সোমবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৬

দীপেন ভট্টাচার্য'এর ধারাবাহিক উপন্যাস | অদিতার আঁধার--পর্ব ১

প্রথম অধ্যায়

"কাল রাতে আমি স্বপ্ন দেখলাম আমার মা আমাকে একটা বড় অলিন্দের মধ্য দিয়ে হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছেন । সেই অলিন্দের দেয়ালে অপসরাদের ছবি খোদাই করা । সেই অপসরারা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল। মাকে বললাম, ওরা হাসছে । মা বলল, ওদের দিকে নজর দিস না । ওরা তোকে বাঁচতে দেবে না ।"

এটুকু বলে অদিতা জানালার বাইরে তাকাল। বেগুনী ফুলে ভারাক্রান্ত হয়ে একটা পারুল গাছ বিকেলের অলস রোদকে পাহারা দিচ্ছিল। গাছটা পেরিয়ে রোদের অবশিষ্ট রেশটুকু অদিতার ছড়ানো সাদা চুলকে রাঙিয়ে অদিতাকে যেন আরো বিষণ্ন করে দিল।


"আমার এবার যাবার সময় হয়েছে, ডাক্তার। আপনি আমাকে ছুটি দিন।"

ডাক্তার বিনতা চেয়ার থেকে উঠে জানালার কাছে গেলেন। তাঁর লম্বা কালো চুল পিঠের ওপর ছড়ানো। তাঁর নিজের কি সময়ে হয়েছে যাবার? না, তাঁর বয়স সবে একশো ছাড়াচ্ছে। তাঁর দুটি ছেলে এখনো যেন শিশু। একটির বয়স পঁয়তাল্লিশ, এখনো তাঁর সাথে থাকে। আর বড়জন থাকে পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে দক্ষিণ আমেরিকায়। দুবার বিয়ে করেছিল বিনতা, টেঁকে নি। তাঁরও সামনে অপার সময়, অদিতার কথাগুলো তাঁর জন্যও প্রযোজ্য।

"আপনার কি মায়ের কথা প্রায়ই মনে হয়?" পারুলের ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে বিনতা।

"না, জেগে থাকা অবস্থায় তাঁকে খুব একটা মনে করি না। কিন্তু ইদানীং স্বপ্নে তাঁকে দেখছি।"

"উনি কবে মারা গেছেন?"

উত্তরটা দিতে অদিতা সময় নেয়। চেতনা বা মস্তিষ্ক কপি করার প্রকল্প তখনও চালু হয় নি। তাঁর মা'র মৃত্যুর সময় অদিতার বয়স হয়েছিল মাত্র চল্লিশ। "একশো বছরের ওপর," উত্তর দেয় অদিতা।

"ওনার কথা এতদিন পরে মনে আছে?" প্রশ্ন করে বিনতা।

"ছোটবেলায় যেমন দেখেছিলাম তাঁকে সেভাবেই দেখছি। ছবি আছে। কিন্তু ওসব বেশী দেখতে পারি না। মনটা বড় খারাপ হয়ে যায়।" এটুকু বলতেই গলাটা ধরে আসে অদিতার, এক বিশাল বেদনাবোধে আচ্ছন্ন হয়ে যায় তার মন। গলার মধ্যে কিসের একট দলা পাকিয়ে ওঠে, ঢোক গিলতে কষ্ট হয়। বিনতা দেখে অদিতার চোখে জল টলমল করছে।

"মা'র মৃত্যুর কয়েক বছর আগে মানুষের চেতনাকে গণহারে সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা শুরু হল। তখনও চাইলে মাকে হয়তো কপি করা যেত, কিন্তু উনি নিজে এটার ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। আর ওনার মৃত্যুর প্রায় কুড়ি বছর পরে বাধ্যতামূলকভাবে চেতনাকে কপি করার নীতি গ্রহণ করা হয়।"

"হ্যাঁ, এসবই হয়েছে যখন আমি খুব ছোট ছিলাম," বলে বিনতা, "মানুষের মৃত্যু যে কী সেটা এখন ক'টা লোক জানে। আমি কিছুটা জানি কারণ আমি মানুষকে মৃত্যুর ছাড়পত্র দিই।"

পারুল গাছ ছাড়িয়ে দূরে একটা পুকুর। পুকুরের পাশে বিনতার গাড়িটা দাঁড়িয়ে। সেই গাড়ি নিয়ে সে সপ্তাহান্তে শহরে যায়। পুকুরের পারে একটা বটগাছ, সেটার শিকড় জল পর্যন্ত নেমে গেছে। সেদিকে তাকিয়ে বিনতা বলে, "মাকে ছাড়া আর কেউ আপনার স্বপ্নে আসছে?"

জানালার বাইরে পুকুরটার দিকে তাকিয়ে অদিতা বলে, "না, মানুষ কেউ আসছে না। তবে অনেক রাত আছে যখন একটা অন্ধকার আমাকে চেপে ধরে।"

বিনতা আশ্চর্য হয়ে অদিতার দিকে তাকায়। "অন্ধকার?"

"হ্যাঁ, অন্ধকার, অদ্ভূত আঁধার বলতে পারেন। এক ধরনের শূন্যতা। সেটা স্বপ্ন কি বাস্তব আমি বুঝতে পারি না। ঘরটা যদি আলো-আঁধারি হয় শুধু তখনই সেটা আসে, একটা কালো বেলুন ফুলে ফেঁপে ওঠে ঘরের মধ্যে। হয়তো জানালা দিয়ে আসে, জানালা বন্ধ থাকলেও আসে। পুরো ঘরটা ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে যায়। মনে হয় কালো কালো আঙ্গুল সেই অন্ধকার গঠ্ন থেকে বের হয়ে আমার মুখের দিকে আসছে। আমি চোখ বন্ধ করে ফেলি। তারপর আর কিছু মনে থাকে না। এমন যেন আমার মৃত্যু হয়েছে।"

বিনতার চোখ বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সীমানায় জ্বলজ্বল করে। সে বলে, "আপনি আমাকে এটা আগে বলেন নি কেন?"

"আমি বলতে গিয়েছি, কিন্তু প্রতিবার বলার সময় কেন জানি বলতে পারি নি। এমন যেন সেই অন্ধকার আপনার ঘরের কোণায় দাঁড়িয়ে আছে, আমাকে শ্বাসাচ্ছে। বললে যেন এখনই আমাকে মেরে ফেলবে। কীরকম ধাঁধা বলুন তো? আমি তো মৃত্যুই চাই। অথচ সেই মৃত্যুর ভয়ে আপনাকে কিছু বলতে পারছি না।"

ঘরের কোণায় অন্ধকার দাঁড়িয়ে আছে শুনে চমকে ওঠে বিনতা, ঘাড় ঘুড়িয়ে ঘরে কোণাগুলো দেখে। না সেখানে কিছু নেই। বিনতার আচরণ অদিতার অলক্ষিত থাকে না। সে বলে, "আজ নেই। আজ মেঘ নেই আকাশে, আজ সে থাকবে না। কেমন রোদ পড়েছে ঘরে দেখেছেন?" বিনতা আশ্চর্য হয়। অদিতা একটা বিমূর্ত ধারণাকে "সে" বলছে , প্রাণ পেয়েছে সেই আঁধার।

প্রায় আধ মিনিট দুজনেই চুপ করে থাকে। তারপর অদিতা বলে, "যে রাতে আমার ঘুম আসে না সে রাতে আমি দোতলার বারান্দায় যেয়ে নদীর ওধারে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে থাকি। জোনাকীরা ঝলমল করে, নদীর এপাড়ে যখন তারা নেভে ওপাড়ে জ্বলে, আবার ওপাড়ে নিভলে এপাড়ে জ্বলে। ঝিঁঝিঁর ডাকও যেন তার সাথে ওঠানামা করে। মাঝে মধ্যে মেছো পেঁচা ডেকে ওঠে কোথায় হুহহুহু-হু, রাতের অন্ধকারেও মেঘহও মাছরাঙারা জলে ঝাঁপ দেয়। অনেক সময় নেকড়ের ডাক শুনি, উউউউউউ, রহস্যময় সেই ডাক। গায়ে কাঁটা দেওয়া তাদের কোরাস কন্ঠ ছড়িয়ে পড়ে পুরোনো বনস্পতির ওপর দিয়ে, নিশীথ রাতের চাঁদের নীরবতার নিচে সেই ডাক ভেসে আসে নদীর এধারে আমাদের বাড়িতে। এসব কিছুই আমার চেনা, আমিই এখন রাতের অরণ্য। বনের শব্দ, গন্ধ, স্পর্শ আমার মজ্জাগত। কিন্তু এসব কিছুর মধ্যেই অন্য একটা কিছু জিনিস সৃষ্টি হতে থাকে। আমি যেন দেখতে পাই নদীর ঐ পাড়ে একটা অন্ধকার দলা পাকিয়ে উঠছে, ফুলে ফেঁপে উঠছে বর্ষার কালো মেঘের মতন। ফুঁসে উঠছে সেই অন্ধকার। আর তখনই বনের সব আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়। নেকড়ে, পেঁচা, ঝিঁঝিঁ, সব। জোনাকীরাও যেন কোথায় চলে যায়।

"নদী পার হয়ে সেই কালো অন্ধকার আমার দিকে তার শীর্ণ হাত বাড়িয়ে দিতে চায়। কিন্তু সেই আঁধারের মধ্যেই, সেই ফুলে ওঠা অন্ধকারের মধ্যেই কি যেন নেকড়ের চোখের মত জ্বলজ্বল করে, আমাকে যেন লক্ষ করে। এরকম মিনিটখানেক থাকে, তারপর সেই অন্ধকার, জ্বলজ্বলে চোখ মুছে যায়। আমি ঘরে ফিরে আসি। ঐসব রাতে সেই আঁধার আর আমার ঘরে আসে না। এমন যেন একবার ভয় দেখিয়েছে, আর দেখানোর দরকার নেই।"

দিনের আলোতেও অদিতার কথা শুনে বিনতার শরীরে কাঁটা দেয়। বনের পাশে গবেষণাগার, তাতে প্রায় দশ-বারোজন বিজ্ঞানী থাকে, তারা মাঝে মধ্যেই বনে যায়, নানান ছোঁয়াচে রোগ নিয়ে আসে, এছাড়া শহর থেকে দূরে থাকতে হয় তাদের, নিসঙ্গতা, একঘেয়েমী জীবনে মানসিক চাপ আছে, এসব কিছুই বিনতাকে সামলাতে হয়। অদিতা প্রায় কুড়ি বছর আছে এই কেন্দ্রে, এই বনের নাড়ীনক্ষত্র তার জানা। বিনতাই বরং নতুন, পাঁচ বছর হল এসেছে।

বনবিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণা করতে প্রায়ই জঙ্গলের গভীরে চলে যায়, একা একাই দিন দশেক থেকে ফিরে আসে। অদিতা যে কতবার বনে গিয়ে থেকেছে তার হিসাব নেই। বিনতা ভাবে, এত বছর ধরে বনে থাকতে থাকতে অদিতার মনকে বন অধিকার করে নিচ্ছে, অরণ্যের হাতছানি এরকমই।

"এরকমই হয় অনেক রাতে, শুধু একবারই এর ব্যতিক্রম হয়েছিল," অদিতা বলে, "এক রাতে ওরকমভাবেই ফুঁসে উঠছিল আঁধার, হঠাৎই মনে হল ধীরে ধীরে সেই আঁধারের মেঘ কেটে যাচ্ছে, স্পষ্ট হচ্ছে ওপাড়ের গাছগুলো। মনে হল ঐপাড়ে বনের গভীর থেকে একটা বাঁশির শব্দ ভেসে আসছে। প্রথমে নিশ্চিত ছিলাম না, কান পাতলাম। ক্ষীণ ছিল সে বাঁশি। এমন একটা উদাস করা সুর কখনো শুনি নি, মনে হল বহু অতীত থেকে, সময়কে উপেক্ষা করে, সেই বাঁশি যেন আমার জন্যই বাজছে। আর সেই বাঁশি সব আঁধার কাটিয়ে দিচ্ছে। সেই বাঁশি যেন ভোরের আলো, সে অন্ধকার কুয়াশা গলিয়ে দেয়।"

অদিতার কথায় বিনতাও যেন কেমন আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। দুজনেই অনেকক্ষণ নিশ্চুপ থাকে।

"আমার একশ সত্তর বছর পার হল, আমাকে এবার ছাড়পত্রটা দিন, ডক্টর বিনতা।" অদিতার কথায় বিনতার সম্বিত ফেরে। জানালা থেকে ফিরে এসে চেয়ারে বসে। দু'বছরে মাত্র একটা ছাড়পত্র লিখতে পারে সে। এই গবেষণাকেন্দ্রে আসার পর থেকেই অদিতা তাকে অনুরোধ করে যাচ্ছে।

বিনতা বলে, "এই মহাবিশ্বকে আপনি সচেতনভাবে উপলব্ধি করতে পারছেন, এর অস্তিত্বকে বুঝতে পারছেন। যেটুকু সময় আপনি পাচ্ছেন এই পৃথিবীতে সেটুকু ব্যবহার করুন। যখন চলে যাবেন তখন তার কিছু বুঝতে পারবেন না।"

হাসে অদিতা, বলে, "চলে তো যেতে দিচ্ছেন না, আপনিও দিচ্ছেন না, জাতিসংঘও দিচ্ছে না। আর মহাবিশ্ব থেকে আমার আর পাবার কিছু নেই। অন্যদিকে বাঁচার জন্য এই পৃথিবীটা খুব ছোট। আমি কি না দেখেছি? কেউ দুশো বছর বাঁচলে কোনো কিছু কি অদেখা থাকে? আর যতবার আত্মহত্যা করেছি ততবার আমাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এভাবে তো চলতে পারে না।"

আদিতার কথাগুলো বোঝে বিনতা। প্রতি তিন বছর অন্তর সব নাগরিকদের মস্তিষ্ককে কপি করা হয়। কপি করার পদ্ধতিটা খুবই জটিল। মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষ, নিউরন যেভাবে থাকার কথা সেভাবেই সৃষ্টি করা হয়। সেই মানুষ যদি কোনোভাবে মারা যায়-- দুর্ঘটনায়, হত্যা বা আত্মহত্যায়, কিংবা হৃদযন্ত্রের কোনো অপ্রত্যাশিত গোলযোগে তার কপি করা মস্তিষ্ককে হয় তার পুরাতন দেহে অথবা নতুন সৃষ্ট কোনো দেহে স্থাপন করা হয়। মৃত্যু বলতে যা বোঝায় পৃথিবী সেটা বিদায় করে দিয়েছে। জাতিসংঘের সনদে মৃত্যুর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, দু'শ বছর পার হলে সহজেই অনুমতি মেলে। তবে সমাজ একেবারে অসংবেদনশীল নয়, দু'শর নিচে বয়স হলেও বিশেষ ক্ষেত্রে মৃত্যুর অনুমতি মেলে, কিন্তু ছাড়পত্র পেতে অনেক আমলাতান্ত্রিক পথ পার হতে হয়।

অদিতাকে নতুন দেহ নিতে হয় নি। একবার হাতের কবজি কেটেছিল সে, বলতে গেলে দশ মিনিট পুরোপুরিই মৃত ছিল। তবে জন্ম থেকেই এখন মস্তিষ্কের কোষগুলোকে এমনভাবে শিক্ষা দেয়া হয় যে সেগুলো ত্রিশ মিনিট পর্যন্ত অক্সিজেন না পেলেও বেঁচে থাকতে পারে। চিকিৎসকরা খুব সহজেই অদিতাকে বাঁচাতে পেরেছিল।

"আমাকে এবার ছাড়পত্রটা দিয়ে দিন, ডাক্তার বিনতা। এবার আমাকে যেতে দিন।" মৃত্যুকে পুরোপুরি নিশ্চিত করতে হলে সরকারি ছাড়পত্র লাগবে। যে ছাড়পত্র তাঁর মস্তিষ্কের কপিকে পুনরায় সঞ্জীবিত করবে না।

বিনতা অদিতার দিকে তাকিয়ে থাকে। একশ সত্তর বছরের প্রবীণ মুখে কোনো বলিরেখা নেই, তীক্ষ্ণ চিবুক, মসৃণ কপোল, উজ্জ্বল বাদামী চোখ, কপালের ওপরে কাঁচা-পাকা চুল। একটা উজ্জ্বল লাল রঙ্গের স্কার্ট পরেছে অদিতা, সেটার প্রতিফলন তার মুখকে লাল করে দিচ্ছে। সেই রঙ দেখে বিনতার মুখই যেন রাঙা হয়ে যেতে থাকে, বিনতার হৃদস্পন্দন বাড়ে, হাত কাঁপে, কিন্তু মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নেয়। বলে,"এই গবেষণাকেন্দ্রের প্রাণ আপনি। আপনি না থাকলে এই কেন্দ্রের কী হবে?"

অদিতা জোরশব্দে হাসে, তার চোখে থাকে আনন্দ ও বেদনার এক মিশ্রণ। বলে, "পৃথিবীতে কোনো কিছুই কারুর জন্য আটকে থাকে না। আমি কাল আবার বনে যাচ্ছি, হয়তো দিন পনেরোর জন্য। আমার কথাটা ভুলে যাবেন না।"

অদিতার হাতটা ধরতে চায় বিনতা। বলতে চায়, আপনাকে ভোলা আমার জন্য কঠিন। আপনাকে ছেড়ে আমি দিতে চাই না।

সেই রাতে বিনতার ঘুম ভেঙ্গে যায় গভীর রাতে। কটা বাজে, ভাবে সে। ঘরের কোনো একটা জায়গা থেকে মৃদু নারীকন্ঠ ভেসে আসে, "এখন রাত দুটো বাজে।" ঘুমাবার চেষ্টা করে বিনতা, কিছুক্ষণের মধ্যেই তন্দ্রাছন্ন হয়ে পড়ে। একটা শব্দে যেন তন্দ্রা ভেঙে যায়। জানালা খোলা, বাইরের বাতাসে পর্দাটা পালের মত ফুলে উঠেছে। দূরের রাস্তার আলোটা পর্দার পেছনটাকে ম্লান উজ্জ্বল করে রেখেছে। হঠাৎই সেই আলোটা নিভে যায়, এমন যেন সেটা বিনতার মনোযোগের ওপর নির্ভর করছিল। জানালার বাইরে বাতাসটাও পড়ে গেল, পর্দাটা জানালার গ্রিলের সাথে সেঁটে গেল। তারপর আবার ফুলে উঠল। এবার মনে হল একটা অন্ধকার জীব পর্দাটাকে প্রাণ দিচ্ছে। একটা মৃদু উঁচু কম্পঙ্কের শব্দ কানে আসে বিনতার। কিসের শব্দ? এই ভাবতে ভাবতেই মনে হল সেই অন্ধকার জীবটা পর্দা ছেড়ে ঘরে প্রবেশ করেছে, তার দিকে এগুচ্ছে। ভয়ে দুটো হাত মুঠি বদ্ধ হয়ে যায় বিনতার। চিৎকার করলেই ঘরের বাতি জ্বলে যাবে, কিংবা কম্পিউটার খুলে যাবে, সে যাকে ইচ্ছা সাহায্যের জন্য ডাকতে পারে। কিন্তু বিনতার গলা দিয়ে স্বর বের হয়ে না, এক সীমাহীন শূন্যতা তাকে গ্রাস করে। কিন্তু এই শূন্যতার যেন প্রাণ আছে, অবয়ব আছে। পর্দার কাপড়ের অদৃশ্য ছিদ্রগুলি দিয়ে সেই শূন্যতা যেন গলে বেরিয়ে আসে ঘরের মধ্যে, ভাসে ঘরের মেঝের ওপর, তারপর বিছানার দিকে সেই আঁধার অনায়াসে এক মসৃণ মৃদু গতিতে এগিয়ে আসে, ঝুঁকে পড়ে বিনতার ওপর। সেই আঁধারের কোটারাগত চোখে যেন অনন্ত অন্ধকার, তার কালো লিকলিকে আঙ্গুলগুলো এগিয়ে যায় বিনতার বিস্ফারিত চোখের দিকে। পালাতে হবে, এখানে থেকে পালাতে হবে, কিন্তু তার পায়ে কোনো জোর নেই, এই তার শেষ শয্যা। এক শিরশির ঠাণ্ডা স্পর্শে হিম হয়ে যায় বিনতার শরীর। চোখ বুঁজে ফেলে সে, জোর করে চোখের পাতাদুটো আটকে রাখে, মনের মধ্যে ফুটিয়ে তুলতে চায় কোনো রঙ্গীন বনফুলের সমারোহ, বিশাল উঁচু বনস্পতির মাথায় লুকানো সূর্যের ছটা, পাহাড়ি নদীর পাথরের পাশে জলের ঘূর্ণীর উচ্ছাস। ঐ সব স্মৃতি সেই অন্ধকারকে পরাজিত করতে পারবে। তারপর বিনতার মনে হল অদিতার বাঁশি। সেই বাঁশির শব্দ সে কি শুনতে পারবে? ঐ বাঁশি আঁধার কাটিয়ে দিতে পারে বলেছিল অদিতা। কান পেতে শুনতে চায় বিনতা, কোনো বাঁশির শব্দ কি ভেসে আসছে? চোখ খোলে না বিনতা অনেকক্ষণ, আর যখন চোখ খুলল তখন সকাল হয়ে গেছে। বাঁশি শোনার চেষ্টা করতে করতে কখন ভোর হয়ে গেছে।
 

দ্বিতীয় পর্বের লিঙ্ক

লেখক পরিচিতি
দীপেন ভট্টাচার্য
জন্ম ১৯৫৯। আদি নিবাস এলেঙ্গা, টাঙ্গাইল।
বিজ্ঞানী। গল্পকার।

মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে পিএইচডি করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট ইন্সটিটিউটের গবেষক ছিলেন। পরে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড ক্যাম্পাসে (ইউসিয়ার) গামা রশ্মি জ্যোতির্বিদ হিসেবে যোগ দেন। এ ছাড়া ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড কলেজে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। ১৯৭৫ সালে তিনি বন্ধুদের সহযোগিতায় 'অনুসন্ধিৎসু চক্র' নামে একটি বিজ্ঞান সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।

বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর প্রকাশিত বই : দিতার ঘড়ি, নিওলিথ স্বপ্ন, অভিজিৎ নক্ষত্রের আলো।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন