বৃহস্পতিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

লেখকের বন্ধু লেখক

কাফকা ও তাঁর বন্ধু ম্যাক্স ব্রড
এক টেবিলের দু’ধারে দুজন বসে লিখছেন। প্রেমে, ডিভোর্সেও, এগিয়ে দিচ্ছেন আশ্রয়ের কাঁধ। প্রকাশক খুঁজে দিচ্ছেন, আমৃত্যু আগলে রাখছেন বন্ধুর লেখা। কলমের বন্ধুতা চারিয়ে যাচ্ছে জীবনে।

লিখেছেন শিশির রায়--

বড় বড় লেখকদের নিয়ে প্রচুর জনশ্রুতি জমা থাকে ইতিহাসে। বেশির ভাগই অনিবার্য রোম্যান্টিক। যেমন ছিল ইংরেজি সাহিত্যের দুই কবি— উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ আর স্যামুয়েল টেলর কোলরিজকে ঘিরে। ১৭৯৭-এর ইংলিশ সামারের এক দিন কোলরিজ নাকি চল্লিশ মাইল পথ উজিয়ে হাজির হয়েছিলেন এক বাগানবাড়িতে, যেখানে দুই ভাইবোন— উইলিয়াম আর ডরোথি— থাকছিলেন, লিখছিলেন। উইলিয়াম তখন সাতাশ বছরের তরুণ, ডরোথি ছাব্বিশ, কোলরিজ পঁচিশ। কোলরিজের দিন তিনেকের ‘দেখা করতে আসা’ সে যাত্রা গড়িয়েছিল তিন হপ্তায়। দিনে ছবির মতো সুন্দর ইংল্যান্ডের কান্ট্রিসাইডে ঘুরে বেড়ানো, আর রাত জেগে দুই বন্ধুর কথা। কী দেখলাম, কবিতা লেখা হবে তাই নিয়ে। ভাবনার বিনিময়: কেমন হবে কবিতার ভাব, ভাষা। খুব জ্বরে পড়লে যেমন একটা ঘোরের মধ্যে থাকে মানুষ, তেমনই আচ্ছন্ন হয়ে কবিতা লিখতেন একই টেবিলের দু’ধারে দুজন। এ জুগিয়ে দিচ্ছেন এক-একটা ইমেজ, ও বলে দিচ্ছেন: আরে, সেই ভেবে-রাখা দুর্দান্ত স্তবকটা বাদ দিয়ে দিলে দেখছি, ঢোকাও ওটা! এমনই কবিতাতুতো বন্ধুতা, সে বার ফিরে এসে কোলরিজের সমারসেটের বাড়ির খুব কাছেই ডেরা বেঁধেছিলেন ওয়ার্ডসওয়ার্থ। কাছাকাছি না থাকলে, পাশাপাশি না লিখলে, কী করে তৈরি হবে রোম্যান্টিক মুভমেন্টের কাব্যভাষা, লেখা হবে যুগান্তকারী কবিতার বই ‘লিরিকাল ব্যালাড্‌স’! কী করে হাত ধরে পাশাপাশি হাঁটবে ‘টিনটার্ন অ্যাবি’ আর ‘দ্য রাইম অব দি এনশেন্ট মেরিনার’!

১৮৫০-এ ওয়ার্ডসওয়ার্থ মারা যাচ্ছেন, আর তার ঠিক বছরখানেকের মাথায় চার্লস ডিকেন্সের সঙ্গে দেখা হচ্ছে উইল্কি কলিন্স-এর। চল্লিশ ছুঁই-ছুঁই ডিকেন্স তখন ইংল্যান্ডে সেনসেশন, খোদ মহারানি ভিক্টোরিয়া তাঁর নভেল ‘অলিভার টুইস্ট’ আর ‘দ্য পিকউইক পেপার্স’ পড়ে দরাজ সার্টিফিকেট দিয়েছেন। সেলেব্রিটি লেখকের দিকে যেমন তাকিয়ে থাকে স্বপ্নালু উঠতি-লিখিয়েরা, এক আড্ডায় ডিকেন্সকেও সে ভাবেই দেখছিলেন বছর সাতাশের কলিন্স। তিনি তখন স্রেফ খানকয়েক গল্প, একটা উপন্যাস লিখে প্রকাশকের দুয়ো-কুড়োনো যুবক। কিন্তু, বন্ধুতার ঈশ্বর যে কার জন্য কোথায় কুটোবাঁধা করে রাখেন কাউকে! সে দিনের সেই বন্ধুত্ব চলল সারা জীবন। চার্লস ডিকেন্স আর উইল্কি কলিন্স— দুজনে একসঙ্গে নাটকে অভিনয় করেছেন। কলিন্সের ছোটগল্প ডিকেন্স বের করেছেন তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ‘হাউসহোল্ড ওয়ার্ডস’-এ, পরে সেখানেই দুজনে একসঙ্গে কলাম লিখেছেন। একসঙ্গে ডিনার, মদ খাওয়া, নাটক দেখা। দাড়ি রাখবেন তো দুজনেই রাখবেন। লন্ডন বা প্যারিসের রাস্তায় একসঙ্গে হাঁটবেন। আর এ সবেরই মধ্য দিয়ে কবে যেন ডিকেন্সের চিঠির সম্বোধন বদলে গেল ‘মাই ডিয়ার কলিন্স’ থেকে ‘মাই ডিয়ার উইল্কি’তে, চিঠি-শেষের পোশাকি ‘এভার ফেথফুলি’ হল ‘এভার অ্যাফেকশনেটলি’। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি-শাসিত ভারতে যখন সিপাহি বিদ্রোহের মেঘ, তখন লন্ডনে কলিন্সের লেখা নাটক স্টেজে নামাচ্ছেন ডিকেন্স। সেই নাটকের সুবাদেই ডিকেন্সের সঙ্গে পরিচয় অষ্টাদশী সুন্দরী তরুণী এলেন টার্নান-এর, যাঁর প্রেমে মজে ক’মাস পরেই নিজের বৈঠকখানা আর শোবার ঘরের মধ্যে পার্টিশন বসাবেন ডিকেন্স, অচিরে বিয়েও ভাঙবে মধ্যবয়সি লব্ধপ্রতিষ্ঠ লেখকের। টালমাটাল দাম্পত্যের ঘায়ে ক্লান্ত, ধ্বস্ত ডিকেন্সের কাছে আশ্রয়ের কাঁধ তখন বন্ধু কলিন্সই। কলিন্সকে ডিকেন্স লিখছেন: ‘আমরা দুজনে চলো কোথাও যাই, ঘুরে-দেখে আসি কিছু, যা নিয়ে দুজনে লিখতেও পারি। কোনও জায়গা জানা আছে তোমার? আমাদের পত্রিকার জন্য লেখা দরকার, আর আমার আরও বেশি দরকার নিজের কাছ থেকে পালানো।’ অগ্রজপ্রতিম বন্ধুর বিয়ে ভাঙার ঘটনায় কলিন্স ডিকেন্সের পাশেই ছিলেন সব সময়, আবার ওঁদের ডিভোর্সের পরেও বরাবর সহৃদয় যোগাযোগ রেখেছেন বন্ধুপত্নী ক্যাথরিনের সঙ্গে, নিজের উপন্যাস-আধারিত নাটক ‘দি উওম্যান ইন হোয়াইট’-এর বক্স-টিকিট পাঠিয়ে দিয়েছেন নেমন্তন্ন-চিঠি সহ। কত কাজই যে করতে হয় বন্ধুদের!

‘প্রিয়তম ম্যাক্স, আমার শেষ ইচ্ছা: যা কিছু আমি রেখে যাচ্ছি— ডায়েরি, পাণ্ডুলিপি, নিজের আর অন্যের চিঠিপত্র, আঁকিবুঁকি (আমার বইয়ের তাকে, আলমারিতে, বাড়ি বা অফিসের লেখার টেবিলে, বা তুমি খুঁজে পাও এমন অন্য যে কোনও জায়গাতেই)— না-পড়া অবস্থাতেই সব একেবারে পুড়িয়ে ফেলা হোক। তোমার কাছে আমার লেখা বা আঁকা যা কিছু আছে, সেগুলোও। অন্যের কাছে আমার যা কিছু আছে (আমার হয়ে ওদের বোলো), তাও। চিঠিগুলো কেউ যদি তোমাকে ফেরত দিতে না চায়, অন্তত ওদের দিয়ে শপথ করিয়ে নিও, যেন ওরা নিজেরাই সেগুলো পুড়িয়ে ফেলে।’ বিশ শতকের সাহিত্য যাঁর কাঁধে ভর করে দাঁড়িয়ে, সেই ফ্রান্‌ৎজ কাফকা মৃত্যুর আগে লিখে গিয়েছিলেন এই শব্দগুলো, বন্ধু ম্যাক্স ব্রড-কে। ১৯২৪-এ কাফকা যখন মারা যাচ্ছেন দুরারোগ্য যক্ষ্মায়, বার্লিন বা প্রাগের সাহিত্যবৃত্তে তখন তিনি আদৌ পরিচিত কোনও লেখক নন। সেই তাঁকেই অমর করে তুললেন বন্ধু সাংবাদিক-লেখক ম্যাক্স, মৃত্যুর পর কাফকার সব লেখা, গল্প-উপন্যাস প্রকাশ করে। প্রিয় বন্ধুর উইলকেও আমল দেননি। সেই যেমন জেলে চল্লিশ দিন অনশনরত কাজী নজরুল ইসলামকে লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ: অনশন ভাঙো, our literature claims you, তেমনই যেন জেনে গিয়েছিলেন বন্ধু ম্যাক্স ব্রডও— বিশ্বসাহিত্য দাবি করে কাফকাকে। ম্যাক্সেরই একক প্রচেষ্টায় ১৯২৫-এ কাফকার ‘দ্য ট্রায়াল’, তার পরের বছর ‘দ্য কাস্‌ল’ প্রকাশের পর যখন আবিশ্ব তোলপাড়, ম্যাক্স বলেছিলেন, আমি তো ফ্রান্‌ৎজকে অনেক আগেই বলেছিলাম, তুমি এই সময়ের সবচেয়ে বড় ‘কবি’! ১৯৩৯-এ নাৎসি সেনারা প্রাগে ঢুকে পড়েছে, ইহুদি ম্যাক্স পালিয়ে এলেন ইজরায়েলে। প্রাণ হাতে করে ট্রেনে চড়েছেন, কিন্তু সঙ্গের সুটকেসে বন্ধুর যাবতীয় লেখা ভরে আনতে ভোলেননি! আরও যে তিরিশ বছর বেঁচে ছিলেন, বেঁচে ছিলেন প্রিয় বন্ধুর লেখা সমস্ত অক্ষরকে মায়ের ভালবাসায় আগলে। ম্যাক্স ব্রডদের জন্যই পৃথিবী পেয়েছে ফ্রান্‌ৎজ কাফকাদের।

খুব কাছের মানুষকে চিনতে পারা কঠিন— একমাত্র বন্ধুরাই বোধহয় এ কথা মানবে না। নিজের পরিবারের সামনেও যে মানুষটা ডালাবন্ধ সিন্দুক, বন্ধুর সামনে সে-ই খোলা বইয়ের পাতা। আমার হাত একদম খালি, আমার ঘরে খাবার নেই, আমার একটা গোপন রোগ হয়েছে, আমার কিস্যু লেখা আসছে না— বন্ধুকে সব বলা চলে। আর সেই সব আক্রান্ত সময়ে, বন্ধু নামের মানুষটারও যেন একটা মেটামরফোসিস ঘটে চোখের সামনে। সে হয়ে ওঠে ছায়া-দেওয়া একটা মহাগাছ, বিরাট ডানা মেলা পাখি, চওড়া বুক-কাঁধওয়ালা মহামানুষ। ফ্রিডরিখ এঙ্গেল্‌স ম্যাঞ্চেস্টারে ফার্ম দেখাশোনার কাজ ছেড়ে চলে এলেন, কার্ল মার্ক্স নামের এক বন্ধুর তাঁকে ‘খুব দরকার’ বলে। জানতেন বন্ধুটির সামনে জরুরি খুব জরুরি একটা বই লেখার কাজ পড়ে, সাংগঠনিক আর আন্দোলনের হাতভর্তি কাজও, আর সে দিন কাটাচ্ছে কপর্দকহীন অবস্থায়। এঙ্গেল্‌স এমন বন্দোবস্ত করে এলেন, যাতে ফার্ম থেকে নিয়মিত টাকা আসার একটা হিল্লে হয়, সেই দিয়ে বন্ধু আর তার পরিবারের খাবার জুটবে। এসে দেখলেন, নানান দেশের কমিউনিস্ট বন্ধু-নেতারা রোজ আসছেন, মার্ক্সের সময় নেই, শারীরিক শক্তিও নেই সব সামলানোর। নিজের কাঁধে তুলে নিলেন সেই মহাগুরুত্বপূর্ণ কাজ। ১৮৭০-এর পর, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসে মার্ক্সের শরীর যখন ভেঙে পড়েছে, এঙ্গেল্‌সই তখন দু’হাতে সব সামলাচ্ছেন। ১৮৮৩-তে মার্ক্সের মৃত্যুর পর, এগারো বছর ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছেন, সম্পাদনা করেছেন বন্ধুর লেখা। হিজিবিজি দুর্বোধ্য ছিল মার্ক্সের হাতের লেখা, জায়গায় জায়গায় স্বরচিত স্টেনোগ্রাফিক সিম্বলে ভরা। সব সামলে, প্রকাশ করেছেন ‘দাস কাপিটাল’-এর দ্বিতীয়, তৃতীয় খণ্ড। এঙ্গেল্‌স খান বারো ভাষা জানতেন, দু’হাত ভরে লিখেছেন জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ফ্রান্সের বন্ধুদের জন্য, পোলিশ ভাষায় কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর ভূমিকা। কিন্তু বিপুল কীর্তির কণামাত্র নিজে নেননি, এগিয়ে দিতেন কার্ল মার্ক্সকে: ‘What I contributed, Marx could have easily filled in without my aid, ... But what Marx did, I could have never done.’ ‘Marx was a genius, we were at most talents.’

সাচ্চা বন্ধু খুঁজতে বিলেত যেতে হবে না। সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ ছবি তৈরির নেপথ্য-স্ট্রাগ্‌ল সর্বজনবিদিত, কিন্তু ক’জন জানেন, ‘পথের পাঁচালী’ ছাপতে বিভূতিভূষণের কী হাল হয়েছিল! ১৯২৯-এ বিভূতিভূষণ ভাগলপুর এস্টেটের কাজ ছেড়ে কলকাতায় মাটি কামড়ে পড়ে আছেন, পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকদের দরজায় দরজায় ঘুরছেন। আর ধেয়ে আসছে উপেক্ষা— ও তো ‘বটানির বই’! নর-নারীর প্রেমকাহিনি নেই, গা-শিউরোনো খুন-কেচ্ছা না, ও আবার প্লট! বিখ্যাত এক প্রকাশক বলেছিলেন, পঞ্চাশ টাকা দিতে পারি, কপিরাইট দেবেন? আর এক জন: বই ছাপার পর আদৌ বিক্রিবাটা হলে, খানিকটা রয়্যালটি দেওয়ার কথা ভাবতে পারি। বিভূতিভূষণ যখন ভাবছেন আর কিছু হল না, ফের ভাগলপুরেই ফিরে যাবেন, তখনই আবির্ভাব বন্ধু নীরদের। নীরদ সি চৌধুরী, রিপন কলেজে তাঁর সহপাঠী, মির্জাপুর স্ট্রিটের মেস-মেট। ‘বিচিত্রা’য় পথের পাঁচালী ধারাবাহিক ভাবে বেরনো ইস্তক নীরদবাবু বলে আসছেন, এ উপন্যাস অসামান্য, যুগান্তকারী, এ বইয়ের ‘ভদ্র প্রকাশক’ না জুটলে তা নিতান্তই দুর্ভাগ্যের। ভেঙে-পড়া বিভূতিভূষণকে টেনে তুলে নীরদ সি চৌধুরী যদি সে দিন ‘প্রবাসী’র আড্ডায় সজনীকান্ত দাসের কাছে নিয়ে না ফেলতেন, বাংলা সাহিত্য বিভূতিভূষণকে (আর এই পৃথিবী সত্যজিৎ রায়কে) পেত কি না সন্দেহ। সজনীকান্তও তখন প্রকাশনার কারবারে নিতান্ত অনভিজ্ঞ। এ বই বার করতে গিয়ে লোন করতে হয়েছিল তাঁকেও। তবু, নীরদ সি চৌধুরীর কথা শুনে, ‘পথের পাঁচালী’ পুরোটা পড়ে, আর সুলেখককে রক্ষা করার প্রেরণায় প্রকাশক হওয়ার তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে বিন্দুমাত্র ভাবেননি!

ভক্ত-গুণমুগ্ধ-স্তাবক পরিবৃত রবীন্দ্রনাথের কি কোনও বন্ধু ছিল? যার কাছে মন খুলতেন, এমন কথা বলতেন যা কেউ শোনেনি? বনফুল, ডা. বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ওঁর যে ক’টা সাক্ষাৎ, পড়ে মনে হয় যেন দুই বন্ধুর মোলাকাত। শুরুটা হয়েছিল দ্বন্দ্ব দিয়ে, রবীন্দ্রনাথের কিছু কথা আর কাজ ভাল না লাগায় ব্যঙ্গ শানিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকায় একখানা কবিতা-চিঠি লিখেছিলেন বনফুল। কিন্তু, ‘দ্বন্দ্ব’ মানে তো মিলনও! এর পরেই রবীন্দ্রনাথের চিঠি বনফুলকে, শান্তিনিকেতনে আমন্ত্রণ জানিয়ে। ১৯৩৭-’৩৮ সালের ওই বারকয়েকের দেখায়, অন্য এক রবীন্দ্রনাথকে চিনেছিলেন বনফুল। যে রবীন্দ্রনাথ বলাইয়ের জন্য ঘুগনি রাঁধতে বলেন— ‘বড় বড় কাবলে মটরের ঘুগনি, মাঝখানে একটা লাল লঙ্কা গোঁজা থাকবে’! এই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বন্ধুর মতো তর্ক জোড়া যায়: ‘আপনার বিরাট অস্তিত্ব এখানে এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করেছে যে তার কাছাকাছি থেকে পরীক্ষা-পাশের জন্য পড়া মুখস্থ করা শক্ত’, ‘... এটা মেয়েদের ইউনিভার্সিটি হলে ভাল হয়।’ রবীন্দ্রনাথও ঠিক বন্ধুর মতোই চ্যালেঞ্জ ছোড়েন: ‘তুমি যা বলছ তা হাতেকলমে করে দেখিয়ে দাও।... যদি করতে পার তাহলে আমিও এখান থেকে চলে যাব, আমাকে যেখানে যেতে বলবে সেইখানে যাব।’ প্রিয় বন্ধু দুর্দান্ত ভাল কিছু করলে যেমন তাকে সর্বস্ব দিয়ে দিতে ইচ্ছে হয়, ঠিক তেমনই, বনফুলের একটা গল্প খুব ভাল লেগেছে বলে তাঁকে বলছেন, অনেকগুলো কলম রয়েছে, যদি কোনওটা পছন্দ হয় নাও। নয়তো ওই রেডিয়োটা নাও। এই রবীন্দ্রনাথই চিঠিতে গল্পের প্লট পাঠাচ্ছেন বনফুলকে: ‘তুমিই ঠিক পারবে’; বনফুলের নাটকের স্বপ্নদৃশ্য পালটানোর সাজেশন দিয়ে বলছেন, নিবেদিতার অনুরোধে কেমন তিনি নিজেও ‘গোরা’র শেষটা পালটে দিয়েছিলেন। শান্তিনিকেতনে পড়ুয়াদের সাহিত্যসভায় বনফুলকে প্রধান অতিথি করে পাঠিয়ে পরে লোক পাঠাচ্ছেন এ কথা বলে দিতে যে, ওদের লেখা পছন্দ না হলেও, বনফুল ‘ছেলেমেয়েদের যেন বেশি না বকে’! রাতে শুয়ে পড়ার পরও লোক দিয়ে বনফুলকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠিয়ে বলছেন ‘গান শুনবে?’, তার পরেই গেয়ে উঠছেন ‘সার্থক জনম আমার’। সভায় ‘বসন্ত’ কবিতা পড়ছেন বেমালুম দুটো স্তবক বাদ দিয়ে, পরে বনফুল সে কথা তুলতে বলছেন, ‘এখানে কেউ ধরতে পারে না। প্রায়ই আমি বাদ দি’।’ আবার সুবন্ধুর মতো বাতলে দিচ্ছেন পরামর্শ— রোজ নিয়ম করে নির্দিষ্ট একটা সময়ে লিখতে বসতে হবে, লেখালিখির পাশাপাশি বেশি পড়তে হবে ইতিহাস-দর্শন-বিজ্ঞান (‘উপন্যাস না পড়লেও চলবে’), লেখার সময় কী কী মনে রাখতে হবে, সব। এই বন্ধুতা পেয়েই বনফুল লেখেন: ‘...সঙ্কোচের কোন অবসরই ছিল না, যেন অকপটে তাঁর সঙ্গে আলাপ না করলেই অশোভন হবে এই রকম একটা আবহাওয়া গড়ে উঠেছিল...’

এ ভাবেই দুটো কলমের একসঙ্গে বা খানিক আগে-পরে লিখে চলা, নাড়িয়ে ঝাঁকিয়ে দেয় চরাচরকে। একটা কলমের কালি শেষ হয়ে এলে অন্যটা নিজের থেকেই ধার দেয় কিছুটা জীবনীশক্তি। আবার একটা কলম একেবারে ফুরিয়ে গেলে, অন্যটা চলতে থাকে। তাই কিট্‌স-এর মৃত্যুতে পৃথিবী পায় শেলির লেখা কবিতা ‘অ্যাডোনিস’। নজরুলের স্মৃতিতে বাল্যবন্ধু, সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় লেখেন ‘আমার বন্ধু নজরুল’, নিজের বইয়ের নাম দেন বন্ধুর লেখা গানের লাইন থেকেই, ‘কেউ ভোলে না কেউ ভোলে’। জেমস বল্ডউইনের মৃত্যুতে টোনি মরিসন লেখেন: ‘Like many of us left here I thought I knew you. Now I discover that in your company it is myself I know.’ শুধু লেখাতুতো বন্ধুতাই না, জীবনতুতো ইয়ারানা। প্যারিসের রাস্তায় মদে চুর জেমস জয়েস অন্য মদাড়ুর সঙ্গে হাতাহাতি বাঁধিয়ে দৌড়ে এসে লুকিয়ে পড়ছেন বিশালদেহী আর্নেস্ট ‘পাপা’ হেমিংওয়ের পেছনে, বন্ধুকে তাতাতে বলছেন, ‘ডিল উইথ হিম, হেমিংওয়ে, ডিল উইথ হিম!’ ১৮৬৬-’৭৬, দশ বছর ধরে একে অন্যকে চিঠি লিখে গেছেন পারফেকশনিস্ট গুস্তাভ ফ্লব্যের আর জীবনোচ্ছল জর্জ সাঁদ। সাহিত্য, রাজনীতি, সমাজ, মানবতা নিয়ে দুজন বেশির ভাগ সময়েই দুই অবস্থানে, তা বলে সংলাপ থামেনি, সখ্যও না। ১৯৩৬-এর মাদ্রিদে পাবলো নেরুদা দাঁড়িয়ে আছেন ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার অপেক্ষায়, বক্সিং ম্যাচ দেখতে যাবেন দুজনে। লোরকাকে হত্যা করতে তখন বধ্যভূমিতে নিয়ে যাচ্ছে জেনারেল ফ্র্যাঙ্কোর সেনারা। সেই লোরকাকে নিয়ে কবিতা লিখছেন কলকাতার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বন্ধু-কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় যাঁকে আখ্যা দিচ্ছেন ‘দশকের আততায়ী কবি’! জাঁ পল সার্ত্রের নাটকের অভিনয় শেষ হতে যেচে এসে আলাপ করছেন আলব্যের কামু নামের এক তরুণ, ক’দিন পরেই প্যারিসের বিখ্যাত ‘কাফে দ্য ফ্লোর’-এ সঙ্গে চুটিয়ে লেখালিখি শুরু সার্ত্র, সিমোন দা বুভোয়া আর কামু, তিন জনের! গ্যোয়টে-র ‘দ্য সাফারিংস অব ইয়াং ওয়্যারথার’ পড়ে ‘সুখদুঃখের সঙ্গী’ সুব্রত, কবি সুব্রত চক্রবর্তীর উদ্দেশে গোটা একটা বই লিখে ফেলছেন ভাস্কর চক্রবর্তী, আর সেই বইয়ের প্রচ্ছদলিপি আদরে এঁকে-লিখে দিচ্ছেন কমলকুমার মজুমদার। ‘সঙ্গে থাকো। সঙ্গে থাকো। সারাক্ষণ/ সঙ্গে সঙ্গে থাকো।’

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন