বুধবার, ২৯ জুন, ২০১৬

পার্কের ধারাবাহিকতা


হুলিও কর্তাজার 
অনুবাদ: অর্ক চট্টোপাধ্যায় 

কয়েকদিন হল ও উপন্যাসটা পড়তে শুরু করেছিল। তারপর কাজেকর্মে কদিন আর হাত দিতে পারেনি। সেদিন ট্রেনে করে এস্টেট যাবার সময় আবার খুলে পড়তে লাগল। আস্তে আস্তে কাহিনী এবং চরিত্ররা দানা বাঁধতে লাগল আর ও তাদের মধ্যে হারিয়ে গেল। সেদিন দুপুরে এজেন্টকে চিঠি লিখে আর এস্টেট ম্যানেজারের সঙ্গে জয়েন্ট অউনারশিপ নিয়ে আলোচনা করার পর পড়ার ঘরের শান্ত পরিবেশে ও বইটায় আবার সেঁধিয়ে গেল আর জানলা দিয়ে বাইরের পার্কের ওক গাছগুলোর দিকে বারবার তাকাতে লাগল।
পছন্দের আরামকেদারায় গা-টা এলিয়ে দিয়ে দরজার দিকে পীঠ করে বসে (তা না হলে দরজা দিয়ে কারুর না কারুর ঢোকার বিরক্তিকর প্রত্যাশাটুকু কাটিয়ে ওঠা যেত না) ও বাঁ হাত দিয়ে বারকতক আরামকেদারার সবুজ হাতলটায় হাত বুলিয়ে নিলো। আর তারপর শেষের চ্যাপ্টারগুলো পড়তে শুরু করল। চরিত্রগুলোর নাম বা ছবি মনে করতে বিশেষ বেগ পেতে হল না। কাহিনীর কুহক ওকে দ্রুতই কাছে টেনে নিল। লাইন বাই লাইন নিজের চারপাশের সবকিছু থেকে নিজেকে আলাদা করে নেওয়ার অশ্লীল এক মজা অনুভব করতে লাগলো অথচ ওর মাথাটা যে আরামকেদারার সবুজ ভেলভেটের সান্নিধ্যেই জিরিয়ে নিচ্ছিলো এই অনুভূতিটাও ওকে ছেড়ে গেলো না। ও তখনও জানত সিগারেটগুলো হাতের কাছেই আছে আর জানলার বাইরের বিরাট পার্কে দুপুরের হাওয়া ওক গাছের নীচে তখনও নেচে বেড়াচ্ছে। একেকটা শব্দ ধরে ধীরে ধীরে ও নায়ক-নায়িকার নানাবিধ মনকষাকষিতে মগ্ন হয়ে পড়ল। দৃশেরা যেখান থেকে রং আর চাঞ্চল্য নিয়ে আসে, সেখানে গিয়ে ও পাহাড়ি কেবিনের শেষ সাক্ষাতের মুহুর্তে ঢুকে পড়ল। আগে এল নায়িকা। সন্দিহান এবং উত্তেজিত। তারপর তার প্রেমিক। তার মুখ কেটে গেছে ডালের আচড়ে। নায়িকা চুম্বন দিয়ে মুছে দিল গালের রক্ত কিন্তু নায়ক হাত দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল অন্তরঙ্গতা। সে তাদের দুর্দমনীয় কামনার চিরায়ত পাঠক্রমের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে আসেনি জঙ্গলের শুকনো পাতা আর ক্লান্ত পথের মুখ চেয়ে। তার বুকের ঘনিষ্ঠ তাপে উষ্ণ হয়ে উঠলো উদ্যত ছোরা। আকাঙ্খার এক কমনীয় সংলাপ পাতার পর পাতা বেয়ে সর্পিল নদীর উদ্দামতায় বয়ে যেতে লাগলো, যেন অনন্তকাল থেকেই সব অমন হবে ঠিক হয়ে রয়েছে। প্রেমিক নায়কের শরীরের অংশ প্রত্যংশে অস্লিষ্ট সেইসব আলিঙ্গন যেন তাকে বিরত করতে গিয়েও চিত্রার্পিত করছিল আরেকটি শরীরকে...সেই অপর শরীর যার বিনাশ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। বিস্মৃত হয়নি কোনো কিছুই: অজুহাত, ভুলত্রুটি, বাধাবিপত্তি। খুঁটিনাটি সব বিষয়ের চুলচেরা নিরুত্তাপ বিবেচনা কি আর গালের কাছে আদরের উদ্দেশে উঠে আসা হাতের জন্য অপেক্ষা করে? অন্ধকার ঘনিয়ে আসছিল। 

পরস্পরের দিকে না তাকিয়ে, আসন্ন কর্মযজ্ঞের কথা ভাবতে ভাবতে তারা কেবিনের দরজা থেকে যে যার মত আলাদা হয়ে গেল। নায়িকার পথ ছিল উত্তরে। আর নায়কের বিপরীতে। সে একবার পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে নিল নায়িকার বিস্রস্ত চুল অন্ধকারে মিশে গেছে। বনবাদাড় আর ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে সে ছুটতে লাগল যতক্ষণ না সন্ধ্যার হলুদ কুয়াশার মধ্যে বাড়ির বাইরের সারিবদ্ধ গাছগুলোকে চিনতে পারে। কুকুরদের ডাকার কথা ছিল না আর তারা ডাকলোও না। এই সময় এস্টেট ম্যানেজারও থাকবে না। নায়ক কয়েকটা সিঁড়ি উঠে বাড়িতে প্রবেশ করলো। তার কানের ভেতরকার রক্তের মধ্যে দিয়ে রুদ্ধশ্বাসে ভেসে এলো নায়িকার কথাগুলো: প্রথমে একটা নীল পার্লার, তারপর গ্যালারী, তারপর কার্পেটে মোড়া সিঁড়ি। ওপরে ওঠার পর দুটো দরজা। প্রথম বেডরুমে কেউ ছিল না। দ্বিতীয়টাও ফাঁকা। স্যালনের দরজা, হাতে ছোরা, বিশাল জানলা দিয়ে আসা আলো, সবুজ ভেলভেটে মোড়া আরামকেদারা আর সবশেষে তার ওপর বসা উপন্যাস পড়তে থাকা লোকটার মাথা।

২টি মন্তব্য:

  1. ধারাবিকতা সংক্রান্ত ধারণাটাকেই নিয়ে জাগলিং। দারুণ।

    উত্তরমুছুন
  2. বিভূতিভূষণ নিজের ৃতদেহ দেখেছিলে্ন ৃত্যুর য়েকদিন আগে,এমন একটি কাহিনি শোনা যায়। মনে পড়ে গেল উপন্যাস পাঠের এই গল্প পড়ে। চমৎকার।

    উত্তরমুছুন