বৃহস্পতিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

নদীতে

মূল: গী দ্য মোপাসাঁ
অনুবাদ :  শামসুজ্জামান হীরা

গত গ্রীষ্মে আমি প্যারি থেকে বেশ কয়েক লিগ (প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটারে ফরাসি এক লিগ -- অনুবাদক) দূরে সিন নদীর পাড়ে ছোট্ট একটা গ্রামীণ কুটির ভাড়া নিয়েছিলাম। প্রতিসন্ধ্যায় সেখানে যেতাম ঘুমানোর জন্য। কিছুদিনের মধ্যেই আমার প্রতিবেশীদের মধ্য থেকে ত্রিশ-চল্লিশ বছর বয়সের একজনের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। সে ছিল নিঃসন্দেহে আমার দেখামতে সবচেয়ে অদ্ভুত প্রকৃতির একজন মানুষ। এক পুরনো নৌচালক এবং নৌচালনায় বাতিকগ্রস্ত। সবসময় থাকত জলের ধারে, জলের ওপর, বা জলের মধ্যে। খুবসম্ভব নৌকাতেই তার জন্ম হয়েছিল এবং আখেরে নির্ঘাত সে মারাও যাবে নৌকাতেই!


এক সন্ধ্যায় যখন আমরা সিন নদীর পাড় ধরে হাঁটছিলাম, আমি তাকে তার জীবনে নদী নিয়ে কিছু অভিজ্ঞতার গল্প বলতে বললাম। চমৎকার লোকটি তৎক্ষণাৎ বেশ উদ্দীপ্ত হল, তার পুরো অভিব্যক্তিতে এল পরিবর্তন, সে হয়ে উঠল প্রগলভ, প্রায় কবিসুলভ। তার হৃদয় জুড়ে ছিল প্রবল আবেগ; এক সর্বগ্রাসী, অনিবার আবেগ — আর তা নদীকে নিয়ে।

আহ্, সে আমাকে বলল, কত স্মৃতিই না আমার আছে নদীকে ঘিরে, যা তুমি দেখছ, বয়ে চলেছে আমাদের পাশ দিয়ে। তোমরা যারা শহুরে কিছুই জান না নদী সম্পর্কে। কিন্তু একজন জেলের কাছ থেকে শোনো কী অর্থে সে ‘নদী’ এই শব্দটাকে বোঝে। তার কাছে এটা একটা রহস্যময় বস্তু, বিশাল, অজ্ঞাত, আলেয়া ও অলীক কল্পনার এক জগৎ, যেখানে কেউ রাতে যা দেখে আদপে তার কোন অস্তিত্ব নেই, যে শব্দ শোনে তা বাস্তবে শোনা যায় না; কেন, তা না-বুঝেই গায়ে কাঁটা দেয়, যেমন গোরস্থানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ঘটে — এবং এটা আসলেই তো সবচেয়ে ভয়াল গোরস্থানগুলোর একটি, যেখানে নেই কোনও সমাধিস্তম্ভ।

নদীর নৌচালকের কাছে স্থলভাগকে মনে হয় সীমাবদ্ধ, এবং অন্ধকার রাতে যখন আকাশে থাকে না চাঁদ, নদীকে মনে হয় সীমাহীন। একজন নাবিকের কিন্তু এরকম অনুভূতি জাগে না সমুদ্র সম্পর্কে। সমুদ্র প্রায়শই অনুশোচনাহীন এবং নির্দয়, এ-কথা সত্যি, তবে ওটা ভয়াবহ শব্দ তোলে, গর্জন করে, সেজন্যই সমুদ্র সৎ — বিশাল; কিন্তু নদী নিঃশব্দ এবং ছলনাময়ী। সে কথা বলে না, বয়ে চলে শব্দহীনভাবে, আর জলের প্রবহমান এই নিরন্তর গতি আমার কাছে সমুদ্রের বিশাল তরঙ্গের চেয়েও ভয়াবহ মনে হয়!

কল্পনাবিলাসীদের ধারণা, সাগর তার বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখে বিপুল নীলের জগৎ, সেখানে যারা ডোবে তারা ঘুরে বেড়ায় বড় বড় মাছের সঙ্গে, উদ্ভট বনাঞ্চলে এবং স্বচ্ছ কাঁচের গুহায়। নদীর আছে শুধুমাত্র কৃষ্ণ গভীরতা যেখানে একজন কাদার মধ্যে পড়ে থেকে পচে। তা যাই হোক, নদী যখন উদীয়মান সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করে এবং খসখস ধ্বনি-তোলা নলখাগড়া আচ্ছাদিত পাড়ে মৃদুভাবে চাপড় দেয় তখন তাকে অপরূপ দেখায় বৈকি।



সমুদ্র নিয়ে কবি বলেন,

“হে তরঙ্গমালা, কত মর্মন্তুদ বিয়োগগাঁথাই না তোমরা জানো

—গভীর তরঙ্গমালা, নতজানু মায়েদের হৃদয়ের ভয়াল আতঙ্ক!

তোমরা সেগুলো বলাবলি কর একে অন্যেতে যখন গড়িয়ে চল

বহমান জোয়ারের ওপর, এবং এটা তাই যা দেয় প্রতিনিয়ত

তোমাদের কণ্ঠস্বরে হতাশার বিরামহীন, বিরামহীন বিষণ্ন নিস্বন

যখন সন্ধ্যাকালে তোমরা লুটিয়ে পড় উত্তাল জোয়ারের তোড়ে।”



হ্যাঁ, আমি ভাবি, গর্জমান ঢেউগুলো যা বলে তার চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ বিয়োগান্ত গল্প তুচ্ছ তৃণগুলো ফিসফিসিয়ে বলে তাদের অতি মৃদু স্বরে।

কিন্তু তুমি যখন আমাকে আমার স্মৃতি থেকে কিছু বলতে বলছ, আমি একটি মাত্র ঘটনার কথা বলব, যা বছর দশেক আগে ঘটেছিল।

এখন যেখানে আছি সেখানেই থাকতাম আমি, অর্থাৎ মাদার ল্যাফোঁর বাড়িতে, এবং আমার একজন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ল্যুই বার্নেত, যে এখন সুপ্রিম কোর্টে চাকরি করার কারণে নৌকা বাওয়া, চটি জুতা পরা এবং উদাম গলায় থাকা ছেড়ে দিয়েছে, সে বসবাস করত ‘সি’ নামের গ্রামে, নদী থেকে আরও দু লিগ দূরে। আমরা প্রতিদিন একসঙ্গে খাবার খেতাম, কখনও তার কখনও বা আমার ঘরে।

এক সন্ধ্যায় আমার বারো-ফুট লম্বা নৌকা, যা প্রতিরাতেই খুব কষ্ট করে বেয়ে থাকি তা নিয়ে যথেষ্ট পরিশ্রান্ত হয়ে আমি বাড়ি ফিরছিলাম। রেলওয়ে ব্রিজের দুশো মিটার দূরে ওই নলখাগড়া আচ্ছাদিত স্থানে কিছুক্ষণের জন্য দম নিতে থামলাম ।

চমৎকার রাত, চাঁদ উজ্জ্বল আলো ছড়াচ্ছিল, নদীও ঝলমল করছিল, বাতাস ছিল শান্ত এবং নরম। প্রকৃতির এই প্রশান্তভাব আমাকে মোহিত করল। আমি নিজে নিজেই ভাবলাম, এই জায়গাটাতে একটু মৌজ করে পাইপ টানলে মন্দ হয় না। নোঙর তুলে নিয়ে আমি ওটা নদীতে ফেললাম।

নৌকা স্রোতের টানে ভাসতে ভাসতে ভাটির দিকে চলল এবং নোঙরের শেকলের শেষ প্রান্তে গিয়ে থেমে গেল। আমি নৌকার পেছন দিকটায় ভেড়ার চামড়ার ওপরে যদ্দুর সম্ভব আরাম করে বসলাম। কোনও শব্দ শোনা যাচ্ছিল না, শুধুমাত্র মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছিল আমি শুনছিলাম পাড়ের গায়ে জলের প্রায় অনুপলব্ধ চাপড়, আর দেখছিলাম লম্বা নলখাগড়াগুলোর ঝোপ, যেগুলোকে আকারে অদ্ভুত দেখাচ্ছিল এবং মনে হচ্ছিল সময় সময় নড়ছে।

নদীটি ছিল পুরোপুরি শান্ত, কিন্তু নিজেকে মনে হল কেমন এক অস্বাভাবিক নৈঃশব্দ্য দ্বারা পরিবেষ্টিত। সকল সৃষ্টি, বিভিন্ন জাতের ব্যাঙ এবং জলাভূমির সকল নৈশকালীন গায়ক যেন নীরব।

হঠাৎ করেই আমার ডান পাশে খুব কাছ থেকে একটি ব্যাঙ ডেকে উঠল। আমি চমকে উঠলাম। ডাক বন্ধ হল। আমি আর কিছু শুনলাম না এবং মনকে সহজ করবার জন্য ধূমপানের সিদ্ধান্ত নিলাম। যদিও পাইপ-রংকারী হিসেবে যথেষ্ট নামডাক ছিল আমার, কিন্তু পাইপ ফুঁকতে পারছিলাম না। দ্বিতীয়বার টান দিতেই বমি-বমি লাগল; সিদ্ধান্ত ত্যাগ করলাম অবশেষে। গলা ছেড়ে গান গাইতে শুরু করলাম। কিন্তু নিজের গলার আওয়াজ নিজের কাছেই বিরক্তিকর ঠেকছিল। কী আর করা, অগত্যা নিঃসাড় শুয়ে থাকলাম। কিন্তু নৌকার সামান্য দুলুনিও তখন আমার বিরক্তি উৎপাদন করছিল। মনে হচ্ছিল, যেন ওটা প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিচ্ছে নদীর এ-পাড় থেকে ও-পাড়ে, বারংবার স্পর্শ করছে প্রতি পাড়। তখন আমার মনে হল, কোনও এক অদৃশ্য শক্তি, বা সত্তা নৌকাটাকে জল থেকে টেনে ওপরে তুলে ধরছিল, তুলে ধরছিল ওটাকে ফের ফেলে দেবার জন্য। ঝড়ের মধ্যে আমাকেও যেন শূন্যে ছুড়ে দেওয়া হচ্ছিল। চারপাশে হট্টগোল শুনতে পাচ্ছিলাম। আমি দ্রুততার সঙ্গে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালাম। আর কী আশ্চর্য, সবকিছু শান্ত, জল চকচক করছিল।

আমি অনুভব করলাম, আমার স্নায়ুতন্ত্র যথেষ্ট নড়বড়ে দশায়, এবং সিদ্ধান্ত নিলাম স্থান ত্যাগ করবার। নোঙরের শেকল ধরে টানলাম, নৌকা নড়তে শুরু করল; কিন্তু কেমন এক বাধা অনুভব করলাম। আরও জোরে টানতে লাগলাম, কিন্তু নোঙর উঠে এল না; নদীর তলদেশে কিছু একটার সঙ্গে ওটা এমনভাবে আটকে গিয়েছিল যে, আমি টেনে তুলতে পারছিলাম না। আবার টানলাম, কিন্তু সব চেষ্টা বৃথা। তখন নোঙরের অবস্থান পরিবর্তনের জন্য বৈঠা দিয়ে নৌকার মাথা স্রোতের উজানের দিকে ঘোরালাম। এতেও কিছু হল না, ওটা তখনও আটকেই থাকল। আমি ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে জোরে জোরে নোঙরের শেকল ঝাঁকাতে থাকলাম। নাহ্, একচুলও নড়ল না! হতাশ হয়ে আমি বসে পড়লাম এবং আমার অবস্থা নিয়ে ভাবতে লাগলাম। আমি শেকলটা ভেঙে ফেলা বা ওটাকে নৌকা থেকে বিচ্ছিন্ন করার কথা কল্পনাও করতে পারলাম না, কেননা ওটা ছিল যথেষ্ট মোটা এবং আমার বাহুর মত পুরু এক বাঁকানো কাষ্ঠখণ্ডের সঙ্গে আটকানো। যাহোক, যেহেতু আবহাওয়া ছিল চমৎকার, ভাবলাম খুব বেশি দেরি হবে না, যখন জেলেরা আমার সাহায্যে এগিয়ে আসবে। দুর্ভাগ্য, মনে হল, আমার পিছু ছেড়েছে। আমি বসে পড়লাম এবং শেষপর্যন্ত পাইপ টানতে সক্ষম হলাম। এক বোতল রাম ছিল; দু তিন গ্লাশ পান করলাম, এবং এ-অবস্থায় একটু হাসতেও পারলাম। ভালোই গরম, দরকার হলে তারাভরা মুক্ত আকাশের নিচে ঘুমোনো যায় বড় ধরনের কোনও বিপদের আশঙ্কা না করে।

হঠাৎ করেই নৌকার পাশে একটা ছোট্ট আঘাতের শব্দ কানে এল। আমি আঁতকে উঠলাম এবং শীতল ঘামে আমার সারা শরীর ভিজে গেল। শব্দটি, নিঃসন্দেহে স্রোতের সাথে ভেসে যাওয়া কোনও কাঠের টুকরো থেকে উৎপন্ন। ব্যস, ওটাই যথেষ্ট, আমি আবার অদ্ভুত স্নায়বিক আলোড়নের শিকারে পরিণত হলাম। আমি শেকলটা ধরলাম এবং আমার পেশিগুলোকে মরিয়া প্রচেষ্টায় টানটান করলাম। নোঙর সেভাবেই আটকে রইল। অবসন্ন আমি, আবার বসে পড়লাম।

নদী ধীরে ধীরে ঢেকে গেল জলের কাছাকাছি ঝুলে-থাকা গাঢ় শাদা কুয়াশায়, যে কারণে উঠে দাঁড়িয়েও না দেখতে পেলাম নদী, না আমার পদযুগল, না আমার নৌকা, কিন্তু আঁচ করতে পারলাম নলখাগড়ার ডগা, এবং কারও দূরে চাঁদের আলোয় শুয়ে-থাকা ধবধবে শাদা সমতলভূমি; ওখান থেকে কিছু বড় কালো কালো ছোপ উঠে গেছে আকাশের পানে, যা সৃষ্টি হয়েছে ইতালিয়ান পপলার গাছের সারিগুলো দ্বারা। মনে হল আমি তুলোর মত শাদা মেঘে কোমর অবধি সমাধিস্থ, এবং বহুরকম অদ্ভুত কল্পনা আমার মনে এসে ভিড় করল। মনে হল কেউ একজন আমার নৌকায় ওঠার চেষ্টা করছে, যা আমি আর পার্থক্য করতে পারছি না, এবং গাঢ় কুয়াশায় আবৃত নদী ভরে আছে উদ্ভট যত সৃষ্টিতে, যেগুলো সাঁতার কাটছে আমার চারপাশে। আমি ভয়ানক অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম, মনে হচ্ছিল আমার কপালের চারদিক আঁটোসাটো পট্টি দিয়ে বাধা, হৃদস্পন্দন এমনই পর্যায়ে, যেন প্রায় শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে আমার এবং প্রায় হতভম্ব আমি ওই স্থানটি থেকে সাঁতরে পালাতে চাইলাম। কিন্তু সেই বিশেষ চিন্তাটি আমাকে আবার ভয়ে কাঁপিয়ে তুলল। এধরনের গাঢ় কুয়াশায়, ঘাস এবং নলখাগড়ার দঙ্গলের মধ্য দিয়ে হাজার চেষ্টা করেও আমি পালাতে পারব না, এটা অনুমান করে আমি চরম হতাশায় হাবুডুবু খেতে থাকলাম। আমার নিশ্বাস ভয়ে ঘরঘর করছিল, না দেখছিলাম পাড়, না পাচ্ছিলাম খুঁজে আমার নৌকা; এবং মনে হচ্ছিল কেউ যেন আমার পা ধরে ওই কালো জলের গভীরে টেনে নিতে চাচ্ছে।

আসলে, আমাকে আরও পাঁচশো মিটার উজানে যেতে হবে, যদি আমি নামবার মত কোনও স্থান পেতে চাই; এমন এক স্থান যা ঘাস এবং নলখাগড়া থেকে মুক্ত। যেরকম বিরূপ পরিস্থিতি তাতে মনে হয় না, আমি কোনও পথ খুঁজে পাব এই কুয়াশায় এবং আমি যতই ভালো সাঁতার জানি না কেন, ডুবে যাবই।

আমি নিজেকে যুক্তি দ্বারা বোঝাতে চেষ্টা করি। আমার ইচ্ছাশক্তি ভয় না পেতে শক্তি যোগায়, কিন্তু ইচ্ছাশক্তির বাইরেও আমার মধ্যে এমন একটা কিছু ছিল যা ছিল ভীত। নিজেকে জিজ্ঞেস করি, ভয় পাওয়ার আছেটা কী। আমার সাহসী সত্তা ভীরু সত্তাকে ঠাট্টা করে, এবং সেদিনের আগে কখনও আমি এটা বুঝিনি যে, আমাদের মধ্যে দুটো বিরোধী ব্যক্তিত্ব বিরাজ করে — একটা প্রত্যাশা করে কোনও কিছুর, অপরটা বাধা দেয়; এবং প্রত্যেকটাই পালাক্রমে জেতে।

এই নির্বোধ, ব্যাখ্যাতীত ভীতি বেড়েই চলল এবং ত্রাসে পরিণত হল। চলৎশক্তিহীন আমি, চোখ আমার স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে ছিল, কিছু একটার প্রত্যাশা নিয়ে কান খাড়া। কিসের? আমি জানিনি, কিন্তু তা ছিল অবশ্যই ভয়ঙ্কর। আমি বিশ্বাস করি, একটি মাছ জলের বাইরে লাফিয়ে পড়লে অহরহই যেমন ঘটে, এরচেয়ে বেশি আর কী ঘটতে পারত আমার ক্ষেত্রে, অনড় — অচেতন।

যাহোক, বেপরোয়া প্রচেষ্টার দ্বারা আমি ফের প্রায় যুক্তিবাদী হতে সফল হলাম। রাময়ের বোতলটা থেকে বেশ কবার টানলাম। তখন আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এল, আমি সর্বশক্তি দিয়ে সবদিকে লক্ষ করে বারংবার চিৎকার করতে লাগলাম। আমার গলা যখন প্রায় অসাড়, অনেক দূর থেকে এক কুকুরের ডাক শুনতে পেলাম।

আরও খানিকটা রাম খেয়ে আমি নিজেকে নৌকার নিচের দিকে নিয়ে এলাম। ওখানে কাটালাম প্রায় এক ঘণ্টা, সম্ভবত দু ঘণ্টা, না ঘুমিয়ে, চোখ পুরোপুরি খোলা রেখে, আমার যত দুঃস্বপ্ন নিয়ে। উঠে দাঁড়াবার সাহস না করলেও আমি দারুণভাবে চাইছিলাম তা। কিন্তু কাজটা করতে বারবারই আমি বিলম্ব করছিলাম। নিজেকেই বলছিলাম:“ওঠো, উঠে দাঁড়াও!” যদিও নড়াচড়া করতে ভয় পাচ্ছিলাম আমি। অবশেষে অতি সাবধানতার সঙ্গে আমি নিজেকে তুলে ধরলাম, যেহেতু আমার জীবন নির্ভর করছিল আমার মুখ থেকে ক্ষীণভাবে হলেও শব্দ উচ্চারিত হওয়ার ওপর। নৌকাটির কানার ওপর দিয়ে তাকিয়ে থাকলাম আমি। দেখবার মত অত্যন্ত সুন্দর, অত্যন্ত আশ্চর্যজনক দৃশ্য আমার চোখ ধাঁধিয়ে দিতে থাকল। এটা যেন সেইসকল পরীরাজ্যের অলীক কল্পনা, যেগুলো বহু দূরের দেশ ভ্রমণ করে ফিরে এসে পরিব্রাজকরা আমাদের কাছে বর্ণনা করে, আমরা যাদের কথা শুনি, কিন্তু বিশ্বাস থোড়াই করি।

দুই ঘণ্টা আগে যে কুয়াশা জলের ওপর ভাসছিল, ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল এবং তা পাড়ের ওপর জমা হচ্ছিল, নদীকে সম্পূর্ণ পরিষ্কার রেখে দুই পাড়ে অবিচ্ছিন্ন ছয় বা সাত মিটার উঁচু দেওয়ালের সৃষ্টি করেছিল, যা চাঁদের আলোতে চকচক করছিল তুষারের চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বলতায়। এই দুই শাদা পর্বতের মধ্যবর্তী আলোকোজ্জ্বল নদী ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছিল না, এবং আমার মাথার ওপর নীলাভ শুভ্র আকাশে ভাসছিল বিরাট পূর্ণ চাঁদ।

জলের সকল প্রাণী জেগে ছিল। ব্যাঙগুলো ডাকছিল ভয়ানকভাবে, সারাক্ষণ আমি শুনছিলাম, প্রথমে ডানে পরে বামে, আচমকা, একঘেয়ে এবং বিষাদগ্রস্ত ধাতব ধ্বনি ছিল কোলাব্যাঙগুলোর। আশ্চর্য, আমি আর ভয় পাচ্ছিলাম না। আমি এমনই এক অস্বাভাবিক প্রকৃতির মধ্যে ছিলাম যে, অতি বিশিষ্ট বস্তুগুলোও আর আমাকে বিস্মিত করতে পারছিল না।

কতক্ষণ এরকম চলছিল আমার জানা নেই, কেননা আমি শেষে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। যখন চোখ খুললাম, চাঁদ নেমে গেছে এবং আকাশ ভরে আছে মেঘে। জল তালি দিচ্ছে বিষণ্নভাবে, বাতাস বইছে জোর, পিচরঙা কালো চরাচর। আমি অবশিষ্ট রামটুকু পান করলাম, তারপর নলখাগড়ার খসখস ধ্বনি এবং নদীর অলক্ষুণে ইঙ্গিতবহ শব্দ শুনে আমি কাঁপতে থাকলাম। আমি দেখতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু পার্থক্য করতে পারলাম না নৌকাকে, এমন কি আমার হাত দুটোকে যা আমি চোখের একদম কাছে তুলে ধরেছিলাম।


একটু একটু করে, যাহোক অন্ধকার কিছুটা কমে এল। হঠাৎ মনে হল, আমি একটা ছায়াকে আমার বেশ কাছ দিয়ে ছুটে যেতে দেখলাম। চিৎকার করে ডাকলাম আমি, একটি কণ্ঠের প্রত্যুত্তর পাওয়া গেল; সে ছিল এক জেলে। ডাকলাম তাকে; কাছে এল সে, এবং আমি তাকে আমার দুর্ভাগ্যের কথা বললাম। আমার নৌকার পাশ ঘেঁষে সে তার নৌকা বাইতে থাকল এবং আমরা দুজনে নোঙরের শেকল ধরে টানলাম। নোঙর নড়ল না। দিনের আগমন ঘটল, বিষণ্ন ধূসর, বৃষ্টিভেজা এবং ঠাণ্ডা, সেরকম একটা দিন যা নিয়ে আসে কারও জন্য দুঃখ এবং অমঙ্গল। আরেকটা নৌকা নজরে এল। ডাকলাম ওটাকেও। ওটার আরোহী লোকটি আমাদের চেষ্টায় হাত লাগাল, এবং ক্রমশ নোঙরটা উঠে এল। ওটা উঠল, কিন্তু ধীরে ধীরে, যথেষ্ট ভারী এক বোঝা নিয়ে। অবশেষে আমরা লক্ষ করলাম একটি কালো বস্তু; এবং ওটাকে আমরা নৌকায় টেনে তুললাম। ওটা ছিল গলায় বড় পাথর জড়ানো এক বৃদ্ধা নারীর মৃতদেহ।



1 টি মন্তব্য: