বৃহস্পতিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

গল্পের কলকব্জা ১. গল্পের খোঁজে ২. গল্পের জনপদ

সৈয়দ শামসুল হক


গল্পের খোঁজে

লেখকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে মানুষের কত রকম কৌতূহল হয়, তখন কত রকম প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় লেখককে; প্রায়ই হাস্যকর, কখনো কখনো গুরুতর সেইসব প্রশ্ন। মনে পড়ে, আমার লেখক জীবনের ছোটবেলায় একজন আমাকে জিগ্যেস করেছিলেন, আমি কোন ক্লাশের বই লিখি?-
তাঁর ধারণা, লেখক মানেই স্কুল পাঠ্য বইয়ের লেখক। আবার অনেকে জানতে চান, একটা বই লিখতে কতদিন লাগে? একটা বই লিখে কত রোজগার হয়। আমার বই কতগুলো? কেউ জানতে চান, আমার লেখার বিষয় কি? - তাঁরা পরমুহূর্তেই প্রাঞ্জল করে দেন যে, বই-টই পড়বার সময় তাঁদের হয় না, কারণ বোঝেনই তো আমরা খেতে খাই, সময় নেই। এঁদেরই অনেকে আবার অনুরোধ করেন, আপনার একখানা বই দেবেন তো, পড়ে দেখবো। আবার, যাঁরা আমার লেখা পড়েছেন তাঁরা প্রায়ই গলা খাটো করে জানতে চান, অমুক বইয়ের অমুক চরিত্রটি কি অমুক ব্যক্তি নন আসলে? এঁরা হন নাছোড়বান্দা, উত্তর না নিয়ে রেহাই দিতে চান না, চুপ করে থাকলে ধরেই নেন যে তাঁর অনুমানই সত্যি। আবার এরকমও হয়, জানতে চাওয়া হয়, আমি কখন লিখি? দিনে না রাতে? রাতে যদি লিখি, আর বিজলি যদি চলে যায়, তাহলে আমি কি হাত গুটিয়ে বসে থাকি? না, মোমের আলোয় লিখি? একবার, কবি শামসুর রাহমানের সঙ্গে এক বাসায় গিয়ে, সে বছর অনেক আগের কথা, এই রকম প্রশ্ন হচ্ছিল একের পর এক, শেষে শামসুর রাহমান থাকতে না পেরে, এতক্ষণ নীরব থাকবার পর, আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে, যেন প্রশ্নকর্ত্রীর হয়েই, প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি কোন টুথপেস্টে দাঁত মাজেন? প্রশ্নকর্ত্রী নির্বোধ ছিলেন না, শামসুর রাহমানের ক্রোধ এবং তীব্র পরিহাসটুকু ধরতে পেরেছিলেন ঠিকই, অতঃপর, আজ পর্যন্ত সে-বাড়িতে আর আমাদের দু'জনের নেমন্তন্ন হয় নি। আজকাল আবার আরেক প্রশ্ন প্রায়ই পেয়ে থাকি, যাঁরা জানেন আমি কম্পিউটারে লিখি, এ সৃষ্টিশীল কাজ কি যন্ত্রের মাধ্যমে সম্ভব?

কিন্তু একটি প্রশ্ন আমাকে ভাবায়, ভাবিয়েছে, যখন কেউ হঠাৎ জানতে চান যে, এই যে এতদিন লিখছি, এত গল্প আমি কথা থেকে পাই? আমি চমকে উঠি, কারণ, আমার অতীত মনে পড়ে যায়-- আমি নিজেই তো একসময় মনে করতাম, শূন্য ঝুলি হাতে নিয়ে গল্প খুঁজে বেড়াতে হয়; বিচলিত বোধ করি, কারণ, গল্প যে খুঁজতে হয়-- এইটে অনেক লেখকই বিশ্বাস করে থাকেন এবং তাঁদের শ্রমের প্রায় সর্বাংশই সেই গল্পের সন্ধানে তাঁরা ব্যয় করে থাকেন; বড় হতাশ বোধ করি, যখন দেখি যে, চূড়ান্ত নাটকীয় বা যার শেষ চমকপ্রদ এরকম একটা গল্পের কাঠামো তৈরি করবার জন্যে চারদিকে লেখকেরা কী পরিমাণে ব্যস্ত। অথচ, তেমন নাটকীয়তার কি সত্যি দরকার আছে? শেষটুকু চমকপ্রদ হলেই কি শিল্প হয়ে যায়? মঁপাসার 'নেকলেস' গল্পটির শেষটুকু চমকপ্রদ নিঃসন্দেহে, কিন্তু আমার ধারণা ঐ শেষটুকুই ও-গল্পের শত্রু, কারণ, গল্পটি কেউ যদি আমাকে মুখে মুখে বলেন তো আমার আর পড়বার পরে নতুন কোনো উপার্জন হয় না, কিংবা ধরুন, ও' হেনরির 'রাজদূতদের উপহার' গল্পটি, সেটিও তো কারো মুখে শোনবার পর পড়বার দরকার হয় না; আসলে, আমাদের অনেকেই ও দুটি গল্প কিন্তু না পড়েই জেনে গেছি।

আমার একটি বিশ্বাস আছে যে, মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে গল্প বানিয়ে আসছে, নাটকীয় যত রকম পরিস্থিতি হতে পারে তার সবই এতদিনে নিঃশেষিত হয়ে গেছে, কারো আর সম্ভব নয় নতুন করে বা নতুন কোনো গল্প বানানো, আমরা কেবল যা করতে পারি, পুরনো গল্পকেই সমকালের পরিস্থিতিতে ফেলতে পারি, অথবা, বর্তমান সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মানুষের আচরণ ও প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারি এবং বলা বাহুল্য, এ দু'য়ের জন্যেই দরকার, এবং একমাত্র দরকার, লেখার ক্ষমতার কথা বলছি না, সে তো থাকতেই হবে, দরকার- একটি বিশ্বাস, একটি দর্শন, একটি দৃষ্টিভঙ্গি। এই বিশ্বাস, এই দর্শন, এই দৃষ্টিভঙ্গি যাঁর আছে, গল্প তাঁকে খুঁজতে হয় না; তাঁকে বরং বেশি করে ভাবতে হয়, কোন গল্প লিখবো আর কোন গল্প লিখবো না।

গল্প লেখকের মাথার ভেতরে গল্প জন্ম নেয় না, মাথার ভেতরে থাকে না; গল্প পড়ে আছে লেখকের চারপাশে, এত গল্প যে একজীবনে সব লিখে ফেলার আশা করাও মূর্খতা। গল্প খোঁজা নয়, বরং কীভাবে গল্পে আমার বিশ্বাসটি পোক্ত কাঠামো হয়ে আসতে পারবে, সেই গল্পে আমার দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হতে পারবে কিনা, আমার জীবনদর্শনকে সে-গল্প দক্ষতার সংগে বহন করতে পারবে কিনা, এটা খুঁজে দেখাই গল্প লেখকের প্রাথমিক কাজ, এই হচ্ছে তার প্রস্তুতির সম্পূর্ণ আয়োজন।

তবু যে গল্প খোঁজার একটা কথা শোনা যায়, সেটা তো অস্বীকার করা যায় না, আমার পাঠক না হয় কেউ কেউ প্রশ্ন করেছেন, এত গল্প কথা থেকে পাই, অনেক লেখকও তো আমাকে এই একই প্রশ্ন করে থাকেন, অবশ্য একটু ভিন্নভাবে, যেমন- আপনার ঐ গল্পটি কিন্তু বেশ জমিয়ে তুলেছেন, ঈর্ষা করবার মতো। হা, তাঁদের আমি কী করে বোঝাবো যে, আমি গল্প জমিয়ে তোলাটাকে কোনো কাজই মনে করি না, বস্তুত আমি সেই অর্থে একটিও গল্প আজ পর্যন্ত লিখি নি, কেবল বাজি রেখে বহুদিন আগে 'কয়েকটি মানুষের সোনালী যৌবন' নামে একটি বড় গল্প ছাড়া এবং যেমন বলেছি, ওটা লেখা বাজি রেখে যে, ইচ্ছে করলে একটা নাটকীয় গল্প আমিও লিখতে পারি। না, সেই অর্থে গল্প বা উপন্যাস একটিও লিখি নি; খুব সংক্ষেপে এটুকু বলা যেতে পারে, আমি আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশেষ একটি পরিস্থিতিতে বিশেষ একটি মানুষকে রেখে তাকে এবং পরিস্থিতিটিকে দেখবার চেষ্টা করেছি মাত্র।

'গল্প খোঁজা'য় যাঁরা বিশ্বাস করেন তাঁরা আসলে দৈবের ওপর নির্ভর করেন, এ কালে যখন অন্নবস্ত্রের জন্যেও দৈবের ওপর আর মানুষের বিশ্বাস নেই, তখন গল্পের জন্যে তার ওপর নির্ভর করাটা নিতান্তই হাস্যকর। এককালে, সে সুদূর অতীতের কথা, যারা গল্প রচনা করতে পারতেন, তাঁদের মনে করা হতো যাদুশক্তির অধিকারী অথবা স্বর্গীয়-পুরুষ; তাই, রামায়ণ-মহাভারত, যার বাইরে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে হিমালয়ের দক্ষিণের যাবত মানুষের গল্প-কল্পনা সম্ভব নয় এখন পর্যন্ত, সেই মহাকাব্য দুটিরও রচয়িতা হিসেবে কোনো মানুষকে সম্মান দেয়া হয় নি, এমন মানুষ যিনি আমাদের মতোই খান-দান এবং সংসার ধর্ম পালন করেন। আমার তো মনে হয়, এখানেই লুকিয়ে আছে আজো গল্পের জন্যে দৈবশক্তি বা দৈব যোগাযোগের ওপর নির্ভর করবার শেকড়টি।

তারপরে, নানাভাবেও এ ধারণাটি প্রশ্রয় পেয়েছে, কিছুটা লেখকদের নিজের কাজ সম্পর্কে স্বল্পভাষীতার জন্যে, আবার অনেকটা আমাদেরই ভুল বোঝার জন্যে। রবীন্দ্রনাথ 'রাজর্ষি' নামে যে উপন্যাসটি লিখেছিলেন, তার গল্প তিনি স্বপ্নে পেয়েছিলেন বলে তিনি নিজেই বহুবার বলেছেন, এখন আমাদের সকলেরই জানা, যে, রেলগাড়িতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন কবি এবং স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি বালিকাকে, যে মন্দিরের সিঁড়িতে রক্ত দেখে বলছে, বাবা, এত রক্ত! আমরা আমাদের ক্ষতি করেছি, ঐ স্বপ্ন দেখাটাকেই উপন্যাসটি লেখার একমাত্র প্রেরণা বলে ধরে নিয়ে, অথচ, আমাদের এতটুকু উৎসাহ থাকলে আমরা সহজেই জেনে নিতে পারি যে, ঐ উপন্যাস রচনার কালে সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক রক্তপাত চলছিলো; মানুষের হিংসা এবং কুসংস্কার নিয়ে রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথের মতো সংবেদনশীল একজন মানুষ, ক্ষুব্ধ এবং ভাবিত, ভাবিত এবং ক্রুদ্ধ ছিলেন; ছিলেন ঈশ্বর-বিশ্বাসে ব্রাহ্ম চেতনাসম্পন্ন ব্যক্তি; সামাজিক পর্যায়ে ত্রিপুরা রাজ পরিবারের ঘনিষ্ঠ- এ সবই মিলে মিশে তাঁর মনে যে বক্তব্যের জন্ম দিয়েছিল, সেই বক্তব্যটিই বাহন পেয়ে যায় তাঁর ঐ স্বপ্ন-দৃশ্যের ভেতরে, আর এ কথা তো আমরা জানি, যে-কোনো স্বপ্নই মানুষের স্মৃতি ও ভাবনার, আশংকা বা আকাংখার দৃশ্যরূপ মাত্র। কাজেই, রবীন্দ্রনাথ দৈবক্রমে 'রাজর্ষি'র গল্পটি পেয়ে গেছেন, এটা কোনো কথাই নয়। আমার মনে পড়ছে, ঔপন্যাসিক হিসেবে আমি যাঁকে সবচেয়ে শ্রদ্ধা করি, সেই লিও টলস্টয়ের কথা; তাঁর উপন্যাস 'আনা কারেনিনা' লেখার ইতিহাস আমরা এটুকু জানি যে, তাঁর বাড়ির খুব কাছেই একবার এক তরুণী রেলগাড়ির নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছিলো, বাড়ির কাছে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক যে-কোনো ঘটনার মতো এটিও কয়েকদিন ধরে টলস্টয় পরিবারে আলোচিত হচ্ছিলো, এরই মধ্যে তিনি তাঁর বাচ্চাদের পড়তে পড়তে ফেলে রাখা পুশকিনের একটা বই তুলে নেন, বইয়ের একটা গল্প টলস্টয় তাঁর স্ত্রীকে পড়ে শোনাতে থাকেন, যার প্রথম লাইন ছিলো, 'দেশের বাড়িতে অতিথিরা একে একে হাজির হতে শুরু করলো', টলস্টয় বই বন্ধ করে বললেন, 'এভাবেই গল্প শুরু করতে হয়', তারপর সে-রাতেই তিনি লেখার ঘরে গিয়ে কাগজ টেনে 'আনা কারেনিনা' উপন্যাসের প্রথম পাতাটি তরতর করে লিখে ফেললেন, যার শুরু- 'সব সুখী পরিবারই এক রকম, তবে অসুখী পরিবার অপর থেকে আলাদা...।' আমরা ধরেই নিই যে, এইভাবে রচিত হয়ে গেল এমন একটি উপন্যাস যা অনেকরই মতে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস; অথচ, আমরা একবারও ভাবি না যে, ঐ উপন্যাসে হাত দেবার অনেক আগে থেকেই টলস্টয় ভাবছিলেন মেয়েদের ব্যক্তিস্বাধীনতার কথা, ভাবছিলেন সেকালে রুশদেশে ভূমিদাসদের কথা, ভাবছিলেন খামার এবং কৃষিব্যবস্থা নিয়ে, ভাবছিলেন তাঁর বিবাহিত জীবন এবং সংসার নিয়ে, ভাবছিলেন অস্তিত্বের পটভূমিতে নিজের অবস্থানের কথা। -এ তালিকা আরো বাড়ানো যায়, এবং গোটা ছবিটা সচেতনভাবে দেখে নিতে পারলেই আমরা জেনে যাবো যে 'আনা কারেনিনা'র আবির্ভাব আকস্মিক নয়, রেলে কাটা পড়া মেয়ের কথা শুনেই তিনি হাতের কাছে 'গল্প পেয়ে গেলাম' বলে কাগজ কলম টেনে নেন নি, বা পুশকিনের লেখায় সূচনার মৃদুস্বর তাঁকে মুগ্ধ করেছিল বলেই নিজেও মৃদুস্বরে একটা কিছু লিখে ফেলবার জন্যে অন্ধকারে যাত্রা শুরু করেন নি তথা দৈবের হাতে কলম এবং কল্পনা ছেড়ে দেন নি।

আসলে, লেখকের বিশ্বাস, দর্শন এবং দৃষ্টিভঙ্গি কোনো একটি বক্তব্য তাঁর মনে আগে থেকেই এনে দিয়ে যায়; কোনো একটি স্বপ্ন, যেমন রবীন্দ্রনাথের বেলায়, কিংবা কোনো একটি সংবাদ, যেমন টলস্টয়ের বেলায়, ইংরেজি বাগভঙ্গি ধার করে বলি, ট্রিগার কাজ করে মাত্র; ট্রিগার তো নিজে কিছু নয়, পিস্তল থাকতে হবে, গুলি থাকতে হবে, সমুখে লক্ষ্যও থাকা চাই, তবে ট্রিগার টিপলে গুলিও ছুটবে, লক্ষ্যও বিদ্ধ হবে। সহজ এই কথাটি উপলব্ধি না করবার দরুনই অধিকাংশ লেখকের অধিকাংশ সময় ও শ্রম খরচ হয়ে যায় ঐ ট্রিগারে, কেবল ঐ ট্রিগার খুঁজতে অথবা বানাতে। উপমাটিকে আরো টেনে বলি, পিস্তল যাঁর হাতে আছে, ট্রিগার সমেতই পিস্তলটি তাঁর হাতে আছে, কেবল সেই ট্রিগারের অবস্থান জেনে আঙুলের চাপ দেবার অপেক্ষা, আর, পিস্তলের ট্রিগার কোথায়, যেমন তা চোখে দেখে বা আঙুলে অনুভব করে জেনে নিতে হয়, তেমনি একজন লেখককেও তার চারপাশে তাকিয়ে দেখতে হয় এবং ট্রিগারটিকে সনাক্ত করে নিতে হয়। গল্প খোঁজার যদি কোনো অভিধেয় থেকেই থাকে তো সেটা হচ্ছে এ ট্রিগারের জন্যে নিজের মন এবং চোখ তৈরি রেখে মানুষের দিকে এবং কেবল মানুষই নয়, সমকালের দিকে তাকিয়ে থাকা, বস্তুত সমকালের পটভূমিতে মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকা।



অনুবাদ

ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত এশিয়া মহাদেশের লেখকদের সম্মেলনে একটি অধিবেশনে আমাকে সভাপতিত্ব করতে বলা হয়; অধিবেশনটি ছিল সাহিত্যের অনুবাদ বিষয়ে; আলোচনার কাঠামো ছিল একটি প্রশ্নের আকারে : অনুবাদ কি কেবল ভাষার ব্যাপার না সংস্কৃতিরও বটে?

মার্কিন একজন লেখক টার্কি বা বনমোরগের চমৎকার উপমা দিয়ে বললেন, 'অনুবাদ হচ্ছে সিঙ্গাপুরের টার্কি রোস্টের মতো। আমি আর আমার স্বামী একবার গেছি সিঙ্গাপুরে। সেখানে থাই আর চাইনিজ খাবার খেয়ে খেয়ে যখন হেঁদিয়ে পড়েছি, তখন একদিন রেস্তোরাঁর মেনু ঘেঁটে বের করলাম টার্কি রোস্ট, দিলাম অর্ডার। আপনারা জানেন, আমরা মার্কিনীরা টার্কি রোস্ট করি, বিশেষ করে বড়দিনে খাই, খুব মজা করে খাই। ভাবলাম, অনেক দিন পর নিজের দেশের একটা রান্না খাবো। চলে এলো টার্কি আমাদের টেবিলে। ছুরি কাঁটা দিয়ে কেটে আমরা হাঁ করে পাঠালাম মুখের গহ্বরে। কিন্তু এ-কী! হা, খৃস্ট! এ যে পুরোপুরি চীনে স্বাদ, চীনে রান্না।

ভদ্রমহিলা বললেন, 'অনুবাদে ঠিক এই ব্যাপারটাই হয়। মার্কিন টার্কি হয়ে যায় সিঙ্গাপুর টার্কি। মোরগটা ঠিকই থাকে, স্বাদটা ভিন্ন হয়ে যায়। আর স্বাদটা ভিন্ন হবার কারণে জিনিশটাই ভিন্ন হয়ে যায়। দুটোই যদি সমান উপভোগ্য হয়, তাহলে ভালো। কিন্তু যদি দেখা যায়, উপাদানের সঙ্গে মশলাটা ঠিক মিলছে না, স্বাভাবিক লাগছে না, তখন যিনি মার্কিন টার্কি রোস্ট মূলে জানেন তিনি বলবেন-- এটা তো সেই জিনিশ নয়! আর যাঁর আদৌ পরিচয় নেই মূল টার্কি রোস্টের সঙ্গে তিনি বলবেন-- হ্যাঁ, এ বেশ মন্দ নয়! বলার দরকার নেই যে, সাহিত্যে মন্দ নয় কথাটা মূল্যহীন, সাহিত্যে চাই-- চমৎকার! চাই-- এইতো!'

কোরিয়ার বক্তা, তিনি কবি, বললেন, 'অনুবাদ চাইই চাই, ভালো হোক কি মন্দ হোক। যে-ভাষা আমি জানি না, অনুবাদ ছাড়া তার সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হবার কোনো উপায়ই যে নেই।' তবে এই বক্তার মূল কথা ছিল, 'প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক ব্যবধান অনেক। এই ব্যবধান আমাদের কমিয়ে আনতে হবে।' কী করে কমানো যাবে? ভদ্রমহিলার প্রস্তাব, 'প্রাচ্যের লেখকেরা বেশি পাশ্চাত্য পুরাণ ও প্রতিমা ব্যবহার করবেন, আর পাশ্চাত্যের লেখকেরা প্রাচ্যের পুরাণ ও প্রতিমা।'

প্রস্তাবটি অভিনব সন্দেহ নেই, তবে অস্বাভাবিক বটে; সৃষ্টিশীল ব্যক্তির কল্পনার শেকড়, বিশেষ করে ভাষা মাধ্যমে যাঁরা কাজ করেন তাঁদের, আপন সংস্কৃতির মাটিতে ও পুরাণ এবং প্রতিমায় বটে। অতএব, শ্রোতাদের ভেতর থেকে প্রতিবাদ উঠলো ঝড়ের বেগে। সিঙ্গাপুরের এক খ্যাপা কবি লাফিয়ে উঠে দু'হাত নেড়ে বললেন, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, এ কাজ আমরা প্রাচ্যের কবিরা বহুদিন থেকেই করছি, পাশ্চাত্যের পুরাণ ও প্রতিমা কবিতায় লাগাচ্ছি, কিন্তু পাশ্চাত্যের কবিরা এতই আত্মগর্বী ও অন্ধ যে তাঁরা আমাদের প্রাচ্যের কোনো কিছুই নিজেদের লেখায় ব্যবহার করেন নি ও করেন না।'

মার্কিন এক কবিও উঠলেন লাফিয়ে; বললেন, 'কক্ষনো নয়। এজরা পাউন্ড সাক্ষী। গ্যোয়েটে সাক্ষী।। এলিয়ট সাক্ষী।' তালিকা দীর্ঘ হতে যাচ্ছিল, বাধা পড়লো তুরস্কের এক লেখকের ধমকে। ভদ্রলোক সম্প্রতি তুর্কি ভাষায় অনুবাদ করেছেন জেমস জয়েসের ইউলেসিস; চার বৎসরের একটানা অনুবাদ-পরিশ্রমে ক্লান্ত তিনি ভারী দেহটিকে টেনে তুলে হুইস্কি মথিত কণ্ঠে বললেন, 'এ সব কী হচ্ছে? আমি যদি ঈশ্বর হতাম, পৃথিবীতে একটাই ভাষা করে দিতাম, একটাই সংস্কৃতি, তাহলে এই ছেলেমানুষি ঝগড়া আমাকে শুনতে হতো না।' তারপর সুস্থির হয়ে তিনি বললেন, 'ঈশ্বর তো একটা ভাষা গোড়াতেই আমাদের দিয়েছিলেন। পুরাণে পড়েন নি? ব্যাবেলের মিনারে বসে আমরা ঝগড়া করে ভাগ হয়ে গেলাম, অনেকগুলো ভাষা হয়ে গেলো চোখের পলকে, ‌ কেউ আর কারো কথা বুঝতে পারলাম না। সে যাক, অনুবাদ সাহিত্য সবসময়ই বিশেষ পাঠকের সাহিত্য। বিশেষ পাঠক হতে গেলে বিশেষ জ্ঞান ধরতে হবে। মূল ভাষার বই অনুবাদে পাঠ করবার আগে সেই ভাষার সংস্কৃতি ইতিহাস ভূগোল পুরাণ সমাজ সব আমাদের কিছু কিছু তো জানতেই হবে। এই যে আমাদের সভাপতি, তিনি বাংলাদেশের, তাঁর দেশের বিন্দুবিসর্গ আমি জানি না, এখন তাঁর দেশের একটা উপন্যাস পড়বো দেশটি সম্পর্কে না জেনেই, এবং দাবি করবো কেন সড়গড় বুঝতে পারছি না, তা তো হয় না!'



তখন মালয়েশিয়ার এক তরুণী চেঁচিয়ে মন্তব্য করলেন, 'আরে, এটাই তো সাহিত্যের একটা বড় কাজ। সাহিত্য পড়ে একটা অজানা দেশ ও তার সংস্কৃতি যতখানি আবেগের ভেতরে নেয়া যায়, ইতিহাস বা প্রবন্ধ পড়ে তা কখনোই সম্ভব হয় না।'

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন