বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর, ২০১৬

অমলেন্দু চক্রবর্তীর গল্প ইছামতী বহমান

সন্ধ্যা নাগাদ অলৌকিক সেই বাড়ির দরজায় এসে থমকে দাঁড়াল ওরা। লঞ্চ থেকে নামার পর দেখতে দেখতে চোখের ওপর চারদিকের গাছপালা, ঘরবাড়ি, আকাশ আর ইছামতী নদী অন্ধকার হয়ে এল। ছোট বড় সরু লম্বা ঝাকড়া কত রকমের গাছ-প্রায় কোনোটাই ভালো করে চেনেনা মৃন্ময়ী। মাটির-ঘর, ধানের মরাই, খড়ের পালুই, ডুলি-পালকি পাখির ডাক-দুপাশে যা-কিছু চোখে পড়েছে সবই ধূসর স্বপ্নের ছবি। কিন্তু উৎসাহিত হবার মতো অনুভব ছিল না কোথাও। অদ্ভুত একটা ভয় বুকের পাথরে। ভয়টা টানছে ভেতর থেকে। দম বন্ধ হয়ে আসে। পুরো একটা রাত বাকি। আজ রাতেই কিছু-একটা হবে। একটা ভয়ঙ্কর কিছু। দুর্বৃত্বের শক্ত পাঞ্জায় কণ্ঠনালী চেপে-থাকা ভয়টাই বাইরে অন্ধকার এখন। দুর্বৃত্ব এ-রাত। এমন ঘনঘোর কালো রাত্রি ইতিপূর্বে সে দেখেনি কোনােদিন। একেই কি অমাবস্যা বলে?

ভাদ্রমাস। সারাদিন ধরে আকাশ মেঘলা ছিল। থেকে-থেকেই বৃষ্টি পড়ছে। সকাল থেকে। হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যেতে চাইছে পায়ের তলার কাদায়। গোড়ালির শাড়ি আর শায়ার নিচুটা সপসপ করছে। পায়ে পায়ে লেপটে জড়িয়ে আসে। টাল সামলে এগোবার ঝুঁকিতে শরীর ভারে ক্লান্তি আর অস্বস্থি কী ভীষণ। ব্যাঙ আর ঝিঝির একটানা ঘ্যানোর ঘ্যানোর। ব্যাঙগুলি কী বিচ্ছিরিভাবে লাফিয়ে পড়ছে সামনে! টর্চ ফেললেই দেখা যাচ্ছে ওদের। ভয়ে আর ঘেন্নায় শিউরে উঠছে গা। বড় বড় গাছগুলির তলা দিয়ে যাবার পথে ঝুরঝুর দু-এক পশলা জলে ভিজে যাচ্ছে চুল। কিন্তু কোনো কথা নয়, টু শব্দটি পর্যন্ত না। শক্ত করে দাঁতে ঠোট চেপে, ভেতরের কান্নাকে বারবার নিজের মধ্যে গিলে নিয়ে সার্কাসের মেয়েগুলোর মতোই, ট্র্যাপিজের দড়ির ওপর পা ফেলার নিয়ম যেমন, ডান-বাঁ সামলে সন্তৰ্পণে এগোবার পথ। সামনে বড়দা, পেছনে মা। জলকাদার গ্রামের রাস্তায় দু-দুবার পিছলে পড়ে যাচ্ছিলেন মা। সেই ভোরবেলা কলকাতা থেকে বেরিয়ে একদুপুর বাসে বাসে বসিরহাট, সেখান থেকে হাসনাবাদ। এ-বয়সে মা কত আর ধকল সইবেন ? অদ্ভুত সেই লোকটা, আজকের সমস্ত ব্যাপারটা যে ঘটাতে চলেছে কিংবা আশ্চর্য সব ঘটনার তদ্বির-তদারকিতে যার প্রধানতম ভূমিকা-এক হাতে ছাতা অন্যহাতে মাকে ধরে পিছু-পিছু আসছে। কী বদখদ একটা মানুষ। শুধু টাকা.একটু বাদে-বাদে টাকা চাইবার সময়ই বুড়ো অদ্ভুতভাবে হাসে। অন্য সময় কানের কাছে মুখ ছুঁয়ে দুর্গন্ধে কারণে অকারণে অনর্গল ফিসফিস ফিসফিস-যেন নিশাচরের মতো ঘুরে ঘুরে পৃথিবীর অনেক গোপন কথা জেনে ফেলেছে লোকটা। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ থেকে আয়ুব খাঁর শাসন অব্দি সব। জ্বালিয়েছে গােটা পথ-দুনিয়ার সব দেশেই তো আইনটাইন মাথামুণ্ড কী-সব থাকে আপনাদের। ওসব বইকেতাবের মধ্যে উইয়ের মতো ঢুকে ফুকুরফােকর ফন্দিফিকির খুঁজে বেরিয়ে আসতেও হয়। সীমান্ত? মানে বর্ডার ? বর্ডার আবার কী? ওসব জাহাজ উড়োজাহাজ মোটরগাড়ি রেলগাড়ির বাবুদের জন্যে। নইলে সোনাদানা থেকে জ্যান্ত মানুষ অব্দি সবই তো হামেশা চালাচালি চলছে। এপার-ওপার। একটু সাহস চাই, বুকের পাটা। মা অতসত বোঝেন না। পুরোনো দেশগায়ের কথা হা হয়ে শুনেছেন। মাঝে মাঝে কপাল কুঁচকেছেন বড়দা। যখন-তখন, যেমন চেয়েছে লোকটা, ব্যাগ থেকে টাকা বের করে দিয়েছেন দরাজ হাতে। ইতিহাসের অধ্যাপক, গম্ভীর, কম কথা বলেন। কি একটা নেশা চেপেছে মাথায়। কোথাও কৃপণতা নেই। যেন দুর্জেয় একটা রহস্যের শেষ পর্যন্ত দেখার জন্যই হঠাৎ মরিয়া।

এবং সারাদিনের ক্লান্তির পরও শরীরটাকে ভুলে যাচ্ছে মৃন্ময়ী। বুক গলা শুকোতে শুকোতে নিজের মধ্যে সিঁধিয়ে গিয়ে এখন সত্যি-সত্যি পাথর। সুবিশাল ভারতরাষ্ট্রের এক প্রান্তে, সীমান্ত এলাকায় কী-সব হবে। আজ রাতে, অন্ধকারে, নিঃশব্দ গোপনে-এবং এই বুড়োটাই নাকি সব আয়োজনের একমাত্র অধীশ্বর। সাত-জেলে-মৌলাখালি গ্রাম। কী অদ্ভুত নাম? অজানা অপরিচিত সুদূর এক গ্রামে এত খারাপ একটা লোককে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করে, নিজেদের সম্পূর্ণ সমৰ্পণ করে ভয়ঙ্কর এ-রাতে...আর ভাবতে পারে না সে, দম বন্ধ হয়ে আসে। শুধু মা আর বড়দাকে নিরাপদ ভরসা মনে করে যখন সাহস কুড়োয়, শক্ত হতে চায়-বুকের গভীরে কান্না। কান্নাটা মুক্তি পেতে চায় চিৎকারে-আমি কি খড়কুটাে মা? খড়মাটির প্রতিমা ? পূজাশেষে কোথায় নিয়ে এলে আমাকে? কোথায় ভাসানে ?

‘কোথায় যাচ্ছি। আমরা?”—সকালে বসন্ত রায় রোডের বাড়ি থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সিতে ওঠার সময় প্রশ্ন করেছিল। মৃন্ময়ী। বড়দা কথা বলেন নি। তাকিয়ে ছিলেন মা-র দিকে, নিঃশব্দে। মা তাকিয়েছিলেন বড়দার দিকে। বাইরে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন বৌদিরা। রাস্তায় একেবারে ট্যাক্সির দরজা ছুঁয়ে নেমে এসেছিলেন মেজদা, সেজদা, ছােড়দা । “আমি কি পর হয়ে যাচ্ছি, তোমরা কথা বলো” মেজবৌদিকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল। মৃন্ময়ী। ওকে ঘিরে অনেকগুলি ভালোবাসা, স্নেহ, আদর, পিঠের ওপর অনেকগুলি হাতের ঘোরাফেরা। মা কাছে টেনে নিয়েছিলেন- ‘আমিই তো সঙ্গে যাচ্ছি, ভয় কি মা!” নিজে ধরে ধরে রাস্তায় নেমে একসঙ্গে ট্যাক্সিতে উঠেছিলেন। তারপর সারাদুপুর বাঙলাদেশের বুকের ওপর দিয়ে বাস, বসিরহাট-হাসনাবাদ...তারপর অন্ধকার নামল, মিশমিশে কালো গাঢ় এ অন্ধকার। গােটা পৃথিবীজুড়ে একসঙ্গে এত অন্ধকার নামতে পারে, সেই পাক-ভারত যুদ্ধের সময় ব্ল্যাকআউট-কলকাতার বীভৎস রাতগুলি ছাড়া অন্য কোনো রাত্রির কথা মনে করতে পারে না মৃন্ময়ী।

এবং এতদূর গড়িয়ে এসে একটা দরজার সামনে দাঁড়াবার পর সেই অদ্ভূত ভয়ঙ্কর লোকটা ভেতরে চলে গেল। বাইরে জল কাদা আর অন্ধকারে মাখামাখি তিনজন একান্ত আপন মানুষ চুপচাপ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বাতাসের একটানা শব্দ চারপাশে। ঠাণ্ডা আৰ্দ্ৰ বাতাস, ব্যাঙ আর ঝিঁঝিঁ-র ডাক, দূরে নদীর জলে মােটর-লঙ্চের বাঁশি। দূরে গলা ছিড়ে কে যেন ডাকছে কাকে ! মাঝি-মাল্লা! হয়তো-বা। নদীর পার ধরেই এতক্ষণ হেঁটেছে ওরা। গাছপালা ঝোপঝাড়ের আড়ালে, ফাঁকেফোকরে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল ওপারে দুটাে একটা ইতস্তত আলো। ওপারে কালীগঞ্জ থানা, খুলনা জেলা-বড়দাবামা-র স্মৃতির দিগন্তে এক দেশে. . .

হয়তো-বা অন্যমনস্কভাবেই হাতের টর্চ জ্বেলে আলোটা মাথার ওপর চারদিকে ঘুরিয়ে নিলেন বড়দা। সে আলোয় ওরাও তাকাল। খুব বড় বড় গাছ সামনে, অনেক উঁচু, অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে না-কত বিশাল! কি গাছ তা-ও জানা নেই। চেনে না কেউ। তারপরই ঢালু জমি, তারপর নদী, ওপারে পাকিস্তান। কেমন ভয়-ভয় করছে মৃন্ময়ীর, সব মিলিয়ে ভয়৷ অন্ধকার রাতের অচেনা জায়গা। সীমান্তের কাছাকাছি এপার ওপর। গরুভেড়াছাগল ইত্যাদি চুরির ঘটনা, সীমান্ত পুলিশের সংঘর্ষ-খবরের কাগজে প্রায়ই তো থাকে। যদি তেমনি হঠাৎ কিছু ঘটে যায় আজই। ঠিক এখানেই। ওপারের আলোগুলির দিকে তাকিয়ে আছেন মা, এবং ওই আলোগুলির জন্যই হাতের টর্চটা অমন ছেলেমানুষের মতো জ্বলে জ্বলে উঠছে বড়দার হাতে। এই বিপুল অন্ধকারের মধ্যে তিনটি হৃদয়, তিনজন আপনমানুষ, নিঃশব্দে, ছুঁয়ে বা না-ছুঁয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, নির্বাক বিস্ময়ে অথবা গভীর কোনো যন্ত্রণাকে বুকে চেপে, দুঃখে-বেদনায়, মৃন্ময়ী স্পষ্ট অনুভব করে-একই কথা ভাবছে সকলেই। বৃষ্টির জলে অন্ধকারে-কাদায় তিনজনই যেন অন্ধের মতো হাতড়ে হাতড়ে খুঁজছে একটা কিছু, যা একদিন ছিল, কোনো জন্মান্তর সম্পদ।

“নদীটা বইছে দেখা মিনু, পুরনাে অভ্যাসে বইছে ইছামতী, যার এপারটা সত্যি ওপারটাও মিথ্যে নয়। আমার কৈশোর আর প্রথম যৌবনটা ওপারে, সেটাই মিথ্যে হয়ে গেছে। আর তোর..." বড়দা থেমে গিয়েছিলেন। হাসনাবাদ থেকে লঞ্চটা আসছিল,অপলক তাকিয়েছিলেন দূরান্ত পৃথিবীর দিকে। সারাদিনের দীর্ঘ পথে একটি কথাও বলেননি। বড়দা। শুধু সন্ধেবেলা নদীতে নদীতে ভাসতে ভাসতে, ওপারের সূর্যটা যখন এপারে ঢলে পড়ছিল, নিতান্ত স্বগতোক্তির মতোই কথাগুলি উচ্চারণ করলেন বোনের পিঠে হাত রেখে-“মা- র একদিকে তুই, অন্যদিকে আমি, দু’জনই সত্যি। কিন্তু হঠাৎ আজ যখন ওই সত্যিটাকেই জোরের সঙ্গে বুঝে নিতে চাইছি...কাঁদিস নে, কেঁদে লাভ নেই, কোথাও একটা বিশ্বাস খুঁজে নিতেই হবে আমাদের। শক্ত পায়ে দাঁড়াবার জমি.'

বড়দার কথাগুলি মনে হতেই এবং দৃশ্যটা মনে মনে কল্পনা করে অন্ধকারে হাত বাড়াল মৃন্ময়ী। বড়দা আর ওর মাঝখানে মা, শরীরে হাত পড়তেই দু'হাত বাড়িয়ে মা কাছে টানলেন। মা-র কাধে মাথা লুকিয়ে মৃন্ময়ী থারথার কেঁপে উঠল। ভেতর থেকে একটা কান্নার বাষ্প কোনোদিকে বেরোবার পথ খুঁজে না-পেয়ে পাক খেয়ে খেয়ে গুমরোতে গুমরোতে যন্ত্রণায় তোলপাড় করছে বুকের ভেতর, ঠোঁট দুটাে কাঁপছে শুকনাে বাঁশপাতার মতো, চোখের জলে ভিজছে বুক। অন্ধকারেই দুহাতে বুকে জড়িয়ে সান্তনা দিচ্ছেন মা—“আমি তো আছি, সঙ্গে আছি। ভয় কী মা তোর?”

বড়দা নির্বাক। শুধু ঝিঁঝিঁ আর ব্যাঙের ডাক চারদিকে, অন্ধকারে জোনাকি, কোথায় ডানা ঝাপটাচ্ছে একটা পাখি, তার শব্দ। আসলে পাখিটা তার বুকের খাঁচায়। মৃন্ময়ী কান্নায় ভাসল, বৃষ্টিতে ভেজা মায়ের আঁচলটা আরো বেশি করে চােখের জলে ভেজে। অচেনা এক গেয়ো-গেরস্তের বাড়ির দরজায় অন্ধকার আড়াল করে নিয়েছে সব। শুধু শব্দ, চারদিকের নিঝুম স্তব্ধতায় ইছামতীর স্রোত, শুধু কান্নার ধ্বনি।

তোমার একটা জন্মদিন ঠিক ঠিক স্থির হােক মিনু। কেক কাটিব না। পায়েস রাঁধব তোমার জন্যে. . .বৌদি

স্বাধীনতার একুশ বছরে তুই কত বড় হয়ে উঠেছিস মিনু। ধর, ধরা যাক, তুই জন্মেছিলি উনিশ শ” সাতচল্লিশে, পনেরই আগস্ট। স্কুলের খাতায়, তাের হায়ার সেকেন্ডারির সার্টিফিকেটে তাই তাে লেখা আছে। কটা পনেরই আগস্ট, কতগুলাে জন্মদিন পেরিয়ে তুই আজ এত বড় হয়েছিস রে! যখন ছােট ছিলি ফ্রক কিনে দিতাম, এখন শাড়ি। তােকে আদর করেই আমাদের স্বাধীনতা উৎসব। মেখলা পরিস না কেন তুই! তাের জন্মদিনে পরবি।

ঘাগরা হবে সবুজ, ব্লাউজ হবে শাদা, ওড়না হবে জায়ফান...মেজদা

মৃন্ময়ী, মিনু মৃন্ময়ী-মৃৎমৃত্তিকা, মৃৎময়, মৃত্তিকাময়, মাটি, মাটিই যার সব.. .বাবা তোর নাম রেখেছিলেন। বাবা নেই, কিন্তু তোর নামটা আছে। নিজের নামের মধ্যে ডুবে যেতে পারিস মিনু? অন্তত নিজের পরিচয়টা, নিজের ইতিহাস, সেজদা

সে অনেকদিন আগে, দেশবিভাগের পর সাতপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে চোখের জলে বুক ভাসিয়ে, কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে চারদিক থেকে ছুটছে মানুষ, হাজারে হাজারে, লাখে লাখে- সে এক আশ্চর্য মানবস্রোত। দুঃখেসুখে যাদের একটা জীবন ছিল, ঘর ছিল। হঠাৎই একদিন সরকারি ঘোষণায় জীবনটা থাকে, ঘরটা চলে যায়। অনির্দিষ্ট পদযাত্রায় সবাই ছন্নছাড়া। আমরাও ছিলাম। ফরিদপুরের মাদারীপুর মহকুমার পালং গ্রাম থেকে যাত্রা আমাদের। বিকেল বেলা, গোয়ালন্দ, পদ্মার জাহাজঘাট থেকে রেলগাড়ি। ভিড়ের চাপে কে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে, চিৎকারহাল্লাগুতোগুতি। বৃষ্টি পড়ছিল, ভাদ্র মাস, পায়ের তলায় কাদা। কাদায় লেপটে-থাকা একটি মেয়ে। ফুটফুটে সুন্দর এক শিশু। কত আর বয়স তখন, দেড়-দুই, অসহায়... আহা রে, কোন হতভাগী মায়ের বুক থেকে খসে-পড়া হৃৎপিণ্ড ? চারদিকের মানুষগুলি তখন জন্তু। কেউ নিমেষের জন্যেও থামতে জানে না। ওনার চোখে পড়ল। তুলে নিয়ে আমার বুকে দিলেন। আমার বুকে তখন শ্যামল, এক বয়সী, চলে এলাম। অনেক খোঁজখবর চলল তারপর। কত মানুষ এল চারপাশ থেকে, কত মায়ের বুক ভেঙেছে। বিশ্বাস করার মতো প্রমাণ জুটলনা কোথাও। মায়া-জড়ানো মেয়েটাকে ছাড়তেও পারলাম না.মা

এতকাল ধরে লুকিয়ে রাখলে যদি, কেন আজই বললে? কেন লুকিয়ে রাখলে না মাগো...আজ একুশ বছর পরে.

চোখের ওপর একটু একটু করে বড় হলি তুই, স্কুলকলেজের সব পড়া শেষ করে এমএ পড়ছিস। কিন্তু এই একুশ বছর ধরে একটানা সন্ধান চলছে তোকে গোপন করে। তোর পরিচয়

কেন সংশয় মা? যদি জানতে, আমি মুসলমান, আমি খৃস্টান, ডোম বা শুদ্দুরের মেয়ে.মা তোমার একুশ বছরের আশ্রয়, মা তোমার একুশ বছরের ভালবাসা, মা আমার একুশ বছরের বিশ্বাস..

হাজার বছরের পুরনো একটা বটগাছ মিনু। মাটির তলার অন্ধকারে তার শিকড়গুলি পাক খেয়ে খেয়ে চারদিকে ছড়িয়ে, অনেক নিচে অন্ধকারের গভীরে ডুবে নিজের একটা সাম্রাজ্য গড়তে চায়। অন্ধকারের সেই শক্তিটা আছে বলেই মাটির ওপর আলোয় মাথা উচু করে, শক্ত-ঋজু হয়ে এত দীর্ঘ দীর্ঘদিন, হাজার বছর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার মেরুদণ্ড আমাদের জন্মের আগে মাতৃগর্ভে সেই অন্ধকার। জন্মের মধ্যে রক্তের পবিত্রতা খোঁজার কুসংস্কার নয়। মিনু, নিজের জীবনটাকে সম্পূর্ণ করে জানার জন্যেই আমরা শিকড় চিনে নিতে চাই, আমাদের নিজেদেরই ইতিহাসটা পুরোপুরি বোঝার জন্য, বড়দা

আমার শৈশব থেকে আমিও তোমাকে একটা বটগাছ ভেবে এসেছি বড়দা, কত বড় তুমি . .

আমরাও কী ভীষণ একটা কিছু হারিয়েছি মিনু, খুঁজছি, ঠিক তোর মতো, আমরা সবাই। মাটির তলায় শিকড় নেই, শক্তবিশ্বাসে মাটিকে আঁকড়ে থাকার বিশ্বাসটাও বডড মেকি।। হয়তো সবাই আগাছা….

মৃন্ময়ী, মিনু, মৃন্ময়ী : মৃৎ মৃত্তিকা, মাটি মাটিই যার সব। জনকরাজার রথের তলায় মাটি, মাটিতেই জন্ম নিলেন কন্যা-জানকী। শঙ্খধ্বনি মিথিলার সুরম্য হর্ম্যে, অশোককাননে নিঃসঙ্গ বেদনা, অযোধ্যার বঞ্চনা, ফিরে ফিরে সেই দ্বিধা- ধরিত্রী-শেষ আশ্রয়। খন্ডিত জন্মভূমিতে জন্ম তোর মিনু, ফাটল ঘোচাবি তুই। আবার এই ফাটলের কাছে বারবার ফিরে ফিরে আমরা আসবো, আমরা সবাই, তোর সঙ্গে এই ফাটলটার কাছে, তোকে জানতে, কিংবা নিজেদেরই ফিরে দেখা.. আমাদের পরিচয়...

কাদের যেন পায়ের শব্দ? ফিসফিস কথা। দরজার ওপাশ থেকে কারা এগিয়ে আসছে। সেই বিদঘুটে লোকটা, সঙ্গে আরও কেউ!!! একটা লালচে আলোর আভাস অন্ধকারে। সচকিত হয়ে উঠল তিনজনই। মায়ের কাঁধ থেকে মাথা তুলে সােজা হয়ে দাঁড়াল মৃন্ময়ী এবং অন্ধকারেই হাতড়ে হাতড়ে ওর চােখের গালের ওপর আঙুল বুলিয়ে দিলেন মা-“কাঁদিস নে, কাঁদিস নে মা, আমিই তো সঙ্গে আছি। ভয় কি মা তোর?

মৃন্ময়ী ওর আঁচলটা চোখেমুখেগালে সর্বত্ৰ বুলিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।

অন্যমনস্কভাবেই টর্চের আলোটা ডানদিকে বাঁদিকে ঘোরালেন বড়দা। দু’পাশ থেকে লম্বা মাটির দেয়াল এসে একটা দরজায় মিশেছে, দরজায় লাল কাঠের গায়ে কোন শিশুহাতের শাদ খড়িমাটির ছবি-মানুষ বলেই ধরে নিতে হবে এমনি একজন কেউ-মাথায় লোহার-টুপি, হাতে বন্দুক, আরেক দিকে তিন-রঙা ঝাণ্ডা, মধ্যে চক্ৰ। ওপরে আঁকাবঁকা হরফে ‘জয়-হিন্দ’। সীমান্তের শেষ রেখা দুয়ে পশ্চিম থেকে পূবদিকে, যেন সতর্ক-নির্দেশ। ইলেকট্রিকের পোস্টে যেমন মর্যা-মাথার খুলি আর আড়াআড়ি কঙ্কালের হাড়।

একটা লণ্ঠন নিয়ে দু'জন মানুষ এসে দরজায় দাঁড়াল। লণ্ঠনের লালচে-আলোয় কেমন ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে ওদের ? চোয়াল-ভাঙা কালো কালো দাঁতে বিচ্ছিরি ভাবে হাসছে সেই বুড়ো, সঙ্গে কালো মোটা ধুমসো-মার্ক আরো একজন। হাঁটু উঁচু নােংরা ধুতি, খালি গা, রোমশ বুকে কারের সুতোয়-বাঁধা একটা চ্যাপটা মাদুলির লকেট, মেদ-থলথল কনুইয়ে ঢাকঢোলের মতো আধ-ডজন কবচমাদুলি। লোকটা গোঁফের ফাকে হাসল-“পোন্নাম হই গ কত্তাবাবু, মা-দিদিরা পোন্নাম...' লোকটা লণ্ঠন শুদ্ধ হাতজোড় করে বুক পর্যন্ত তুলল-“গরিবের ঘরে রাতটা কাটাবেন কষ্টেছিস্টে, আসুন, আসুন-”

বড়দা এগোলেন, তারপর মা। তাদের অনুসরণে কুষ্ঠিত মৃন্ময়ী। দরজার ওপাশেও প্যাকপ্যাক কাদা, দুটাে করে ইট গায়ে গায়ে বসানো, একটু দূরে দূরে। উঠোনটা বড়, অনেক বড়। কত বড় বােঝা যাচ্ছে না। ঠিক। লন্ঠনের আলোয় ইটগুলি কিছুদূর গিয়েই হারিয়ে গেছে। দূরে দূরে লন্ঠন-হাতে দাঁড়িয়ে আছে আরো কিছু মানুষ, ঘরের বৌ-ঝিরা। ঘুটঘুটে অন্ধকারে চারপাশটা ভালো করে বুঝে উঠতে না-পারলেও, এরই মধ্যে, শুধু সদর দরজা পেরোতেই মৃন্ময়ীর মনে হলো, বড়দা, মা এবং সে নিজে কী দুঃসাহসিক অভিযানে অদ্ভুত এক জগতে এসে পড়েছে। বসন্ত রায় রোডের সুন্দর ওই ফ্ল্যাটবাড়িতে বসে ভাবাই যায়নি এতদিন, পৃথিবীতে কিংবা এই বাংলাদেশে এরকম একটা জগৎ থাকতে পারে! এত অন্ধকার, এত স্তব্ধতা, এত বিচিত্র সব মানুষ! হয়তো-বা গ্রহান্তরের বাবুমানুষদের এমন আগমন এদের কাছেও নতুন কিছু নয়। আরও অনেকেই আসেন। আরো অনেক মৃন্ময়ীর জন্য আরো অনেক মানুষ—এই ফাটলটার কাছে।

অবশ দুটাে পা থমকে দাঁড়াল। বিকট একটা হাঁক আসে অনেক দূর থেকে, মানুষের হাঁক, সঙ্গে সঙ্গে আরো কতগুলি। কাছেই মনে হয়, খুব কাছে। নিশুতিতে বুক ধড়াস করে ওঠে। বড়দা, মা থমকে দাঁড়ালেন। সেই অদ্ভুত লোকটা হাসে-ও কিছু না, কিছুনা কত্তা, পাকিস্তানের পুলিশ.'

‘পুলিশ’

না, এপার থেকেও জবাব গেল। এখন আর কী? রাত বাড়ক, তিষ্ঠোতে দেবে না ব্যটারা’।

"কেন, এসব কেন?”

আমাদের শাসাচ্ছে, ঘুষের টাকা আগাম না দিয়ে যাচ্ছে কোথায় হে?”

“সে কি?” আঁতকে উঠলেন মা—“ভয় করে না। আপনাদের? যদি গুলি ছেড়ে ''

‘গুলি?” ওরা হাসল, লকলকে হাসি-ওপারে চাদ--তারার ছাপ, এপারে তিন সিংহি, মাঝখানে এই চরটায় সারারাত এখন এই তো চলবে মা। আকাশে যুদ্ধ হবে, কালকেতায় ঢাকায় বোমা ফেলে আপনাদের মারবে। আমরা এই চরের মাঝখানটায় শিবঠাকুর সেজে তামাশা দেখব গা মা-ঠাকরুন। বাহারের মজা.

বড়দা নিঃশব্দে এগোলেন। ওরা ডানদিকে নিয়ে গেল বড়দাকে। টর্চের আলো ফেললেন বড়দা-ছােট একটা মাটির ঘর, খড়ের ছাউনি। মৃন্ময়ী শিউরে উঠল। ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন বড়দা? বড়দা আলাদা হয়ে যাচ্ছেন। বসন্তরায় রোডে বসবার-ঘরের দেয়ালে একটা বিলিতি কোম্পানির ক্যালেন্ডারে গোপাল ঘোষের ছবিতে এরকমই একটা ঘরের-ছবি বুলছে। একেবারে জ্যান্ত ক্যালেন্ডারের সামনে দাঁড়িয়ে মৃন্ময়ী আতঙ্কে থরথর কেঁপে উঠল। বড়দাকে নিয়ে ওরা চলে যেতেই দূর থেকে মেয়েরা ছুটে এসে আলো দেখাল। মা-র পিছু পিছু যেতে যেতে মৃন্ময়ী শুধু দুপাশের কতগুলি গেয়ো বৌ-মেয়ের নোংরা শাড়ির গন্ধ নাকে সয়ে এগোতে লাগল। মা আর সে-মৃন্ময়ী অবাক হলো, দুজন মহিলার কাছেও৷ কি লজ্জা বৌগুলির। ঘোমটা টেনেছে একহাত। বার-তের বছরের মেয়েটাও শাড়ি পরেছে। ওর বয়সী বাইশ-পাঁচিশের বৌগুলির গায়ে ব্লাউজ নেই, শায়া নেই, নাকে ফুল, কপালে সিঁথিতে ড্যাবডেবেসিঁদুর। পাশাপাশি পা ফেলে এগোবার পথে লক্ষ করল, ঘোমটা সরিয়ে আড়চোখে ওকেই দেখছে বৌগুলো। রূপসী হবার গৌরব নয়, অস্বস্তিতে দারুণ একটা রাগ হচ্ছিল মেজবৌদির ওপর। নিজে সে চায় নি। আলমারি খুলে মেজবৌদিই জোর করে পরিয়ে দিয়েছেন রঙিন সিলকের শাড়িটা।

মাটির ঘর। দাওয়ার সিঁড়িতে পা ফেলার আগেই কী একটা-কিছুর সঙ্গে ভীষণভাবে জড়িয়ে গেল মৃন্ময়ী। ভয়ে চিৎকার করে উঠল। এবং সঙ্গে সঙ্গেই খলখল হাসির ঝলকে ঝলকে ওকে ছাড়িয়ে দিয়েছে মেয়েরা। মস্ত উঠোনের এপাশ থেকে ওপাশে টান করে রাখা বড়-বড় মাছ-ধরার জাল। আঁশটে গন্ধ, গা ঘুলিয়ে আসে। জুতো জোড়া বাইরে রেখে ঘরে ঢুকতেই কান্না পেল। ওদের ঘরের ভেতরও সেই বিদঘুটে ঘ্রাণের বিস্তার। খুঁজে পেল-এতক্ষণ যে-গন্ধটা সে চিনতে পারছিল না ঠিক-ঠিক, আসলে সেটা মাছের গন্ধ। এদের মানুষগুলোর গায়ের গন্ধও মাছের।

প্রায়ান্ধকার ঘরটায় কালিকুলি-পড়া একটা লণ্ঠন জ্বলছিল। ভেজামাটির মেঝেতে ঢালাবিছানা। ছেড়াফাটানোংরা হতচ্ছিরি কাঁথার ওপর তেল-চিটচিটে ওয়ার-ছাড়া বালিশকে জড়িয়ে অথবা বালিশ ছাড়াই ঘুমে-কুঁকড়োনো একপাল ন্যাংটাে ছেলেমেয়ে। এক পাশে বাঁশের তৈরি তক্তপোশ গোছের উঁচু কী-যেন একটা? নোংরা দুৰ্গন্ধময় কাঁথার বিছানায় দুটাে বালিশ। মা বসলেন, মা-র গা ঘেঁষে মৃন্ময়ী। মা-র পায়ে মাথা ঠেকিয়ে একে একে ওরা প্ৰণাম করল। সবাই। বামুন ঠাকরুনের পায়ের ধূলি। মাকে সারদা মায়ের মতে দেখাচ্ছিল।

প্ৰণামের শেষে ওরা মৃন্ময়ীকে ঘিরে দাঁড়াল তিন দিক থেকে, একেবারে গা ঘেষে। চোখে চোখে ভরাট বিস্ময়। বয়সে নুয়ে-পড়া সেই বুড়িটাও ছানিপড়া চোখ তুলে, চোয়াল চুষতে চুষতে দেখতে চাইল চাদপানা মুখ। হাতের লণ্ঠনটা আরো উচু করে ধরল। ওদের কেউ একজন। মৃন্ময়ীর চোখ বুজে এল। রক্তে রক্তে শিহরনে ঝনঝনিয়ে উঠছে শরীর। লজ্জা নয়, কৌতুক নয়, বিরক্তি নয়-তাকে নিয়ে এমন মুন্ধতা সে পায়নি কোনোকালে। শুনল, বুড়িকে বলছে কেউ-“রূপবতী কন্যে গ মা, মা-নক্ষ্মীর ঝি। ডাগর ডাগর চোখ, মেঘবরণ কেশ। বেউলা কন্যের কপাল গ, জলে ভাসতি এল.'

বোজানো চোখের পাতা ভেদ করে লন্ঠনের আলো এসে বেঁধে, কপালে ঘাম জমে, দাঁতে দাঁতের চাপ। অন্য কোনোদিন হলে এ-অবস্থায় নিঃসন্দেহে হাসি পেত। পেটে খিলধরা হাসি। কিন্তু ঠোঁট কপছে, রক্তচাপ মাপার ডাক্তারি-যন্ত্রের পারা ওঠানামার মতো কণ্ঠনালীটাে ঘন-ঘন উঠ-বোস করছে। আশ্চর্য এ-রােত। ফুলশয্যার রাতে শ্রাবণীকে নিয়ে একটানা প্রায় মিনিট পনের-কুড়ি সে কি ফোটাে তোলার হিড়িক! ঘরের এপাশ ও পাশ চারপাশ থেকে ফ্ল্যাশের পর ফ্ল্যাশ, হাসিঠাট্টা মন্তব্য মজাদার হুল্লোড়। বেয়াদপিতে কিছুটা অশ্লীলও কেউ কেউ। ক্লাশে এসে গল্প করেছিল শ্রাবণী নিজেই। সে-গল্প শোনায় কেমন একটা রোমাঞ্চও ছিল। মৃন্ময়ীর কান্না পাচ্ছে। কিন্তু চোখ খুলতে পারছে না সে। ওদের মুগ্ধ চোখে চোখ রেখে একই আলোয় সে কাদের দেখবো? রোগা রোগা চোয়াল ভাঙা, হতকুচ্ছিত কতগুলি মুখ। কণ্ঠা বেরিয়ে আছে, চোখ গেথে গেছে, গা ভরে আঁশটে-গন্ধ। অবশ চোখ বুজেও সেই গন্ধে বমি আসছে তার। যদি চোখ বুজেই বসে থাকা যেত আজি, সারারাত। এই লণ্ঠনই তো আজ আবার নাকমুখচোখকানচুল, হাতের আঙুল, পায়েরগোড়ালি নতুন করে পরখ করবো! আচমকা ধাক্কা লাগে। যদি সত্যি তাই হয়। যারা আসবে, যদি দাবি করে! স্মাগলার মেয়েরা যেমন তাদের শায়া আর ব্লাউজের নিচে সুপুরির পুঢ়লি আফিংয়ের ডেলা লুকিয়ে চোরের মতো সীমান্ত পার হয়...তুমি...তুমি নিজের পরিচয়টা গোপন করে পালিয়ে যাচ্ছে কোথায়? ওরা না-চাক, মা প্রমাণ চাইবেন। এবং তখন যদি পুরুষমানুষের চােখের আড়াল থেকে দূরে সরে গিয়ে, মা আর ভুল-মা দু’পাশে দাঁড়িয়ে লন্ঠনের আলো তুলে ওর কোমরের শাড়ির গিট, শায়ার দড়ি খুলে, একটু নামিয়ে, ঠিক উরুর তলায় একটা কালো জরুড় খুঁজে পায়? জন্মের চিহ্ন। আর ভাবতে পারছে না। এত কুৎসিত, এত অশ্লীল সব ব্যাপার ঘটতে পারে একটি মেয়েকে নিয়ে, কল্পনা করা যায় নি। কখনও। মাথা ঝিমঝিম করে। মুখের এত কাছে লন্ঠনের তাপ, মাথার শিরাগুলি দপদপ জ্বলছে যন্ত্রণায়।

‘কী গ মা-ঠাকরুন ? উনুনটা বইয়ে যাচ্ছে, দুটাে চাল ফুইটে নিন।'

মৃন্ময়ী চােখ খুলল। সামনে ছেলে-কোলে একজন বয়স্ক বৌ। গিট দেওয়া ডোরা-কাটা গোলাপী শাড়িটা বুক থেকে সরিয়ে ছেলের মুখে মাইটা পুরে দােলাচ্ছে, একেবারে খোলাখুলি, চোখের ওপর।

মা বললেন- না বাপু, আমি বিধবা মানুষ। রাতে কিছু খাব না."

‘পর ভাবেন কেনে গা মা-ঠাকরুন। কিছু মুখে দেবেন নি? একবাটি দুধ? ওখেনে বামুন ঠাকুর, হেই দিদিঠাকরুন’

ওরা তোমাদের রান্নাই খাবে, তোমরা কিছু ভেব না."

"মোরা জেলে গা মা-ঠাকরুন। জেলে-বৌর হাতে বামুনঠাকুরের ভাগ। অ মামা গ, মোদের পাপ হবে নি?"

মৃন্ময়ী উঠে দাঁড়াল। আপাতত ভেজা-শাড়িটা পাল্টানাে দরকার। এভাবে থাকলে মারও তো শরীর খারাপ হতে পারে। কিন্তু সুটকেশটা ওঘরে বড়দার কাছে। বড়দার কাছে যাওয়া যেত। সেখানে কিছুটা সাহস, খোলামেলা কিছুটা নিশ্বাস হয়তো এখনও। কিন্তু বাইরের উঠোনে ঘুটঘুটি অন্ধকারের আতঙ্ক। ইচ্ছেটা কুঁকড়ে যায়। বড়দাকে নিয়ে ওরা নিশ্চয়ই এখন শলা-পরামর্শ করছে। মৃন্ময়ী ভেতরে ভেতরে ঘামতে শুরু করে। রাত গাঢ় হচ্ছে । ঢাকা থেকে কালীগঞ্জ এসে ওরাও হয়তো অপেক্ষা করবেন। তারপর রাত আরো গভীর হলে সেই ভয়ঙ্কর আর অদ্ভুত লোকটা নিজেই ওপারে যাবে অথবা ওপারের সঙ্কেত আসবে। এপারে। রাতদুপুর পেরিয়ে অনেক অনেক রাতে, কত রাত কে জানে, একটা দেড়টা দুটাে. গাঢ় অন্ধকারে গা ঢেকে, কোনাে আলো না জ্বেলে, কোনাে শব্দ না তুলে ইছামতী ডিঙিয়ে নৌকোটা পৌছোবে এপারের ঘাটে। তারপর? পরবর্তী কোনো দৃশ্যের ভাবনায় মাথাটা ঝিমঝিম করছে তার। গোটা শরীরে ঘাম। আবার হয়তো লন্ঠনের লালচে আলো উঠবে নাকের ডগায়। চােখ খুললেই অর্ধবৃত্ত অগ্নিকণা আর চিমনির কালিকুলির ওপারে কতগুলো উৎসুক চােখের চাউনি। ওরা কারা? রক্তের প্রবাহে ঝড়। শরীর অবশ। মৃন্ময়ী চোখ বুজল। মনে হলো, যেন সে নিজেই আজ এক অন্ধকারের নদী-যার এপারের ঘাটে বড়দা আর মা, ওপারের ঘাটে এসেও দাঁড়িয়েছেন কারা? তৃষ্ণা উভয় পারেই। অবগাহনের শান্তি চায় এপার ওপার

এবং মুদিত চোখের পাতায় শিহরণ তার। নিমজ্জিত অন্ধকারে বইছে ইছামতী। সে তার স্পষ্ট কলধ্বনি শুনতে পাচ্ছে। যদি ভেসে যেতে পারতাম সেই স্রোতে? বিপুল অন্ধকারে স্নিগ্ধ স্রোতের ধারা, শীতল বাতাস। ডান হাতে জল কাটলে সবুজ দিগন্ত, বাঁ-হাতে সেই একই সবুজ। একই মৌসুমী বাতাসে এপার-ওপারে অখণ্ড বর্ষা

শেষ পর্যন্ত মাকে রাঁধতে যেতে হলো। ভক্তগৃহে দেবীপটি সেজে বসে থাকে মৃন্ময়ী-যথার্থই পটের বেহুলা। নিচে, মাটিতে নোংরা বিছানায় বাচ্চাগুলো, ওদের পাশেই চটের বস্তাবিছিয়ে বুড়িটা ঘুমিয়ে পড়েছে। মৃন্ময়ী তাকিয়ে থাকে। এক সময় হাই ওঠে, ঘুম পায়। কিন্তু ঘুমোনোও কী সম্ভব আজ রাতে ? একটানা সন্ধানে ছিলেন দাদারা। এতকাল পরে কোথায় কীভাবে যোগাযোগ? একটা সম্ভাব্য অনুমানে তার জন্য, শুধু তাকেই জন্মমৃত্তিকায় চিহ্নিত করার প্রয়োজনে আজ এক অস্থির রাত-জাগা

রাত বাড়ে, রাত দীর্ঘতর হয়।

তারপর রাত আরো গভীরতর হলে আহারাদির শেষে ডাক পড়ল সদরের ঘরে। ঘরের জানালা থেকে বাইরের দিকে তাকিয়ে নিঝুম বসে ছিলেন বড়দা। যেখান থেকে ওপারের মিটমিটে আলোগুলো অন্ধকারের জোনাকি নয়, আকাশের নক্ষত্র নয়-বিগত স্বপ্নের হাতছানি কোনো। দীর্ঘ লম্বিত প্রতিবিম্বে আলোগুলো কাঁপছে ইচ্ছামতীর জলে। কাঁপবে সারারাত। চৌকিদারি হাঁকে তীক্ষ্ণ হুঙ্কার আসে ওপার থেকে। এপারে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স, রাইফেলের ট্রিগারে আঙুল বাজিয়ে হিন্দীগানের শিস, পাল্টা জবাব। এবং এরই মধ্যে অন্ধকারে গা ঢেকে গোপন পথে কারা আসে? নিশাচর মানুষরা, মানুষপাচারের দালালরা, চোরাইচালানের কুৎসিত লোকজন। মায়েরাও আসেন, পিতারা-সন্তানের কাছে, সন্তানের খোঁজে।

ওরা আসছে, ঘডিতে আড়াইটা। হয়তো আরো রাত হবে। ভাঙা-সেতুর পুননির্মাণ সম্ভব নয় জেনেই ওরা আসবে শুধু স্পর্শলোভে, বিষাদে ।

মৃন্ময়ী মা আর বড়দাকে দেখছিল। ঘুম নেই। কারুর, কোনাে উচ্চারণ নেই। যেন পৃথিবীতে বলার মতো সব কথা ফুরিয়ে গেছে সবার। এখন শুধু ইছামতী বইবে ধীরে। গাঢ় ঘনজমাট অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে রাত গাড়িয়ে যাবে, এবং সময়-নিশুতির saga কঁাপিয়ে কী-এক কৰ্কশ ডাক। পাখি। মা বললেন- 'কালপেচা।' হৎপিণ্ডের ভেতর গিয়েখামাচে, ধরল শব্দটা। ভয়ে শিউরে উঠল। মৃন্ময়ী। বড়দাও আঁতকে তাকালেন। শুধু মা জানেন, কালপেচার ডাকক। মা-র অনেক বয়স।

বাইরে কাদের চাপা কণ্ঠস্বর। দরজায় খিল-তোলার শব্দ, মরচে-পড়া পেরেকের চিৎকার। বুকের জ্বালাটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। সেধিয়ে আসছে দেহ। গভীর উৎকণ্ঠায়। বড়দা নিঃশব্দে উঠলেন, এগোলেন দরজার দিকে। মা আরো ঘনিষ্ঠতায় মেয়েকে টেনে নিলেন বুকে—‘এই দেখ আমি আছি, সঙ্গেই আছি। ভয় কী মা তোর ?

তক্তপোশের ওপর পা বুলিয়ে বসে, মাকে জড়িয়ে মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে চােখ বুজে থারথার কঁপিছে মৃন্ময়ী-আধো-অন্ধকার এ-ভৌতিক ঘরটায় তোমাকে খুঁয়ে থাকতে দাও মা। মায়ের বুকে এলোপাথারিনাক ঘষে ঘষে শেষমূহুর্তে একটু শক্ত হতে, বুক বাঁধতে চাওয়াI

ওঁরা এলেন। প্রথম সেই অদ্ভূত ভয়ঙ্কর মানুষটা, তার সাঙাৎআশ্রয়দাতা জেলে-বুড়ো। তারপর একজন প্রৌঢ়া নারী-শাদা সেমিজের ওপর লাল রেলপাড় শাদা-শাড়ি, রোগ বিষয় মুখে টিকোল নাক, ভাঙা চােয়াল, কপালে দগদগে সিঁদুর। পেছনে বৃদ্ধ-হাঁটু পর্যন্ত ধুতি, সস্তা কাপড়ের ঢোলা-হাতা পাঞ্জাবি, রুগ্ন, কালো। যেন পৃথিবীতে পাওনার চেয়ে অনেক বেশিদিন বেঁচে থেকে এখন ক্লান্ত।। ওঁরা দরজার চৌকাঠে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে! মৃন্ময়ী মায়ের বুকে মুখ রেখে আড়াচােখে দেখছিল। মা ওরা থুতনি ধরে জোর করে তুলে ধরলেন মুখ। নিজের পিঠ থেকে ওর হাত দুটাে ছাড়িয়ে নিয়ে সরে দাঁড়ালেন একপাশে। সেই অদ্ভুত বিদঘুটে লোকটা হঠাৎ তীব্র টর্চের আলো ফেলল মুখের ওপর, অসভ্যের মতো। চােখ ঝাঝিয়ে উঠল, বুজে, এল, সমস্ত মনপ্রাণ কেন্দ্রীভূত করে স্থির শক্ত হয়ে সোজা হয়ে বসল। মৃন্ময়ী। মনে হলো, এবার সে আস্তে আস্তে সত্যি যেন পট হয়ে উঠছে।--বেহুলার পট। স্থিরস্তব্ধ আধো-অন্ধকার ঘরটায় সবাই অপালক ওর দিকে। ওকেই দেখছে। এ কী, এত স্তব্ধতা কেন? এতটুকু শব্দ নেই কোথাও? বাইরের বাতাসও কী বন্ধ হয়ে গেছে? ইছামতীর স্রোত? জন্মের সুদূর অতীত দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে এত কাছাকাছি যদি, সত্যি যদি মা—বুক ভাঙে না কেন অঝোর ক্ৰন্দনে? একুশ বছর ধরে যে-কান্নাটা বিন্দু বিন্দু জমেছে বুকের গোপনে। অথচ ওর নিজের মধ্যেই কান্নাটা গুমরোতে থাকে। ঠোঁট দুটাে কঁপে, রুদ্ধনিশ্বাসে কান্নাকে চেপে রাখার বেদনায় বুদবুদের শব্দ, চােখের নিচে নাকের দু’পাশের ঢালুতে অসহ্য যন্ত্রণা "

মৃন্ময়ী চােখ খুলল। চমকে উঠল, এক-বিঘাতের মধ্যে লণ্ঠন উচিয়ে-ধরা, একেবারে মুখােমুখি, প্রায় নাকের সঙ্গে নাক ছুঁয়ে আরেক মুখের ছবি-কে ? রক্তের স্রোতে হালকা লাগে। ভরাট বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে-চােখে চােখ, পলক নেই। দর্পণে এ-কার মুখ ? সেই রোগা বিষন্ন মুখ, টিকেল নাক, ভাঙা চােয়াল, কপালে দগদগে সিঁদুর। কিন্তু মুখের আদলে এ-কার প্রতিবিম্ব ? ঠিকুজি-কোষ্ঠী নয়, রক্তের পরীক্ষা নয়, উরুতে জরুড়ের চিহ্ন নয়, সাক্ষ্যপ্রমাণ অনাবশ্যক। রক্তে রক্তে তোলপাড়ে কেঁপে উঠেই শক্ত পাথর হয়ে উঠল। শরীরটা। তীক্ষ্ণতায় হিংস্র দৃষ্টি। মৃন্ময়ী হঠাৎ নির্মম.

ওদিকে থুতনি শুদ্ধ ঠোঁট দুটাে কাঁপছে। ছলছল উপচে উঠছে চোখজোড়া। লণ্ঠন-ধরা-হাত ঠকঠক কাঁপছে। ভেঙে পড়বে এক্ষুনি। কে এসে লণ্ঠনটা নিয়ে গেল হাত থেকে এবং প্রচণ্ড আবেগে কান্নার হিক্কা তুলে সেই রুগ্নশরীর আছড়ে পড়ল। মৃন্ময়ীর গায়ে। মৃন্ময়ীকে দু-হাতে জড়িয়ে কান্না, কারা-একুশ বছরের সঞ্চিত কান্নার হিসেবনিকেশ। এবং সোজা শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে মৃন্ময়ীর মনে হলো, একটা স্নিগ্ধ জলপ্রপাতের নিচে দাঁড়িয়ে আছে সে। কোষে কোষে রক্তশিরায় শীতল প্রবাহ, প্রসন্ন অবগাহন। ঘরে আরো যারা রুদ্ধবাক দাঁড়িয়ে ছিলেন, মৃন্ময়ী তাদের কারও দিকে তাকাতে পারছে না। এমন কি বড়দা নন, মা-ও হঠাৎ-বাতিল। শুধু সেই বৃদ্ধ, অজ্ঞাতকুলশীল, জন্মান্তরের কোন এক মানুষ, যাঁর সঙ্গে চােখে চোখ রেখে অশ্রুপাতের আরো এক নিষ্ঠুরতা এখনও বাকি। অত্যন্ত সন্ত্রস্তভঙ্গিতে এগিয়ে আসছেন বৃদ্ধ, কাঁপতে কাঁপতে, একেবারে গা বেঁধে দাঁড়িয়ে দুটাে কাঁপা-কাঁপা হাতের দীর্ঘ প্রসারেও দ্বিধায় স্তব্ধ। বৃদ্ধ হলেও একজন পুরুষমানুষ এবং একটি মেয়ের শরীর। চােখে চােখ রেখে দাঁড়িয়ে রইলেন। স্থিরপলকের ওপর দিয়ে সময় বইতে থাকে। সেই হাত এসে স্পর্শ পেল মাথায়। মাথা থেকে কাঁপতে কাঁপতে গলাকাধপিঠ ছুয়ে কোমর পর্যন্ত নামল। সারাদেহের রক্তে একটা স্নিগ্ধতার ঢল নামছে, শিহরনে স্থবির মৃন্ময়ী। সে যথার্থই পট হয়ে উঠেছে এবার। বেহুলার পট।

এবং সেই নারী, আশ্লেষ থেকে ওকে মুক্তি দিয়ে যখন ওর বুককোমরহাটু বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে একবারে পায়ের কাছে পড়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন, এবং সেই পুরুষ, বৃদ্ধ, ভর শরীর থেকে হাত তুলে নিয়ে উবু হয়ে সেই নারীকে তুলতে চাইলেন, তখনই নিজের মধ্যে আবার নিজেকে ফিরে পেয়ে মৃন্ময়ী ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল, ডুকরে উঠল অঝোর কান্না-মা তোমার একুশ বছরের আশ্রয়, মা তােমার একুশ বছরের ভালোবাসা, মা আমার একুশ বছরের বিশ্বাস।

কান্নায় শরীর কাঁপছে । স্পষ্ট অনুভব-পিঠে আঁচলের নিচে মায়ের-হাত আদর বুলােচ্ছে। ওপারে কান্না থেমেছে, পেছনে না তাকিয়েও স্পষ্ট বােঝা যায়, হতবাক বিস্ময়ে এপারের দিকে তাকিয়ে আছেন ভুলো মা।

মা বললেন-“প্রণাম কর, ওঁদের প্রণাম কর মিনু.'

সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছেনা মৃন্ময়ী। শুনতে পেল, কাঁপা গলায় কে যেন বলছেন, বৃদ্ধের কন্ঠ-নাম ছিলো পারুল, পারুল রাণী মালাকার, পিতার নাম শ্রী শম্ভুনাথ মালাকার, সাকিন শুভড্ডা, কেরানীগন্জ থানা, ঢাকা সদর, আলিমন গ্রোত্র, রাঢী শ্রেণী।

মৃন্ময়ী শোনে, ঘনিষ্ট নিবিড মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁপে। ওপার থেকে যেন বহুদুর থেকে ভাটিয়ালী—“মাইয়াটারে গােয়ালন্দের ভিড়ে হারাইয়া আর আমরা ভারতের দিকে পা বাড়াই নাই। বাপঠাকুদ্দার ভিটা গেল, একটা মাত্তর বুকের মাইয়া, যদি হেইটাও যায় তবে আমাগাে আর ভারতে কাম নাই। আমরা দুইজনে কান্দতে কান্দতে ফিরা গেলাম…

' মা আবার বললেন-প্ৰণাম কর, ছিঃ প্ৰণাম কর মিনু, প্ৰণাম কর ওঁদের..."

মৃন্ময়ী শক্ত হলো। সোজা শিরদাঁড়ায় দাঁড়াবার পর স্তম্ভিত বিস্ময়-ঘরের চৌকাঠ ডিঙিয়ে বাইরের অন্ধকারে মিশে যাচ্ছেন ওঁরা। শুধু শেষবারের মতাে একবার, লণ্ঠন আলোর প্রান্ত রেখায় নারীমূর্তিকে আবছা দেখা গেল। তারপরই অন্ধকাের.অন্ধকার আর দূরাগত বৃদ্ধের কণ্ঠস্বরে কম্পিত বায়ুমণ্ডল-পারুল রানী মালাকার, পিতা শ্ৰীশম্ভুনাথ মালাকার, সাকিন শুভাড্ডা, কেরানিগঞ্জ থানা, ঢাকা সদর, গোত্র আলিমন, রাঢ়ী শ্রেণী:.

লন্ঠনের লালচে-আলোর চারপাশে কিলবিল উড়ে বেড়াচ্ছে কতগুলি বিচ্ছিরি পােকা। প্রায়ান্ধকারে আবার সেই নীরবতা। তিনটি আপন-হৃদয় স্তব্ধবাক, তিনজনের ওপর দিয়ে সময় গড়িয়ে যায়, ইতিহাসের সময়। মা তক্তপোশে গিয়ে শুলেন। একইভাবে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন বড়দা। ইছামতী বইছে। ওপারে আলোটা জ্বলছে। জ্বলবে সারারাত।

ক্লান্ত শরীর টেনে মৃন্ময়ী বড়দার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। মধ্যরাতের অন্ধকারে পথ খুঁজে খুঁজে কারা এগিয়ে যাচ্ছে ইছামতীর দিকে? কালো জমাট বাঁধা অন্ধকারে মাঝে মাঝে টর্চ জ্বলে উঠছে, দূরে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে, জানালা থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। গায়ে কালো চাদর ঢেকে অন্ধকারে ওরা ওপারে চলে যাবে, ওপারের আলোটার দিকে। মৃন্ময়ী তাকিয়ে থাকে। ওরা কারা? চোখ বুজে একাগ্রভাবে নিজের রক্তের অণুতে পরমাণুতে নিজেকে হাতড়ায়। শ্ৰীশম্ভুনাথ মালাকার। একটা অন্ধকারের নাম, হদিশ পায়না কিছু। শুভাড্ডা গ্রাম, কেরানিগঞ্জ থানা, ঢাকা সদর!!! পৃথিবীর কোথায় সে-দেশ ? কতদূর ? এই ফাটলটার ওপারে কোথায় তোমরা যাচ্ছে শ্ৰীশম্ভুনাথ-মালাকার? পারুল নামে কে-এক কন্যা ছিল তোমাদের। জন্ম দিয়েছিলে! কোথায় তাকে ভাসান দিলে গো। কোন গাঙুরের জলে ?

হঠাৎ একটা হাত এসে পড়ল কাঁধে। মৃন্ময়ী বড়দার বুকে মাথা রেখে স্থবির হয়ে যায়। নিরাপদ আশ্রয় আর বিশ্বাসের মাটি। চোখ বুজে আসছে, ঘুম। মনে হলো, স্বপ্নের মধ্যে কে যেন পরম আদরে ভালোবাসার চামর বুলোচ্ছে সর্বাঙ্গে ওর, যেন স্বপ্নের মধ্যে কার কণ্ঠস্বর-“কাঁদিস নে, কাঁদিসনে মিনু। এরপরও তো বাঁচতে হবে আমাদের। দেখ, দেখ মিনু, ইছামতীর জলে জ্যোৎস্নার আলো। কী আশ্চর্য সুন্দর হতে পারে একটা নদী! যার এপারটা সত্যি, ওপারটাও মিথ্যে নয়। আমরা এই ফাটলটার কাছে ফিরে ফিরে আসব বারবার। আমরা সবাই, তোর সঙ্গে এই ফাটলটার কাছে। শুধু তোর একার জন্যে নয়, আমাদের সকলের জন্যে। আমাদের নিজেদেরই পরিচয়টা জানতে।

ইছামতীর জলে তখন মধ্যরাতের চাঁদ উঠছে। মৃন্ময়ীর ক্লান্ত শরীরে ঘুম।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন