বৃহস্পতিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

রুমা মোদক'এর গল্প : সে সন্ধ্যায় দ্রৌপদী এসেছিলো

অত্র এলাকায় কোনো রাজনৈতিক সমস্যা নেই, এখানে সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু, ধনী-নির্ধন, সাদা-কালো, “এ” দল- “ও” দল সবাই গলাগলি করে বাস করে, দলাদলি করে না। জেলা সদর আসনের সদ্য নির্বাচিত নেতার সামনে সদরের বাইরের পাতি নেতা, যিনি দুর্ভাগ্যক্রমে অনির্বাচিত হয়েছেন, তিনি যখন এ ঘোষণা দেন, তখন নির্বাচনে বিজয়োত্তর সরকার গঠনের প্রস্তুতিকল্পে কেন্দ্রে চলছে হৈ হৈ রৈ রৈ প্রস্তুতি, আর গ্রামে গঞ্জে স্ব-স্ব অবস্থানে স্ব-স্ব আয় উন্নতির নানা ফন্দি ফিকির, কানাপথ, চোরাপথ খুঁজছে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা-কর্মী, সমর্থক, মিছিলকারী, ক্যানভাসাররা।
এবার প্রাপ্ত ভোটের হিসাবে দেশব্যাপী “এ” দল সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু ঐ যে দুর্ভাগ্য! “এ” দল সারা দেশে সংখ্যা গরিষ্ঠ হলেও অত্র এলাকায় সংখ্যালঘিষ্ঠ মানে প্রার্থী পরাজিত। এলাকাটি মোটেই সংখ্যালঘু শাসিত নয়, বরং সংখ্যাগুরু শাসিত অর্থাৎ সংখ্যাগুরু ভোটারের সংখ্যাই বেশি। ভোটের সময় বহুল ব্যবহৃত যেসব কৌশল, তার সবকটি, অর্থাৎ ঘরে ঘরে টাকা বিলানো, জুম্মাবারে মসজিদে মসজিদে জুম্মা পড়া, পাড়ায় পাড়ায় মিটিং করা, প্রায় প্রায় ঠাকুর বাড়িতে যাওয়া ইত্যাদি ঠিকঠাক মতো প্রয়োগ করা সত্ত্বেও কেনো তার বাক্সে ততোটা ভোট ঠিকঠাক মতো পড়লো না, যতোটা ভোট পড়লে সংখ্যাগরিষ্ঠদের নব্য গঠিত ক্ষমতা কাঠামোর অংশীদার হওয়া যেতো, তার হিসাব তিনি কোনো ভাবেই মিলাতে পারেন না। তিনি তলে তলে খালি খোঁজ করেন, হন্যে হয়ে খোঁজ করেন, কোন কোন এলাকা থেকে তার ভোটবাক্স ভরে এসেছে আর কোন কোন এলাকা থেকে আসে নি। খোঁজ নিতে নিতে তার মধ্যে অবশ্যম্ভাবী অনিবার্য হয়ে যে প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে উঠে তা প্রাথমিকভাবে অবদমন করতে হয়। অত্র এলাকায় উত্তেজনার খবর পেয়ে জেলা সদরের নির্বাচিত নেতা হঠাৎ সরকার গঠনের মাহেন্দ্রক্ষণটি উদযাপনের আগে এলাকাটি পরিদর্শন করতে এলে পাতিনেতাকে নেতা সকাশে এই বিবৃতি দিতে হয় যে অত্র এলাকায় কোনো রাজনৈতিক সমস্যা নেই। এখানে সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু, ধনী-নির্ধন, সাদা-কালো, ‘এ’ দল- ‘ও’ দল সবাই গলাগলি করে বাস করে, দলাদলি করে না।

কিন্তু নেতা চলে গেলে, পাতিনেতা যখন আবার ভাবতে বসেন সুযোগ হাতড়াবার এই সুবর্ণ সময়ে অত্র এলাকার সংখ্যাগুরু এবং সংখ্যালঘু নির্বিশেষে সকল ভোটারের সম্মিলিত বেইমানীর কারণেই তিনি ক্ষমতা কাঠামোর অংশদারিত্বের সুযোগ বঞ্চিত হয়েছেন তখন তার নিজের হাত নিজেরই কামড়াতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তিনি তা পারেন না, বরং তার দলে তিনি সমস্ত রোষ তাদের উরই ঝাড়ার নীতি গ্রহণ করেন, যাদের কারণে তিনি বঞ্চিত। যেখানেও ধনী-নির্ধন সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু সবাই আছে। সংখ্যালঘুরা যদিও যথার্থই সংখ্যালঘু অর্থাৎ তাদের ভোটার সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম, তবু তিনি হিসাব করে দেখলেন নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘুদের উৎসব-পার্বণে মোটা অংকের চাঁদা দিয়েছেন, ভগ্নস্তূপ প্রার্থনালয়গুলিকে সিরামিক টাইলসে মুড়িয়ে দিয়েছেন। তার একমাত্র প্রধান কারণ ছিল সর্বজনবিদিত বিষয় এই যে এরা ঝাঁকের কই, যে বাক্সে ভোট দেয় একতরফা দেয়। সংখ্যালঘুরা একতরফাই দিয়েছে বটে, তবে অন্য বাক্সে। তারা এসব দান-দক্ষিণার সামান্যতম মর্যাদাও না দিয়ে বেঈমানি করেছে।

তাই নিজের দল যখন ক্ষমতায়, তখন ক্ষমতা কাঠামোর অংশীদার হবার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবার তীব্র রোষ তখন পাতিনেতা সংখ্যালঘুদের উপরই ঝাড়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। কর্মীরা সোৎসাহে তাতে অংশগ্রহণ করতে সম্মত হলেন। মুখে না বললেও এই উৎসাহের একটা বিশেষ গূঢ় কারণ আছে, তা হলো এই যে অত্র এলাকার সংখ্যালঘুদের যে যৎসামান্য মাথা গুঁজার ঠাই কিংবা ধানী জমি আছে, সামান্য ঠেলা দিলেই তারা তা স্বল্পমূল্যে কিংবা বিনামূল্যেই দান পূর্বক দ্রুত দেশ ত্যাগ করবে এ ব্যাপারে কোনোই সন্দেহ নেই। সংখ্যাগুরুদের ভোটার সংখ্যা যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তারাও বেঈমানি করেছে, তবু তারা রোষ থেকে রক্ষা পেলেন এই কারণেই যে তাদের এভাবে সহায়-সম্পদ পরিত্যাগের কোনোই সম্ভাবনা নেই। তাছাড়া তাদের মামা বা চাচা কেউ না কেউ ‘এ’ দলে আছে বিধায় কাজটি কঠিন।

তো, পরদিন কর্মসূচি শুরু হয়, সরকার পাড়ার নিবারণ সরকারকে বাজারে যাবার পথে পথ আটকে। পাতিনেতাকে ভোট না দেবার অপরাধে তার চেলারা নিবারণ সরকারকে নিজের পায়ের স্যান্ডেল নিজে খুলে, নিজের গালে মারতে বাধ্য করে, দশবার কানে ধরে উঠবস করায়। উপস্থিত চেলাদের অবশ্য এ তথ্য ও জানা ছিল যে একমাত্র সরকার পাড়া থেকেই ‘এ’ দলের বাক্স ভোটে ভরে এসেছে, তারা এলাকায় থাকতে না পারার শঙ্কায় চোখ বন্ধ করে পাতিনেতাকেই ভোট দিয়েছে কিন্তু এখন কর্মসূচি শুরুর সময় সর্বাগ্রে সে সামনে পড়ে যাওয়ায় আর সেসব বিবেচনার অবকাশ নেই। তাকে দিয়েই কর্মসূচি শুরু হয়ে যায়। অতঃপর আরো গূঢ় কিছু কারণে কর্মসূচি আরো সম্প্রসারিত হয়। সেই গূঢ় কারণ যদিও ওপেন সিক্রেট, তবু ভদ্রতাবশত কেউ মুখে আনে না। তা হলো এই যে পাতিনেতা অত্র এলাকায় যে শিল্পাঞ্চলের গোড়াপত্তন করেছেন, সেন বাড়ির অযত্নে পড়ে থাকা, পরের কাছে বর্গা দেয়া ধানী জমিগুলো পেয়ে গেলে তা ‘প্রস্থে ও দীঘে’ সমান টানা যায়। বারকয়েক নায্যমূল্যের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হবার পর, পাতিনেতার টার্গেট ছিল, এবার ক্ষমতায় এলে কোন না কোন কৌশলে সফলতা অর্জন করবেন। ভোটের ফলাফল তার বিপক্ষে গেলেও তিনি লক্ষ্যচ্যুত হন নি। উদ্দেশ্য ভুলে যান নি। উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য উহ্য রেখে তিনি চেলাদের অধিক উৎসাহ দেন। কর্মসূচি সম্প্রসারিত হয়। মূলত পাতিনেতাকে ভোট না দিয়ে সংখ্যালঘুরা নিজেরাই লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য সফল করার গ্রাউন্ড তৈরি করে দেয়।

সেন বাড়ির বান্ধা কামলা রতন পরদিন বাজারে গেলে সব টং দোকানদার, মুদি দোকানদার এবং খুচরা বিক্রেতাদের সামনে বাজারের মাঝামাঝি মাটির করিডোরে খত এঁকে নাক দিয়ে মুছতে হয়। যা দেখে সম্মিলিত জনতা সার্কাস দেখার মতো হাততালি দেয়। কাজটি রতনকে করতে হয়েছে নিজের অপরাধে নয়, সেন বাবুর অপরাধে। সেন বাবুর অপরাধ, বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তিনি কোনদিন ‘এ’ দলের কোনো নির্বাচনী সভায় উপস্থিত ছিলেন না। তবে কী তিনি ‘ও’ দলের সভায় উপস্থিত ছিলেন? এমন তথ্যও কারো জানা নেই। সেদিনই বিকেলে পাতিনেতার চেলাদের একটি বিশ্বস্ত দল সেন বাড়িতে ঢুকে। কেউ আম গাছের ডাল ভাঙে, কেউ বেলগাছের বেল পাড়ে, কেউ জামরুল গাছে ঢিল ছুঁড়ে। কেউ কামরাঙা গাছে ঝাঁক বেধে বসে থাকা টিয়া পাখিদের তাক করে গুলতি ছুঁড়ে। যেন সেন বাড়ির উঠোনে শুরু হয়েছে, ‘যেমন খুশি তেমন করো’ কোনো প্রতিযোগিতা। সেন বাবু কোনোরকম বাধা দেয়ার চেষ্টা না করে দরজায় খিল আটকে ঘরে বসে থাকেন আর ভাবেন ৪৭ এমনকি ৭১ এও কেন তিনি এ দেশ ছেড়ে গেলেন না। কারণটা কী? দেশপ্রেম নাকি স্থাবর সম্পত্তির প্রতি মোহ, যা কিনা আজ তার সম্মান ধুলোতে মিশিয়ে দিচ্ছে। অক্ষম বেদনায় দিশেহারা তিনি চোখমুখ বন্ধ করে ধ্যানস্থ হন। মূলত স্ত্রী পুত্র কন্যাদের সামনে চিৎকার করে কাঁদার প্রবণতাকে জোরপূর্বক দমন করেন। বাড়ির অন্য আরেকজন মুনিষ মানিক বাধা দিতে গেলে, চেলারা তার দিকে দা ছুড়ে মারে এবং ভয়ার্ত মানিক প্রাণে বেঁচে গোয়ালঘরে খিল আটকে কাঁপতে থাকে ব্যাধের লক্ষ্যচ্যুত পাখির মতো। এসবই যখন সেন মহাশয়ের উপস্থিতিতে ঘটতে থাকে সেন মহাশয় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ হয় না। বিষণ্ন, অবসন্ন, আতঙ্কগ্রস্থ পরিবার টিকে আরো োূদুকা ও অস্তিত্বের সংকটে নিপতিত করে পরপর দুদিন মোটা অংকের চাঁদা দাবি করে তার বাড়িতে উড়ো চিঠি আসে, গভীর রাতে তার গোয়ালঘর থেকে বাছুর সহ দুধেল গাভীগুলো নিয়ে যাওয়া হয়, এবং সর্বশেষ যখন দা-কুড়াল নিয়ে বাড়ি ঢুকে চেলারা তার চোখের সামনে স্কুল ঘরের দরজা জানালা মেরামত করার অজুহাতে প্রপিতামহের আমলের দুটি ফলজ গাছ কেটে নিয়ে যায়, তিনি প্রতিবাদ করার মতো সামান্য সাহসও অর্জন করতে পারেন না তখন তিনি আগপাছ, ভূত-ভবিষ্যৎ না ভেবে, সপরিবারে চৌদ্দপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে কেবল মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত গোপালের মূর্তিখানা সংঘে নিয়ে জেল সদরে স্ত্রীর বড় ভাই এর বাড়িতে আশ্রয় নেন। এবং তারপর প্রতিদিন তাঁর পিতা-পিতামহ-প্রপিতামহের স্মৃতি মাখা গাছগুলো প্রতিদিন কাটা হতে থাকে, উদোম হয়ে যেতে থাকে তাঁর দোচালা ঘর, উপরের টিন-বেড়া হারিয়ে, বেহাত হয়ে যায় পূর্বপুরুষের সম্পন্ন অবস্থার স্বাক্ষর ভারী কাঠের পাল্লাগুলি। অতঃপর জেলা সদরে একখানা ছোট বাসা ভাড়া করে, জমানো টাকা ভেঙে একখানা মুদিদোকান খুলে তিনি তাঁর উদ্বাস্তু জীবনের গোড়াপত্তন করেন। কেউ তাঁর সম্ভ্রান্ত ঐতিহ্য ধ্বংসের বৃত্তান্ত শুনাতে এলে তিনি দূর দূর করেন। তিন তিনটা স্কুল পড়ুয়া সন্তানকে নিয়ে জীবনসমুদ্র পাড়ি দেয়াই এখন তাঁর একমাত্র আরাধ্য। তবু তলে তলে ফেলে আসা ভূ-সম্পত্তিগুলোর বিনিময়ে যেন পানির দরটা অন্তত পান সে চেষ্টা-তদবির ও অব্যাহত রাখেন। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেন এ যাত্রা পালিয়ে বেঁচে গেছেন বলে, তবে গাঁয়ের লোক জাত-ধর্ম-নির্বিশেষে তাঁর জন্য ঠিকই সমব্যথী হয়। তারা বলাবলি করে-বাবু একবার সাহস করে দাঁড়ালে আমরা কী পাশে থাকতাম না? এভাবে চলে যাওয়াটা তার মোটেই উচিত হয় নি।

তাদের এ বক্তব্যের যে যৌক্তিকতা নেই, তা নয়। আছে বটে। জ্যোতিষ তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। সে কী সুবিচার পায় নি? সে কী গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে? নিত্য আনা নিত্য খাওয়া গতর কামলা জ্যোতিষ। গত একমাস গতর না খাটিয়ে, দিব্যি ঠ্যাং এর উপর ঠ্যাং তুলে, পান চুরট খেয়ে আয়েশে সংসার চালিয়েছে সে। কারণ নির্বাচনের অব্যবহিত পূর্বে দলবদল করে ‘ও’ দল ছেলে ‘এ’ দলে যোগদান করেছে জ্যোতিষ। পাড়াশুদ্ধ আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব যখন ‘ও’ দলের সমর্থক, তখন হঠাৎই দল বদলে ‘এ’ দলের ক্যাম্পে তার খাতির বেড়ে যায়। যে যাই বলুক, মূলত অত্র এলাকায় যে ধনী-নির্ধন সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু, সাদা-কালো সবাই গলাগলি করে বাস করে দলাদলি করে না তার জ্বলন্ত উদাহরণ হিসাবে জ্যোতিষকে সর্বাগ্রে রেখে চলতে থাকে নির্বাচনী প্রচার। জ্যোতিষও যোগদানের পরপরই নতুন দলে নিজের খাতির যতেœ সন্তুষ্ট হয়ে রাতারাতি একজন ডাকসাইটে কর্মীতে পরিণত হয়ে নিজ পাড়ায় মোটামুটি ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। নিজ পাড়ায় কেউ ‘ও’ দলের নাম নিলেই শার্টের হাতা গুটিয়ে তেড়ে যায়- বল হালারা এত্তোকাল যে খালি এক বাক্সে ভোট দিলি, কী পাইছস? পাইছসটা কী? পাড়ার কারো মুখে অবশ্য উত্তর যোগায় না। সত্যি তো দৃশ্যমান কিংবা অদৃশ্যমান কোন প্রাপ্তি তো নেই। তাদের এই নিরুত্তর আত্মসমর্পণে শেষাবধি জ্যোতিষ অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাসী হয়ে ঘোষণা দেয়- প্রথমবারের মতো এই পাড়ার একটা ভোটও আর ‘ও’ দলের বাক্সে পড়বে না। কিন্তু ফলাফলে যথারীতি পূর্বাবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটলে ভোটকেন্দ্রেই জ্যোতিষকে ‘মালোয়ানের বাচ্চা’, ‘বেঈমানের বাচ্চা’ প্রভৃতি গালি সহযোগে উত্তম-মধ্যমে মোটামুটি বিধ্বস্ত করে দেয় ‘এ’ দলের বিশ্বস্ত কর্মীরা। কিন্তু তাতেই ক্ষান্ত হয় না তারা, নির্বাচন এবং সরকার গঠনের মধ্যবর্তী সময়ে এক অমাবস্যা রাতে মেঘমুক্ত আকাশে নক্ষত্রগুলি জ্বলজ্বল করতে থাকে, ভ্যাপসা গরমে গাছের পাতারাও নড়তে ভুলে যায়, দূর থেকে একটানা ঝিঁঝিঁর ডাক কানে তব্দা লাগিয়ে দেয় তখন জ্যোতিষের নড়বড়ে ঘরের ততোধিক নড়বড়ে দরোজার খিল ভেঙে তার অবিবাহিতা সহোদরাদের উপর চড়াও হয় একের পর এক, সংঘবদ্ধভাবে। নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করলে এই সংঘবদ্ধ দলটিকে ঠিক দোষ ও দেয়া যায় না। সুদীর্ঘ একমাস এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে ক্যানভাস করার সময় স্বপ্না আর কল্পনা জ্যোতিষের দু সহোদরার বে- আব্রু পিঠ, গলা, কামিজের ভাঁজ দেখে কর্মীদের ভিতরে যে যে দুর্বিনীত পৌরুষ জেগে উঠেছিল, তা প্রমাণের সুযোগ পেয়ে তারা হাতছাড়া করবে এমনটি ভাবাইতো অন্যায়।

কিন্তু জ্যোতিষের কাছে ঘটনাটিকেই অন্যায় মনে হয়। সরল হৃদয়ে সে সুবিচার প্রত্যাশা করে। পরদিন সকালে বিশাল আশায় বুক বেঁধে বিচারের দাবী নিয়ে অর্পিত সম্পত্তির পতিত দালানে অবস্থিত দলীয় কার্যালয়ে পাতিনেতা সকাশে দাঁড়ালে তিনি অফিসে সমবেত তরুণ-কিশোর যুবা-বৃদ্ধা নেতাকর্মীদের সামনে গর্জে উঠে তীব্র রোষে, কত্তো বড়ো সাহস........। কী দুর্দান্ত স্পর্ধা!! তারপর জ্যোতিষকে তার পাশের চেয়ারে বসার অনুমতি দিয়ে সম্মানিত করেন। শুধু তাই নয়, জনৈক বাধ্যগত কর্মীকে দিয়ে এক বোতল সেভেন-আপ আনিয়ে তাকে শান্ত থাকার পরামর্শ দেন। অতঃপর নিজে কিছুক্ষণ শান্ত থেকে তর্জনী তুলে জানতে চান এতদসত্ত্বেও জ্যোতিষ কী বুঝতে অক্ষম “ও” দল কেমন চীজ! দলবদলের প্রতিশোধ তারা কীভাবে নিলো! সাথে পাতিনেতা এও ঘোষণা করলেন, নির্বাচনে হারলেও তিনি আপোষহীন মনোভাব বর্জন করেন নি। দুর্বৃত্ত যে দলেরই হোক না কেন তিনি কোনো ছাড় দেবেন না। মাংস কেঁচে যাওয়ার অসহনীয় ব্যথা শরীরে আর পরিবার ঘটে যাওয়া অমোচনীয় দুর্ঘটনার দুঃসহ যন্ত্রণা মনে চেপে জ্যোতিষ খুব মিনমিনে গলায় বারবার একটা তথ্য দেয়ার চেষ্টা করে যে, রাতে তার ঘরে হানা দেয়া হানাদারেরা কেউ তার অপরিচিত নয়, বরং এই পতিত দালানের আশে পাশেই ঘুরঘুর করছে তারা, কিন্তু এই মিনমিনে গলা মোটেই পাতিনেতার কানে পৌঁছায় না। তিনি জ্যোতিষকে থানায় একটা জিডি করার পরামর্শ দিয়ে বিচার কাজ শেষ করেন। অব্যাহত বাকি যন্ত্রণাগুলোর সাথে যোগ হওয়া সুবিচারের তিক্ত যন্ত্রণা নিয়ে দলীয় কার্যালয় থেকে বের হতে হতে সে শুনতে পায় কারো সরোষ গালিগালাজ-শালা বেঈমান, মালোয়ানের বাচ্চা..........। মুখ ফিরিয়ে সে চিনতে চায় এতোদিন একসাথে উঠাবসা করা সঙ্গীগুলোর মধ্যে এটা ঠিক কার কণ্ঠ, কিন্তু পারে না। সবার চেহারাই সমান সমবেদনা হীন নিঃস্পৃহ। কেউ কিছু বলেছে বলেই মনে হয় না।

তবু জ্যোতিষের সরল বিশ্বাসে চির ধরে, সে মনে মনে ধারণা করতে সক্ষম হয়, আসলে থানায় জিডি করেও কোন লাভ টাভ হবে না। কিন্তু নিরুপায় পা দুটো কেন জানি থানার রাস্তাই ধরে, জ্যোতিষ বুঝে কিছু হোক না হোক আসলে শেষমেশ ওখানে যাওয়া ছাড়া তার তো এ মূহুর্তে আর কিছুই করার নেই। কিন্তু কী আশ্চর্য, সে নিরুপায় যাত্রাটাও নির্বিঘ্ন হয় না তার, তাঁকে রাস্তায় নাগাল পেয়ে ঘিরে ধরে ‘ও’ দলের কর্মীরা। সারা দেশে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও অত্র এলাকায় নির্বাচিত বিধায় তাদের দাপট এখনো সমান বিদ্যমান। দলবদলের প্রতিশোধ স্বরূপ প্রথমে তারা জ্যোতিষের পথ আটকায়, তাঁর বোনদের উদ্দেশ্য করে অশ্লীল বাক্যবাণ ছুঁড়ে, অতঃপর নিজেরা নিজেরা পরামর্শ করে জ্যোতিষের লুঙ্গি ধরে টানতে থাকে খুলে নেয়ার প্রয়াসে, বলতে থাকে- যা মান ইজ্জত আছিলো, দল বদলাইয়া সবইতো হারাইলি, এখন তোর লুঙ্গি পইরা চললেই কী আর লেংটা হইয়া চললেই কী? পশ্চিমাকাশের সূর্য ডুবে যেতে থাকে থৈহীন দীঘি অতিক্রম করে ধূধূ শস্যখেতের সীমান্ত ছুঁয়ে, সন্ধ্যা নামতে থাকে নিশ্চিত নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের নিশ্চয়তা নিয়ে, জ্যোতিষের লুঙ্গি খুলে তাদের হাতে হাতে যেতে থাকে, আর তেপথের মোড়ে নির্বাক বিপর্যস্ত অসহায় জ্যোতিষের চোখে তখন ভাসতে থাকে কৈশোরে দূরদর্শনে দেখা দৌপদীরূপী রূপাগাঙ্গুলীর চেহারা। প্রকাশ্য কুরুরাজ সভায় দুর্যোধন টানতে থাকে কূলবধূর শাড়ি, আর রূপাগাঙ্গুলী সেই সন্ধ্যায় তেপথের মোড়ে জ্যোতিষের কানের কাছে চিৎকার করে বলতে থাকে, হে নাথ......হে নাথ.......।

এদিকে স্থানীয় থানা, মিডিয়া গবেষণা করে সম্মিলিত স্বরে ঘোষণা করে নেতা সকাশে পাতিনেতা প্রদত্ত বিবৃতি সর্বৈব সত্য। অত্র এলাকায় সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু, ধনী-নির্ধন, সাদা কালো, ‘এ’ দল- ‘ও’ দল সবাই গলাগলি করে বাস করে দলাদলি করে না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন