বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর, ২০১৬

হেলাল মহিদীন'এর গল্প : দ্যা ল্যুম্পেন ম্যানিফ্যাস্তো

পেপার-কাগজওয়ালারা ভীড়ভাট্টার এই লোকগুলোকেই “উম্মত্ত জনতা” নাম দিয়েছে। খ্যাপা পাবলিক আগুনই লাগিয়ে দিল গাড়িটায়? অ্যাত রাগ? অ্যাত তেজ? বড়লোকের গাড়ি ভাংগতে পারলে উম্মত্ত জনতার পায়খানা-পেশাব ঘুমনিদ ভালো হয় বোধ হয়! জ্বলন্ত গাড়িটার ভেতরে পুড়তে থাকা আজকের কাগজেও একটি খবর ছিল ‘উম্মত্ত জনতার গণপিটুনিতে পকেটমারের মৃত্যু’। গণপিটুনি খাবার আগমুহূর্ত পর্যন্ত ছানোয়ার নিজেও বিশ্বাস করত মেরে ফেলাটাই সেরা কাজ, একদম খাশা কাজের কাজ পবলিকের। শালাদের গণপিটুনিতে না মারলে দেশের ক্ষতি। আইন-আদালত-পুলিশতো শালাদের পকেটে। এই দেশে কার সাধ্য চোরের বিচার করে, শাস্তি দেয়। পুলিশে দেয়া মানে তো বেহস্তের পাসপোর্ট-টিকেট দিয়ে দেওয়া। পুলিশওয়ালাদের ব্যবসা মোটাতাজা করে দেওয়া!


ছানোয়ারের হাল্কা-আবছা ছায়াছায়া মনে পড়া শুরু হয়েছে গ্রামের ফাঁকা সুনসান রাস্তায় ধুলাবালি উড়িয়ে সাঁইসাঁই করে চালাচ্ছিল গাড়িটি। এক বোকাচোদা ভুতের মত আঁতকা গাড়ির সামনে লাফ দিয়ে পড়েছিল। হার্ডব্রেক আর স্টিয়ারিংযের বাঁহাতি মোচড়ে গাড়িটি ঘুড্ডি কাটাকাটির কান্নিগোত্তা খাওয়ার মত বামপাশের খানাখন্দে পড়েছিল। ইউনিয়ন বোর্ডের রাস্তার ডান পাশে ঝোপঝাড় ভর্তি। সেগুলোর ভিতর হতেই পাগলমত লোকটা ভোজবাজির মত পলকে গাড়ির সামনে পড়েছিল। বাম পাশটিতে একের পর এক কাটাকুটা খানাখন্দ। নতুন পুকুর নতুন ডোবা। পাগলটিকে বাঁচাতেইতো অমন ক্কচাত মোচড় দেয়া! বেয়াক্কেলটা কি তারপরেও মরেই গেল?

ভীড়ের খ্যাপা মানুষের দলে কতজন আছে? একশ’? পাঁচশ? শ’য়েশ’য়ে? হাজারে-হাজার? অগনিত? অথচ কি আশ্চর্য! গ্রামের রাস্তা ধরে গাড়িটা চলার সময় আশেপাশে কোন মানুষেরই দেখা মেলেনি। মনে হচ্ছিল ভূতের গ্রাম। মানুষটানুষ থাকেনা। কয়েকটি বড়সড় ইটের ভাটা, চিমনি, সার বাঁধা কাঁচা ইট পোড়া ইট মিলিয়ে ভিন্ন চেহারার এক গ্রাম। রাস্তার পাশের কাটা পুকুর খানাখন্দের সব ক’টিতেই সাইনবোর্ড লাগানো ‘অমুক ফিশারিজ’, ‘তমুক পোল্ট্রি’ ‘সমূক নার্সারি’, ‘সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ’, অর্থায়নে ‘তমূক ব্যাঙ্ক’। পানির অভাবে সেগুলোকে ল্যাংটা ল্যাংটা লাগছিল। কাটাকাটির নমুনাসমূনা বলে দিচ্ছিল মাটি বিক্রি হয়ে ইটভাটায় গেছে।

টাকাটাকা টাকাটাকা গন্ধ চারপাশে। ছানোয়ারের মনে পড়ছিল উনিশ-কুড়ি বছর বয়সেই সে নেতা হয়ে উঠেছিল গ্রামময়। লোকজনকে নিয়ে এক বড়লোকের ইটভাটা বসানোর চেষ্টা, ফিশারিজ এর জন্য ফসলি জমি কিনে নেবার চেষ্টা ভন্ডুল করে দিয়েছিল। তার তখন সে কি তেজ! তিনবার মেট্রিক ফেল করে পড়াশোনা দরকারি নয় সমাজ পরিবর্তন দরকার ভেবে বিপ্লবী দলে যোগও দিয়েছিল। গাড়ি চালানোর সময় সে’সব দিনদৃশ্য সিনেমার মত চোখের পর্দায় ভেসে উঠায় ভাবছিল গাঁও-গেরামের লোকে ক্ষেতফসলি শাক-সব্জি ছেড়ে খালি টাকাই খায় নাকি? নইলে সাইনবোর্ড বাদ দিলে মাঠের পর মাঠ ধূ ধূ বিরাণভূমি কেন? ফিশারি, পোল্ট্রি, নার্সারি হলেই বা কি সেসব তো শহুরে ধনিদের পেট ভরাতেই চলে যাবে। গরু-ছাগলও তেমন একটা দেখা যায়নি। এমন জনমানব-পশুপাখিহীন গ্রামের ঝোঁপে কেউ লাফ দেবার জন্য ওঁত পেতে থাকে ভাবাও দুঃসাধ্য।

হ্যান্ড মাইকে ঘোষণা শোনা গেল— বড় ভাই আর ওসি স্যারের ওয়ার্নিং খবদ্দার কেউ আসামীর গা’য় হাত দিবানা। বহুত বড়লোকের পোলা। গ্যাঞ্জাম ঘাপলা হবে। মাইকের পেছনে ঘোষকটি বশির মেম্বার, জনতার ফিসফাসে জানা গেল। একজন ঘুরেঘুরে বলে চলছে— বড়লোকের পোলার গায়ে হাত তুলছ, মন্ত্রী এমপির পোলা অইলে বুঝবা কিন্তু বুইঝো! মাইর-ধইর যা করছ করছ আর করলে পুরা গেরামে আগুন জ্বলবে, কোমরে দড়ি, হাজত। সাবধান! কেউ কেউ সমস্বরে তালও মেলাচ্ছে। জানা গেল এই যুবকের নাম জামাইল্যা। বড় ভাই’র পরে পার্টির উঠতি যুবনেতা। জামাইল্যা বলতেই থাকে—গাড়ি পোড়াইছ, আর কিছু কর আর না কর তোমাগো খবর আছেই! মিনিমিনে কৈফিয়তি গলায় কেউ একজন বল্ল— গাড়িত আগুন নিজেনিজে লাগছে, কেউ লাগায় নাই! এরই মাঝেও জনতার ভিতর হতে নেতাফেতা ধরণের ঘাউড়া টাইপ কেউ একজন বাজখাঁই গলায় উলটা আগুন ঝাড়ল—ধান্দাবাজি রাখো মেম্বার। গেরামের পোলার গা’য় গাড়ি তুলছে নবাব সলিমুল্লাহর পোলা অইলেও অরে এইহানেই গোর কব্বর দিমু।

মারধোর খেয়ে মরোমরো শরীর, ঘিলু-মগজ কিন্তু ভালোই চালু আছে ছানোয়ারের। ভাবছিল ইনি আবার কোন নায়ক? নাকি ভিলেন? সঙ্গে সমর্থক সাংগপাংগ মিলিয়ে দলটি বেশ বড়সড়ই হবে মনে হয়। গলার স্বরে তো মনে হচ্ছে সত্যিসত্যিই নিজ হাতে খুন করে তারপরই ঘরে ফিরবে সে! বশির মেম্বার খেপে ওঠে— ছাল নাই কুত্তার বাঘা নাম। জুট মিলের শ্রমিক নেতা আছিলা জুট মিলে গিয়া দুনিয়ার মজদুর ঝাড়ো। তা জুট মিলেত্তেতো লাইত্তাইয়া বাইর করছে, চাকরিও হারাইছ। এই গেরাম জুট মিল না। জামাইল্যার কন্ঠও কানে আসে— বালের বিপ্লবী, এলাকার লোকজনরে সব কিছুতেই খ্যাপায়া তুলতেছে। বড় ভাই সব সময় কয় ভ্যাজাইল্যা কাদিরা। হালায় সব যায়গায় বিপ্লব মারায়, হাউকাউ গ্যাঞ্জাম আর কিছু না দুই-চাইরটা নোট-ফোট, কিছু দানাপানির ধান্দা। বশির মেম্বার সায় দেয়— হ! বড় ভাই, তুই জামাইল্যা, আমি বশিইর‍্যা আমরা কে কম বিপ্লবী আছিলাম? কম আন্দোলন-সংগ্রাম, কম নেতাগিরি করছি?

বশির মেম্বার হ্যান্ডমাইকে শুদ্ধ ভাষায় ঘোষণা দ্যায়—এইটা পুলিশের মামলা। ভেজাইল্যা কাদিরার কথায় কেউ বিভ্রান্ত হবেন না ভাইসব। তখনই চারপাশে ‘আসসালামু আলাইকুম’ শব্দ। ছানোয়ার যা অনুমান করে তাই-ই। বশির মেম্বারের আকুতি আগত ব্যাক্তিটির কাছে— ইমাম সা’ব ভ্যাজাইল্যারের একটু বুঝান! পুলিশ আসতেছে।

ভ্যাজাইল্যা কাদিরা হুজুরকে তেমন পাত্তা দেয়না মনে হচ্ছে। গলা সপ্তমে চড়িয়ে চেঁচায়— পুলিশের মায়রে বাপ! পুলিশ হ্যাত্তে লাখ-কুটি ট্যাহা খাইব। সরেন ত’ ইমাম সাব। যেইডা বুজেন না হেইডা নিয়া শালিশে আপনার কাম নাই। এই বড়লোক শুয়ারের বাইচ্চারা গেরামে একখান ধানিজমি খ্যাত-ফসলির মাডি রাখছে? সব কিইন্যা-কুইন্যা নিবার নাম দিয়া দখল কইর‍্যা রাখছে; কাউরে পাওনা ট্যাহাপইসাটাও দ্যায় নাই ঠিকমত। ইটভাটা বানাইছে, পোল্ট্রি, নার্সারি, মাছ চাষের নাম দিয়া পুরা গেরামরে খানাখন্দক দোজখ কব্বর বানাইয়া রাখছে! হেই খবর আছে আপনের? চাষ-কামলা-কামারি-খ্যাতগিরস্থি নাই, ঘরে খানাদানা নাই। গেরামের বৌ-ঝি-পোলা মাইয়া কি গারমেনের কাম আর ঝি চাকরবাকরের কাম দিয়া খালি প্যাটখান চালাইবার লাইগাই জন্ম নিছেনি? আগে গেরামে বছরে কয়খান গাড়ি ঢুকত? এখন দিনে ষাইট-সত্তরটা দেখি। জমির দালাল, জমি কিনইন্যা, মাছ ফলাইন্যা, বাল ফালাইন্যা, চোর-ডাকাইত এইজন সেইজন কত্তকত্ত পদের সা’ব-সুবা পইসাওয়ালা”।

ভ্যাজাইল্যা কাদিরার তেজ আছে বটে! ভাষনের তালে তালে জনতা ক্ষেপে উঠেছে— “এইহানেই কব্বর দ্যাও বাইঞ্চোতরে!”

“বান্দির পোলারা গাড়ি নিয়া গেরামে আইতে আইতে রাস্তাডারে কি বানাইছে দ্যাখছেন আপ্নেরা?”

“গত ছয় মাসে পোলামাইয়ারে একটা মাছ খাওয়াইতে পারি নাই। বেড়জালের মাছটাও বাজারে উডার আগেই চাইর-পাঁচ ডবল দাম দিয়া কিইন্যা নেয় হালার পোলারা!”

“খালি কি এই? সারা গেরামে এক কুড়ি ফল-ফলারির গাছও আর নাই। সবইতো ইটভাটার প্যাডে গ্যাছে!”


কানে আসে ঝাঁকের মানুষের, ঝোঁকের মানুষের একথা সেকথা নানা কথা—

“মুইতা ফালাইছে ত!”

“ দ্যাখ, সাবধান, হাগুটাগু য্যান না কইর‍্যা দ্যায় আবার!”

“হালার পোলা হালা মরার ভংভেচকি ধরে নাইতো?”

“না না! ট্যাহাপইসাওয়ালা হারামজাদাগো কচ্ছপের জান! দুই-চাইট্টা লাত্তিগুতায় মরেনা!”

“নাম কি হালার পোলার? নায়কের চেহারাসুরত!”

‘পকেটের ভিজিটিং কার্ডে লেখা শাহ শাহমির শাহ। বাইঞ্চোতের মুখে প্যাটে পাছায় খালি শাহ আর শাহ। শাহেনশাহ শাহজাদা শাহ শাহ শাহ”।

“ও, শাহমির শাহ? চিনছি ত! ফিলিম লাইনে নতুন। শাহরুখ এর শাহ আর আমির এর মির নিয়া শাহমির।


‘বড়লোকের পোলা’ ওরফে ‘শাহমির’ শরীরের সকল শক্তি জড়ো করে সবাইকে জানাতে চায়— ‘আমার নাম ছানোয়ার। ছানোয়ার ড্রাইভার। ব্যবসায়ী আজিজ খান পোডিউসারের ড্রাইভার। পাঁচ বছর আগে গেরামে সিনেমার শুটিং এ আসছিল। আমার লম্বা-চওড়া নায়কের মত চেহারা দেইখা নায়ক বানাইব বইলা শহরে নিয়া গেছিল। ড্রাইভারি শিখার, থাওন-খাওনের মোউজমাস্তি করনের সব খরচ দেয়। বিনিময়ে আমিও হের কাজাকাম ড্রাইভারি সেক্রেটারিগিরি করি। আমি বড়লোকের পোলাও না! গাড়িও আমার নয়। বাপের নাম হোসেন মিয়া! আবাংগাল। গণ্ডমুরুক্ষ! খেতগিরস্থি করে আর তাবলিগ করে। আমি ছানোয়ার, আমারে বাঁচান। আপনাদের পায়ে পড়ি আমারে পুলিশে দ্যান। অ্যম্বুলেন্স ডাকেন। আমার মালিকরে খবর দ্যান। সে হাজার কোটি টাকার মালিক। আমারে নিজের ছেলের চেয়ে বেশি আদর করে। আমারে বাঁচান, আমার মালিক লাখ টাকা পুরস্কার দিবে। ছানোয়ার আরজ গুজার থামায়না। কিন্তু নিজেই টের পায় চিৎকারের প্রতিধ্বনি খুলির ভিতর মগজের ডান-বাম-পূব-পশ্চিমেই ঘুরেফিরে আটকা। লোলমাখা ঘর্ঘর ফসফস ফিসফিসানি ছাড়া বোধগম্য কোনো শব্দ তৈরি হয়না। তাই কেউ শুনতেও পায়না।

হুট করেই হুশিয়ারি নামে ছানোয়ারের ব্যাথা-টনটন মাথায়। তাইতো! ছানোয়ার জানোয়ার নামটা যা ইচ্ছা হোক আপাতত শাহমির শাহ নাম আর ‘বড়লোকের পোলা’ নাম-পরিচয়ই তো প্রাণভোমরা। এই নাম-পরিচয়ে খামট আছে, বাঁচার তবক-তালুক আছে। বড়লোকের পোলার গায়ে ফুলের টোকা দেয় এমন মানুষ বাংলাদেশে এখন আর পয়দা হয়না! ছানোয়ার আল্লাকে ডাকে— ইয়া মাবুদ, বেয়াদ্দবি মাফ দিও, বড়লোকের পোলা শাহমির বানাইতে পারাওতো তোমারই কেরামতি, মা’বুদ! তুমি আরেকটু বাঁচাইয়া রাখ মা’বুদ! শাহমির-এর নামে শিন্নি দিব, গরিব-দুস্থরে দুই বেলা ফ্রি-তে খাওয়াব।

গাড়িটার দাউদাউ আগুন, মটমট শব্দ দুটোই সমানে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। গাড়ীটা ফাটবে-ফুটবে নাতো? বিস্ফোরণটি হলে কিরকম হ’তে পারে? সিনেমায় যে’রকম হয় সেরকমের? শুন্যে উড়া টুকরা টুকরা খন্ড কাগজের মত উড়বে কি?

তওবা তওবা! মরার সময়ও সিনেমা-টিনেমা মনে আসে কেন? কলেমা জপে শাহমির শাহ। পাঁচ কলেমার একটাই খালি মনে আছে, কলেমা তৈয়্যব। আর একটাও মনে আসছে না কেন? শয়তানের কাজ। শরীরে মাথায় টনটন যন্ত্রণা বাড়ছে। বকের পালকের মত হাল্কা শরীর গোত্তা খেয়ে খেয়ে আসমানে উঠে যাচ্ছে বুঝি পরোয়ারদিগারের কাছে! ছানোয়ার নিয়ত-মানত করে—ও আল্লা এইবারের মত বাঁচাও, শিন্নি দিব, তিন গেরামের গরীব-ভুখারে জেয়াফত খাওয়াব, আজিজ ভাইরে খোদা হাফেজ বাইবাই টাটা দিয়া গেরামে ফিরব, বাপের যে এক দেড় পাখি জমিজমা আছে সেইগুলায় চাষবাস করে খাব, নষ্ট মাইয়ালোক ফারিয়া-মারিয়ার নাম-চেহারাও মনে রাখব না, বেশ্যার দালালি বন্ধ, হজ্জ করব, বাপের লগে তাব্লিগে যাব। ও আল্লা আমার মাত্র পঁচিশ বছর বয়স, বেয়াদ্দবি মাফ দিও মাওলা পরোয়ারদিগার, এখনো বিয়াশাদি করি নাই, সহি বিয়াশাদি করব, বিবিরে নেকনজরে রাখব, বাইচ্চাকাইচ্চারে দীনদার পরহেজগার বানাব, মক্তবে মদ্রাসায় তোমার খেদমতে দিব। আরো পঞ্চাশ-ষাইটটা বছর বাঁচতে চাইলে কি খুব বেয়াদ্দবি হবে, ইয়া রহমানুর রহিম?

নিবুড়া নিবুড়া নিবুড়া। টেলিফোনের রিংটোন। বশির মেম্বার ফোন ধরে বলতে থাকে—“সেলামালাইকুম ওসি সাব! আরে ধুর, আমরা আছিনা! আপনে চা-পানি খাইয়া আস্তেধীরে দুই-চাইর ঘণ্টা পরে আসেন। আমরা সামলামুনে! কেউ অ’র গায় ফুলের টোকাও দিবার পারবনা কইলাম। হ্যালো, হ্যাঁ। বড় ভাই আইসা পড়বে পাঁচ-সাত মিনিটে! আপনের লগে বুঝবাঝ হ্যার পর অইবনে!”

মাথার কাছে একটি প্রাইভেট কার এসে থামে। জনতার কিচিরমিচির জানান দিচ্ছে ইনিই পার্টির সভাপতি বড় ভাই। ছানোয়ার টের পায় কয়েকজন পাঁজাকোলা করে তাকে একটি রিক্সাভ্যানের চাতালে শুইয়ে দিয়েছে। রিক্সাভ্যান হলেও চাতালে নরম বিছানা বসানো। ফোম সম্ভবত। নইলে উঁচুনীচু চষা রাস্তায় রিক্সাভ্যানের এলেবেলে খটখটানিতে গা-গতরের ব্যথায় জান বের হয়ে যেত এতক্ষণে। ভ্যানের চারপাশে দুরাগত শব্দের মত অস্ফুট আধফোটা কথাবার্তা কান খাড়া করে শোনে ছানোয়ার। ডাক্তার, কম্পাউন্ডার, নার্স, স্যালাইন, ব্যান্ডেজ, গজ-ফিতা, ডেটল ফিনাইল সব কিছুরই ভালোই আয়োজন-অস্তিত্ব টের পাওয়া যাচ্ছে। বড় ভাই কাকে যেন বলছে আধ ঘন্টার মধ্যে শহর হ’তে অক্সিজেন চলে আসবে। আরো বলছে ইউনিয়ন পরিষদ অফিসের ভেতরেই ফাইভ-স্টার হোটেলের মত সিট ফেলা হয়েছে। বলছে ওটাই একমাত্র নিরাপদ যায়গা। পাহারার লোক আছে। বাইরে যেখানেই রাখা হোক উন্মত্ত জনতা পিটিয়েই মেরে ফেলবে নায়ক শাহমির শাহকে। বাইরে অনেকের সংগে বুঝবাঝের ব্যাপার আছে। বুঝবাঝে মিললে, অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হলে, হাসপাতালে পাঠাতে হ’লে—পাঠানো হবে অসুবিধা নাই। আল্লা মহামহিমের দয়ার উপর ছানোয়ারের ভরসা পোক্ত হয়। বড় ভাইয়ের লোকজনকে আল্লার পাঠানো ফেরেশতা বোধ হয়!

ছানোয়ারকে ফাইভ-স্টার বিছানায় নামানো হয়েছে। বড় ভাইয়ের গলা শোনা যায়—“বশির মেম্বার বাদে আপনারা আর সবাই আল্লার ওয়াস্তে দয়া করে পাঁচ-দশটা মিনিট বাইরে থাকেন। জামাইল্যা তুই ইমাম সা’বসহ বাইরে পাবলিক ঠেকা। টাইম মত ডাক দিব নে।”

কানের খুব কাছে বাসা বড় ভাই-মেম্বারের ফিশফিশানি শোনে ছানোয়ার—

-- বাঁইচা আছে?

-- জ্বে, বড় ভাই। হাড্ডিগুড্ডিও তেমন ভাঙ্গে নাই লাগতেছে।

-- হুঁশ?

-- না। একদম মরার মত। হুঁশ নাই।

-- মনোযোগ দিয়া আমার সব কথা শুন।

বশিরের কানে ফিশফিশায় বড় ভাই। ছানোয়ারের কানের শক্তি যেন এক লাফে লাখো গুন বেড়ে গেছে। বড় ভাই’র ফিশফিশানিও পষ্ট-পরিস্কার শুনতে পায় সে—“কামের কাম করছস অ্যাক্সিডেন্টের লগে লগে ওর পকেটের জিনিষপত্র আমার কাছে পাঠায়া দিছস। লাখ টাকা দামি ফোন। চাইর-পাঁচরকম লক। বাজারের মোবাইল রকিব্যা ত’ ফাটাফাটি এক্সপার্ট! লক-পাসোয়ার্ড সব দশ মিনিটের মইদ্যে কাটাইয়া কুটাইয়া ফালাইছে। সিম ব্যাটারি মেমোরি কার্ড সব খুইলা ফালাইছি। ফোনের কভার জ্যাকেটে আরো দুইডা আলগা সিম পাইছি। শ’য়ে শ’য়ে নামীদামী কোটিপতি লোকের নামধাম টেলিফোন নম্বর লেখা”।

--আইচ্ছা!

--ভিতরে ব্যাডা-বেডির আকাম-কুকামের ছবি ভিডিও, ন্যাংটাম্যাঙটা, বিদেশি না দেশিটেশি...ওয়াক থু’...

--কন কি?

--খুব বেশি না, এই ধর দশ-বারোটা...

--আইচ্ছা!

--এই দশ-বারোটা ছাড়া আরো ছত্তিরিশটা ছবি আছে, আমার ইউনিয়নের এক মাইয়ার।

--কন কি?

- হ, পাশের গেরাম বাইল্যাডাংগার ইসমাইল মাস্টারের মাইয়ার।

- ক্যাম্নে? ও আল্লা, এইটা ক্যাম্নে সম্ভব?

ছানোয়ারের শোনার ক্ষমতা যেন আরো লাখ গুন বেড়ে যায়। সব গোমরই ফাঁস হয়ে গেছে তাহলে? সর্বনাশ হয়েছে! বড় ভাই’র গলায় দরদ-গদগদ আওয়াজ—ইসমাইল মাস্টারের মাইয়ার ছবি ল্যাংটা-ম্যাংটা না! কাছরা-ময়লা না! সোন্দর সোন্দর কাপড়চোপড়ে হুরপরির মত ছবি! মাইয়াটা মাশাআল্লাহ দারুণ সুন্দরি। কলেজ শ্যাষ, ঢাকায় গিয়া নাকি ভার্সিটিতে পড়বে, মডেলিং শখ, ইন্টার দিয়া ঢাকায় গিয়া অডিশন-ফটোসেশন কীসব দিয়াটিয়াও আসছিল কোন এক কোম্পানীর জন্য। সেইসব ছবিছাবা আর কি!

-অ্যাত্তসব আপনে জানলেন ক্যামনে?

-ওই বাড়ি হইয়াই সোজা এইখানে আইলাম। ছবি দেইখ্যা লগেলগে মাস্টারের বাড়িতে গেলাম। মাইয়াটা সাইজাগুইজা অপেক্ষা করতেছিল উঠতি নায়ক শাহমির ভাই আসবে, তাকে রেকর্ডিং-এ নিয়া যাবে! আহাহারে। নিষ্পাপ, নিরীহ, কি সহজ-সরল মায়াবি সিধাগাধা একটা মাইয়্যা! এই কুত্তার বাইচ্চা জানোয়ারের বাইচ্চারা... আহাহারে কত্তকত্ত সহজ-সরল মাইয়্যাগো জীবন যে...! মাইয়্যাটারে, মাইয়্যার বাপ-মায়েরে বইলা আসছি দুনিয়ার আর কোনো কাক-পক্ষিও য্যানো আগেপিছে এইসবের কিচ্ছু না জানে! একদম হজম! আফটার অল মাইয়ামানুষ! ভবিষ্যত আছে না? বইনের ইজ্জত বাপ-মা’র ইজ্জত আমরা এলাকার ছেলেরা না রাখলে কে রাখবে! ওর বাপ-মা’রে বলছি ঢাকায় পড়লে পড়বে, ছুডো বইনের নিরাপত্তার, দেখাশোনার হান্ডেড পাচ্ছেন্ট দায়-দায়িত্ব আমাদের। অ’র বাপ-মা’য়তো পারলে আমারে মাথায় তুইলা রাখে!

ছানোয়ারের সবগুলো ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠে। বড় ভাই’র দরদের ধরণটির সঙ্গে তার পরিচয় আছে। শরীরময় ব্যাথা চেপে রেখে বেহঁশ ভঙ্গিতে মরা মানুষ সেজে কান খাড়া করে রাখে ছানোয়ার। বড় ভাই বলে চলে—

-মনোযোগ দিয়া শোন। ফোনটোনসহ জিনিষপাতি সব আসল মালিকরে ফেরত দিয়া আসতে হবে। আমানতের খেয়ানত গুনাহর কাজ। তুই সোনাদানা, চেইন, আংটি, ক্রেডিট কার্ড, মানিব্যাগের মালটাল আর কিছু পাস নাই? আসল মালিক, এই ড্রাইভারের বাচ্চার মালিক, কংকর-নুড়ি গোটাগাটি সব ফেরত চায়।

-- আল্লার কিরা, খোদার কসম চেইন আংটি কিছু পাই নাই! ট্যাহাপয়সাও আগেই কেউ সরায়্যা ফালাইছে।

--ঠিক ত?

--আল্লার কির‍্যা!

--মনে কষ্ট নিস না। তুই, আমি, এই ড্রাইভার, হেই ব্যাডা মালিক, ভেজাইল্যা কাদিরা, চিটার আজগইর‍্যা সব বাইঞ্চোতইতো আসলে লুম্পেনের বাইচ্চা? শুরু করি বিপ্লব কইর‍্যা ফালাব, সমাজ বলাইয়া ফালামু বইল্যা, তারপর আর কথার-কামের ঠিক নাই! ট্যাহা-পইসার খোঁজ পাইলে বৌ-ঝি-বইনরেও বেইচা ফালাই। মরিও য্যামনে ত্যামনে, রাস্তাঘাটে। চিটার আজগইর‍্যার মত!

--চিটার আজগইর‍্যার মত মানে? চিটার আজগইর‍্যার তো খালি চোট লাগছে! মরেতো নাই!

--মরছে, তখন মরে নাই, আমি ব্যবস্থা করছি। হসপিটালে মাইর‍্যা ফালানোর লোকেরাই মারছে!

--ক’ন কি?

--চিটার আজগইর‍্যারে বুঝাইয়া বাঝাইয়া নিয়া আসছিলাম আমার কামে লাগামু এইজন্য। তারপর অ্যাতশত বুঝানোর পরও হালার পুতে আগের অভ্যাস ছাড়ে নাই। আমার অজান্তে চুপেচাপে আগের মত আবার গ্যাং পাকাইছে। বড়লোকগো গাড়ির সামনে লাফ দিত। হের গ্যাং আইসা গাড়ির লোকজনরে মাইরধর করত, আরেকজন শালিশ-খেলোয়াড় আইসা টাকা-পয়সা সব নিয়া, চিকিতসার খরচ নিবার নাম নিয়া মীমাংসার অ্যাক্টিং করত। আগে কোনো দিন নিজের এলাকায় করে নাই, তবে সারা দেশের বহুত যায়গা-যাগায় এই আকাম দিয়া ধুমায়া কামাইছে। হালায় আছিল রেলের সিগন্যালম্যান, হইল সমাজ পরিবর্তনের লাঠিয়াল জনদরদী বিপ্লবী রেল শ্রমিক নেতা, তার থেইকা রেল ডাকাইত। কিন্তু ঠিকমত সিস্টেম করতে না পারায় গেল চাকরি। ধরল এই ব্ল্যাকমেইলিং ব্যবসা। যাই হোক, পুরানা ট্রেইনিং আইজ আর লোকাল খেলায় কামে লাগে নাই, নিজেও চোট খাইছে্, প্যাঁচও লাগাইছে। ওর প্যাটে কিছু কথা আছে, বাঁইচা থাকলে আমি তুই সবাইরেই মরতে অইত! সাম্বাদিক-পুলিশের যুগ-জমানা। কারে কি কইতে কি কইত, রিস্ক নিলাম না।

বলাকওয়া নেই হঠাত আবারো সেই নেতার নেতৃত্বে জনতার গর্জন সাইক্লোনের বাতাসের মত ফুঁসে উঠেছে। অফিসঘরের বাইরে হাংগামা তেজি হচ্ছে। উন্মত্ত জনতা বোধ হয় মাত্রই জেনেছে চিটার আজগইর‍্যা আর জীবিত নাই। আইন হাতে নিতে হয় তুলে নিবে তবুও জনতা শাহমিরের লাশ চায়। ভেজাইল্যা কাদিরা গলার রগ ফুলিয়ে শুদ্ধ উচ্চারণে বইয়ের ভাষায় মহাবিপ্লবীর ভঙ্গিতে ভাষণ দিচ্ছে—— এই নষ্ট সমাজ ভাঙ্গার জন্য, শোষণ-বঞ্চনা-নিপীড়নের শিকড় উপড়ে ফেলার জন্য দরকার হয় একটা শ্রেণীশত্রু র জান যাবে, কিন্তু হাজার হাজার নিপীড়িত-নিষ্পেষিত গ্রামবাসীর জীবন বাঁচবে, প্রিয় গ্রামবাসী কমরেডগণ... ভ্যাজাইল্যা কাদিরার চিৎকারসর্স্ব ভাষণও তলিয়ে যেতে থাকে ‘আজগর ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দিবনা’ শ্লোগানের গগনবিদারী আওয়াজের ভিতর।

--ভয় লাগতেছে বড় ভাই।

--ভয় পাইলে চলে বশির? শোন, ড্রাইভার শালার বড় বাপ আজিজ খানের কাছে যাবি, জিনিশগুলা বুঝায়া দিবি। বিনিময়ে দশ লাখ টাকা ক্যাশ গুইনা বুইঝা নিয়া আসবি। কুড়ি লাখ চাইছিলাম। হালা বিরাট ত্যাঁদড়। খানিক পরে একটা ইয়োলো ক্যাব আসবে। তিনজন পালোয়ান বসা থাকবে। তোরে গার্ড দিয়া নিয়া যাবে গার্ড দিয়া ফিরায়া নিয়া আসবে। এই ল’ দুইটা নতুন ফোন দুইটা নতুন সিম। এই দুইটা নাম্বার ল্যাখ। হেই লোকেরও নতুন ফোন নতুন সিম। খুব ভালোমত মনে রাখ হেই ব্যাডার একেক ফোনে খা্লি একবার কইরাই ফোন দিতে পারবি। ঠিকাছে? আমি ফোনের অপেক্ষায় আছি। অ্যম্বুলেন্স আসবে না কি আজরাইল আসবে সেই ফোনে জানব।

ছানোয়ার প্রাণপন আল্লাকে ডাকে। রিং আসুক, অ্যাম্বুলেন্স আসুক। ইয়া আল্লাহ রিং পাঠাও অ্যাম্বুলেন্স পাঠাও।

কাংখিত রিংটি আসে। দূরে গিয়ে বড় ভাই আলাপ সারে মিনিট তিনেক। প্রতীক্ষার তিন মিনিটকেই ছানোয়ারের মনে হয় তিন হাজার বছর। বড় ভাই বশির মেম্বারকে ফিশফিশিয়ে বলে--কেইস প্যাঁচ খাইছে। ফকিন্নির বাইচ্চাটারে ফালাইয়া দিতে কইছে। জানতে চাইল ক্রসফায়ার করা যায় কিনা! বললাম সময় লাগবে, আশি নব্বই লাখ টাকা লাগবে, এরে হাটাহাটি করার মত সুস্থ হ’তে হবে, তারচে’ বরং এক্ষুণি গণপিটুনিতে মাইরা ফেলানোর ব্যবস্থা রেডিই আছে। আরো দশ লাখ চাইলাম, পাঁচ লাখে রাজি অইল। যাবি, পনের লাখ বুইঝা নিয়া আসবি। চ্বকিতে ছানোয়ারের মগজে বিজলিবিদ্যুতের ঝটিকা ঝিলিক খেলে যায়— বড় ভাই-ই চিটার আজগইর‍্যাকে এই খেলায় নামায়নি তো? নইলে আজগইর‍্যাকেও কেন মরতে হবে? এক ঘন্টার খেলায় বড় ভাই’র কামাই পনেরো লাখ!

ছানোয়ার বিশ্বব্রহ্মান্ডের সকল শক্তি জড়ো করে চিৎকার দেয়—আমাকে বাঁচান। চোখ দুটো বিস্ফোরিত। সারা শরীরে প্রবল ঝাঁকুনি। কিন্ত উঠে বসার শক্তি নাই শরীরে। বড় ভাই বিরক্ত হয়। বলে— ফকিন্নির পোলার হুঁশ আসার এইটা একটা টাইম অইলো? ততক্ষণে ভ্যাজাইল্লা কাদিরার দলবল অফিসঘরের দরজা ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকে পড়েছে। বড় ভাই গা ছেড়ে দেয়া অসহায় ভংগিতে বলল—যাহ! ভাইরে তোদের যা ইচ্ছা করগা, একজন মানুষরে বাঁচাইতে চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখি নাই! আমাদের আর কোনো দায়দায়িত্ব থাকলনা!

মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত ছানোয়ার কলেমা পড়ে নেয়। কিন্তু হঠাত করেই যা ঘটল তা ছানোয়ার এতদিন খালি সিনেমাতেই দেখে আসছিল। এটা এফডিসির সেট নয় তো! ভ্যাজাইল্যা কাদিরা বলে উঠল—‘না না না না না, এরে ত’ মরতে দেয়া যাবেনা। আমাগো সবার জান দিয়া হলেও বড়লোকের পোলার জান বাঁচামু। তোমরা আম্বুলেন্স না ডাইকা পুলিশে না দিয়া ঠাশ করে ওরে আমাদের হাতে দিয়া দিলা, এখানে কিছু একটা ঘটনা আছে, কিছু একটা কিন্তু আছে খেলা আছে! তোমরা চাইতেছ বড়লোকের পোলা মরুক......

ভ্যাজাইল্লা কাদিরার বুদ্ধি-বিবেচনায় অভিভূত ছানোয়ার। ভ্যাজাইল্লার চার শিষ্য খাটিয়ার চার কোনা ধরে তাকে নিয়ে এল মুক্ত বাতাসে। রাখে আল্লা মারে কে? সারা দুনিয়ায় এত আলো! ছানোয়ারের হাড়গোড় ভাঙ্গার ব্যাথা-যন্ত্রণা কষ্ট মুহুর্তেই কর্পূরের মত বাতাসে উড়ে গেল যেন! প্রতিটি শ্বাসে-প্রশ্বাসে ভোরের শিশিরে ঝরা কাঁঠালিচাঁপার সুগন্ধ। ‘আজগর ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দিবনা’ শ্লোগান দ্রুত এদিকে এগিয়ে আসছে তবুও ছানোয়ারের বিন্দুমাত্র ভয় হ’লো না। উলটো মনে হল এই এক দেড় ঘন্টার নাটকীয়তা দিয়ে একটা ফিলিম বানাবে। খুব চলবে। মারমার কাটকাটতি হাউজফুল সিনেমা হবে। নিজে হবে নায়ক, ভ্যাজাইল্যা কাদিরার চরিত্র সহনায়ক। শাকিব খান রোলটা করবে। আজিজ খান ভিলেন। রোলটি করবে এ’সময়ের ভয়ংকরতম ভিলেন অভিনেতা টাঙ্গুয়া। তাৎক্ষণিকভাবে মনে একটি সংলাপও তৈরি হয়ে গেল— আজিজ খান, বেঈমানির প্রায়শ্চিত্ত করতে প্রস্তুত হ’ শয়তান! শত যুবতির জীবন নষ্ট করেছিস, এখন তোর জীবন আমার হাতে, হাহাহা! ক্ষণিকের জন্য নিয়ত-মানতগুলো ঝটিকা ঝিলিক দিয়েই কুয়াশা রাতের রাস্তার মত অস্পষ্ট হয়ে গেল। ছানোয়ারের মনে হল ও’সব পরে কোনো এক সময় ভাবা যাবে!

হঠাৎ খাটিয়া ঘেঁষে আরেকটি প্রাইভেট কার এসে থামল। কেন? ঝাপসা চোখেও ছানোয়ার দেখতে পায় ভ্যাজাইল্যা কাদিরা গাড়িটিতে চড়ে বসল। চোখের পলকেই প্রচন্ড স্পীডে কোথায় যেন চলে গেল গাড়িটি। হাজার কন্ঠে আগুনঝরানো ‘আজগর ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দিবনা’ ঝড়ের শক্তি নিয়ে খাটিয়াটির এক হাতের মধ্যে চলে এসেছে!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন