বুধবার, ২৯ জুন, ২০১৬

পাঠপ্রতিক্রিয়া : বিমল করের গল্প 'নিগ্রহ'

দীপেন ভট্টাচার্য

সহমর্মী ব্যথা

নিগ্রহ মানে উৎপীড়ন, দমন, নির্যাতন, হয়রানি, অত্যাচার। পুলিশের হেফাজতে রয়েছে এক তরুণ, তার নাম সুবোধ। নিগ্রহ তারই ওপর, অথবা বলা যেতে তার ছোট জীবনটার সমস্তটাই নিগ্রহে ভরা। পুলিশ তাকে আর একটি তরুণকে ছুরি মারার অভিযোগে, বোমা বানানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। সে ছুরি মেরেছে কিনা আমরা জানি না। গল্পকার প্রথম পুরুষে একজন প্রশ্নকর্তা, সে নানাবিধ চাপ সৃষ্টি করে সুবোধের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করতে চাইছে। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম সে একজন সরকারি গোয়েন্দা বা পুলিশ অফিসার।
কিন্তু কথোপকথনে প্রশ্নকর্তা দাবি করে সে পুলিশের লোক নয়; তাই আমাদের ধরে নিতে হবে সে বিশেষ কোনো বাহিনীর লোক যারা রাজনৈতিক সন্ত্রাস বা ঐ ধরনের কোনো কারণে নিয়োজিত হয়। হয়তো সময়টা নকশাল আন্দোলনের, এই জিজ্ঞাসাবাদের পেছনে সাধারণ অপরাধ নয়, বরং একটা রাজনৈতিক দিক আছে। এসব পুরোপুরি বুঝে ওঠার মত অবস্থা নেই, সেটা গল্পের মূল ঘটনাপ্রবাহের জন্য প্রয়োজনীয় নয়। কারণ এই গল্প পশ্চিম বঙ্গের এক বিশেষ সময়ের বিশেষ কাহিনী নয়, এই গল্প মানব সমাজের চিরায়ত দ্বন্দ্বেরই কাহিনী। 

এই প্রশ্নোত্তর পর্যায়ে ধীরে ধীরে আমাদের কাছে উন্মোচিত হয় সুবোধের পরিবারের কাহিনী, দারিদ্রের পাকচক্রে তার বাবা ও মা’র পতন, তার নিজের পায়ে দাঁড়াবার ব্যর্থ চেষ্টা, তার বোনের দুর্গতি। কিন্তু কাহিনীটি, আমার মতে, সুবোধের কাহিনী নয়। কাহিনীটি সেই গোয়েন্দার, একটি মানুষ যে নানাবিধ মুখোশ নিয়ে বিচরণ করে এবং তার মধ্যে যে কোনটি তার নিজস্ব সেটা বোঝা যায় না। 

ছোট গল্প সম্পর্কে হারুকি মুরাকামির একটি উক্তি দেখেছিলাম একবার। বলেছিলেন ছোট গল্প হল কোমল ছায়ার মত, এক একটি গল্প লেখকের অস্পষ্ট পদচিহ্ন। আমি ধরে নিয়েছি তিনি বলতে চেয়েছেন সেই পদচিহ্ন লেখকের সৃজন-সৌধের এক একটি ইট। গল্প লেখার সময় লেখককে অন্য মানুষ হতে হয়, এমন কি অনেক সময় অন্য একটি প্রাণী, কিংবা অজৈবিক পদার্থও হতে পারেন। মানুষের মনের গভীরতা ও মাত্রা প্রায় অসীম, সেখানে ঘটনার রামধনু তার বৈচিত্র্যে পাঠককে সম্মোহিত করবে, ভাবাবে, পড়া-শেষে রোমন্থন করাবে। তাই নিগ্রহ পড়া শেষে আমরা লেখকের নিগ্রহদাতা হয়ে উঠবার প্রক্রিয়াটা সম্পর্কে চিন্তা করি।

গল্পটি দুটি অংশে বিভক্ত। প্রথম অধ্যায়ে প্রশ্নকর্তা যেন সুবোধের শুভানুধ্যায়ী, আপন বন্ধু। যদিও সে সুবোধকে একটি ছেলেকে ছুরি মারার অভিযোগে অভিযুক্ত করতে চাইছিল, কিন্তু সে সুবোধকে সিগারেট দিতে চায়, চা খাওয়ায়। দ্বিতীয় অংশে প্রশ্নকর্তার রূপ বদলায়, সে হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর এক দানব। একই মুদ্রার যেন দুটো পিঠ, এক পিঠে সে যেন পিতার ন্যায় সন্তানবৎসল, অন্য পিঠে সে দানব অসুর। প্রতিটি মানুষের মনের সম্ভাব্য বহুচারিতাই এখানে মূর্ত। 

বিমল কর পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে বর্ণনা করেন, এটা ওনার সব লেখার মধ্যেই আছে। প্রথম পর্বটি সংঘটিত হয় প্রশ্নকর্তার মূল অফিসে। তিনি লিখছেন 

এই ঘর তেমন বড়ো নয়। মাঝারি। জানলা আছে; তবে আপাতত বন্ধ। ভারী পর্দা টানা রয়েছে আগাগোড়া জানলায়। বাইরে ছিটেফোঁটা রোদ আসছে না; আলো প্রায় নেই। কোনো শব্দই শোনা যায় না। দুটো আলো, একটা মাথার ওপর, অন্যটা দেওয়ালে এমনভাবে জ্বলছে যেন ছেলেটিকে আমি স্পষ্ট দেখতে পাই। নিজে আমি একটু আবছায় বসে আছি। এখন গরমকাল নয়, তবু মাথার ওপর পাখাটা মিহি রি-রি শব্দ করে ঘুরছিল। 

মুহূর্তে একটা ভয় বা উত্তেজনা পাঠককে গ্রাস করে, আসন্ন কোনো বিপদের আহ্বান যেন এই ঘরটিতে। পাঠক চেষ্টা করে প্রশ্নকর্তাকে বুঝতে, কি ধরনের মানুষ সে? সে কি আমাদের মত চিন্তাভাবনা করে। এই পুত্রসম ছেলেটির প্রতি তার ব্যবহার কি যথাযথ? পুলিশের নিন্দা করছে প্রশ্নকর্তা, বলেছে তার মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ এসেছিল এক পুলিশ অফিসারের সাথে, নাকচ করে দিয়েছে। এটাও এক ধরণের চাল যাতে সুবোধ তার বোন বেলা সম্পর্কে মুখ খোলে। সে সুবোধকে চা খাওয়ায়, সেই সুযোগে জানতে চায় সুবোধের অন্য মদ-গাঁজার নেশা আছে কিনা। কুমারী বেলার গর্ভবতী হওয়া নিয়ে ইঙ্গিত করলে সুবোধ ক্ষিপ্ত হয়। প্রশ্নকর্তা তার উত্তরে বলে -- 

তোমার বাড়িকে বাদ দিয়ে কথা বলতে পারলে ভালো হত। আমি খুশি হতাম। কিন্তু তাঁর উপায় নেই। তোমার বাড়ি তোমায় তৈরি করেছে।

তোমার বাড়ি তোমাকে তৈরি করেছে কথাগুলোর মধ্যে সত্যতা আছে। আমাদেরকে গড়তে পরিবেশের প্রভাব অনস্বীকার্য। সুবোধের বাবা নেশা করত, মা’র সঙ্গে সবসময় ঝগড়া হত। মা বাড়িকে চালানোর জন্য এক স্কুলে ঝি’র কাজ করত। সুবোধ নিজে কিছু করে উঠতে পারে নি। 

লেখক এবার আমাদের দ্বিতীয় অধ্যায়ে নিয়ে এলেন, নাটকের দ্বিতীয় পালায় ঘর বদলানোর দরকার পড়ল। বিমল কর লিখছেন-- 

এই ঘরের চেহারায় আপাতদৃষ্টিতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সরু, লম্বা ঘর। ছোটো। একটি মাত্র লম্বাটে জানলা। জানলা বন্ধ। পর্দা ঝুলছে। ঘরের মাথার দিকে ঘুলঘুলিতে একটা একজস্ট ফ্যান, পাখাটা চোখে পড়ে না। সেটা ঘুরছিল। শব্দ হচ্ছিল সামান্য। দুটি মাত্র চেয়ার ঘরে। একটা টেবিল- লম্বা সরু ধরনের, ডাক্তারদের রোগী দেখবার চেম্বারে যেমন থাকে। আপাতত মিহি বাতি জ্বলছিল ঘরে। জোরালো বাতিগুলো নেভানো। সেগুলো কোনটা কোথায় বোঝা যায় না। বোঝা যায় না- এই ঘরের দেওয়ালে একটা চোরা ছোটো কাবার্ডও আছে। একেবারে স্তব্ধ ঘর। পাখার একঘেয়ে শব্দ ছাড়া কোনও শব্দ শোনা যায় না।

লিখছেন ‘আপাতদৃষ্টিতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই’, অথচ ভয়ের সব সরঞ্জামই এখানে মজুত। ঘরটার নাম প্রশ্নকর্তা দিয়েছেন জতুগৃহ। মহাভারতে পঞ্চপাণ্ডব ও কুন্তীকে পুড়িয়ে মারার জন্য দুর্যোধন দাহ্য পদার্থ দিয়ে জতুগৃহ নির্মাণ করেছিল। দুর্যোধনের সঙ্গে চারিত্রিক মিলের যে পরিহাস সেটা যেন প্রশ্নকর্তা স্বপ্রণোদিত হয়েই গ্রহণ করেছে। সরু লম্বা টেবিলটা যে টর্চার করবার জন্য ব্যবহার করা হয় সেটা পাঠক ভালভাবেই বুঝছে। বুঝছে না শুধু সুবোধ। তাকে প্রশ্নকর্তা চায়ের সঙ্গে ওষুধ খাইয়েছে যে ওষুধ তাকে আচ্ছন্ন করছে, বিচারবোধের বুদ্ধি বিলুপ্ত করেছে। 

প্রথম অধ্যায়েই প্রশ্নকর্তা হাত থেকে তার প্রতিদিনের পড়া আঙটি খুলে পড়েছিল পঁচিশ ছুঁচের টর্চার করার আঙটি। আঙটি বদল যেন মুখোশ পাল্টানোর মত একটা ব্যাপার। একটা চরিত্র আলমারিতে তুলে রেখে অন্য চরিত্র ধারণ করা। প্রথম অধ্যায়ে আমরা সুবোধের পরিবার সম্পর্কে যে ছিটেফোঁটা জ্ঞান পেয়েছিলাম তাই দ্বিতীয় পর্যায়ে বর্ধিত হল তীক্ষ্ণ প্রশ্নের বানে। সুবোধের বাবার চৌর্যবৃত্তি, তার দায়িত্বহীনতা, তরুণী বিধবা পিসী যে তাদের বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছিল - তার দুর্গতি, বেলা ও মা’র মধ্যে চুলোচুলি, বেলার লুকিয়ে বাচ্চু নামে একটি ছেলেকে বিয়ে করা, চুরি করতে গিয়ে বাচ্চুর মানুষের হাতে পিটুনি খেয়ে মৃত্যু। বিমল কর পাঠককে পালাতে দেন না। সুবোধ বলে --

আমরা ছেলেবেলা থেকে গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগির মতন বেড়ে উঠেছি। …….. তারপর? ..... হ্যাঁ- তার পরও আছে। জন্তু-জানোয়ার, রাস্তার কুকুর। ফুটপাতের বাচ্চাকাচ্চাও বড়ো হয়। তারা কী খেয়ে বড়ো হয়, কেমন করে বড়ো হয়- সে-সব আপনারা ভেবে দেখবেন।

সুবোধের গায়ে বোমার স্প্লিনটারের চিহ্ন, পায়ের কড়ে আঙুল উড়ে গেছে। প্রশ্নকর্তা তাকে বোমা বানানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। কিন্তু সুবোধ বলে তার মাছ বিক্রির টাকা কেড়ে নিতে গুণ্ডারা তাকে বোমা মেরেছিল। প্রশ্নকর্তা সুবোধের কাটা কড়ে আঙুলের জায়গায় হাত দিতে গেলে সুবোধ সেই পা তুলে প্রশ্নকর্তার মুখে লাথি মারে। আমরা ভাবি সেটা এতক্ষণ ধরে প্রশ্নের জের। কিন্তু সুবোধ শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বলে --

আমি বুঝতে পারিনি। ভেবেছিলাম- আপনি কোনও চালাকি করছেন। ওই কাটা জায়গাটায় আমার খুব ব্যথা। এখনও। ভীষণ কষ্ট হয়। 

প্রশ্নকর্তা রুমাল দিয়ে নাক-মুখের রক্ত পরিষ্কার করতে করতে ভাবে --

বলতে চাইলাম, জানি; আমারও হয়। সুবোধ বুঝল কিনা কে জানে। 

টর্চার যে করে তার কি কষ্ট হয় সেটা লেখক উহ্য রেখেছেন। কিন্তু একটা তলে নিপীড়িত ও নিপীড়নকারীর বোধের কী মিল হতে পারে সেটা পাঠককে ভাবায়। প্রশ্নকর্তার মুখে সুবোধের লাথি মারা হয়তো ইচ্ছাকৃত নয় (যদিও এতে পুরোপুরি নিঃসন্দেহ হওয়া যায় না), কিন্তু বোমায় উড়ে যাওয়া কাটা অংশের জায়গাটার ব্যথার সঙ্গে প্রশ্নকর্তার সহমর্মিতা পাঠককে ভাবায়। 

বিমল কর গল্পটি শেষ করেছেন ‘সুবোধ বুঝল কিনা কে জানে’ বাক্যটি দিয়ে। এখানে ‘কে জানের’ মধ্যে পাঠকও অন্তর্গত। আমি প্রশ্নকর্তার ব্যথার উৎস সম্পর্কে অনুমান করতে পারি, কিন্তু তাতে নিঃসন্দেহ হতে পারি না। নিপীড়ক যে ব্যথার সৃষ্টি করে ও নিপীড়িত যে ব্যথাটি পায়, এই একটি ক্রিয়াকর্ম দুজন দুভাবে অনুভব করলেও ঘটনাটি যেন তারা ভাগ করে নেয়। তাই দুর্যোধন নিপীড়ক হয়তো বলে-- ‘'আমারও হয়’'। সে এক অন্যায় সৃষ্টি ও সহ্য-করা সমাজের ক্রীড়নক, এই অত্যাচারী হিসাবে সেও অসহায়। হয়তো আর্ট ও শিল্পের গুণ এর মধ্যেই নিহিত। একটা কুয়াশাচ্ছন্ন অনুমান যা কিনা আমাদের মনের বহুচারিতাকে অবলম্বন করে পৃথিবীর মাঝে আমাদের অস্তিত্বকে অর্থ দেয়। সেই অর্থ হতে পারে সুবোধের রাস্তার কুকুরের মত বড় হওয়া, হতে পারে সমাজের আইন-শৃঙ্খলার টর্চার পদ্ধতির আবিষ্কার, সমাজের অন্যায়কে সহ্য করা, হতে পারে লেখক ও পাঠকের মিথষ্ক্রিয়ায় সুবোধের ব্যথা, প্রশ্নকর্তার ব্যথা পাঠকের মাঝে সঞ্চারিত করা। সেই কুয়াশাচ্ছন্ন অনুমানই এই গল্পের denouement - জটোদ্ধার, উপসংহার, যবনিকা। তাই এই কাহিনী নির্দিষ্ট স্থান ও কাল ছাড়িয়ে সর্বজনীন হয়ে ওঠে। 

আমার কাছে ছোট গল্প লেখকের কোমল ছায়া নয়। আমার কাছে সেই ছায়ার আকার সুস্পষ্ট, সে ছায়া পাঠককে স্বস্তি দেয় না।  
---------------------------------------------------------



 

লেখক পরিচিতি
দীপেন ভট্টাচার্যকথাসাহিত্যিক। প্রবন্ধকার। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন