজারি করতে করতে রাতে দিনে চরকায় সুতো কাটত। তাঁতে বুনতো রংবেরঙের কাপড়। কিন্তু তূলার আঁশের বিষাক্ত ধুলো একটু একটু করে প্রতিটা মুহূর্তে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছিল হাসি-খুশী মানুষগুলোকে।


সারাদিনমান উদলা আকাশ থেকে যেন তরল সীসা গলে গলে পড়ে। তার মাঝে শ্রমিকরা তূলার আঁশ ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে সেগুলো কাঁরখানার মেশিনের উপযোগী করে তোলে, আর একটু একটু করে ক্ষয় করে চলে তাঁদের আয়ু। বিষাক্ত ধুলো থেকে বাঁচাবার মতো সব রকম সুবিধা বঞ্চিত মানুষগুলোর পরিবার পিছু বরাদ্দ ছিল মুর্গীর খোপের মতো ছোট্ট একটা করে কুঁড়ে ঘর। প্রত্যেক কুঁড়ে ঘরে থাকার মধ্যে ছিল মাত্র একটা এক চিলতে খাট নামক বস্তু, যাতে কোনো মতে শুধু স্বামী-স্ত্রীর সঙ্কুলান হতে পারে আর বাচ্চাগুলোকে কুকুর বেড়ালের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে অপরিসর ঘরের মেঝেতে এদিক সেদিক স্থান করে নিতে হতো রাতে। প্রতি ভোরেই সব কুঁড়ে থেকে ভেসে আসতো চর্বি মেশানো আলুর ট্যালটেলে ঝোলের একঘেয়ে বিস্বাদ গন্ধ। একমাত্র রবিবার বা অন্য কোনো পালা পর্বনে জুটতো খরগোশের মাংসের ঝোল আর উপরি পাওনা হিসাবে ছাগলের দুধের কফি, তাই পেয়েই কুচোকাঁচা আর বুড়ো মর্দ মানুষগুলো যেন বর্তে যেতো। গুড়োগ্যাঁড়াগুলো অধীর আগ্রহে লোভাতুর জুলজুলে চোখে চেয়ে চেয়ে দেখতো ধোঁয়া ওঠা কুঁচকুঁচে কালো কফির মগে মা তাদের একটু একটু ঘন দুধ ঢেলে নেড়ে দিচ্ছে আর কফির রংও কেমন ধীরে ধীরে বদলে ফ্যাঁকাসে হয়ে যাচ্ছে। সে সময়গুলোতে বাচ্চাগুলোর চোখমুখে ফুটে উঠতো আলোর বিচ্ছুরণ, যেন স্বর্গ থেকে এক টুকরো অমৃত খসে পড়েছে তাদের পাতে।

সেই কোন কাঁক ডাকা ভোরে বাবা মায়েরা চলে যেতো তূলার ক্ষেতে আর ঘর গৃহস্থালীর সব ঝক্কি-ঝামেলা চাপতো বাচ্চাগুলোর কচি ঘাড়ে। বাসী বিছানা পরিপাটি করে গুছিয়ে ওঠাও, কুঁড়ে গুলো ঝাড় ঝাঁপটি দিয়ে সাফ সুতরো করো, গুচ্ছের এঁটো কাঁটা পরিষ্কার কর, রাতের রান্নার জন্য এক ধামা আলু ছিলে রাখো, ডাই করে রাখা থালা বাসন গুলো ঘষে মেজে চকচকে করে রাখার পরে স্কুল মুখে দৌড়াবার ফুরসৎ মিলতো বাচ্চাগুলোর। আবার স্কুল ছুটি হতে না হতেই ছোট বলে একটা মুহূর্ত কি আর নিঃশ্বাস ফেলবার জো আছে'রে বাবা! বন-বাদাড়ে যাও, তোলপাড় করে খুঁটে আনো, কুঁড়িয়ে বাড়িয়ে আনো শুকনো কাঠকুটো, ব্যাঙের ছাতা, শুকনো আর তাজা বুনো ফল পাকুড়, রোজমেরী, বন তুলসী, মৌরীদানা, শিয়ালমোথা, পুদিনা পাতা সহ রাজ্যির লতাগুল্ম। এটুকুতেই কি আর ক্ষান্তি, এতো গেল কেবল শীত থেকে বসন্ত কালীন পর্ব। আবার বসন্তের শেষে গরম পড়তেই না পড়তেই কয়েক ক্রোশ পথ হেঁটে গিয়ে গম ক্ষেত থেকে শুকনো ন্যাড়া কুড়িয়ে এনে জড়ো করো, সেও কম খাটুনীর কাজ নয়। দুটো উপরি আয়ের লোভে ন্যাড়া কুড়োবার ফাঁকে ফাঁকে ছেলে মেয়েগুলো আবার সুগন্ধি বুনো ফুল তুলে জমিয়ে রাখে, কাজের অবসরে কাছের শহরের ঔষধের দোকানের গিয়ে বেঁচে আসতে হয় নাম মাত্র দামে। ছেলে মানুষ পেয়ে দোকানী ওদের ঠকিয়ে ভূত করে দিতো অথচ, এই ফুলগুলোই অন্তত বিশগুণ দাম দিয়ে কিনে নিতো শহুরে পটের বিবিরা। তবে, বন থেকে কুড়ানো ব্যাঙের ছাতাগুলো বেশ ভাল দামে বিকোতো, এক পাউণ্ডের দাম কুড়ি পেনি। যদিও দোকানী তাঁর খদ্দেরদের কাছে সেই ব্যাঙের ছাতারই। দাম এক মার্ক কুড়ি পেনি আদায় করতো। হেমন্তের ভেজা সোঁদা মাটির বুক ফেটে সদ্য গজিয়ে ওঠা ব্যাঙেরছাতাগুলো তুলে আনবার জন্য কি কষ্টটাই পোয়াতে হয় ছোট, ছোট ছেলে মেয়ে গুলোকে। স্যাঁতসেঁতে ঘন সবুজ অন্ধকার বনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বুকে হেঁটে, হামাগুড়ি দিয়ে ঝুড়ি ভর্তি করে ব্যাঙের ছাতা যোগাড় করা, বড় চাট্টিখানি কথা নয়! কখনো কাঁটার খোঁচায় হাত পা ছড়ে রক্তারক্তি কাণ্ড হয়। কখনো বা এদের উষ্ম রক্ত চুষে টিংটিংয়ে জোঁকগুলো দিব্যি নাদুস নুদুস পটলের মতো ট্যাঁপাটোপা হয়ে ওঠে, আর কাদা মেখে সেই বাচ্চাগুলো কিম্ভূতকিমাকার রূপ ধারণ করে। তবে, বাঁচোয়া এই যে বংশ পরস্পরায় প্রত্যেক পরিবারের ফল পাকুড় কুড়োবার জন্য বনের জায়গা আগে থেকেই ভাগ বাঁটোয়ারা করা আছে। তা নাহলে এই ক্ষুদেগুলোকে অসম্ভব কুরুক্ষেত্রের হাত থেকে বাঁচানো কারো সাধ্যি ছিল না।

আসে পাশের বন-বনানী তূলা কাঁরখানা আর শুঁড়ীখানা সব কিছুরই মালিক ছিলেন শ্রীমান ব্লেক, তবে পরিবার প্রধানা ছিলেন শ্রীমতী ব্লেক। দুধের গুমটি ঘরের পাশের ছোট্ট ঘরখানা ব্যবহার করা হতো বুনো ফলমূল, ফুল লতা গুল্ম কেনা বেচা করবারের কাজে। ওটা চালাতেন শ্রীমতী ব্লেক। ও ঘরটিরই ঠিক মাঝ বরাবর একটা পেল্লায় কাঠের টেবিলের উপর শোভা পেতো শ্রীমান ব্লেকের মান্ধাতা আমলের ওজন মাপবার দাঁড়িপাল্লাখানা। আমার বাপের ঠাকুরদার ঠাকুরদা, সেই তিনি যখন ছোট্টটি ছিলেন, তিনিও পরিচিত ছিলেন এই পিতলের উপর তামার গিল্টি করা দাঁড়িপাল্লা খানারসাথে। তাঁরাও ঠিক আমাদেরই মতো এমনি করে ধুলো কাদা মাখা হাতে ঝুড়ি ভর্তি বনজ ফল পাকুড় শাকটা মুলোটা আর কাগজের ঠোঙ্গায় জড়িয়ে ফুল লতাগুল্ম এনে হাজির হতেন এই ঘরখানাতেই। প্রতি বছরই দাঁড়ি পাল্লার মাঝের কাল কাঁটাটা বাঁদিকে আরও সরে সরে যেতো আর ডান দিকের পাল্লাখানায় ঠেসে ঠুসে ওঠানো হতো আনাজপাতি যতক্ষণ না তা উপচে পড়ার যোগাড় হয়। হয়তো, এমনি করেই তাঁরাও দম আটকে চোখ সরু করে, করুণ মুখে দেখতেন ব্লেক পরিবারের মানদণ্ডের প্রহসন যেমন করে এখন আমরা দেখছি।

এই এখন যেমন শ্রীমতী ফারু ব্লেক পাল্লা বাঁদিকে ঝুঁকে না পড়া পর্যন্ত ওতে মাল তুলেই গেলেন। বাদামী চামড়ায় বাঁধানো গাবদা খেরো খাতাখানা খুলে ধীরেসুস্থে প্রথমে সব হিশেব নিকেশ লিখে রাখলেন। তারপর গুনে গুনে আমাদের হাতে তুলে দিলেন এক পেনি বা একাধিক। তবে, ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকলে কালেভদ্রে জুটে যায় এক আধ মার্ক। শুনেছি আমার ঠাকুরদার ছেলেবেলায় এই ঘরটির এক কোনে যে শোকেস রাখা আছে ওতেই একটা কাঁচের বোয়ামে রাখা থাকতো টকমিষ্টি লেবেঞ্চুস। দেখলেই পানিতে মুখ ভরে ওঠে, তবে সেগুলোর একেবারে আকাশ ছোঁয়া দাম। এক পাউণ্ডের দামই এক মার্ক, যাকে বলে নাগালের বাইরে, ছেলেমেয়েরা গোপনে মুখ ভর্তি লালা সুড়ুত করে গিলে নেয়। কেনা বেচায় মন প্রসন্ন থাকলে শ্রীমতী ব্লেক দয়াপরবেশ হয়ে ক্বচিৎ, কদাচিৎ একখানা করেই সেই বেহস্তী মেওয়া কুচোকাঁচাদের হাতে গুঁজে দিতেন। মুহূর্তে অপ্রত্যাশিত আনন্দে ওদের মুখগুলো ঝলমলিয়ে উঠতো, যেমনটি হতো পালাপর্বণে তাদের মা যখন কালো কুঁচকুঁচে কফির মগে ঘন দুধ মিশিয়ে মিশিয়ে ফ্যাঁকাসে করে তুলতেন, যার তুলনা করা চলে শুধুমাত্র ফ্লাক্সেনদের শুঁয়োরঝুঁটি বাঁধা মেয়েটির গাঁয়ের রঙের সাথে।

ব্লেক পরিবারের এক অলিখিত আইন ছিল ও গাঁয়ের কোনো বাড়িতে দাঁড়িপাল্লা রাখা চলবে না। আইনটা যে কবে আর কিভাবে বলবতৎ হয়েছিল তাও গাঁয়ের লোকদের মনে পড়ে না। তাঁরা শুধু এই অব্দি জানতো যে, আইন অমান্যকারীর জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি! তূলা কাঁরখানা থেকে শুধু তাঁদের ছাঁটাই-ই করা হবে না, তাঁদের সংগৃহীত আনাজ, ফল পাকুড়, ফুল কিবা লতাগুল্মও ব্লেকরা আর কিনবে না। এখানেই শেষ নয়, ব্লেকরা ছিল এমন প্রভাবশালী যে তাঁদের চটাতে আশেপাশের দশ গাঁওগেরামের অন্য দোকানীরাও এ সব পণ্য কিনবার মতো হিম্মত দেখাবে না, কিংবা এদের মধ্যে শ্রমিক হিসেবে যারা কাজ করে তাদেরকে ছাটাই করে দেবে। তাই বিনা প্রতিবাদে ব্লেক পরিবারের অলিখিত নিয়ম অনুযায়ী আমার ঠাকুরদার পাঁচপুরুষ সহ সারা গাঁয়ের মানুষ মান্য করে এসেছে। একজন মানুষেরও মাথায় এটা খেলেনি যে, বাবা আদমের আমলের ওই দাঁড়িপাল্লার উপর নির্ভর না করে সহজেই আটা ময়দা কাপ দিয়ে মাপা যায়, ডিমের গুনতি হতে পারে ডজন অনুসারে, চরকায় কাটা সুতো মাপা যেতে পারতো গজ হিসাবে। কেউ ভেবে দেখেননি, তাঁরা যে পয়সা মাস কাবারে উপার্জন করতেন তা হতে পারতো তাঁদের এক দিনের রোজগার, এই তুচ্ছ হিসাবটুকুও তাঁদের অগোচরে থেকে যায়। বাস্তব পরিস্থিতি বরং ছিল এর উল্টো, একটা নূতন দাঁড়িপাল্লা যে কেনা বা বানানো তেমন কোনো ব্যপার নয়, সেটা নিয়েও কারো হেলদোলও ছিল না।

আমার ঠাকুরদার পূর্বপুরুষরা বংশানুক্রমে ব্লেকদের জমিতেই বসবাস করতেন। ছোটবেলা থেকে আমার ঠাকুরদা ছিলেন কর্মঠ, সাহসী, চটপটে আর ক্ষুরধার বুদ্ধির অধিকারী। তাঁর সমবয়সী ছেলেদের তুলনায় অনায়াসেই বনের অনেক গভীরে ঢুকে যেতেন ব্যাঙের ছাতা খুঁজতে, বড়রা ভয় দেখতেন বনের অপদেবতা নারাজ হবে তাঁদের শান্তি ভঙ্গ হলে। কিন্তু এসব কল্পকথাকে আমার ঠাকুরদা মোটেও পাত্তা দিতে না, তিনি ঝুড়ি ভরে ব্যাঙেরছাতা তুলে আনতেন। এমনকি অনেক সময় দুষ্প্রাপ্য ট্রেফেল প্রজাতির ব্যাঙেরছাতাও খুঁজে যার প্রতি পাউণ্ডের দাম তিরিশ পেনি। সাত থেকে বার বছর পর্যন্ত একটা ক্যালেন্ডারের ছেঁড়া পাতার পিছন দিকে ছেলেমানুষী আঁকাবাঁকা হাতের লেখায় যা কিছুই তিনি ব্লেকদের কাছে বেঁচে দিতেন তার সব কিছুর নাম ও দরদাম লিখে রাখতেন।

একমাত্র ব্লেকদেরই ঘোড়ায় টানা একটা দু’ বগির গাড়ি ছিল। ব্লেকরা তাঁদের এক ছেলেকে ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান চর্চার জন্য সেই সুদূর প্রাগের এক মঠে পাঠিয়েছিলেন লেখাপড়া করতে। সেটা ছিল ১৯০০ সালের প্রথম দিন, মহামান্য সম্রাটের আদেশে তাঁদের সেই পুত্রটিকে ধর্ম্যযাজক পদে উন্নীত করা হলো। এমনিতেই ব্লেকদের পতিপত্তি প্রচুর, তার উপরে মহামান্য সম্রাটের বদান্যতায় তাঁরা অভিজাত পরিবারভুক্ত হলেন এবার। এ উপলক্ষে ব্লেকরা গাঁয়ের প্রতি পরিবারের মাঝে প্রথমবারের মতো কোয়াটার পাউণ্ড সত্যিকার ব্রাজিলিয়ান কফি, পুরুষদের জন্য তামাক আর বিয়ার বিতরণ করল। আর তাঁদের শুঁড়ীখানায় আয়োজন করল অঢেল খাবার দাবার পানীয় আর রাতভর ফুর্তির রসদ। এ উপলক্ষে আশেপাশের গাঁও গেরামের মান্যগণ্য অতিথিরা এসেছিলেন। তাঁদের জমকালো ঘোড়া টানা গাড়ি গুলোর উপচে পড়া ভিড়ে জমজমাট ছিল চারদিক। সে দেখবার মতো একটা বিষয় হয়েছিল বটে! ব্লেকদের এখন লোকে কিংবদন্তী দৈত্যে বিল্গানের নামে অভিষিত করে। তাঁরা এখন ব্লেক-ভঁ-বিল্গান!

আমার ঠাকুরদা ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি ব্লেকদের অনাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর মুখে আমি বেশ ক’বার শুনেছি বিনামূল্যে বিতরণ করা কফি আনতে গিয়ে কীভাবে তিনি আবিষ্কার করলেন, যুগ, যুগ ধরে ব্লেকরা তাঁদের ধার্য করা দাড়িপাল্লার সাহায্যে ওজনে কারচুপি করে ঠকিয়েছে তাঁদের পূর্বপুরুষ সহ সমগ্র গাঁয়ের মানুষদের। সেদিনটা ছিল বছরের শেষ সন্ধ্যা, নববর্ষের প্রথম দিনটি উৎযাপনের জন্য তখনও ঘরদোর সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা বাকী, কেকগুলো তখনও বেক করা হয়ে ওঠেনি। এছাড়াও সাতপাঁচ নানা ধরণের টুকিটাকি কাজ রয়েছ, আর দিচ্ছিলো তো মোটে এইটুকুনি করে কফি! তার জন্য কাজ পণ্ড করে দল বেঁধে যাবার দরকারটা কি হে বাপু? তাই আরও তিন পড়শি পরিবার ও ঠাকুরদাদের পরিবার সহ মোট চার পরিবার থেকে চারজনকে না পাঠিয়ে শুধু, ঠাকুরদাকেই পাঠানো হলো স্কুল ছুটির পর। ঠাকুরদা নিজের জন্য ছাড়াও ওয়েডলার, চেচ, আর ভল্লাস মোট এই চারটি পরিবারের জন্য কফি নিতে গেছেন। সেই দুধের গুমটি ঘরটির সরু ব্রেঞ্চটায় বসে ধৈর্যের সাথে ঠাকুরদা অপেক্ষা করতে লাগলেন, যেখানে ছিল ব্লেকদের বিখ্যাত সেই প্রাগঐতিহাসিক দাঁড়িপাল্লাটা। ব্লেকদের হোঁৎকা কাজের মেয়েটা কফি মেপে মেপে প্যাকেট করছিল, চারটা প্যাকেট চারটা পরিবারের জন্য, তিনি দেখলেন মাপার ওজনটা বাঁ দিকের পাল্লার উপরে রাখা। শ্রীমান ব্লেক সান্ধ্য ভোজের তদারকিতে ব্যস্ত। কাজের মেয়েলোকটি বুঝি ঠাকুরদাকে একটা লেবঞ্চুস দিতে চেয়েছিল, কাঁচের বোয়ামের ভেতর হাত ডুবিয়ে দেবার পর তার হাতের মুঠোয় যখন কিছুই উঠে এলো না, সে বুঝতে পেলো ওটা আসলে সম্পূর্ণ শূন্য। সে বেচারির আর কি দোষ, ওটাতে বছরে একবার মাত্রই ভরা হতো লেবঞ্চুস, যার এক পাউণ্ডের দাম ছিল মোটে এক মার্ক! কাজের মেয়েলোকটি হেসে বলল, “দাঁড়াও একটুক্ষণ, আমি লেবেঞ্চুসের নূতন একটা প্যাকেট নিয়ে আসছি’’। ঠাকুরদা কফির চার চারটা প্যাকেট হাতে নিয়ে, বাঁদিকে কাঁত হয়ে থাকা দাঁড়িপাল্লার দিকে এক নজর তাকিয়ে হাতের প্যাকেটগুলো নিয়ে ডানদিকের খালি পাল্লায় রাখলেন। চার চারটি প্যাকেট ডানদিকের পাল্লায় রাখার পরও যখন বাঁদিকের পাল্লাটা বাঁ দিকেই কাঁৎ হয়ে রইলো ঠাকুরদার বুকের ভেতরটা ধড়াস ধড়াস করতে লাগল যেন, তিনি বনের অপদেবতাকে সশরীরে সামনে দেখতে পাচ্ছেন! ঠাকুরদার পকেটে সব সময় ভরা থাকতো ছোট পাথরের টুকরা, ওগুলো গুলতিতে লাগিয়ে তিনি তাঁর মায়ের ক্ষেত থেকে চড়াই পাখীদের তাড়িয়ে দিতেন, বড্ড পাজী পাখীগুলো, ওগুলোর জ্বালায় ক্ষেতে কোনো শাক-সবজি রাখবার জো’টি নেই, সব খুঁটে খুঁটে খেয়ে নেবে। পকেট থেকে একটা একটা করে পাথরের টুকরা বের করে তিনি ডানদিকের পাল্লায় রাখতে লাগলেন, যতক্ষণ না দুদিকের পাল্লা সমান হয়। গুনে গুনে পাঁচটা পাথরের টুকরা তিনি তাঁর রুমালের খুঁটে বেঁধে নিলেন আর কফির প্যাকেট গুলোও উঠিয়ে হাতে নিলেন। সে সময়ই কাজের মেয়ে লোকটি বোয়াম ভর্তি লেবেঞ্চুস নিয়ে হাসি মুখে ফিরে এলো, আর ঠাকুরদা ফ্যাঁকাসে মুখে তখনও সেখানেই দাঁড়িয়েছিলেন।

ঠাকুরদা একটা কফির প্যাকেট রেখেদিলেন আর লেবেঞ্চুসটা মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে পায়ের তলায় পিষলেন, কাজের মেয়ে লোকটি হতভম্ব হয়ে তাঁর কাণ্ড কাঁরখানা দেখছিলো। তিনি বললেন, “আমি শ্রীমান ব্লেকের সাথে দেখা করতে চাই।” “দয়া করে বলুন শ্রীমান ব্লেক-ভঁ-বিল্গান,’’ দ্রুত শুধরে দিলো মেয়েলোকটি। “ঠিক আছে, ব্লেক-ভঁ-বিল্গান” বললেন ঠাকুরদা, কিন্তু মেয়েলোকটি কোনো জবাব না দিয়ে তার উত্তরে শুধু হেসেছিল। ঠাকুরদাও আর কোনো বাক্য ব্যয় না করে অন্ধকার পথ ধরে গ্রাম অভিমুখে রওনা দিলেন, হাতে তাঁর প্রতিবেশীদের জন্য নেয়া তিন প্যাকেট কফি আর রুমালে বাঁধা পাথরের টুকরাগুলো। এই মুহূর্তেই তিনি ধর্মযাজকের সাথে দেখা করতে চান। তবে, প্রথম কাজ হবে এমন একজন মানুষকে খুঁজে বের করা, যার কাছে থেকে সঠিক ওজনের মাপ সহ একটা দাঁড়িপাল্লা তিনি ধার পেতে পারেন। তিনি জানতেন, এ গাঁয়ের কারো কাছে দাঁড়িপাল্লা পবার আশা নেই, অন্ধকারে পাক্কা দু’ঘণ্টা টানা হেঁটে তিনি পৌঁছালেন দেলহামের ছোট একটা শহরে, যেখানে ছিল গ্রাম্য বৈদ্য হোইয়িং এর বাড়ি, ততক্ষণে ঠাণ্ডায় তিনি আধা জমে গেছেন। হোইয়িং এর বাড়ির কাছে আসতেই ঠাকুরদা সদ্য ভাঁজা প্যানকেকের সুমিষ্ট সুবাস পেলেন! হোইয়িং সরু ঠোঁটে মস্ত এক সিগার চেপে দরজায় এসে দাঁড়ালেন, তাঁর গাঁ থেকে ভুরভুর করে ভেসে আসছিলো অ্যালকোহল, প্যানকেক আর সিগারের মিলিত গন্ধ! হোইয়িং এগিয়ে এসে ঠাকুরদার বরফ শীতল ঠাণ্ডা হাতটা ধরে জোরে চাপ দিলেন, “ কি ব্যপার বলতো, তোমার বাবার বুকের ব্যথাটা কি আবার বেড়েছে?” “না, না আমি ওষুধ নিতে আসিনি, আমি চাই———,” বলেই, তিনি রুমালে বাঁধা পাথরের টুকরাগুলো খুলে নিয়ে হোইয়িং এর হাতে দিলেন। বললেন, “আমি শুধু এই মার্বেল গুলো মাপতে চাই,’’ তিনি কুণ্ঠিত মুখে হোইয়িং এর চেহারার দিকে তাকিয়ে রইলেন। যখন দেখলেন হোইয়িং কিছুই বললেন না, একটুও রাগ দেখালেন না, এমনকি কোনো প্রশ্নও করলেন না, তখন তিনি সাহসে ভর করে বললেন, “আমি ন্যায় বিচার চাই,” বলতে, বলতে তিনি উষ্ণ ঘড়টির ভেতরে ঢুকে পড়লেন। ঠাকুরদা দেখলেন, তাঁর সস্তায় কেনা জুতো জোড়া কেমন ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে। পাতলা জুতোর আস্তর ভেদ করে ভেতরে জল ঢুকে পড়েছে, আর তাঁর শরীরে বনের গাছের পাতা বেয়ে টুপ টুপ করে ঝরে পড়া বরফগুলো উষ্ণতা পেয়ে গলতে সুরু করে দিয়েছে, প্রচণ্ড ক্ষুধায় আর ক্লান্তিতে তাঁর দেহ ভেঙে নুয়ে পড়ছিলো। হঠাৎ করেই তিনি ডুকরে উঠলেন, এতদিন ধরে যত ফুল লতা পাতা, ফল পাকুড়, শাক সবজি অন্যায় ভাবে ব্লেকরা মেপে নিয়েছে আজ পাঁচটি মার্বেল সেই অন্যায় মাপের সাক্ষী দেবে। হোইয়ং প্রথমে মার্বেলগুলো হাতে নিয়ে মাথা ঝাঁকালেন, তারপর তাঁর স্ত্রীকে ডাক দিলেন। আমার ঠাকুরদার মানসচোখে ভেসে উঠলো যুগ যুগ ধরে ব্লেকরা ওজনে কারচুপি করে মেপে নিচ্ছে তাঁদের পূর্বপুরুষদের বন থেকে খুঁটে আনা সামগ্রী। হতাশায় ক্রোধে তিনি আরও জোরে কেঁদে উঠলেন, কান্নার দমকে তাঁর সারা শরীর কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগলো। শ্রীমান হোইয়ং অনুমতি দেবার আগেই তিনি ধপ করে বসে পড়লেন শুঁকনো সোফার উপর, তাঁর সামনে রাখা গরম প্যান কেক ও ধোঁয়া ওঠা কফির পেয়ালা জুড়িয়ে জল হয়ে গেল। যতক্ষণ পর্যন্ত না, হোইয়ং তাঁর দোকান ঘর থেকে পাথরের টুকরাগুলো মাপ দিয়ে ফিরলেন, ঠাকুরদা এক নাগাড়ে কেঁদেই চললেন। হোইয়ং হাতের মুঠোয় পাথরের টুকরাগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে মৃদু কণ্ঠে তাঁর স্ত্রীকে বললেন, “একেবারে পাক্কা দু’আউন্স ওজন।”

আমার ঠাকুরদা ঠাণ্ডা অন্ধকার বনের ভেতর দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরে তাঁর বাবার কাছে বেধড়ক মার খেলেন এতক্ষণ অনুপস্থিত থাকার কোনো সঠিক কারণ দেখাতে পারলেন না বলে। কফির কথা জিজ্ঞেস করাতে মুখে একটি শব্দ উচ্চারণ করলেন না যেন কুলুপ এঁটে রেখেছেন। সমস্ত সন্ধ্যা তিনি এক টুকরো কাগজের উপর আজ পর্যন্ত যত কিছু তিনি ব্লেকদের কাছে বিক্রি করছেন তার হিসাব কষে চললেন। ঘড়ির কাঁটা ক্রমে মধ্যরাতের দিকে ঝুঁকলো, শুঁড়ীখানা আর সারা গাঁ থেকে গান, বাজনা আর হৈ হট্টগোল ভেসে আসছিলো। বাড়ির সবাই যখন সবাইকে জড়িয়ে চুমু দিয়ে নূতন বছরের আভিষেকে ব্যস্ত, ঠাকুরদা নূতন বছরকে স্বাগত জানালেন এই বলে, “ব্লেকদের কাছে আমার সাকুল্যে আঠারো মার্ক আর বত্রিশ পেনি পাওনা রয়েছে।” তারপর, তিনি তাঁর ভাই, বোন সহ সারা গাঁয়ের ছেলে মেয়েদের কথা ভাবলেন, ভাবলেন তাঁর পূর্বপুরুষ ও তাঁদের আমলের গাঁয়ের লোকদের কথাও, এমন ভাবে কতো টাকা তাদেরও তো পাওনা রয়ে গেছে। ততক্ষণে তাঁর কান্না থেমে গেছে, তিনি তাঁর মা বাবা ভাই বোনকে তাঁর আবিষ্কারের কথা বললেন।

নয়া সালের প্রথম দিনের গন জমায়েতে অংশ নিতে ব্লেক-ভঁ-বিল্গান জাঁকজমক পূর্ণ নূতন কোট পরেগির্জায় দিকে রওনা হলেন, দু’বগির ঘোড়ায় টানা তাঁর গাড়ি খানার নীল, সোনালী ঝলমলে সাঁজে আলো ঠিকরে ঠিকরে পড়ছিলো। তিনি আশা করেছিলেন, তাঁর সম্মানে পথের দু’ধারে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রাম বাসীরা ঘন ঘন হাত তালি দেবে, হর্ষধ্বনি দেবে, গান গাইবে, কিন্তু তার বদলে সবার কঠোর পাণ্ডুর মুখে যেন মুরুভুমির রুক্ষতা, এমনকি গির্জার ভেতরেও সেই একই দৃশ্য। শব্দহীন, মূখ মানুষের ঠাণ্ডা ও শীতল দৃষ্টিতে তাঁর অন্তরআত্মা কেঁপে উঠলো, প্রার্থনাবাণী পড়তে গিয়ে ব্লেক রীতিমতো তোতলাতে লাগলেন, তাঁর হাতের তালু ঘেমে উঠলো। প্রার্থনা শেষ হবার পর ব্লেক যখন সপরিবারে বাইরে বেরিয়ে এলেন অপেক্ষারত বিষণ্ণ বদন আর শব্দহীন মানুষদের দিকে তাকিয়ে একেবারে ঘাবড়ে গেলেন। কিন্তু ব্লেকদের তরুণী মেয়েটি ছোট ছেলে মেয়েদের জটলা সামনে গিয়ে আমার ঠাকুরদার মুখোমুখী হয়ে চেঁচিয়ে উঠলো, “এই তুই তোর মায়ের জন্য কফি নিয়ে যাসনি কেন’রে?” আমার ঠাকুরদা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “কারণ আপনাদের কাছে পাঁচ পাউণ্ড দামের কফির সমান টাকা পাওনা রয়েছে আমার”। পকেট থেকে পাঁচটি পাথরের টুকরা মেয়েটির সামনে বাড়িয়ে ধরে বলেন, “এ কটির ওজন দু’আউন্স, আপনাদের দাঁড়িপাল্লায় ঠিক এ পরিমাণ ওজনের ঘাঁটতি রয়েছে।” মেয়েটি কিছু জবাব দেবার আগেই হল ভর্তি মেয়ে পুরুষ উচ্চ স্বরে গেয়ে ওঠে, “হে ঈশ্বর দয়া করো, আমাদের ন্যায় বিচার দাও———————।”

ব্লেকরা চার্চে থাকতেই গাঁয়ের উইলহ্যাম ভোঁহ্লা দুধ গুমটির দরজা ভেঙে দাঁড়িপাল্লা আর হিসাবের খেরো খাতাখানা চুরি করে নিয়ে আসে। তারপর নূতন বছরের সারাটা বিকেল ধরে ভর গাঁয়ের লোক আমার প্রপিতামহের বৈঠকখানায় বসে হিসাব কষে চলে, আজ পর্যন্ত কত টাকা ব্লেকরা সবার কাছ থেকে ঠকিয়ে নিয়েছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বয়ে চলে সে হিসাব আর মেলে না। অবশেষে যখন ব্লেকের পোষা গুন্ডারা এসে এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে, ছুরি মেরে ছিনিয়ে নিয়ে যায় দাঁড়িপাল্লাটা আর খেরো খাতাটা তখন সব হিসাব-নিকাশের পরিসমাপ্তি ঘটে।

ঠাকুরদার ছোট বোন গুলী খেয়ে মারা যান, গাঁয়ের বেশ কিছু মানুষ গুরুতর আহত হয় আর ব্লেকের পোষা গুণ্ডাদের একজন প্রাণ হারায় উইলহ্যামের ভোঁহ্লার ছুরির আঘাতে। শুধু আমাদের গাঁয়েই নয় আশেপাশের গাঁওগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবাদের ঢেউ, প্রায় সপ্তাহ খানেক ধরে তূলা কাঁরখানার সব কাজ বন্ধ থাকে। বাইরে থেকে আরও ভাড়াটিয়া গুণ্ডা জুটিয়ে এনে ব্লেক গাঁয়ের মনুষ্যদের জেলে পোরাবার ভয় দেখাতে থাকে, গির্জার পাদ্রীকে বাধ্য করে তাঁর হয়ে তাঁর দাঁড়িপাল্লার বৈধতা সম্পর্কে সাফাই গাওয়াতে। গাঁয়ের মানুষরা কাঁরখানায় ফিরে গেলেও আর কেউ গির্জায় যোগ দেয় না। নিঃসঙ্গ একাকী অসহায় পাদ্রী দাঁড়িয়ে থাকে ওজন দাঁড়িপাল্লা আর কফির প্যাকেট পরিবেষ্টিত হয়ে। বাচ্চাকাচ্চারাও আবার বনে, বনে ঘুরে খুঁটে আনে সুগন্ধি ফুল, লতা, পাতা আর গুল্ম। শুধু রবিবারে ব্লেক এসে গির্জায় ঢুকলেই গ্রামবাসী দু’হাত তুলে মাতম করে, “হে ঈশ্বর দয়া করো, আমাদের ন্যায় বিচার দাও --------------।” শেষমেশ ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেটের অফিস থেকে হুকুমজারী হয়, গান গেয়ে মাতম করলে কঠোর সাজা দেয়া হবে!

ঠাকুরদার মা বাবাকে ছোট মেয়েটির কবরের মাটি শুকাবার আগেই গাঁ ছেড়ে দূর পরবাসে যাত্রা করতে হয়। কালে কালে তাঁরা ঝাঁকা বুনে পেটের ভাত যোগাতেন, কিন্তু কোনো এক খানে থিতু হওয়া আর তাঁদের ভাগ্যে জোটেনি। কারণ মানুষকে ন্যায় বিচার দিতে পারে এমন কোনো বিচার ব্যবস্থার দাঁড়িপাল্লা কোথাও তারা দেখতে পায়নি। গাঁয়ের পর গাঁ এই পরিবারটি তাঁদের ঠেলাগাড়ি ঠেলে ঠেলে পাড়ি দিয়েছেন, পিছু পিছু হেঁটে চলেছে তাঁদের অপুষ্ট ছাগলের পাল। কান পাতলে শোনা যেত বহুদূর থেকে ভেসে আসছে তাঁদের হাহাকার ধ্বনি, “হে ঈশ্বর দয়া করো, আমাদের ন্যায় বিচার দাও————————।”

আচ্ছা, আমাদের পূর্বপুরুষরা কি ওপর থেকে দেখতে পান, পৃথিবীতে এখনো দাঁড়িপাল্লার মাপে কারচুপি হয়, সাধারণ মানুষ ন্যায় বিচার চেয়ে হাহাকার করে। কিন্তু ঈশ্বরের কানে তা কক্ষনো পৌঁছায় না!   


                     



অনুবাদক পরিচিতি
সুদর্শনা রহমান

গল্পকার। অনুবাদক। 
অস্ট্রলিয়া প্রবাসী।



                   
                                                                              
                                                     
   

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন