বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৫

আর্ট অফ ফিকশন : গল্পকার, ঔপন্যাসিক ও চলচ্চিত্রকার আনোয়ার শাহাদাতের সাক্ষাৎকার

আনোয়ার শাহাদাতের জন্ম ১৯৬৩ সালের ৩ ডিসেম্বর। জন্মেছেন বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলায়। ইউনিয়ন পাদ্রী শিবপুর। গ্রামের নাম রঘুনাথপুর। পড়েছেন বরিশালে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাংবাদিকতা করতেন দৈনিক আজকের কাগজে। পরে আসে দিন যায় নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন। সে সময়ে তিনি মৌলবাদীদের আক্রামণের শিকার হন।
দীর্ঘদিন তিনি নিউ ইয়র্কে বাস করছেন। এখানে চলচ্চিত্র বিষয়ে পড়াশুনা করেন। পরে ব্যবসা ব্যাবস্থাপনা বিষয়ে ডিগ্রী অর্জন করেন।


এই প্রবাসজীবনে লিখতে শুরু করেন গল্প। ‘হেলেচাষার জোঁয়াল বৃত্তান্ত’ এবং ‘ক্যানভেসার গল্পকার’ শিরোণামে তাঁর দুটি গল্প গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। আখ্যান ও নির্মাণ শৈলীর দিক থেকে আনোয়ার শাহাদতের গল্প অভূতপূর্ব। বাংলাদেশের সামরিক শাসন নিয়ে একটি ধ্রুপদী উপন্যাস লিখেছেন। নাম-- সাঁজোয়া তলে মুরগা। তাঁর এই তিনটি গ্রন্থই বাংলা কথাসাহিত্যে মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত।

দুবছর আগে আনোয়ার শাহাদাত পঞ্চাশ বছরে পড়েন। সে সময়ে গল্পপাঠে একটি বিশেষ আয়োজন করার পরিকল্পনা করে। এরই একটি অংশ হিসেবে আনোয়ার শাহাদাতের এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয়। সাক্ষাৎকারটি শুরুতে মুখোমুখি গ্রহণ করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তাঁর সঙ্গে সময় করে ওঠা সম্ভব ছিল না। পরে টেলিফোনে কয়েকদিন ধরে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয়। সেটা রেকর্ড করা হয়। সাক্ষাৎকারটি কয়েকটি ভাগে নেওয়ার কথা ছিল। প্রথম ভাগে—তাঁর গল্প নিয়ে। দ্বিতীয়ভাগে উপন্যাসটি নিয়ে। তৃতীয়ভাগে—সাহিত্যের নানা বিষয় নিয়ে। এবং চতুর্থভাগে তাঁর চলচ্চিত্র ‘কারিগর’ নিয়ে। চলচ্চিত্র পর্বে তানভীর রাব্বানীর যোগ দেওয়ার কথা ছিল।  কিন্তু আনোয়ার শাহাদাত  এ সময়ে পড়াশুনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তানভীর রাব্বানীর পেশাগত, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইত্যাদি ধরনের বিখ্যাত কাজে মুগ্ধ হয়ে যান।  সাক্ষাৎকারদাতা ও গ্রহণকারী একই শহরে থাকা সত্বেও হচ্ছে-হবে করে নানা ব্যস্ততায়-অলসতায় পরিকল্পিত সাক্ষাৎকার সিরিজটি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে দুই বৎসর কেটে যায়। তবে আশা করা যায়—অচিরেই পরিকল্পনা বাস্তাবায়ন করা হবে।
এই সাক্ষাৎকারে আনোয়ার শাহাদাত তাঁর নিজের লেখালেখি, লেখালেখি বিষয়ক ভাবনা, বাংলাদেশের লেখালেখির জগতে বিরাজমান সিরিয়াস ঘরানা/ উদার ঘরানা ও মৌলবাদী ঘরানার চালচিত্র অকপটে প্রকাশ করেছেন। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন কুলদা রায়। অনুলিখনে সহায়তা করেছেন এমদাদ রহমান। তাঁর যে-কোনো আলাপই বৈশ্বিক আলো-হাওয়ার দেখা মেলে।


কুলদা রায় :১/ 
 গল্প লিখতে শুরু করলেন কেন?

আনোয়ার শাহাদাত:১/ 
ছেলেবেলায় ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, নিমাই ভট্টাচার্য, শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পড়ে মনে হয়েছে এগুলো আমিও লিখতে পারি।

রবীন্দ্রনাথের ছুটি গল্পের ফটিক চাঁদ, বলাই, কৃষ্ণকান্তের উইল পড়ে আমি তখন বুঝতে পারি এ গল্পগুলোর সঙ্গে আমার জীবন জড়িত। এই গল্পগুলি আমার নিজেরও। কোনো না কোনো ভাবে ওই লেখার সঙ্গে আমি রয়েছি।

ম্যাক্সিম গোর্কির মা এবং সল বেলোর একটা উপন্যাস ( নাম মনে নেই) পড়ে আমি খুবই উদ্দীপিত হই। উপন্যাসটিতে প্রধান চরিত্র সমুদ্র তীরে ল্যাংটা হয়ে হাঁটছে। এটা ছিল ওই চরিত্রের উদ্দেশ্য-মূলক পাগলামি করা। এটা পড়ে আমার মনে হয়েছে এই চরিত্রটি আমি। কোথায় যেন আমার খুব মিল। তখন আমার বাল্যকাল, আমি একটি গল্প লিখি। মনে হয় নবম শ্রেণী'র ছাত্র হব। গল্পটিতে একটি বাবা তার শিশু পুত্র অ্যালেক্সান্ডারকে রেখে আফ্রিকায় চলে যায়। এটা লিখবার পরের বছর গল্পটি আমার বন্ধু বরিশালের ঝাউতলার বাচ্চুর সঙ্গে শেয়ার করি। গল্পটি পড়ে বাচ্চুর মন খারাপ হয়। আমি আসলে মন খারাপের গল্পই লিখেছিলাম। বাচ্চুর মন খারাপে আমার আনন্দ লাগে। বুঝতে পারি উদ্দেশ্যটা সফল হয়েছে। সেই লেখাটিকে এক রকমের অকালপক্কালীন প্রথম ও শেষ লেখা হিসেবে তখন ধরে নিয়েছিলাম। এর পরে আমি আর লিখিনি, সেই গল্পটিও হারিয়ে যায়।

১৯৮৭ সালে আমি তখন সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত। আমার সহকর্মী বন্ধু আসিফ নজরুল গল্প লিখত। আমার সঙ্গে গল্প নিয়ে গল্প করত। ওকে একদিন সেই অ্যালেক্সান্ডারের পিতার আফ্রিকায় হারিয়ে যাওয়া গল্পটা বলি। শুনে আসিফ বলল, আপনি গল্পটা আবার লেখেন, আমি ছাপার ব্যবস্থা করব। আবার আমি গল্পটি লিখি। এর মধ্যে আসিফ জেনেছে যে আমি গল্প লিখলেও কাউকে দিতে যাব না, সে ব্যাপারে আমি লাজুক-- সেহেতু আসিফ তখন আমাকে সাংবাদিক কবি সোহরাব হাসানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। সোহরাব ভাই তখন যতদূর মনে পড়ে একটি পত্রিকায় গল্পটি প্রকাশ করেন। পত্রিকাটার নাম মনে নেই। ওই পত্রিকাটিতে তিনি পার্ট টাইম সম্পাদনার কাজ করতেন। ওই অর্থে আমি তখনও সত্যি গল্প লিখতে শুরু করিনি। গল্পকার হওয়ার ইচ্ছেও ছিল না। তাই আর লেখার তাড়না অনুভব করিনি। এরপর সাংবাদিকতায় 'রাজা-উজির' বিষয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। গল্প লেখা কাজটিকে নেহায়েত সৌখিনতা কী বিলাসিতা মনে হল। এরপর দেশান্তরী হলাম।

আমেরিকায় এসে দেখি নিউ ইয়র্কে তখন জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, পুরবী বসু, হাসান ফেরদৌস, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, সাদ কামালী- এঁরা সাহিত্য সভা করতেন। পেশাগত কারণে ঢাকাতে খ্যাতিমানদের সান্নিধ্য হত, হয়তো সেই পুরনো নেশায় এঁদের সঙ্গে ভিড়ে গেলাম। সেই সাহিত্য আসরে আমি নিয়মিত যাই। আমি অফিসিয়ালি ঢাকাতে সংবাদপত্রে 'রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংবাদদাতা' ছিলাম। জ্ঞানে, ও বোঝাপড়ায় ওটা পরিষ্কার ছিল। নিউ ইয়র্কের এই সাহিত্য আসরে সবারই লেখার নিয়ম; সে-কারণে আমিও লিখতাম, তবে লিখতাম রাজনীতি বিষয়ে। হাসান ফেরদৌস একদিন রাগ করে বললেন, আমরা সাহিত্য করতে আসি, আনোয়ার তার মধ্যে রাজনৈতিক লেখা ঢুকিয়ে দেয়। ওই অর্থে হাসান ফেরদৌসের ওই কথার মর্যাদা রাখতেই আবার গল্প লেখা শুরু করলাম। তবে কী হাসান ফেরদৌসের কারণে বা এই সাহিত্য সভার নিয়ম রক্ষার জন্যই কেবল আমার আবার নতুন করে গল্প লেখা বা আমি গল্পকার হওয়া? উত্তরঃ নাহ! তেমনটি যদি বলি তবে সেটা হবে সীমাহীন নির্বোদ্ধিতা। তবে সেটা অন্তত ওই সময়ের জন্য অজুহাত? তা ধরা যেতে পারে। কারণ লেখাটি আমার মধ্যে কোনও না কোনওভাবে ছিলই।


কুলদা রায় :২/ 
 শুরুর লেখাগুলো কেমন ছিল?

আনোয়ার শাহাদাত :২/ 
অ্যালেক্সান্ডার নামে প্রথম যে গল্পটি লিখেছিলাম- সেটা ছিল রোম্যান্টিক। রোম্যান্টিক মানে নারীপুরুষের যৌনাকাঙ্ক্ষাজনিত যাতনায় উৎপীড়ন্মুখ তাড়না থেকে উদ্ভূত কোনও তৎপরতা নয়। অর্থাৎ গল্পটি ভাবনায় রোম্যান্টিক বলতে চেয়েছি।

ফলে আমার প্রথম গল্প বলে যেটাকে আমি ধরে থাকি সেটা এই আমেরিকাতে লেখা, সেই সাহিত্য আসরের জন্য, গল্পের নাম ' পিঠ যখন ভূমি' । রোম্যান্টিকতার বিপরীতমুখী একটি গল্প যার মুখটি হল--একজন চাষির গাই-গরুটি গাভিন হয়েছে। তার পাল দেওয়ানো দরকার। ওই চাষির একটি বলদ গরু ছিল তা কিছুদিন আগে খুরা-রোগে মারা গেছে। এখন এই সংসারে অবশিষ্ট থাকা গাই গরুটার ডাক উঠেছে। কিন্তু গাভীটি এতো দুর্বল যে পালের সময় নিজের পিঠে ষাঁড়ের ভার সহ্য করতে পারার কথা নয়। পারেও না। সেজন্য চাষী, গাভীর পালের সময় নিজেই গরুটির নিচে নিজের পিঠটি পেতে ধরে। দৃশ্যটির তৈরি হয় এমন যে চাষির উপরে গাই, তার উপরে ষাঁড়। এবং ষাঁড়ের ওজন সেও আর নিতে পারে না। কিন্তু তার গাইটিকে গর্ভবতী করানোর জন্য সে এইভাবে চেষ্টা করে। গাভীর পেটে বাচ্চা দরকার, তার আর একটি গরু দরকার। এই ছিল গল্পের অন্যতম মূল 'গল্প-রেখা'।

এই গল্পগুলো আমার বাল্য-বেলার যাপিত জীবনে দেখা জীবন থেকে নেয়া। গল্পগুলো গ্রামীণ জীবনের গভীরে প্রোথিত মনে হতে পারে কারও কাছে। যারা শুরুর এই গল্পগুলো পড়েছেন তাদের সিংহভাগই মনে করেছেন--এ গল্পগুলোর মধ্যে আমার বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির প্রকাশ রয়েছে। তাদের কাছে একেবারে কথিত ঝাঁকুনি ধরনের মনে হয়েছে। আমার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে যে বোধ আমি অনুভব করেছি সেই জীবনবোধ থেকেই সে-সব লিখেছি। প্রাণের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এ-আমার গল্প। কোনও বানানো বিষয় নেই, পাতানো বিষয় নেই, আরোপিত কিছু নেই।

আমি নিজে যেমন একজন গ্রামের মানুষ, আমার লেখা গল্পের মানুষগুলো তাই--প্রান্তিক মানুষই। তারা শাপলা তুলতে যায়, বয়স মানে না; খুব বুড়ো হলেও যায় বা যেতে হয়। এই বুড়ো মানুষটিই একদিন দেখে রাজাকারের যে লাশটি খালে ভাসছে তার পরনে এমন লুঙ্গি যা সে কোনোদিনও কল্পনা করতে পারে না। অর্থাৎ দামী। তার পরনের লুঙ্গি ছিঁড়ে প্রায় ঝাঁজরা, নৌকা বাইচের সময় ছোট্ট নাতিরা তার পুরুষ অর্গান দেখা যায় বলে এর আগে রসিকতা করেছে। একদিন একটি লাশের পরনে থাকা সে পেলেকার্ড লুঙ্গি পেয়েছিল। একদম শেষে এসেই বোঝা যায় এই গল্পটি আসলে মুক্তিযুদ্ধের গল্প। শুরুর কোথাও সেই ইঙ্গিত ছিল না। সম্ভবত আমার লেখার সেটা একটা দিক যে বোঝার কোনও উপায় থাকবে না যে কোথায় মোচড়টা থাকতে পারে।

'ফুরফু্রি ও সিকুর নির্দোষ কবুতরের মাংস' নামের গল্পটিতেও কেবল মানুষ এসেছে। যেন আর কোনও কিছু নয়। গোত্রহীন মানুষ। মানবেতর জীবন-যাপনের ফসল। এই জীবন-যাপনের মধ্যে দিয়ে আমি এসেছি। বাংলাদেশে কী উপমহাদেশে- প্রায় প্রতিটি দেশের চিত্রই এমন। আমি কেবল তার বিচ্ছিন্ন অংশের বর্ণনা বা বিবরণী দিয়ে গেছি। তেমন কোনও ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ দিতে চাইনি। কাহিনীটি বলার ক্ষেত্রে আমার কোনও উদ্দেশ্য নেই। নেই খ্যাতির উদ্দেশ্য। যৌন তাড়না থেকে উদ্ভূত কোনও সংযোগ স্থাপনের উদ্দেশ্য থেকেও লিখিনি। তাই আমাকে গল্প লেখার জন্য জোরপূর্বক কিছু করতে হয় না। শুধু বলে যাওয়া। যা আমার উপলব্ধিতে এবং অনুভূতিতে আছে তাই শব্দে বাক্যে বর্ণনা করা। ফলে গল্প 'লিখতে' হয়নি, গল্প পাতাতে হয়নি, গল্প বানাতে হয়নি, গল্প আরোপ করতেও হয়নি। এসব না করেও যদি তা গল্পের মধ্যে (শিল্প বিচারে) পড়ে তবে ধরে নিতে হবে আমার বলার ভঙ্গি বা ক্ষমতা বা ধরনটির একটি ক্ষমতা হয়তো থাকতে পারে। এটাই আমার এই প্রসঙ্গে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বলতে চাচ্ছি।


কুলদা রায় :৩/ 
গল্প লেখার জন্য কি প্রস্তুতি নিয়েছেন? নিলে সেগুলো কেমন?

আনোয়ার শাহাদাত :৩/
না। গল্প লেখার জন্য কোনও প্রস্তুতি নেইনি। আমি বিশ্বাস করি না গল্প লিখতে হলে প্রস্তুতি নেওয়ার দরকার আছে। আমি গ্রাম-জীবনের মানুষ। সেই গ্রামের মানুষদের কথা বলতে চেয়েছি। সে জীবনের অভিজ্ঞতাটা আমার মধ্যে আছে। আমার পূর্বপুরুষের কাছ থেকেও তাই পেয়েছি। সুতরাং আমি বাল্যকাল থেকেই দেখেছি- আমার চারিপাশের সবার জীবনই আসলে গল্প। আমি আমার মত করে লিখেছি বলে তার আলাদা একটা আবেদন বা উৎকর্ষতা তৈরি হতে পারে। সে জন্য আমার কোনও প্রস্তুতি নিতে হয়নি। বরং কোনও শিল্পের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রস্তুতি একেবারে অপ্রাসঙ্গিক মনে হয় আমার কাছে।

একজন চাষির (এক্ষেত্রে ভূমিহীন কী অন্যরা, যারাই আমার ওই জীবন সংস্কৃতির অংশ) সঙ্গে যখন কথা হয়, সে যে-গল্পটি তখন আমাকে বলে, তা গল্প নয়, আমিও তা গল্প হিসেবে দেখি না বা সে অন্যকে, কিংবা তার বউকে বা বউ যখন তার সঙ্গীকে কিছু বলছে অথবা হালিয়া (হেলে চাষা) যখন কাউকে না পেয়ে তার হালের গরুটিকে বলছে; তখন সেইসব কথা শুনে মনে হয়েছ সেই চাষিটি অসাধারণ সব গল্পই বলেছেন। এই অংশটা বলি, হালিয়া তার ডান হালের বলদটিকে উদ্দেশ্য করে বলছে- এই মাতবরের ফো মাতবর, আল (হাল) ছাইর‍্যা দিমু, সোজা আইল ধইর‍্যা, কান্দি বাইয়া, গরু ঘরে যাবা। আটবার (হাটবার) কালে ডাইনে বায় চাবা (চাওয়া/তাকানো) না ফজুর ক্ষেতের দিক চউক (চোখ দেয়া) দেছও কি ছোবা (ছোবল) দেছও তো জিবরা (জিব্বা) ছ্যাইচ্যা হালামু। চারিতে কুডা আছে, মুই আইয়া খইর আর ফ্যান দিমু... আমার কাছে এটাও গল্প, হালিয়ার হালের বলদের সঙ্গে কথোপকথনের গল্প। এটা লিখতে যদি প্রস্তুতি নিতে হয় তবে বলব সে গল্প আমি লিখিনি।

তখন ওই গল্পের গল্পকার; তিনি হতে পারেন অশিক্ষিত, স্বল্প শিক্ষিত, কিন্তু গল্পটি যখন বলছেন তখন তা কিন্তু আর অশিক্ষিতদের মত থাকছে না।

ধরা যাক, প্রচলিত এই গল্পটি- আগিলা (পুরনো দিনে) কালে শকুন আর বাজপাখি ছিল দোস্ত বা বোন্দে। দুই-দোস্তে একে অপরকে ডাকতো ‘হইয়া’। তারা একসঙ্গে থাকত, চলত, খেতও। বাজপাখির চোখ ছিল খুব ভাল। সবকিছু দেখতে পেত সহসা, উনচল্লিশ হাত পানির নিচ পর্যন্ত দেখতে পেত। আর শকুন তার চোখে দেখত সবকিছু ঝাপসা। একদিন দুই-বোন্দে সুস্বাদু এক খাবার খাওয়া শুরু করে, কিন্তু ঝাপসা চোখে শকুন ভাল করে খেতে পারছিল না। সে সত্য-কালের কথা- শকুন তার বোন্দে বাজপাখিকে বলে, ‘দোস্ত, চক্ষেতে বালো কইর‍্যা দেখতে পারি না, খাইতে অসুবিদা, তোমার চউখটা একটু ধার দেও, খাওন শেষে দিয়া দিমু।’ কথা মতোন বাজপাখি তার চোখ দেয় প্রাণের বন্ধু শকুনকে। নিরিবিলি সময় তখন, ক্লান্ত বাজপাখি বোন্দের পাশে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম থেকে জেগে দেখে প্রাণের বোন্দে চলে গেছে দূর পাহাড়ের দেশে। সে আগিলা কালের কথা, আজও ফেরেনি শকুন দোস্তের কাছে, তাকে ফেরত দেয়নি সেই চোখ। তাই বাজপাখি গভীর রাতে দুঃখে বন্ধুকে স্মরণ করে, সময় পেলে বোন্দে শকুনকে উদ্দেশ্য করে ডেকে ওঠে- কু-হু, কু-কু’ ..., আহ্ আহ্-রে দোস্ত চোউখটা দিয়া গেলা না,আহ্ আহ্-রে দোস্তো।

আমি এখনো আজ এত বছর পরও এই গল্পটির ব্যক্তিকরণ (পারসনিফাই) করে ফেলি অগোচরে, দেখি দুই বন্ধু (পাখি প্রজাতির এই দুটো প্রাণী যে বন্ধু তা বিশ্বাস হচ্ছে কেন?) চোখ বিনিময় করলেও তার পরিণতিতে আমার এক খারাপলাগা অনুভূত হয়। এই গল্পটি তো ম্যাজিক্যাল রিয়ালিজমের অসামান্য উদাহরণ। যিনি বলেছেন, তিনি চাষি। তিনি কেন তার চৌদ্দ-পুরুষের কেউ ম্যাজিক্যাল রিয়ালিজমের নাম শোনেননি। কিন্তু গল্পটি যিনি বাংলা সংস্কৃতি উপযোগী করে রচনা করেছেন তা কিন্তু না জেনেই করেছেন। কিছু না জেনেই যে রচনাটি করেছেন সেটা কি প্রস্তুতি নেওয়া লেখকের চেয়ে কোনও অংশে কম? তো, আমি তাদের গল্পটিই বলছি। তাদের মধ্যে যেভাবে গল্পগুলো ছিল, আছে বা হয়ে উঠেছিল বা উঠবে, ঠিক সে রকম করেই আমার নিজস্ব ভাবনায় যেমন মনে হয় তেমন করেই বলতে চেয়েছি। তাতে কোনও প্রস্তুতির প্রসঙ্গ অবান্তর।


কুলদা রায় :৪/
আপনি কি নির্দিষ্ট কোনও পাঠক-গোষ্ঠীকে মাথায় রেখে লেখেন? 

আনোয়ার শাহাদাত : ৪/ 
 এর চেয়ে আর কোনও সুন্দর প্রশ্ন হতে পারে না! উত্তর হল- না, কোনও পাঠক গোষ্ঠী মাথায় রেখে লিখি না। এ বিষয়ে আর একটু বলতে ইচ্ছে করছে। এমন একটা ধারণা সারা দুনিয়াতেই আছে। পাঠক ও বাণিজ্য। এই নিয়ে পরে বলছি।

কোনো লেখকেরই নির্দিষ্ট কোনও পাঠক গোষ্ঠী থাকা উচিত নয়। তার নিজস্ব পাঠক গোষ্ঠী থাকলে তাদের খুশি করার একটা ব্যাপার কাজ করে। পাঠকের ইচ্ছায় তখন লেখক লিখে থাকেন। লেখকের নিজের ইচ্ছেটি আর তখন থাকে না। ফলে সেটা হয় ইচ্ছে পূরণের লেখা। যদিও এর আগে লেখকই আবার ওই পাঠক গোষ্ঠী নির্মাণে প্রতিশ্রুত থাকেন। ফলে এটা এক ধরনের দ্বিপাক্ষিক শিল্পহীন সাহিত্য বাণিজ্যের নমুনা। কোনও পাঠক গোষ্ঠীকে মাথায় রেখে লিখলে সেটা কোনওভাবেই আর প্রকৃত সাহিত্য হয় না। যদি-বা তার প্রিয়তা তৈরি হতে পারে। সাহিত্য বিচারে তার কোনও মূল্য নেই। পাঠক "খাবে" মাথায় রেখে লেখক লিখেছে। ফলে ওই লেখার মূল সততা বা আন্তরিকতাটা হারিয়েছে তা সৃষ্টির আগেই। এটা যদি জীবনের অংশ হয়, দরদের অংশ হয়, তাহলে শ্রেষ্ঠত্ব তৈরি হতেই পারে। কিন্তু এর বদলে সাহিত্যটা শিল্প বিচারে 'শ্রেষ্ঠত্বে' বা উত্তীর্ণতার জায়গা থেকে সরে গিয়েছে। আরবানাইজড হয়ে পড়ছে।

আমি কারও জন্য লিখি না। যদি কেউ পড়ে- তাহলে আমি খুশি। কিন্তু তাকে পড়ানোর জন্য আমি লিখিনি। কোনোদিন লিখবও না।

ধরা যাক আমার গল্পগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব (বিনয়ের সঙ্গে বলে নিচ্ছি, যদি তা থেকে থাকে)- এটা কিন্তু গভীরতর একটা বিষয়, কেউ যদি এই শ্রেষ্ঠত্বের জায়গাগুলো খুঁজে দেখতে চায়, তাহলে বলা যাবে শ্রেষ্ঠতর কিছু একটা আছে যে, যেটা অগোচরে ঘটেছে---ওটা আপনি পড়লে বুঝবেন যে, আপনি যখন লিখছেন তখন আপনার মাথায় কোনোও পাঠক শ্রেণী নেই। যদি থেকে থাকে তাহলে এমন এক পাঠক শ্রেণী আছে যারা, বা যাদেরকে আমি জানি না, আমার লেখার তখন একমাত্র পাঠককে আমি চিনি সে হচ্ছে আমি। অর্থাৎ সেই জেনে আমি আমাকেই লিখেছি, আমার জন্য, আর কিছু নয়। এই যে একজন লেখকের মাথায় পাঠক শ্রেণী না থাকা; সেটি-ই একটি গল্পের শ্রেষ্ঠত্বের প্রথম ঘটনা ঘটিয়ে দেয়া। এটি একটি গল্পের প্রথম ও প্রধান শক্তি বলে বিবেচিত হবে।

দু'চারজন এ ধরনের আন্তরিক গল্প লিখেছেন বলে আমার মনে হয়েছে। সে লেখকরা সৎভাবে লিখেছেন। কোনো ধান্ধা থেকে লিখেছেন বলে আমার মনে হয়নি। সেই নিয়মে লেখাগুলো দীর্ঘায়ূ হবে বলে ধারনা করা যেতে পারে।

গল্পের মধ্যে যখন আমি গল্পকারকে দেখতে পাই, যখন বুঝতে পারি গল্পকার বেশ কসরত করছেন নিজের বদনখানি নিজের গল্পটির মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে- তখন আমি তা আর পড়ি না। পড়বার দরকারও পড়েনা। আমার লেখা গল্প পড়ে কোনো নির্ধারিত মহিলা মূর্ছা যাবে, সেই কথা মাথায় রেখে আমার লেখা নয়। আমি আমার নিজের গল্পই বলি। কিন্তু লেখার সময় মনে রাখি না এ লেখাগুলি কোনো পাঠক গোষ্ঠী পড়বে। সেটা দরকার নেই। কিন্তু পড়বে- সেটা তো ঠিক আছে। না হলে লিখি কেন? কিন্তু আমি জানি না তারা কারা। তারা পড়ে আরাম পাবে কিনা, খুশি হবে কিনা- এটা ভেবে লিখলে লেখককে লেখক নিজ হাতে অ-লেখক করে দেন। আসলে অলেখক শব্দের বদলে 'কু-লেখক' হবে উত্তম প্রকাশ।


কুলদা রায় :৫/ 
আরেকটু বিস্তারিত বলেন-

আনোয়ার শাহাদাত :৫/ 
বাংলা (দেশ +পশ্চিমবঙ্গ) সাহিত্যের আর্বানাইজেশন একটা প্রধান শর্ত! আমি ভাবি এটা একটা মাইজভাণ্ডারী বা ধরুন আটরশীর জেকের-এর মতন কিছু (যথাযথ শ্রদ্ধা রেখে বলা হচ্ছে)। আমাদের একটি জেকের গোষ্ঠী (কমিউনিটি) তৈরি হয়। ওই জেকের কমিউনিটির কাছে পৌঁছাবার জন্য আমরা জেকের কমিউনিটি উপযোগী লেখা লিখে থাকি । এটাকে আমি আর্বানাইজেশন বলছি। তাহলে আপনি যদি আমাকে প্রশ্ন করেন, আপনার ভাষায় 'জেকের কমিউনিটির' জন্য আপনি লিখে থাকেন না? উত্তর হল- না, যদি তেমনটি কোথাও হয়ে থাকে (আমার লেখা গবেষণা করে যেতে পারে, বলব) তাহলে সেই জ্ঞান আমার মধ্যে অগোচরে ঢুকে পড়েছে। কিন্তু আমি ঐ জ্ঞানের বাইরে থাকতে চাই। আমি ঐ জ্ঞানের বাইরের লোক। আমার কোনও জেকের কমিউনিটি থাকবে না। আমার যা মনে হয়েছে আমি তাই লিখেছি। এবং যে কারণে- আপনি একদম গবেষণা হিসাবে নিতে পারেন (আবারো বললাম) , আমার টোটাল গল্প হবে ২২টি। এই ২২টি গল্পের একটি গল্প পড়েও যদি আপনার মনে হয় যে আমি কোথাও পৌঁছাতে চাচ্ছি (বিশেষ পাঠক গোষ্ঠী হিসাবে), তখন আমি এটা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হব। দুঃখ প্রকাশ করব যে- না, আমার লেখার ভিতরে আর্বানাইজেশনের বা জেকের বা ভাণ্ডারী ধরনের সাহিত্য গোষ্ঠীর নিকট পৌঁছাতে চাওয়া আছে।

এটা নেই। কোনো একটি কমিউনিটিকে রিচ করতে চাওয়া আমার ভেতরে নাই। বরং আমি জানিই না যে কোনো রকম কমিউনিটি বোধ আমার মধ্যে আছে (এক্সিস্ট) কিনা। এবং আমার চর্চার মধ্যেও তা নাই। আমি ২২ বছর আগে এই দেশে (ইউ.এস.এ.) আসার পর গল্প লেখা শুরু করেছি। এরমধ্যে বাংলাদেশে অন্তত ৬০-৭০ দিন থেকেছি। এর মধ্যে যে সব লেখকের সঙ্গে দেখা হয়েছে যদি গুনে দেখি তাহলে দেখা যাবে, তাদের সংখ্যা অতি নগণ্য। হাতে গোনা বলা যায়। এই-ই হচ্ছে আমার সমগ্র 'লেখক জীবন'।

কিন্তু তাতে কি আপনি আমাকে লেখক হিসেবে গ্রহণ করছেন না? না, আসলে করছেন না। আমাকে গ্রহণ করছেন না। গ্রহণ করছেন গল্পকারকে, যদি গ্রহণ করে থাকেন তবে গ্রহণ করছেন ব্যক্তি আনোয়ার শাহাদাতের বদলে লেখক আনোয়ার শাহাদাতকে। গল্পের কারণেই গল্পকারকে গ্রহণ করছেন। ফলে গল্পের সঙ্গে জেকের কমিটি বা আরবানাইজেশনের কোনো সম্পর্ক নেই।

কিন্তু আমাদের প্রথাগত প্রতিযোগিতার দৌঁড়ে এটি প্রবল। এটা আমার মতে এমন কোনও ভাল কিছু নয়। আমি কার্যত মনে করি বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে যে- এখনো পর্যন্ত যত লোক সাহিত্য করতে আসে, তাদের মধ্যে একটি লোককে খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি সাহিত্য-নগরায়নের (লিটেরারি আরবানাইজেশন) চূড়ান্ত জায়গায় যেতে চায় না। আরও স্পষ্ট করে বলা যায়- আহসান হাবীব থেকে সাজ্জাদ শরীফ পর্যন্ত সবাই এই আর্বানাইজেশন ঘরানার লেখক। আহসান হাবীব যখন গ্রাম থেকে আসেন তখন হয়তো সামাজিক বাস্তবতার কারণে তাকে অভিজাত'দের (আর্থিক অর্থেও) সঙ্গে পাল্লা দিয়েই বসবাস করেতে হয়, এবং করেন। তার অর্থ হচ্ছে যে—এটাকে আমি দোষের মনে করছি কিনা ? না, এটাকে আমি দোষের দেখি না। কিন্তু এটা একটা লক্ষণ (০ক্রাইটেরিয়া)। সেভাবেই আমাদের সাহিত্য চলে আসছে। সাহিত্য-নগরায়ন বাংলা সাহিত্যে এখন একটি বিল্ট-ইন, ডিফল্ট (সহজাত, যথারীতি?) উপসর্গ। তাহলে এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করতে পারেন- আমি (আনোয়ার শাহাদাত) সেই চেষ্টা করিনি? না । জ্ঞাতসারে নয়। আমি একটি গল্পও সে রকম করে লিখিনি।

এর অবশ্য আর একটা ব্যাখ্যা আমার আছে। তা হলো আমার লেখা শুরু করার আগেই আমি আমেরিকায় এসেছি। ফলে স্বভূমিতে থেকে সাহিত্য করে যে সব উত্তরনঃ অটোগ্রাফ, ভক্ত, নারী প্রকাশ্য ভক্ত, নারী গোপন ভক্ত কী বহুবিধ 'পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া' আমার ক্ষেত্রে অপ্রযোজ্য। আমি প্রথম কারো দেখা পেলাম ২০০৩/৪ এ হবে। একটি মেয়ে যিনি স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটিতে পিইএচডি করছিলেন তিনি আমাকে আমার গল্প'র মাধ্যমে চেনেন বলে জানিয়েছিলেন। অর্থাৎ আমার প্রথম গল্প লেখা ৯৩ সালে কি ৯৪ সালে। ছাপা হওয়ার প্রায় দশ বছর পর প্রথম কোনো পাঠক পেলাম। তখন ঠিকানা পত্রিকার সম্পাদক (মালেক ভাই) একটি অনুষ্ঠানে বললেন, আনোয়ার, অনেক দিন আগ থেকে আপনাকে একজন খুঁজছে। কিন্তু আপনার সঙ্গে দেখা হয়না বলে তার সঙ্গে পরিচয় করানো যায়নি। তিনি (সেই মহিলা) বললেন, আপনার নাম বললে দেখি অনেক লোক চেনে। কিন্তু আমি যখন আপনাকে গল্পকার বলি তখন তারা মনে করে আমি অন্য-লোকের সঙ্গে আপনাকে মিলিয়ে ফেলেছি। আমি সেই প্রসঙ্গে তাকে জানালাম যে, এর কারণ, আমি গল্পকার হিসাবে কোথাও যাই না। ফলে খ্যাতির দিক থেকে ওই জাতীয় উত্তরণের সঙ্গে আমার সাহিত্য লেখার কোনো সম্পর্ক নেই।

সাহিত্যিক যখন তার লেখার খ্যাতি ও পরিচিতি নিয়ে জীবন করেন তখন তিনি আর নির্ভেজাল লেখক থাকতে পারেন কিনা সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ থাকে। একটা উদাহরণ দেই। ওই লেখকরা দেখবেন খুব করে বলছেন যে আমাদের রাজনীতিকরা চাটুকার পরিবেষ্টিত থাকে বলে তারা সত্যিটাকে জানতে পারে না। কথাটা যদি রাজনৈতিকদের জন্য খাটে তবে লেখকদের জন্য খাটবে না কেন? ঘটনা তো একই।

আমার ব্যক্তিগত উত্তরণ যদি বলা হয় তাহলে এটা আসলে উন্নতির উত্তরণ নয়, এটাকে বলা যায় রূপান্তর। স্থানান্তর । আমার স্থানান্তরের সঙ্গে অথবা জীবনবোধের সঙ্গে আমার সাহিত্যের কোনো সম্পর্ক নাই। কিন্তু অন্য সকলের ক্ষেত্রে এ রকম ঘটে।


কুলদা রায় :৬/
অর্থাৎ আপনি যেটা বলছেন তার অর্থ এইও দাঁড়ায়- আপনি যে গ্রাম জীবনটা যাপন করে এসেছেন, সেই গ্রাম জীবনটা দেখা, গ্রাম জীবনের একজন হয়ে ওঠা, হয়ে থাকা- এগুলোর মধ্যে বাইরের কোনো জিনিস প্রযুক্ত হয় নাই। এখনো পর্যন্ত সেখানেই আছেন। এর মধ্যে আপনি যা বলছেন বা লিখছেন তাতে আপনি কিছু আরোপ করতে চান না, ম্যানিপুলেট করতে চাচ্ছেন না। হুবহু সেই জিনিসটাই আপনি রাখতে চান।

আনোয়ার শাহাদাত :৬/
আমার সর্বত্র এই 'র' ব্যাপারটাই থাকে। সেটা আমার ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে আমার যে কোনো লেখালেখিত- সবই 'র'। আমি কিছু সংগঠিত বা গোছাই না (ম্যানিপুলেট)। আবার এটা এও নয় যে আমি একেবারে পরিকল্পিতভাবে বা অমুক করে তমুক করে বা সিনসিয়রিটি দেখাবার জন্য আমার লেখার মধ্যে দিয়ে আমার দেখা জগৎটাকে পালটে দিতে চাই। আমার লেখার কোনও উদ্দেশ্য নেই। কোনও কমিটমেন্ট থেকেও আমি লিখি না। আমি যাই লিখি না কেন সেটা থেকে এই ব্যাপারটা বিচার (জাজ) করা যাবে, বোঝা যাবে- আমি কে? ফলে আর্বানাইজেশনের সঙ্গে ব্যক্তি আমার কোনো সম্পর্ক তৈরি হয়নি। কিন্তু আমি আর্বানাইজেশন জিনিসটা কী তা কি জানি না? যতটা একজন মানুষের জানা দরকার আমি ততটুকু তো জানিই, বরং কিছুটা বেশিই জানি বলা যায়। তার অর্থ এই নয় যে আমার সাহিত্যের (শিল্পকর্ম অর্থে) সঙ্গে আর্বানাইজেশনের সম্বন্ধ করেছি।


কুলদা রায়:৭/ 
তার মানে আপনি এই কথাটিও বলতে চাচ্ছেন যে, যখন আপনার একটা গল্প পড়া হচ্ছে--কোনও একজন পাঠক পড়ছেন তখন সেই গল্পের মধ্যে পাঠক ব্যক্তি আনোয়ার শাহাদাতকে খুঁজে পাচ্ছেন না। পাওয়া যাচ্ছে ‘সাঁজোয়া তলে মুরগা’র উপন্যাসের আব্দুল আজিজকে অথবা কাদম্বরী বিবির গামছা কবরের কাজেম আলি নামের মানুষদেরকে। কাজেম আলি নামে চাষা লোকটা তার পোটলার মধ্যে থেকে কাঁসার চকচকে গ্লাসটা বের করছেন, বৌয়ের বানিয়ে দেওয়া শক্ত রুটি বের করছেন। একদলা গুড় বের করে খাচ্ছেন। নিজের গামছা পেতে বিখ্যাত গল্পকারের ড্রয়িং রুমে বসেছেন। তিনি জানেন তিনি লোকটি কে। তিনি এসেছেন গ্রাম থেকে। লেখককে মুগ্ধ করতে নয়। লেখকের করুণা পেতেও নয়। সমাদর পেতেও নয়। লেখকের কাছ থেকে আদায় করতেও নয়। এসেছেন তার এলাকার একটি সত্যি ঘটনাকে লেখককে বলতে। তার এলাকার এক শিক্ষক মনে করেছেন—গল্পটি পেলে বিখ্যাত লেখক লিখতে পারবেন। সত্যি ঘটনাটি লেখা হয়ে থাকবে। হারিয়ে যাবে না। যে রকম করে এই কাজেম আলি ব্যক্তিগত জীবনযাপন করেন ঠিক তেমনি করেই আপনি গল্পে তাকে উপস্থাপন করছেন। উপস্থাপন করছেন বিখ্যাত লেখকের স্ত্রীর বাসি খাবার দেওয়ার ঘটনাটিও। আর মধ্যে আপনার কোনো কথা নেই। নেই বানানো ঘটনা। কোনো মতামতও আপনি দিচ্ছেন না। কোনো কিছু আরোপ করছেন না। এই বিষয়গুলোই আপনার গল্পের বৈশিষ্ট্য। আপনি সচেতনভাবে গল্পের মধ্যে কোনো আর্বানাইজেশন করেননি।

আনোয়ার শাহাদাত :৭/ 
আমার ভেতরে আর্বানাইজেশন ঢোকার দরকার পড়ে না। যারা এটা করে থাকেন—তারা তাদের পাঠক গোষ্ঠীকে মাথায় রেখেই আর্বানাইজেশনটা করেন, করা ছাড়া উপায় থাকে না। কারণ পাঠকে তিনি কিছু "খাওয়াতে" চান। বলবার সময় বলেনও ওই ভাষায় যে "পাঠক খাইছে"। পাঠক যা খেতে চায় ও যা খাওয়ায় অভ্যস্ত তা তিনি পরিমাপ করে পাঠকের রুচি মত তার গল্প বা সাহিত্য কর্ম পরিবেশন করেন। এতে পাঠকের কাছে তার নাম হয়। বিক্রিবাটা বাড়ে। টাকাকড়ি আসে। অর্থাৎ আর্বানাইজেশনের যে প্রাপ্তিটা একজন লেখক পাওয়ার চেষ্টা করেন- আমার সেটা লাগে না। আমি ব্যক্তিগতভাবে এ সকলের ঊর্ধ্বে।

যেমন ধরেন আমার খ্যাতি প্রীতি নাই। আমার পুরস্কার প্রীতি নাই। আমি কোনো সাহিত্য-সংস্কৃতির কোনো অনুষ্ঠানে যাই না। আমি জানি ওগুলো কিন্তু আর্বানাইজেশনের একটা পার্ট।

আমার কদমবিবির গামছা কবরের কাজেম আলী নামের গ্রাম থেকে আসা লোকটি তার জীবনে এমন একটা জায়গায় গেছেন, যেখানে গেছেন—সেটা কোনো সমাবেশের মত নয়। যদি সে সমাবেশেও যেত তাহলেও তিনি ওই সমাবেশের কোনো সাংগঠনিক অংশ হয়ে নয়—স্বাভাবিক অংশ হয়েই যেতেন। ফলে আর্বানাইজেশনের যা সাংগঠনিক প্রথা এবং প্রক্রিয়া সেটি হচ্ছে সাহিত্যের জন্য একটা উপদ্রব ধরনের (ডিস্টার্বিং) ব্যাপার। সেটার খপ্পরে পড়লেই স্বাভাবিকতাটা নষ্ট হয়ে যায়। কাজেম আলী আর কাজেম আলী থাকেন না। তার বদলে একজন 'গড়' মানুষে পরিণত হয়। ফলে আমরা সাহিত্যে আর প্রকৃত চরিত্রদের পাইনা । পাই এমনসব চরিত্র যা আসলে ওই একদল 'সামাজিক-লেখক'। এদের মধ্যে লেখক নামের একজন 'ভাঁড়'ই চরিত্র হয়ে ওঠে । চরিত্র ভাঁড়ামি পূর্ণতায়-ভরা। পেছনে লেখক। লেখক 'ভাঁড়'। লেখকের ভাঁড়ামি...। এই 'ভাঁড়' তার নির্ধারিত পাঠকদের বা সমগোত্রীয়দের খুশি করতে চাইছেন। 'ভাঁড়'এর কাজই তো তার 'ক্লায়েন্ট'দের (এ ক্ষেত্রে পাঠক) খুশি করা। বাংলা সাহিত্যে দুঃখজনক হলেও সত্যি যে এই ঘটনাই ঘটছে। এটিকেই মান (স্ট্যান্ডার্ড) বলে মেনে নেওয়া হচ্ছে (অধিকাংশ ক্ষেত্রে) কিন্তু আমি ঐ স্ট্যান্ডার্ডের বাইরে অবস্থান করি বা করতে চাই। এবং মনে করি তাতে আমার গল্পের বা শিল্প কর্মের কোনো ক্ষতি নাই। ক্ষতি যদি হয় তবে তা আমার, ব্যক্তির, ব্যক্তি আমার। তার সঙ্গে আমার লেখক সত্তার সম্পর্ক নেই।


কুলদা রায়:৮/ 
এখান থেকে আর্বানাইজেশনটাকে আরো ডিফাইন করতে চাচ্ছি। এই আর্বানাইজেশনটাকে আপনি আপনার কথার মধ্যে দিয়ে বলছেন—আর্বানাইজেশনটা হল এক ধরনের বাইরে থেকে আরোপ করা চিন্তা, 'র' জিনিসটাকে ম্যানিপুলেট করে ফাইন প্রোডাক্ট হিসেবে নির্মাণ করা।

আনোয়ার শাহাদাত :৮/
জী, কোনো না কোনো ভাবে কৃত্রিমতার সঙ্গে সম্বন্ধ করা।


কুলদা রায় : ৯/
তার মধ্যে দিয়ে একটা জায়গায় রিচ করা। আপনি বলছেন এই রিচ করাটাও এক ধরনের আর্বানাইজেশন। একটা সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকতে হবে-সেই উদ্দেশ্যের দিকে গল্পটাকে ঠেলে দেওয়া। সেই উদ্দেশ্য থেকে কিছু প্রাপ্তিযোগ পাওয়া। যেমন খ্যাতি, সম্মান, অর্থ ইত্যাদি।

আনোয়ার শাহাদাত :৯/
প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। চেয়ারে বসা। মঞ্চে দাঁড়ানো। সভাপতিত্ব করা। অতিথি হওয়া। ডাক পাওয়া। আরো কত কী। আমি এর সব জানি না যেহেতু আমি তার অংশ নই তাই বাকী সব জানি না কী ধরনের লাভ তারা হাতড়ায়!

আমার সরোজিনী কদমবিবির গামছা কবর গল্পে দুজন গল্পকার ছিলেন। ক্যানভেসার গল্পকার গল্পে একজন গল্পকার। কদমবিবির গামছা কবরের দুজনের একজন বাংলা সাহিত্যের প্রধান গল্পকার। আরেক জন তাকে একটি গল্প দেবেন বলে তার কাছে গেছেন। তিনিও গল্পকার, তার সে পরিচয়ের কথা কোথাও বলা হচ্ছে না। যদি কোনো পাঠক সেটা না বোঝেন তার জন্য ওই গল্প লেখা হয়নি। সেখানে বাংলা সাহিত্যের প্রধান গল্পকারের বৌয়ের সোনা গয়নার এবং আমেরিকা বেড়ানো পর্যন্ত আছে। কিন্তু গ্রাম থেকে আসা গল্পকারের কিছুই নাই। এই দুই গল্পকারের মধ্যে এই গ্রাম থেকে আসা গল্পকারই কিন্তু সেরা থেকে গেছেন। গ্রামের গল্পকারের গল্পটি শুনে পপুলার গল্পকার অন্তত দশবার অভিভূত হয়েছেন। গল্পের শেষদিকে গ্রামের গল্পকার গ্রামে ফিরে যাওয়ার সময়ে ভুল করে জনপ্রিয় গল্পকারের বাসায় জুতো ফেলে রেখে গেছেন (হয়তো, যেহেতু তার অভ্যাসে জুতা পরিধান কোনো বিষয় নয়, স্বভাবতই সেটা ঘটবার কথা) । তার সেই জুতো নিয়ে পেছনে পেছনে দৌড়াচ্ছেন পপুলার গল্পকার। গ্রামের গল্পকারটির এই জুতো নিয়ে ছুটে চলার মধ্যে দিয়ে পপুলার গল্পকার ওইখানে অন্তত সৎ থেকেছেন (সেটিও লেখকেরই সৃষ্ট!) । তিনি বুঝতে পারছেন তিনি এতো কাল যা কিছু লিখেছেন তা সবই কৃত্রিম। আর প্রকৃত গল্পকার হলেন ঐ গ্রামের লোকটি (এ কথা খোলাসা করে গল্পে বলা নেই) । লোকটি জীবনে কিছুই লেখেননি। লিখতে জানেনও না। তিনি তার নিজের জীবনের মধ্যে আছেন। অথচ 'জনপ্রিয়' কৃত্রিম গল্পের জগতের কারণে অনেক পিছনে পড়ে আছেন। এই পপুলার লেখালেখির খাস (নেট) অর্জনটা হল সবশেষ অভাঁড়ামী পুর্ন সততা যে তিনি ওই গ্রামীণ গল্পকারের জুতো জোড়া পৌছে দিতে চাচ্ছেন। প্রকৃত অর্থে তার ওই সাময়িক সৃষ্ট সৎ জগতে এর বেশী কিছু আর করার নেই। তিনি অর্থহীন। সেটা উপলব্ধিতে এসেছে বলেই গ্রামের গল্পকারের ফেলে যাওয়া জুতো নিয়ে তিনি ছুটে যাচ্ছেন, নিজেকেই সন্তুষ্ট করতে চাইছেন। এই জুতোটা নিয়ে যে তিনি সেবা করতে চাচ্ছেন—ঘটনা তা নয়। তিনি একটা মানসিক যন্ত্রণায় পড়ে গেছেন। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই তিনি জুতো নিয়ে ছুটেছেন। অথচ এই লেখক এমন একটি জগতে থাকেন যেখানে পৌঁছাতে সবাই পারে না। দারোয়ানের অনুমতি নিতে হয়। দারোয়ান আবার লেখকের কাছ থেকে সেই অনুমতির জন্য অনুমতি চেয়ে নেন।

জুতোটা নিয়ে যখন তার কাছে পৌঁছেছেন তখন কিন্তু গ্রামের গল্পকার জুতো নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন না। তিনি তখনো সেই গল্পের মধ্যেই আছেন।

বলছেন, সেদিন ঢাকায় পাকবাহিনীর আক্রমণে অগণিত মানুষ মেরে ফেলার একটি অংশ থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে আক্রমণ করা হলো। শিক্ষকদের আবাসিক এলাকাও আক্রান্ত হল। তাদের গ্রামের এক ছাতা-সারানী লোকের ছেলে, যিনি আবার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, এই গল্পকার সেই গল্পটি বলছেন। সেই শিক্ষকের মা বাবা (ছাতা-সারানি-কারিগর) ঢাকায় আসছেন কারণ ছেলে বউ সন্তান সম্ভাবা। ওই গল্পের যে গ্রামীণ গল্পকার (কাজেম আলী) সে ছিল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের বাবা-মায়ের ঢাকা আসার সঙ্গী। তখনকার ইকবাল হলে (জহুরুল হক হল) পরদিন গ্রাম-গল্পকার বিদায় নিতে এসে দেখে এলাকায় লাশের পাহাড়, সবই মরে পড়ে আছে। শত মৃতদের সঙ্গে বাবা-মা (যাদেরকে সে গ্রাম থেকে সঙ্গী হয়ে ঢাকায় নিয়ে এসেছে), তাদের শিক্ষক ছেলে, ছেলের স্ত্রী-সবাই। কেউ রেহাই পায়নি। তার মধ্যেই সন্তান সম্ভাব্য মায়ের জন্ম প্রক্রিয়াটি থেমে থাকেনি। সে দেখতে পায় একটি মেয়ে সন্তান। গল্পকার কিন্তু বলছেন না মেয়েটি মৃতদের মধ্যে জীবিত না মৃত। জনপ্রিয় খ্যাতিমান লেখক যখন জুতো নিয়ে তার পিছনে পিছনে এসেছেন—তখন এই গল্পকার খ্যাত গল্পকারকে বলছে যে, মেয়েটি কিন্তু মৃত হয় নাই। জীবিত হয়েছিল। শুনে পপুলার গল্পকার পথের উপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন। তখন তার দারোয়ানরা তাকে তুলে নিয়ে যায়। কার্যত ওই পপুলার গল্পকারটি বুঝতে পারেন তার প্রতিষ্ঠিত জগতে ওই গ্রামের লোকটিই সেরা গল্পকার।

তখন তার মানে এই দাঁড়ায় যে গ্রামীণ এই লোকটি, লোকটির গল্প এর সবই হচ্ছে 'র'। লোকটি কোনো কৃত্রিমতার মধ্যে যায়নি। তার শ্রেষ্ঠতা এইখানেই। সেই দৃষ্টি ও বিচারে আমার গল্পগুলিতে সেই রকম জায়গাগুলো হয়তো আছে। যে কারণে যারা আমার গল্পকে গ্রহণ করেছেন, তার ভিত্তি হয়ত আমার গল্পের অকৃত্রিম শ্রেষ্ঠ জায়গাগুলো। কয়েকজনের নাম বলতে পারি যাদের কথা মনে আছে, শিব নারায়ণ রায়, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, আব্দুল আলী, সেলিনা হোসেন, রশিদ হায়দার, দাউদ হায়দার, জাহিদ হায়দার (অথেনটিক), সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম, হাসান আজিজুল হক... (মৌখিক)!!! ধরা যাক এরা এইসব গল্প পড়েননি অথবা পড়েছেন কিন্তু গল্পগুলোকে শিল্পোত্তীর্ন বলে গ্রহণ করেন নি। তাতে গল্পগুলোর কী ক্ষতি হল? তাতে আসলে কোনোও ক্ষতি হল না। গল্পে যা লেখা আছে, তাই আছে, তাই থাকবে!!!

এই 'সরজিনী কদমবিবির গামছা কবর'কে যদি কথিত 'পপুলারাইজড' করা হয় তবে হয়তো বাংলা সাহিত্যে এই গল্পটি নিয়ে ধারাবাহিক অনেক ডিবেট হতে পারে। এটা দুটো গল্পকারের গল্প। এবং দ্যাখেন, প্রকৃত গল্পকারের কাছে একজন পপুলার লেখক কত অবনত এবং পরাজিত। পরাজিত হয়ে পড়েছে ওই কথিত 'র' গল্পকারেরে "গল্পের সততা"র কাছে। অন্য কিছু নয়। ফলে আমার মতে "গল্পের সততা" একটি পরিভাষা যার পেছনে গল্পকার থাকেন--গ্লপের ভেতরে নয়।

হাসান আজিজুল হকের একটা গল্প আছে (দুঃখিত এত আগে পড়েছি এবং কথা বলা চর্চা-হীনতায় সব ভুলে বসে আছি) গল্পের নাম মনে নাই এবং কাহিনী মনে নেই, যদিও এখানে আমার বিশুদ্ধ গল্পের সূত্র (রেফারেন্স) মৌলিক উদ্দেশ নয় —ঐ যে মুক্তিযুদ্ধের- লোকটি খুব বড় করে গল্প করছেন যে তিনি মুক্তিযুদ্ধে গেছেন, বিরাট কিছু, ইত্যাদি। কিন্তু পড়ে গল্পসল্প করার শেষ পর্যায়ে লোকটি টের পান যে যাকে তিনি গর্বভরে মুক্তিযুদ্ধের গল্প করছেন—তার দুজন ছেলেই ছিল মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধ নায়ক, শহীদ (ওয়ার হিরো, মার্টিয়ার), তখন লোকটির খুব খারাপ লাগে। বুঝতে পারেন যে তিনি বিষয়টিতে কত বাচালতা করেছেন অথচ লোকটির ছেলে যে যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন তা কখনোই বলেছেন না। এখান থেকে আমরা গল্পের শ্রেষ্ঠত্ব জেনে নিতে পারি। অর্থাৎ ঐ লোকটি কৃত্রিম বলেই সে তার যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করাটাকে রুচিহীন ভাবে বড়াই করছে। পরিশেষে দেখলেন যে তার চেয়েও অনেক বড় বীরত্বের ঘটনা আছে যার এবং যিনি তার অংশ তিনি সেটা নিয়ে বড়াই করেন না। এগুলোই শ্রেষ্ঠ। গল্পের ও গল্পকারের শ্রেষ্ঠত্বও এই রকম।

ফলে, একজন সাহিত্যিক যখন কৃত্রিমতাকে গ্রহণ করেন বা কৃত্রিমতার সঙ্গে সম্বন্ধ করেন তখন অসম্বন্ধীয় "র" লোকটি তার পেছনে পড়ে আছে বা থাকে বলে তার তখন মনে হয়। কিন্তু পরিণামে তা নয়। ‘পরিনামে ওই ‘র’ লোকটিই এগিয়ে থাকেন। জীবনানন্দ এই গোত্রে পড়েছিলেন; অর্থাৎ আন্ডার ডগ। আমি কম বেশী "র" (কাঁচামাল?), সেই জায়গাটিতে বিচরণ করি। জীবনানন্দ জানতেন, তিনি কী লিখেছেন, কাফকা, এ্যালেন পো, জন কিটস, জানতেন তারা কী লিখছেন, জোহানেস, মোনএ' এবং ভ্যান-গ জানতেন তারা কী এঁকেছেন। আমার ক্ষেত্রেও অনেকটা তাই। দুঃখিত, ভুল বুঝবেন না, আমি এদের সঙ্গে নিজের তুলনা করছি না। শুধু বলতে চাইছি, আমি জানি আমি কী লিখেছি। "আপনাদের দোয়ার বরকতে" লিখেছি বলে এক ধরনের লেখক বাংলায় আছে আমি জানি। তার 'দোয়া-মাঙ্গা’, 'দোয়া'য় কেউ লেখক হতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি না। আমি 'দোয়ার বরকতে' লিখি নাই। দোয়ার বরকতের লেখক নই। বরং আমার চেষ্টা আছে 'দোয়ার' বাইরে থাকার। মূল আলোচনায় ফিরে যাই।

এসব মিলিয়ে এখন আপনি যদি আমাকে প্রশ্ন করেন যে আপনার গল্পের পাঠক কে? তার উত্তরে আমি বলব যে, খুব সামান্য সংখ্যক পাঠক। কিন্তু কেউ হয়তো বলবেন তাদের কোটি-কোটি পাঠক। এই স্বল্পসংখ্যক পাঠক নিয়ে কি আমি খারাপ বোধ করি? না। অন্যদের দুই তিন শত কোটি পাঠক থাকলেও আমার গল্পটির তাতে কিছুই যায় আসে না। আমার শ্রেষ্ঠত্ব নষ্ট হয় না। আমি কখনো বোধ করি না যে আমাকে গল্পকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হল কিনা? না। আমি বোধ করি না। আমার জন্য এটা কিছু নয়। স্বীকৃতি কৃত্রিম সমাজের একটা ব্যাপার।

তাহলে দেখেন বিদেশে থেকে মাটির সম্পর্কে এই রকম লেখা আর কেউ লেখেনি। বলেছিলেন দাউদ হায়দার। বলেছিলেন—নিউ ইয়র্কে থেকে লেখা একটা অলৌকিক ব্যাপার। তবে এটা কিন্তু বিশেষ কৃতিত্ব বলা ঠিক হবে না। কারণ আপনার আমার মধ্যে যদি মাটি ব্যাপারটিই মাটির মত করে থাকে, তাহলে আপনি যেখানেই যান না কেনো —আপনি আমি তো সেই মাটির বাইরে যেতে পারি না। আমাদের মাটির কথাটিই লেখা বা বলা ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না। যিনি প্রকৃত লেখক তিনি তার ভেতরে যা আছে তা লিখবেনই। আপনি চান্দে গেলেও কিন্তু এইটাই লিখবেন। তার মানে হল যে এই কৃতিত্বগুলো ফেইক, ভুয়া। এর কোনো দরকার নেই।

আমি দেশে নেই। দেশকে মিস করি, সে ধরনের কোনোও অনুভূতিকে ভর করে আমি গল্প লিখি বা লিখে থাকি তা নয়। আমার আগের গাড়িটায় একটা টেপরেকর্ডার অপশন ছিল- এই যুগে স্বভাবতই সেটা চালানো হয় না। অব্যবহৃত থাকে; ছিল অনেকদিন। একদিন বাটন টিপে দিতে দেখি একটা গান বেজে উঠল—খোলা জানালার ধারে মাথা রেখে—এই গানটি যখন শুনি তখন এই গানটার মধ্যে যে কথা বা তার শিল্পী বা আরো কী সব আছে তা আমার কাছে কোনো কিছুই নয়। আসলে এই গানটির সঙ্গে আমার সম্পর্ক থাকলে আছে আমার আত্মার সঙ্গে। কী কারণে সে সম্পর্ক আমি তা ব্যাখ্যা দিতে পারব না। তার দরকারও নেই এ-ক্ষত্রে। তাহলে কী হয় তখন? একটা অনুভূতি তৈরি হয়। সেই অনুভূতিটা আমি দেশান্তরী হয়েছি বলে নয়। কেউ যদি সেরকম ব্যাখ্যা করেন—তা ভুল হবে। আমি কিন্তু মনে করে এই ফিলিংসের সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত (কানেক্টেড)। আমার জীবনের সঙ্গে জড়িত হয়ে গেছে। এইভাবে একজন গল্পকার আলাদা। একজন গল্পকার (বা লেখক) বিদেশে থাকে, দেশ 'মিস' করে, সেজন্য লিখতে চাওয়া অনুভূত হয়, এবং কিছু লেখেন, (এই কেইস যে নেই তা বলা যাবে না), এই সব তত্ত্বের সঙ্গে আমার মেলে না।

কুলদা রায় : ১০/
আপনি বললেন—অনেকে গ্রাম নিয়ে লিখছেন কিন্তু তাদের লেখাগুলো আরবানাইজড হয়ে যাচ্ছে। এই অভিযোগটা বিষয়ে আরেকটু বিস্তারিত বলুন-

আনোয়ার শাহাদাত: ১০/
  যদি ফোকাস করতে চান-তাহলে সেটার কারণটা আমরা জানি। ধরা যাক আমার গল্পগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব (বিনয়ের সঙ্গে বলে নিচ্ছি, যদি তা থেকে থাকে) —এটা কিন্তু গভীরতর একটা বিষয়, কেউ যদি এই শ্রেষ্ঠত্বের জায়গাগুলো খুঁজে দেখতে চায়, তাহলে বলা যাবে একটি শ্রেষ্ঠতর কিছু একটা আছে যে, যেটা অগোচরে ঘটেছে---ওটা আপনি পড়লে বুঝবেন যে, আপনি যখন লিখছেন তখন আপনার মাথায় কোনোও পাঠক শ্রেণী নেই। যদি থেকে থাকে তাহলে এমন এক পাঠক শ্রেণী আছে যারা, বা যাদেরকে আমি জানি না, আমার লেখার তখন একমাত্র পাঠককে আমি চিনি সে হচ্ছে আমি। অর্থাৎ সেই জেনে আমি আমাকেই লিখেছি, আমার জন্য, আর কিছু নয়। এই যে একজন লেখকের মাথায় পাঠক শ্রেণী না থাকা; সেটি-ই একটি গল্পের শ্রেষ্ঠত্বের প্রথম ঘটনা ঘটিয়ে দেয়া। এটি একটি গল্পের প্রথম ও প্রধান শক্তি বলে বিবেচিত হবে।

কোলকাতার কথা আমি অত বিশেষ জানি না, আমি কোলকাতার লেখা খুব বেশি পড়িনি, খুব বেশি বিশ্লেষণ করার সুযোগ আমার ঘটেনি। বাংলা সাহিত্যে আহসান হাবীব থেকে শামসুর রাহমান, শামসুর রাহমান অবশ্য শহরকেন্দ্রিক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসও নগরকেন্দ্রিক কম বেশি। হাসান আজিজুল হক নগরকেন্দ্রিক। যেহেতু তাদের মাথায় কোনো না কোনো পাঠক আছে ফলে তারা ভুলতে পারেন না এই পাঠকদের কথা। হাসান আজিজুল হকের প্রতিটি লেখাই আরবান। তার অর্থ হচ্ছে যে হাসান আজিজুল হকের যে পাঠক আছে তাদেরকে তিনি জানেন। তাদেরকে খুশি করতে চান। আসলে কথাটা হবে 'পাঠক তৃপ্তি' (স্যাটিসফাই অর্থে) প্রত্যাশা করেন। অজান্তে উচ্চ শ্রেণীর গল্প-বোদ্ধা পাঠক চাহিদা মোতাবেক লিখতে বাধ্য হওয়ার কথা। আমি কিন্তু জানতাম না আমার পাঠক-শ্রেণী কে। আমি এখনো জানি না। যে কারণে আমার লেখা 'র' হয়।

ধরেন আমার গল্পগুলো খুব বেশি প্রচারিত হয়নি। ফলে পাঠক আমার গল্প পড়ার সুযোগ কম পেয়েছেন। ধরেন ঢাকা কেন্দ্রিক একজন লম্পট, লেখক-তকমায়, তার বিবাহ বহির্ভূত বালিকা বান্ধবী বা মিস্ট্রেসের হয়ে একখানা 'গপ্প' লিখছেনঃ —সুতরাং গপ্পদারের হিসাবমতে তার গোপন অনৈতিক বালিকা বন্ধুটি এই গল্পটি পড়বেন, ফলে তিনি একটা কিছু লিখছেন তার মিস্ট্রেসকে জানাতে বা ইমপ্রেস করতে। ফলে তার লেখা'র পূর্ব নির্ধারিত পাঠক ধরে তিনি লিখছেন। তা কখনো মিস্ট্রেস কী কখনো গোপন ভক্ত কী সভা সমাবেশ... ইত্যাদি সব মাথায় রেখে। ফলে একটি গপ্পের জন্ম-কল্প-জীবন যে কারণে ঘটছে তা হলো হয়তো একজন পুরুষ লেখকের মিস্ট্রেস বা অমন কিছুকে মাথায় রেখে। পাঠ পরবর্তিতে এসব উচ্ছিষ্টের প্রতিক্রিয়াটা টের পাওয়া যায়। অসব গল্প নয় বলে আমি ধরে থাকি।



কুলদা রায় :১১/
আমি বলতে চাচ্ছি যে আর্বানাইজেশন বা গ্রামীণ জীবন, ভাবনা—যাই বলি না কেনো—এই দুটোকে আপনি কি করে পার্থক্য করে নেন। আপনি ব্যক্তিগত জীবনে কোনো না কোনোভাবে আর্বানাইজড। আপনি জীবনের একটা পর্যায়ে গ্রামে থেকেছেন। ঢাকাতে পড়াশুনা করেছেন। সাংবাদিকতা করেছেন। তারপর বহুদিন আমেরিকা চলে এসেছেন। পড়াশুনার মধ্যে দিয়ে গেছেন। জানাশুনার মধ্যে দিয়ে গেছেন। আপনার চেতনা বা অভিজ্ঞানটাকে আপনি এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে গেছেন যে আপনি কোনোভাবে বাংলাদেশের কোনো মূল্যবোধকে, কোনো ঘটনাকে, বাংলাদেশের কোনো সত্যকে আর বাংলাদেশের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আর দেখেন না। আপনি এখন দেখেন একটা বৈশ্বিক চিন্তা থেকে। এটা তো আসলে, আপনি যদি কোনো না কোনোভাবে সেই গ্রামেই থেকে যেতেন, ধরা যাক সেই বাকেরগঞ্জের পাদ্রি শিবপুর গ্রামের—যেখানে আপনার জন, বেড়ে ওঠা, আমার ধারণা এই চিন্তার পরিবর্তনটা—বিকাশটা হত, অনেকের হয়, সে রকম আপনার হয়তো হত, তবে এতোটা প্রখর ভাবে হত না।

আনোয়ার শাহাদাত :১১/
আমি জানি আপনি বিনয় করছেন। আসলে সোজাভাবে বললে, চিন্তার বিকাশটা হতই না। জ্ঞান হচ্ছে একটা সংস্পর্শ। জ্ঞান হচ্ছে একটা ইন্টার‍্যাকশন । যেটার মুখোমুখি না হলে ঐ জ্ঞান আপনি পেতেন না। যে কারণে ঐটা জ্ঞান। আর্বানাইজেশনটা হল এক ধরনের কিছু এটিকেট। কতকগুলো কম্পোনেন্ট অফ স্মার্টসনেস। বা বহমান জীবনধারা। সেই জীবনধারা হচ্ছে একটা শেখার মত ব্যাপার। একটা রপ্ত করার ব্যাপার। কিন্তু এটা এক্সট্রা কোনো গুণ না। এটা হতেই পারে। অনেকে এই রপ্ত করে ফেলে খুব বেশি রকম করে। কেউ কেউ কম করে। কিন্তু যেকোনো মানুষই আসল জায়গায় আসলই থেকে যায়। ফলে আরবানাইজেশনের যে কৃত্রিম শিক্ষা সে জায়গাটায় আমার কখনো অসুবিধা হয় না। সে জন্য আমার যে 'র' জায়গাটি, যে জায়গাটিকে আমি রিপ্রেজেন্ট করি সেই জায়গাটির সঙ্গে এই জ্ঞান কোনো কন্ট্রাডিক্ট করে না। বরং, এটাকে সমৃদ্ধ করে। যে কারণে আমি কনফিডেনটলী বলে দিতে পারছি যে আর্বানাইজেশন এবং আর্বান সাহিত্য –এটা কমপ্লিটলি একটা কৃত্রিম সাহিত্য। বাংলা সাহিত্যের অধিকাংশ সাহিত্যই আর্বান সাহিত্য। যারা লেখেন তারা জানেন তাদের পাঠক কখনো গ্রামীণ জীবনের লোক নয়। এমন কি গ্রামীণ জীবনের ধরা যাক একজন হেডমাস্টারও কিন্তু গল্প পড়েন না। আপনার অভিজ্ঞতা থেকে বলুন—কয়জন হেড মাস্টার বা এমন কেউ পেয়েছেন যারা সাহিত্য পড়েছেন? মফস্বলে হয়তো একটু—হয়তো রবীন্দ্রনাথ পড়েছেন ঠেকে-ঠুকে। গ্রামের স্কুলের এই হেড মাস্টার বা সাহিত্য পড়ান যে শিক্ষক তারা তাদের চাকরির জন্য যতটুকু দরকার তার বাইরে একটুকুও পড়েন নি--পড়েন না।

কুলদা রায় :১২/
নিজের গল্প নিয়ে আপনার নিজের বিবেচনাটি কী? 

আনোয়ার শাহাদাত :১২/
আমি শ্রেষ্ঠ গল্প লিখতে পেরেছি কিনা সেটা বলব না। সেটা বলতে পারেন ক্রিটিকরা। তবে আমি ইউনিক গল্প লেখার চেষ্টা করেছি। এ ক্ষেত্রে কোনো আপোষ করিনি। আমি লিখেছি—ধরা যাক আমার একটি গল্পে খালে ভাসতে ভাসতে একজন রাজাকারের ডেড-বডি মাঝ খালে চলে এসেছে। বাংলাদেশের কোনো রাজাকারের ডেড-বডি খালে ভেসে আসতে পারে এটার মধ্যে একটি ব্যাপার আছে। সেটা হল—এই খালটি কোথায়? বরিশালে। বরিশালে দক্ষিণাঞ্চলে বা খুলনার দক্ষিণে এই ধরনের খাল আছে। অন্যত্র নেই। জোয়ার ভাটা হয় বলেই এইভাবে ডেড-বডির ভেসে আসা সহজ। আমি এই এলাকার লোক। আমি দেখেছি খালে কিভাবে জোয়ার আর ভাটায় কী ঘটে—কিভাবে ঘটে। আমার জীবনের এই দেখা অভিজ্ঞতার অংশ থেকেই লিখেছি। এই সত্যিটাকে আমি লিখেছি। রাজাকার লোকটি হয়তো মারা গেছে খুব বেশি দূরে নয়। এই এলাকার বড় খালেই মারা গেছে। সেখান থেকে জোয়ারে ছোটো খালে ভেসে এসেছে। যে চরিত্রটিকে আমি বর্ণনা করেছি, যে বুড়ো মানুষটি খালে এসেছে—তাকে দেখতে পাই না যে তিনি খালে লুঙ্গি নিতে এসেছেন। রাজাকারের বিরুদ্ধে তার কিছু ক্ষোভ আছে সত্যি। সে রাজাকার কিনা তাতে বুড়োর খুব বেশি কিছু যায় আসে না। ভাসা লাশটি যে একজন রাজাকার, সেটা জানিয়েছে এলাকার মুন্সী। রাজাকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকার কারণে বুড়ো লোকটি এই ডেড-বডির উপর ঝাঁপিয়ে পড়েনি বা প্রতিশোধও নেওয়ার মত কোনো বাসনাও তার নেই। সে গরীব মানুষ তার লুঙ্গি দরকার। লুঙ্গিটি দেখতে পেয়েছে খালের পানিতে ডেড-বডির পরনে। রাতের বেলায় এসেছে লুঙ্গিটি খুলে নিতে। এখন প্রশ্ন হল এখানে প্লেকার্ড লুঙ্গী প্রসঙ্গ এলো কেনো। অন্য কোনো লুঙ্গী হলেও তো চলত। প্লেকার্ড লুঙ্গী সে সময়ে খুব দামী লুঙ্গী ছিল। অবস্থাপন্ন লোকজনই পরার সামর্থ্য রাখত। এই রাজাকার লোকটি সেই অবস্থাপন্ন লোক বা শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। এরা পাকিস্তান চেয়েছিল। এরা পাকিস্তানকে রক্ষা করার দায় নিয়ে রাজাকার হয়েছিল। তখন অবস্থাপন্ন মুসলমানের সংখ্যা বাংলাদেশে খুব বেশি ছিল না। হাতে গোনা যেত। এর মধ্যেই পাকিস্তানপন্থী রাজনীতির শেকড়টা আছে। আমি এই গল্পের সেটা ব্যাখ্যা করিনি। কিন্তু এই লুঙ্গীর মধ্যে দিয়েই সেটা স্ব-ব্যাখ্যায়িত হয়ে পড়েছে।


কুলদা রায়: ১৩/
অর্থাৎ আপনি বলতে চাইছেন আপনার গল্পগুলো ইউনিক তার ঘটনার কারণে। এই ঘটনাগুলি সত্যি। বিশ্বাসযোগ্য। অসাধারণ। অসামান্য।

আনোয়ার শাহাদাত :১৩/
যারা আমার গল্প পড়েছে তারা এ সব কথাই বলেছেন আমার গল্পগুলো সম্পর্কে। তারা বলেছেন- আখ্যানগুলো ইউনিক বলেই গল্পটি ইউনিক হয়ে উঠেছে। আমি সাধারণ গল্প বলতে চাইনি। এগুলো অদ্বিতীয়। এগুলো এর আগে কেউ লেখেননি। আমি লিখেছি। ধরেন আমার পিঠ যখন ভূমি গল্পটির কথা। এক লোক তার গাই গরুকে গর্ভিণী করার জন্য নিজের পিঠ পেতে দিচ্ছে। গাই গরুটির নিচে শুয়ে পড়েছে। পিঠ দিয়ে ঠেলে গাই গরুটিকে উঁচিয়ে ধরেছে যাতে ষাঁড়টি তাকে ঠিকঠাক মত গর্ভিণী করার সুযোগটি পায়। এটা তো সাধারণ গল্প নয়।


কুলদা রায় :১৪/
আপনার গল্পে একটা ম্যাজিক থাকে। শেষটাতে এসে ম্যাজিকের মত মোচড় দেওয়া একটা ব্যাপার ঘটে যা পাঠক গল্পটি পড়তে পড়তে, শেষ করার আগে ভাবতেই পারে না।

আনোয়ার শাহাদাত :১৪/
আমি নিজে কিছু ম্যাজিক বলি না। যে ম্যাজিকটা জীবনে থাকে সেটা চলে এলে ম্যাজিকের মত লাগতে পারে। আমি আখ্যানের ম্যাজিক চাই, সেন্স চাই, ইনফরমেশন চাই, কানেকশন চাই। ব্যক্তিগতভাবে আমি লজিক্যাল এবং সায়েন্টিফিক এক্সিসটেনসের লোক। পৃথিবীর কোনো ম্যাজিককেই আমি ম্যাজিক মনে করি না। ম্যাজিক একটা পাতানো ব্যাপার। এক্ষেত্রে আমার আগ্রহ নেই। কারণ আমি জানি পৃথিবীর সেরা ম্যাজিকটিও বানানো। এই ম্যাজিক টার্মটি আমার পছন্দ নয়। ম্যাজিকের চেয়ে ফ্যান্টাসি আমার প্রিয়।


কুলদা রায় :১৫/
কিন্তু ধরেন, পোকামাকড়ের জীবনচক্রে একটা ন্যাচারাল প্রসেস দেখা যায়। যেমন প্রজাপতির ক্ষেত্রে- ডিম, বাচ্চা, শুয়া পোকা, পুত্তলি এবং পূর্ণ প্রজাপতি, এদের মধ্যে কোনোটির চেহারাই কোনোটির মত নয়। এটাকে যখন আপনি দেখতে পাবেন তখন মনে হবে এটা কী করে হল-এটা তো রূপান্তরের ম্যাজিক।

আনোয়ার শাহাদাত :১৫/
এটা রূপান্তর। ম্যাজিক নয়। আমি গল্প বলার জন্য আমার ক্ষমতায় একটা ঘোর তৈরি করি মাত্র। ধরেন- একজন মানুষ যখন প্রেমে পড়ে তখন তার দয়িত-দয়িতাকে ক্রমাগত মুগ্ধ করার চেষ্টা করে। এটা নানা কায়দায় করে থাকে। এই মুগ্ধতার মধ্যে দিয়ে তারা একটি ঘোর তৈরি করে। এর মধ্যে দিয়েই তারা পরস্পরকে আরও কাছে টেনে নেয়। গল্পটির নিয়তিকে ডমিনেট করে লেখক। আমি যে গল্পটি বলতে চাই—শুরু থেকে আমি সেই গল্পটুকু হাইড করছি। পাঠক সেই গল্পটি পাচ্ছেন না। অন্য আরেকটি গল্প পাচ্ছেন। উদ্দেশ্য পাঠককে একটা আঘাত করতে চাই শেষ দিকে।

একজন গল্পকার প্রেমিক-প্রেমিকাদের মতন একে অপরকে মুগ্ধ করতে চায়। তাহলে কে কাকে মুগ্ধ করবেন? কে কার প্রেমিক/প্রেমিকা? প্রচলিত ভাবে লেখক-পাঠক হলেন পরস্পর-পরস্পরের প্রেমিক প্রেমিকা। কিন্তু প্রকৃত অর্থে লেখক-পাঠক বলে কিছু থাকে না। গল্পকার প্রথমত নিজেই লেখক এবং নিজেই পাঠক। নিজেকেই মুগ্ধ করতে চান লেখক। এটা সহজ বিষয় নয়। লেখক নিজেই জানেন তিনি কী কী দিয়ে নির্মাণ করছেন লেখাটি। তার চেয়ে এই পৃথিবীতে আর কেউ জানেন না--এই গল্পের মধ্যে তিনি আসল মাল দিয়েছেন--কতটা ভেজাল মাল দিয়েছেন। কতটা রদ্দি মাল ব্যবহার করেছেন। কতটা চুরি করা জিনিস ঢুকিয়ে দিয়েছেন। ফলে মুগ্ধ হওয়ার ব্যাপারটি নিজের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। এই মুগ্ধ করতে চাওয়ার প্রবণতায় যে গল্পকার যত বেশি সৃষ্টিশীলতা দেখাতে পারে সে তত ভালো গল্পকার! আসলে শব্দটা 'মুগ্ধ' হবে না। ঘোর হবে। ঘোরটা কেনো তৈরি করতে হবে এর উত্তর আমি একটু আগে বলেছি। অর্থাৎ গল্পকার যদি গল্পের উপর ডমিনেট করতে পারেন তবেই তিনি ঘোর তৈরি করতে সক্ষম। গল্পকার গল্পের নিয়তির নির্ধারক হয়ে ওঠেন। ওর যে জ্ঞান-বোধ, গল্প শুনবার যে জ্ঞান-বোধ, ওর যে মনোজগৎ আপনাকে শুনছে—গ্রহণ করছে--সেই জায়গাটা ডমিনেট করে লেখক। এই ডমিনেট করার কৌশল বা ক্রাফটটাকে অবলম্বন করেই আমরা এখন কথা বলছি। আপনি বলেছেন—আমরা আপনার গল্পে এটা দেখতে পাই। আমি যখন একটি গল্প বলছি পাঠককে—তখন যে গল্পটি আমি বলতে চাইছি, সেটা কিন্তু পাঠকের কাছ থেকে আমি হাইড করছি ক্রমাগত। সেটাই আমার গল্পের শ্রেষ্ঠত্বের জায়গা (হয়তো) । এমনভাবে হাইড করছি যাকে আমরা আগে বলে নিয়েছি কিছুটা, আবার সেটা লুকিয়ে ফেলেছি। একটা ঘোরের মধ্যে ফেলে দিয়েছি পাঠককে। এই ঘোর তৈরি করার উদ্দেশ্য হল---আমি পাঠককে একটা আঘাত করতে চাই। আমার এমন কোনো গল্প নেই যেখানে আমি পাঠককে আঘাত করতে চাইনি। আমি আসলে এই ঘরানার গল্পকার। কিন্তু আঘাত করার আগে আমি পাঠককে অন্য জগতে রাখি। সাধারণ ঘটনা দিয়ে তাকে অন্য জগতে রাখতে চাচ্ছি—জীবনের অন্য কিছু নিয়ে কথা বলছি—বারবার কেন্দ্র থেকে পরিধির দিকে নিয়ে যাচ্ছি।

ধরুণ, চরিত্রটি গল্পের একজন নিপাট ভদ্রলোক। চুরিচামারি করার কোনো স্বভাব বা ইতিহাস তার মধ্যে থাকার কথা নয়। অথচ তাকে দিয়ে আমি চুরি করাতে চাইছি। এইজন্য তাকে নানাভাবে আরও সৎ প্রমাণের চেষ্টা করছি। আবার এমনভাবে করছি যাতে সে কায়দাটাকে জোর করে প্রমাণের চেষ্টা বলা যাবে না কোনোভাবেই। জোর করলে পাঠকের মনে সন্দেহ সৃষ্টি হবে। তারা আমাকে অবিশ্বাস করবেন (বলে নেয়া ভাল যে আমি নিজে পাঠক হিসাবে ওই রকম যৌক্তিকতার পাঠক, ফলে নির্মান ঠিক আমার ভাবনার মতনই তো হবে?) । আমার গল্পই তার কাছে মার খাবে। পাঠক ভাবতেই পারবেন না যে ঐ লোকটি চুরি করতে পারে। সর্বশেষে দেখবেন—লোকটি চুরি করেছে (গৃহস্তের চাদ-কাৎ, গল্প) ।

তার মানে হল, আমি তার মনো জাগতিক স্ট্রাকচারে আমি আঘাত করব। পাঠকের মনোজাগতিক মূল্যবোধকে আঘাত করাটাই আমার গল্প বলার কৌশল। আঘাতটা এমনভাবে করি যেন কেউ টের না পায়। আঘাতটা কোনো দিক থেকে আসছে সেটা টের পেতে দেইনা। এটা অনেকটা যুদ্ধের কৌশলের মত। এমন কি যখন কেউ আমার গল্পের পড়ে আনন্দ পায় সেই আনন্দটাও সেই আঘাতের মধ্যে দিয়েই আসে। আমি যে আঘাতটি করছি—সেটা আসলে নেগেটিভ এপ্রোচ। ভেঙ্গে ফেলছি। আঘাত দিয়ে পাঠকের প্রচলিত মনোজাগতিক স্ট্রারচারকে ভেঙ্গে ফেলেছি। আমি পাঠককে এমনভাবে রেখে দিচ্ছি যেখানে তার কল্পনাও যাবে না। তিনি এমনভাবে সেখানে গেলেন—সেখানে গিয়ে অবাক হলেন। যদি বলেন, তবে এটা হচ্ছে আমার অন্যতমদের একটি ক্রাফট।


কুলদা রায় :১৬/
আপনার প্রথম দুটো গল্পের বই পড়লে দেখা যায়—আপনি দীর্ঘ বাক্য ব্যবহার করেন। বাক্যগুলো এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেখানে হুট করে ঢুকে পড়া একটু জটিল হয়ে পড়ে। এই বাক্যজাল দেখে শুরুর দিকে কেউ কেউ সরেই পড়তে পারেন। আপনার গল্প যেমন এক পর্যায়ে থ্রিলারের মত হয়ে ওঠে, পাঠককে আক্রান্ত করে—মনোজগতকে ভেঙ্গে দেয়, কিন্তু সেই পাইপলাইনে ঢুকতে হলে পাঠককে একটা ভাষার শক্ত আবরণ সরিয়ে নিতে হয়। এ ধরনের ভাষা-প্রকৃতি কেনো নিলেন?

আনোয়ার শাহাদাত :১৬/
এটা আমি প্রথম দিকে খেয়াল করেছি। আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ হেলে চাষার জোয়াল বৃত্তান্ত-এ অনেক ছোটো ছোটো বাক্য ব্যবহার করেছি। আমার মাথায় ছিল আমি যে স্টাইলে কথা বলি সেভাবে লিখলে অনেকে বুঝতে পারবে না। সে কারণে আমি অনেক সহজ বোধ্য ভাবে লিখেছি। পরের গল্পগ্রন্থ ক্যানভেসার গল্পকারে বাক্য অনেক লম্বা হয়েছে। এখন আরও লম্বা হয়। মানে হল—যত সময় যাচ্ছে ততই জাগতিক কম্প্রোমাইজগুলি আমি বর্জন করছি। ব্যক্তিগতভাবে আমার কথা বলা দীর্ঘ বাক্যে আপনি হয়ত লক্ষ করে থাকবেন। আমি যখন একাডেমিক লেখাও লিখি তখনও আমার এ সমস্যা হয়। আমাকে প্রচুর যতিচিহ্ন ব্যবহার করতে হয়। এটা আমার সহজাত। এটা আমার অফিসিয়াল উত্তর।

আমি চেষ্টা করি গল্পটির স্বার্থে কিছু কম্প্রোমাইজ করতে। কিন্তু সেটা ভালো হয় না। এইজন্য আমার ঘরানার চার/পাঁচজন এডিটর যদি থাকেন, সেটা ভালো হয়। এই এডিটর থাকাটা দোষের নয়। বড় বড় প্রকাশনাগুলো মনে করে প্রেসে যাওয়ার আগে ছয়জন এডিটরের কাছে যাবে কেনো পাণ্ডুলিপি। সে ধরনের ব্যবস্থা আমার জন্যই ভালো হয়।

কুলদা রায় :১৭/
এই দীর্ঘ বাক্য ব্যবহার করার ফলে আপনার গল্প পাঠকের সঙ্গে কমিউনিকেট করতে সমস্যা হয়!

আনোয়ার শাহাদাত : ১৭/
অবশ্যই। আমি জানি। আবার অনেক সময় পাঠকের জন্য আমি এ ধরনের কম্প্রোমাইজ করতে চাই না। কারণ পাঠক আমার গল্প ভুল বুঝুক—শুদ্ধ বুঝুক, অল্প বুঝুক—বেশি বুঝুক, সেটা বড় কথা নয়। কথা হল—আমি যা লিখেছি, যে রকম করে লিখেছি—সেটা আমিই। এটা আমার সত্ত্বা। সত্ত্বাকে সম্মান করতে চাই বলেই পাঠককে ওই স্থানে গুরুত্ব দিতে চাই না।


কুলদা রায় :১৮/
ভবিষ্যতে কি আপনি কমিউনিকেটিভ ভাষাভঙ্গিতে যাবেন-এ ব্যাপারে কি আপনার কোনোও পরিকল্পনা আছে?

আনোয়ার শাহাদাত : ১৮/
না। আমি পারব না। যদি করি—সেটা আলটিমেটলি আমাকে আমার বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হবে। যদি আমার এডিটররা সেটা করেন—তাহলে আমার খুব বেশি আপত্তি থাকবে না। যদি আমার লেখার সব কিছু ঠিক ঠাক থাকে তবেই আমি আপত্তি করব না। কিন্তু আমি নিজে এই স্ট্রাগলে যেতে চাই না।

হুমায়ূন আহমেদ যে ভাষায় লিখেছেন—সেটা লিখতে কিন্তু তাকে কম্প্রোমাইজ করতে হয়নি। সেটাই তার সহজাত লিখন ভঙ্গিমা। তার কমিউনিকেশন বেশি হয়। আমি যদি ওই ভঙ্গিতে লিখি—হুমায়ুনের ভঙ্গিতে লিখতে চেষ্টা করি, সেটা করা সম্ভব—সেটা কিন্তু আমার জন্য কৃত্রিম বা আরবানাইজড হয়ে পরবে। এ ধরনের যদি লিখতে চান কেউ তাতে প্রমাণ হবে যে তিনি দুর্বল লেখক। পাঠককে মাথায় রেখে লেখেন যিনি তিনি শক্তিশালী লেখক হতে পারেন না।

আমার পাঠক সংখ্যা কম। কিন্তু তাতে আমি নিজেকে ব্যর্থ মনে করিনা। আমি কি চাই সবাই আমার লেখা পড়ুক? আমি তা চাই না। চাইনা বলেই আমি নিজের ভঙ্গিটা বজায় রাখতে চাই। যদি কেউ পড়েন—তাতে কোনোও অসুবিধা নেই। যদি কেউ না পড়েন—তাতেও অসুবিধা নেই।


কুলদা রায় :১৯/
আপনার প্রিয় গল্পকার কে? কেন তাদের লেখা পছন্দ করেন?

আনোয়ার শাহাদত :১৯/
আমি কখনো কাউকে প্রিয় লেখক বলি না। বলবো না। বিশ্বসাহিত্যের অধিকাংশ সেরা লেখাগুলো আমার পড়া আছে। কিন্তু আমি কাউকেই প্রিয় ভাবি না। প্রিয় বললে—কোনোও গল্পকারকে ছোটোও করা হয়। কোনোও লেখক আমার প্রিয় না হলেও তিনি গুণে ছোটো গল্পকার তা ভাবা ঠিক নয়। কিন্তু কোনোও গল্পকারকে আমি কিভাবে দেখি—কার ক্ষমতা কেমন, তার শক্তির জায়গাটি কোথায়—সেটা আমি বলতে পারি। প্রিয় বা আদর্শ শব্দটি আমার পছন্দ নয়।

আমি পৃথিবীর অনেক চলচ্চিত্রকারের নাম বলতে পারি। অনেক সঙ্গীতজ্ঞের নাম বলতে পারি, প্রিয়, তার কোনো অর্থ নাই। ধরেন, একটা গান—যেই দেশেতে শাপলা শালুক ঝিলের জলে ভাসে—এই গানটির কথা খুব সাদামাটা। কিন্তু গানটি আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে (ধরা যাক)। যিনি গানটি লিখেছেন (লেখক ব্যক্তি হিসাবে এখানে মুখ্য নন)—তিনি হয়তো তার নিজের গ্রামের সাধারণ শাপলা ফুলের কথাটিই লিখেছেন। কিন্তু গানটিতে যেই দেশ বলে যে ইঙ্গিতটি করেছেন সেই ইঙ্গিতটিকে আপনি ব্যাখ্যা করেন, তাহলে এই দেশের আর কিছুই পৃথিবীতে একজিস্ট করে না। তিনি এতো কিছু ভেবে গানটি লেখেননি। কিন্তু আমার কাছে এক দুই লাইনের একটি এক্সপ্রেশনে তিনিই শ্রেষ্ঠ গল্পকার। ফলে শ্রেষ্ঠ গল্পগুলোর এই জায়গাগুলোতে অফিসিয়াল টার্মগুলো আমি এড়িয়ে চলি। অধিকাংশ গল্পকারই আমার চোখে শ্রেষ্ঠ গল্পকার। কিন্তু এক একজনকে আমি এক একরকম ভাবে দেখি।

রবীন্দ্রনাথের দুটি গল্পের প্রশংসা আপনার কাছে করেছি। কিন্তু তার শেষের কবিতা উপন্যাসটি আমার কাছে অতি নিম্নমানের বলে মনে হয়েছে।

একটা ম্যাজিক রিয়ালিজমের গল্প শোনাই। স্বরূপকাঠিতে গাছের ব্যবসা আছে। সেই গাছগুলি আসে সুন্দরবন থেকে। সুন্দরবনে কাঠ আনতে গেছে এক বাওয়ালি। সেখানে ডাকাত আছে।

ডাকাত সেবার গাছকাটা বাওয়ালীর গলা কেটে ফেলেছে। এরপর বাওয়ালির ধড়টা (মুন্ডুহীন দেহ) 'আজকে দৌড় তো কালকে দৌড়' (আইজগো দৌড় আর কাইলগো দৌড়, টারমিটি গল্প উপলব্ধিতে জানা দরকার) । দৌড়াইয়া তাগো বাড়িতে আইসা হুমড়ি খাইয়া পড়ছে। মাকে ঢাইক্যা কয়, মাগো, সুন্দরবনে ডাকাইত পড়ছে। মা জিগায়, বাবা তোর মাথাডা কই? মায়ের এই কথা শুইনা পোলায় দুই চোক্ষের পানি ছাইর‍্যা কাইন্দা দিছে।

দেখুন, এই গল্পটি অতি পুরনো। কিন্তু গল্প বর্ণনা করতে শব্দের মধ্যে যে ছন্দ তৈরি হচ্ছে--— কাব্যিক ব্যাপার তৈরি হচ্ছে, সেটা জেনে শ্রোতা/পাঠক অবাক বিস্ময়ে এরপরের অংশটির জন্য অপেক্ষা করে। এটাই তো একজন গল্পকারের ক্ষমতা। মাথা না থাকলে কী ধড়টা দৌঁড়াতে পারে? (লোকটি আসলে মরা, অতএব গল্পটি ওইখানেই ভুল হয়ে যায়)। অথচ আমরা দেখতে পাই সেই ধড় সুন্দরবন থেকে দৌড়ে নিজ বাড়ীর উঠানে এসে দাড়ায় (বেঁচে থাকা মানুসের জন্যও এই ঘটনা অসম্ভব) । উঠোনে না গেলে মাকে ডাকে না। মা না জিগাইলে সে কান্দে না। কিন্তু আপনি এসবটা যৌক্তিক না হলেও শুনে যাচ্ছেন কিন্তু। শুনছেন গল্পের জন্য নয়, কেনোনা আপনি ইতোমধ্যে জানেন এটা একটা অযৌক্তিক গল্প। এই যে আপনি শুনছেন—এটা শুনছেন গল্পকারের গল্প বলার কারণে। অযৌক্তিকতাটার মাত্রাটাই হয়তো আপনি জানতে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। এটাই যখন আপনি আরেকভাবে বলবেন, সেটা হয়তো পাঠক শুনবে না। এই গল্পটির চেয়ে আমাকে হয়তো অন্য কোনোও শ্রেষ্ঠ গল্প ওই গল্পকার শোনাতে পারেনি। এটা ক্র্যাফটের অংশ।

এখন প্রশ্ন হল—আমি কোনোও গল্পকারকে নিন্দা করি কিনা? সেটা অন্য প্রশ্ন। এই উত্তর আমি দিতে চাইনা।

কুলদা রায় :২০/
তারপরও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস...

আনোয়ার শাহাদাত :২০/
দূরে যেতে চাই না, কাছাকাছি থাকি। আপনি যদি হাসান আজিজুল হকের নামই বলতে চান, অন্যতম শ্রেষ্ঠদের জায়গায় তাঁকে রাখি। এছাড়া আরো দুইজনকেই দুই ঘরানার শক্তিশালী গল্পকার মনে করি। একজন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আরেকজন শহীদুল জহির। এরা সর্বাধিক শক্তিশালীদের অংশ। এদের রাজনৈতিক ভাবনার মধ্যে অস্পষ্টতা আছে (আমার কাছে, ইলিয়াসের আরো বেশি, জহিরের তুলনায়)। সেটা নিয়ে আমি কথা বলছি না, আপাতত।

কুলদা রায় :২১/
কী কী অর্থে এঁদেরকে শ্রেষ্ঠ গল্পকার বলছেন?

আনোয়ার শাহাদাত :২১/
হাসান আজিজুল হকের গল্পগুলো প্রায় সব আমি জানি। তা নতুন নয়। কিন্তু আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সত্যের জায়গায় পৌঁছানোর যে ক্ষমতা আছে, সেটা বাংলা সাহিত্যে এই পারে আর কারো নেই। ওপার নিয়ে আমি মন্তব্য করছি না। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের একটি ছোটোগল্পে আছে- একজন রাজাকার ইংলিশ রোডের এক পতিতার কাছে গেছে। সঙ্গে বন্দুক। এক পর্যায়ে পতিতার সঙ্গে বিরোধিতা হলে রাজাকার বন্দুকের ভয় দেখালে পতিতা তাকে বলে, বন্দুক তোর মায়ের মধ্যে ঢুকায় দেব (হুবহু বলতে পারলাম না, স্মৃতিতে এখন আর পরিষ্কার নেই)। এই সংলাপে ক্ষোভ প্রকাশ ওই পরিবেশের সঙ্গে মানায়। যারা পতিতালয় সংস্কৃতি জানেন তারা জানবেন এটা, ওই পরিস্থিতিটায়, ওই গালিটা কত যে স্বাভাবিক। এই জায়গাগুলোয় ইলিয়াসের রয়েছে সীমাহীন 'গল্প সততা'। ওই সংলাপটিকে আপনি যে কোনো ফরম্যাটে কথিত অশ্লীল নয় মতন করে লিখে দেখেন, দেখবেন ওই পরিবেশে ক্ষোভটা আর এক থাকবে না। ফলে যুতসই শব্দই ব্যবহারের মাধ্যমে সংলাপটি ওইভাবে লেখা হয়েছে। তিনি এখানে পাঠকের সঙ্গে সমঝোতা (কম্প্রোমাইজ) করেননি। মনে করেন হুমায়ূন আহমেদ ওই সংলাপ ওই শব্দে লিখতেন? হাসান? প্রশ্নই আসে না। অথচ ইংলিশ রোডের পতিতাকে নিয়ে গল্প লিখতে হলে তার মুখে ওই শব্দটিই দিতে হবে। ক্ষোভ প্রকাশ-বাচক শব্দ হিসেবে ওটাই স্বাভাবিক। তখন একজনের ক্ষোভ প্রকাশ ওই ভাষায় সেটাই স্বাভাবিক। এবং এই সত্যটা প্রকাশ এইভাবে একমাত্র আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের পক্ষেই সম্ভব। এটা অন্য কোনোও শালীন শব্দে বললে গল্পের শক্তিটা পাওয়া যেত না। এটা অন্য কেউ পারেন না।

শহীদুল জহিরের প্রায় সব লেখা আমি পড়েছি। তাঁর ক্ষমতা হচ্ছে—ম্যাজিক রিয়ালিজমের সার্থক প্রয়োগ। কিন্তু ম্যাজিক রিয়ালিজম শুধু ম্যাজিক তৈরির কথা বলে না। ম্যাজিকতার আরো গভীরে যেতে হয়। গভীরে যাওয়ার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে জহিরের। শেষের উপন্যাসটা মুখের দিকে দেখি—এটা হল ওর সবচেয়ে শক্তিশালী লেখা। এই লেখায় ম্যাজিকের ভেতরের ম্যাজিকে যাওয়ার কাজগুলো আছে। মনোজাগতিক বিশ্লেষণের এত গভীরে যাওয়ার ক্ষমতা এমন কি ইলিয়াসেরও ছিল না। ধরা যাক চাটগাঁর সাম্পান ব্যবসায়ী বা ফড়িয়া বা ঐ লোকটার ব্যবসায়িক জীবনের মনোজাগতিক এবং ইন্টার‍্যাকশনের একটা বর্ণনা আছে। এটার মধ্যে একটা ম্যাজিক আছে। সেটা আমার জন্য কোনোও ম্যাটার করে না। আমার কাছে ম্যাটার হল—ওই ম্যাজিকের ভেতরে যে মনোজাগতিক গভীরতা আছে, বিশ্লেষণ আছে—সেটা।

হাসান আজিজুল হকের গল্পে একটা কমিটমেন্ট আছে। আদর্শ আছে, সেটা আগে থেকে ধরা যায়। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসে সেটা নেই। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পার্সোনালি কোনোও রাজনীতি করতে পারেন। সেটা তার গল্পে চাপিয়ে দেননি। গল্পে সেই রাজনীতি ব্লেন্ড করা হয়নি। শহীদুল জহিরও সেটা করেননি। গল্পের ক্ষমতা রাজনীতি নয়—গল্পটি মানুষের গভীরে কিভাবে আলোড়িত করে, নতুন কিছুর উন্মোচন করে—এই ক্ষমতাই গল্পকে বড় করে।

আমি সাহিত্যের শুদ্ধতায় বিশ্বাস করিনা। সাহিত্যের শুদ্ধতার ব্যাপারটি ইলিয়াস বা জহিরের মধ্যে নেই। তারা ‘র; সে জায়গায় থেকেই কাজ করেছেন। শুদ্ধ করতে গেলেই তা পানসে হয়ে যাবে—আরবানাইজড হয়ে যাবে। কিন্তু এদের দুর্ভাগ্য হল—বাংলাদেশে যারা মৌলবাদী সাহিত্য স্কুলের তালেবর, তারা ইলিয়াসকে ও জহিরকে বড় পীর ছোট পীর বা প্রফেট করে দেখে। তারা তাদের মত করে এদেরকে ব্যবহার করে। তাতে সাহিত্যের ওই দুজনার কাজের-প্রকৃত-ক্ষমতাকে ছোট করা হয়।


কুলদা রায় : ২২/
এটা কিভাবে হল? ইলিয়াস—জহির মৌলবাদী নয়--কিন্তু মৌলবাদীরা তাদেরকে তাদের মত করে ব্যবহার করছে?

আনোয়ার শাহাদাত : ২২/
বাংলাদেশের লেখকদের মোটা দাগে তিন ধারায় হিসাব করা যেতে পারে। ১. সিরিয়াস লেখক,২. উদার বা লিবারাল লেখক এবং ৩. মৌলবাদী ধারার লেখক।

সিরিয়াস লেখকদের সংখ্যা বাংলাদেশে খুবই কম। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, শহীদুল জহির--এই রকম কিছু নাম করা যায়। এর মধ্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ একাত্তর সালে মারা গেছেন। আখতারুজ্জামান মারা গেছেন ১৯৯৭ সালে। শহীদুল জহির মারা গেছেন ২০০৮ সালে। হাসান আজিজুল হক এখনো জীবিত। লেখালেখিতে তিনি সক্রিয়। এঁদের মধ্যে কম্প্রোমাইজ বিষয়টা থাকে না বা এড়িয়ে চলেন। প্রতিষ্ঠানবিরোধীতা আছে। এরা মৌলবাদকে যেমন সমালোচনা করেন, ঠিক তেমনি উদার বা লিবারালদেরকেও তাদের সুবিধাবাধের ঝোঁকটিকে সমালোচনা করেন।

দীর্ঘদিন থেকেই লিবারেলরা আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেন। বা সিপিবিকে সমর্থন করে্ন। হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক বিভাজন থেকে মুক্ত থাকেন। শুধু রাষ্ট্রে নয়--মনোজগতেও তাঁরা সেক্যুলার আচরণে অভ্যস্ত। কিন্তু আওয়ামী ঘরানা বা সিপিবি ঘরানার লেখকদের মধ্যে সিরিয়াস সাহিত্য করার মতন সাধনা বা বাসনা দেখা যায় না। তাঁরা নিজেদের মধ্যম মানের লেখা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেন। এক ধরনেরর প্রতিষ্ঠান-প্রিয়তা তাদের মধ্যে কাজ করে।

মৌলবাদী ঘরানার লেখকরা বাংলাদেশের লিবারেল রাজনৈতিক ঘরানার লোকদের বিরুদ্ধে জান-পরান দিয়ে থাকে। এই মৌলবাদীদের ভেতরের দ্বন্দ্বটা আসলে ‘হিন্দু-মুসলমান’ । এরা অধিকাংশই হিন্দুদের ঘৃণা করে। এরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাকিস্তানপন্থী, ঐতিহ্যগতভাবে ভারতবিরোধী। তাদের এই ভারতবিরোধীতা আসলে হিন্দুবিরোধীতারই নামান্তর। এরা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে দুই ভাইয়ের পারিবারিক দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখাতে চায়। বলতে চায়--একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আসলে রাশিয়া আর ভারতের ষড়যন্ত্রের ফসল। এদের চিনাপন্থী বামনামধারী ছদ্মগ্রুপটি আরেকটি কায়দা করে বলে, একাততরের মুক্তিযুদ্ধ হল আমেরিকা আর রাশিয়া নামের দুই কুকুরের লড়াই। এরা অভিযোগ করে-- বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে জাতিকে বিভক্ত করার চেষ্টা করছে আওয়ামী-সিপিবি ধারাটি। এখন পুরনো লড়াই-ফ্যাসাদ ভুলে গিয়ে আবার পাকিস্তানের সঙ্গে পুনর্মিত্রতা বা রিকনসিলেশন করার সময় এসেছে আবার। তারা মুক্তিচিন্তার বিরোধী, বাক স্বাধীনতার বিরোধী, ভিন্নমতের প্রতি নিষ্ঠুর। ফুঁকো, দেরিদা, জাঁকা লাঁকা, উত্তরাধুনিকতা, - -ইত্যাদি নামের আড়াল নিয়ে তারা তরুণ লেখকদেরকে বিভ্রান্ত করতে চায়। প্রকৃতপক্ষে এই মৌলবাদী ঘরানার লেখকদের লেখা নিম্নমানের। নিজেদের লেখা নিয়ে মূলধারার সাহিত্যে জায়গা পাওয়ার কথা নয়। তাদেরকে কারো উপরে ভর করা ছাড়া উপায় থাকে না। কিন্তু মৌলবাদী রাজনীতির অংশ হিসেবে তাদেরকে আম-পাঠকদের নজরে থাকার দরকার হয়।

এজন্য তারা সিরিয়াস ঘরানার ইলিয়াস-শহীদুল জহীরের মত লেখকদের কাঁধে ভর করে। কারণ ইলিয়াস-শহীদুল জহিররা আওয়ামী-সিপিবি’র ধারার যে সুবিধাবাদকে সমালোচনা করতেন বা তাদেরকে এড়িয়ে একটি মুক্ত পাটাতনে অবস্থান করতেন, এবং উদার আওয়ামী-সিপিবি ঘরনার লেখকদের উদাসীনতা বা আলস্যের শিকার হয়ে পড়েন এই সিরিয়াস ঘরানার দুই লেখক--এই এরকম কিছু কারণকে এই মৌলবাদীরা ছিদ্র হিসেবে খুঁজে নেয়। তাদেরকে নিজেদের মৌলবাদ প্রচারের ব্যবহার করতে চায়। তাদের স্বজন হিসেবে পরিচিতি দিতে চায়। তাদেরকে পূঁজি করে মূলধারায় নিজেদের লেখক পরিচিতিটাকে টিকিয়ে রাখতে চায়। এবং কায়দা করে মৌলবাদী লেখকদের নিম্নমানের লেখাকে ইলিয়াস-শহীদুল মানের সমত্যুল্য বলে প্রচারের চেষ্টা করে। এটা আসলে একটা নিম্নমানের অপকৌশল। ইলিয়াস জহিরের সিরিয়াস কাজকে খাটো করারই সামিল। এটা একটা অপরাধও বটে।

মজার ব্যাপার হল, এই ইলিয়াস-শহীদুলকে নিয়ে তাদের এই কাজগুলো তাদের জীবিতকালে করেতে খুব বেশি সাহস পায়নি। মৃত্যুর পরেই জোরে-শোরে করছে।

এই মৌলবাদী লেখকরা খুব জোরে-শোরে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক ও আহমদ ছফাকেও মহান লেখক হিসেবে প্রচার করে চলেছে। আব্দুর রাজ্জাক কখনোই সাহিত্য কর্ম করেননি যা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। আহমদ ছফার বেশ কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যাপার পরিষ্কার। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে অস্পষ্টতাও আছে। কিন্তু তাঁর একটি রাজনৈতিক কমিটমেন্ট আছে। একটু দূর থেকে হলেও তার মধ্যে হিন্দু বিরোধিতা আছে। তার ভেতর থেকে মৌলবাদী শক্তি পুষ্টি খুঁজে পায়। এটাকেই অবলম্বন করে মৌলবাদীরা। কিন্তু ইলিয়াস বা শহীদুল জহিরে এই হিন্দু বিদ্বেষটা পাওয়া যাবে না। বিদ্বেষের বিরুদ্ধেই তাঁদের অবস্থান ছিল। তারা জানতেন, যে কোনো দেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর আচরণ আসলে সভ্যতার প্রধান মাপকাঠি হিসেবে কাজ করে। সেক্যুলার হওয়া ছাড়া একজন প্রকৃত-সভ্য লেখকের উপায় নেই।

কুলদা রায় : ২৩/
আপনাকে ধন্যবাদ।

আনোয়ার শাহাদাত : ২৩/
আপনাকেও ধন্যবাদ।


সংযুক্ত
এই গল্পে উল্লেখিত আনোয়ার শাহাদাতের গল্পের লিঙ্ক--
১. সরোজিনী কদমবিবির গামছা কবর

1 টি মন্তব্য:

  1. সাহিত্যের সততা ও সাহিত্যিকের সততা নিয়ে একটি সত্যপাঠ।

    উত্তরমুছুন