বৃহস্পতিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

সাদিক হোসেনের গল্প :তুঘলক

ঠিক এই মুহুর্তে ১০০ পাওয়ারের বাল্বের নিচে শুয়ে তুঘলক বুঝতে পারে, এই হাওয়ালাতের ভিতর, এই হাওয়ালাতের ভিতর গরাদের গা থেকে বেরিয়ে আসা আলো, ও সেই আলোর প্রক্ষিতে তার চোখের দিকে ধাবমান কালারসমূহ, খৈনি ঝাড়ার শব্দ, লাঠির ঠুকঠাক, এটাসেটা সবই আসলে ঐ ১০০ পাওয়ারের বাল্বের গায়ে জেপ্টে ঠাকা ধুলোর মত, শ্রেণীশত্রুর পকেট কেটে পাওয়া মানিব্যাগ সদৃশ পবিত্র তথা বিলিয়মান; অর্থাৎ সন্দেহাতীত নয়।
উপরন্তু লম্বা বুটের শব্দকে অনুসরণ করলে, সে খেয়াল করবে, প্রশ্নকর্তা তার দিকেই এগিয়ে আসছে – সুতরাং, ঠিক এই মুহুর্তে শিরদাঁড়া খাড়া করে বসে থাকাটা হবে রাজনৈতিক বিচ্যুতি। তুঘলক শুয়ে পড়ে। এবং যন্ত্রনাকাতর কয়েদিদের মত পা-টাকে পেটের কাছে টেনে এনে ‘দ’ হয়ে যায়।

দ-এ দৌড়।

দ-এ দাঁড়িপাল্লাও বটে।

তুঘলকের নাম তুঘলক কেন? – এই প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে একটা দৌড়ের দিকে নজর দেওয়া আমাদের একান্ত কর্তব্য।

কিন্তু যেহেতু ছাপা অক্ষর বৈশিষ্টগত ভাবে স্থির, তাই আমাদের কল্পনা করতে হবে এই মুহুর্তে ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দই আসলে চলমান, শুধু চলমান কেন, এই মুহুর্তে লিখিত শব্দরা এই তো পাহাড় থেকে গড়্গড়িয়ে নামছে, খনি থেকে হুড়মুড়িয়ে উঠছে, ব্যর্থ পকেটমারের মত তারা দৌড়ুচ্ছে, তাদের পেছনে ছুঁচোবাজি ছেঁড়ে দেওয়া হয়নি তবু তারা দৌড়ুচ্ছে, তাদের চামড়া থেকে বেরিয়ে আসছে রক্ত ও ক্যালসিয়াম, এবং তারা এমন এক প্রান্তরের ভেতর ঢুকে পড়ছে যেখানে আদালত ও কিষান, সমকাম ও গণিত, এবং ভুখহরতাল আর শব্দ ও তার ব্যুৎপত্তিগত অর্থ সব একত্রে, সমানতালে প্রসব করে চলেছে যে মানসিক ভারসাম্যহীনতাকে – তাই তুঘলক।

সুতরাং, তুঘলক – এখানে তুঘলকই!

তবু আমাদের খেয়াল রাখা জরুরি গল্প এমন এক আর্টফর্ম যেখানে সাদা কাগজের উপর কালো অক্ষর ছাড়া আর কোন কিছুরই বাস্তবিক উপস্থিতি নেই। সবটাই কল্পনা। ফলে পাঠক প্রথম থেকেই লেখকের দাবী গুলোকে সন্দেহ করতে থাকে। অন্যদিকে লেখক তার দাবী গুলোকে জোরদার করতে এমন ছকে গল্পকে বাঁধেন যাতে মনে হয় তার সৃষ্ট চরিত্র গুলো কোন না কোন ভাবে তার ব্যক্তি অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে। যেন লেখকের কল্পনা অতটাও কাল্পনিক নয়, এটাই লেখক প্রমাণ করতে চান।

পাঠক-লেখকের এই বোঝাপড়ার মাত্রার উপরি কি গল্পের সফলতা নির্মিত হয়?

যদি তাই হয়, তবে, এইক্ষণে তুঘলক সম্পর্কে দু-চারপিস হিন্টস্ দিয়ে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

তুঘলকের বাপের নাম ছিল খালিদ। কিন্তু তার চোখ বেড়ালের মত ঘোলাটে হওয়ায় বিল্লু খালিদ নামেই পরিচিত ছিল বেশি। সব্জিবাজারে যতটুকু জায়গা পাওয়া গেলে সংসার চালানো যায়, ঠিক ততটুকু জায়গাতে দাঁড়িপাল্লার এমন এক হিসেব সে করতে পেরেছিল যে আপনি ৫০০ গ্রাম টমেটো চাইলে ৪টে টমেটো নিয়ে তার দাঁড়িপাল্লা ততটুকুই ঝুঁকত যতটুকু ঝুঁকলে ৫০০ গ্রামের হিসেব মেলে। বলাবাহুল্য টমেটোর সাইজের উপর তা সবসময় নির্ভর করত না। তাছাড়া কথায় আছে, মানুষের চেহারা তার চরিত্রকে নির্মান করে। ফলে তার পাশের সব্জিওয়ালারা প্রায়শই লাভলোকসানের হিসেব মেলাতে পারত না। সন্দেহ এসে পরত অবশ্যই বিল্লু খালিদের উপর। কিন্তু সেইসব সময় সে এমন এক চোখে চারদিকে তাকাতে শিখেছিল যে প্রায়দিন মনে হত সেইদিনটাই তার এই বাজারে প্রথম দিন। সে থ্রেট পেত। কখনও কখনও হেট স্পিচ শুনত। কিন্তু গায়ে হাত পড়ত না। একদিন সেটাও হল। একজন বৌদি টমেটো, কাঁচালঙ্কা কিনতে এসেছিল। সে মানিব্যাগ ফেলে রেখে চলে গেল। পরে খোঁজ নিতে এলে বিল্লু খালিদ সোজা ডিনাই করতে থাকল। তাকে চার্জ করা হল। সার্চ করা হল। শেষে চটের তলা থেকে মানিব্যাগটাকে পাওয়া গেল।

এই সময় তুঘলকের বয়স কত ছিল? বহু চেষ্টা করেও তুঘলকের একজ্যাক্ট জন্মতিথির খোঁজ পাওয়া যায়নি। প্রায়মারি স্কুলে তার যে জন্মতারিখ দেওয়া রয়েছে তা নির্ভরযোগ্য নয়। কারণ ভোটার কার্ড অনুযায়ী তার বয়স আবার অন্য। বিশ্বস্তসূত্রে জানা যায়, যেদিন তার বাপ গায়েব হয়ে গেছিল, সেইদিন সে খাতুনমহলে পিঠে চাবুকের দাগ নিয়ে নাচতে থাকা মাধুরী দীক্ষিতের এক-দো-তিন-চার দেখছিল। ‘তেজাব’-এর রিলিজ ডেট ১১ নভেম্বর, ১৯৮৮। সুতরাং ৮৮’সাল নাগাদ তার বয়স ছিল লাগভাগ ১০/১২ বছর।

১৯৯০ সালে World Wide Web এল। সাড়ে সাতাশ বছর জেল খাটার পর সাউথ আফ্রিকা নেলসন ম্যান্ডেলাকে রেহাই দিল। ইরাক কুয়েত আক্রমণ করল। আবার এই সময় ইন্ডিয়া শ্রীলংকা থেকে সেনাবাহিনী সরিয়ে নিয়েছিল, কাশ্মীরে ডাইরেক্ট রুল চাপিয়ে ছিল, মণ্ডল কমিশনের প্রস্তাবনাকে বাস্তবায়িত করেছিল। এই সব ঘটনা এবং আরও অনেক কিছু তুঘলকের উপর কী কী প্রভাব বিস্তার করেছিল?

পুলিশের লাঠির ঠকঠকানির সামনে তুঘলক যা বলে তা প্রায় ম্যাজিক রিয়্যালিজম সদৃশ।

মায়ের পেটের ভেতর থাকাকালীন সে নাকি বাপের লাথি খেয়ে ছিল। প্রমাণস্বরূপ নিজের বোচা নাকটা দেখিয়ে বলে, এই যে।

এতে বড়বাবু হেসেই কাহিল। কনস্টেবলকে ডেকে বলেন, শোনুন, আপনার তুঘলক কী বলে। এই বল, বল না।

তুঘলক আবার শুরু করতেই বড়বাবু কনস্টেবলের দিকে তাকান, কি ঘোষদা আপনিও আজকাল লাথি দিচ্ছেন নাকি?

কনস্টেবলের ওয়াইফ প্রেগন্যান্ট। অফিসার কোন দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছেন তা বুঝতে পেরে সে তুঘলকের জুলপি টেনে দু-চারটে চুল ছিঁড়ে দেয়।

- আহ ঘোষদা। বড়বাবু খানিক ধমক দিয়ে তুঘলকের দিকে ফেরেন, তো বাপের পাটা তোর নাকে লেগেছিল! ওটা পা ছিল, না অন্য কিছু? তুই জানলি কি করে?

তুঘলক জানায় তার যখন বছর পাঁচেক বয়স হবে সে তার বাপ-মায়ের সঙ্গে দীঘায় গেছিল। তার এখনও মনে আছে, সন্ধ্যেবেলা বালির উপর বসে তারা হাজার হাজার টিউবলাইটকে সমুদ্রের উপর আছাড় খেয়ে ভেঙে যেতে দেখেছিল। সকালে সি-বীচে মরে যাওয়া তারা মাছ দেখেছিল। সমুদ্রের ওপারে কী আছে, সে দেখতে পায়নি। তবু কোন কোন রাতে তার ঘুম ভেঙে গেলে সে দেখতে পেত, মা পাশে ঘুমচ্ছে, আর বিল্লু খালিদ বেড়ালের মত জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। যেন এখুনি সে জানলা দিয়ে লাফ কেটে পাশের পাঁচিলে উঠে যাবে। কিন্তু সে কিছুই করত না। হয়ত একটা বিড়ি ধরিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকত খানিক।

বিল্লু খালিদ না পারলেও লাফ দিয়েছিল তুঘলক নিজেই।

২০০০ সালে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া মিস ওয়ার্ল্ড হল, ILOVEYOU ভাইরাস সারা পৃথিবী জুড়ে কম্পিউটারে থাবা বসাল আর তুঘলক শিবুকে সঙ্গে নিয়ে কুরলা স্টেশনে পা ফেলল। তার সারা শরীর ঝনঝন করে উঠেছিল। শিবু গান গায়, ইয়ে বোম্বাই মেরি জান। কানেকানে বলে, ভাই টাকাপয়সা সামলে।

তুঘলক পেছনের পকেটে হাত দিয়ে স্টেশন টার্মিনাস পার হয়েছিল।

সে বড়াপাও খেয়ে শহরে মিশে যেতে থাকে। একটা হোটেলে কাজ নেয়। রাতে আবার কুরলায় ফিরে আসে। সেখানে দৈনিক ২০টাকা দিলে একটা গোডাউনে ১০-১২ জনের সঙ্গে ঘুমনোর বন্দবস্ত পাকা করা যায়।

তারপর মিডনাইটে সিমেন্ট ভর্তি ওয়াগন ছুটে গেলে সে নিজের ভেতর কেমন টান অনুভব করে। বুড়ো বুড়ো, খোঁড়া মানুষগুলোকে দেখলেই ভাবে বিল্লু খালিদ? একবার ডবল ডেকারে উঠে সে যেন সারা শহর জুড়ে শুধু বেড়ালের চোখ দেখতে পায়। জ্বলজ্বলে শিকারি চোখ। জুহু বীচের উপর লাথি কষাচ্ছে। তঘলক ঠিক করে আর নয়। এবার উল্টো লাফ দেবার সময় এসেছে।

সে লাফ দিয়ে যেখানে এল, সেখানে ততদিনে বুলি সংসার পেতেছে।

- বুলি কে ?

অফিসারের প্রশ্ন শুনে তুঘলক এমন চোখে তাকায় যার অর্থ বুলির অস্তিত্ব এক অনন্ত ইতিহাসের পাতায় প্রথিত রয়েছে। অতএব তার মত অজ্ঞ ছোকরার কাছ থেকে সেই অস্তিত্বের ব্যাখ্যা চাওয়া হবে নিতান্তই নাদান পলিসি। কিন্তু তুঘলক বুঝতে ভুল করে। প্রশাসন ব্যখ্যা চায় না, চায় ফ্যাক্ট। তাই, বুলির বর একজন লকআউট পাট কারখানার শ্রমিক, এটা জানার পরেই অফিসার চমকে ওঠেন। বুঝি কোন বৃহৎ সত্যের সম্মুখীন হতে চলেছেন তিনি, এই ভেবে, উত্তেজনায় তুঘলককে দু-চারটে চড় কষিয়ে আবার জল খেতে দেন। তুঘলক ডিসাইড করতে পারে না জলটা কি সে গ্লাসে মুখ দিয়ে খাবে? গ্লাস এঁটো করলে আবার মার খাবে না তো? শেষে উর্ধতনের মুখ দেখে আর রিস্ক নেয় না। গ্লাস উঁচু করে জল খায়। খানিক জিরোয়। সেই সুযোগে অফিসার চেয়ার থেকে নেমে তার দিকে এগিয়ে আসেন। কনস্টেবল অফিসারের দিকে তাকিয়ে থাকে।

আহা, এই সময়, অফিসারের বুটের শব্দের সঙ্গে সে কি বেড়ালের পদচালনার কোন সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছিল?

সম্ভাবনা বড়ই কম। কেননা বুলির উপস্থিতি তাকে সর্বদাই কাল্পনিক করে তুলত। তার নিজেকে মনে হত সে যেন লোকাল ট্রেনে পাশের সীটে বসে থাকা সেই লোকটা যার সম্পর্কে সে কিছুই জানেনা। কিংবা এসব একেবারে ফালতু। তুঘলক সম্পর্কে আমরা ইতিমধ্যে যা ধারনা তৈরি করে ফেলেছি, তা যদি সত্যি হয়, তবে তুঘলকের পক্ষে এই সূক্ষতায় গিয়ে কিছু ভাবা কী আদৌ সম্ভব? আসল কথা হল, বুলির ঐ রকম মোটা গড়ন, ঝুলে যাওয়া বুক, কেলেকুচ্ছিত মুখমন্ডল দেখে তুঘলক এতটাই মিইয়ে যেত যে সে ভাবত তার যদি কোন সহদোরা থাকত তবে সে হত বুলির মতই। এবং সে তার সেই না-সহদোরাকে কল্পনা করে সমেহনে প্রবৃত্ত হত প্রায়ই।

তবে এইসময়, যখন অফিসার তার দিকে এগিয়ে আসছেন, এইসব কথার উল্লেখ ঘটনাকে লঘু করে দেয় বৈকি। তাই এইসব কথা আপাতত মুলতুবি থাক। বরঞ্চ আমরা ইন্টারোগেশনের দিকে নজর দিই-

- বুলির বরের নাম কী?

- তপন প্রামানিক।

- কোথাকার জুট মিলে কাজ করত?

- হাওড়া।

- কারখানার নাম কী?

- ডেলটা। (পুরোপুরি ঢপ। সে বুঝে গেছিল কিছু কিছু সিচ্যুয়েশনে অজ্ঞতাকে অজুহাত হিসাবে খাড়া করা অনুচিত)

- তুই কোনদিন কারখানায় গিছিলি?

- না।

- ঠিক করে বল।

- হ্যাঁ।

- কবে?

- অনেকদিন হল।

- কবে?

- ৬ মাস হবে।

- কি করতে গিছিলি?

- ওখানে ভুখহরতাল হচ্ছিল। আমাকে নিয়ে গিছিল।

- আর কারা ছিল।

- অনেকে।

- অনেকে কারা?

- চিনিনা।

- কারা ছিল?

- ঐ কারখানায় যারা কাজ করত।

- কি করে জানলি ওরা কারখানায় কাজ করত?

- বলাবলি করছিল।

- আর কি বলাবলি করছিল?

- কারাখানা কবে খুলবে...এইসব।

- তুই কেন গিছিলি? (তুঘলক চড় খায়)

- আমাকে নিয়ে গিছিল।

- বুলির বর কোন পার্টি করে?

- জানিনা। (কানমোলা খায়)

- কোন পার্টি?

- জানিনা। (আবার চড়)

- কোন গোপন মিটিঙে গিছিলি?

তুঘলক চুপ।

- চিঠিটা কার জন্যে ক্যারি করছিলি?

- চিঠিটা আমার না।

- কে তোকে রিক্রুট করেছিল?

উত্তর নেই। (পায়ের পাতার উপর অফিসারের বুট)

- কি লেখা আছে চিঠিটায় জানিস?

- না।

- তোর বাপের নাম কী?

- খালিদ।

অফিসার হেসে ওঠেন। কনস্টেবলও।

- লাটুয়াগিরিতে কবার গিছিলি?

- যাইনি।

- তপনের সঙ্গে তোর পরিচয় কবে থেকে?

- বছর দুই।

- তপন কোন জুট মিলে কাজ করত?

তুঘলক আমতা আমতা করে।

বড়বাবু কনস্টেবলকে ইশারা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন।

নিজের টেবিলে বসে সিগ্রেট ধরিয়ে ঘোষদাকে জিজ্ঞেস করেন, কী, সাসপিসিয়াস মনে হচ্ছে?

- হাইলি।

অফিসার খানিক্ষণ চুপচাপ সিগ্রেট খান। যেন নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছেন। তারপর কনস্টেবলের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলেন।

ঘোষদা ভ্যাবাচাকা খায়, কী হল স্যার?

- আচ্ছা বলুন তো এত রকমের কাজকর্ম থাকতে লোকজনে তবু পকেটমারি করতে যায় কেন? ভেরি রিস্কি জব। একটু এধারওধার হলেই পাবলিকের কেলানি। তবু কেন?

- ওরা আর কী করবে স্যার। খেটে তো খেতে চায়না।

- তাই?

- আবার কী?

- আর পকেটমার হতে গেলে সবথেকে আগে কী দরকার লাগে?

- হাতসাফাই।

অফিসার হাসেন। যেন তার হাতে তিনটে টেক্কাই এসে গেছে। তিনি আর একটা সিগ্রেট ধরিয়ে বলেন, ঘোষদা সবসময় পুরনো মডেল কী আর কাজে দেয়?

- বলছেন হাতসাফাই নয়?

- উহু। অফিসার দুদিকে মাথা নেড়ে বলেন, অ্যাসেসমেন্ট। আদারকে অ্যাসেস করতে না পারলে

কোনদিন পকেটমারি করা যায় না। কার পকেটে কত টাকা আছে, কী সেলফোন আছে...এইসব যদি সে অ্যাসেস করতে না শেখে তবে বুঝবে কিভাবে কার পকেটে কখন হাত দিতে হবে? আর আদারকে অ্যাসেস করতে চাওয়াটা একটা নেশা। না হয়ত নেশাও না। প্রাক্টিস অফ নলেজ। কিংবা নলেজের প্যাটার্নটাই হয়ত এটা।

সেসব তো হল, ঘোষদা এবার প্রবলেমের দিকে চোখ ফেরায়, তা মালটাকে কী করবেন? একে কি পকেটমারই ভাবছেন? আর চিঠিটা? নো লিঙ্ক?

- অ্যাবসোলিউটলি নো লিঙ্ক। অফিসার আরমোড়া ভেঙে বলেন, যার পকেটে হাত দিয়েছিল চিঠিটা তারই। তারপর বাস থেকে হুড়মুড় করে নামতে গেলে তুমি ওকে ক্যাচ কর।

- মালটাকে ছেড়ে দেবেন?

- রেখে কী লাভ। মাঝখান থেকে হিয়ম্যানরাইটস ঢুকে গেলে আবার কেলো। তবে এমন ভাবে ছাড়তে হবে যাতে ও বুঝতে না পারে ওকে ছাড়া হচ্ছে।

কথামত তুঘলককে লকআপ থেকে বার করতেই অফিসার তাকে সটান চড় কষিয়ে হুমকি দেন, তোর কাছে আর একদিন আছে। কালকের মধ্যেই এই চিঠিটা যার তাকে এইখানে তুই হাজির করাবি। আর না পারলে তুই জানিস আমরা কী করতে পারি।

তুঘলক কী বলতে যাচ্ছিল, অফিসার হাত উঁচু করতেই সে থেমে যায়। কনস্টেবল তাকে টেনে থানার বাইরে বার করে দিয়ে আসে।


এতক্ষণে তুঘলককে আমরা প্রায় তার ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে একজন তুঘলক অর্থাৎ পাগলাগোছের কিছু এবং অফিসারকে ধান্দাবাজ মায় শিক্ষিত বলে ধরে নিয়েছি। এবার ফাঁকফোকরের দিকে নজর দেওয়া যাক।

এই যে অফিসার প্রায় নির্দিধায় সিদ্ধান্তে এলেন তুঘলক একজন ব্যর্থ পকেটমার ছাড়া আর কিছু নয়; তার এই সিদ্ধান্তে আসার প্রসেসটা কী সন্দেহকে অতিক্রান্ত করতে পেরেছে? বিশেষত বোম্বে যাবার মত এত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সম্পর্কে তুঘলক যখন প্রায় নীরব! শিবুর সঙ্গে তার সম্পর্ক কী ছিল – আমরা কিন্তু এখনও তা জানি না। তাছাড়া বুলিদের সঙ্গে তার এই ঘনিষ্টতা শুধুই কি গল্পকে একটি আকার দেবার ব্যর্থ প্রচেষ্টা! তুঘলক তার মা সম্পর্কে কোন কিছুই বলে না কেন? উপরন্তু প্রথম প্যারাগ্রাফেই তুঘলকের বয়ানে ‘শ্রেনিশত্রু’, ‘রাজনৈতিক বিচ্যুতি’ এইসবের উল্লেখ ছিল। তবে কি এই শব্দগুলো প্রয়োগ করে আমি কেবলই বাক্যবিন্যাসটিকে সুন্দর করতে চেয়েছিলাম? নাকি তুঘলক সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারনা দিতে চেয়েছিলাম? তুঘলককে কি আমরা চিনতে পেরেছি? কতটুকু ডিটেইল লিপিবদ্ধ করতে পারলে একটি চরিত্রকে শেষমেশ মনে হয় সে কোথাও না কোথাও, কখনও না কখনও, কোন না কোনভাবে উপস্থিত ছিল?

আহা, ঐ তো, চড়চাপড় খেয়ে তুঘলকের মুখ ফুলে গিয়েছে। এখন সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে রাস্তা পেরোচ্ছে। তাকে দেখলে মায়া লাগে।

ঠিক এই মুহুর্তে আমরা জেনে গেছি, সিরিয়ায় সিভিল ওয়ারে ২ লক্ষের বেশি মানুষ মারা গেছে, ৯০ লক্ষের বেশি ঘরছাড়া, চায়না দক্ষিন চায়না সাগরে কৃত্রিম দ্বীপ বানিয়ে ফেলেছে, ২০১১ সালে সাউথ সুদান নামের আরও একটি নতুন দেশের জন্ম হয়েছে আর এই সব কিছু নিয়ে তুঘলক এখন কোলকাতার রাস্তায় ভ্যাভ্যা করে ঘুরছে।

হাওয়ালাতের ভেতর সেই ১০০ পাওয়ারের বাল্বের গায়ে লেগে থাকা ধুলোর মতই সে যেন ক্রমশ জেপ্টে থেকে যাচ্ছে। তার ভাল লাগছে না। তবু তাকে থাকতে হচ্ছে। পায়ে ব্যথা তবু সে হাঁটছে। সে প্রতিটা বাসের দিকে সজাগ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। বাসের ভেতরকার মানুষগুলোর ভেতর, আশপাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষ গুলোর ভেতর সে খালি চিঠির মালিকটিকে খোঁজে।

এদিকে বিজ্ঞাপনের আলো, সিগন্যালের আলো, দোকানপাট দিয়ে বেরিয়ে আসা আলো তার চারদিকে যে পবিত্রতার হুল্লোড় তৈরি করেছে, তাতে সে বিরক্ত হয়।

তারপর এইভাবে থাকতে থাকতে তার সব মানুষকেই একই রকম মনে হয়। মনে হয় তাদের সকলের মুখ এক। মনে হয় তাদের সকলের কাঁধ থেকে ব্যাগ ঝুলছে। এই তো তারা বাসে উঠছে। এই তো তারা বাস থেকে নামছে। কে একজন দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে গেল। আর একজন ফোনে কথা বলতে বলতে বুকপকেট থেকে সিগ্রেট বার করল।

বাড়ি ফেরার গলিটা সরু। শেষ মাথায় একটা স্ট্রীট লাইট জ্বলছে। সেই আলো সবদিকে সমানভাবে পড়েনি। মধ্যিখানের একটা অংশ তো প্রায় অন্ধকার।

তুঘলকের গা-টা ছমছম করে ওঠে। কেউ বুঝি তাকে ফলো করছে, এই ভেবে সে খালি পেছনে তাকায়। কেউ নেই। নেড়ি কুত্তারা ডেকে উঠল। আবার চুপ করে গেল।

দরজায় টোকা দিতেই তপন দরজা খুলল। পেছনে বুলি।

এদের দেখেই তুঘলকের চোখ দিয়ে আপনা আপনি জল নেমে এল।

- কোথায় ছিলিস? এ কী অবস্থা তোর!

তুঘলক কোন উত্তর করল না। তপনের গায়ে হাত দিয়ে খানিক দাঁড়াল। তপন তাকে ঘরে নিয়ে এসে চেয়ারে বসাল।


সে একবার বুলিকে দেখল। তপনের দিকে চোখ ঘোরাল। কিন্তু কাউকেই জানাতে পারল না অবশেষে চিঠির মালিকটিকে সে চিনে ফেলেছে।

৪টি মন্তব্য:

  1. জেলের ভেতরে অনেকগুলো গল্প তৈরি হয় । জেলের বাইরে তাঁর আঁচটুকুও আন্দাজ করা যায় না । সেই টর্চার চেম্বার,রাজনৈতিক বন্দি হলে মন-গোলানো বিভিন্ন পদ্ধতি । আর সেসবের বাইরে ব‍্যক্তি এবং সমগ্রের ভিন্ন ভিন্ন লড়াই,সমঝোতা,চালাকি অথবা নুয়ে পড়া । সাদিকের গল্প যেন তারই একটা খণ্ডচিত্র । ব‍্যক্তির । সমগ্রেরও ।

    উত্তরমুছুন
  2. লিখনভঙ্গী অদ্ভুত টানের। ঠিক চিত্রায়িত নয়, অনেকটা আবছা জলরঙে আঁকা। ধূসর, ময়লা, জেল, পুলিশ, কয়েদী, পকেটমার মিলিয়ে - সম্মোহিত করে।

    উত্তরমুছুন
  3. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন