বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর, ২০১৬

বাদলধারা অথবা জললীলা

বই নিয়ে আলাপ : রাখাল রাহার উপন্যাস অমাবতী

রেজা ঘটক


সা...

আমি ঠিক জানি না-- উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করতে কি কি লিখতে হয়? কী কী আলোচনা করতে হয়? কীভাবে কীভাবে করতে হয়? আমার স্বল্প পাঠ অভিজ্ঞতার বিপরীতে উপন্যাস বিষয়ে আলোচনা লেখাটা সত্যিই খুউব কঠিন কাজ। আমি যখন কোন উপন্যাস পড়ি, তখন কি কি বিষয় আমার মধ্যে ঘুরপাক খায়-- তার আলোকে উপন্যাস পাঠ শেষে আমার মধ্যে কী কী বিষয় নাড়া দেয়-- তাই এখানে একটু বলার চেষ্টা করবো। আর উপলক্ষ্য হিসেবে অবশ্যই পঠিত কোন উপন্যাস হওয়াটাই যুক্তিসঙ্গত।
তার আগে বলে রাখি-- আমি কিন্তু খুবই খুঁতখুঁতে টাইপের লোক। মন্দকে মন্দ এমনকি গালমন্দ পর্যন্ত করি। আর ভালোকে আলোর মতোই প্রকাশ করতে পছন্দ করি। আমি পড়াশোনা করেছি অর্থনীতি বিষয়ে কিন্তু সাহিত্যের প্রতি ছোটবেলা থেকেই এক ধরণের প্রীতি ছিল। হাতের কাছে যা পেতাম খুঁটে খুঁটে তাই পড়তাম। আমার আর একটা বদ অভ্যাস হলো-- সর্বশেষ পঠিত কোন সাহিত্য রচনার চরিত্রগুলোর সাথে আমার আশেপাশের বাস্তবের মানুষগুলোর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলীর মিল-অমিলে অনুসন্ধান চালানো। এটা ক্যানো করি? নিজেও জানি না। এবং কিছু দিন চলে গেলে উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে ভুলতে বসলে ধীরে ধীরে এই কর্মটিতে এক সময় আলসেমি আসে। আবার নতুন কোনো বই পড়লে এই ঘোড়ারোগটি আমাকে আবারো সংক্রামকের মতো পেয়ে বসে। আর একটা বিষয় হলো-- আমি যখন কোন উপন্যাস পড়ি মনের অজান্তেই ওই উপন্যাসের ঔপন্যাসিককে শত্র“ বানিয়ে ফেলি। তার সঙ্গে একটা মনযুদ্ধ ঘোষণা করেই আমি তাঁর বইটা পড়তে বসি। দ্যাখি, তুমি আমাকে কতোটা সময় আটকে রাখতে পারো? আমি আসলে তখন নিজের বিরুদ্ধেও একটা যুদ্ধ ঘোষণা করি। যেভাবে হোক পড়া শেষ করতে হবে এমন ইচ্ছাটা শুরুতে খুউব থাকে। কিন্তু লেখক যদি আমার সেই ইচ্ছাকে ধরে রাখতে ব্যর্থ হয় তাহলে পাঠক হিসাবে আমার তখন কিছুই করার থাকে না। অনেক সময় দুঃখবোধেরও জন্ম হয়। আমি আসলে একটা বেকুব। কোনো বই পড়তে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হবার জন্য আমি তাই পরবর্তীতে ওই লেখকদেরকে স্বাভাবিকভাবেই এড়িয়ে চলি।

১৯৮৫ সালের জুন-জুলাই মাসে, বর্ষা-মৌসুমে স্কুলে দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা চলছে। আমি তখন দশম শ্রেণীর ছাত্র। পরের দিন অংক পরীক্ষা। বিকালে এক বন্ধুর বাড়িতে আমরা চারজনে খুউব জমিয়ে কেরাম খেলছিলাম। আমার পার্টনার খুব জোড়ে হিট করায় একটা গুটি কোথায় যে উড়ে গেছে, সেটাকে খুঁজতে গিয়ে দেখি বিছানায় একটা বই-- ‘দ্য ওল্ড ম্যান ইন দ্য সি’ আর্নেস্ট হেমিংওয়ের নোবেল জয়ী উপন্যাস। তারপর গুটি না পাওয়ায় খেলা আর হয়নি। গুটি না পেয়ে বইটা উল্টিয়ে দেখলাম। বন্ধুকে বললাম-- এটা আমি নিয়ে যাচ্ছি। বন্ধু বলল-- একদিনের জন্য হলে নিতে পারিস। অংকে একটু ভালো ছিলাম তাই একপৃষ্ঠা পড়েই বন্ধুকে জবাব দিলাম-- একদিনও লাগবে না, কালই পেয়ে যাবি। আরো জানতে চাইলাম-- এই বই তুই কোথায় পাইলি? জবাবে বন্ধু তুহিন বলেছিল-- তোরে যে আমি বইটা দিলাম, কেউ জানার আগেই তুই ফেরৎ দিবি। নইলে আপা আমারে খুন কইরা ফ্যালাবে। আপা যে সাহিত্যের ছাত্রী সেদিন প্রথম বুঝলাম। কারণ ভয়ে কোনদিন জিজ্ঞাসা করা হয়নি। এমনিতে দেখতাম-- আমরা হৈহুল্লোর করে খেলছি। আর কাছাকাছি কোথাও আপা কোনো একটা বই নিয়ে খুবই মশগুল। আমরা তখন এর অর্থ বুঝতাম না। কারণ আমরা গল্পের বই পড়তাম অনেকটা লুকিয়ে লুকিয়ে। ক্লাসের পড়া রেখে গল্পের বই পড়ছি আর বাড়ির কেউ তা দেখেছে তো খবর খারাপ। পরের দিন অংক পরীক্ষার হলে হাজির হতে দেড় ঘন্টা লেইট। পরীক্ষা ভুলে আমি তখন সান্টিয়াগোর সাথে বর্হিসমুদ্রে মাছ ধরছিলাম। ভাগ্যিস বৃষ্টি বাদলা ছিল। আবার বর্ষাকালে ইস্কুলে যাবার পথটাও আমার পৃথিবী ভ্রমণের মতো দীর্ঘ। আমার ইস্কুল আমাদের বাড়ি থেকে মাইলখানেক পূর্বদিকে। কিন্তু বর্ষাকলে আমাকে পশ্চিম দিকে হাঁটা দিয়ে বড় রাস্তা ধরে পশ্চিম-দক্ষিণ পূর্ব পথে অথবা পশ্চিম-উত্তর-পূর্ব রাউন্ড পথে যেতে হতো। আর হালদার বাড়ির জোড়া কালভার্ট পর্যন্ত পুরো সময়টা মাঠের মধ্যের আমাদের বাড়িটা তখন চোখে পড়তো। সেদিন অবশ্য হাটু জল মাড়িয়ে সোজা পূর্বের রাস্তায় ইস্কুলে গিয়েছিলাম। আর দেড় ঘন্টা লেইটের বিপরীতে হেডস্যার অবশ্য লাইব্রেরি কক্ষে বাড়তি আধাঘন্টা দিয়েছিলেন। হয়তো আমি ফার্সবয় ছিলাম বলে! কিন্তু কেউ জানলো না যে, আমার পরীক্ষার হলে দেরিতে পৌঁছানোর সেদিনের একমাত্র কারণ ছিল আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। পরীক্ষা না ছাই, সান্টিয়াগোর মাছ ধরার কৌশল তার চেয়ে অনেক বেশি মজার। দীর্ঘ বাঁইশ বছর পরেও সান্টিয়াগোর কথা দিব্যি আমার মনে আছে। এটায় কিন্তু আমার কোনোই পাণ্ডিত্য নেই। সবটাই লেখকের যাদু। তার মানে লেখককে আশ্চার্য এক যাদু জানতে হবে। যাদু ভালো না লাগলে পাঠকের কিছুই করার থাকে না।


রে...

বন্ধু সুমন শামস আর আমি দৈনিক সমকালে ঢু মারতেই আরেক বন্ধু সৈকত হাবিবের সঙ্গে দ্যাখা। অনেক কথার ফাঁকে সৈকত জানতে চাইলো-- রাখাল রাহা’র ‘অমাবতী’ উপন্যাসটা পড়েছি কিনা? কইলাম-- না। ক্যানো অমাবতীতে কি খই-ছাতু-গুড়-টুর খাওয়ায় নাকি? বইটা পড়ে একটা লেখা দেবার অনুরোধ করলো সৈকত। আমি পড়ে গেলাম মহাবিপদে। বইটা আগে পাঠসূত্রে গিয়ে রাজীব নূরের থেকে সংগ্রহ করতে হবে। তারপর পড়তে হবে। তারপর ওটার ওপর লিখতে হবে। কী ঝামেলারে বাপু! তাছাড়া কয়েকদিন আগে রাজীব নূরের থেকে একটা গল্পের বই নিয়েছি। শর্তছিলো বইটার দাম ৩০% কমিশনে ৬৫ টাকা অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। আগের পাওনা-ই পরিশোধ হয়নি এখন কী করে আবার আরেকটা বই চাই? সৈকত বলল-- আমি রাজীবকে বলে দিচ্ছি, তুমি শুধু সংগ্রহ করো। তারপর দেশে জরুরি অবস্থা জারী হলো। অনেক ত্রানের টিন উদ্ধার হলো। অনেক দুর্নীতিবাজ গ্রেফতার হলো। তারা আবার রাজবন্দীর মর্যাদায় দিন কাটাতে লাগলেন। কিন্তু আমার আর বইটি সংগ্রহ করা হয় না। ধানমণ্ডি নদীর তীরে আমরা রোজ আড্ডা দেই। সন্ধ্যার সেই আড্ডায় বন্ধু সত্যজিৎ পোদ্দার বিপু বললো-- রাখাল রাহা’র অমাবতী পোড়েছেন? জবাবে বলালাম-- না পড়িনি; ক্যানো? জবাবে বিপু কইলো-- পইরেন, ভালো লাগবে। পাশ থেকে আরেক বন্ধু নাহিদ বললো-- আমি পড়তাছি, ভালো লাগতাছে। শুনে আরেক বন্ধু কবি ফিরোজ এহতেশাম কইলো-- তাইলে পড়েন। ভালো লাগলে কইয়েন, আমিও পড়বো। এবার আমি কিছুটা আগ্রহী হয়ে উঠলাম এবং সেই রাতেই রাজীব নূরের থেকে রাখাল রাহা’র ‘অমাবতী’ সংগ্রহ করি।


গা...


এমনিতে প্রতিবছর অমাবতীর সময় আমাদের এলাকায় একটা উৎসব হয়। বিয়াতো-অব্বিয়াতো খেলা। বৃষ্টি বাদলায় কারো কোনো কাজ কাম থাকে না। কয়েকটা দিন সবাই উৎসব আনন্দ করে কাটায়। তাই ইচ্ছে করেই বিয়াতো-অব্বিয়াতো খেলা তিন-চারদিন ধরে ড্র রাখার নিয়ম। যখন সবাই আবার যার যার কাজে চলে যাবার খবর দেয়, তখন একদিন নিষ্পত্তি হয় সেই খেলা। আর সেদিন সবাই মিলে বিধান দা’র বাড়িতে খাসী, মোরগ, মাছ, সব্জি সব জড়ো করে আড়ম্বর করে খাওয়া হয়। খেতে খেতে আবার আগামী বছর কিসের বাজীতে খেলা হবে তা নিয়ে সবাই আলোচনা করেন। বিয়াতো-অব্বিয়াতো খেলার পরিচালক আমাদের সবার প্রিয় রেফারি মনোজ কাকার কাছে বছরের বাকী সময়টা আমরা শুনি-- মজার মজার সব ঘটনা। বিতর্কিত কোন কোন গোলে কার কী পরামর্শ ছিলো, কে কে তাকে কী কী বলেছিল, ক্যানো বলেছিল, এসব। পরের বছর আবারো অমাবতী লাগত। বিতর্কিত গোলে ভূমিকা রাখা পরিচিত সেই মুখগুলোকে আমরা আবার বেমালুম ভুলে যেতাম। আর আবারো জমে ওঠতো বিয়াতো-অব্বিয়াতো খেলা। ছেলেবেলায় দেখা এবং নিজে যখন খেলোয়ার প্রায় প্রত্যেকটি বিয়াতো-অব্বিয়াতো খেলার ফাইনালে আমরা অব্বিয়াতোরাই শেষ পর্যন্ত জিততাম। একবার কি দু’বার মাত্র বিয়াত্বোরা জিতেছিল। আমরা যারা ভালো খেলতাম, তারা হয়তো সেদিন বাইরে কোথাও হায়ারে খেলতে গ্যাছি, সেদিন ওরা বিয়াতোরা ষড়যন্ত্র করে, ফাইনাল খেলে ফেলতো আমাদের অবশিষ্ট অব্বিয়াতো দুর্বল টিমের বিরুদ্ধে। ফলে পরের বছর পর্যন্ত আমাদের সেই জ্বালা এবং খোটা সহ্য করতে হতো। আর যারা বিয়াতোদের এই খোঁচা সহ্য করতে পারতো না, তারা উভয়পক্ষকে সাথে নিয়ে বিয়ার কাজটা সেরে, পরের বছর আবার আমাদের বিরুদ্ধেই খেলতে নামতো, ভারি দেমাগের সাথে।

অমাবতী নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরণের মিথ রয়েছে। বিভিন্ন ধরণের চর্চা এবং আনুষ্ঠানিকতাও রয়েছে। তবে মুসলমানরা দু’একজন তা শখে পালন করে। আর হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় সবাই সেটা আনন্দেরই সাথে রীতি হিসাবেই পালন করে। অমাবতীর উৎসব আমার ছেলেবেলা থেকেই ভালো লাগতো। আর ভালো ফুটবলার হিসাবে এলাকায় সুনাম থাকায় অব্বিয়াতো দলের অপরিহার্য খেলোয়ার ছিলাম আমি। ফলে অমাবতীর সমস্ত আনন্দ উৎসবে সরাসরি অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা এখনো নাগরিক বর্ষাকালে আমাকে খুব নস্টালজিয়ায় ভোগায়। অতএব, রাখাল রাহা’র ‘অমাবতী’ উপভোগ্য হতে পারে, এমন ভাবনার দোলে দোল খেতে খেতে বইটা পড়া শুরু করলাম। রাখাল রাহা’র সঙ্গে আমার তখনো পরিচয় নেই। কোনো গ্রামোফোন রেকর্ড বা ভাঙা সিডির মতো মোটা কোন বস্তু নিশ্চয়ই তিনি নন। তিনি একজন মানুষ, যার টুটুল নামে একটা ভাই হারিয়ে গেছে। রাখালও আমার মতো অর্থনীতির ছাত্র। কিন্তু অমাবতী লেখার কারণে এভাবে পরিচয় হচ্ছে। ‘কিডা যাচ্ছিস কলপাড়ে? এক বদনা পানি আনে দে তো। অজু করে নামাজ পড়ি’। দুন্দির দাদীর মতো আমি কিন্তু নামাজ পড়িনা। তাই রাখালকে তুলোধুনো করতে চাইলে আমার অজু বানানোরও দরকার নেই। মনে হচ্ছে, অজু ছাড়াই পারবানে। তার আগে গাড়াগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে সর্বরোগের মহৌষধ বিক্রেতা ফকের আলী টিঙটিঙে হ্যালফ্যালে এক লোককে সবার সামনে হাজির করে কি বলে শুনি --‘দ্যাকো রে ভাই দ্যাকো, এর কি হাল দ্যাকো! এর বউ নাঙ না করে কি করবি, কও’? গোল জটলার মধ্যে জাফরও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফকের আলীর সেই তামাশা উপভোগ করছিল। ফকের আলী গলার গামছাটা দিয়ে জাফরকে টানতে টানতে একেবারে আসরের মাঝখানে এনে ফেলে-- ‘এই দ্যাকেন, ভাইসব! এর নাম হলো শরীল। গাছে মারলি ফিরে আসপি! এ লোকের বউ জীবনে ডানি-বাঁয়ে ঘাস খাবিনে। ঠিক যাগা মতো অট্ করে দাঁড়ায়ে থাকপি। নাকি বেঠিক কলাম ভাই’? অমাবতী নিয়ে লিখতে গিয়ে আমাকেও ফকের আলী না হয়ে উপোয় নেই, ভাই রাখাল!


মা...

কোন একটি উপন্যাসকে যদি সমালোচনার কাঠ গড়ায় বিবেচনা করতে হয়, তাহলে পাঠককে অবশ্যই বই নিয়ে বসতে হয় এবং লেখকের সঙ্গে এক ধরণের যুদ্ধে অবতীর্ন হতে হয়। একটি উপন্যাসকে যেভাবে যেভাবে দেখা সম্ভব, তার বিভিন্ন উপায় এবং একজন ঔপন্যাসিক তাঁর কাজকে যেভাবে যেভাবে দেখতে পারেন, তারও বিভিন্ন উপায়কে বিবেচনায় রাখা উচিত। সেজন্য উপন্যাস আলোচনার জন্য উপন্যাসের বিভিন্ন বিষয় আশয়কে যেমন, উপন্যাসের কাহিনী কী? উপন্যাসের পাত্রপাত্রী বা মানুষজন কারা? উপন্যাসের মূল কথাবস্তু কী কী? উপন্যাসে কোনো অলীক কাহিনীর প্রচ্ছয় আছে কীনা? উপন্যাসে কোনো দিব্যিবাণী বা কোনো সুনির্দিষ্ট বিষয়ের প্রতি ভবিষ্যৎবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে কীনা? উপন্যাসের আঙ্গিক প্যাটার্ন বা নকশারূপ কেমন? উপন্যাসে বিথোফোনের (ইববঃযড়াবহ)-এর পঞ্চম সিম্ফনির ‘ডিড্ডিডি ডুম’ --এর মতো কোনো ছন্দরূপ আছে কীনা? কিংবা ৫০ হাজার শব্দের অধিক কোনো গদ্য কাহিনীকে উপন্যাস বলবো কিনা? অথবা উপন্যাসের মানবিক মূল্যবোধ এবং সৃজনশীল দ্বন্ধগুলোকে কীভাবে বিবেচনা করা হবে? --এমন হাজারো অমিমাংসীত বিষয়ে একজন সমালোচকের উৎকণ্ঠা থাকাটা কী প্রয়োজনীয় নয়? এতোসব বিষয় বিবেচনায় নিতে পারলে হয়তো সুনির্দিষ্ট উপন্যাসটি সম্পর্কে একটা অনুমান নির্ভর সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব। কিন্তু উপন্যাসের চারিত্রগুলোকে নিয়ে উপহাস করা কিংম্বা ধূমপান করা অথবা রসিকতার নামে নির্যাতন করা সম্ভবত প্রত্যাখান করা উচিত। সেক্ষেত্রে অনেকে হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, তাহলে উপন্যাসের উপর আক্রমণ চালানো হবে কীভাবে? সেক্ষেত্রে আমরা সবাই কিন্তু শাহেরজাদীর স্বামীর মতোই নিষ্ঠুর। এরপর কী ঘটবে? সে সম্পর্কে বাদশাহ’র [পাঠকের] মনে অসীম উৎকণ্ঠা জাগাতে না পারলে, শাহেরজাদীর নিশ্চিত মৃত্যু। সেখানে শাহেরজাদী যেভাবে ঘটনার অতি সুক্ষ্ম বর্ণনা দেন, যেমন তীক্ষ্ম তাঁর বিচারবুদ্ধি, ঘটনার পর ঘটনা তৈরিতে তাঁর যে অসীম উদ্ভাবনী ক্ষমতা, যেমন তাঁর অনন্য নীতিবোধ, চরিত্র নির্মাণে তাঁর কুলশতা, প্রাচ্যের তিনটি রাজধানী সম্পর্কে যে গভীর জ্ঞান প্রদর্শনের মাধ্যমে তিনি যে কাহিনী বর্ণনা করতেন, তেমনি লেখককে অবশ্যই শাহেরজাদীর মতো কুশলী এবং দক্ষ হতে হবে। নইলে সূর্য ওঠা পর্যন্ত বাদশাহ অপেক্ষা করতে পারেন কিন্তু পাঠক হয়তো অপেক্ষা না করে, বইটি রেখে ঘুমিয়ে যাবে অন্য কোন স্বপ্নভ্রম রচনা করতে। অর্থাৎ পাঠককে একই সঙ্গে উৎকণ্ঠার মধ্যে যেমন রাখতে হবে, তেমনি পাঠকের কৌতূহল ব্যবহার করার আদিম সেই ক্ষমতা লেখকের মধ্যে থাকতে হবে। সেদিক দিয়ে কাহিনী বর্ণনায় রাখাল ততোটা পটু না হলেও এক ধরনের আরোপিত কৌতুহলে তিনি পাঠককে হয়তো তীর মারেন।

মানুষের জীবনের অসংখ্য বিষয় থেকে যদি আমরা মাত্র পাঁচটি বিষয়কে বিবেচনা করি-- জন্ম, খাদ্য, নিদ্রা, ভালোবাসা আর মৃত্যু এবং এই পাঁচটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে নিজেদেরকে একবার প্রশ্ন করি যে-- এসব বিষয়ে আমাদের জীবনে কি কি ভূমিকা রয়েছে? এবং পাশাপাশি উপন্যাসে এই বিষয়গুলোর ভূমিকা ক্যামন? তাহলে হয়তো উপন্যাসের চরিত্রগুলোর মধ্যে আমরা আসলে কীসের অনুসন্ধান চালাই, তা অনেকটা সুস্পষ্ট হয়ে যায়। কোনো উপন্যাসের কোনো চরিত্র দুষ্ট প্রকৃতির হওয়ার পরেও যদি পাঠকের কাছে তা আনন্দদায়ক হয়, তাহলে তাকে আমরা কীভাবে বিচার করি-- তাও আমাদের মনে রাখা দরকার। কাকে আমরা উপন্যাসের শক্তি বলবো? হয়তো একগুচ্ছ মানুষ এবং একগুচ্ছ নানারকম জিনিস বা উপাদান, যেগুলো কিন্তু মানুষ নয়, মানুষের প্রয়োজন মেটায় এমন একগুচ্ছ জিনিস-- এই দুই গুচ্ছকে ঔপন্যাসিক হয়তো উপন্যাসের শক্তি হিসাবে ব্যবহার করেন। কিন্তু একজন ভালো ঔপন্যাসিক শব্দের পর শব্দ বসিয়ে এমন একটা খেলা খেলেন যে, এই শক্তিগুচ্ছ শব্দের মায়াজালে ফিতাকৃমির মতো জড়াতে থাকে। আর তখন কে কতো ভেলকি দ্যাখাতে পারলো, কোথায় কোথায় উৎকণ্ঠা? কোথায় কোথায় কীভাবে গল্পটি বুনট সৃষ্টি করলো, কতোটা শৈল্পিকভাবে তা করলো, কতোটা মুগ্ধতার সাথে তা পাঠক গিলবে? কী কী ঢং থাকবে তাতে ইত্যাদি বিষয়গুলো হয়তো ঔপন্যাসিকদের মাথায় রাখতে হয়। এতোকিছুর পরেও যদি আসল কাজটা না হয়, তখন পাঠক হয়তো প্রত্যাখ্যান করবে সেই লেখা। একজন ভালো ঔপন্যাসিক গুচ্ছ গুচ্ছ বিষয় এবং ঘটনাকে চরিত্রগুলোর দাবী অনুযায়ী সুন্নিবদ্ধ করেন। রাখাল যে কাজটি করেছেন-- তাতে অনেক কিছুই আছে আবার কী যেন নেই। সেই কী টা যে আসলে কি, তা হয়তো আমিও জানি না। হয়তো সেই ‘কী’ এর সন্ধানেই আমি পুরো ‘অমাবতী’ পড়েছি। কিন্তু সেই ‘কী’র সন্ধান না পেয়ে বড়োই হতাশ হয়েছি। রাখাল হয়তো জানেন কোন ‘কী’ আমি ‘অমাবতী’তে খুঁজেছি এবং ক্যানো আমি কিছু লিখতে বসলে আগে কাগজ কলম নেই, তারপর হয়তো একটা সিগারেট ধরাই, তারপর দেখা গেল কলমটা কোন ঝামেলা করছে, বা যা লিখতে চাইছি, সে বিষয়ে তখন আর ইচ্ছার তীব্রতাটা আগের মতো নেই, বা যদি থাকে ফটাফট কিছুক্ষণ হয়তো লিখলাম-- এবার হয়তো কি হচ্ছে একটু চেঁকে দ্যাখার জন্য যেই পড়তে শুরু করলাম-- ওমা, এ কার লেখা? তখন মনে হয়, এ লেখা কখনোই আমার হতে পারে না। কলমটি নিশ্চয়ই অন্য কোনো অপরিচিত লোকের হাতে ছিল। হতেই পারে না এমন করে লিখবো আমি। তখন অনেক লেখাই বাতিল হয়ে যায়। আগে আমি খুউব লিখতাম। যা মনে আসতো, যেভাবে আসতো, সেভাবে তা লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করতাম। দেখা গেল একই দিনে হয়তো তিনটা গল্প লিখে ফেল্লাম। বন্ধু রাজীব নূর আমাকে থামালো। বললো ধীরে রেজা, আরো ধীরে লেখো। একমাসে একটা গল্প লেখো। তিনমাসে একটা লিখলে আরো ভালো। রাজীব নূরের পরামর্শটি আমাকে ভিতরে ভিতরে মারাত্মক ফল দিচ্ছে। এখন আমার মাথায় গল্প আসলে, গল্পের চরিত্রগুলোকে নিয়ে অনেক সময় নিয়েই আমি খেলা করি। তবে এর একটা খারাপ দিকও আছে। হয়তো খেলতে খেলতে এক সময় গল্পটা কিছুই না বলে কোথায় যেন চলে যায়। কোথায় চলে যায় গল্পটা? কেনই বা চলে যায়? তখন হাজারো চেষ্টা করেও তাকে আর ফেরানো যায় না। আমি পারিনা। যারা এই কাজটা পারেন, তারা মহান। সত্যি কথা বলতে কি, ‘অমাবতী’কে আমি উপন্যাস হিসাবে স্বীকার করতে চাই না। যদি স্বীকার করি, সাহিত্যের বড়ো বড়ো পণ্ডিতদের কোপানলে তখন না জানি একদিন আমাকেও তাঁরা পুণ্ডুপাত করতে যাবেন। ভাই রাখাল, সেই রিক্স আমি নিতে পারবো না। উপন্যাসকে আমি যেভাবে বুঝি, তার সঙ্গে পৃথিবীর দ্বিতীয় কোনো মানুষের বোঝার অমিল থাকতে পারে। তাতে আমার কিছু যায় আসে না। কিন্তু উপন্যাস বলতে আমি যাকে বুঝি, তা ‘অমাবতী’ পুরোপুরি রক্ষা করেনি। একে কি বড়ো গল্প বলবো? তখন আবার গল্পের প্রয়োজনীয় রসদ, মাল মশলার সাথে ‘অমাবতী’ কি কি মিটমাট করতে সমর্থ-- তা বিচার বিশ্লেষণ করতে হবে। তবে অমাবতী অবশ্যই পাঁচালী এবং সেটা গদ্যে লেখা। উপন্যাসের মধ্যে একটা না শোনা গানের সুমিষ্ট সুর থাকবে। ফিরে ফিরে বাঁকে বাঁকে পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় সেই না শোনা গানটির সুমধুর সুরটি কেবল খুঁজি আমি। সেই সুরের চলার পথ উপন্যাসে যাঁরা সৃষ্টি করতে পারেন, হয়তো তাদের লেখাটি পাঠকের কাছে ততো বেশি আকর্ষনীয় হয়ে ওঠে।

আজকাল আমাদের মধ্যে একটা প্রবণতা মারাত্মক সংক্রামকের মতো ছড়াচ্ছে। কয়েক পৃষ্ঠা লিখে, কয়েকটা এনজিও বা সাহিত্য পাতার সম্পাদকদের মনোতুষ্টি করে, জুতসই একজন প্রকাশক ম্যানেজ করে, একুশের বইমেলা উপলক্ষে একটা বই বের করা। আর হাটে ঘাটে, বাজারে, কাগজে, আড্ডায় সবখানে কিছু পছন্দের দালাল লেলিয়ে দেয়া। এঁরা শর্তহীনভাবে সেই লেখকের পক্ষে ঢোল পেটাতে থাকেন। মুড়ির টিনের ঢোল। বেসুরা ঢোল যাকে বলে। তাদের বক্তব্য অমুকের ওই বইটা যা হয়েছে না। এক ধরনের মিডিয়াবাজি আর কি। অর্থাৎ ঠাপ দিয়ে হলেও পাঠক ঠকাও। যতোখুশি ঠাপাও। যতোখুশি ঠকাও। সাহিত্যের মধ্যেও আমলাগিরি আছে। একশ্রেণীর নয়া ঠাপনেওয়ালীরা সেই আমলাগিরি চালু করেছেন। তাঁরা দালালদের মাধ্যমে পাঠক ঠাপিয়ে বেড়ান। আপনি যদি সত্যিকারের পাঠক হয়ে থাকেন, উল্টো তাঁদের ঠাপিয়ে দেন। আর আমার কাছে এসে বলুন-- নগদ পুরষ্কার দেবো। নতুবা নতুন ঠাপ শিখিয়ে দেবো। রাখাল রাহা’র সঙ্গে আমি আড্ডা দিতে চাই। ‘অমাবতী’ লেখার আগে রাখাল কী কী ভাবতো? কীভাবে কীভাবে ভাবতো? সেই ভাবনাগুলো নিজের ইচ্ছার সাথে মিলিয়ে ‘অমাবতী’তে সেভাবে উঠে এসেছে কীনা-- তা আমার জানতে ইচ্ছা করবে। ‘অমাবতী’ লেখার সময় কলমটি কি রাখাল রাহা’র হাতে ছিল? নাকি অপরিচিত অন্য কারো হাতে ছিল? রাখালের নিজের কী মনে হয়? এসব বিষয়ে আমার জানতে ইচ্ছে করবে। আবার হয়তো আমার কিছুই জানার আগ্রহ নাও জাগতে পারে।

‘অমাবতী’ বের হয়েছে পাঠসূত্র থেকে। পাঠসূত্রের এবারের বইগুলো চমৎকার। গেটআপ, মেকআপ, বাইন্ডিং, প্রচ্ছদ, বইয়ের সাইজ, কাগজের রং, পৃষ্ঠা নিদর্শনী চিহ্ন, বইয়ের পেছনের পাতায় মজার মজার সব বিজ্ঞাপন!-- সবকিছু মিলিয়ে সুন্দর গোছানো প্রডাকশন। ‘অমাবতী’র প্রচ্ছদ করেছেন সব্যসাচী মিস্ত্রী। প্রচ্ছদের ডানাওয়ালা মায়াবী পরীটা কোথায় উড়ে যাচ্ছে? সে কী কেঁচো রাজার সাত রানীর কোনো রানী? নাকি সেই অদৃশ্য সুর করনেওয়ালী, যে কিনা উপন্যাসের মধ্যে উৎকণ্ঠার চোরাগলি ধরে কেবলই হারিয়ে যাওয়া পথে চলতে থাকে? কে সে? আমি জানি না। ‘অমাবতী’তে পৃষ্ঠা সংখ্যা ৯৬। ইনার এবং কভার বাদ দিলে মূল লেখা ৮৭ পৃষ্ঠায়। গড়ে পূর্ণপৃষ্ঠায় ৩২ থেকে ৩৩ লাইন। আর প্রত্যেক লাইনে গড়ে ৮ থেকে ১২ শব্দের কাঠামো। গোটা ‘অমাবতী’তে মোট ১৩টি পর্ব বা অধ্যায়। ‘অমাবতী’র ইংরেজি করা হয়েছে ÔThe Goddess of MonsoonÕ- যার অর্থ দাঁড়ায় ‘বৃষ্টির দেবী’। প্রচ্ছদে হয়তো সেই দেবীকে তুলে ধরা হয়েছে কিনা আমি জানি না। ‘অমাবতী’র মূল্য ধরা হয়েছে একশ টাকা আর প্রকাশকাল ফাল্গুন ১৪১৩, ফেব্রুয়ারি ২০০৭। নির্বাহী প্রকাশক রাজীব নূর, পাঠসূত্র। আর ‘অমাবতী’কে যদি উপন্যাসিকা বা ক্ষুদ্র উপন্যাস বলতে চাই তাহলে ÔThe Goddess of Monsoon may be a novelette which provide the story of marginal people in the western region of Bangladesh especially in local language by Rakhal Raha that published by Pathsutro, Dhaka on February 2007. ISBN : 984-300-000137-B.


পা...
অর্থনৈতিক কর্মদিবসকে আমরা যদি দুই ভাগে ভাগ করি, যেমন- কার্যকর কর্মদিবস আর অকার্যকর কর্মদিবস। তাহলে কার্যকর কর্মদিবসের বিপরীতে অবশ্যই মজুরি প্রাপ্তির বিষয় থাকবে। আর অকার্যকর কর্মদিবসে মজুরি নেই বা মজুরি অপ্রাপ্তির ব্যাপার থাকবে। কৃষকদের মধ্যে যাঁরা শ্রম বিক্রি করেন (কৃষিজীবী শ্রমিক), তাঁদের অধিকাংশরা বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের ছদ্ম বেকারত্ব বা মৌসুমী বেকারত্বের শিকার হন। এঁদের মধ্যে অনেকে তখন পেশা বদল করেন। কেউ বা দূরের অন্য কোনো অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমের চাষীদের সন্ধানে বের হন বেকারত্ব ঘোচাতে। কারণ এই মানুষগুলো বোকা। এই মানুষগুলো সহজ সরল। এই মানুষগুলো অশিক্ষিত। এই মানুষগুলো অনেকটাই মৌলিক। এই মানুষগুলো কোনো ধরনের জটিলতা বোঝেন না। এই মানুষগুলো প্রকৃতির মতোই স্বচ্ছ। পুঁজিবাদ সমর্থনপুষ্ঠ পুঁজিবাদের দালালদের পরিকল্পিত শ্রেণী বৈষম্য বিদ্যমান রাখার কৌশলগুলো, ওইসব সহজ, সরল, বোকা, অশিক্ষিত, স্বচ্ছ এবং মৌলিক মানুষগুলো কখনোই বুঝে উঠতে পারেন না। তাই এই মানুষগুলো পৃথিবীর সকল দেশেই এভাবে একই পদ্ধতির ভেতর একই ধরনের বা ভিন্নভিন ধরনের গ্যারাকলে আবদ্ধ থাকছে। আবার এই মানুষগুলো আশ্চার্যজনকভাবে বঞ্চিত থেকেও যেনোবা খুউব খুশি। এতেই যেনো তাঁদের অনেক শান্তি। আবার এই মানুষগুলো বর্তমান কালের চেয়ে পরকালের ওপর মানসিকভাবে যেনোবা বেশি নির্ভরশীল। এই মানুষগুলো ভীতু এবং খোদা, ভগবান, গড বা ঈশ্বরে খুবই বিশ্বাসী। অর্থাৎ এই মানুষগুলো বাস্তবের চেয়ে ধর্ম সমর্থিত পরকালের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির প্রতি বেশি আস্থাশীল।

অতএব, এই মানুষগুলোকে ঠকানো তো খুবই সোজা। সেই সোজা কাজটি পুঁজিবাদের পক্ষের লোকগুলো কম শ্রম ব্যয় করে, মেধা আর পুঁজির কৌশলে যুগ যুগ ধরে করে আসছেন। তাঁদের কৌশলটিও খুব সোজা। শুধুমাত্র পরিশ্রম আর শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে হঠাৎ দু’চারজন শ্রমজীবী হয়তো কখনো পুঁজির দেখা পান। কিন্তু ধনবানদের যে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক, তার সাথে সুসম্পর্ক এবং গোপন সম্পর্ক স্থাপন করতে না পারলে, তাঁরাও শেষ পর্যন্ত সর্বস্ব হারিয়ে ছিটকে পড়তে বাধ্য হন। আর এই রেসে যেঁ বা যাঁরা টিকে থাকেন, ওই গোষ্ঠী এবং তাঁদের স্ট্রং নেটওয়ার্ক তখন তাঁকে বা তাঁদেরকেও দলের বা একই ফোরামের সদস্য হিসাবে মেনে নেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুঁজিবান লোকের সংখ্যা শ্রমবান মানুষগুলোর চেয়ে কমই থাকে। তবুও এই ব্যবস্থা শুধুমাত্র বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের অন্যান্য গরীব বা অনুন্নত রাষ্ট্রগুলোতেও এখনো বিদ্যমান। তাই পৃথিবীব্যাপী এখন একটাই যুদ্ধ-- সম্পদ বন্টনের যুদ্ধ। এখানে পক্ষমাত্র দুটো-- পুঁজি আছে বা পুঁজিপুষ্ট পুঁজিপতি পক্ষ। আর সম্পদ নেই বা পুঁজি বঞ্চিত শ্রমবান বিপক্ষ। এই পক্ষ ও বিপক্ষ দলদুটো পৃথিবীর সকল দেশে সকল সমাজে, গোত্রে বর্ণে, গোষ্ঠীতে এখনো বিদ্যমান। তেমনি এক পুঁজিবঞ্চিত দুর্বল পক্ষের চরিত্র ‘জাফর’ ‘অমাবতী’র কার্যত প্রধান চরিত্র। যদিও তা কেবল ‘অমাবতী’র আঙ্গিক পুষ্টতা, কলেবর বৃদ্ধি আর ছোট ছোট নানা ঘটনায় একটু যা ধরা পড়ে।

‘অমাবতী’ রাখাল রাহা’র প্রথম প্রচেস্টা। রাখাল রাহা’র গল্পটি যদিওবা ঝিনাইদহ এলাকার গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক শ্রেণীর দৈনন্দিন জীবন গাঁথাকে কেন্দ্র করে মাত্র একদিনের গল্প। গল্পটি হয়তো বুধবার সকালে শুরু হয় আর শেষ হয় বৃহস্পতিবার বিকালে। যখন দুন্দি বিষ খায় আর সেই ভীড়ের মধ্যে জাফরের অনিশ্চিত চলে যাওয়ার মধ্যেই শেষ হয়। কিন্তু বাস্তবে এই গল্পটি, এই গল্পের চরিত্রগুলো-- পৃথিবীর অনেক দেশে এখনো এভাবেই আছে। রাখাল গল্প হিসাবে ‘অমাবতী’র জন্য যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বেছে নেন, তা আঞ্চলিকতা ছাড়িয়ে সারাবিশ্বের বঞ্চিত শ্রেণী গোষ্ঠীর বিদ্যমান বেদনাগুলোকে যেনো স্মরণ করিয়ে দেয়। এই মানুষগুলো কেমন অল্প পেয়েও কতো সুখী। রাখাল সেই সব সুখী মানুষদের বঞ্চনা এবং জীবনযাত্রার যে সরলতা, খাঁটিত্ব, একেবারে শিকরের মানুষগুলোর ভাষা ব্যবহারের যে প্রাকৃতিক ধরন ও বৈশিষ্ট্যাবলী, অসংখ্য বৈচিত্রময় চরিত্রের সমাহারে ‘অমাবতী’তে তুলে ধরেন, তা এক কথায় চমৎকার।


ধা...

আষাঢ় মাসের প্রথম সপ্তাহে কৃষকরা যে আহ্নিক শাস্ত্র পালন করেন, যাকে আমরা অমাবতী বলি, তা আসলে প্রকৃতির বর্ষা মৌসুমের অনেকদিনের একটা রেকর্ডেড ফলাফল। ‘অমাবতী’তে দুন্দি, দুধবুড়ি, গুড়মুড়ি ও ফুটফুটির দাদী তথা ইকারুলের নানীর জবানীতে আমরা প্রথম ‘অমাবতী’ পাই। আষাঢ় মাসের প্রথম সপ্তাহে কেঁচো রাজার সাত রানী তাঁদের বাপের বাড়ি থেকে স্বামী কেঁচো রাজার কাছে কীভাবে ফিরে আসেন, তা আমরা বুড়িমার কাছে শুনতে পাই। স্বামীর বাড়িতে ফেরার সময় সাত রানী যেভাবে কান্নাকাটি করেন-- তাই আষাঢ়ের ঢল বা বাদল হয়ে টানা সাতদিন ধরে ঝরতে থাকে-- যাকে আমাদের গ্রামীণ চাষীরা অমাবতীর মিথ হিসাবে মানেন। তাইতো অমাবতীর সাতদিনে গৃহস্থ ঘরের কোনো কর্তা বা কর্ত্রী ঝারের বাঁশ কাটে না, গাঙের মাছ মারে না, গরু-ছাগল বিক্রি করে না, হাঁস-মুরগি জবাই করে না, মাঁচার থেকে ধান চাল পাড়ে না, ঘরের ঝুল ঝাড়ে না, কাউকে কিছু ধার দেয় না, কোনো লেনদেন করে না-- সবাই এক ধরনের সাধনা করে কিছু নিয়ম বা রীতি মেনে চলেন-- যা অমাবতী নামে পরিচিত। অমাবতীর সময় এমনিতে অনেকেই কাজকর্ম করেন না। বেকার অলস সময় কাটান। কেউ বা বউয়ের সাথে দিনে রাতে সোহাগ করে কাটান। আবার যাঁরা একেবারে প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষ, যাঁরা ‘অমাবতী’র জাফরের মতো গরীব, তাঁদের তো পেটের ক্ষুধা অমাবতীর কারণে বন্ধ হয়না। ক্ষুধা লাগার সময় হলেই ক্ষুধা লাগে। ক্ষুধাতো কোন শাস্ত্র মানে না। তাই জাফরকেও অমাবতীর মধ্যে কাজের সন্ধানে বের হতে হয়। গাড়াগঞ্জের হাটে জাফর এমনি একজন মহাজনকে [দুন্দির বাবা] ভাগ্যক্রমে পেয়েও যায়। যে মহাজনের কোন ছেলেপুলে নেই। চারটা ঢাংগর মেয়ে। বড়োটা দুন্দি আবার ফুফাতো ভাই ইকারুলের প্রেমে হাবুডুবু খায়। তারা মাঝরাতে ঢেঁকি ঘরে প্রেমের উৎসব করে বাদল নামায়। গোটা ‘অমাবতী’তে হাজারো প্যাঁচালির ভীড়ে দুন্দি আর ইকারুল আসলে ওই জনগোষ্ঠীর আধুনিক রোমিও-জুলিয়েট। হঠাৎ অমন করে দুন্দিকে বিষ খাওয়ানোর মাধ্যমে রাখাল ‘অমাবতী’র যে ইচ্ছাকৃত সমাপ্তি টানতে চেয়েছেন-- আসলে নতুন একটা পর্বের শুরুটা এখান থেকেই হতে পারতো। জাফর যেভাবে ভীড়ের মধ্যে দুন্দির দাদীর থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়, আর পেছনে পরে থাকে এক অমীমাংসীত ঘটনা-- দুন্দি কী বাঁচবে নাকি মারা যাবে? ইকারুল তো আগেই ভাগলো। দুন্দির কিছু না হওয়া পর্যন্ত পাঠককে রাখাল ইচ্ছে করলে ধরে রাখতে পারতেন। রাখাল সেটি না করে সমাপ্তি টানলেন!

অমাবতীর সবচেয়ে মজার ক্যারেক্টার বুড়ো মোনজের মুল্লা, ভুল চিকিৎসায় নেওয়া তাঁর চশমা এবং চ্যাংরা করম আলীর লিলিপুট বাহিনী। ভুল চিকিৎসায় পাওয়া যে চশমা মোনজের মুল্লা চোখে দেন তা দিয়েই তিনি চলাফেরার কাজটা চালান। মাঝমধ্যে দূরের শ্রীপুর গ্রামটা দেখার শখ জাগলে তিনি চশমাটা উল্টো করে ধরে দেখার চেষ্টা করেন। বুড়োর প্রতিদ্বন্দ্বি চ্যাংরা করম আলীর দল তখন কলার ভেওয়ার পরিবর্তে খেলার নতুন একটা বিষয় পায়। ‘ও বুড়ো, ভিডিও করবা না? ভিডিও করো’। মোনজের মুল্লা চরিত্রটি ইতিহাসের অনেক গল্প শোনায়। এখানে ‘অমাবতী’র কাঠামোগত ভিত্তিটার প্রারম্ভ হলেও চরিত্রগুলো ধীরে ধীরে যেনোবা হারিয়ে যায়। রাখাল চরিত্রগুলোর কথা কী বেমালুম ভুলে যান। কিন্তু পাঠক কি ভুলে যায়? একমাত্র জাফর যেদিকে যায়, রাখালও সেই দিকের চরিত্রগুলো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। ফলে চরিত্রগুলো চরিত্র হয়ে ওঠার আগেই অমাবতীর প্রগাঢ় বাদলে কোথায় যেনো ভেসে যায় বা হারিয়ে যায়। চরিত্রগুলোকে এভাবে অবহেলায় এড়িয়ে যাবার কৌশলকে পাঠক যদি রাখালের লেখনির দুর্বলতা বা ‘অমাবতী’র অসম্পূর্ণতা হিসেবে বিচার করেন তার জন্য রাখালকেই কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।


নি...

আমরা কাকে উপন্যাস বলবো? একের পর এক চরিত্রের সাথে পরিচয় হওয়াকে যদি উপন্যাস হিসাবে স্বীকার করতে হয়, তাহলে রাখালকে ঔপন্যাসিক না বলে ‘অমাবতী’র মোনজের মুল্লা’র সাথেই কেবল তুলনা করা সম্ভব। যে কিনা কাছে লোক পেলেই শুধু পুরানা দিনের গল্প শোনায়। যার সাথে ইতিহাস বা বাস্তবের কোনো মিল নেই। গ্রামের সবাই মোনজের মুল্লার সাথে মজা করার জন্যই ইচ্ছে করে গল্পের শুরুটা ধরিয়ে দেয়। শেষ করার দায়িত্ব মোনজের মুল্লার। রাখালের সমস্যা তাঁর চরিত্রগুলো শুধু কথা বলে। গ্রামের অশিক্ষিত কম শিক্ষিত মানুষগুলোর অমার্জিত বাক্যালাপের মধ্যেই ‘অমাবতী’র দৃশ্য বর্ণিত হয়। গ্রামের কোনো মার্জিত শিক্ষিত ভদ্রলোকদের কথা রাখাল যেন ইছে করেই এড়িয়ে যান। অর্থাৎ তাঁরা রাখালের চোখেই পড়ে না। তাই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার সামগ্রিক শৈল্পিক দলিল না হয়ে ‘অমাবতী’ দ্বিধাদ্বন্দের এক অমীমাংসীত আংশিক আখ্যানে বন্দি থাকে। ‘অমাবতী’তে এটাই রাখাল রাহার সীমাবদ্ধতা। দ্বন্দ্ব থাকলেও সবাইকে স্ট্রংলি আনতে পারেননি। অংশ বিশেষ এসেছে। বাকী অংশের খবর রাখাল যেনো ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেছেন। কিন্তু কেন তা আমার বোধগম্য হয়নি। রাখালের একটাই অর্জন-- আঞ্চলিকতাকে সে বাক্যের ফুলঝুড়িতে ঠাপ মারেন। তাঁর নায়ক জাফর আঙ্গিক গতিকে ঘুরিয়ে দেবার জন্য শক্ত করে কষে কাছা মারেন। পৃথিবীকে পূর্ব থেকে পশ্চিমে উল্টো করে সে আজ ঘুরিয়ে দেবে। অথচ জাফরকে ‘অমাবতী’র কোথাও অমন শক্তিশালী সামর্থ্যবান পুরুষ মনে হয়নি। যে কিনা বাবার পরিচয় না দিয়ে ভাইয়ের পরিচয় দিতেই [রাজার ভাই/নাজার ভাই] স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অমন দুর্বল চরিত্র যে সংকল্প করে তা আসলে আষাঢ়ে গল্পের মতো। আর রাখালের প্রচেষ্টাকে সব মিলিয়ে অমাবতীর কাটালে আঘাতপ্রাপ্ত আষাঢ়ে প্যাঁচালি বলার মতো একটা সুযোগ আসতো-- যদি কিনা সে দুন্দি’র সাথে জাফরের কোনো ধরনের সম্পর্ক স্থাপন পর্যন্ত পাঠককে ধরে রাখতেন। আমি বলব ‘অমাবতী’ উপন্যাসের প্রথম অংশ রাখাল ইতিমধ্যে শেষ করেছেন। আর একটা জিনিস-- সমাজের প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষগুলো একটু অদূরদর্শী, অলস, বোকা বা কিছুটা সহজ সরল। রাখালও যেনো উপন্যাস লিখতে গিয়ে ওরকম বোকা সোকাই থেকে যেতে ভালোবাসেন। উপন্যাসের যে কাঠামো তিনি অতি যত্নে দাঁড় করিয়েছেন-- তাকে এভাবে অকাল অমাবতীর বাদলে ভেসে যেতে দিলে পাঠক হিসাবে আমার ভারী কষ্ট হয়। পাঠককে জাফরের মতো অন্য কোথাও পালানোর জন্য রাখাল নিজেই উৎসাহিত করেন। ‘অমাবতী’কে আরো কয়েক পর্বে পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসে রূপ দেয়ার কোনো ইচ্ছে রাখালের থাকলে ভালো। সেখানে দৃশ্য বর্ণনায় রাখাল যদি আঞ্চলিক কথ্য ভাষার পরিবর্তে লেখক শৈলীর হাজারো বৈচিত্র্য ও নানান নান্দনিকতার প্রকাশ ঘটাতে পারেন, তাহলে রাখাল রাহাও একদিন পাঠক প্রিয় ঔপন্যাসিক হবেন। তার আগে তাঁর প্রথম প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ না জানালে অকৃতজ্ঞতা করা হবে। উপন্যাসের রস, প্রাণ, অঙ্গ, দেহ, বৃদ্ধি সব ফলজ হলেই আষাঢ়ের ঢলেও ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। সবশেষে, রাখাল রাহাকে আন্তরিক ধন্যবাদ তার ‘অমাবতী’র জন্য।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন